Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১২

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১২

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১২
রিদিতা চৌধুরী

রিদির চলে যাওয়ার পর ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা জমাট বেঁধে রইল। সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুক চিরে বেরিয়ে এল, তবে সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক চিলতে ম্লান হাসি। অস্ফুট স্বরে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, “স্টুপিড দেড়-ব্যাটারি!
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ডেস্কের ওপর পড়ে থাকা রোগীর ফাইলগুলোতে চোখ বোলাল সে। কাল সকালে একটি ইমারজেন্সি অপারেশন আছে, তার প্রস্তুতি এখন সবচেয়ে জরুরি।
​হঠাৎ করেই কড়া নাড়তেই দরজা খুলে ভেতরে এলেন সরহান চৌধুরী। বাবাকে দেখে সৌহার্দ্যের কপালে ভাঁজ পড়ল ঠিকই, কিন্তু কোনো বাক্য ব্যয় না করে সে নিজের মনোযোগ আবার ফাইলের ভেতরেই ডুবিয়ে রাখল।
​সারহান চৌধুরী ছেলের সামনে এসে চেয়ার টেনে বসলেন। অস্বস্তি নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“তোমার শরীর এখন কেমন?”
​ফাইল থেকে চোখ না তুলেই সৌহার্দ্য নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “বেটার নাউ।”
​সারহান চৌধুরী কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, “তোমার সাথে আমার জরুরি কথা ছিল।”
​সৌহার্দ্য নির্বাক হয়ে ফাইলেই ডুবে রইল, শুধু গম্ভীর স্বরে বলল, “শুনছি।”
​ছেলের এমন ঔদাসীন্য আর নির্লিপ্ত আচরণে সারহান চৌধুরীর ভেতরে রাগ দানা বাঁধল। তিনি কোনোমতে তা চেপে রেখে বললেন, “আরিফা জানতে চাচ্ছে, রিদিকে নিয়ে কি ভাবছো?”
​সৌহার্দ্য এবার ফাইল থেকে চোখ তুলল। বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত অথচ ধারালো গলায় বলল, “ওটাকে নিয়ে আমি কী ভাবছি, সেটা জানার প্রয়োজন ওনার কেন? আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কারো কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন আমি বোধ করছি না।”
​সারহান চৌধুরী ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জে উঠলেন, “অসভ্য ছেলে! ওরা রিদির বাড়ির লোক, তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে খোঁজ নেওয়াটা কি তাদের অন্যায়? তোমার কি ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান নেই?”
​সৌহার্দ্য এবার যেন আরও পাথর হয়ে গেল। সে শীতল স্বরে বলল, “ওসব ভাবার মতো সময় আপাতত আমার নেই। কাল সকালে একটা ইমারজেন্সি অপারেশন আছে, আমি তার স্টাডি নিয়ে ব্যস্ত। এছাড়া আর কিছু বলার থাকলে বলো, না হলে আমাকে একটু একা ছাড়ো।”

​ছেলের এই শীতল দেয়াল ভেঙে সারহান চৌধুরীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “তোমার একগুঁয়েমির জন্য আমি রিদিতার জীবন নষ্ট হতে দিতে পারি না। তুমি যখন মানছ না, আমাকেই অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। আমি উকিলের সাথে কথা বলব। যত দ্রুত সম্ভব তোমাদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করব।”
​সৌহার্দ্য বাবার দিকে কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, যেন ডিভোর্সের কথাটি তার কাছে বাতাসের চেয়েও তুচ্ছ। সে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিল। সারহান চৌধুরী বুঝতে পারলেন, এই পাথরের মূর্তিকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। নিজের হাতেই মেয়েটার জীবন তিনি নষ্ট করে দিলেন ভেবে এক তীব্র অনুশোচনা তাকে গ্রাস করল। তিনি নিজের মনেই এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। আর কোনো কথা না বলে রাগে গুমোট হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
​বাবা ঘর থেকে বের হতেই সৌহার্দ্য কলমটা নামিয়ে রাখল। জানালার বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, যেন মনের ভেতরে জমে থাকা কোনো অজানা ঝড়কে সে একা হাতে সামলে নিচ্ছে।

সেদিনের সেই ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে একটি পুরো মাস। রিদি এখন আর সৌহার্দ্যর বাড়িতে নেই, আশ্রয় নিয়েছে নিজের ফুফুর বাসায়। সেদিন সারহান চৌধুরী যখন ছেলের এমন পাথরচাপা নির্লিপ্ততা আর উদাসীনতা দেখলেন, নিজের সন্তানের এমন আচরণে তিনি লজ্জিত বোধ করেছিলেন। রিদিকে কাছে ডেকে পরম মমতায় তিনি বুঝিয়েছিলেন, “মা, কিছুদিন আরিফার বাসায় গিয়ে থাকো। ও একটু একা থাকুক, নিজেকে সময় দিক। দেখা যাক, ও আসলে ঠিক কী চায়।”
​রিদি শুরুতে রাজি হতে চায়নি। সৌহার্দ্যর কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা ভাবলেই ওর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছিল। কিন্তু সারহান চৌধুরীর মতো মানুষের অনুরোধ উপেক্ষা করার সাধ্য ওর ছিল না। অগত্যা রিদি রাজি হলো, এই আশায়—হয়তো এই দূরত্বই তাদের সম্পর্কের জট খুলবে, হয়তো সৌহার্দ্যর অবচেতন মনের কথাগুলো স্পষ্ট হবে।

​কিন্তু রিদির সমস্ত প্রত্যাশা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সবাইকে ভুল প্রমাণ করে সৌহার্দ্য এই একটি মাসে একবারের জন্যও রিদির খোঁজ নেয়নি। কোনো অনুতাপ, কোনো অস্থিরতা—এমনকি রিদির অনুপস্থিতিতে ওর জীবনে যে কোনো পরিবর্তন এসেছে, তার বিন্দুমাত্র ছাপও সৌহার্দ্যর আচরণে দেখা যায়নি। রিদির চলে যাওয়াটা যেন ওর কাছে একটা সাধারণ ঘটনার মতো, যেটাতে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রয়োজনও সে বোধ করেনি।
​ ছেলের এই অদ্ভুত নীরবতায় সারহান চৌধুরী ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড বিরক্ত আর লজ্জিত ছিলেন। তিনি কয়েকবারই রিদিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন,
কিন্তু রিদি আর ফিরে যায়নি। অভিমানে আর অপমানে ওর মনটা পাথর হয়ে গেছে। রিদি বুঝে গেছে, যেখানে ভালোবাসার চেয়ে আত্মসম্মানের অভাবটা বেশি প্রকট, সেখানে থাকা মানে নিজের অস্তিত্বকেই বিসর্জন দেওয়া।
​এই এক মাসে সৌহার্দ্যর সাথে রিদির আর দেখাও হয়নি। রিদি জেনেবুঝেই সৌহার্দ্যর ক্লাসগুলো এড়িয়ে চলছে, যেন ভুলেও চোখের সামনে পড়ে স্মৃতিগুলো আবার নতুন করে ক্ষত তৈরি না করে। অভিমানের দেয়ালে ঢাকা এই দূরত্বে রিদি কেবল নিজের ক্ষতগুলো নিয়ে বেঁচে আছে, আর সৌহার্দ্যর নীরবতা সেই ক্ষতকে প্রতিনিয়ত আরও গভীর করছে।

ফ্ল্যাশব্যাক
সৌহার্দ্যের রুম থেকে বেরিয়ে সারহান চৌধুরী ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন রিদির রুমের দিকে। মাঝরাতের নিস্তব্ধতা চিরে দরজায় হালকা টোকা দিতেই রিদি ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খুলল। এত রাতে শ্বশুরকে এমন অবস্থায় দেখে রিদি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়েই বলল, “আব্বু, আপনি এত রাতে? আম্মুর শরীর ঠিক আছে তো?”
​সারহান চৌধুরী হালকা হেসে আশ্বস্ত করে বললেন, “ঠিক আছে। তোর সাথে আমার একটু কথা আছে মা।”
​রিদি ওনার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে বলল, “আসুন আব্বু, বলুন কি কথা!”
​সারহান চৌধুরী রিদির পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ভারী কণ্ঠে বললেন, “আমি তোর ভালো করতে চেয়ে তোর জীবনটা নষ্ট করে দিলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিস মা!”
​শ্বশুরের এমন হাহাকার ভরা কথায় রিদির বুক কেঁপে উঠল। সে শান্ত গলায় উত্তর দিয়ে বলল, “ছিঃ আব্বু, এইসব কি কথা! আমি না আপনার মেয়ে, বলেন!”
​সারহান চৌধুরী একটু ইতস্তত করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তুই কয়দিনের জন্য আরিফার বাসায় চলে যা। অসভ্যটাকে তোর মর্ম বুঝতে হবে। আব্বুকে ভুল বুঝিস না, আমি চাই তুই সসম্মানে এই বাড়িতে ফিরে আয়।”
​রিদি ম্লান হেসে বলল, “আমার তো অসুবিধা হচ্ছে না আব্বু। আমি গেলে আম্মু কষ্ট পাবে!” আমি যেতে চাই না আব্বু!

​রিদির এই সরলতায় সারহান চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার কথাটা রাখ মা, চিরকাল একসাথে সুন্দর করে থাকার জন্য ক্ষণিকের দূরত্ব ভালো।”
​রিদি আর কোনো প্রতিউত্তর করল না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সারহান চৌধুরী শেষবার রিদির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সারহান চৌধুরীর চলে যাওয়ার প্রতিটি পদধ্বনি রিদির হৃদপিণ্ডে যেন এক একটি দীর্ঘশ্বাসের মতো আঘাত করছিল। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু ভেতরে তখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো হাহাকার। হঠাৎ করেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল এক তীব্র, চিনচিন ব্যথায়—যেন অশরীরী কোনো হাত তার হৃৎপিণ্ডটা চেপে ধরেছে।
​চোখের নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে অবিরত, কিন্তু রিদি অতি কষ্টে সেগুলো মুছে আকাশের বিশাল শূন্যতার দিকে তাকাল। আর্তনাদের মতো স্বর বের হয়ে এলো তার কণ্ঠ থেকে, “অবশেষে আপনাকে মুক্তি দিয়ে দিলাম, ডাক্তার সাহেব। আপনার জীবন থেকে আমার অস্তিত্বের এই শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেললাম।”
​একটু থেমে, কাঁপাকাঁপা গলায় সে আবার বলল, “সারা জীবন শুধু আপনার ভালো চেয়েছি, আজও তাই করছি। খুব ভালো থাকুন আপনি, একদম নিজের মতো করে। আমার এই চোখের নোনা জলগুলো যেন কখনো আপনার চলার পথে অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়। আমি শুধু এটুকুই প্রার্থনা করি—আপনি সুখে থাকুন, যদিও জানি, আপনার সেই রঙিন সুখে আমার জন্য আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।”

ছাদের খোলা আকাশের নিচে তখন হালকা শীতল বাতাসের আনাগোনা। তারার মিটিমিটি আলোয় রিদি আর যুথি মগ্ন লুডু খেলায়। যুথি আরিফা খানের ননদের মেয়ে, এই কয়দিনে রিদির খুব মিশে গেছে। হাসাহাসি আর খুনসুটির সেই শান্ত পরিবেশে আচমকা ছন্দপতন ঘটাল সাহান।
যুথির পাশে এসে বসে বাঁকা হেসে খোঁচা দিয়ে বলল, “কিরে চুন্নি, কয়টা গুটি চুরি করলি আজ? দেখি তো তোর হাত!”
​সাহানের এমন অহেতুক অভিযোগে যুথি তেতে উঠল। চেঁচিয়ে সে প্রতিবাদ করে বলল, “একদম বাজে বকবেন না ভাইয়া! রিদি আপু, তুই-ই বল তো আমি কি চুরি করেছি?
রিদি হালকা হেসে সাহানের দিকে তাকিয়ে বলল, “সাহান , অহেতুক ঝামেলা পাকিয়ে আমাদের খেলার পরিবেশটা নষ্ট করিস না ভাই!”

​তাদের কথার তোড়ে যখন পরিবেশটা বেশ জমে উঠেছে, ঠিক তখনই গম্ভীর পদশব্দে ছাদে উপস্থিত হলো শাহাবীর। তার উপস্থিতিতেই যেন বাতাসের উষ্ণতা কমে গেল। একরাশ গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, “অনেক হয়েছে, এবার ভেতরে চলো। সকালে কলেজ নেই তোদের? খেয়ে দেয়ে ঘুমাতে যা।”
​শাহাবীরকে রিদি আর যুথি যমের মতো ভয় পায়। তার কণ্ঠের আদেশে মুহূর্তের মধ্যেই দুই জন পিলপিল পায়ে ছাদ থেকে নামতে শুরু করল। ঠিক তখনই শাহাবীর রিদির দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরে বলল, “রিদি, আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আয় তো।
রিদি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। শাহাবীর তার পিছু ফিরে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “পাগলী!”

​কিছুক্ষণ পর, রিদি কফির মগ নিয়ে আবার ছাদে এলো। শাহাবীর কফিটা নিয়ে আলতো চুমুক দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘুমাতে যা, সকালে কলেজ আছে। আমি তোকে নামিয়ে দিয়ে আসবো।
রিদি কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল। সে ফিরে যেতে নিতেই শাহাবীর আবার ডাকল, “শোন।” রিদি থমকে তাকালে সে মৃদু কণ্ঠে যোগ করে বলল, “তোর জন্য চকোলেট রাখা আছে।”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১১

​রিদির ঠোঁটে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। এখানে আসার পর থেকে এটাই শাহাবীরের রোজকার রুটিন। প্রতিদিন সে নিয়ম করে চকোলেট রাখে, রিদি শতবার বারণ করলেও সে শোনার পাত্র নয়।
​নিজের রুমে এসে বিছানাটা ঠিকঠাক করে রিদি যখন ঘুমানোর জন্য শরীরটা এলিয়ে দিল, ঠিক তখনই তার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে:
​”ভালো আছেন ম্যাডাম?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here