Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৮
রিদিতা চৌধুরী

রিদি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির বিড়ালের মতো তীক্ষ্ণ চোখগুলো যেন তার অস্তিত্বের গভীরে বিঁধছে। পৃথা পাশে দাঁড়িয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত; সেও বুঝতে পারছে না লোকটা আসলে কে। অস্বস্তি কাটিয়ে রিদি নিজেকে কিছুটা সামলে নিল, তারপর ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আমাকে কিছু বলছেন? আমি তো আপনাকে চিনি না, ভাইয়া।”
​’ভাইয়া’ ডাকটা শুনেই ছেলেটির কপালে ভাঁজ পড়ল, তবে বিরক্তি চেপে সে শান্ত গলায় বলল, “আমাকে চিনতে পারছ না, মিষ্টি?”
​রিদিতা বিরক্তির আতিশয্যে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। স্পষ্ট স্বরে জবাব দিল, “ভাইয়া, আমি চিনি বা ‘মিষ্টি’ না, আমার নাম রিদিতা খান!”

​রিদি -এর ঝাঁঝালো কথা শুনে ছেলেটি হালকা হাসল। তার কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা, সে বলল, “তুমি আমাকে একদম ভুলে গেছ, মিষ্টি? আমি তাজওয়ান শিকদার। তোমার ভাই শাহবীরের চাচাতো ভাই। ছোটবেলায় তো তুমি আমার কোলেই চড়ে বসে থাকতে! আমার বউ হ….
​তাজওয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য হাওয়ার বেগে এসে রিদিকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। তাজওয়ানের দিকে আগুনের মতো জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে কড়া গলায় বলল, “ছোটবেলার কথা ভুলে যা। বড়বেলায় এখন ও আমার কোলে চড়ে বসে থাকে। তবে কোলে ওঠার সিস্টেমটা অন্যরকম, তুই আনম্যারেড পারসন, তুই বুঝবি না!”
​বলেই সৌহার্দ্য রিদির গালে আলতো করে চুমু খেল। তারপর তাজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “সুইটহার্ট, আমি ঠিক বলছি না?”
​সৌহার্দ্যের এমন আচরণে রিদি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সবার সামনে এমন কাণ্ডে কিছুটা লজ্জা পেলেও, তার মনের ভেতর এখন কৌতূহলই বেশি কাজ করছে।
​সৌহার্দ্যের বুকের সাথে রিদিকে লেপ্টে থাকতে দেখে তাজওয়ানের বুকের ভেতরটা রাগে টগবগ করে ফুটছে। মনে হচ্ছে, চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সৌহার্দ্যকে এখনই মাটির সাথে পিষে ফেলে সব আক্রোশ মেটায়। তাজওয়ান চোয়াল শক্ত করে বিড়বিড় করে উঠল, “বেশি বাড়াবাড়ি করছিস সৌহার্দ্য, এর ফল ভালো হবে না।”

​সৌহার্দ্য ধীর স্থিরভাবে তাজওয়ানের দিকে ফিরল, কিন্তু তার চোখে তখন আগুনের হলকা। ভ্রু কুঁচকে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল, “ভীষণ ভয় পেয়েছি আমি, তুই আমার বাল ছিঁড়বি? শুয়োরের বাচ্চা, ভুল জায়গায় চোখ দিলে চোখ উপড়ে ফেলতে এই সৌহার্দ্য চৌধুরী দুই সেকেন্ডও সময় নেবে না!”
​সৌহার্দ্যের এই রুদ্রমূর্তি দেখে রিদির ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারল, সৌহার্দ্যর এই প্রচণ্ড রাগ অকারণ নয়; এর পেছনে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা তাকে ঘিরেই। নিজের অজান্তেই সে আরও একটু সৌহার্দ্যের বুকের সাথে মিশে গেল তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল, “বাড়ি চলুন ডাক্তার সাহেব, প্লিজ!”
​রিদির এই অসহায় মিনতি আর গায়ের সাথে লেপ্টে থাকা শরীর সৌহার্দ্যের রাগের তীব্রতা এক নিমেষে কমিয়ে আনল। সে বুঝতে পারল তার বউটা ভয় পাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তার গলার স্বর বদলে গিয়ে আদুরে হয়ে এল। রিদির গালে আলতো করে হাত রেখে সে ফিসফিস করে বলল, “কুল ডাউন, জান।”

​পরক্ষণেই সৌহার্দ্য আবার তাজওয়ানের দিকে ফিরল। তার দৃষ্টি এখন স্থির, ধারালো আর ভয়ঙ্কর রকমের শীতল।
কিন্ত সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাজওয়ান যেন বিকারহীন, সে হালকা হেসে রিদির দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, “তুমি ভয় পাচ্ছ কেন মিষ্টি আ…”
তাজওয়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য রাগে গর্জে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কুত্তার বাচ্চা, আমার বউ মিষ্টি না তিতা সেটা আমার জানার কথা, তুই ওকে মিষ্টি বলিস কোন সাহসে!”
​রিদির দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্যের রাগী মুখটা একটু নরম হলো। সে দ্রুত রিদিকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে আবার তাজওয়ানের দিকে এগিয়ে এল। এবার তার গলার স্বর আরও নিচে, কিন্তু তাতে আগুনের হলকা। তাজওয়ানের খুব কাছে গিয়ে সে বলল, “বিশ্বাস কর, ওটা একটু মিষ্টি না, পুরো তিতা! অলরেডি কয়েকবার টেস্ট করা ডান!”
​কথাটা বলেই সৌহার্দ্য তার সানগ্লাসটা চোখে পরে নিল। তার ভাবসাব একদম পাথরের মতো শক্ত। তাজওয়ানের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সে গম্ভীরভাবে বলল, “তোর ভালোর জন্য বলছি, আমার সাথে লাগতে আসিস না। ফল মোটেও ভালো হবে না। আমি খুব একটা ভালো মানুষ না, সেটা তোদের জানাই আছে!”

​তাজওয়ানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সৌহার্দ্য গাড়িতে উঠে বসল। স্টার্ট দেওয়ার সাথে সাথে গাড়িটা তীব্র গতিতে ধুলো উড়িয়ে চোখের নিমিষে রাস্তা দিয়ে মিলিয়ে গেল।
তাজওয়ান ক্ষিপ্ত গতিতে গাড়িটির দিকে তাকিয়ে আছে, তার হাতের মুঠি শক্ত হয়ে জমে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, “কতগুলো বছর… দূর থেকে কেবল আগলে রেখেছি তোমাকে, মিষ্টি। নিজের কোনো চাহিদার চেয়ে তোমার ওই নিষ্পাপ হাসিটাকেই বেশি ভালোবেসেছি। ভেবেছিলাম, সময় এলে তোমাকে আমার করে নেব। অথচ, এক মুহূর্তেই সব শেষ! যে ফুলটাকে ছুঁতেও আমি ভয় পেতাম, আজ সেই ফুল অন্য কারো বাগানে ফুটে আছে। ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর… কেউ তোমাকে না চেয়েও পেয়ে গেল! কিন্তু আমি, তাজওয়ান শিকদার—সৌহার্দ্য চৌধুরীকে ছাড়বোনা!”

​একরাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাজওয়ান নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। চোখ লাল হয়ে আছে, বার বার সৌহার্দ্যর বুকে রিদির লেপ্টে থাকার দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসছে,!
​১২ বছর বয়সের রিদিকে ঘিরে তাজওয়ানের এক অদ্ভুত আসক্তি ছিলো। তারপর থেকে তাকে আগলে রাখাই যেন তার জীবনের ব্রত। রিদিকে দেখার জন্য চাচী আরিফা খানদের বাড়িতে বার বার সুদূর আমেরিকা থেকে বারবার ছুটে আসত সে। ছোটবেলায় রিদি ছিল তাজওয়ানের ছায়াসঙ্গী; খান বাড়িতে এলে সারাদিন তার পিছু পিছু ঘুরত। কিন্তু রিদি যখন বড় হতে লাগল, তাজওয়ান ইচ্ছে করেই দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। তার কাছে রিদি ছিল এক পবিত্র ফুল, আর টগবগে যুবক হিসেবে সে কোনোভাবেই চায়নি আবেগের বশে কোনো ভুল করে ফেলতে। তাই দেশে আসা কমিয়ে দিলেও, সুদূর আমেরিকায় বসেও যক্ষের মতো আগলে রেখেছিল মেয়েটিকে।

​অথচ সব পরিকল্পনা এক মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল। আকরাম খানের মৃত্যুর পর, তার পরম যত্নে রাখা সেই পাখিটি আজ চিরতরে অন্য কারো— দখলে।
খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে রিদি। ঠিক তার বিপরীতে সোফায় বসে আগুনের গোলার মতো জ্বলছে সৌহার্দ্য। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন রিদিকে বিদ্ধ করছে। বাড়িতে ফেরার পর থেকে আধা ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, অথচ সৌহার্দ্য একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি; কেবল তার রাগের উত্তাপে পুরো ঘরটা থমথমে হয়ে আছে। রিদি ভয়ে কুঁকড়ে আছে, কোনো প্রশ্ন করার সাহসও তার হচ্ছে না। সে জানেই না তার অপরাধটা ঠিক কোথায়। কিন্তু সৌহার্দ্যের মনের ভেতর তাজওয়ানের রিদিকে কোলে নেওয়ার কথাটা বারবার দগদগে ক্ষতের মতো ফুটে উঠছে, আর প্রতিবার সেই দৃশ্য মনে আসতেই তার রক্ত যেন ফুটছে।
​আর ধৈর্য ধরে রাখা সম্ভব হলো না। সৌহার্দ্য দাঁতে দাঁত চেপে, প্রতিটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! ছোটবেলা থেকেই কি এমন বেয়াদব ছিলে? কোনো বোধবুদ্ধি নেই তোমার? কার কোলে উঠতে হয়, আর কার কোলে না—সেটা কি কখনো শেখনি? বড় হয়ে আমার কোলে ওঠার আগ পর্যন্ত কি একটু ধৈর্য ধরা যাচ্ছিল না? কতটা বেয়াদব হলে এমনটা করা যায়!”

​সৌহার্দ্যের এমন অযৌক্তিক অভিযোগ শুনে রিদি যেন পাথরের মতো জমে গেল। তার মানে, সব ঝামেলার মূলে ওই একটা ঘটনাই? সে তো ছোটবেলার কথা, রিদির নিজেরই তো মনে নেই কার কোলে উঠছে! সে যদি বুঝত যে বড় হয়ে তার জীবনে এমন একজন ‘আপদ’ জুটবে, তবে কি সে নিজের কপালে এই দুর্ভাগ্য টেনে আনত? সৌহার্দ্যের এমন হীনম্মন্যতায় রিদির ভেতরটা অভিমানে টনটন করে উঠল, কিন্তু পরিস্থিতি সামলাতে সে নিচু স্বরে কাঁপাকাঁপা গলায় মিনমিন করে বলল, “তখন… তখন তো আমি অনেক ছোট ছিলাম, আমি তো অত কিছু বুঝতাম না…”

রিদি বাক্যটি শেষ করতে পারল না, তার আগেই সৌহার্দ্য গর্জে উঠল, “জাস্ট শাট আপ, স্টুপিড!”
সৌহার্দ্যের সেই বজ্রকঠিন ধমক শুনে রিদির শরীর কেঁপে উঠল। সৌহার্দ্য নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে হাতের ইশারায় রিদিকে কাছে ডাকল। রিদি ভীরু পায়ে এগিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য আচমকা তার হাত ধরে হেঁচকা টানে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। শক্ত হাতে রিদির কোমর জড়িয়ে ধরে সৌহার্দ্য হিসহিসিয়ে বলল, “স্টুপিড মহিলা, শান্ত করো আমাকে!”
​রিদি যেন বোবা হয়ে গেল। সে সৌহার্দ্যকে কীভাবে শান্ত করবে! আমতা আমতা করে সে বলতে চাইল, “আমি… আমি কীভাবে…”
​কিন্তু তার কথা শেষ করার আগেই সৌহার্দ্য রিদির গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে আলতো চুমুর উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে বলল, “স্টুপিড, শুধু কি মুখ চালাতে পারো?”
সৌহার্দ্য রিদিকে আরও নিবিড় করে কাছে টেনে নিতেই দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। মুহূর্তের মধ্যে সৌহার্দ্যের বিরক্তি তুঙ্গে উঠল। রিদিকে ছেড়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়াল এবং রাগে বিড়বিড় করে বলল, “ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তি নেই! আমার কপালে কি বাসরও জুটবে না?”
​দরজা খুলতেই সামনে শাহেদা চৌধুরীকে দেখে সৌহার্দ্যের ভ্রু কুঁচকে গেল। শাহেদা চৌধুরী ছেলের অগ্নিশর্মা চাহনিকে উপেক্ষা করে রাগী কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “মেয়েটাকে এভাবে টেনে নিয়ে এলে কেন? কী করছিস তুই ওর সাথে? তোর এই রাগ—”

​”তোমরা কি আমাকে শান্তিতে কিছু করতে দেবে?”
মা’র কথা শেষ করার আগেই বিরক্তি ঝেড়ে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সৌহার্দ্য। এদিকে রিদি লজ্জায় লাল হয়ে সোফায় কুঁকড়ে বসে রইল।
​ছেলের এমন উগ্র আচরণের কারণ শাহেদা চৌধুরী ঠিক বুঝতে পারলেন না। তিনি রিদির পাশে গিয়ে বসে পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে মা? আমাকে বলবি? বাবু তোকে ওভাবে নিয়ে এল কেন?”
​রিদি নিজেকে সামলে নিয়ে মিনমিন করে বলল, “তেমন কিছু না আম্মু, আপনি টেনশন করবেন না। উনি একটু রেগে ছিলেন তো, তাই!”
শাহেদা চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। ছেলে ও ছেলের বউয়ের মাঝে সব ঠিক হচ্ছে—এই আশাটাই ওনার শান্তি। রিদিকে সৌহার্দ্যের সাথে এক ঘরে থাকতে দেখে তিনি ধরে নিয়েছেন ওদের মাঝে বুঝি সব মিটে গেছে। কিন্তু আজ কলেজ থেকে আসার পর সৌহার্দ্যকে যেভাবে রাগী ভঙ্গিতে রিদিকে রুমে নিয়ে আসতে দেখেছিলেন, তাতে তিনি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন! আসবে কি আসবে না—এমন দ্বিধা আর মনের অস্থিরতা নিয়েই তিনি ছুটে এসেছিলেন।

​শাহেদা চৌধুরী রিদিকে খেয়ে নিতে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যেতেই রিদি ছোটবেলার স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু সেভাবে কিছুই মনে পড়ছে না তার। রিদি বিড়বিড় করে বলল, “আমার কপালে আপদের শেষ নেই! একটা গেলে আরেকটা! ইস,অশান্তির জীবন!”
​বলেই সে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল; আপাতত কিছু খাওয়া দরকার। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। কিন্তু যা হওয়ার হবে, এই জীবনে তার ভাগ্যে শান্তি আসবে কি না—সেটা তার অজানা!
রাত তখন এগারোটা। দেয়ালঘড়ির কাঁটাটা নিরলসভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সৌহার্দ্যের ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। রিদি হাতে একটা বই নিয়ে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু চোখের পাতা অক্ষরের ওপর স্থির হতে চাইছে না। প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটা পাহাড়সম ভারী হয়ে বুকের ওপর চেপে বসছে। অকারণ অস্থিরতায় বারবার মোবাইলটা চেক করছে সে। দু-তিনবার কল দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কেবলই যান্ত্রিক নীরবতা। আজকের ঘটনাটার পর থেকে রিদির মনের ভেতর এক অজানা আশঙ্কায় কু ডাকছে।
​আর স্থির থাকতে পারল না রিদি। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। হাত কাঁপছে, তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে সৌহার্দ্যের নম্বরে আবারো ডায়াল করল সে। এবার রিং হওয়ার সাথে সাথেই কলটা রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসার আগেই রিদির উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেঙে পড়ল, “ডাক্তার সাহেব, আপনি ঠিক আছেন তো? এখনো বাড়ি ফেরেননি যে?”

​ওপাশ থেকে সৌহার্দ্যের নীরব হাসির একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল। রিদির এই তীব্র ব্যাকুলতা সৌহার্দ্যের হৃদয়ের কঠিন দেয়ালে যেন আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিয়ে গেল। বিরবির করে বলল, ‘উফ, এই পাগলিটা! আমার সহজ-সরল মনটাকে পুরো কব্জা করে নিয়েছে। এখন তো নিজের চেয়েও বেশি ওই স্টুপিড মেয়েটার কথাই আমার মনে পড়ে।’
​নিজের ভাবনাগুলো ঝেড়ে ফেলে সৌহার্দ্য শান্ত অথচ গভীর স্বরে বলল, “ডোন্ট প্যানিক, সুইটহার্ট। আই অ্যাম ফাইন।”
​রিদি খানিকটা আশ্বস্ত হলেও অভিমান ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে, “এত দেরি হচ্ছে কেন? বাসায় ফিরছেন না যে?”
​সৌহার্দ্যের ভারী কণ্ঠস্বর কানে আসতেই রিদির কান গরম হয়ে উঠল। সে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, “কেন? খুব মিস করছ আমায়? তাড়াতাড়ি ফিরলে কি কিছু মিছু খেতে দিবে? আদর করতে দেবে? এগ্রি করলে এক্ষুনি আসছি!”
​রিদির গাল লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু মনে জমে থাকা দীর্ঘদিনের আক্ষেপটা যেন হঠাৎ করেই ডানা মেলল। অভিমানী স্বরে সে কিছুটা মুখ ফুলিয়ে বলল, “আপনি তো আমাকে কখনো ‘ভালোবাসি’ বলেননি। যেদিন মন থেকে এই কথাটা বলবেন, সেদিন কিছু মিছু খাওয়ার চিন্ত করবেন। তা না হলে খেতে চাওয়ার আশা ছেড়েই দিন!”

​ওপাশে হঠাৎ করেই এক গভীর নীরবতা নেমে এল। সৌহার্দ্য যেন কথাগুলো শুনতেই পাইনি। রিদির মনে হলো, সৌহার্দ্য হয়তো গুরুত্বই দিচ্ছে না। তার অভিমান যেন মুহূর্তেই রাগে পরিণত হলো। এক ঝটকায় ফোনটা কেটে দিল সে।
​বারবার মনে হতে লাগল, একটা ‘ভালোবাসি’ বললে কি খুব ক্ষতি হয়? সব স্ত্রীই তো তার স্বামীর মুখ থেকে এই শব্দটা শোনার জন্য তৃষ্ণার্ত থাকে। সে জানে, সৌহার্দ্য এসব আদিখ্যেতা অপছন্দ করে, খুব গম্ভীর মানুষ সে। তবুও রিদির মনের কোনো এক অন্ধকার কোণে একটা ক্ষীণ আশা সবসময় বেঁচে থাকে—হয়তো একদিন, অন্তত একবার, সৌহার্দ্য বলবে—’ভালোবাসি’।
​একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বইটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে রিদি ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় বারোটা। নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা ঘর। রিভা চোরের মতো অতি সাবধানে ফারিসের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। উঁকি দিয়ে দেখল, ফারিস উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। অফিস থেকে ফিরে বাইরের খাবার খেয়েই সে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল। ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ফারিস টের পেল, তার পিচ্চি বউটি ঘরের ভেতর। কৌতূহল হলো, দেখি মেয়েটা কী করে! তাই সে ঘুমের ভান ধরে স্থির হয়ে রইল।

​রিভা পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকল। বিছানার পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল ফারিসের নিস্তব্ধতা বোঝার জন্য। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে আলতো করে বিছানায় উঠে বসল। এরপর বিড়ালের মতো নিঃশব্দে ফারিসের হাতটা সরিয়ে তার বুকের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে নিল।
​মুহূর্তের মধ্যে ফারিস তাকে জাপটে ধরল। রিভার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে! ভেবেছিলাম ভার্জিন থাকব দিলি না? এখন এই ছোট্ট শরীরে আমার পুরো ভার নিতে পারবে তো?”
​রিভা লজ্জায় আর ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে তো এত কিছু ভেবে আসেনি। মুরুব্বিদের কাছে শুনেছিল—স্বামীর থেকে দূরে থাকলে তারা নাকি পরকীয়ায় জড়ায়। এমপি দের ওপর তার এমনিতেই কিছুটা অবিশ্বাস, তাই শুধু একটু কাছে আসার অজুহাত খুঁজছিল সে।
ভাবনার রেশটুকু কাটতে না কাটতেই ফারিসের সুঠাম দেহের ভার রিভার ওপর নেমে এল। এক নিমেষে রিভার অবাধ্য ঠোঁটজোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিল ফারিস। রিভার হৃদস্পন্দন তখন যেন গলার কাছে এসে ঠেকেছে, দুহাত দিয়ে ফারিসের বুকে আলতো চাপ দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল সে, কিন্তু ফারিসের দৃঢ় আলিঙ্গনের কাছে তার সব বাধা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। দম বন্ধ হয়ে আসা সেই মুহূর্তটিতে রিভার অস্তিত্বের প্রতিটি কোণ কাঁপছিল।

​হঠাৎ ফারিস তার ঠোঁট থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। রিভার কানের কাছে মুখ এনে, তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে সে ফিসফিসিয়ে বলল, “বেবি ডল, নিজেকে কি পুরোপুরি সঁপে দেবে আমাকে? বলো… প্লিজ?”
​রিভার চাউনি তখন লজ্জায় নত। কোনো শব্দ না করে, শুধু লাজুক চাহনিতে তাকিয়ে মাথা নাড়ল সে। আর একই সাথে নিজের অস্থির হাত দুটো ফারিসের পিঠের ওপর রেখে শক্ত করে খামচে ধরল। সেই স্পর্শে ফারিসের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। রিভার গ্রীবায় মুখ গুঁজে ফারিস শুরু করল এক নেশাতুর সফর। এলোমেলো চুমুর তীব্রতায় রিভার সারা শরীর তখন শিহরণে চঞ্চল। সময়ের ঘড়ি যেন সেখানেই থমকে দাঁড়াল, আর তারা দুজনে হারিয়ে গেল এক গভীর, অজানা সুখের মায়াবী ঠিকানায়।
রাত তখন প্রায় ১টা। বিছানার এক কোণে কুঁকড়ে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে রিভা। পাশে বসে থাকা ফারিসের কপালে চিন্তার ভাঁজ, ভ্রু কুঁচকে সে তাকিয়ে আছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল মেয়েটার কান্না থামার নাম নেই। সে তো উত্তেজনার বশে নিজেকে সামলাতে পারেনি, তাই বলে এমন ‘মরা কান্না’ জুড়ে দেবে? নিজের রাগ আর বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে ফারিস ঝাঝিয়ে বলে উঠল, “পকেটে সাইজের ঝড়, আদরই তো করছি, এভাবে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছিস কেন?”
​রিভা তখন ব্যথায় নীল হয়ে আছে, শরীরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যন্ত্রণায় তার মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। এই লোকটা যে এত পাষাণ হতে পারে, তা আগে জানলে সে ভুলেও ধারেকাছে আসত না। কিছুক্ষণ আগের সেই উন্মাদনায় সে কতবার অনুরোধ করেছিল ছেড়ে দেওয়ার জন্য, কিন্তু ফারিস তাকে এক বিন্দুও ছাড় দেয়নি—

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৭

​রিভা নাক টানতে টানতে ভাঙা গলায় প্রতিবাদ করে বলল, “হাতির মত লোক, আমার সমস্ত শরীর ব্যথা বানিয়ে এখন আমাকে ধমকাচ্ছেন! আর আসব না আপনার কাছে!”
​বউ আর কাছে আসবে না—এই কথাটি শুনে ফারিস মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে গেল। তার ভেতরকার অস্থিরতা মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। সে দ্রুত রিভাকে টেনে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তার কপালে, গালে, চোখের জলে ভেজা মুখে অসংখ্য চুমু একে দিয়ে ফারিস ফিসফিসিয়ে বলল, “এমন অলক্ষণে কথা বলিস না বেবি! স্বামীর কাছে না আসলে পাপ হয়, শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here