অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৬
রিদিতা চৌধুরী
রিদির হতভম্ব চাহনি আর সৌহার্দ্যের শীতল নিস্পৃহ ভঙ্গির মাঝে ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। রিদি তখনও টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে, আঙুলগুলো নিজের কানে ধরা। সৌহার্দ্যের সেই শেষ বাক্যটি—”আই ডোন্ট লাভ ইউ”—রিদির মস্তিষ্কে যেন কোনো তপ্ত শূলের মতো বিঁধল। কিছুক্ষণ আগে মানুষটি তাকে মিথ্যা বলে ৬৫ বার ভালোবাসার স্বীকারোক্তি আদায় করে নিয়ে, আবার সেই মানুষটিই এমন তাচ্ছিল্যভরা প্রত্যাখ্যান ছুড়ে দিল!
রিদির মনে রাগের চেয়েও বেশি দানা বাঁধল তীব্র অভিমান। সে নিজেকেই ধিক্কার দিল, এই মানুষটির সামান্য নরম আচরণের আশায় সে বারবার তার সমস্ত কঠোরতা ভুলে যায়। মনে মনে এক করুণ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল রিদি। তার মনে হলো, নির্লজ্জ না হলে সে কীভাবে ভাবল যে এই পাথরের মতো মানুষের মনে তার জন্য বিন্দুমাত্র দুর্বলতা থাকতে পারে?
টেবিল থেকে নেমে রিদি এক কদম এগিয়ে গেল সৌহার্দ্যর দিকে। ক্ষোভ আর অভিমানে টলমল কণ্ঠে ফুঁসে উঠে বলল, “কে চাইছে আপনার ভালোবাসা? আমি কি কখনো বলেছি আমাকে ভালোবাসুন? চাই না আমি আপনার ভালোবাসা, মরে গেলেও না, আ…”
রিদির বাক্য শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য বিছানা থেকে উঠে এসে, মুহূর্তের মধ্যে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো ঝাপিয়ে পড়ে রিদিকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল সে। সৌহার্দ্যের চোখ-মুখ দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছে; এক হাত দেয়ালের ওপর ভর দিয়ে অন্য হাতে রিদির চিবুক শক্ত করে খামচে ধরে রাগে হিসহিসিয়ে বলল, “কী বলছিস তুই, স্টুপিড মহিলা? রিপিট দ্যাট! জবান বড্ড বেড়ে গেছে না? একদম টেনে ছিঁড়ে ফেলব! আর একবার যদি তোর মুখ থেকে ওই শব্দ উচ্চারিত হয়, আমিই তোকে জিন্দা কবর দিয়ে দেব!”
সৌহার্দ্যের অগ্নিদৃষ্টির সামনে রিদির চোখে টুপটাপ জল ঝরছে, কিন্তু অভিমানে সে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। রিদির এই নীরবতা সৌহার্দ্যের রাগ যেন দিগুণ বাড়িয়ে দিল। সে রিদিকে ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় নিজের হাত দিয়ে দেয়ালের ওপর প্রচণ্ড জোরে থাবা বসাল। সাথে সাথে তার হাতের চামড়া ফেটে ফিনিক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। তবে সেদিকে বিন্দু পরিমান তোয়াক্কা করলো না সে!
সৌহার্দ্য ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে নিজের উত্তেজনা প্রশমনের ব্যর্থ চেষ্টা চালাল অনেকক্ষন। কিন্তু আজকের এই উন্মাদ রাগ কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না তার। নিজের চুলে হাত দিয়ে খামচে ধরে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল সে। রাগে, ক্ষোভে আর নিজের ওপর বিরক্তিতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, “বালের রাগ, বালের দেড় ব্যাটারি , কোনটাই কন্ট্রোল করতে পারিনা ছেহ!
তখন ও দেয়ালের এক কোণে কুঁকড়ে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে রিদি। সৌহার্দ্য এক পলক সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই দীর্ঘশ্বাসে যেন অনেক না বলা অনুযোগ মিশে ছিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে রিদির কাছে গিয়ে বসল। কোনো কথা না বলে আলতো করে রিদির মুখটা দুহাতে তুলে ধরল নিজের দুই হাতের আজলায়। বুড়ো আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় মুছে দিল চোখের নোনা জল। এরপর রিদিকে পাঁজা কোলে তুলে আলগোছে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ড্রয়ার থেকে ব্যথানাশক মলমটা বের করে নিল সৌহার্দ্য। রিদির আর একটু কাছে ঘেঁষে বসে যখন সে রিদির পা-টা নিজের উরুর ওপর তুলে নিয়ে পায়জামাটা সামান্য উপরে উঠাতে যাবে তখনি, রিদি চমকে আর্তনাদ করে উঠল, “ছাড়ুন! কী করছেন? আমার পায়ে হাত দেবেন না, আমার পায়ে কোনো ব্যথা নেই!”
সৌহার্দ্য নির্বিকার। ওর কথা যেন কানেই তুলল না সে। রিদির হাতটা সরিয়ে খুব যত্নসহকারে পায়ে মলম মালিশ করে দিয়ে রিদিকে নিজের দিকে টেনে নিল সে। কোনো শারীরিক উত্তাপের আতিশয্য নেই, সেখনে কেবল এক গভীর প্রশান্তি। রিদির পিঠ নিজের বুকের সাথে চোপে ধরে আলতো করে রিদির কাঁধে নিজের থুতনিটা রেখে গম্ভীর স্বরে শুধাল, “বাইক রাইডে যাবে?”
রিদি পাথরের মতো জমে আছে। সে কোনো উত্তর দিচ্ছে না, এই মানুষটাকে সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না—কখনো পাহাড়সম কষ্ট দেয়, আবার মুহূর্তেই পরম মমতায় কাছে টেনে নেয়। মানুষ কি এমন হয়? গাল ফুলিয়ে অভিমানে থ মেরে বসে রইল সে। রিদির এই নিরবতা সৌহার্দ্যে মোটেও ভালো লাগলো না। আজ বোধহয় একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছে মেয়েটাকে?সৌহার্দ্য কোনো বাক্য বিনিময় ছাড়া আবার ও রিদিকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। এবার রিদি ভয়ে দুহাতে সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে ছটপটিয়ে উঠে বলল, “অসভ্য লোক! কী করছেন? নামান বলছি, নামান আমাকে!”
সৌহার্দ্য যেন বধির। রিদির কথায় কোন পাত্তা না দিয়েই দরজা খুলে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এসে ওকে নিয়ে গেল গ্যারেজে রাখা বাইকটি কাছে, যেটা সকালেই দারোয়ানকে দিয়ে ঠিক করিয়ে রেখেছিল। বিনা বাক্যে রিদিকে বাইকে বসিয়ে নিজে উঠে বসল। তারপর পিছন ফিরে গমগমে গলায় বলল, “শক্ত করে ধরে বসো।”
রিদি একটু নড়ল না, হাত বাড়িয়ে ধরলও না। সৌহার্দ্যের যেন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। তবুও নিজের রাগ দমিয়ে বিরক্ত হয়ে, বাইক থেকে নেমে রিদিকে নিজের সামনে টেনে নিল সে। বুক আর পিঠের মাঝে কোনো দূরত্ব না রেখে চেপে বসিয়ে বাইক স্টার্ট দিতেই রিদি চেঁচিয়ে উঠতে , চাইলে সৌহার্দ্যে কণ্ঠস্বর পাথরের মতো কঠিন, করে বলল, “তুমি যত চিৎকার করবে, বাইকের গতি তত বাড়বে। এমনিতেও তোমার মরার খুব শখ,চলো—আজ দুজন মিলে মরব! সাথে সাথে রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিরব হয়ে গেল!
শহরের কোলাহলকে পেছনে ফেলে বাইকটি এখন পিচঢালা হাইওয়ে ধরে আপন গতিতে ছুটছে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা গাছের ছায়া আর আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ যেন এক মায়াবী দৃশ্যপট তৈরি করেছে। তীব্র বাতাসের ঝাপটায় রিদির অবিন্যস্ত চুলগুলো অবাধ্য হয়ে তার মুখ জুড়ে নাচছে। সৌহার্দ্যের বুকের সাথে মিশে থাকার সুবাদে সে স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছে মানুষটার হৃদস্পন্দনের ছন্দ—কখনো ধীর, কখনো বা দ্রুত। একটু আগে ঝগড়ার যে উত্তাপ রিদির চোখে-মুখে ছিল, বাতাসের শীতল স্পর্শ আর গতির নেশায় সেই কঠোরতা যেন ধীরে ধীরে গলে জলের মতো নরম হয়ে আসছে।
বাইকটি চলতে চলতে এক সময় শহরের জঞ্জাল ছাড়িয়ে এসে থামল এক নিভৃত নদীর পাড়ে। চারপাশটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ; দিগন্তের ওপারে অস্পষ্টভাবে কয়েকটা বাড়ির অবয়ব ছাড়া জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। বাইক থেকে নেমে সৌহার্দ্য রিদির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল, তারপর টেনে নিয়ে কিছু দূর গিয়ে বসিয়ে দিল নদীর পাড়ের নরম ঘাসের ওপর।
নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা পরিবেশ। দুজনেই চুপচাপ। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কিছুক্ষণ পর নদীর শান্ত স্রোতের দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্য এক গভীর, গমগমে স্বরে মৃদু খোঁচা দিয়ে বলে উঠল, ” ইউ নো, এভাবে মিউট থাকলে তোমাকে একটু বেশিই কিউট লাগে!”
সৌহার্দ্যের এই চালাকি রিদি খুব ভালোভাবেই বুঝল। সৌহার্দ্য তাকে কথা বলানের জন্য এগুলো করছে। রিদি রাগে মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল, যেন সে পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। সৌহার্দ্যও বুঝে গেল, আজ তার আদুরে বউটির মুখ থেকে শব্দ বের করা প্রায় অসম্ভব।সৌহার্দ্য আলতো করে ঘাসের ওপর নিজের শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রিদির হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরে রাখলো!
নিশীথ রাতের এই নিরিবিলি পরিবেশটা রিদির কাছে একদম অন্যরকম লাগছে। রাতের আঁধারে এমন নির্জনতায় প্রিয় মানুষটির পাশে বসে সময় কাটানোর যে শখ তার ছিল,আজ তা যেন কোনঅলৌকিকতায় পূর্ণ হয়ে গেল।রিদি চোখ বন্ধ করে নদীর বুক চিরে আসা হিমেল হাওয়াটা বুক ভরে অনুভব করছিল, ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের আকস্মিক এক হেঁচকা টানে সে হারিয়ে গেল তার বলিষ্ঠ বুকের উষ্ণতায়।
সৌহার্দ্য রিদির মাথাটা নিজের বুকের ওপর আলতো করে চেপে ধরে দুহাতে তাকে আগলে নিয়ে নিচু, গম্ভীর আর শান্ত স্বরে ফিসফিস করে বলল, “জান?”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠে ‘জান’ ডাকটা শুনে রিদি থমকে গেল। সম্পর্কের এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র দ্বিতীয়বার সে মানুষটার মুখে এমন একটা সম্বোধন শুনল, যা তার সমস্ত অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রিদির ঠোঁট দুটো সামান্য কেঁপে উঠল, সে অতি কষ্টে মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “হুম…”
সৌহার্দ্য তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আবেশমাখা নেশালো কণ্ঠে বলল, “ইউ লাভ মি?”
রিদি উত্তেজনায় বিভোর হয়ে যখনই ‘হুম’ বলে সম্মতি দিতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটে যাওয়া আগের মুহূর্তের অভিমানটা তার মনে পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রাগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে উঠল, “আই ডোন্ট লাভ ইউ!”
বউয়ের কথা কানে যেতেই সৌহার্দ্য নিঃশব্দে হাসল। সে বুঝতে পারছে তার বউ তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে! সৌহার্দ্য নিজের মাথাটা উঁচিয়ে রিদির চুলের ভাঁজে আলতো একটা চুমু খেয়ে বলল, “ওকে, ভাসতে হবে না, চোখ বন্ধ করো!”
রিদি আমতা আমতা করে সরে যেতে চেয়ে বলল, “এখানে এভাবে কেউ এসে গেলে, আমার ভয় করছে পরিবেশটা কেমন ভুতুড়ে!”
সৌহার্দ্য ওভাবে চোখ বন্ধ করে তাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে শান্ত কন্ঠে বলল, “সৌহার্দ্য চৌধুরীর শরীরে যতক্ষণ এক বিন্দু নিঃশ্বাসও বাকি আছে, ততক্ষণ তার এই ফুলের গায়ে একটি আঁচড়ও পড়তে দেবে না সে। তাই ভয় পেও না, শান্ত হও… “ক্লোজ ইয়োর আইজ। ইউ’র সেফ, মাই হার্ট।”
সৌহার্দ্যের কথাগুলো কানে যেতে রিদি কেঁপে উঠল। এটা কি সত্যি তার অসভ্য ডাক্তার? নাকি এখানে এসে অন্য কোনো ভূত-প্রেত ধরল তাকে? রিদি টেনশনে পড়ে যাচাই করার জন্য সৌহার্দ্যের বুকে জোরে একটা চিমটি কেটে দিতে, ব্যাথায় সৌহার্দ্য কুঁকড়ে গিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে বলল, ইউ”দেড় ব্যাটারি, এখনি ছুড়ে নদীতে ফেলে দিবো! এটা কি করছো, স্টুপিড?”
রিদি একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল, ‘এটাই আমার অসভ্য ডাক্তার, ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে!’ বলেই নিশ্চিন্তে সৌহার্দ্যের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজল।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, ঘড়ির কাঁটায় সম্ভবত প্রায় পাঁচটার কাছাকছি হবে। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে রিদির তন্দ্রা ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখল, সৌহার্দ্য তাকে পরম মমতায় দুহাতে জড়িয়ে ধরে আছে। খোলা আকাশের নিচে এই ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় চারিদিক মায়াবী হয়ে উঠেছে। রিদি খুব সাবধানে সৌহার্দ্যের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসল।
চোখ মেলতেই এক অপার্থিব দৃশ্যের দেখা মিলল। শান্ত নদীটা যেন রূপকথার কোনো ছবি, আর দূরে অস্পষ্টভাবে জেগে ওঠা বাড়িগুলোর ছায়া মিলে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে রিদির মনটা ভরে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি। ঘাড় ঘুরিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতেই দেখল, মানুষটা কেমন ছোট বাচ্চার মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘুমিয়ে আছে। অথচ , চোখ খোলার পর এই মানুষটাই আবার ‘ঠাডা পড়া বগার মতো’ চেঁচামেচি শুরু করবে! তবুও আজ কেন জানি মানুষটার এই শান্ত রূপটুকু রিদির মনের খুব কাছে জায়গা করে নিল। মনে মনে সে ভাবল, ‘ইস,অসভ্য ডাক্তার যদি সারাক্ষণ এমন শান্ত থাকতো!’
রিদির ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই সৌহার্দ্য পিটপিট করে চোখ খুলে উঠে বসল। চারপাশে দৃষ্টি ফেলতে মুহূর্তের মধ্যে তার ঘুমের রেশ কেটে গেল। নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়েই চট করে রিদির হাতটা ধরে উঠে দাঁড়িয়ে চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ওঠো” ৯ টায় (ওটি) আছে, আমার, যেতে হবে!”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠে সেই চিরচেনা কর্কশ সুর শুনে রিদি বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। বিড়বিড় করে বলল, “আনরোমান্টিক ভূত আবার নিজের ফর্মে ফিরে এসেছে!”বলেই মুখ বাঁকিয়ে সৌহার্দ্যর পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল রিদি।
তাদের বাইকটা একটু দূরে রাখা ছিল। কিছু দূর হেঁটে যেতেই রিদির চোখ পড়ল রাস্তার পাশের একটা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল আম গাছটার দিকে। কাঁচা আমের থোকাগুলো বাতাসের দোলায় মৃদু দুলছে। রিদির চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। লোভ সামলাতে না পেরে সে সৌহার্দ্যের শার্টের কোণাটা টেনে ধরে আবদার করে বলল, “ডাক্তার সাহেব, ওই দেখুন না কী সুন্দর আম! আমাকে দুটো পেড়ে দেন না প্লিজ?”
রিদির এমন বাচ্চামো বায়না শুনে সৌহার্দ্য বিরুক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। নিজের সেই চিরচেনা গম্ভীর গলায় বলল, “যাওয়ার পথে কিনে দেব। অন্যের গাছের ফল এভাবে চুরি করা—ইটস আ ব্যাড হ্যাবিট!”
রিদি গাল ফুলিয়ে রাগ দেখিয়ে পাল্টা জবাব দিয়ে বলল, “কিনতে হবে না! আমি এই গাছ থেকেই পেরে খাবো। গ্রামের মানুষ কত আম চুরি করে খায়, জানেন? ওগুলোর যে আলাদা মজা! আপনি জানবেন কী করে? আপনি তো শুধু ভাল্লুকের মতো মুখ করে মানুষকে ভয় পাইয়ে দিতেই জানেন!”
বউয়ের এমন একনাগাড়ে বকবকানি শুনে সৌহার্দ্য নিজের বিরক্তি আর সামলাতে পারল না। চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে সে বলল, “ওকে, দিচ্ছি! শাট আপ ইউর মাউথ!” সৌহার্দ্যর বকা শুনোও রিদি আজ খুশি হলো, যাই হোক আম তো পেড়ে দিতে রাজি হয়ছে!
গাছটা খুব একটা উঁচু না হলেও হাত নাগালের বাইরে ছিল। সৌহার্দ্য এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা মই খুঁজে পেয়ে, সেটা গাছের গায়ে ঠেকিয়ে মই বেয়ে ওপরে উঠে গেল সে। রিদি নিচে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার গম্ভীর রাগী ,বদমেজাজি, ডাক্তার মানুষটাকে। সৌহার্দ্য সবে দুটো আম পেড়ে নিচে ছুড়ে দিতেই, এমন সময় হঠাৎই একটা কর্কশ চিৎকার ভেসে এল, “কে রে? কোন হতচ্ছাড়া আমার আম চুরি করছিস?”
সৌহার্দ্য থমকে গেল। তাড়াহুড়ো করে মই থেকে নেমে দাঁড়াতেই সামনের লোকটার দিকে চোখ পড়ল। কিন্তু লোকটা সৌহার্দ্যকে দেখামাত্রই লাঠিটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে। বিস্ময় আর লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “ডাক্তার বাবা… আপনি?”
সৌহার্দ্য রিদির দিকে একবার রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার লোকটার দিকে ফিরে, গলা খাঁকারি দিয়ে খুব স্বাভাবিক স্বরে গম্ভীর গলায় বলল, “আসলে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট, আম দেখে খুব খেতে চাচ্ছিল, তাই ভাবলাম দুটোর ব্যবস্থা করি।”
রিদি তো পুরো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে! তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে—’এই লোক বলে কী? সে কবে প্রেগন্যান্ট হলো?’ রিদির মাথায় যখন এই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, লোকটা ততক্ষণে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছে। সে প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, “আরে বাবা, এ আর এমন কী? যা লাগে নিয়ে যান! আমিই পেড়ে দিচ্ছি। আপনি না থাকলে তো আমার ছেলেটা আর বাঁচত না!”
ঘটনাটা হলো, কিছুদিন আগেই সৌহার্দ্য বিনা পারিশ্রমিকে লোকটার ছেলের হার্টের অপারেশন করেছিল। সৌহার্দ্য লোকটার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “নো নিড, ইটস এনাফ। আপনার ছেলে এখন কেমন আছে?”
লোকটার মুখে একরাশ প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। খুশি হয়ে বলল, “অনেক ভালো আছে বাবা! আপনার কাছে যে কত বড় ঋণ আমাদের, সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।”
ঠিক তখনই ভেতর থেকে লোকটার স্ত্রী এসে রিদির হাতে কয়েকটা আচারের বয়াম ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই টাইমে এগুলো খেতে খুব ভালো লাগবে মা, নাও।” যখনি বমি পাবে খেতে পারবে!
রিদি হতবাক হয়ে আচারের বয়ামগুলো হাতে নিয়ে। সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতেই দেখল সে আড়চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সৌহার্দ্য বুঝতে পারল বউ এখন কী ভাবছে! সে দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিয়ে বলল, “আজ আসি তাহলে, আমার একটা ওটি আছে। কোনো প্রবলেম হলে ছেলেকে নিয়ে চেম্বারে আসবেন।”
বলেই রিদির হাতটা শক্ত করে ধরে দ্রুত বাইকের দিকে এগিয়ে গেল সৌহার্দ্য। আর রিদি আশ্চর্য বনে সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে আছে, কি মিথ্যা বাদী লোক….
বাইকের কাছে পৌঁছাতেই রিদি সৌহার্দ্যের হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। রাগে তার শরীর তিরতির করে কাঁপছে, আর গলায় ঝরছে তীব্র অভিমান। সে ফুঁসে উঠে বলল, “মিথ্যা বললেন কেন অসভ্য লোক?”
সৌহার্দ্য রিদির দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন। তার গম্ভীর, গমগমে গলার স্বরে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। সে পাল্টা প্রশ্ন করল, “তো কি বলবো? এসব অদ্ভুত ইচ্ছে তো প্রেগনেন্ট মহিলাদের হয় না?”
সৌহার্দ্যের এই অযৌক্তিক কথায় রিদির রাগ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে রাগে নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠল, “আশ্চর্য, আম খেতে হলে ও ওসব হতে হয়, আজ আপনার কাছে শুনলাম অসভ্য ডাক্তার!”
সৌহার্দ্য কোনো প্রতিউত্তর করল না। বরং সে ধীরস্থিরভাবে রিদির কোমর চেপে ধরে তাকে বাইকের ওপর বসিয়ে দিল। এরপর দীর্ঘক্ষণ রিদির চোখের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সেই নীরব চাহনিতে যেন কোনো এক গভীর আবেগ লুকানো ছিল। মুহূর্তের স্থবিরতা ভেঙে সে শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “এখন কি হতে চাচ্ছ ওসব?”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৫
সৌহার্দ্যের এমন নির্লজ্জ প্রশ্নে রিদি লজ্জা আর রাগে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। সে নাক-মুখ কুঁচকে মিনিমিনিয়ে বলল, “ছিঃ অসভ্য লোক, শুধু বাজে কথা!”
এবার সৌহার্দ্যের ধৈর্য যেন সীমা ছাড়াল। রিদির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে উঠল, “বাজে কথা ও বলবো না, বাজে কাজ ও করবোনা, তোমাকে সোকিসে সাজিয়ে রাখবো স্টুপিড!”
কথাটা বলেই সে বাইক স্টার্ট দিয়ে রিদিকে পেছনে বসিয়ে তীব্র গতিতে বাড়ির পথের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
