অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১
শ্রাবণী ইয়াসমিন
“- মেয়েটিকে আমাদের হাতে তুলে দিন। এর পরিবর্তে আপনাদের যত টাকা লাগবে আমি দেবো।তবে মেয়েটিকে আমার চাই-ই চাই, সেইটা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।
মিস্টার রবিন এবং তার স্ত্রী মিসেস রেবেকা, লোকগুলোর মুখোমুখি সোফায় বসে আছেন। তাদের মুখে ভয়ের পাশাপাশি আতংকের ছাপ স্পষ্ট।
কিছুক্ষণ পর মিস্টার রবিন জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলতে যাবেন তার আগেই লোকগুলো টাকা ভর্তি একটি স্যুটকেস তাদের সামনে রেখে খুলে দেয়।
মিসেস রেবেকার যেন এতগুলো টাকা দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। জীবনে প্রথম সে এতগুলো টাকা চোখের সামনে দেখতে পারছে। সে একবার তার স্বামীর দিকে তাকায়, মিস্টার রবিনও টাকা গুলোর দিকেই থ হয়ে তাকিয়ে আছেন।
তাদের দিকে তাকিয়ে ভিক্টর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে-
“- ঠিক দুদিন সময় দিলাম আপনাদের তিনদিনের দিন মেয়েটিকে আমাদের কাছে তুলে দিবেন। আপাতত এইটাকা গুলো রাখুন। মেয়েটাকে আমাদের কাছে তুলে দিলে এর চেয়েও ডাবল পাবেন।
মিস্টার রবিন ভিক্টর এর তাদের দিকে তাকালো। তার মুখ দিয়ে যেন কোন কথাই বের হচ্ছে না। সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা লোকটার চেহারাও সে ঠিকভাবে দেখতে পারছে না। শুধু দেখছে একটি কালো স্যুট পড়া লোক চোখে সালগ্লাস আর মুখে মাস্ক পড়া তাদের সামনে সোফায় একদম আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে।তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ৩ জন বডিগার্ড।
তিনি কিছু বলার আগেই তার স্ত্রী পাশে থেকে তারাহুড়ো বলে ওঠে-
“- হ্যা রাজী। আমরা রাজী আছি। আপনারা ২ দিন পর এসেই ওকে নিয়ে যেতে পারেন আমাদের কোনো সমস্যা নেই একদমই।
ভিক্টর হালকা বাকা হেসে সেইখান থেকে উঠে পড়ে।
“- তুমি এইটা কি করলে? আনায়া কে তাদের হাতে তুলে দিতে চাইলে? ওরা আনায়ার সাথে যদি খারাপ কিছু করে?
মিসেস রেবেকা ভ্রু কুচকে ফোস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে-
“- তোমার বোনের মেয়ে বাড়িতে বসে শুধু অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া আর কি-ই বা করছে? সারাদিন শুয়ে বসে কি সব ছাই পাশ লিখতে থাকে। এই মেয়েকে দিয়ে যদি আমাদের কাছে এত এত টাকা আসে তাহলে তো আমাদেরই লাভ।
আনায়ার মামা তার স্ত্রীর দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তার স্ত্রী আবারও বলতে থাকে-
“- এছাড়াও ঘরে আমাদের মেয়ে বড় হচ্ছে ওইও তো আনায়ার সমবয়সীই ওকেও তো বিয়ে দিতে হবে আবার তোমার ছেলেটারও তো ভবিষ্যৎ আছে তাইনা সব কিছুতেই আমাদের অনেক টাকার প্রয়োজন । আমি সব ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি আর কথা বাড়িও না আমি যা করেছি ভেবে চিন্তেই করেছি।
আনায়ার মামা আর কথা বাড়ালেন না কারণ তার ধারণা তার স্ত্রী ঠিকই বলছে।
ঘরের কোণার ছোট্ট টেবিলটা আজ অনেকটা গুছানো। তবুও আনায়ার মনে জট লেগে আছে।পর্দা সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থেকেও মন যেন পড়ে আছে খাতার ভাঁজে। হাতে ধরা কলম, সামনে খোলা ডায়েরি তবুও আজ শব্দেরা কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না।
শব্দের মতোই বেঁকে বসেছে মনটাও।
নিচতলা থেকে কিছুক্ষণ আগে ভেসে এসেছিল কিছু অচেনা কণ্ঠ, ভেতরে একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে দিলেও আনায়া সে সব গুরুত্ব দেয়নি। এ বাড়িতে আসার পর থেকেই তার জীবনে যা ঘটে, তার অনেকটাই সে জানে না জানার প্রয়োজনও মনে করে না।
আনায়ার জীবনটা যেন দুধারে বন্ধ এক সরু গলি, যার শেষ মাথায় শুধু লেখার স্বপ্ন।
সে জানে, সে ভিন্ন।
সে জানে, এ বাড়িতে তার কোনো জায়গা নেই—শুধু সহ্য করে নেওয়া হয়, সময় কাটিয়ে দেওয়া হয়। শুধু একজন তার নানুআপা যিনি নিঃশর্তে ওকে ভালোবাসেন। বাকি সবাই যেন শুধু তাকে দেখে বোঝা হিসেবে।
মা বাবার স্মৃতিও আজ যেন ঝাপসা হয়ে এসেছে তার মনে।
ছোট্ট বয়সে তারা চলে গিয়েছিল এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায়, আর সেই থেকে এই বাড়িতেই বেড়ে উঠছে আনায়া প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে মামির কটুক্তি, অবজ্ঞা আর ঠান্ডা অপছন্দের দেয়ালে দেয়ালে আটকে থেকেও নিজের স্বপ্নটা আঁকড়ে ধরে রেখেছে সে।
মামাতো বোন শেইলি মাঝে মাঝে চেপে ধরে তাকে বিদ্বেষে, হিংসায়।
আজও দরজার কোণায় দাঁড়িয়ে বলে ওঠে–
“– কি সব গাধাগাধি লেখিস রে? তুই কি ভাবিস, তোর মতো বলদ কেউ লেখিকা হয়?
কী সব ভাষা, মাথার মধ্যে ঢুকে না কিছু! হাসি পায় তোকে দেখে!”
আনায়া তাকায় না, প্রতিবাদও করে না। এই কথাগুলো অনেকবার শুনেছে সে। প্রতিবার নতুন কষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু এখন সেগুলো বুকের মধ্যে আর নতুন করে থরথর করে না। তবুও আজ মনটা ভার হয়ে আছে।
কলমটা পৃষ্ঠা ছুঁয়ে থাকে অনেকক্ষণ, কিন্তু কোনো শব্দ তৈরি হয় না। এক ফোঁটা নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস শুধু বেরিয়ে আসে ঠোঁটের কোণ থেকে।
আনায়া জানে না, তার চারপাশে ঠিক এখনই এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র জন্ম নিচ্ছে। সে জানে না, দুদিন পর তার জীবন নেমে আসতে চলেছে এক তীব্র ঝড়।
নিচতলার বসার ঘরে উত্তেজনার ঝাঁজ ছড়িয়ে পড়েছে।
মিস্টার রবিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখ নামানো।
আর তার সামনে দাঁড়িয়ে তার বৃদ্ধা মা—আনায়ার নানুআপা—চোখ দুটো অশ্রু আর রাগে লাল।
তিনি থরথর করে কাঁপা গলায় বলে উঠলেন—
“– তুই কি পাগল হয়েছিস রবিন? একটা বাচ্চা মেয়েকে, যে তোর বোনের শেষ স্মৃতি, তাকে তুই বিক্রি করে দিবি? টাকা কী এতটাই দরকার হয়ে গেছে যে তোর বিবেকও বিক্রি করে দিলি?”
রবিন কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার মা থামিয়ে দিলেন—
“– না, তুই চুপ কর! আমি সব শুনেছি। ওই লোকেরা যখন টাকার স্যুটকেস রাখলো, তোর বউ যখন হ্যাঁ বললো… আমি ওপরে উঠতে গিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনেছি সবকিছু! আর আজ আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছি… আমি কীভাবে ভাবলাম, আমার ছেলে অন্তত একটু মানুষ হবে?”
রবিন মুখ তুলে তাকাতে পারেন না।
তার পাশে বসা রেবেকা বিরক্ত মুখে বলে ওঠে—
“– ওহ আবার নাটক শুরু করলেন আপনি! আপনার এই অতিরিক্ত আবেগই এই বাড়ির বড় সমস্যা। আর আনায়া? ও তো বাড়তি ঝামেলা! দিনের পর দিন বসে বসে কেবল গান্ডেপিন্ডে গিলে যাচ্ছে আর কি সব ছাইপাশ লেখে। আর তো কোনো কাজে লাগে না। খায়, পরে, পড়ে থাকে দায়িত্ব তো আমাদের ঘাড়েই, বলুন?”
নানুআপা কাঁপা হাতে পাশের টেবিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন।
“– দায়িত্ব? যে বাচ্চাটা জন্মেই মা বাবাকে হারিয়েছে, তার দায়িত্ব তো তোমাদের নেওয়ার কথা ছিল সম্মানের সাথে… অথচ তোমরা তাকে একটা বোঝা ভাবো?
রেবেকা, আমি জানতাম তুমি আনায়াকে অপছন্দ করো, কিন্তু এতটা নিষ্ঠুর তুমি হতে পারো সেটা ভাবিনি।”
রেবেকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
“– হ্যাঁ, আমি নিষ্ঠুর। কারণ বাস্তবতা বোঝি। এই বাড়িতে আমাদের নিজের মেয়ে আছে, ছেলে আছে, তাদের ভবিষ্যৎ আছে। আনায়া আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক না। আর যদি ওকে দিয়ে কিছু টাকা আসে, তাহলে সেটা নষ্ট করার মানে হয়?”
“– একদিন তোমরা বুঝবে রেবেকা… মানুষ টাকায় সব কিনতে পারে না। কিন্তু তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
তুমি একটা নিষ্পাপ মেয়ের ওপর যা করছো, তার বিচার এই পৃথিবীই করে দেবে।”
নানুআপা ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান।
পিছনে রেবেকার মুখে বিরক্তির ছাপ, আর রবিন দাঁড়িয়ে থাকে, থমথমে বাতাসের মধ্যে, মাথা নিচু করে—
শুধু কানে বাজে মায়ের শেষ কথাগুলো:
“আনায়া আমার বংশের অভিশাপ না… সে একদিন তোমাদের গর্ব হবে যদি তার আগে তাকে শেষ না করে দাও।
রাত গভীর বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ ঘরের দরজায় খুব হালকা ঠকঠক শব্দ হয়।
আনায়া তখনও জেগে—ডায়েরির পাতায় শব্দেরা আসছে না, মনেও চলছিল কেমন অস্থিরতা।
সে দরজা খুলতেই দেখে নানুআপা দাঁড়িয়ে, হাতে একটা ছোটো কাপড়ের পোটলা।
“– আয় বোন, নিচে আমার ঘরে আয় তোর সাথে একটু কথা আছে।”
আনায়া কিছু না বুঝে ধীর পায়ে তার হাত ধরে নেমে আসে নিচে।
নানুআপার ঘরটা সারা দিনের মতোই পরিচ্ছন্ন। জানালার পাশে রাখা কাঠের চেয়ারে বসে তিনি খুব আস্তে বললেন—
“– আয়, এই খাতা আর এই চাবির ছড়াটা রাখ।
আনায়া অবাক হয়ে বলে, এইগুলো কী নানু?
নানুআপা এবার আস্তে করে তার মাথায় হাত রেখে বলেন-
“– পালিয়ে যা বঅন… এখান থেকে পালিয়ে যা।
এই বাড়ি এই মানুষগুলো… তোর ভালো চায় না।
আনায়া স্তব্ধ হয়ে যায়।
“– ক…কী বলছো তুমি! আমি কিছুই বুঝছি না। আমি কোথায় যাবো?
নানুআপার গলাটা কেঁপে ওঠে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু। তিনি থরথর করে বললেন—
“– তোকে ব্যাখ্যা করার মতো শক্তি নেই আর,বোন। শুধু বিশ্বাস রাখ আমার ওপর। আমি তোকে ওদের হাতে তুলে দেব না। তুই আমার বুকের একটা অংশ। আমি বাঁচি বা না বাঁচি, তুই যেন বাঁচিস।
তিনি থামলেন। তারপর ধীরে ধীরে কাপড়ের পোটলাটা খুলে কাগজের একটা দল তুলে আনায়ার হাতে দিলেন।
“– এই বাড়িটা তোর মায়ের নামে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সে তো বাঁচল না। তাই আমি এই বাড়ির কাগজপত্র এখন তোর নামে করে দিয়েছি।
আনায়ার চোখ জলে ভরে ওঠে। কাঁপা গলায় বলে—
“– আমি একা কীভাবে যাবো নানু? আমি তো কিছুই জানি না। কেউ চেনে না আমাকে, আমি কোথায় যাবো?”
নানুআপা তার গাল ছুঁয়ে বলেন—
“– তুই পারবি বোন। এই ঘর তোকে খেয়ে ফেলবে, বিশ্বাস কর। আমি বাঁচা অবস্থায় সেটা হতে দেব না।
তিনি কাঁপা হাতে আনায়ার ব্যাগে কিছু টাকা, কাগজ আর চাবির ছড়াটা ভরে দিয়ে বলেন—
“– ভোর হবার আগেই চলে যা। রাস্তাটা নিরিবিলি। দরকার হলে সেই পুরনো রিকশাচালক মিরাজকে ডাক, আমি ওকে বলে রাখবো। আর আমি আছি বোন। যতদিন বাঁচি, তোর পাশে থাকবো।
আনায়া আর একবারও কিছু বলতে পারে না। সে জানে না তার নানু আপা হঠাৎ তাকে এইসব কেন বলছে সে শুধু জানে তার নানু আপা যেহেতু বলছে তবে অবশ্যই এর পেছনে কোনো কারণ আছে।
আনায়া শেষবারের মতো নানুআপার হাত ধরে কেঁদে ফেলে। কাঁধে ছোট একটা ব্যাগ, চোখে ভয় আর অজানা এক অস্থিরতা। পুরনো রিকশাচালক মিরাজ বাইরে অপেক্ষা করছে নানুআপা ইশারায় বিদায় জানান।
আনায়া পেছন ফিরে একবার তাকায় এই বাড়ি, এই জানালা, এই দেয়াল, সব তার চেনা তবুও কোথাও কোনো টান নেই। রাতের ঘন অন্ধকারে রিকশাটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
এক নতুন যাত্রার শুরু হলো আনায়ার।
কিন্তু সে জানে না, এই যাত্রা কেবল মুক্তির না…
সামনে অপেক্ষা করছে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন, যা ওর পুরো পৃথিবীটাই পাল্টে দেবে।
