অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪০
রিদিতা চৌধুরী
রাতের আকাশটা আজ যেন গভীর নীলচে এক ক্যানভাস। জানালার পর্দাটা বাতাসে ঈষৎ দুলছে, আর তার ফাঁক গলে ভেতরে এসে পড়ছে এক চিলতে রুপালি জোছনা। সেই জোছনার আলোয় ঘরের মেঝেটা যেন দুধ-সাদা মেঘের আস্তরণে ঢাকা পড়েছে। এমন নিঝুম রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো, সৌহার্দ্য তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে চলেছে।
সৌহার্দ্য যখন নিজের ভাবনায় গভীরভাবে মগ্ন, ঠিক তখনই রিদি এসে নীরবে তার পাশে দাঁড়াল।
সিগারেটের কড়া গন্ধ নাকে আসতেই রিদি খুক খুক করে কেশে উঠল। কাশির শব্দে চমকে উঠে সৌহার্দ্য দ্রুত সিগারেটটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে পাশ ফিরে রিদির কোমরে হাত রেখে তাকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিল।
রিদির নাকের সঙ্গে নিজের নাকটা আলতো করে ঘষে, আদুরে অথচ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
“না ঘুমিয়ে উঠে পড়লে যে? শরীর খারাপ লাগছে, সুইটহার্ট?”
কথাটা বলেই নিজের খসখসে হাতের তালু দিয়ে রিদির গাল আর গলা ছুঁয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে শুরু করল সে। সৌহার্দ্যকে এমন অকারণে এতটা চিন্তিত হতে দেখে রিদির বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত উষ্ণ ভালোবাসায় ভরে উঠল। সে দুই হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটের কোণে হালকা একটুখানি হাসি ফুটিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“কিছু হয়নি আমার, ডাঃ সাহেব! আমি একদম ঠিক আছি!”
সৌহার্দ্য রিদিকে আরও নিবিড় করে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে চোখ বুজতেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরল। এই মেয়েটাকে নিজের হৃদস্পন্দনের মাঝে আগলে রাখতে পারাটাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝেই সে রিদির চুলে মুখ ডুবিয়ে আলতো করে মাথার তালুতে একটা চুমু এঁকে দিল। তারপর গভীর মমতাভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“ঘুমাবে না, লক্ষ্মীটি? সকালে কলেজের জন্য উঠতে হবে না?”
রিদি সৌহার্দ্যের বুকের গভীরে নিজের নাকটা আলতো করে ঘষে আদুরে স্বরে বলল,
“উহু, এভাবেই থাকতে ভালো লাগছে। প্লিজ, আর কিছুক্ষণ থাকি?”
সৌহার্দ্য কোনো উত্তর দিল না। শুধু রিদিকে আরও একটু শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।
রিদি তার বুকের উষ্ণতা অনুভব করতে করতে ধীর কণ্ঠে মিনমিনিয়ে বলল,
“সিগারেট কেন খান, ডাঃ সাহেব? প্লিজ, আর খাবেন না। আমার একদম পছন্দ না। আপনি তো ডাক্তার, আপনি তো জানেনই এটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকারক।”
কথাগুলো বলেই সে মাথা তুলে সরাসরি সৌহার্দ্যের চোখের দিকে তাকাল।
সৌহার্দ্য এক পলক রিদির মায়াবী চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে তখন যেন গভীর এক মোহের ছায়া। ধীরে ধীরে মুখটা রিদির কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে খেতে দাও, তাহলে সিগারেট ছুঁয়েও দেখব না—প্রমিস! দিবে, সুইটহার্ট?”
সৌহার্দ্যের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আর রোমাঞ্চকর কথায় রিদির গাল মুহূর্তেই পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল তার পুরো শরীরজুড়ে। লজ্জায় নিজের মুখটা সৌহার্দ্যের বুকের গভীরে লুকিয়ে ফেলে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“ছিঃ! অসভ্য লোক! মুখ খুললেই সবসময় বাজে কথা বের হয়।”
কিন্তু রিদির এই আদুরে অভিযোগ শোনার পর সৌহার্দ্যের শান্ত রূপটা যেন নিমেষেই কোথায় মিলিয়ে গেল। সে এক মুহূর্ত বিরক্ত দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্তি আর রাগের মিশ্রণে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“স্টুপিড মহিলা! তোমাকে খেতেও দিবা না, সিগারেটও খাবো না—তো খাবোটা কী? সর আমার বুক থেকে!”
রিদি সৌহার্দ্যের কথায় ভ্রূক্ষেপ না করে তাকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরল। ঠোঁট উল্টে কৃত্রিম বিরক্তি নিয়ে বলল,
“অসভ্য লোক একটা! আমি কি কোনো খাওয়ার জিনিস নাকি?”
সৌহার্দ্য ঠোঁট কামড়ে হাসল। রিদির উন্মুক্ত ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে উষ্ণ নিশ্বাস ফেলল সে। সেখানে আলতো করে নাক ঘষতে ঘষতে ঘোরলাগা, নেশাতুর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“ইউ আর মাই মোস্ট ফেভারিট ডিশ, সুইটহার্ট! একবার শুধু স্বাদ নিতে দাও, তারপর দেখো, রোজ তিনবেলা করে তোমাকে খাব!”
কথাটা শেষ করেই রিদির ঘাড়ের স্পর্শকাতর ত্বকে আলতো করে দাঁত বসিয়ে দিল সৌহার্দ্য। আচমকা এই আদরে রিদির সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল; তীব্র এক শিহরণে কেঁপে উঠল সে।
সৌহার্দ্য পেছন থেকে রিদিকে নিজের চওড়া বুকের সাথে শক্ত করে লেপ্টে নিল। ঘাড়ের খাঁজে অবিরাম আদরের উষ্ণতা ছড়াতে ছড়াতেই তার হাতটা ধীরগতিতে গলে গেল রিদির টি-শার্টের ভেতর। উন্মুক্ত, নরম উদরে সৌহার্দ্যের আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই লজ্জায় আর আদিম এক পুলকে সিঁটিয়ে গেল রিদি। স্পর্শটা ক্রমশ আরও গভীর, আরও দাবিদার হয়ে উঠছে।
কিন্তু হাতটা আরেকটু নিচে নামতেই রিদি চমকে উঠে খপ করে চেপে ধরল সৌহার্দ্যের হাত। একবুক সংকোচ আর অস্ফুট ভয় নিয়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে সৌহার্দ্যের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল।
কথাটা শুনেই সৌহার্দ্যের চলা হাতটা থমকে গেল। চোখ বুজে একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ছাড়ল সে। নিজের ভেতরের উত্তাল হয়ে ওঠা সমস্ত অস্থিরতা আর উন্মাদনাকে যেন এক নিমিষেই গিলে নিল।
রিদিকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে কিছুটা গম্ভীর, অথচ শান্ত কণ্ঠে বলল,
“ওকে, ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে কলেজ আছে তোমার।”
কথাটুকু বলেই সে আর দাঁড়াল না, বাথরুমের দিকে চলে গেল!
বিছানায় একা বসে রিদির নিজেকে বড্ড অসহায় আর অপরাধী লাগতে লাগল। যখনই তাদের মধ্যকার দেয়ালগুলো একটু একটু করে গলতে শুরু করে, সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে যায়, তখনই যেন কোথা থেকে এক অদৃশ্য বাধা এসে দাঁড়ায়!
সৌহার্দ্য কি রাগ করল? নাকি অভিমান? কিন্তু রিদিরই বা কী করার ছিল? এটা তো নিতান্তই মেয়েদের একটা স্বাভাবিক শারীরিক চক্র!
একরাশ মন খারাপ আর বুকের ভেতর জমানো হাজারো দ্বিধা নিয়ে রিদি শুয়ে পড়ল। এখন না ঘুমালে সকালে ক্লাস মিস হয়ে যাবে।
ঘণ্টাখানেক পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল সৌহার্দ্য। ততক্ষণে রিদি ঘুমে তলিয়ে গেছে। ঘরের টিমটিমে আলোটা নিভিয়ে দিয়ে সে খুব সন্তর্পণে, একটুও শব্দ না করে রিদির পাশে এসে শুলো। অন্ধকারে মেয়েটার নিষ্পাপ মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ে কপালে একটা দীর্ঘ, স্নিগ্ধ চুমু আঁকল সে। তারপর কোনো এক পরম মমতায়, আগলে রাখার ভঙ্গিতে মেয়েটাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিয়ে চোখ বুজল। এই ছোট্ট মেয়েটা বুকের ওমে থাকলেই যেন তার পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি মুছে যায়, পরম শান্তিতে ভরে ওঠে মন। এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা চাওয়ার আছে তার!
সকালে ঘুম থেকে উঠেই রিদির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। দেরিতে ঘুমানোর মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন—কলেজের জন্য বের হতেই বেশ দেরি হয়ে গেছে। সৌহার্দ্য আজ ভোর চারটাতেই বেরিয়ে গেছে; ইমার্জেন্সি অপারেশন আছে বলে কথা!
কলেজের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ একটা ছেলে এসে ওর হাতে একটা পার্সেল ধরিয়ে দিল। আকার-আকৃতিতে মনে হচ্ছে ভেতরে কোনো বই। রিদি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ছেলেটা রহস্যময়ভাবে দ্রুত পায়ে মিলিয়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে দ্বিধায় পড়ল রিদি। অগত্যা, ক্লাসের দেরি হচ্ছে বলে কোনোমতে পার্সেলটা নিজের ব্যাগে চালান করে দিয়ে দ্রুত ক্লাসরুমের দিকে দৌড় দিল সে।
ক্লাসে এসে দেখল সুমি বসে আছে। আজকের ক্লাসে পৃথা, সায়েম অনুপস্থিত—পরপর দুই দিন শরীর খারাপের কারণে পৃথা আসতে পারছে না। দুই বান্ধবীর যখন গল্পে মশগুল, তখনি ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেন প্রফেসর। রিদি মাথা তুলে তাকাতেই তার চোখের পলক যেন স্থির হয়ে গেল! প্রফেসর হিসেবে তাজওয়ানকে দেখে সে হতবাক—এই লোকটা তাদের কলেজে জয়েন করেছে? এই লোক ডাক্তার! চোখের সামনে সৌহার্দ্যের রাগী মুখটা ভেসে উঠতেই রিদি ভয়ে তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি সরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ফেলল।
তাজওয়ান সবার সাথে সৌজন্যমূলক আলাপ শেষ করে রিদির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে খুব ধীর কণ্ঠে বলল, “আপনার পরিচয়টা দেবেন কি, মিস?”
রিদি নিজের চোয়াল শক্ত করল। ভেতরে তীব্র বিরক্তি দানা বাঁধলেও সাহসের সাথে উঠে দাঁড়িয়ে শীতল গলায় জবাব দিল, “মিসেস সৌহার্দ্য চৌধুরী, স্যার!” বলেই সে আর একটা মুহূর্তও অপেক্ষা না করে ধপ করে বসে পড়ল।
রিদির মুখে “মিসেস সৌহার্দ্য চৌধুরী” শুনে তাজওয়ানের বুকের ভেতরটা রাগে আর প্রতিহিংসায় ফুঁসে উঠল। তবুও বাইরের খোলসটা শান্ত রেখে, দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে সে বলল, “বেশিদিন থাকবেন না, মিসেস সৌহার্দ্য চৌধুরী! কারণ আপনাকে আমার চাই—ঠিক যেভাবে হোক, আপনাকে আমার চাই!”
পুরো ক্লাসরুম স্তব্ধ। সবাই যেন পাথরের মতো জমে গিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিদির দিকে—যেন অসম্ভব কোনো কথা শুনেছে তারা। সৌহার্দ্যের সাথে রিদির সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে অনেকের মনেই নানা কানাঘুষা ছিল, রিদির প্রতি সৌহার্দ্যের কেয়ার দেখে! কিন্তু ক্লাসের মাঝে রিদি যে এমনটা বলে বসবে, তা কেউ ভাবতেও পারেনি। সবার সেই অবিশ্বাস ভরা চাহনি রিদিকে দারুণভাবে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
রিদি নিজেও তো কখনো ব্যক্তিগত জীবন কলেজের গণ্ডিতে আনতে চায়নি, কিন্তু আজ তাজওয়ানের মতিগতি সুবিধার মনে হচ্ছিল না বলেই সে কথাগুলো বলতে বাধ্য হলো। তাজওয়ানের আসল মতলব এখনো রিদির কাছে ধোঁয়াশা, কারণ তাজওয়ান তাকে সরাসরি এমন কিছু বলেনি বা এমন কোনো আচরণ করেনি যাতে তার উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তবে সেদিন সৌহার্দ্যকে ওভাবে আগুনমূর্তি ধারণ করতে দেখে রিদি মনে একটা অশুভ ইঙ্গিত পেয়েছিল।
তাজওয়ান নিজের রাগটুকু কোনোমতে গিলে ক্লাস শেষ করেই বেরিয়ে গেল।
ক্লাস শেষে রিদি আর সুমি কলেজ থেকে বের হতেই সুমির এক কাজিনের সাথে দেখা হয়ে গেল। সুমি বিদায় নিয়ে চলে যেতেই রিদি সামনের দিকে পা বাড়াল। ঠিক তখনই মোবাইলে একটা ‘টুং’ শব্দ—মেসেজ এসেছে। মেসেজটি পড়ার পর রিদি যেন থমকে গেল, পায়ের নিচে মাটি কাঁপছে তার।
‘নিজের হাসবেন্ডের মাখোমাখো প্রেম দেখতে চাইলে হাসপাতালের চতুর্থ তলায় আসতে পারেন মিসেস চৌধুরী!’
মুহূর্তের জন্য রিদির পৃথিবীটা যেন থেমে গেল। মাথা বলছে এটা নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র, আগের বারের মতো। রিদি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে বাড়ির দিকে পা বাড়াল, কিন্তু মন কি আর কথা শোনে?
বুকের ভেতরটা তোলপাড় শুরু হলো। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রিদি আবার থমকে দাঁড়াল। যদিও সে জানে সৌহার্দ্য কেমন, মুখে কিছু না বললেও রিদি এখন সৌহার্দ্যের ভালোবাসার গভীরতাটা বোঝে; তবুও নিজের অস্থির মনকে সে কিছুতেই মানাতে পারল না। বুকের সেই অশান্ত ধুকপুকানি বারবার বলছে, এই মুহূর্তে সৌহার্দ্যকে সামনে থেকে একবার না দেখলে তার শান্তি নেই। তার দৃঢ় বিশ্বাস, মেসেজে যা লেখা আছে তা মিথ্যা—তবুও রিদি দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আবার হাসপাতালের দিকেই পা বাড়াল।
চারতলায় সিঁড়ির কাছে রিদির বুকটা ধুরু ধুরু করে কাঁপছে। আল্লাহর কাছে সে বারবার প্রার্থনা করছে, সব যেন ঠিক থাকে। রিদি বারবার নিচে ফিরে যেতে চাইল, তার গভীর বিশ্বাস এমন কিছু হতেই পারে না। তবুও শেষমেশ নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে রিদি চারতলায় পা রাখল। হঠাৎ করিডোরের এক কোণে চোখ পড়তেই রিদি থমকে দাঁড়াল।
একটা মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। দেখে মনে হচ্ছে তারা গভীর চুম্বনে লিপ্ত, তবে মুখটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পেছন থেকে পুরো সৌহার্দ্যের মতো, সকালে যে পোশাক পরে সে বেরিয়েছিল—ঠিক সেই পোশাক! রিদির মুহূর্তেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তবুও নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে সে ভাবল, ‘পেছন থেকে তো একজন মানুষের সাথে আরেকজনের মিল থাকতেই পারে! একই পোশাক তো কতজনেরই থাকে।’ রিদি পণ করল, মুখ না দেখে সে কিছুতেই বিশ্বাস করবে না—এটা তার ডাঃ সাহেব হতে পারে না!
টলমলে চোখে রিদি সামনে এগোতে গিয়েই অপরিচিত কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে তার ব্যাগটা পড়ে গেল। লোকটা ব্যাগটা তুলে দিয়ে বলল, “সরি ম্যাডাম, আমি খেয়াল করিনি।”
রিদি লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, “সমস্যা নেই ভাইয়া।”
বলেই সামনের দিকে তাকাতেই যেন রিদি স্তব্ধ হয়ে গেল। করিডোর দিয়ে সৌহার্দ্য সামনের দিকে আসছে, পরনের সাদা শার্টের কলারের কাছে স্পষ্ট লিপস্টিকের দাগ! সৌহার্দ্য আশপাশ বা কারো দিকে কোনো খেয়াল না করে, প্রতিদিনের মতো বিরক্ত মুখে সামনের কেবিনে ঢুকে গেল। করিডোরের পাশে মেয়েটাকেও আর দেখা যাচ্ছে না। জায়গাটা অদ্ভুত রকমের শান্ত, প্রতিদিনের তুলনায় আজ করিডোরে মানুষ নেই বললেই চলে।
রিদি যেন পাথর হয়ে গেল। তার ভেতরটা রক্তশূন্য রোগীর মতো চটপট করছে, মনের ভেতর থেকে ঘৃণা উপচে পড়ছে। তবুও মন চিৎকার করে বলছে, এমনটা কিছুই হয়নি! কিন্তু চোখের সামনের দৃশ্যটা কিছুতেই মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে না। রিদি তার মন আর মস্তিষ্কের সাথে যুদ্ধ করে সৌহার্দ্যের কেবিনের দিকে যেতে গিয়েও গেল না। গিয়েই বা কী হবে? সৌহার্দ্য কি ওকে কোনো এক্সপ্লেইন করবে? উল্টো আরও রেগে যাবে! রিদি সৌহার্দ্যকে এইটুকু তো চিনে গেছে। সৌহার্দ্য গতবার এত বড় একটা ঘটনার পরও রিদির কাছে নিজেকে একবার প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। তখন যদি ফারিস সত্যিটা না বলত, হয়তো তারা এখনো আলাদা থাকত! এমনকি এখন পর্যন্ত সৌহার্দ্য তার কাছে একবারও জানতে চায়নি সে কেন সেদিন অত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল! সেই জায়গায় তো এই ব্যাপার সৌহার্দ্যের কাছে কিছুই না। এক্ষুনি হয়তো তাকে উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দেবে!
শেষমেশ তীব্র রাগ আর অভিমানে বুকটা ভারী করে রিদি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এল।
রিদি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে চৌধুরী বাড়ির পথ ধরলেও, মাঝপথে এসে তার পা দুটো যেন স্থবির হয়ে গেল। চৌধুরী বাড়ির দিকে যাওয়ার ইচ্ছেটা অভিমানে ধূসর হয়ে উঠল। গত কয়েকটা দিন শাহাবীর বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, কিন্তু রিদি তার অভিমানের দেয়াল এতটাই উঁচু করে রেখেছিল যে, একটা বারও ফোন রিসিভ করেনি। ফারিসের কাছ থেকে যেদিন জেনেছিল শাহাবীর তার আপন ভাই, সেদিন থেকেই রিদির ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর অভিমানের পাহাড়টা আরও বড় হয়ে উঠেছিল। নিজের ভাই হয়েও যে মানুষটা একবারের জন্যও নিজের পরিচয় দিয়ে তাকে বুকে টেনে নেয়নি, তার ওপর রাগটা আজন্ম পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। এই অভিমানকেই সে আগলে রেখেছিল নিজের মতো করে।
কিন্তু আজ? আজ কেন জানি অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল। মনের কোনো এক নিভৃত কোণ থেকে আকুলতা জেগে উঠল, ভাইটার বুকে মাথা গুঁজে জীবনের সব জমা রাখা ক্লান্তি আর কষ্টগুলো ধুয়ে ফেলার। অজানতেই তার পা দুটো শিকদার বাড়ির দিকে মোড় নিল। বাড়ির দরজার সামনে শাহাবীরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই রিদির আবেগ বাঁধ ভাঙল। সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না, দৌড়ে গিয়ে ভাইকে জাপটে ধরল। ভাইয়ের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকাতেই তার গলার ভেতর থেকে দীর্ঘদিনের জমানো কষ্টগুলো ডুকরে বেরিয়ে এল। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
শাহাবীর তো অবাক! এতদিন বোনটার অভিমান ভাঙানোর জন্য কত চেষ্টা করেছে, কিন্তু আজ রিদির এই রূপ দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “কী হয়েছে আমার কলিজার টুকরা? সৌহার্দ্য কি কিছু বলেছে? ভাইয়াকে বল না, প্লিজ?” পাখি আমার?
রিদি কোনোমতে কান্না থামানোর চেষ্টা করে অস্ফুট স্বরে বলল, “কিছু হয়নি ভাইয়া… আমি শুধু দুই-তিন দিন তোমার সাথে এখানে থাকতে চাই।” তোমার কথা মনে পড়ছে!
শাহাবীর মৃদু হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, থাকবি।” এটার জন্য কাঁদতে হয় পাগলী!
শাহাবীরের মনের ভেতর তখন সন্দেহের দাবানল জ্বলছে। রিদি কোনো কথা বলছে না ঠিকই, কিন্তু শাহাবীরের মন বলছে, সৌহার্দ্য নিশ্চয়ই ওর সাথে কোনো খারাপ আচরণ করেছে! সৌহার্দ্যকে শাহাবীর খুব ভালো করেই চেনে; এই ছেলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অহংকার, কাউকে তোয়াক্কা করে কথা বলা এর ধাতে নেই।
শাহাবীরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে মনে মনেই এক কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল—রিদি কিছু বলুক বা না বলুক, সৌহার্দ্য যদি বিন্দুমাত্রও খারাপ ব্যবহার করে থাকে, তবে কোনোভাবেই সে রিদিকে ওর ধারেকাছে ঘেঁষতে দেবে না। বাংলাদেশে সে যে কাজের জন্য পা রেখেছে, তা শেষ করেই রিদিকে নিয়ে সে আমেরিকা ব্যাক করবে। ওই বেয়াদবটার কাছে নিজের বোনকে সে কিছুতেই ফেলে রাখবে না! থাক সে তার ইগো নিয়ে!
শাহাবীর পরম মমতায় রিদিকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে নিল। তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “যা ফ্রেশ হয়ে নে। মম এর সাথে দেখা করে নে!”
ভাইয়ের কথার বিপরীতে রিদি শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর ভারী পায়ে ধীরগতিতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
রিদি সিঁড়ি ভেঙে উপরে চলে যেতেই শাহাবীরের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে সে দ্রুত ফোনটা কানে ধরল। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করতেই শাহাবীর ধীর কিন্তু গম্ভীর স্বরে বলল, “আকাশ, আজ রিদির কলেজে কোনো কিছু ঘটেছিল কি না খবর নে তো। ওকে দেখে আমার মনে হচ্ছে কোনো একটা বড় সমস্যা হয়েছে। তাজওয়ান যেহেতু এখানে জয়েন করেছে, হয়তো কোনো গন্ডগোল পাকিয়েছে। আমার তীব্র সন্দেহ হচ্ছে, তুই ব্যাপারটা দেখ!”
আকাশ মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনে আশ্বস্ত করার সুরে বলল, “তুই টেনশন নিস না, আমি সব তথ্য বের করছি। আর শোন, সেদিন সৌহার্দ্যের গাড়ির ব্রেক ফেইল কিন্তু ওই তাজওয়ানই করিয়েছিল। আমি যতটুকু বুঝেছি, সৌহার্দ্য ব্যাপারটা জেনে গেছে। তবে বেয়াদবটা এখন আমার পেছনে লেগে আছে। নিজের আপনজন যে ওর নাকের ডগায় বসে ওকে বাঁশ দিচ্ছে, সেটা বুঝতেও পারছে না!”
শাহাবীরের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে সতর্ক করল, “তুই সাবধানে থাক, কিছুতেই ওর সামনে পড়বি না। তোকে পেলে সত্যিটা জানার আগেই ও তোকে মেরে দেবে। মাথা গরম, ঘাড়ত্যাড়া একটা বেয়াদব ও!”
আকাশ ওপাশ থেকে হেসে ফেলল, তারপর একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মারতে পারবে না, বড়জোর কয়েকটা কেলানি খাব! বেয়াদব হলে কী হবে, ভালোবাসার মানুষগুলোকে আগলে রাখতে ও জানে। বউয়ের জন্য ও পাগল বেচারা, কিন্তু মুখে স্বীকার করতে রাজি না। ফারিস ঠিকই বলে, ও আসলেই অতিরিক্ত ভেজাল প্রোডাক্ট!”
ফারিসের নাম শুনতেই শাহাবীরের রক্ত গরম হয়ে গেল। সে তেতে উঠে বলল, “ওই বেয়াদবটার নাম নিবি না! ও তো সৌহার্দ্যের চেয়েও বড় বেয়াদব। আমাকে কীভাবে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বানিয়ে দিয়েছে সৌহার্দ্যর কাছে! ভুলভাল সব ইনফরমেশন দিয়ে আমাকে বিপদে ফেলছে। কত বড় বেয়াদব! বলে কি না, আমাকে ধরার জন্য নাকি দেশ-বিদেশের পুলিশ আমার পেছনে পড়ে আছে! দেখ কত খারাপ! ও সারাক্ষণ আমার পেছনে লেগে থাকে।”
শাহাবীরের রাগে ফুঁসতে থাকা অবস্থা দেখে আকাশ হো হো করে হেসে উঠল। শাহাবীর বিরক্ত হয়ে ঝাড়ি দিয়ে বলল, “তুই হাসছিস? ও আমাকে নিয়ে ঠিক কী চায় বা ওর সমস্যাটা কী, সেটা আমি এখনো পর্যন্ত বুঝলাম না!”
আকাশ হাসতে হাসতেই জবাব দিল, “তুই যেভাবে নিজের পরিচয় রিভিল করে রেখেছিস, ও সেইভাবেই কথা বলছে। এতে তো আমি ওর কোনো দোষ দেখছি না, বীর!”
শাহাবীর বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বিরবির করে উঠল, “মাথা মোটা একটা! এই বুদ্ধি নিয়ে ও কীভাবে এমপি হয়েছে কে জানে! ভালো বুদ্ধি কম থাকলে কী হবে, ওর মাথায় শয়তানি বুদ্ধির অভাব নেই। আর সৌহার্দ্যের মতো একটা বুদ্ধিমান ছেলে এত সহজে ওর কথা বিশ্বাস করে নিল, ভাবলেই আমার অবাক লাগে!”
আকাশ কিছু একটা ভেবে বলল, “আমার কেন জানি মনে হচ্ছে সৌহার্দ্য সব কিছু জানে। নাহলে হঠাৎ ও আমাকে খোঁজা বন্ধ করলো কেন?”
শাহাবীর আকাশের এই সন্দেহের মুখে কোনো কথা বলল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে আকাশের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত পা বাড়াল বাড়ির বাইরের দিকে।
ওদিকে, ফারিসের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। সেই কখন থেকে সে রিভাকে ফোন দিচ্ছে, মেয়েটার ধরার কোনো নাম নেই। অথচ গতকাল রিভাকে নেওয়ার জন্য সে সৌহার্দ্যদের বাড়িতে কতক্ষণ অপেক্ষা করল, কিন্তু মেয়েটা তার সামনে আসলো না! রাগে ফারিসের ভেতরটা জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “শশুরের বেয়াদব মেয়ে! একদম ওই ঘ্যাঁড়তেড়া অদ্ভুত প্রোডাক্টটার মতো হয়েছে। এক ফ্যাক্টরি থেকে বের না হয়েও এরা একই রকম জেদি হয় কী করে, সেটাই তো বুঝলাম না!”
ফারিস বিড়বিড় করতে করতেই আবারও ডায়াল করল। এবার ওপাশ থেকে ভেসে এল রিভার অগ্নিশর্মা কণ্ঠ, “পরকীয়া এমপি, আমাকে ফোন করছেন কেন? কী চাই আপনার? একটা অবুঝ মেয়ের সব কেড়ে নিয়ে এখন নাটক করতে এসেছেন?”
ফারিসের মেজাজ সপ্তমে চড়লেও সে নিজেকে সামলে নিল। গলার স্বরে মধু ঢেলে বলল, “সোনা, ময়না পাখি, আমার শশুরের বেয়াদব মেয়েটা এমন করে না। স্বামীকে এসব কথা বলতে নেই, আল্লাহ পাপ দেবেন! প্লিজ ডল, তোকে ছাড়া যে আমার ঘুম আসছে না! একটু আয়, দেখবি তোর অভাবে আমি কেমন শুকিয়ে গেছি। চলে আয়, তোকে দুই টাকার একটা ক্যান্ডি কিনে দেব!”
রিভা নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “নির্লজ্জ ফকির এমপি! আপনার ওই দুই টাকার ক্যান্ডি আপনার ঝাটাপুরিকেই খাওয়ান! আমি আসব না, একদম বিরক্ত করবেন না!”
ফারিস বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল, “ওই ঝাটাপুরি তোর ভাইয়ের, আমার না! বিশ্বাস না হলে তোর ওই ঘ্যাঁড়তেড়া ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। আমি একটুও মিথ্যা বলছি না, তোর বাপের কসম!”
রিভা রাগে ফুঁসে উঠল, “আমার বাবাকে নিয়ে আপনার এত সমস্যা কী, ফারিস ভাই? সবসময় বাবাকে নিয়ে কেন বাজে কথা বলেন?”
ফারিস বিরক্ত হয়ে কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, “ঠিক আছে, শশুরের বেয়াদব মেয়ে! তোকে আসতে হবে না। আমি বরং মনিকার কাছে যাচ্ছি। মেয়েটা সুন্দরী আছে, মন্দ না! তুই যেহেতু আসবি না, কষ্ট হলেও ওর সাথেই মানিয়ে নেব। করার তো আর কিছু নেই!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৯
ফারিসের কথা শেষ হতে না হতেই রিভার ঝাঝালো কণ্ঠ ভেসে এল, “নির্লজ্জ এমপি! খবরদার, একদম ওই দিকে পা বাড়াবেন না! মেরে একদম তক্তা বানিয়ে ফেলব! ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন, আসছি আমি!”
কথাটা বলেই রিভা লাইনটা কেটে দিল। চৌধুরী বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিসের ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে মুচকি হাসি। এই জেদি মেয়েটার মনের তালার চাবিকাঠি যে ঠিক কোথায়, তা ফারিসের চেয়ে ভালো আর কে জানে!
