Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৯

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৯

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৯
রিদিতা চৌধুরী

পুলিশের গাড়ির জানালার কাঁচ ঘেঁষে বসা রিদির বুকের ভেতরটা তখনো এক অমানবিক আতঙ্কে তোলপাড় করছে। হাড়হিম করা সেই পরিস্থিতির রেশ কাটতে না কাটতেই তার মনে পড়ে গেল, কী ভয়াবহ এক খেলাটা খেলেছে সে আজ! অসভ্য ডাক্তারটার সাথে সেই মুহূর্তের চরম আচরণের কথা মনে পড়তেই রিদির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল।কণ্ঠস্বরটা কান্নায় ভিজে ভারী হয়ে আছে, জানালা দিয়ে বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে বলল, “আপনি আমায় অনেক কাঁদিয়েছেন, অসভ্য ডাক্তার। আমি আর কোনোদিন আপনার জীবনে ফিরে যাবো না—কোনোদিন না!”

​বাড়িতে ঢুকে ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই রিদির কদম আটকে গেল। সোফায় বসে থাকা মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোককে দেখে তার ভ্রু কুঁচকে উঠল। আবছা অন্ধকারে মুখটা ঠিক ঠাহর করতে না পারলেও, পরিচিত কোনো সুর যেন অবচেতন মনে বেজে উঠল। রিদি দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে এগিয়ে যেতেই ভদ্রলোকটি পরম স্নেহে হাত বাড়িয়ে তাকে কাছে ডেকে বলল, “আসো মামুনি। চিনতে পারছো আমাকে? বলো তো, কে আমি?”
​রিদির হৃদস্পন্দন তখন বুকের খাঁচায় যেন আছড়ে পড়ছে। সে ভদ্রলোকের পাশে গিয়ে অত্যন্ত জড়তা নিয়ে বসল, কণ্ঠস্বর মৃদু আর কাঁপা কাঁপা, “বাবাই… না?”
​রিদির কথায় আকিব শিকদারের ঠোঁটে এক পশলা প্রশান্তির হাসি ফুটল। তিনি স্নেহের সাথে রিদির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “এই তো, আমার মামুনি একদম ঠিক ধরেছে! কেমন আছো তুমি?”
রিদি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসার চেষ্টা করল, যদিও সে হাসিতে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট। “জ্বি বাবাই, আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?”

​আকিব শিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়িয়ে বলল, “তোমাদের দোয়ায় ভালো আছি।”
​আরিফা খানের স্বামী আকিব শিকদার এরপর সোজা হয়ে বসলেন। তার দৃষ্টি এবার শাহাবীরের দিকে। গম্ভীর গলায় তিনি প্রশ্ন করে বলল, “বীর, তোমাকে যেটা করতে বলেছিলাম, সেটা কি করছো?”
​শাহাবীর আড়চোখে একবার রিদির মলিন মুখের দিকে তাকাল। তার স্বরে গভীর এক বিষাদ দৃঢ়তা, নিয়ে বলল “সেটা রিদির ওপর নির্ভর করবে। আমার বোন যা চাইবে, সেটাই হবে। ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিচ্ছু করব না।”
​ছেলের এই নমনীয়তায় আকিব শিকদারের চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। তিনি কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, “ও তো ছোট মানুষ! ও কি ভালো-মন্দ বোঝে? ওর ভালোর জন্য সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। তুমি যত দ্রুত সম্ভব ডিভোর্স ফাইল করার ব্যবস্থা করো। ওই অসভ্য ছেলের কাছে আমাদের মেয়েকে আমি কিছুতেই রাখব না।”
​কথাটা শেষ করে তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “রিদি মামুনি, তুমি কি আদৌ ওর সাথে থাকতে চাও?”

​রিদির মনে হলো, বুকের ভেতরটা কেউ বুঝি তপ্ত শূলে গেঁথে দিয়েছে। কী বলবে সে? কোনদিকে যাবে? একূল-ওকূল দুকূলই যে আজ তার জন্য বিষাক্ত। রিদিকে পাথর হয়ে বসে থাকতে দেখে শাহাবীর দ্রুত বোনের পাশে গিয়ে বসল। বোনের কাঁধে আলতো হাত রেখে সে সান্ত্বনার সুরে বলল, “তোকে জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। সময় নে, যা মনে আসে ভেবে দেখ। তুই বুঝে সিদ্ধান্ত নে, ভাইয়া তোর পাশেই আছে।”
শাহাবীরের কথায় বাধা দিয়ে আকিব শিকদার প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠলেন, “আহ্! ওকে বলতে দাও তুমি? চুপ করো।”
বলেই তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিদির দিকে ফিরলেন, যেন তার উত্তরের অপেক্ষায় পুরো ঘরটা থমথম করছে। “বলো মামুনি, তুমি কী চাও?”
​রিদির বুকের ভেতরটা তখন উত্তাল সমুদ্রের মতো তোলপাড় করছে। প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি ভারী পাথর হয়ে তার কণ্ঠনালীতে আটকে যাচ্ছে। সে জানে না কী বলা উচিত, কিংবা কোন সত্যটা বললে এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে। সে শুধু জানত, তার ভেতরে সব আবেগ মরে গেছে। নিস্তেজ স্বরে, কোনো রকমে আমতা আমতা করে সে বলল, “আপনারা যা ভালো বুঝেন… করেন।”

​কথাটা শেষ করেই সে আর দাঁড়াল না। চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে, কিন্তু সেদিকে কারো নজর যাওয়ার আগেই রিদি দ্রুত পা বাড়াল নিজের রুমের দিকে।
​রিদি সেখান থেকে বেরিয়ে যেতেই আকিব শিকদারের চেহারায় কঠোরতা ফুটে উঠল। তিনি শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বললেন, “বীর, তুমি কালকেই ডিভোর্সের ফাইলটা তৈরি করে ফেলো। আর দেরি নয়, যত দ্রুত সম্ভব এই ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে চাই আমি। এমন অসভ্য ছেলের সাথে আমাদের মেয়ের সম্পর্ক থাকার কোনো মানেই হয় না!”
​বাবার দিকে তাকিয়ে শাহাবীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল— তারপর মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে চলে গেল!
সবার সামনে পাথর চাপা কষ্টে নিজেকে শক্ত করে রাখা রিদি, নিজের শোবার ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই যেন ভেঙে পড়ল। বাঁধভাঙা কান্নায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। হুহু করে কাঁদতে কাঁদতে সে বিছানায় এলিয়ে পড়ল। সৌহার্দ্যের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো, তার সাথে ঝগড়া, মান-অভিমান আর তিক্ততার স্মৃতিগুলো যেন এক একটা ধারালো ছুরির মতো হৃদয়ে বিঁধছে। বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় কেমন যেন হাঁসফাস করছে, দম আটকে আসছে তার। ডিভোর্সের মতো একটি রূঢ় শব্দ একজন মেয়ের জীবনে কতটা ভারী, কতটা বিষাক্ত—তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রিদি।

​কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল সে। নিজেকে কিঞ্চিৎ সামলে নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিল। সুমিকে কল দিতেই দুই রিংয়ের মাথায় ওপাশ থেকে তার পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যালো?”
​সুমিকে শোনা মাত্রই রিদির চোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল ঝরে পড়ল। কোনো কথা বলতে পারল না সে, শুধু কান্নার দমকে বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল তার। ওপাশ থেকে সুমি অস্থির হয়ে উঠল, “রিদি! কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন বোন? প্লিজ, চুপ কর… আমাকে খুলে বল।”
​এক হাতে চোখের পানি মুছে, নাক টানতে টানতে রিদি ভাঙা গলায় বলল, “সুমি… আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।”

​সুমি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “এমন কী সিদ্ধান্ত নিলি যার জন্য এভাবে কাঁদছিস? বল আমাকে, কি হয়েছে?”
​গলাটা যেন কেউ চেপে ধরেছে। কথাগুলো মুখ দিয়ে বের করতে রিদির প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। তবুও মিনমিনে স্বরে সে উচ্চারণ করল, “আমি… আমি ওনাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
​রিদির কথা শেষ হতে না হতেই সুমির কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত স্বস্তি আর উচ্ছ্বাস, “আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ, রিদি! এতদিনে জীবনের সেরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিস তুই। তুই একদম চিন্তা করিস না, আমি সায়েমকে তোদের বাড়ির সামনে পাঠাচ্ছি। তুই দেরি না করে জলদি চলে আয়।”
​রিদির মন এখন এক বিশাল শূন্যতায় আচ্ছন্ন। সুমির কথার বিপরীতে কোনো প্রশ্ন করার শক্তি বা ইচ্ছা তার নেই। শুধু মনে হলো, বান্ধবীদের সাথে থাকলে হয়তো এই বিষাক্ত দমবন্ধ পরিবেশ থেকে কিছুটা মুক্তি মিলবে। তাই ক্লান্ত কণ্ঠে শুধু সম্মতি জানাল।

​সায়েম যখন বাড়ির সামনে এসে ফোন দিল, রিদি দ্রুত পোশাক বদলে আলগোছে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। যাওয়ার আগে একবার বাড়ির মানুষগুলোকে অন্তত জানিয়ে যেতে চেয়েছিল সে, কিন্তু কাউকে খুঁজে পেল না। আসলে সে মন দিয়ে খুঁজতেই চায়নি; মানুষের মন যখন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখন কোনো নিয়মের তোয়াক্কা আর থাকে না।
​বাইরের গেটে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সায়েম। রিদিকে দেখেই সে ভ্রু কুঁচকে, কিছুটা রাগী গলায় বলল, “ওই বেয়াদব লোকটার জন্য তুই এখনো কাঁদছিস?”
​রিদি কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতা যেন সায়েমের প্রশ্নের চেয়েও বেশি ভারী। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে সায়েমের বাইকের পেছনে উঠে বসল। রিদির ফ্যাকাসে মুখ আর চোখের ভেজা ভাব দেখে সায়েম আর কোনো কথা বাড়াল না। বাইক স্টার্ট দিতেই রিদি ঝাপসা চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল!
ওদিকে রিদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে প্রায় ঘণ্টাখানেক হলো। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় আরিফা খান রিদিকে রাতের খাবারের জন্য ডাকতে তার রুমে গেলেন। কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। বিছানা খালি, ঘর নিঝুম—রিদি কোথাও নেই। বুকটা ধক করে উঠল তাঁর। কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর হলো। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন তিনি, কিন্তু রিদির কোনো চিহ্ন নেই। ভয়ের শীতল স্রোত যেন তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল। কি করবেন, কী ঘটে গেল—কিছুই তাঁর মাথায় কাজ করছে না। নিরুপায় হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে দ্রুত শাহাবীরকে ফোন লাগালেন তিনি।

​বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর শাহাবীর কল রিসিভ করতেই আরিফা খান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, ওপাশ থেকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ছেলের কানে মায়ের সেই আর্তনাদ পৌঁছাতেই শাহাবীরের হৃদপিণ্ড যেন একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। অস্থির গলায় সে চিৎকার করে উঠল, “মম! তুমি কাঁদছো কেন? কী হয়েছে? সবাই ঠিক আছে তো? আমার পাখি কোথায়? ও… ও কি ঠিক আছে?”
​আরিফা খান কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বিলাপ করে উঠলেন, “কিছুই ঠিক নেই রে বাপ! আমি… আমি রিদিকে খুঁজে পাচ্ছি না। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, কোথাও নেই ও! কোথায় গেল মেয়েটা? তুই একটু দেখ না বাবা, ওকে একটু খুঁজে আন!”

​মায়ের কান্নায় শাহাবীরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের অস্থিরতাকে কোনোমতে চেপে ধরে মায়ের কণ্ঠে একটু সাহস জোগানোর চেষ্টা করল সে। তার স্বরে তখন এক পাহাড়সম প্রতিজ্ঞা নিয়ে বলল, “মম, তুমি প্লিজ টেনশন কোরো না। কিচ্ছু হবে না ওর। আমার নিঃশ্বাস থাকতে আমার বোনের কোনো ক্ষতি আমি হতে দেব না।” কথাগুলো বলেই সে ফোনটা রেখে দিল।
​মুহূর্তের মধ্যেই শাহাবীরের মাথায় খেলে গেল একটি চিন্তা। সে দ্রুত সুজনকে কল করল। সবার আগে এটা নিশ্চিত করা জরুরি যে রিদি চৌধুরী বাড়িতে গেছে কি না। ওপাশ থেকে সুজন ফোন তুলতেই শাহাবীরের গম্ভীর ও উদ্বেগপূর্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “সুজন ভাই, একটা সাহায্য দরকার।”
​শাহাবীরের এমন বিধ্বস্ত কণ্ঠ শুনে সুজন নিজেও বিচলিত হয়ে পড়ল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বীর? কোনো সমস্যা? এমন শোনানোচ্ছে কেন তোকে?”
​শাহাবীর কিছুটা দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে বলল, “আমার কাছে তো সৌহার্দ্য কিংবা চৌধুরী বাড়ির কারো নম্বর নেই। রিদি বাড়িতে নেই, কোথায় গেছে বুঝতে পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না ভাই… ও কি ওদের ওখানে গেছে? একটু কি খোঁজ নিয়ে আমাকে জানানো যায়?”
​রিদির কথা শুনে সুজনের নিজের বুকের ভেতরটাও যেন দুশ্চিন্তায় ভারী হয়ে এল। মেয়েটিকে সে নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ করে। সে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “বীর, তুই একদম প্যানিক করিস না। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। শান্ত হ, আমি তোকে জানাচ্ছি।”

সুজন জানে, রিদি চৌধুরী বাড়িতে গেলে সৌহার্দ্য সেটা জানতে পারবে না, কারণ সৌহার্দ্য এখন তার ওটিতে ব্যস্ত থাকার কথা। সময় নষ্ট না করে সে দ্রুত আরবানকে ফোন দিল। ফোন রিসিভ করতেই সুজন কোনো ভূমিকা ছাড়াই অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আরবান, রিদি কি চৌধুরী বাড়িতে আছে? ওকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
​আরবান বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে এসেছে মাত্র দশ মিনিট আগে। তার জানার কথা নয় রিদির বর্তমান অবস্থা, কিন্তু সুজনের কথা শুনে তার বুকটা ধক করে উঠল। সে বিস্ময় আর আতঙ্ক নিয়ে বলল, “কী বলছ ! রিদি বাড়িতে আসেনি তো! আমি তো এই তো কিছুক্ষণ আগে বাড়ি থেকে বের হলাম!”
​আরবানের কথা শুনে সুজনের কপালে চিন্তার ঘাম জমে উঠল, কণ্ঠস্বর আরও ভারী হয়ে এল, “বীর আমাকে ফোন করেছিল। ও খুব ভেঙে পড়েছে, রিদিকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না।”
​সুজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে সৌহার্দ্যের গম্ভীর এবং তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মাত্রই দীর্ঘ ওটি শেষ করে বেরিয়ে এসেছে সে, তার চোখেমুখে ক্লান্তি আর বিরক্তি। সে আরবানের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে? কার সাথে কথা বলছিস? কী এমন হয়েছে যে তুই এভাবে চিৎকার করছিস?”
আরবান ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “ব্রো… রিদিকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। সে বাড়িতে নেই।”

​”রিদিকে পাওয়া যাচ্ছে না”—এই বাক্যটা কানে আসতেই সৌহার্দ্যের পৃথিবীর সময় যেন এক নিমেষে থমকে গেল। তার হাতের শক্ত মুঠো থেকে ফোনটা ঠাস করে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। প্রায় এক মিনিট সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার শরীরের প্রতিটা পেশি থরথর করে কাঁপছে, আর চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক।
​আরবান ভাইয়ের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল, “ব্রো! তুমি ঠিক আছো তো? তোমায় কেমন যেন লাগছে…”

​কিন্তু সৌহার্দ্য যেন কোনো কিছু শুনতে পাচ্ছে না। তার মস্তিষ্ক তখন শুধুমাত্র রিদিকে খুঁজে পাওয়ার উন্মাদের মতো এক নেশায় মগ্ন। কোনো কথা না বলে সে ঝড়ের বেগে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। ভাইকে এভাবে পাগলের মতো ছুটতে দেখে আরবান মেঝে থেকে সৌহার্দ্যের ফোনটা কুড়িয়ে নিয়ে ওর পিছু ছুটল। দৌড়াতে দৌড়াতেই সৌহার্দ্য আরবানের হাত থেকে ফোনটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে দ্রুত ফারিসকে ডায়াল করল।
​ফোন রিসিভ হতেই সৌহার্দ্যের বজ্রকণ্ঠ গগনবিদারী চিৎকারে ফেটে পড়ল, “তোকে একটা নাম্বার পাঠিয়েছি! সেটা দ্রুত ট্রেস কর! যত ফোর্স, যত লোক লাগে লাগা, কিন্তু ওটাকে খুঁজে বের কর! কুইক! পুরো শহর তন্ন তন্ন করে ফেলবি, অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল!”
​ফারিস ওপাশ থেকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না—কাকে খুঁজবে? কী হয়েছে? বিরক্ত হয়ে সে বলল, “আরে ভাই, শান্ত হ! কাকে খুঁজতে হবে সেটা তো বলবি, আর ‘ওটা’ বলতে কাকে বোঝাচ্ছিস?”
​সৌহার্দ্য রাগে গর্জে উঠল, “ঐ দেড় ব্যাটারিটাকে খুঁজতে বলছি তোকে! কানে যাচ্ছে না? এত প্যাঁচাল পারছিস কেন? হারি আপ! আধা ঘণ্টার মধ্যে ওর খবর আমার চাই!”

​ফারিস এবার চরম বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠল, “আরে ভাই, নামটা বলবি তো! কাকে খুঁজব?”
​তীব্র রাগ আর উৎকণ্ঠার চাপে সৌহার্দ্য নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। ফারিসের প্রশ্নে তার চেতনা ফিরল। মুহূর্তের জন্য তার সেই বজ্রকণ্ঠ যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, স্বর নামিয়ে, এক অদ্ভুত করুণ আর অসহায় আর্তনাদে সে বলল, “আমার বউ… । প্লিজ ফারিস,!”প্লিজ ফাইন্ড হার অ্যান্ড ব্রিং হার ব্যাক অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল,ভাই।”
​সৌহার্দ্যের কণ্ঠে সেই মুহূর্তে যে আকুতি আর যন্ত্রণার সুর বেজে উঠল, তা শুনে ফারিস আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেল না। তার কন্ঠস্বরও গম্ভীর হয়ে এল, “ওকে, তুই প্যানিক করিস না। আমি দেখছি।”
ফারিসের সাথে কল কাটার পর সৌহার্দ্যের হাতের ফোনটা যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো কাঁপছে। সে একে একে তার পরিচিত সব পুলিশ অফিসার থেকে শুরু করে ডিআইজি পর্যন্ত—কাউকে বাদ রাখল না। প্রতিটি কণ্ঠস্বরে শুধু একই আর্তনাদ, একই হাহাকার—”যত দ্রুত সম্ভব রিদির খবর চাই। আমার রিদির গায়ে যেন একটা ফুলের টোকাও না লাগে!”

​আরবান পাশে বসে বড় ভাইয়ের এই উন্মাদনা স্তব্ধ হয়ে দেখছিল। মানুষের জীবনে ভালোবাসার অনেক সংজ্ঞা আছে, কিন্তু সৌহার্দ্যের এই মুহূর্তের রূপ দেখলে মনে হয়, ‘ভালোবাসা’ শব্দটা বড্ড তুচ্ছ। এ তো নিছক ভালোবাসা নয়, এ তো পাগলামি, এ তো উন্মাদের সেই তীব্র আসক্তি যেখানে নিজের অস্তিত্বের চেয়েও অন্যের অস্তিত্ব বড় হয়ে দেখা দেয়। আরবান চাইলেও ভাইকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢাকা, আর তার মাঝেই সৌহার্দ্যের মার্সিডিজ গাড়িটা বাতাসের বেগে শহরের অলিগলিতে ছুটে চলছে।
​এভাবে টানা চার ঘণ্টা—না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, পুরো ঢাকা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজছে সৌহার্দ্য। হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিচিত জায়গা—কোথাও বাদ রাখেনি। প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ফারিসকে ফোন করছে, পরিচিতদের খবর নিচ্ছে—একই প্রশ্ন, একই আকুতি, “পাওয়া গেছে কি?” উত্তর প্রতিবারই হতাশাজনক।
​হঠাৎ করেই সৌহার্দ্য গাড়িটা রাস্তার একপাশে পার্ক করল। তার হাতের আঙুলগুলো স্টিয়ারিং হুইলের ওপর থরথর করে কাঁপছে, যেন সেগুলো আর ভার সইবার শক্তি পাচ্ছে না। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এল, বুকটা ধড়ফড় করছে অশুভ সংকেতে। কপালে জমে থাকা ঘাম ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ছে। আরবান ভাইয়ের হাতের পালস চেক করেই আঁতকে উঠল। তার ভাইয়ের অবস্থা যে আশঙ্কাজনক, তা বুঝতে বাকি নেই।
​ভীত কণ্ঠে আরবান বলে উঠল, “ভাইয়া, তুমি একদম ঠিক নেই! তোমাকে এখনই হাসপাতালে যেতে হবে, না হলে…”

​সৌহার্দ্য একটা রুগ্ন হাসি হাসল, যেন নিজের জীবনের চেয়ে রিদির গুরুত্বই বেশি। সে হাত তুলে আরবানকে থামিয়ে দিয়ে ভেঙে পড়া স্বরে বলল, “হাতে সময় নেই, আরবান। ওকে খুঁজে পেতেই হবে।” তারপর ধীরগতিতে একটা ওষুধের নাম বলে যোগ করল, “তুই দ্রুত এটা নিয়ে আয়।” কথাগুলো বলেই সে ক্লান্তিতে, যন্ত্রণায় স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা ঠেকিয়ে দিল।
​ভাইয়ের এমন অসহায় আর বিধ্বস্ত রূপ দেখে আরবানের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে দেরি না করে দ্রুত গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল ওষুধের খোঁজে,
আরবান গাড়ি থেকে নামতেই সৌহার্দ্য একাকীত্বের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল। স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে সে বিড়বিড় করতে লাগল—যেন রিদি তার খুব কাছেই কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।
​তার প্রতিটি শব্দে ছিল এক গভীর হাহাকার: “প্লিজ, মাই লাভ, কাম ব্যাক টু মি। আই ওন’ট হার্ট ইউ এনিমোর।”
​সে বুকের ভেতরটা চেপে ধরে অসহায়ের মতো বলল, , “বিশ্বাস কর, আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে। প্লিজ ফিরে আয়, কোথায় আছিস তুই, কেন পাচ্ছি না! প্লিজ কাম ব্যাক ইনটু মাই আর্মস।”

পার্টি অফিসের ভেতর গম্ভীর নিস্তব্ধতা। এক কোণে পায়ের ওপর পা তুলে পরম আরামে বসে আছে ফারিস, ঠোঁটের কোণে তার বাঁকা, রহস্যময় এক মিটমিট হাসি। তার ঠিক বিপরীতেই সুজন বসে আছে, ভ্রু কুঁচকে, চোখেমুখে চরম বিরক্তি আর অস্থিরতা নিয়ে। ঘণ্টা দুয়েক আগেই সে রিদির খবর পেয়েছিল। এই তিন ঘণ্টায় সুজন বহুবার সৌহার্দ্যকে ফোন করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ফারিসের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ফারিস সমস্ত চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে সৌহার্দ্য ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে যে রিদি সুরক্ষিত আছে।
​সুজন আর ধৈর্য রাখতে পারল না। আগুনের মতো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ফারিসের দিকে তাকিয়ে সে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “রিদিকে পাওয়া গেছে জেনেও তুই সৌহার্দ্যকে এভাবে পাগলের মতো ঘুরাচ্ছিস? ও জানার পর তোর অবস্থা কী হবে, বুঝতে পারছিস?” সাথে আমি ও মরবো!
​ফারিস সুজনের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু পায়ের ওপর পা তুলে পরম নিশ্চিন্তে মুচকি হেসে উঠে দাঁড়াল। তারপর এক অদ্ভুত ছন্দে গেয়ে উঠল:

​”আমি বউ মানি না, বউ মানি না রে ভাই
সৌহার্দ্য বউ হারিয়ে, এখন কাঁদে বউ কোথায়?”
​ফারিসের এই মশকরায় সুজনের বিরক্তি যেন চরমে পৌঁছাল। সে ফারিসের দিকে তাকাতেই তীব্র বিতৃষ্ণায় বিড়বিড় করে উঠল, “পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে!”
আরবান হন্তদন্ত হয়ে ওষুধ নিয়ে ফিরল দ্রুত সৌহার্দ্যকে খাইয়ে দিল। ওষুধটা কাজ করতে শুরু করতেই সৌহার্দ্যের শরীর কিছুটা স্থির হলো। ঠান্ডা মাথায় ভাবতেই তার মাথায় খেলে গেল একটা নাম—সায়েম! কেন এতক্ষণ এই বালটার কথা তার মনে পড়েনি, নিজের ওপরই রাগ হলো তার। সৌহার্দ্য দ্রুত সায়েমের নাম্বারে কল করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে তীব্র মিউজিকের আওয়াজ ভেসে এল, কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সৌহার্দ্য রাগে ফেটে পড়ে গর্জে উঠে বলল, “এই চারচোখ, বল আমার বউ কোথায়?”
​সায়েম একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “স্যার, এবার বলুন। একটা পার্টি চলছিল তো, তাই কথা বুঝতে পারিনি।”

​সৌহার্দ্যের রাগ তখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সে চিৎকার করে উঠে বলল, “চারচোখের বাচ্চা, আমার বউ কই বল? কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ওটাকে?”
​সায়েম হকচকিয়ে গেল। সৌহার্দ্যের বউ কোথায়, তা সে জানবে কোত্থেকে? সে মনে মনে খিস্তি ঝাড়ল—খাটাস! তোর বউ কোথায় আমি জানব কীভাবে? আমি কি তোর বউয়ের সাথে পরকীয়া করি নাকি? তবুও মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে সে বলল, “বিশ্বাস করেন স্যার, আপনার বউ কোথায় আমি জানি না, আমি কি…”
​সায়েমের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য ফোনের ওপর প্রচণ্ড আক্রোশে আঙুল চালিয়ে লাইনটা কেটে দিল।
​পরের মুহূর্তেই টায়ারের আর্তনাদ তুলে সৌহার্দ্যের মার্সিডিজ শিকদার বাড়ির দিকে ছুটল। রাগে সৌহার্দ্যের পুরো শরীর কাঁপছে, চোখের কোণে রক্তবর্ণ আভা ফুটে উঠেছে। শিকদার বাড়ির গেইটে এসেই সে গাড়ি থামিয়ে ঝড়ের বেগে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল। সামনেই সোফায় বসে আকিব শিকদার আর শাহবীর কিছু একটা নিয়ে গম্ভীর আলোচনা করছিল।

​সরাসরি শাহবীরের ওপর চড়াও হলো সৌহার্দ্য। তার কলার চেপে ধরে ধারালো গলায় গর্জে উঠে বলল, “ওটা কোথায়? এক্ষুনি বের কর! একদম নাটক করবি না আমার সাথে!”
​শাহবীর চরম বিরক্তিতে সৌহার্দ্যের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “মাথা ঠিক আছে তোর? এমন পাগলের মতো আচরণ করছিস কেন? ছাড় আমাকে!”
হঠাৎ সৌহার্দ্যের সেই হিংস্র রূপ বদলে গেল এক চরম অসহায় আর্তিতে। সে শাহাবীরের দুই হাত নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল, চোখের কোণে জমে থাকা জল যেন উপচে পড়ার অপেক্ষায়। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে সে মিনতি করে বলল, “প্লিজ ভাই, বল না ও কোথায়। ওকে শুধু একবার দেখতে দে, আমি দেখেই চলে যাব। প্লিজ… তোর পায়ে পড়ি, বল না কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস ওটাকে?”
​ঘরের স্তব্ধতা যেন হাড়হিম করা। আরিফা খান, শাহবীর, আরবান—সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। এই সৌহার্দ্য? যে ইগো আর অহঙ্কারের চূড়ায় বসে থাকে, যার মাটিতে পা পড়ে না—সেই ছেলে আজ রিদির জন্য কারো পায়ে পড়ছে? অবিশ্বাস্য এই দৃশ্য দেখে সবার শ্বাস যেন আটকে গেল।

​হঠাৎ আকিব শিকদার গর্জে উঠলেন, “এই ছেলে, তোমার না…” কিন্তু কথা শেষ করতে পারলেন না। সৌহার্দ্য এমন এক রক্তচক্ষু নিয়ে তাঁর দিকে তাকাল যে, আকিব শিকদার ভয়ে ঢোক গিলে থেমে গেলেন।
​শাহবীর শান্ত দৃষ্টিতে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল। ছেলেটার কী করুণ দশা! চুলগুলো অবিন্যস্ত, শার্টের বোতাম খোলা, প্যান্টের ইন অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে—সব মিলিয়ে এক বিধ্বস্ত রূপ। শাহবীর আলতো করে সৌহার্দ্যের কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “বস, তুই ঠিক নেই। আগে এক গ্লাস…”
​কথা শেষ করতে পারল না সে। সৌহার্দ্য বাঘের মতো গর্জে উঠে হাত সরিয়ে দিল, “আমার জান বেরিয়ে যাচ্ছে, আর তুই আমার সাথে নাটক মারাচ্ছিস? বল ওই দেড় ব্যাটারিটাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস?”
​এতক্ষণ শাহবীরের মায়া লাগছিল, কিন্তু বোনকে এমন ‘দেড় ব্যাটারি’ বলাতে সে এবার চরম বিরক্ত হলো। রাগে তার মুখটা শক্ত হয়ে গেল। শাহবীর ঝংকার দিয়ে বলল, “তুই কখনো মানুষ হবি না! এত নাটক করছিস কেন? আমি তো তিন ঘণ্টা আগেই সুজনকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি যে ওকে পাওয়া গেছে! ও এখন ওর বান্ধবী সুমির বাসায়!”

শাহবীরের কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো সৌহার্দ্যের মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ল। সে এখানে মরণাপন্ন অবস্থায় ছটফট করছে, এক মুহূর্তের জন্য দম আটকে আসছে, আর সেই মেয়েটি নির্বিকার মনে বান্ধবীর বাসায় বসে আছে? সুজনের ওপরও তার প্রচণ্ড ক্ষোভ জন্মাল—সব জেনেও সে কেন তাকে এভাবে অন্ধকারে রেখেছিল?
​সৌহার্দ্য আর কোনো কথা খরচ করল না। তার চোখের সেই রক্তবর্ণ ক্রোধ এখন রূপ নিয়েছে এক নিস্তব্ধ পাথুরে শীতলতায়। কোনো পিছুটান না রেখে সে গটগট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, আরবানও দিশেহারা হয়ে তার পিছু নিল।

​সৌহার্দ্যের মার্সিডিজ এখন বুলেট ট্রেনের গতিতে সুমিদের বাড়ির দিকে ছুটছে। গাড়ি থেকে নেমে সে সোজা ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ল। মির্জা বাড়ির কর্তাব্যক্তি সাফিন মির্জাকে সে আগে থেকেই চিনত। সৌহার্দ্যের এলোমেলো বিধ্বস্ত চেহারা আর অদ্ভুত চাহনি দেখে সাফিন সাহেব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন।
​সৌহার্দ্য কোনো রকম সৌজন্যবশত কথার ধার না ধেরে, অনুভূতিহীন এক যান্ত্রিক কণ্ঠে বলল, “আঙ্কেল, আপনার মেয়ে কোথায়? প্লিজ,কল হার।”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৮

​সাফিন সাহেব কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন বাবা? কোনো সমস্যা? ও তো ওর বান্ধবীদের নিয়ে ছাদে…”
​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য যেন ঝড়ের বেগে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। তার হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি ধড়ফড়ানি তখন যেন ছাদের চৌকাঠের কাছে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। ছাদের দরজায় পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here