অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৪
রিদিতা চৌধুরী
সৌহার্দ্যের সেই আকস্মিক ও গভীর চুম্বনের রেশ না কাটতেই রিদির মস্তিষ্ক যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের চারপাশের বাতাস তার কাছে হঠাৎই ভারী আর অসহ্য মনে হতে লাগল। হৃদপিণ্ডের সেই উদ্দাম ধুকপুকানি, সৌহার্দ্যের বুকের উষ্ণতা আর নিজের অস্তিত্বের এই অদ্ভুত দোলাচল—সব মিলিয়ে এক তীব্র ঘোর আর তীব্র অস্বস্তিতে রিদি যেন হারিয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এল। সৌহার্দ্যের শক্ত আলিঙ্গনের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই রিদির হাতটা অকারণেই কেঁপে উঠল। পরের মুহূর্তেই এক গভীর অন্ধকারের অতলে তলিয়ে গেল সে।
রিদির নিস্তেজ শরীরটা নিজের বুকের ওপর লুটিয়ে পড়তেই সৌহার্দ্যের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে রিদিকে আলগা করে ধরে মুখে আলতো চাপড় দিয়ে ডাকল, “কী হলো হার্ট? ওপেন ইউ আইজ!”
রিদি সাড়াহীন, দেখে সৌহার্দ্য বুঝল—মেয়েটা সম্ভবত এই আকস্মিক আবেগের তীব্রতা নিতে পারেনি। সে বিরক্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! সামান্য একটা চুমুর ধাক্কাও সামলাতে পারল না!”
একটু বিরক্ত হয়েই সে রিদিকে বিছানায় শুইয়ে দিল। পাশের বইপত্রগুলো সরিয়ে আলতো হাতে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে দিল সে। এসির তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে দিয়ে আবার নিজের ল্যাপটপে মনোযোগ দিল সৌহার্দ্য। কালই তাকে ঢাকা যেতে হবে। আপ্রাণ চেষ্টা করছে রিদিকে তার পুরনো কলেজে ট্রান্সফার করে নিয়ে ফিরে যেতে; চট্টগ্রামে এভাবে বন্দী হয়ে থাকাটা তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঢাকাতে তার সব কিছু। মেডিকেল কলেজের কঠোর নিয়ম আর পড়াশোনার চাপের কারণে কর্তৃপক্ষ সহজে রাজি হচ্ছে না, তবুও সৌহার্দ্য নিজের ক্ষমতা আর প্রভাব খাটিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতিটা সহজ করার জন্য।
সকালের মিষ্টি রোদের ঝিলিক জানালার ফাঁক গলে রিদির মুখে এসে পড়ল। চোখের পাতা কাঁপিয়ে সে যখন ঘুম ভাঙল, মনে হলো কেউ যেন তাকে সাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। হালকা শরীর ঘুরিয়ে তাকাতেই রিদির দৃষ্টি আটকে গেল—সৌহার্দ্য তাকে পেছন থেকে এক হাতে কোমরে জড়িয়ে ধরেছে, আর নিজের পা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে রিদির পা দুটি। অদ্ভুত এক নির্ভরতার আরামে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সৌহার্দ্য।
রিদি একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল মানুষটার দিকে। কি শান্ত, কি মায়াবী দেখাচ্ছে লোকটাকে! ঘুমের মধ্য ও মুখটাকে কেমন পেঁচার মত করে রেখেছে! রিদির ভীষণ হাসি পেল, হঠাৎই গতকাল রাতের সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই লজ্জায় রিদির দুই গাল রাঙা হয়ে উঠল। মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল সে, “ইশ্, নির্লজ্জ বেহায়া ডাক্তার!”
বলেই আলতো করে সৌহার্দ্যের হাতটা নিজের কোমর থেকে সরিয়ে দিতেই সৌহার্দ্য ঘুমের ঘোরেই বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। রিদি বিছানার পাশ থেকে নিজের উড়নাটা নিয়ে সাবধানে পা টিপে টিপে বিছানা ছেড়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
ঘড়িতে তখন সকাল আটটা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের স্নিগ্ধ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে রিদির মনে হচ্ছিল, গতকালের সেই সংশয়গুলো যেন এক নিমেষেই ধুয়ে মুছে গেছে। সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে, এই মানুষটার মুখ থেকে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শোনার অপেক্ষায় থাকলে তাকে হয়তো সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিতে হবে! না বলবে ভালোবাসি, না বলবে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেবে- আর না, তাকে ছাড়তে রাজি হবে!সম্পর্কটা এভাবেই বয়ে চলবে। তবুও, এই অদ্ভুত নিয়মহীন সংসারের সুরটা বোধহয় এভাবেই বাঁধা।
ভাবনার রেশটুকু ঝেড়ে ফেলে রিদি যখন রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখা গেল রায়েদা শেখের বাসার কাজের বুয়া দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে রায়েদা শেখের পাঠানো খাবারের বক্সটি রিদির হাতে তুলে দিলেন। এরপর ঘরে ঢুকে চটজলদি সবকিছু গুছিয়ে রেখে সৌহার্দ্য উঠার আগেই দ্রুত বেরিয়ে গেলেন তিনি।
রিদি খাবারের বক্সটি খুলতে যাবে, ঠিক তখনই আড়মোড়া ভেঙে ঘুম ঘুম চোখে সৌহার্দ্য ডাইনিং রুমে এসে চেয়ার টেনে বসল। তার মুখাবয়বে পাথরের মতো শীতল ভাব, যেন কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব নয় ভেতরে কী চলছে। গতকাল রাতের সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই রিদির দুই গাল লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল; সৌহার্দ্যের চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহসটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে।
টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে রিদির হাত কাঁপছিল। সৌহার্দ্য একদৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “আজ কলেজ যাবে?”
রিদি প্লেটে পরোটা আর মাংস বাড়িয়ে দিতে দিতে নিচু স্বরে উত্তর দিয়ে বলল, “হুম, যাবো।”
সৌহার্দ্যের চোখেমুখে প্রতিদিনের মতোই একরাশ বিরক্তি। গমগমে স্বরে সে নির্দেশ দিল, “ওকে দেন, যাওয়ার পথে তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাব। কফি দাও, এসব খাব না। তুমি দ্রুত খেয়ে নাও।”বের হতে হবে!
রিদি কফির মগটি এগিয়ে দিতে দিতে দ্বিধাভরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
কফিতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে সৌহার্দ্য নির্বিকার গলায় বলল, “ঢাকা ফিরতে হবে। তোমার ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করব।” আমার ইমার্জেন্সি রেগি’র (ওটি) আছে!
খবরটা শুনেই রিদির মনটা বিষণ্নতায় ছেয়ে গেল। একটু অভিমানী গলায় সে বলল, “আমি এখানেই থাকি, আমার চট্টগ্রামটা খুব ভালো লাগে।”
কথাটা শেষ না হতেই সৌহার্দ্যের কপালে বিরক্তির ভাঁজ গভীর হলো। ধমকের সুরে সে বলে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! একা এখানে কার কাছে থাকবে? খালামণি তো কদিন পরেই লন্ডন চলে যাবে।”
রিদি আর কথা বাড়াল না। সে জানে, এই মানুষটার সাথে যুক্তি দিয়ে জেতা অসম্ভব, উল্টো ধমক খাওয়ার ভয়টা তো আছেই। চুপচাপ খাওয়া শেষ করে সৌহার্দ্যের সাথে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল সে, সৌহার্দ্য রিদিকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো!
সকাল এগারোটা। খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে মোবাইল স্ক্রল করছিল আরবান। সারারাত নাইট ডিউটি করে এসে ভোর পাঁচটায় ঘুমিয়েছিল সে, কিন্তু স্বভাবমতোই এগারোটা বাজতে না বাজতেই ঘুম ভেঙে গেল। হঠাৎ বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে আরবান ফোনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই থমকে গেল যেন পুরো পৃথিবীটা!
ভেজা লম্বা চুলগুলো হাত দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল পৃথা। রূপালি জলের ফোঁটাগুলো তার চুলে আটকে থেকে যেন মুক্তোর মতো ঝিলিক দিচ্ছে। এমন স্নিগ্ধ, সিক্ত রূপে তাকে আজ অপার্থিব সুন্দর লাগছে। আরবানের চোখের পলক ফেলার কথা যেন মনেই রইল না। সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রইল সে। হঠাৎ পৃথা বুঝতে পারল কেউ তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে। আরবানের দিকে চোখ পড়তেই পৃথা থমকে গেল, লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে দ্রুত নিজের বুকের ওড়নাটা টেনে ঠিক করে নিল।
আরবান নিজের ভুল বুঝতে পেরে গলা খাঁকারি দিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঢোক গিলে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আজ কলেজে গেলে না যে?”
পৃথা একটু ইতস্তত বোধ করল। নিচু স্বরে বলল, “শরীরটা একদম ভালো লাগছে না। তাছাড়া ভাবীও তো অসুস্থ। শুনলাম আজ সৌহার্দ্য ভাইয়া আসবে, তাই রান্নাবান্নার অনেক ঝামেলা। ভাবী এই শরীর নিয়ে পারবেন না, মা তাই আমাকে যেতে বারণ করলেন।”
পৃথার কথায় আরবানের ভেতরটা একটু বিরক্তিতে ভরে উঠল। তার মায়ের এই চালাকিগুলো সে খুব ভালোভাবেই চেনে— প্রতিদিন কোন না কোন অজুহাতে পৃথার পড়াশোনায় বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। আরবান শান্ত হয়ে পৃথাকে হাতের ইশারায় নিজের কাছে ডাকল। পৃথা দ্বিধা কাটিয়ে এগিয়ে আসতেই আরবান তাকে আলতো করে নিজের পাশে বসিয়ে নিল। কাঁধ জড়িয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে আদুরে স্বরে ফিসফিস করে বলল, “দেখো পৃথা, কারও কথায় নিজের পড়াশোনার সাথে কখনো আপস করবে না। আর ভাইয়া এমনিতে খুব কম খায়, খুঁতখুঁতে স্বভাবের। এত আইটেম রান্না করে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার একদম প্রয়োজন নেই। সাধারণ রান্নার সাথে ভাইয়ার পছন্দের দুটো ডিশ বানিয়ে দিলেই চলবে।”
আরবানের আশ্বাসে পৃথার আড়ষ্টতা কিছুটা কমল। সে মৃদু মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আরবান একদৃষ্টিতে পৃথার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “আমার লাজুক লতা!”
সৌহার্দ্য চট্টগ্রামে নেই প্রায় এক সপ্তাহ। এই সাতটি দিন যেন থমকে আছে রিদির জীবনে। দুজনের মাঝে যোগাযোগ বলতে প্রায় কিছুই নেই; যাওয়ার পরদিন সৌহার্দ্য একবার ফোন করেছিল, তারপর থেকে নীরবতা। রিদিও অভিমান করে ফোন করেনি, তবে ফোনে হাতে বার বার চেক করছে, অপেক্ষা করছে যেন এই বুঝি সৌহার্দ্যর নাম্বার থেকে কল এল! কিন্তু সৌহার্দ্য কোনো রকম সাড়াশব্দ দেয়নি।
রাত বারোটা। পড়ার টেবিলে বসে আছে রিদি, কিন্তু বইয়ের পাতায় তার মন নেই। বুকের ভেতরটা যেন কেমন ছটফট করছে, অকারণে অস্থিরতায় মন কোথাও শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না। নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে সৌহার্দ্যের নামটা ভেসে উঠতেই রিদির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সমস্ত অভিমান ভুলে সে দ্রুত ফোনটা কানে নিল।
কিন্তু ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটা শুনেই রিদির রক্ত হিম হয়ে এল। সৌহার্দ্যের কণ্ঠস্বর কেমন যেন ভাঙা ভাঙা, অদ্ভুত এক অবসাদ তাতে।
”আ- আই মিস ইউ, সুইটহার্ট!”
সৌহার্দ্যের গলার স্বরটা ঠিক স্বাভাবিক লাগছে না, যেন কোনো গভীর যন্ত্রণায় সে পিষ্ট হচ্ছে। রিদির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে দ্রুত বলে উঠল, “কী হয়েছে আপনার, ডাক্তার সাহেব? এমন করে কথা বলছেন কেন? আপনি ঠিক আছেন তো?”
সৌহার্দ্য রিদির কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। ম্লান স্বরে সে বলে চলল, “তোমার সাথে যদি আর কখনো দেখা না হয়, আমাকে মনে রাখবে তো, লক্ষ্মীটি?, তুমি অন্য কারো হয়ে যেও না— প্লিজ আমার হয়েই থেকে যেও।ইউ আর আ পার্ট অব মাই হার্ট !”
সৌহার্দ্যের প্রতিটি শব্দ যেন রিদির বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল। একটা তীব্র ধক করে ওঠা শব্দে রিদির হৃৎপিণ্ড যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সৌহার্দ্যের কণ্ঠে লেগে থাকা এই অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর আকুতি রিদির মনের ভেতরটা ওলটপালট করে দিচ্ছে। এক অজানা আতঙ্কে তার চারপাশটা যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। রিদির তীব্র সন্দেহ হতে লাগল, নিশ্চয়ই সৌহার্দ্য এই মুহূর্তে বড় কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। তার পায়ের তলার মাটিটুকু বুঝি এই মুহূর্তেই সরে যাচ্ছে, আর চারপাশটা ঘিরে ধরছে এক অজানা আশঙ্কার গভীর অন্ধকার। রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারলো না,
কান্নায় ভেঙে পড়ে রিদি কোনোমতে ফুঁপিয়ে বলল, “ডাক্তার সাহেব, আপনি এসব কী বলছেন? আপনার কী হয়েছে? আপনি কোথায়? আমি…”
রিদির অস্থিরতা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে সৌহার্দ্যের শান্ত, স্বাভাবিক কণ্ঠ ভেসে এল, “ডোন্ট প্যানিক। আই এম ওকে হার্ট।”
কিন্তু রিদির মনে কোনোভাবেই শান্তি ফিরছিল না। কান্নার তোড়ে তার কথা আটকে আসছিল, সে অধৈর্য হয়ে প্রায় আর্তনাদের মতো করে বলল, আ- ” আ-আমি আপনাকে দেখতে চাই! এ- এক্ষুনি ভিডিও কল দিন, প্লিজ!” আ…
রিদির অনুরোধ ফুরোনোর আগেই সৌহার্দ্যের ভিডিও কল এল। রিদি বিদ্যুদ্বেগে রিসিভ করতেই স্ক্রিনে ফুটে উঠল সৌহার্দ্যের কিছুটা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত এক মুখ। সে গড়ির সিটের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে।অন্ধকারে ঝাপসা মুখটা ভালো বুঝা যাচ্ছে না, তবুও রিদি সৌহার্দ্যকে চোখের সামনে সুস্থ অবস্থায় দেখে রিদির আটকে থাকা শ্বাসটা যেন বেরিয়ে এল। কান্নায় তার মুখশ্রী ততক্ষণে লাল হয়ে গেছে। কান্নার তোপে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, সমানে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে মেয়েটো!
সৌহার্দ্য নিজের বউ এর এই পাগলামি দেখে ঠোঁট কামড়ে একটু হাসল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল, “এত ভালোবাসেন আমায়, মিসেস সৌহার্দ্য চৌধুরী?”
সৌহার্দ্যের মুখে নিজের নামের সাথে ওই উপাধিটি শুনতে পেয়ে রিদির হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত পাগলামি, কান্নাকাটি আর উদ্বেগের কথা মনে পড়ে গেল। লজ্জা আর অভিমানে রিদির মুখটা যেন পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জায় নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। কিছুতে সৌহার্দ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছেনা, ইস কিভাবে এতক্ষণ পাগলামি করছে মনে আসতেই লজ্জায় কুঁকুড়ে গেল!
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে, সেই চিরচেনা বিরক্তি নিয়ে ধমকে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! তাকাও আমার দিকে।” ওটা সরাও মুখ থেকে!
রিদি হাত সরিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল, “হার্টলেস ডাক্তার! দুই মিনিটেই আপনি একদম পাল্টে যান। একটু বেশিক্ষণ কি ভালো কিছু বলতে পারেন না? মনে হয় ভালো কিছু বললেই আপনার জাত চলে যাবে!”
অভিমান আর লজ্জার মিশ্রণে কথাটা বলেই রিদি ফোনটা ঠাস করে কেটে দিল। কিন্তু ফোনের ওপাশে তার হৃদপিণ্ড তখনও অকারণে দ্রুত তালে ধুকপুক করছিল।
রিদি ফোনটা কেটে দিতেই সৌহার্দ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। আজকের দিনটা তার জীবনের শেষ দিন হতে পারত। এই চিন্তাটা তার মনের গভীরে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে দিচ্ছে। সৌহার্দ্যের মতো একজন শক্তপোক্ত, আত্মবিশ্বাসী পুরুষের হৃদপিণ্ড যে এভাবে ভয়ে কাঁপতে পারে, তা আজ সে নিজেই প্রথম অনুভব করল।সৌহার্দ্য চোখ বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে ফিসফিস করে বলল, মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না হার্ট, তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবীটা আমার কাছে অর্থহীন। আর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তোমাকে একা রেখে যাওয়ার কথা ভাবলেও আমার কলিজা ছিঁড়ে আসে। তুমিই তো আমার বেঁচে থাকার একমাত্র স্পন্দন, মাই হার্ট!'”
ঘটনাটা ঘটেছিল কিছুক্ষণ আগেই। একটা জটিল ওটি (অপারেশন থিয়েটার) শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল । হাইওয়েতে গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ সৌহার্দ্য অনুভব করল, তার গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না। স্টিয়ারিং হুইলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে, গাড়িটা যেন কোনো এক অশুভ গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে। সেই মুহূর্তের জন্য সৌহার্দ্যের মস্তিষ্কের সব বোধ যেন স্থবির হয়ে গিয়েছিল। সে শুধু একটা কথাই ভেবেছিল—আজকের এই বিদায়ের পর হয়তো রিদির সাথে তার আর কোনোদিন দেখা হবে না।
মৃত্যুর সেই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও সৌহার্দ্যের মাথায় কেবল রিদির কথাই ঘুরছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যদি আজ চলে যায়, তবে রিদি হয়তো অন্য কারো হয়ে যাবে, তাকে চিরতরে ভুলে যাবে। এই তীব্র আশঙ্কা আর যন্ত্রনা তাকে যেন ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। নিজেকে স্থির রাখার শেষ চেষ্টাটুকু করে সে গাড়িটাকে রাস্তার পাশে একটি বড় গাছের সাথে ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে দেয়। প্রচণ্ড গতির ধাক্কায় গাড়িটা দুমড়েমুচড়ে গেলেও সৌহার্দ্য ভাগ্যক্রমে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। শরীরে সামান্য আঘাত আর যন্ত্রণা থাকলেও, প্রাণে সে রক্ষা পেয়েছে—
রাত প্রায় দুটো। রিভার দুচোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে ক্লান্ত সে, কিন্তু মনটা যেন অবাধ্য ঘোড়ার মতো ছুটছে। বারবার হাতের মোবাইলটার দিকে তাকাচ্ছে রিভা। ঠিক এক সপ্তাহ হলো ফারিসের কোনো খবর নেই। যে মানুষটা এতদিন দিনের চব্বিশ ঘণ্টায় হাজারবার কল কিংবা মেসেজ দিয়ে অস্থির করে তুলত, সে আজ সাত দিন ধরে সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ। রিভার জন্য এই নীরবতা মেনে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ অদ্ভুত এক দোটানায় সে আজ বড়ই অসহায়—ফারিসকে তো একসময় সে-ই বলেছিল যেন বিরক্ত না করে, কিন্তু আজ ফারিসের সেই নীরবতাই কেন তার কলিজা ছিঁড়ে দিচ্ছে?
নিজের ভেতরের এই অদ্ভুত যুদ্ধের কাছে হেরে গেল রিভা। কাঁপা কাঁপা হাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ফারিসের নাম্বারে কল দিল। রিং বাজছে… একবার, দুবার। কোনো সাড়া নেই। রিভা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, সে আবারও কল দিল। এবার ফোনটা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ফারিসের শীতল ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “এত রাতে বিরক্ত করার মানে কী?”
ফারিসের কণ্ঠের এই অচেনা রুক্ষতা রিভাকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। ফারিস কখনো তার সাথে এভাবে কথা বলেনি। রিভা আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল, “সরি ফারিস ভাই… আপনি কি রাগ করে আছেন?”
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না, শুধু ভেসে এল ফারিসের দীর্ঘ, গম্ভীর নিঃশ্বাসের শব্দ। রিভা ব্যাকুল হয়ে আবার বলল, “আমার সাথে কি কথাই বলবেন না?”
ফারিস এক মুহূর্তের নীরবতার পর নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আমার ঘুম পাচ্ছে। সকালে কথা বলব।”
বলেই ফোনের অপর প্রান্তে একটা কঠোর ‘ঠাস’ শব্দ হলো—কলটা কেটে দিয়েছে ফারিস। সেই তীব্র শব্দে রিভার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে যেতেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কান্নায় বুক ভেসে যাচ্ছে, চোখের জলে বালিশ ভিজে একাকার। অবশ আর কাঁপা হাতে আবারও মোবাইলটা তুলে মেসেজ টাইপ করতে শুরু করল সে:
”সরি ফারিস ভাই, আপনাকে আর কখনো কষ্ট দেব না। প্লিজ… আমাকে মাফ করে দিন!”
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি, ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর পাঁচটার ঘরে। রায়েদা শেখের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। দরজার কলিং বেলটা চাপতে গিয়েও সে হাত সরিয়ে নিল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সরাসরি রায়েদা শেখকে ডায়াল করল সে। ওপাশ থেকে রায়েদা শেখের ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর আসতেই সৌহার্দ্য শান্ত অথচ নিস্তেজ গলায় বলল, “খালামনি, দরজাটা একটু খুলবে প্লিজ?” কথা শেষ করেই ফোনটা রেখে দিল সে।
রায়েদা শেখ আধোঘুমে দরজা খুলতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সৌহার্দ্যের এই চেহারা তিনি ভাবতেই পারেননি—চুলগুলো এলোমেলো, উসকোখুসকো, হাতে ব্যান্ডেজ, আর কপালের এক পাশপাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত যেন শুকিয়ে একাকার হয়ে আছে। উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, “এ কী অবস্থা তোর! কী হয়েছে আব্বু? এসব কীভাবে হলো?”
সৌহার্দ্য গম্ভীর মুখে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। তার গলার স্বর ভারী আর গমগমে, “ডোন্ট প্যানিক খালামনি, তেমন কিছু না। ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা, ইটস ওকে।” বলেই রায়েদা শেখের পাশ কাটিয়ে সে সোজা রিদির রুমের দিকে এগিয়ে গেল। রুমের ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে আটকে দিল সে।
সামনের দিকে তাকাতেই তার হৃদপিণ্ডের গতি যেন মুহূর্তেই হাজারগুণ বেড়ে গেল। বিছানায় রিদি অঘোরে ঘুমিয়ে আছে, ঘুমের ঘোরে তার পরনের পোশাক কিছুটা সরে গেছে। লেডিস টি-শার্টের নিচ দিয়ে তার কোমল উদরদেশ অনাবৃত হয়ে আছে। সেই দৃশ্য দেখে সৌহার্দ্যের পুরুষালি সংযম যেন মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল, তার চোখের দৃষ্টিতে এক তীব্র নেশার আবেশ ভর করল। সেদিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বিরবির করে বলল, “উফ, এই স্টুপিডটা আমাকে পাগল না বানিয়ে যেন দম নেবে না!” বলেই ধীরে ধীরে রিদির দিকে এগিয়ে গেল!
তীব্র ব্যাকুলতায় সে রিদির পাশে গিয়ে বসল। চোখ দুটো শক্ত করে বুজে সে বারবার গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল, নিজের উত্তাল মনকে শান্ত করার এক ব্যর্থ চেষ্টায়। কিন্তু আজ কোনো বাঁধই যেন মানছে না তার অবাধ্য হূদয়। শেষমেশ নিজেকে আর সামলাতে পারল না সে—রিদির অনাবৃত উদরে নিজের মুখ ডুবিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো; একবার নয়, বারবার কয়েবার!
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৩
এরপর সে ধীরে ধীরে রিদির একদম কোল ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। রিদির বুকের উষ্ণতায় নিজের মুখটা গুজে দিয়ে দুই হাতে তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। কতদিনের জমানো ক্লান্তি, কত না-পাওয়া হাহাকার যেন রিদির শরীরের সেই মায়াবী উষ্ণতায় মুহূর্তেই মিলিয়ে যেতে লাগল। পরম আবেশে সৌহার্দ্য চোখ বুজল। মনে হলো, জীবনের সমস্ত যুদ্ধের ময়দান থেকে বেঁচে ফেরার সার্থকতা যেন এই একটি মুহূর্তের শান্তির মাঝেই লুকিয়ে আছে!
