Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩২

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩২

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩২
শ্রাবণী ইয়াসমিন

গ্যারাজের পেছনের সেই গুপ্তকক্ষটা এখন ঘন অন্ধকারে ঢাকা। হালকা হলুদ আলোয় কক্ষের দেয়ালে ছায়া পড়েছে।
অ্যালেক্স সেই কক্ষের এক কোণে বসে আছে। ঠোঁট শক্ত করে কামড়ে ধরে, চোখ নিচু করে রেখেছে। তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে, মুঠো দুটো শক্ত করে বাঁধা। নিজেকেই দোষ দিচ্ছে বারবার,
“আমি যদি আরও সাবধান হতাম, একটু আগে টের পেতাম, তাহলে পানি এতটা ঘোলা হতো না।”
তার চোখে ক্লান্তি, অপরাধবোধ একসাথে।
ঘণ্টা খানেক আগে আশার পরপরই খবর পেয়েছিল, আনায়া ইতিমধ্যেই এখানে এসেছে।
আর এখন জেভিয়ার আনায়ার সাথেই অন্য কক্ষে আছে।
ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে। সময় স্থির হয়ে আছে এই নিস্তব্ধতার ভেতর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দরজার দিক থেকে পায়ের শব্দ। ভারী, মাপা পদক্ষেপ। অ্যালেক্স মুখ তুলে তাকালো সেইদিকে।
জেভিয়ার প্রবেশ করল। অল্প আলোয় তার বিশাল দেহের ছায়া দেয়ালে এমনভাবে পড়ল যেন কোনো অন্ধকারের দানব এগিয়ে আসছে।

চোখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
অ্যালেক্সের দৃষ্টি পরের মুহূর্তেই গিয়ে থামল তার হাতে। বাম হাতটা র/ক্তে মাখামাখি।
র/ক্ত এখনো তাজা হাত দিয়ে আঙুল গড়িয়ে মাটিতে পড়ঁছে সেই র/ক্ত। হাতের কাটা দাগগুলো এখনো ভিজে।
সাতটা গভীর পোচ, প্রতিটা যেন কারও জমে থাকা ক্রোধের চিহ্ন। চামড়া কেটে ভেতরের সাদা মাংস পর্যন্ত ফেটে আছে, যেন কেউ ইচ্ছে করেই রক্তের নিচে লুকানো হাড়ের ছায়া দেখাতে চেয়েছে।
এক ঝলক তাকালে মনে হয়, ওই হাতের অংশটা কেউ আলাদা করে কেটে রেখেছে তাই বুঝি ওই অংশ টুকু এইভাবে ফাকা হয়ে আছে। কাটা দাগটা এত ভয়াবহ যে, অ্যালেক্সের বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।
সে ধীরে বলে উঠলো,
“এই হাত… কে করল ভাই?”
জেভিয়ার কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ নিঃশব্দ, কিন্তু সেই নীরবতাতেই একটা ঝড় লুকানো।
সে শুধু নিঃশব্দে কক্ষের ভেতর এগিয়ে এল, চেয়ার টেনে বসল অ্যালেক্সের সামনে।
অ্যালেক্স তার দিকে তাকিয়ে থাকল মুখে প্রশ্ন, মনে আতঙ্ক। জেভিয়ার নিঃশব্দে একটা সিগার জ্বালালো, ধোঁয়া ছড়িয়ে গেল হলুদ আলোয়।
তার গলার স্বর নিচু, ঠান্ডা কিন্তু তীক্ষ্ণ,

“অনেক কিছুই আজ শেষ হয়ে গেল, অ্যালেক্স।”
অ্যালেক্স হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। হাতের দিকেই দৃষ্টি আবদ্ধ রেখে চোখ বড় বড় করে বলল,
“ভাই, আপনার এই অবস্থা কে করল?রক্ত বন্ধ করতে হবে এখনই, নয়তো বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে!”
জেভিয়ার কোনো কথা বলল না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দ, স্থির।
ঘরের আলোয় তার ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে, ভারী স্বরে বলল,
“অ্যালেক্স জানো, আমার বাচ্চা আসতে চলেছে।”
অ্যালেক্স অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জেভিয়ারের কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্তি।
জেভিয়ার আবার বলল, মুখে একরাশ তিক্ত হাসি ফুটে উঠল,
“আমি বাবা হতে চলেছি। আমার লাভবার্ড প্রেগন্যান্ট।” তার চোখে যেন অন্ধকারের মধ্যেও একটুখানি আলো জ্বলে উঠল।

“যতবারই এই কথা মনে হয়, ততবারই আনন্দের ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাকে।”
সে থামল এক মুহূর্ত। সিগারেটের ধোঁয়া হালকা কুয়াশার মতো বাতাসে ভেসে গেল। তারপর ঠোঁটের কোণ শক্ত করে বলল,
“কিন্তু আমার লাভবার্ড আমার বাচ্চাকে এই পৃথিবীতে আসতে দিতে চায় না, অ্যালেক্স।”
তার চোখে এবার এক প্রকার দহনের জ্বালা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সে হতাশ স্বরে বলল,
“ও আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়। ও ভাবে আমার মতো অমানুষ, জানোয়ারের সন্তানের জন্ম হওয়া উচিত না।”
অ্যালেক্সের বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। জেভিয়ারের কথা যেন তার বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। তার মনে প্রশ্ন জেগে উঠল
এই মানুষটার জীবনে যা ঘটছে, সেটার ছায়া কি আমার জীবনেও পড়বে?
তারও তো একটা ভালোবাসা আছে, তার অ্যাশ, তার রেড চেরি। সে কি একদিন ভুল বুঝবে? দূরে সরে যাবে?
অ্যালেক্স নিঃশব্দে চেয়ে রইল জেভিয়ারের দিকে। জেভিয়ার হঠাৎ গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
“অ্যালেক্স… আমি এত অপরাধবোধে ভুগছি কেন বলতে পারো?” তার গলায় নিস্তব্ধতার মধ্যে জমে থাকা এক যন্ত্রণার রেশ ফুটে উঠলো।
“আমার অপরাধগুলো আজ আমার শ্বাসরোধ করে দিতে চাইছে।”
অ্যালেক্সের বুক কেমন ভারী হয়ে উঠল।
সে দ্রুত বলল,

“ভাই, আপনি বসুন আগে। আমি মেডিসিন কিটটা নিয়ে আসি। হাতটা ব্যান্ডেজ করতে হবে এখনই।”
জেভিয়ার হঠাৎ এক তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। সেই হাসিতে কষ্ট, অবজ্ঞা, আর একফোঁটা বিদ্রুপ মিলেমিশে রয়েছে।
সে ধীরে ধীরে শার্টের বোতাম খুলে ফেলল।
কাপড়টা নামতেই অ্যালেক্সের নিঃশ্বাস থেমে গেল।
জেভিয়ারের বুক জুড়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন।
বুকের বা পাশে হাতের মতোই কেটে ফালা ফালা করা। রক্ত জমে কালচে হয়ে আছে, তবু চামড়ার নিচে তাজা লাল রেখাগুলো স্পষ্ট।
অ্যালেক্স আতকে উঠল।

“ভাই এ কী করেছেন আপনি!”
জেভিয়ার কোনো উত্তর দিল না। শার্টটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।
সে একবার কাটা হাতের দিকে তাকাল, তারপর বুকের ক্ষতের ওপর হাত রাখল।
তার আঙুলে রক্ত লেগে গেল, আর সেই রক্ত মিশে গেল ঘামের সাথে।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমার এইখানে অনেক ব্যথা হচ্ছে, অ্যালেক্স…”
তার গলা ধরে আসছে, যেন প্রতিটা শব্দ বুকের গভীর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।
“মনে হচ্ছে আমি আমার হৃদয়টাকে বুক চিরে বের করে ফেলছি, সব হারিয়ে ফেলছি আমি, অ্যালেক্স…”
অ্যালেক্স পাথর হয়ে গেল। তার চোখ জেভিয়ারের মুখে, কিন্তু সে যেন চিনতেই পারছে না এই মানুষটাকে। এই কি সেই জেভিয়ার যে ঠান্ডা মাথায় মানুষকে যন্ত্রণা দিতে পারে?
যে কারও কষ্টে চোখের পলকও ফেলে না?
এখন তার গলা কাপছে?একটা নারীর জন্য?
একটা অনাগত শিশুর জন্য?
জেভিয়ারের চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। রক্তক্ষরণের সাথে চোখের দৃষ্টি কেমন কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে।
তাও সে ঠোঁট কামড়ে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে তুলল। কষ্টে ভেজা, বিদ্রুপে ঢাকা এক হাসি।

“অ্যালেক্স, তুমি ভাবছো আমি সামান্য একটা মেয়ের জন্য এত মরিয়া হয়ে উঠেছি, তাই না?”
অ্যালেক্স কিছুই বলল না। চোখ নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। কারণ জেভিয়ার ঠিকই ধরেছে সত্যিই তো, সে এইটাই ভাবছিল।
জেভিয়ার হালকা হেসে আঙুল দিয়ে চোখের কোণা থেকে পানি মুছে ফেলল। তার কণ্ঠ নরম অথচ কেমন ভাঙা।
“মা-বাবা ছাড়া দুনিয়া যে কতটা নিষ্ঠুর, কতটা হিংস্র হতে পারে, তা আমি হাড়ে হাড়ে হাড়ে জানি অ্যালেক্স।” সে থামল এক মুহূর্ত।
“আমার বাবার টাকা ছিল, কিন্তু আমি পাইনি কিছুই। ছোট চাচার পা ধরে থাকতে হয়েছে সামান্য কিছু টাকার জন্য।”
তার গলা ভারী হয়ে উঠল। “সবাই ভাবত আমি অনেক ধনী, অনেক ক্ষমতাশালী পরিবারের ছেলে। কেউ জানত না, রাতে আমি কতটা ক্ষুধার্ত থাকতাম।”
সে হালকা হেসে নিচু স্বরে যোগ করল,

“ছেলে মানুষ হয়েও খাবার খেতে বসে চোখ ঝাপসা হয়ে যেত। ক্ষুধায় না… কষ্টে।”
অ্যালেক্স নির্বাক হয়ে শুনছে। ঘরের হালকা আলোয় জেভিয়ারের মুখটা অদ্ভুত লাগছে।
“এইসব কাজে আমি কখনো আসতে চাইনি,” জেভিয়ার বলল ধীরে। “আমার চাচাই আমাকে টেনে এনেছিল এই জগতে। তার কথা না শুনে যেতেই বা কোথায় পারতাম?”
সে একটু থামল। তারপর ঠোঁট শক্ত করে ফেলল,
“প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো, জানো? ছোট ছোট মেয়েগুলোকে কাঁদতে দেখলে বুকের ভেতর আগুন ধরত। মনে হতো পালিয়ে যাই, সব ছেড়ে দিই।”
একটা শ্বাস নিয়ে সে নিচু স্বরে যোগ করল,
“কিন্তু ধীরে ধীরে সব কষ্ট, সব গ্লানি সহ্য করতে করতে আজ এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি,
যেখানে অন্যের চিৎকার শুনে আমি শান্তি পাই।
অন্যের চোখের পানি দেখে আমি তৃপ্ত হই।”
অ্যালেক্স চুপ করে বসে রইল। তার মাথার ভেতর কেবল একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,

“এই মানুষটা কি সত্যিই অপরাধী? নাকি দুনিয়া ওকেই এমন করে বানিয়েছে?”
জেভিয়ারের প্রতিটা শব্দ যেন তার কানে নয়, বুকের ভেতরে বাজছে। সে কোনোদিনও জেভিয়ারকে এমন অবস্থায় দেখেনি এই মানুষটা তো সব সময় শক্ত, ঠান্ডা, ভয়ঙ্কর ছিল। আজ তার সামনে বসে আছে ভাঙা, বিধ্বস্ত এক মানুষ।
অ্যালেক্স নিঃশব্দে জেভিয়ারের কাঁধে হাত রাখল। তার উষ্ণ স্পর্শে জেভিয়ার মুখ তুলে তাকাল, তারপর হালকা এক হাসি দিল ব্যঙ্গমিশ্রিত।
“স্বান্তনা আসছে আমাকে দেখে, তাই না অ্যালেক্স?”
অ্যালেক্স কিছু বলল না। কিন্তু চোখের চাহনিতেই বোঝা গেল হ্যাঁ, এমন জেভিয়ার সে কখনো ভাবেনি।
জেভিয়ার ঠোঁট চেপে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর নিচু স্বরে বলল,
“আমি জানি, আমি আমার ব্যক্তিগত জিনিসগুলো নিয়ে অনেক ওভার পসেসিভ।
কিন্তু আনায়াকে আমি সত্যি ভালোবাসি, অ্যালেক্স। আমারও মন আছে তো। সেই মনে রাজত্ব করছে আমার লাভবার্ড।”
একটু থেমে গিয়ে জেভিয়ার আবারও বলল,

“আমি ওকে ছাড়া সত্যিই বাঁচতে পারবো না, ভালোবাসা কাকে বলে, মা-বাবা চলে যাওয়ার পর ভুলেই গিয়েছিলাম। যত্ন কী জিনিস, সেইটাও জানতাম না।
জেভিয়ারের গলার স্বর এখন কাঁপছে,
“ও একমাত্র নারী, যে আমার মরুভূমির মতো শূন্য মনে আবার ফুল ফোটাতে পেরেছে, অ্যালেক্স।”
তার চোখে হঠাৎ একরাশ বেদনা জমে উঠল,
“কিন্তু আমার অতীতের জন্য, আমার করা ভুলগুলোর জন্য আমি ওকেও হারাতে চলেছি।”
সে ফিচেল হেসে বলল,
“হায়… কী জীবন আমার, তাই না বলো?
যে জিনিসটা আমি সবচেয়ে আগলে রাখি,
দিন শেষে সেইটাকেই হারিয়ে ফেলি।”
অ্যালেক্স চেয়ে রইল জেভিয়ারের দিকে অ্যালেক্স কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,
“ভাই, আপনি এইসব ছেড়ে দিন।
নিজের মতো করে একটা আলাদা জীবন গুছিয়ে নিন।”
জেভিয়ার মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

“সম্ভব না, অ্যালেক্স…”
তার গলা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে গেল,
“এই পাপের অপরাধবোধ আমি আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বয়ে বেড়াবো। প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয়,
যে অন্যায়গুলো আমি সেই বাচ্চাগুলোর সঙ্গে করেছি, ঠিক সেরকম কিছুই হয়তো আমার বাচ্চার সাথেও হবে… তাই না?”
অ্যালেক্সের বুকটা কেমন চেপে এল।
সে একটু এগিয়ে বলল,
“ভাই, এত ভাবছেন কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে?
আপনি তো স্বেচ্ছায় এইসবে জড়িত হননি। আপনি একবার ভাবির সাথে কথা বলেই দেখুন।
ভাবি আপনাকে অনেক ভালোবাসেন, তিনি বুঝবেন। আপনি এই অন্ধকার জগৎটা ছেড়ে দিন। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
অ্যালেক্স জোর দিয়ে বলল,
“সৃষ্টিকর্তার কাছে মন থেকে ক্ষমা চাইলে,তিনি তো মাফ করে দেন, আর আমরা সামান্য মানুষ, তাই না?”
জেভিয়ার ধীরে চোখ তুলে তাকাল অ্যালেক্সের দিকে। চোখদুটি নিস্তেজ, তবু গভীর কোনো উত্তর নেই সেখানে, শুধু এক অজানা শূন্যতা।
সে কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে।

একটা অন্ধকার ঘরে ল্যাপটপের স্ক্রিনে আলো জ্বলছে। ডেভিড আর এরিক্স আধা বসা ভঙ্গিতে সামনে বসে আছে টেবিলে আধখালি বোতল, ছড়ানো গ্লাস, আর বাতাসে গন্ধ ছড়ানো দামি হুইস্কি।
আজ তাদের মুখে হাসি, চোখে মদের নেশা।
এরিক্স সিগারেট ধরিয়ে হেসে বলল,
“আজ তো আমাদের জন্য খুবই আনন্দের দিন, পার্টনার।”
ডেভিড গ্লাসে আবারও মদ ঢালল।
“তুমি ঠিক বলেছো,যে দিনটা এতদিন চেয়েছিলাম, মনে হচ্ছে সেটা আসতে চলেছে।”
ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখন লাইভ ফিডে দেখা যাচ্ছে,
জেভিয়ারের বাগানবাড়ি। আলোর ছটা, ছায়া, বারান্দা, গাছপালা সব কিছু স্পষ্ট।
হঠাৎই এরিক্স থেমে গেল। তার চোখ সরু হয়ে এলো, মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
“ওইটা… ওইটা দেখো, সে আঙুল তুলে বলল,
“বারান্দায় কিছু একটা নড়ল। ভিডিও পজ করো।”
ডেভিড একটু অবাক হলেও নির্দেশ মেনে ভিডিও পজ করল। এরিক্স স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
“জুম করো আরেকটু।”

ডেভিড জুম করতেই ফ্রেমের ভেতর স্পষ্ট হলো একটা ছায়া বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষের অবয়ব।
এরিক্সের ঠোঁটের কোণে এক বিকৃত হাসি ফুটে উঠল।
“আরেহ… এই ডাম্পস্টারটা এইখানে লুকিয়ে আছে!”
তার চোখে জ্বলে উঠল পুরনো ক্ষোভ।
“ওর জন্য কত জায়গায় খুঁজেছি আমি, কত ঝামেলা পোহাতে হয়েছে জানো? আজ… আজ আমি নিজেই ওর খবর নিচ্ছি।”
এই বলেই সে চেয়ার সরিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ডেভিড একটু দ্বিধায় পড়ল,

“এইসময় যাচ্ছ নাকি? এখন তো—”
“চুপ থাকো,” এরিক্স গর্জে উঠল,
“চলো আমার সাথে। এবার এই খেলাটার শেষ টানার সময়।”
ডেভিডও কিছু না বুঝে তার পিছু নিল।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখনও স্থির হয়ে আছে সেই ফ্রেম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তি,
যাকে দেখে দুটো নেশাগ্রস্ত চোখ এখন আগুনে ঝলমল করছে।
দশ মিনিটের ড্রাইভিং শেষে কালো গাড়িটা এসে থামল জেভিয়ারের বাগানবাড়ির গেটের সামনে।
নীরব রাত, আকাশে ম্লান চাঁদ, চাঁদের আলোয় গেটের উপরে ঝলমল করছে স্টিলের নেইমপ্লেট
“Mr. & Mrs. Drevan Amoria.”
বাড়িটা নিঃস্তব্ধ। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন কেউ নেই ভেতরে। হাওয়ায় পাতার মৃদু শব্দ,
আর সেই নির্জনতায় এরিক্সের ঠোঁটে ফুটে উঠল বিকৃত এক হাসি।

“এই তো…”
সে ফিসফিস করে বলল,
ডেভিড কিছু না বলে তার পিছু নিল।
দু’জন ধীরে ধীরে বাগানবাড়ির দিকে এগোতে লাগল, চাঁদের আলোয় তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ল ঘাসের উপর।
ঠিক তখনই নীরবতা ভেদ করে তীক্ষ্ণ শব্দে ভেসে এলো ঘেউ ঘেউ শব্দ।
টাইসন আর ভেনম জেভিয়ারের বিশ্বস্ত দুই পাহারাদার কুকুর বাগানের দিক থেকে ছুটে এলো তাদের দিকে।
এরিক্স কপালের পাশটা টিপে ধরল।
তার মাথা এখনো ঘোরাচ্ছে, মদের প্রভাব মিলেমিশে বিরক্তি বাড়িয়ে তুলছে তার ভেতরে।
টাইসন এগিয়ে আসতেই এরিক্স মাটির দিকে সামান্য ঝুঁকে জুতার পাশের ভেতর থেকে একটা ছোট ছুরি টেনে বের করল।
এরিক্স নিঃশব্দে ছুরিটা ছুঁড়ে দিল সামনের দিকে,
লোহার ঝলক চাঁদের আলোয় একবার ঝিকিমিকি করে উঠল, আর পরমুহূর্তেই টাইসনের ঘাড় বরাবর গভীরভাবে ঢুকে গেল সেটা।
রক্তের গরম ছিটা পড়ল ঘাসে।
টাইসন গরগর শব্দ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই, ভেনম গর্জে উঠল। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে ক্রোধে। সে হঠাৎ ছুটে এলো দ্রুত গতিতে, এরিক্স সামলে উঠার আগেই কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর!
এরিক্স চিৎকার করে উঠল ভেনমের ধারালো নখ তার হাতের চামড়া ছিঁড়ে ফেলছে, রক্ত ঝরছে ফোয়ারার মতো।
এরিক্স মরিয়া হয়ে কুকুরটাকে ঠেলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু ভেনম তার গায়ে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। রক্ত, কাদা, চাঁদের আলো সব মিশে এক ভয়াবহ দৃশ্য তৈরি করেছে।
ডেভিড পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল,

“এরিক্স! নড়ো না!”
সে কী করবে বুঝতে পারছে না। তার হাত কাঁপছে, নিঃশ্বাস অগোছালো। ভয় আর আতঙ্ক মিলে মাথা ঘুরছে। শেষমেশ এক ঝটকায় সে কোমর থেকে বন্দুকটা বের করল।
এরিক্স চিৎকার করে উঠল,
“শ্যুট করো! এখনই!”
বন্দুকের শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। চাঁদের আলোয় ধোঁয়ার হালকা রেখা দেখা গেল।
ভেনমের দেহ নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রক্ত ছিটকে পড়ল এরিক্সের মুখে।
ডেভিডের হাতে বন্দুকটা এখনো কাঁপছে।
তার চোখে আতঙ্ক,৷ আর কানে ভেসে আসছে কুকুর দুটো মৃতদেহের চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার অদ্ভুত নীরব গুঞ্জন।
এরিক্সের মুখে ফুটে উঠলো ভয়ংকর এক বিকৃত হাসি। হাতের আঁচড় থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে যেন কিছুই টের পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, ভারী নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
চাঁদের আলোয় তার মুখটা যেন আরও ভয়ংকর লাগছে ঠোঁটে সেই শিকারীর হাসি।
ডেভিড কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু এরিক্স ইতিমধ্যেই এগিয়ে গেছে বাড়ির মূল দরজার দিকে। বাড়িটা নিস্তব্ধ, শুধু তার দরজা নক করার শব্দ চারপাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষন পর ভেতর থেকে আসছে পায়ের আওয়াজ। ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে থামল সেই পদচারণা।
দরজাটা হালকা শব্দে খুলতেই এরিক্স দেখলো দরজার ওপাশে অ্যাশলি দাঁড়িয়ে আছে।
অ্যাশলির চোখ বড় হয়ে, ঠোঁট কেঁপে উঠলো।

“তু… তুমি…?”
এরিক্স হেসে মাথা কাত করল। রক্তমাখা হাতটা দরজার পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। অ্যাশলি এক পা পিছিয়ে গেল। হঠাৎ দৌড়াতে চাইল।
কিন্তু এরিক্স হাত বাড়িয়ে তার কব্জি ধরে ফেলল।
“ এই পালাচ্ছিস কেন? আজ যে পেয়ে গেলাম তোকে!কোথায় পালাবি আজ? কত পরিশ্রম হয়েছে তোকে হারানোর পর।সব গুনে গুনে মাশুল নেবো আজ।”
অ্যাশলির হাত-পা কাঁপছে ভয়ে।

“ছাড়ো ভাইয়া! প্লিজ!” অ্যাশলি হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু হাত ছাড়ানো যাচ্ছে না।
অ্যাশলির চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। তার নীলাভ চোখের মণির পাশের সাদা অংশ লাল হয়ে এসেছে অতিরিক্ত কান্নার তোপে। তার সম্পূর্ণ ফর্সা মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে আতংকে।
এরিক্স এর নির্দেশনায় ডেভিড এগিয়ে এসে অ্যাশলির মুখ এবং হাত শখ করে বেধে ফেলল। কাপড় দিয়ে। এত টাই শখ বাধন যে ঠোঁটের পাশ দিয়ে চিড়ে ফেটে যাচ্ছে।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩১

এরিক্স বাকা গেসে অ্যাশলি কে এক কাধে তুলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নিচে কার্পেট এর ওপর ফেলে দেয়। অ্যাশলি ব্যাথায় কাকিয়ে উঠে। এরিক্স নিজের শার্ট এর বোতাম খুলতে খুলতে বলে,
“আজ তোমার মুক্তি নেই এরিক্স এর হাত থেকে।”
অ্যাশলির চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তার মস্তিষ্ক তাকে বারবার জানান দিচ্ছে, “তার সময় শেষ।”
অ্যাশলি ব্যাকুল চোখে দরজার দিকে তাকায়, “তার ভরসা আছে অ্যালেক্স আসবেই সময় মত তাকে বাচাতে।”

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৩