অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৬
শ্রাবণী ইয়াসমিন
অন্ধকার সাউন্ডপ্রুফ ঘরটায় যেন এক ধরনের চাপা গন্ধ র*ক্ত, ঘাম আর পচ*ন ধরা মাং*সের মিশ্র গন্ধ যেন বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
চেয়ারের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা লোকটা তখনও কাঁপছে। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ ছড়িয়ে আছে কিন্তু ভয়ের কারণে নয়, অসহ্য যন্ত্রণায়। কারণ তার দুটো পা-ই থেঁতলে দেওয়া হয়েছে।
হাত ও পায়ের সবগুলো নখ প্লাস দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। রক্তে ভেজা নখগুলো একটা ছোট স্টেইনলেস ট্রে-তে সাজিয়ে রাখা। ঠিক যেন ট্রফি।
লোকটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কান্না নয় এটা মৃত্যুর আগে দেহের কাতর বিলাপ। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেভিয়ার কঠিন, নীরব, তার চোখে একটা অন্ধকার যা কোনো সাধারণ মানুষের চোখে থাকে না।
হাতে ধরা চিকন ছুরিটা দিয়ে সে তার আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে চাপ দিচ্ছে।
– “বল… শেষবার বলছি… লোকটা কে?”
লোকটা ফুঁপিয়ে বলে, গলার স্বর জড়ানো—
– “আমি… আমি কিচ্ছু জানি না… প্লিজ… আর না…”
জেভিয়ার মাথা নাড়ল। তারপর আচমকা ছুরিটা ঢুকিয়ে দেয় লোকটার বাঁ কানটায়। একটা ঘিনঘিনে শব্দ হয় চামড়া ছিঁড়ছে, হাড় কেটে যাচ্ছে।
লোকটা গর্জে ওঠে যন্ত্রণায়। কাঁধ, ঘাড় আর গলা রক্তে ভিজে স্যাতস্যাতে। চেয়ারটা তার গোঙ্গানিতে দুলছে।
জেভিয়ার কিছু বলে না।সে সামনে এসে ছুরিটা লোকটার বাম চোখের পাশে ধরে, খুব কাছ থেকে।
– “তুই জানিস আমি কি করতে পারি। আমি এই দিয়ে ছয়বার জিজ্ঞেস করছি। এইবারও না বললে… চোখটা উপড়ে ফেলব। আর তুই জানিস আমি কথা রাখি।”
লোকটা কাঁপছে। ঠোঁট নড়ে কিন্তু শব্দ বের হয় না।
জেভিয়ার ছুরিটা চোখের এক পাশে ধীরে ধীরে চেপে ধরে। চোখ থেকে রক্তের এক ফোটা ঝরে পড়ে।
এইবার লোকটা আর সহ্য করতে পারে না।
এক ঝটকায় চেঁচিয়ে ওঠে—
– “আছে! একজন আছে! আমি জানি, ও জানে!”
জেভিয়ার পেছনে হেঁটে গিয়ে থামে।
– “কে?”
লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বলে—
– “ওই ফ্রান্সে থাকে। টাক মাথা, মাথায় একটা দাগ আছে। দাগটা টুপি দিয়ে ঢেকে রাখে সবসময়। ও জানে… সব জানে।
জেভিয়ার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
লোকটা এবার কাতর গলায় বলে—
– “আমাকে ছেড়ে দে… প্লিজ।
জেভিয়ার মুখে এক অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি খেলে যায়। সে এগিয়ে আসে, তার কাঁধে হাত রাখে। যেন এক সহানুভূতির স্পর্শ।
– “অবশ্যই। তুই অনেক ভালো করেছিস। তোকে আমি নিজে গিয়ে পৌঁছে দেব… ওকে?
লোকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েছিল।
এক মুহূর্তে ছুরিটা ঢুকে যায় তার ডান চোখের ঠিক কেন্দ্রে।
লোকটা শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে নিথর হয়ে যায়।
র*ক্ত টপ টপ করে ঝরছে। জিভ বের হয়ে এসেছে, চোখটা একদম থেঁতলে গেছে।
জেভিয়ার ছুরিটা বের করে। তারপর শ্বাস নিয়ে গর্জে ওঠে—
– “তুই চাইল্ড রেপিস্ট ছিলি! তুই চাইল্ড রেপিস্ট ছিলি! তুই চাইল্ড রেপিস্ট ছিলি !
– “তুই ভাবলি তোকেই ছেড়ে দেব আমি?!
জেভিয়ার ছুরিটা ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার হাতে খেলাচ্ছে। চোখ দুটো স্থির, মুখটা বিস্বাদ আর সন্তুষ্টির হাসি মাঝখানে ঝুলে আছে।
তিন ঘণ্টা।
ঠিক তিন ঘণ্টা ধরে এই লোকটাকে সে ধীরে ধীরে ভেঙেছে।
প্রতিটি নখ তুলে ফেলার সময়, প্রতিটি থেঁতলে দেওয়া হাড়ের আওয়াজ, প্রতিটি চিৎকার, সবই ছিল তার জন্য একটা নেশার মতো।
রক্তের গন্ধটা সে দম নিয়ে নিয়ে টেনেছে।
– “আহ্… এমন ঘ্রাণে তৃপ্তি আসে। অদ্ভুত শান্তি।
সে নিঃশব্দে হেসে ফেলে। তার পেটটা গড়গড় করে উঠল।
একটা হালকা বিরক্তি তার চোখে।
– “হু… খিদে পেয়েছে।
সে ঘড়ির দিকে তাকায়।
– “তিন ঘণ্টা হয়ে গেলো।
তারপর ছুরিটা ধুয়ে একটা র্যাক-এ রাখে। পেছনে পড়ে থাকা মৃতদেহটা ঠান্ডা। মাথার একপাশ গর্ত হয়ে গেছে। চোখের জায়গায় ছুরির দাগ। পা, হাত সব ভাঙা, থেঁতলে যাওয়া।
এখন সময় হয়েছে, লাশ পরিষ্কারের।
জেভিয়ার কারো উপর ভরসা করে না। এক ইঞ্চি বিশ্বাসও না। তার চোখে “গোপনীয়তা মানেই বেঁচে থাকা”।
সে যা করে নিজেই করে। সবসময়।
– “ঠিক প্রতিবারের মতো… এবারও আমাকেই করতে হবে।
সে হালকা করে গাঁট খোলে জামার বোতাম। তারপর লম্বা রাবার অ্যাপ্রোন পরে। হাতে গ্লাভস। একটা বড় মাংস কাটার ছুড়ি তুলে নেয়।
চকচকে মার্বেল ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন শেইলির মা–বাবা। ভাঙা গলায় মিনতি করছেন…
রেবেকা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন-
“আপনার পায়ে পড়ি স্যার… শেইলিকে আমাদের ফিরিয়ে দিন… ও তো ছোট একটা মেয়ে।
ভিক্টর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, ঠোঁটে একরকম বিরক্তিকর উদাস ভাব। তার চোখদুটো যেন কাঁচ দিয়ে তৈরি শুধু দেখছে, বুঝছে না কিছুই।
তার আঙুলে হীরে বসানো আংটি ঘোরানো ছাড়া আর কোনো সাড়া নেই।
হঠাৎ রনি, তার ছায়ার মতো একনিষ্ঠ অ্যাসিস্ট্যান্ট, সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে কানে কিছু বলে।
ভিক্টরের ঠোঁটের কোণে ঠাণ্ডা একটা হাসি খেলে যায়।
ভিক্টর নিচু গলায়, নিজের মনেই নিজে বল ওঠে-
“Finally…”
সে উঠে দাঁড়ায়, ধীরে। তার চলাফেরায় একটা অলস রাজকীয়তা যেন সব নিয়ন্ত্রণে, যেন কারও কষ্ট তাকে ছুঁতে পারে না।
সে নিচু হয়ে শেইলির মায়ের কাঁধে আলতো হাত রাখে।
ভিক্টর খুবই কোমল স্বরে হালকা হাসি দিয়ে বলে-
“এখন আপনি নিতে পারেন আপনার মেয়েকে। আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার শিকার আমি পেয়েছি।”
শেইলির মা বাবা যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারে না ভিক্টর ক্রুজ এত বড় মাপের মাফিয়া তাদের মেয়েকে এত সহজে ফেরত দিয়ে দিলো!
তারা জানে না শেইলি ফিরবে কেমন অবস্থায়।
আনায়া নিচে নামছিল ধীর পায়ে। জুতার শব্দও যেন থেমে গেছে কার্পেট পেরিয়ে মার্বেল ফ্লোরে। কেমন একটা টান কাজ করছিল ওর ভেতরে অকারণ একটা অস্বস্তি, বুকের ভেতর ঘিরে থাকা হিম হাওয়া।
হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেল এক জায়গায়।
দৃষ্টি থেমে গেল ডাইনিং রুমের পাশের গ্লাস দরজার সামনে যেখানে অদ্ভুত অন্ধকার একটা কর্নার আছে, ঠিক যেন বাড়িটার ছায়া।
ও খেয়াল করলো জেভিয়ারের সেই দুই বিদেশি কুকুর সেখানে বসে আছে।
কিন্তু আজ ওদের আচরণ অস্বাভাবিক।
ওরা যেন এক থলের ভেতর থেকে কিছু একটা টেনে টেনে খাচ্ছে। হাড়ের আওয়াজ কচ কচ করে ভাঙছে নিঃশব্দে।
আনায়া একটু এগিয়ে গেল, কৌতূহল আর অজানা আতঙ্কে। হঠাৎ থলে থেকে কিছু একটা গড়িয়ে পড়লো।
আনায়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
ওর চোখ আটকে গেল সেই জিনিসটার উপর।একটা মানুষের হাতের আঙুল। রক্তমাখা, নখহীন, থেঁতলে যাওয়া।
কান্নার মতো অবয়ব এখনও জমে আছে আঙুলের ভাঁজে।
আনায়ার শরীর থেকে যেন গলা পর্যন্ত একটা ঠান্ডা শক বয়ে গেল।
পেছনের হাড়গোড় ভাঙার আওয়াজ, কুকুরের চিবানোর শব্দ সব মিলে এক ভয়ানক বিভীষিকার চিত্র।
আনায়া দু’পা পিছিয়ে আসে, ঠোঁট কাঁপে তারপর,একটা বিকট চিৎকার বেরিয়ে আসে ওর গলা থেকে—
– “জেভিয়ার!!
– “জেভিয়ার!!
ওর গলার স্বর কেঁপে কেঁপে বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
বাড়ির আলো যেন হঠাৎ আরও নরম হয়ে আসে, আর নিচের অন্ধকার কর্নারটা হয়ে ওঠে আরও গভীর।
দূরে কোথাও থেকে ঠাণ্ডা পায়ের শব্দ ভেসে আসে জেভিয়ার কি শুনেছে?নাকি সে ইচ্ছা করেই আসছে না?
আনায়া আরেকবার চিৎকার করে ওঠে—
– “জেভিয়ার!!
তার চোখ তখনও সেই থলের দিকে যেখানে রক্তের দাগ মেঝেতে লম্বা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে… আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে দুই কুকুর নিষ্ঠুর তৃপ্তিতে মুখে রক্ত মেখে চিবিয়ে যাচ্ছে মানুষের দেহাংশ।
আনায়া কাঁপতে কাঁপতে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়।
জিভ শুকিয়ে গেছে, মুখে একফোঁটা শব্দ পর্যন্ত আটকে আসে না। বুকের মধ্যে শুধু একটাই শব্দ জেভিয়ার।
– “জেভিয়ার…!!”
– “জেভিয়ার, কোথায় তুমি!”
হাঁটার আওয়াজ নেই, কেবল দম বন্ধ হয়ে আসা নিঃশ্বাসে তার চারপাশ ভারী হয়ে উঠছে। তখনই সে থেমে যায়।
বেসিনের পাশে একটা দীর্ঘ আকৃতি দেখা যায়।
পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকা জেভিয়ার।
কিচেনের বেসিনে ঝুঁকে কিছু একটা করছিলো সে। কিন্তু আনায়ার কণ্ঠস্বর শুনেই তার হাতের গতি থেমে গেছে।
ধীরে ধীরে সে ঘাড় ঘোরায়।
আনায়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
– “ত…তুমি… ওরা… ওরা কী খাচ্ছিল, জেভিয়ার?
আনায়ার কণ্ঠ ভাঙা, তবু সাহস জড়ো করে সে জিজ্ঞেস করে যায়,
– “আমি দেখেছি… ওদের থলে থেকে… মানুষ… একটা আঙুল ছিল… রক্তমাখা… নখ ছিল না…
আনায়া কিছুটা দুলতে দুলতে জেভিয়ারের দিকে এগোয়… কিন্তু যতটা এগোয়, তার চোখ বড় হতে থাকে।
তার পা হঠাৎই জমে যায়।
জেভিয়ারের হাতে ধরা ছুরিটা সে স্পষ্ট দেখতে পায়। ছুরির গায়ে লেগে থাকা রক্ত আর বেসিনের পানির ধারে লাল হয়ে থাকা দাগ।
– “ত…তোমার হাতে… রক্ত!
আনায়া যেন এক ঝটকায় ছিটকে যায় পেছনে।
সে কাঁপতে কাঁপতে দেয়ালের সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়ায়।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে ছুরিটা ফেলে দেয় বেসিনে।
তার চোখে কোনো আতঙ্ক নেই। বরং একটা অদ্ভুত মোলায়েমতা, যেন কেউ দুধের শিশুকে বোঝাচ্ছে।
হাতের গেঞ্জিতে ছুরির রক্ত মুছতে মুছতে সে এগিয়ে আসে।
– “অ্যানা… তুমি ভয় পেয়েছো?
তার কণ্ঠ এমনভাবে শান্ত, যেন এই বাড়িতে কোনোদিন কিছুই ঘটেনি।
– “ভয় পেয়ো না… আমি শুধু চিকেন কেটেছিলাম। আজকের ডিনারের জন্য। ছুরিটায় রক্ত লেগে ছিল, সেটা ধুচ্ছিলাম।
আনায়া চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তার চোখ এখনও কাঁপছে।
– “তুমি… মিথ্যা বলছো, জেভিয়ার।
– “ওরা যা খাচ্ছিল… ওটা মানুষ ছিল। ওই আঙুল… তুমি দাওনি ওদের? বাহিরের কেউ নিশ্চয়ই তোমার বাড়িতে এসে তোমার কুকুরকে ওগুলো দেয়নি, তাই না?”
জেভিয়ার দাঁড়িয়ে থাকে।
তার মুখে কোনো গর্জন নেই। কিন্তু তার চোখ সেই শীতল অন্ধকারে ঢাকা।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
– “তুমি জানো, অ্যানা… কখনো কখনো কুকুরদের একটু ‘প্রোটিন’ দেওয়া দরকার হয়। আর সব প্রোটিন একরকম হয় না।
আনায়া দু’পা পেছাতে থাকে।
তার কণ্ঠ তখনও কাঁপছে—
– “তুমি কী করো জেভিয়ার? কে তুমি আসলে?
জেভিয়ার এক পা বাড়ায়।
আনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
জেভিয়ারের ঠান্ডা মুখ আর অদ্ভুত ব্যাখ্যা সবকিছুই যেন হঠাৎ একটা অন্ধকার গর্তের মতো তার বুকের ভেতর জমে বসেছে।
সে থরথর করে উঠে দাঁড়ায়, পেছনের দরজার দিকে এগোয়।
– “আমি… আমি থাকতে পারবো না এখানে।
আনায়া নিঃশ্বাস আটকে আসা গলায় বলে।
– “জেভিয়ার, প্লিজ… আমি বের হতে চাই প্লিজ…”
জেভিয়ার কিচেনের দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।
সে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, একটুও বাঁধা দেয় না।
আনায়া ভেবেছিল হয়তো সে তাকে থামাবে… চিৎকার করবে… অথবা দরজা লক করে দেবে…
কিন্তু কিছুই করে না। এটাই তাকে আরো ভয় পাইয়ে দেয়।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
আর তখনই—
পেছন থেকে এক গম্ভীর গলা, ঠান্ডা অথচ গভীর।
– “লাভ বার্ড…
আনায়া যেন পাথর হয়ে যায়।
তার গলা শুকিয়ে আসে। পা যেন মাটি ছুঁয়ে আছে ঠিক, তবু শরীরটা আর নড়ছে না।
পেছনে ঘাড় না ঘুরিয়েও সে অনুভব করতে পারে—জেভিয়ার হাসছে না, তবে চোখে আগুন জ্বলছে।
– “আমার থেকে পালানোর চেষ্টা করো না, লাভ বার্ড।
তোমার পা থেকে মাথা অবধি… সবটাই আমার কাছে ক্যাপচার্ড আছে।তোমার বাড়ির সিসিটিভিগুলো তো আমিই লাগিয়েছিলাম বেইবী।
আনায়ার চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে যায়। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকায়
জেভিয়ার তখনও দাঁড়িয়ে আছে। শরীরটা থমথমে। চোখে একপ্রকার নিঃশব্দ দাবানল।
– “তুমি তো আমার হৃদয় নও, লাভ বার্ড … তুমি আমার প্রপার্টি।”
আনায়া পেছাতে পেছাতে দেয়ালে ঠেকে যায়। তার ঠোঁট কাঁপে, গলা দিয়ে শব্দ বের হতে চায় না।
– “ত…তুমি পাগল জেভিয়ার।
তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে… তুমি আমার কাছ থেকে পালাতে পারবে?”
এই বলেই জেভিয়ার পাগলের মত করে হাসতে থাকে।
আনায়া দরজার সামনে হাটু গেড়ে বসে, মুখটা মুখোশের মত গুঁজে রেখেছে নিজের হাতে। তার চোখ থেকে নীরব কান্না গড়িয়ে পড়ছে বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে নিঃশব্দ চিৎকারে।
এই রুমটা তার কাছে এখন একটা জ্যান্ত কফিন মনে হচ্ছে। এবং সবকিছু যেন পরিষ্কার হতে শুরু করেছে তার চোখে।
“জেভিয়ার তাকে প্রথম থেকেই স্টক করছিলো?আর আমি সেই রাতে তো ওর কাছেই সাহায্য চেয়েছিলাম।
তাহলে আমি নিজেই তো নিজের শিকারি বাড়িতে এসে উঠেছি।
হঠাৎ, একটা ধীর শব্দ হয় দরজার। তারপর দরজা খুলে যায়। আলো ছায়া ভেদ করে ভিতরে আসে জেভিয়ার। হাতে একটা ট্রে, তাতে সাজানো খাবার।
তার মুখে নরম হাসি, চোখে সেই চিরচেনা অদ্ভুত প্রশান্তি।
“খাও, লাভ বার্ড। তুমি সারাদিন কিছু খাওনি,আমার খুব খারাপ লাগছে।
আনায়া কিছু বলে না।
সে শুধু তাকিয়ে থাকে জেভিয়ারের দিকে তারপর এক চিৎকারে প্লেটটা ঠেলে ফেলে দেয়। গ্লাস ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, খাবার ছিটকে পড়ে মেঝেতে।
এক সেকেন্ড… দুই সেকেন্ড…
তীব্র নীরবতা।
তারপর জেভিয়ারের চোখের কোণ গাঢ় হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে ট্রেটা নামিয়ে রাখে পাশে তারপর দ্রুত আনায়ার কাছে এগিয়ে আসে-
– “তুমি আমার হাতের খাবার ফেলে দিলে, লাভ বার্ড?
সে আনায়ার গালটা শক্ত করে চেপে ধরে, মুখটা একদম কাছে এনে হিসহিসিয়ে ওঠে—
> “আমি তোমার জন্য ভালোবেসে খাবার এনেছিলাম
আর তুমি? তুমি এটা করলে?
তারপর এক ঝটকায় আনার হাত ধরে টেনে তাকে রুম থেকে বের করে আনে।
আনায়া বাধা দেয়, চিৎকার করে কিন্তু জেভিয়ার থামে না। সে সরাসরি নিচের ডাইনিং টেবিলে ওকে এনে বসায়।
আনার গালটা লাল হয়ে আছে শক্ত করে চেপে ধরায় , চোখ টপটপ করে জল পড়ছে।
জেভিয়ার শান্ত গলায় বলে—
“- চুপচাপ খাবে এইবার কেমন?
সে নতুন করে খাবারের প্লেট সাজায়, আস্তে করে এক টুকরো খাবার তুলে ধরে আনার মুখের সামনে।
আনায়া মুখ ঘুরিয়ে নেয়। উঠে যেতে চায়।
ঠিক তখনই তার হাত জেভিয়ার মুচড়ে ধরে নিজের কোলে বসিয়ে নেয়। আনায়ার কাঁধটা টান মারে সে ব্যথায় ফুঁপিয়ে ওঠে।
জেভিয়ার তার গাল ছুঁয়ে আদরের ভঙ্গিতে খাবার মুখে দেয়।
আনায়া প্রথমে মাথা নাড়ে, তবুও ভয়ে মুখ খুলে যেন মৃত্যু গিলে নিচ্ছে।
জেভিয়ার তারপর আস্তে ওকে ছেড়ে দেয়।
আনায়া ছিটকে দূরে গিয়ে বসে পড়ে কাঁপতে থাকে।
তার চোখ পড়ে নিজের হাতে যেখানে জেভিয়ারের টানের দাগে লালচে হয়ে গেছে চামড়া।
ঠিক তখনই জেভিয়ার আবার ফিরে আসে।
সে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে, তার মুখ সামনে এনে পাগলের মত মাথা নেড়ে নেড়ে বলতে থাকে—
“লাভ বার্ড… তুমি আমার কথা শোনো না কেন?”
“তুমি আমার মাথাটা খারাপ করে দাও…”
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৫
“তুমি যদি লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকো, আমি তোমার জন্য সব করতে পারি… সব…”
“আর আজ থেকে তুমি শুধু আমার কথা শুনবে আর আমায় ভালোবাসবে। শুধু মাত্র আমাকে নিয়ে ভাববে।
জেভিয়ার আনার মুচড়ে ধরা হাতে একটা ধীর চুমু খেলে দেয়।
তারপর কানে কানে বলে—
“কাল আমাদের বিয়ে লাভ বার্ড। তুমি শুধুই আমার লাভ বার্ড। শুধুই আমার,শুধুই আমার শুধুই আমার
