Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৫

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৫

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৫
রিদিতা চৌধুরী

ভোরের প্রথম আলো জানালার পর্দা চিরে এসে পড়ল রিদির চোখেমুখে। ঘুমের ঘোর কাটার আগেই সে অনুভব করল বুকের ওপর ভারী কিছুর অস্তিত্ব। নিশ্বাসের সেই পরিচিত উষ্ণ ছোঁয়া রিদির ভেতরে এক তীব্র শিহরণ জাগিয়ে তুলল। চোখ মেলতেই তার হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল—সৌহার্দ্য! তার বুকের ওপর মুখ গুঁজে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে সে। রিদির একটা হাত আলতো করে সৌহার্দ্যর চুলের ভাঁজে জড়িয়ে।

​এ কি স্বপ্ন? গতরাতেই তো কথা হয়েছে, চট্টগ্রাম আসার কথা তো একবারও বলেনি সে! অবিশ্বাস নিয়ে রিদি আবার চোখ বুজল, তারপর খুলল। না, ভুল দেখছে না সে। সত্যি সত্যিই সৌহার্দ্য তার কাছেই। রিদির ঠোঁটের কোণে এক নির্মল হাসি ফুটে উঠল, আঙুলের ডগায় আলতো করে সরিয়ে দিল সৌহার্দ্যর এলোমেলো চুলগুলো। ওকে নিজের বুক থেকে সরাতেও যেন রিদির মন সায় দিচ্ছিল না। কেমন শান্তিতে ঘুমাচ্ছে!
এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর হাত বাড়িয়ে মোবাইলে সময় দেখেই রিদি চমকে উঠল। প্রায় ৮টা বেজে গেছে। সে আলতো করে সৌহার্দ্যকে সরিয়ে উঠতে গেলে, হঠাৎ তার চোখ পড়ল সৌহার্দ্যর কপাল ঘেঁষা ওই ব্যান্ডেজটার দিকে। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল! তার মানে, কাল রাতের মনের ভয়টাই সত্যি ছিল! সৌহার্দ্যর কিছু হয়েছে, এ জন্যই কাল রাতে ওসব অদ্ভুত কথা বলছিল। উঠে বসতেই আবার তার চোখ গেল হাতের ব্যান্ডেজের ওপর!
রিদি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অঝোর ধারায় কাঁদছে সে, সৌহার্দ্যর কাঁধটা দুই হাতে ধরে জোরে ঝাকুনি দিয়ে আর্তস্বরে বলে উঠল, “আপনার এমনটা কীভাবে হলো ডাক্তার সাহেব? রাতে আমাকে কিছুই বললেন না কেন?”

​রিদির ঝাকানিতেই ঘুম ভেঙে গেল সৌহার্দ্যর। দুচোখে ঘোরলাগা ঘুম, মেজাজটাও তুঙ্গে। রিদির দিকে তাকিয়েই বিরক্তিভরা কণ্ঠে ধমকে উঠল সে, “স্টুপিড মহিলা! সকাল সকাল মরা কান্না শুরু করে দিয়েছো কেন? শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না?”
​সৌহার্দ্যর ধমকে রিদি দমলো না। উল্টো আরও ঝুঁকে এসে ধরা গলায় বলল, “আগে বলুন, এমনটা কীভাবে হলো? এই জন্যই রাতে আমাকে ওসব কথা বলছিলেন?”
​এবার সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম শিখরে পৌঁছাল। ভ্রু কুঁচকে খাটের সাথে হেলান দিয়ে উঠে বসল সে। রিদির দিকে তাকাতেই তার নজর আটকে গেল—মেয়েটির মায়াভরা চোখজোড়া জলে টলমল করছে, একরাশ উদ্বেগ তার পুরো মুখ জুড়ে। হঠাতই রাগটা পানি হয়ে গেল সৌহার্দ্যর। আলতো করে রিদির গালের ওপর হাত রাখল সে, বুড়ো আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় মুছে দিল চোখের পানি। স্বরটা অস্বাভাবিক রকমের নরম হয়ে এল, “ডোন্ট ক্রাই, হার্ট। ইটস নরমাল। দেখো, কিছুই হয়নি আমার, আই এম ওকে নাউ।”

​সৌহার্দ্যর এই আদুরে স্বরও যেন শান্তি দিল না রিদিকে। গত কয়েকটা দিন ধরে তার মনের ভেতর কেমন যেন একটা অজানা ভয় কু গাইছে। সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু সৌহার্দ্য থামিয়ে দিল তাকে। গলার স্বর গম্ভীর করে বলল, “দুই দিনের মধ্যে আমরা ঢাকা ব্যাক করছি। তোমার প্রয়োজনীয় সব গুছিয়ে নাও।”
​রিদি বুঝল, এই মানুষটা তার বদলি করিয়ে ফেলেছে। তাই সে কোনো প্রশ্ন না করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। একটু উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আমরা চলে গেলে আপনার এখানে ফ্লাটটার কি করবেন? কতগুলো টাকা নষ্ট করলেন বলুন তো? ভাড়া নিলেই তো হতো, ফ্লাট কেনার দরকার ছিল কী?”
​বউয়ের এমন অবুঝ প্রশ্নে সৌহার্দ্য আবারও বিরক্ত হলো। কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল, “স্টুপিড মহিলা, ঢাকাতে আমার কতগুলো ফ্লাট খালি পড়ে আছে তুমি জানো? আর তুমি এখানে একটা ফ্লাট নিয়ে টেনশন করছো?”

​রিদির মাথায় হঠাতই দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। একটু জ্বালাতন করার জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখটা গোমড়া করে বলল, “আপনার তো টাকার পাহাড়! তবুও তো খাওয়ানোর ভয়ে একটা মাত্র বউকে মেনে নেন না? পেঁচা মুখো লোক! বলেই মুখটা ভার করে নিল!
​সৌহার্দ্য এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত। রিদির দিকে কঁপাল কুচকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! তুমি না খেয়ে আছ? আর সারাক্ষণ এত মুখ চালাও কীভাবে?”মুখ বন্ধ করবে তোমার? বলেই অগ্নির দৃষ্টিতে তাকাল রিদির দিকে!
​রিদি সে দিকে পাত্তা না দিয়ে উল্টো রেগে গিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। কোমরে দুই হাত দিয়ে সৌহার্দ্যর দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, “রাতে তো ভালোবাসা মিশিয়ে কথা বলছেন, যেন আমাকে ছাড়া জান চলে যাচ্ছে? রাতে ভালোবাসা দেখান!সকাল হতেই এমন ছেঁচড়ার মতো ব্যবহার করছেন কেন?”
​সৌহার্দ্যর বিরক্তির পারদ যেন আরও একদফা চড়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে, রাগী দৃষ্টিতে রিদির তাকিয়ে সে বলল, “স্টুপিড মহিলা! ভালোবাসা তো রাতেই দেখাতে হয় না? তাছাড়া তুমি এমনি তে বেশিক্ষণ ভালোবাসা হজম করার মতো মহিলা নও!”

সর সামনে থেকে বলেই পাশ ফিরে শুয়ে যাবে তার আগে ​রিদি রাগে-দুঃখে গজ গজ করতে লাগল, “আমার মতো পিচ্চি একটা মেয়েকে কোন দিক থেকে আপনার মহিলা মনে হয়? সারাক্ষণ ‘মহিলা, মহিলা’ বলে মুখের ফেনা তুলে ফেলেন—পেঁচার মুখওয়ালা বুড়ো লোক!”
​সৌহার্দ্য আর সহ্য করতে না পেরে অগ্নি দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বলল, “সব দিক থেকেই মহিলা মনে হয়!” শুধু মহিলা না বোয়দব মহিলা!বলেই ‘ঢাস’ করে বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে দিল। রিদি সেদিকে তাকিয়ে রাগে ফুসতে লাগল।
সকাল প্রায় এগারোটা। চেম্বারে বসে রোগী দেখায় ব্যস্ত সৌহার্দ্য। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠতেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে গেল তার—ফারিসের ফোন। একহাতে ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ফারিসের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, “সৌহার্দ্য, আমি কালকে হাসপাতালের পার্কিং ফুটেজ ভালো ভাবে চেক করছি, তবে সেখানে তুই বের হওয়ার আধা ঘণ্টা আগের ফুটেজ মিসিং!”

​সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত স্থির হয়ে ভাবল। ফোনের ওপাশ থেকে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্যটা হজম করে সে শান্ত গলায় বলল, “আমার আইডিয়া তাহলে সঠিক, কেউ প্লান করে করছে সবটা!”
​ফারিস উদিগ্ন কণ্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করল, “হঠাৎ তোকে মারতে চাইছে কেন? এতদিন তো তোর ক্ষতি করার মতো কিছু করেনি, তাদের টার্গেট শুধু রিদিকে আলাদা করা ছিলো!”
​সৌহার্দ্য অনেকক্ষণ ভেবে নিয়ে শান্ত গলায় জবাব দিল, “ওরা বুঝে গেছে আমার থেকে ওকে ছাড়ানো সম্ভব না! আমার কাছে যেহেতু সব প্রমাণ আছে, ওই ভিডিও এখন ওদের জন্য ভেলুহীন হয়ে গেছে!”
​ফারিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে সৌহার্দ্যর কথার সাথে সায় দিয়ে বলল, “ওকে, তুই সাবধানে থাক ভাই। বাড়ির ভিতরের সাপটাকে আপাতত খুঁজে বের করা বেশি জরুরি হয়ে গেছে!”

​ফারিসের সাথে কথা শেষ করে সৌহার্দ্য ফোনটা রাখল। মাথার ভেতর জমানো হাজারো দুশ্চিন্তার জটগুলো এক নিমেষে ঝেড়ে ফেলে সে আবারও রোগীর দিকে মনোযোগ দিল।
কালো স্যুট পরে পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় বসে আছে মাঝবয়সী এক লোক, চোখেমুখে তার ধূর্ততার ছাপ। তার ঠিক সামনেই রাগে ফুঁসছে এক যুবক; রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে, যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে চাইছে সে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর যুবকটি গর্জে উঠল, “কতবার বলা হয়েছে আপনাদের—সৌহার্দ্যর কোনো ক্ষতি করা যাবে না! তাহলে কেন এমন করলেন? উত্তর দিন, ড্যাম ইট!”
​মাঝবয়সী লোকটি কিছু বলার আগেই আরেকজন যুবক ঘরে ঢুকে শীতল গলায় বলে উঠল, “আমি করিয়েছি এসব। ওই মা..র্বোড বেশি বেড়ে গেছে, ওকে মর…”

​কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রথম যুবকটি বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে গিয়ে তার কলার চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল, “আমার ভাইকে নিয়ে একটা বাজে কথা বললে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে নেব, বাস্টার্ড!”
​সামনে বসা মাঝবয়সী লোকটি হাতের ইশারায় ওদের থামিয়ে দিয়ে শীতল স্বরে বলল, “আহ্, থামবে তোমরা? আর কী ‘ভাই-ভাই’ লাগিয়েছে! তোমার ওই বেয়াদব ভাই যদি জানে তুমি এত অপকর্ম করো, তবে কি তোমাকে ছেড়ে দেবে? আর তোমার বাবার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। উনি স্পষ্ট বলেছেন—নিজেদের বাঁচার জন্য দরকার পড়লে সৌহার্দ্যকে মরতে হবে। সৌহার্দ্যর হাতে অনেক প্রমাণ চলে গেছে; এই ধুরন্ধর ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখলে আমাদের বরবাদ হতে সময় লাগবে না। আর ওই এমপির বাচ্চা তো একটা বদের হাড্ডি, সেটার একটা ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে।” আমাদের কোটি টাকার মাল পুলিশকে ধরিয়ে দিছে!
​এতসব কথা শুনেও যেন যুবকটির বিন্দুমাত্র হেলদোল হলো না। সে মাঝবয়সী লোকটির চোখের দিকে আঙুল তাক করে কঠোর স্বরে বলল, “সৌহার্দ্যর গায়ে একটা ফুলের আঁচড়ও যদি লাগে, তবে আমি আমার বাপকেও ছাড়ব না, মাইন্ড ইট!”

বলেই সে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
​যুবকটি চলে যেতেই অন্য যুবকটি রাগে হিসহিসিয়ে উঠল, “ড্যাড, যেভাবে হোক আমার মিষ্টিকে চাই, এন্ড এনি কস্ট!”
​ছেলের এমন পাগলামিতে মাঝবয়সী লোকটি বিরক্ত হয়ে বলল, “একটা মেয়েকে নিয়ে এমন পাগল হচ্ছ কেন? মাথায় রাখো, ওই মেয়েকে আমাদের কেন দরকার!”
​বাবার কথায় যুবকটি যেন রাগের আগুনে জ্বলে উঠল। সামনে যা পেল, তা-ই সজোরে আছাড় দিয়ে চুরমার করে দিল সে। চিৎকার করে বলল, “তোমাদের যা চাই, সেটা আমি তোমাদের বুঝিয়ে দেব! কিন্তু আমার মিষ্টির যেন কোনো ক্ষতি না হয়! ওর কিছু হলে আমি সব ধ্বংস করে দেব। আগুন জ্বালিয়ে দেব তোমার এই সাম্রাজ্যের মধ্যে। আর ওই সৌহার্দ্য চৌধুরীকে আমি নিজের হাতে খুন করব! এত কষ্ট করে আগলে রাখা আমার পাখিকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য!”​বলেই সে রাগী পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সকাল থেকে রিভা বোধহয় হাজারবার ফোন করেছে ফারিসকে। প্রতিটিবারই ওপাশ থেকে ভেসে এসেছে সেই পরিচিত বিজি টোন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল রিভার, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে একপর্যায়ে বিড়বিড় করে উঠল, “নির্লজ্জ এমপি! কার সঙ্গে এত কথা বলছেন আপনি বউ রেখে?”

​বলতে বলতেই আরও একবার কল দিল সে। এবার রিং হওয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ফারিসের গমগমে কণ্ঠস্বর, “কী চাই তোর? শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, এমন জ্বালিয়ে মারছিস কেন? কাজ করতে দিবি না আমাকে?”
​রিভা এসব ধমকে বিচলিত হওয়ার পাত্রী নয়। রাগে তার শরীর কাঁপছে, ঝনঝনে গলায় বলে উঠল, “একটু রাগ দেখিয়েছি বলে পরকীয়া শুরু করে দিয়েছেন ফারিস ভাই? এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলেন?”
​ওপাশ থেকে ফারিস যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়! সকাল থেকে ফাইল আর মিটিংয়ের চাপে নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই, আর এই মেয়ে তাকে কি না বলছে পরকীয়া করছে! প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ করে ফারিস গর্জে উঠল, “পকেট সাইজের ঝড়, তোর বাপের সঙ্গে পরকীয়া করছি!শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, উল্টাপাল্টা এলিগেশন দিলে থাপ্পড় মেরে ফোকলা দাঁত ফেলে দেব!”
​রিভা মুহূর্তেই কাঁদ-কাঁদ মুখ বানিয়ে ফেলল, “এমপিরা চরিত্রহীন হয়, আমি জানি। একদম বিশ্বাস করি না আপনাকে আমি!”

​ফারিস যেন রাগে ফেটে পড়ার অপেক্ষায় ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “অভদ্র, শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে! তোকে একবার হাতের কাছে পাই, তারপর ‘চরিত্রহীন’-এর ডেফিনিশন বুঝিয়ে দেব আমি!”
​বলেই সে ‘ঢাস’ করে ফোনটা কেটে দিল।
​ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রিভা একটা ভেংচি কাটল। রাগে গজগজ করতে করতে বলল, “বুইড়া এমপি! আমার মতো একটা পিচ্চি মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে এখন আবার ভাব দেখাচ্ছে! একদম বাল্যবিবাহের মামলা ঠুকে দেব! জনসভায় দাঁড়িয়ে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ভাষণ দেয়, আর এদিকে নিজে বাল্যবিবাহ করে বসে আছে!”

​নিজের ওপর অভিমান আর ফারিসের ওপর রাগে দুপদাপ পা ফেলে রিভা রুমের ভেতর ঢুকে গেল।
রাত প্রায় নয়টা। সৌহার্দ্যের ফ্ল্যাটের সোফায় গা এলিয়ে টিভি দেখছে রিদি। আজ সকাল থেকেই মনটা ভীষণ অস্থির। সৌহার্দ্য হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাকে এখানে রেখে গেছে, ট্রান্সফারের কারণে রিদির কলেজ এখন বন্ধ। একা একা সময় কাটানো যে কতটা দুর্বিষহ, তা আজ হাড়েমজ্জায় টের পাচ্ছে সে। ওই বাসায় থাকলে, তবে রিভার আড্ডা দেওয়া যেত! সেই একঘেয়েমি কাটাতে সারাটা দিন সে ফ্ল্যাটটা গুছিয়েছে, সৌহার্দ্যের পছন্দের খাবারগুলো নিজ হাতে রান্না করে সাজিয়ে রেখেছে। ভেবেছিল, দুপুরেই হয়তো সৌহার্দ্য ফিরবে, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা নয়টার ঘর পার হয়ে গেলেও সৌহার্দ্যের কোনো সাড়া নেই।
​অভিমান আর উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়ে রিদি মাত্র ফোনটা হাতে নিয়েছে কল করার জন্য, ঠিক তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠল। দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলতেই রিদির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য—পরনের কালো শার্টটা ভিজে থকথকে, ফর্সা মুখটা অতিরিক্ত ক্লান্তিতে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মানুষটাকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে রিদির সব রাগ নিমেষেই জল হয়ে গেল।
​সৌহার্দ্য ক্লান্ত দৃষ্টিতে রিদির দিকে একবার তাকিয়ে নিজের মোবাইলটা আর ল্যাপটপটা তার দিকে এগিয়ে দিল। কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে সোফায় শরীর এলিয়ে দিল সে। রিদি উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার গলায় বিরক্তির সুর, “গোসল করোনি? সকালের পোশাক কেন এখনো?”

​রিদি খানিকটা আহত হলেও বিরক্তি নিয়ে জবাব দিল, “আপনি আমাকে পোশাক আনার টাইম দিয়েছেন? সকাল থেকে ঘরেটা গুছিয়ে শরীরটা ঘামে কেমন গন্ধ হয়ে আছে জামার জন্য গোসল করতে পারিনি !”
​সৌহার্দ্যের মেজাজ যেন এক মুহূর্তেই তিরতিরে হয়ে উঠল। সে ধমকের স্বরে বলে উঠল, “তোমাকে এসব আজেবাজে কাজ করতে কে বলেছে? সারাক্ষণ যে সময় এসব কাজে নষ্ট করো, সেই টাইমে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া যায় না, স্টুপিড? যাও রুমে, কাবার্ডে তোমার সবকিছু রাখা আছে!” বলেই ক্লান্তিতে চোখটা বন্ধ কারে নিলো! রিদি অবাক হলেও সৌহার্দ্যর মেজাজের পারদ দেখে কিছু বলল না!
রিদি রুমে এসে আলমারিটা খুলতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। আলমারির অর্ধেক অংশ জুড়ে সারিবদ্ধভাবে ঝোলানো শ’খানেক শাড়ি। সাধারণ সুতি থেকে শুরু করে জমকালো সিল্ক—প্রতিটিই যেন একেকটা শিল্পকর্ম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সবগুলোর রং একটাই—কলাপাতা সবুজ। শাড়ির পাশাপাশি ম্যাচিং গয়না, , থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সবকিছু এমন নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখা হয়েছে যে রিদির চোখ কপালে উঠল।
​মনে মনে বিরক্তি চেপে সে বিড়বিড় করল, ” পেঁচা মুখো ডাক্তার আস্ত একটা কলাগাছ তুলে এনে আলমারিতে ভরে রেখেছে? এক রঙের এত শাড়ি কে পরে ভাই?”

​রিদি যখন নিজের ভাবনায় মগ্ন, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়াল। রিদির শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার কানের কাছে মুখটা নিয়ে এল। সৌহার্দ্যের কণ্ঠস্বর এখন এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন ঘোর নিয়ে ঝরে পড়ল, ‘‘পছন্দ হয়নি?’’
​সৌহার্দ্যের শরীর থেকে আসা তীব্র উষ্ণতা আর তার নিশ্বাস রিদির উন্মুক্ত ঘাড়ের কাছে এসে মৃদু ঢেউ তুলছে। রিদি চোখ বুজল, তার গলার স্বর কাঁপা কাঁপা শোনাল, ‘‘এত সব শাড়ি… কেন? এখন শাড়ি পরেই থাকতে হবে?’’
​সৌহার্দ্য রিদির আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। এবার তার ফিসফিসে কণ্ঠস্বর আরও গভীর, আরও প্রলুব্ধকর, ‘‘শাড়ি খুলতে সহজ, সুইটহার্ট!’’

কথাটি বলেই সে রিদির কানের লতিতে আলতো করে একটা কামড় বসিয়ে দ্রুত সরে গেল।
​রিদির নিশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। বুকের ভেতরে হৃৎস্পন্দন দ্রুতলয়ে আছড়ে পড়ছে, আর সর্বশরীরে এক অজানা শীরশিরানি ছড়িয়ে পড়ছে। লজ্জায় রিদির শ্যাম বর্ণের মুখটা যেন রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। সে এক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর সৌহার্দ্য একটু দূরে দাঁড়িয়ে শিকারি দৃষ্টিতে ঠোঁট কামড়ে দাড়িয়ে তার বউকে পর্যবেক্ষণ করছে!
​রিদি অস্বস্তি আর উত্তেজনায় দ্রুত হাত বাড়িয়ে আলমারি থেকে একটা সুতির শাড়ি টেনে নিয়ে বাথরুমে ঢুকল। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে উঠল, ‘‘ইস! আমার এই অসভ্য ডাক্তার মোটেও সুবিধার না, একেবারে আস্ত একটা লুতুপুতু!’’ বলেই লজ্জায় সে দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে ফেলল।
​রিদি বাতরুমে চলে যেতেই সৌহার্দ্য একরাশ বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে তাকাল। নিজের হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতে সে বিড়বিড় করে উঠল, ‘‘স্টুপিড মহিলা! ধরা ছোঁয়ার আগেই দেখি সব কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়!’’

বিছানায় আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে ডুবে ছিল সৌহার্দ্য। ঠোঁট জোড়া কামড়ে ধরে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে সে কোনো এক জটিল কাজে মগ্ন, চারপাশটা যেন তার কাছে অস্তিত্বহীন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাথরুমের দরজা খোলার মৃদু শব্দ ভেসে এলো। সৌহার্দ্য স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই চোখ তুলল, কিন্তু পরক্ষণেই তার পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেল এক সেকেন্ডের জন্য।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৪

​হৃদস্পন্দনটা বুকের ভেতর প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল তার। হাত থেকে ল্যাপটপটা সশব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ল, কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই সৌহার্দ্যের। সে যেন এক অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টি নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রমণীর দিকে—নিশ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেছে সে।”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here