অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১১
রিদিতা চৌধুরী
ভোরের স্নিগ্ধ আলো জানালার কাঁচ গলে এসে রিদির চোখে পড়তেই তার তন্দ্রা ভেঙে গেল। সারা রাতের জড়তা আর অস্বস্তিতে শরীরের প্রতিটি হাড় যেন বিদ্রোহ করছে। দীর্ঘক্ষণ খাটের পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকার মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন—ঘাড় থেকে শুরু করে কোমরের হাড় পর্যন্ত তীব্র এক অসাড়তা তাকে নড়াচড়া করতে দিচ্ছে না। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে শরীরটা একটু মোচড় দিতেই শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র চিনচিনে ব্যথা খেলে গেল।
অস্পষ্ট আবছা অন্ধকারে চোখ মেলল রিদি। তার ডান হাতটা এখনো সৌহার্দ্যের শক্ত মুঠোয় বন্দি। সে তাকিয়ে দেখল, সৌহার্দ্য গভীর ঘুমে মগ্ন। আলতো করে তার কপালে হাত রাখতেই রিদি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল—রাতের সেই ভয়াবহ আগুনের মতো জ্বরটা আর নেই, শরীরটা এখন বেশ শীতল।
সৌহার্দ্যের হাতের বাঁধন আলগা হলেও ঘুমের ঘোরেও সে যেন রিদির হাতটা এমনভাবে আঁকড়ে আছে, যেন এটিই তার সবটুকু ভরসা। সে দিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই রিদির ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠলো!
রিদি বিরবির করে বলল, ছিঃ আমি কত নির্লজ্জ , এই মানুষটা আমাকে এত অবহেলা করে তবুও তার প্রতি আমার এত মায়া কাজ করে,!
কথাটা বলেই সন্তর্পণে রিদি নিজের কবজিটা ছাড়িয়ে নিল। ধীর পায়ে খাট থেকে নেমে গুছিয়ে নিল নিজের এলোমেলো জামাটা।
আজ কলেজে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস আছে, সুমি কালই ফোনে তাগাদা দিয়ে রেখেছে। মোবাইলে সময়ের দিকে তাকিয়ে রিদির মনে হলো, প্রতিটি মুহূর্ত যেন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে নিজের ঘরে গিয়ে তৈরি হয়ে সে নিচে নেমে এল। নাস্তা তৈরি করে, দুপুরের রান্নার সবটুকু গুছিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে আমেনা খালাকে বলল, খালা প্লিজ ভাবীকে বলবেন, যেন রান্নাটা করে নেই, আমার হাতে একদম সময় নেই আজ!
আমেনা খালা রিদিকে আশ্বস্ত করে বলল, তুমি একদম চিন্তা কইরোনা, ছোট আম্মা তুমি কলেজে যাও!
আমেনা খালার কথায় আশ্বস্ত হয়ে রিদি ,সৌহার্দ্যের খাবারটা শাহেদা চৌধুরীর হাতে দিয়ে এক বুক উৎকণ্ঠা আর দায়িত্ববোধ নিয়ে রিদি কলেজের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।
রিদি চলে যাওয়ার বেশ খানিকটা সময় পর সৌহার্দ্যের ঘুম ভাঙলো। মাথার ভেতরটা তখনও ভারী হয়ে আছে, যেন কেউ হাতুড়ি পিটাচ্ছে। তবে হাতের ব্যথাটা আগের চেয়ে অনেক কমেছে, নড়াচড়া করতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না। সে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরস্থিরভাবে শার্টের বোতামগুলো আটকাচ্ছিল। ঠিক তখনই নাস্তার ট্রে হাতে ঘরে প্রবেশ করলেন শাহেদা চৌধুরী।
মায়ের উপস্থিতি টের পেতেই সৌহার্দ্যের চেহারায় এক অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠল। আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে সে শান্ত ছেলের মতো এসে বিছানায় বসলো। শাহেদা চৌধুরী নাস্তার ট্রে বিছানার একপাশে রেখে পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত রেখে চিন্তাতুর কণ্ঠে বলল, “এখন কেমন লাগছে বাবু? ব্যথাটা কি খুব বেশি?”
সৌহার্দ্য মায়ের হাতটা টেনে নিয়ে নিজের মাথার ওপর আরও চেপে ধরলো। একটু হেসে বলল, “উহু, একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন! ডোন্ট প্যানিক, আম্মু। আর কতদিন তুমি আমাকে এই ‘বাবু’ বলে ডাকবে?”
ছেলের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে শাহেদা চৌধুরী মৃদু হাসলেন। রসিকতা করে উত্তর দিয়ে বলল, “যবে তুই আমাকে কোলে নেওয়ার মতো একটা ছোট্ট বাবু এনে দিবি। আমার কিন্তু নাতিনাতনি চাই, এক বছরের মধ্যে!”
সৌহার্দ্য মায়ের পেটে মুখ গুঁজে দিয়ে দুষ্টু গলায় বললো, “এটা কি খেলনা যে চাইলেই এক বছরে এনে দেবো? এর তো একটা প্রসেসিং টাইম আছে, তাই না?”
ছেলের কথা শুনে শাহেদা চৌধুরী সলজ্জ রাগে তার পিঠে একটা আলতো থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল, “অসভ্য ছেলে! মুখে কি তোর কোনো ব্যালেন্স নেই?”
মায়ের কোল থেকে সোজা হয়ে বসে সৌহার্দ্য একটা স্নিগ্ধ হাসি হাসলো। এই হাসিটা বড় বিরল। পৃথিবীর সবাই সৌহার্দ্যকে দেখেছে তার গম্ভীর আর রুক্ষ রূপটায়, কিন্তু এই নির্ভেজাল হাসিটা শুধু শাহেদা চৌধুরীর জন্যই তোলা থাকে। মায়ের সামনে এলে এই মানুষটাই যেন আবার সেই ছোটবেলার ছেলেমানুষ হয়ে যায়।
সৌহার্দ্য মাকে জড়িয়ে ধরে বললো, “ওকে, ওকে! অনেক হয়েছে। এখন নিজের হাতে খাইয়ে দাও তো, আম্মু। আমাকে বের হতে হবে।”
ছেলের খাইয়ে দেওয়ার আবদার মেটাতে গিয়ে শাহেদা চৌধুরীর চোখেমুখে দুশ্চিন্তার রেখা ভেসে উঠলো। তিনি কোমল স্বরে বলল, “এমন শরীর নিয়ে কোথায় যাবি? আজকের দিনটা অন্তত বাড়িতে রেস্ট কর না?”
সৌহার্দ্য খেতে খেতে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, “না আম্মু, আজ ইমারজেন্সি কয়েকজন রোগী আছে। তাছাড়া একটা ইম্পর্টেন্ট ক্লাসও আছে, যাওয়াটা খুব জরুরি।”
শাহেদা চৌধুরী আর কোনো দ্বিমত করলেন না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নেহের পরশ মিশিয়ে ছেলেকে খাইয়ে দিলো!
কলেজের গেট দিয়ে পা রাখতেই রিদিকে ঘিরে ধরল সুমি, পৃথা আর সায়েম। যেন কত যুগ পর তারা প্রাণ ফিরে পেয়েছে! বন্ধুদের এই উচ্ছ্বাস রিদির ক্লান্ত মনে কিছুটা হলেও স্নিগ্ধতার ছোঁয়া দিল।
সুমি রিদির পিঠ চাপড়ে ধরে আদুরে অভিমান নিয়ে বলল, “কিরে, এতদিন কোথায় ছিলি? একটা খবরও নেই!”
রিদি হালকা হেসে বলল, “বাড়িতে অনুষ্ঠান ছিল রে, খুব ব্যস্ত ছিলাম।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই পৃথা ফোঁড়ন কেটে বলল, “বাদ দে তো অনুষ্ঠানের কথা! তোর ওই খচ্চর জামাইটার কী খবর? সে কি দেশে ফেরার নামগন্ধও নিচ্ছে না?”
পৃথার কথা শেষ হতে না হতেই সুমির চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বের হলো। সে কঠোর স্বরে বলল, “ওই বেয়াদবটাকে দেশে এলে আমি আগেই ওর নকশা পাল্টিয়ে দিবো!
সুমি আর পৃথার এই উত্তেজনার মাঝে সায়েম আড়মোড়া ভেঙে অনেকটা নাটকীয় ভঙিতে বলল, “উফ, শান্ত হ তোরা! আমি তো বলেই রেখেছি, ওই খবিশটার কাছে রিদুকে আর রাখা যাবে না। বরং আজকে এক দারুণ ছেলের সন্ধান পেয়েছি। বিশ্বাস কর, কি হ্যান্ডসাম! আমি ছেলে হয়েও ওর ওপর ক্রাশ খেয়ে গেছি। একদম সৌহার্দ্য স্যারের মতো দেখতে, তবে ব্যবহারটা মাশাল্লাহ! সৌহার্দ্য স্যারের ব্যবহার তো ওইদিকে আস্তাগফিরুল্লাহ— এই ছেলেটাই আমাদের রিদুর জন্য একদম পারফেক্ট!”
সায়েমের কথা শুনে পৃথা তার পিঠে এক দলা চড় বসিয়ে দিয়ে বলল, “থাম তো তোর আজগুবি
কথাবার্তা! ওই ছেলে যদি বিয়ে করা থাকে, তখন?”
সায়েম নিজের কলারটা একটু উঁচিয়ে, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল, “সায়েম কখনো এত কাঁচা কাজ করে না, বস! সব খবর নেওয়া শেষ, ছেলে সিঙ্গেল!”
বন্ধুদের এই ছেলেমানুষি আর বাড়াবাড়িতে রিদি খানিকটা বিরক্তির সুরে নাক কুঁচকে বলল, “তোরা কি থামবি? একটা আজাব নিয়ে এমনিতেই অস্থির আছি, তার ওপর এখন নতুন করে আরেক আজাবের কথা বলছিস। চল তো ক্লাসে যাই!”এইটুকু বলেই রিদি দ্রুত পায়ে ক্লাসের দিকে হাঁটা দিল। পিছু পিছু সুমি, পৃথা আর সায়েম হাসাহাসি করতে করতে ছুটল।
পুরো রাত এক ফোঁটা ঘুম হয়নি, রিদির মনে হচ্ছে মাথার ভেতরে কেউ হাতুড়ি পিটিয়ে পেরেক ঠুকছে। সুমির কাঁধে মাথা এলিয়ে আধা-চেতন অবস্থায় সে পড়ে আছে। আজকের বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাসটা ইমপর্ট্যান্ট না হলে সে আসতও না, কিন্তু ক্লাসের গুমোট বাতাস আর চারপাশের কোলাহল সেই মাথাব্যথাকে আরও অসহ্য করে তুলেছে।
হঠাৎ, পুরো থিয়েটার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রিদি ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো।সামনের ডায়াসে সৌহার্দ্য। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, ফর্সা হাতে লোম গুলো কেমন চিকচিক করছে, সাদা এপ্রোন টা আজ নেই,কপালে কাটা দাগের ওপর সাদা ব্যান্ডেজ—সব মিলিয়ে তাকে অসম্ভব সুদর্শন লাগছে। কিন্তু তার চোখের শীতলতা ক্লাসের তাপমাত্রাকে যেন হিমাঙ্কের নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
সৌহার্দ্য হাতের ব্যান্ডেজটা খুলতে খুলতে প্রজেক্টরের দিকে ইশারা করল। সৌহার্দ্য যখন গম্ভীর গলায় জটিল সব মেটাবলিক পাথওয়ে বোঝাচ্ছিল, রিদির কানে সেসবের একটি শব্দও ঢুকছে না। তার সমস্ত মনোযোগ ওই গম্ভীর চেহারার মানুষটার ওপর। অদ্ভুত এক মায়ায় রিদির মাথার সেই অসহ্য যন্ত্রণাটা যেন নিমেষেই উবে গেল।
সে চারদিকে একবার নজর বোলাল। দেখল, ক্লাসের বাকি মেয়েগুলোও প্রায় চোখ বড় বড় করে সৌহার্দ্যকে গিলে খাচ্ছে। রিদি নাক মুখ কুঁচকে বলল,
লুচ্চা ডাক্তার অসুস্থ শরীর নিয়ে কিভাবে সেজে আসছে , মেয়েদের মাথা খেতে!
হঠাৎ সৌহার্দ্যর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এসে থামল রিদির ওপর। রিদিরকে অমনোযোগী দেখে সৌহার্দ্যর ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর লেকচার থিয়েটারের দেওয়ালে ধাক্কা খেল, “হেই ইউ, কর্নার সাইট! স্ট্যান্ড আপ।”
রিদি চমকে উঠে, কাঁপাকাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়াল । সৌহার্দ্য গম্ভীর গমগমে গলায় প্রশ্ন করল, “বিটউইন কার্বোহাইড্রেটস, প্রোটিনস অ্যান্ড লিপিডস—হুইচ ওয়ান ইজ দ্য মেইন সোর্স অফ এনার্জি ইন দ্য বডি, অ্যান্ড হোয়াই?”
রিদির মস্তিষ্ক তখন পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তার দিকে এগিয়ে এল। ঠিক রিদির সামনে দাঁড়িয়ে, তার উচ্চতার চাপে রিদিকে আরও ছোট মনে হচ্ছে।
সৌহার্দ্যর কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি এনে বলল, “হোয়াটস ইওর প্রবলেম? আনসার মাই কোয়েশ্চেন!”
রিদি আমতা আমতা করে বলল, “আমি… আমি পারিনা স্যার।”
সৌহার্দ্যর বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বলল , ক্যান ইউ ডু ইট? মুখে মুখে তর্ক ছাড়া?
রিদি চুপ করে আছে, ক্লাসে সৌহার্দ্য তার শিক্ষক, এখানে প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। রিদির নীরবতা দেখে সৌহার্দ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। একদম তার কানের কাছে মুখটা নামিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “দেন, হাজবেন্ডের টাকা উড়িয়ে লাভ নেই! বাড়ি গিয়ে বেবি প্ল্যানিং করো, বেটার ফর ইউ!”
বলেই সে প্রজেক্টরের দিকে ফিরে গেল। রিদির শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা যেন রাগে ফুটে উঠছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, ‘অসভ্য ডাক্তার! বাচ্চা তো পয়দা করবই, আর দিনে-রাতে তোকে দিয়ে সেগুলোর হাগু-মুতু না পরিষ্কার না করিয়েছি তো আমার নাম রিদিতা খান না!’
রিদি রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যর দিকে। সৌহার্দ্য রিদির জলন্ত দৃষ্টি দেখে, গলা খাঁকারি দিয়ে
এক ছাত্রের দিকে ক্লাস টেস্টের পেপারগুলো দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ইউ উইল গিভ দিজ টু এভরিওয়ান।” বলেই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল!
সৌহার্দ্য বেরিয়ে যেতেই সেই ছেলেটা একে একে সবার হাতে ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো ধরিয়ে দিলো। রিদি অধীর আগ্রহে নিজের খাতাটা নিলো কিন্তু প্রথম পাতাটা খুলতেই তার সারা শরীরে যেন বরফ জল ঢেলে দিল কেউ। ২০-এর মধ্যে পেয়েছে মাত্র ১২!
রিদি হতবাক হয়ে পাতার পর পাতা উল্টে দেখল। প্রতিটি উত্তরের লজিক, প্রতিটি ডাটা—সবই তো নিখুঁত! অন্তত ১৮ পাওয়ার মতো লেখা সে লিখেছে। রিদির হাতের আঙুলগুলো রাগে থরথর করে কাঁপছে। দ্রুত সুমিদের খাতাগুলো টেনে নিয়ে চোখ বোলাল সে। অবাক কাণ্ড! সবার খাতা তো নিয়ম মেনে চেক করা, সবাই ভালো নম্বর পেয়েছে। শুধু ওরটাই এমন অদ্ভুতভাবে কাটা?রিদির বুঝতে বাকি রইল না, এটা সৌহার্দ্য ইচ্ছে করে করছে, কত বড় অসভ্য লোক ভাবা যায়, রিদি রাগে দুঃখে বিরবির করে বলল, অসভ্য ডাক্তার, আমি আর আমার বাচ্চারা মিলে তোর জীবন তেজপাতা, না করছি তো আমার নাম, পাল্টে ফেলবো দেখিস তুই!
রিদি বাসায় ফিরেই ব্যাগটা যেখানে ছিল সেখানেই ফেলে রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। মাথাটা যেন কেউ চিরে দিচ্ছে, চোখ খোলার শক্তিটুকুও নেই। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, টেরই পেল না। যখন ঘুম ভাঙল মোবাইলের স্ক্রিনের আলোয়, তাকিয়ে দেখল রাত এগারোটা বেজে গেছে। মাথাটা এখনো বেশ ভার, তবে ব্যথার তীব্রতা কিছুটা কমেছে। কোনোমতে ধুঁকতে ধুঁকতে সে রান্নাঘরের দিকে গেল।
সেখানে আমেনা খালা সব গুছিয়ে রাখছিলো। রিদি একটু ম্লান গলায় জিজ্ঞেস করল, “খালা, সবার খাওয়া শেষ? ভাবী একা হাতে সব সামলালেন, আমাকে ডাকলেন না যে?”
আমেনা খালা একটু হেসে বলল, “বড় বউ তো তোমারে ডাকতে মানা করছে, ছোট আম্মা। সবার খাওয়া শেষ, শুধু সৌহার্দ্য স্যার বাকি। সে বলে দিয়েছেন, তার হাতটা ব্যথা, তাই তুমি যেন তাকে খাইয়ে দাও।”
কথাটা শুনে রিদির মুখটা একটু কুঁচকে গেল। কাল এত নাটক করলো যেন তার খাওয়ার খেলে গলা দিয়ে নামবে না,। রিদি মনে মনে একটু বিড়বিড় করল, তারপর বিরক্তি নিয়েই সৌহার্দ্যর জন্য খাবারটা গুছিয়ে নিল।
সৌহার্দ্যর ঘরের দরজাটা আধখোলা। রিদি ভেতরে তাকিয়ে দেখল, সে গভীর মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কী যেন টাইপ করছে। রিদিকে খাবার নিয়ে ঢুকতে দেখেই সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি ওটা খাব না, ভাত নিয়ে এসো।”
রিদি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “আপনি তো রাতে ভাত খান না, তাহলে আজ হঠাৎ?”
সৌহার্দ্য বিরক্তিতে মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল, “তোমাকে কি সব কৈফিয়ত দিতে হবে? যেটা বলছি সেটা করো, স্টুপিড!”
রিদির মনে হলো, এই অসভ্য মানুষটার সাথে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করা বৃথা। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে ফিরে গেল। সুপটা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে ঝটপট ভাত বেড়ে ফিরে এসে, আবার সে সৌহার্দ্যের সামনে এসে বসল।
রিদি ভাতের লোকমা হাতে নিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে বাড়াতেই সে বিরক্তির সাথে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “হ্যান্ডওয়াশ করেছ তো?”
রিদির মনের ভেতর রাগের অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠল। ইচ্ছে করছিল তক্ষুণি কড়া করে শুনিয়ে দেয়, ‘না, তোকে ওয়াশরুম পরিষ্কার করা হাতেই খাওয়াচ্ছি, অসভ্য লোক!’ কিন্তু নিজেকে সংযত করল সে। মুখে কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে ইশারা করল মানে ‘হ্যাঁ’
রিদির বুকের ভেতরটা তখন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় কাঁপছে। কাল তো চামচ দিয়ে খাইয়েছিল, কিন্তু আজ নিজের হাত দিয়ে খাওয়াতে গিয়ে তার হাতের আঙুলগুলোতে বার বার সৌহার্দ্যর মুখের ছোঁয়া লাগার কারনে কেঁপে উঠছে।
সৌহার্দ্য অবশ্য সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না। রিদির বাড়ানো হাতের দিকে না তাকিয়েই সে নিজের মাথা এগিয়ে নিয়ে খাবারটুকু মুখে পুরে নিল। তার চোখ তখনো ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিবদ্ধ, আর এক হাত দিয়ে দ্রুত টাইপ করে যাচ্ছে সে। রিদির বুকের ভেতর জমে থাকা সেই নিভৃত আবেগগুলো সৌহার্দ্যের এমন যান্ত্রিক উদাসীনতায় যেন আরও বেশি করে দুমড়ে-মুচড়ে যেতে লাগল।
রিদি সৌহার্দ্যকে খাইয়ে দিতে দিতে। হাতটা থামিয়ে হঠাৎ করে বলল, “আচ্ছা, আমার ক্লাস টেস্টের খাতায় নাম্বার কম কেন? আমি তো সব মিলিয়ে দেখেছি, ঠিকঠাকই তো ছিল।” বলেই সে বড় বড় চোখে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যর দিকে।
সৌহার্দ্য শান্তভাবে খাবার চিবোচ্ছিল। রিদির প্রশ্নের উত্তরে সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “মুখে মুখে তর্ক করার জন্য ৬ মার্ক কাটা হয়েছে।” কথাটার মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই, যেন এটা কোনো বড় ব্যাপারই না!
রিদি যেন বেয়াক্কেল বনে গেল । সৌহার্দ্যর এমন অসংবেদনশীল উত্তর শুনে সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা মানুষ কতটা অসভ্য আর অদ্ভুত হতে পারে, সেটা তার ভাবনার অতীত।
রাগে রিদির ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কি করে করলেন আপনি আমার সাথে এমনটা?”
খাওয়ার শেষটুকু মুখে দিয়ে সৌহার্দ্য নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, “উইথ মাই ওন হ্যান্ড অ্যান্ড পেন, নাউ ফিনিশ, ইউ গো!”
রিদির চোখ দুটো মুহূর্তেই রাগে-দুঃখে ছলছল করে উঠল। অভিমানে আর আক্রোশে তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল, “আপনার ওই বালের ওন হ্যান্ড পেন, উপর ঠাডা পরুক অসভ্য লোক!
” রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে চলে যেতে নিলে সৌহার্দ্য পেছন থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকল, “ওটার ব্যাপারে কি ভাবলে?”
রিদি রাগে গজরাতে গজরাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কিসের ব্যাপারে কি ভাববো? নাম বলতে পারেন না? ওটা কি, অসভ্য লোক?”
সৌহার্দ্য এক কদম এগিয়ে এসে একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়াল। তারপর মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১০
“ওই যে বেবী প্ল্যানিং?”
রিদির চোখের আগুন যেন দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে উঠল। সে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “ভেবেছি তো একডজন বাচ্চা পয়দা করবো, আর এগুলো দিয়ে আপনার সব চুল ছিঁড়ে টাক বানিয়ে আমি ঢোল বাজাবো, অসভ্য ডাক্তার!”
কথাটা বলেই রিদি দুপদাপ পা ফেলে চলে গেল। আর হতভম্ব সৌহার্দ্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল রিদির যাওয়ার পথের দিকে!
