অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৪
রিদিতা চৌধুরী
ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সৌহার্দ্য স্থির হয়ে বসে রইল। তার চোখেমুখে এখন আর আগের সেই শান্ত আবেশ নেই, বরং এক শীতল ও ভয়ংকর সংকল্পের ছাপ স্পষ্ট। সে ধীরে ধীরে ল্যাপটপটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। রিদির দিকে একবার তাকাল; মেয়েটি অঘোরে ঘুমাচ্ছে, চুলে কিছুটা অবিন্যস্ত ভাব। সৌহার্দ্য আলতো করে রিদির কপালে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। কপালে দীর্ঘক্ষণ হাত রেখে কী যেন ভাবল সে। তারপর অত্যন্ত সাবধানে রিদিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আলমারি থেকে কালো রঙের একটা জ্যাকেট বের করে গায়ে চাপাল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করে নিল; তার প্রতিটি নড়াচড়ায় যেন এক গাম্ভীর্য ফুটে উঠছে। রিদির দিকে শেষবার এক নজর তাকিয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে “বিরবির করে বলল, ‘আই নো, নিজেকে যতটা ইনোসেন্ট দেখাও, ততটা ইনোসেন্ট তুমি নও,’—জান! বলেই একটা বাঁকা হাসি দিয়ে সৌহার্দ্য রুম থেকে বেরিয়ে গেল।”
রাত প্রায় দুইটা। জঙ্গলের বুক চিরে আসা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়েও কানে আসছে ট্রাকের ইঞ্জিনের গর্জন। রাতের অন্ধকার এখানে এতটাই গাঢ় যে, মনে হচ্ছে আকাশটা মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে। রাস্তার একপাশে ঝোপের আড়ালে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সিআইডি টিম। তাদের লিডার এসবি, চোখ জোড়া সরু করে নাইট ভিশন লেন্সের ভেতর দিয়ে দেখছে ট্রাকের চারপাশের দৃশ্য।
প্রায় ৫০-৬০ জন মেয়ে—কারো পরনের কাপড় ছিন্নভিন্ন, কারো চোখ নেশায় বুজে আছে, কারো জ্ঞানই নেই। পাচারকারীরা হায়েনার মতো চারপাশ ঘিরে আছে। এক সিআইডি সদস্য ফিসফিস করে বলল, “স্যার, মেয়েগুলোকে গাড়িতে তোলা শেষ। ওরা মুভ করার আগেই আমাদের অ্যাকশনে নামা উচিত। দেরি করলে ওরা মেইন রোডে উঠে যাবে!”
এসবির চোয়াল শক্ত, কপালে জমে থাকা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে চোখের ওপর। সে গম্ভীর স্বরে বলল, “না। সময় হলে আমি নির্দেশ দেবো।”
পাশ থেকে আরেকজন অফিসার অস্থির হয়ে তাগাদা দিল, “এসবি, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে!”
এসবি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লেন্সটা সরিয়ে নিল। বাতাসের শব্দের মাঝে নিচু স্বরে বলল, “ওকে, স্টার্ট নাও!”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো জঙ্গল যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। সাইলেন্সারের শব্দে ফাটল রাতের নিস্তব্ধতা। সিআইডি এবং পুলিশের সাঁড়াশি আক্রমণে শুরু হলো তুমুল সংঘর্ষ। অন্ধকারের ভেতর থেকে আগুনের ফুলকি আর গুলির বিকট শব্দে জঙ্গল প্রকম্পিত। পাচারকারীরাও বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে।
এসবি যখন একটা বড় গাছের আড়ালে পজিশন নিয়েছিল, হঠাৎ বাতাসের গতির পরিবর্তন টের পেল সে। একটা বুলেটের শিস কেটে গেল ঠিক তার কানের পাশ দিয়ে। বাতাসের তীব্র চাপে তার কানের পর্দা ঝনঝন করে উঠল। রিফ্লেক্স কাজ করার আগেই, অন্ধকার থেকে ঝড়ের বেগে একটা ছায়া তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সজোরে ধাক্কা খেয়ে এসবি দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল ঝোপের ভেতরে। মাথায় একটা প্রচণ্ড ঝনঝনি অনুভূত হলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে, এসবি দেখল—আগন্তুকটি বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়াল। হাতের পিস্তল থেকে বের হওয়া আগুনের ছটায় ভেসে উঠল এক জোড়া রহস্যময় চোখ। সেই চোখে কোনো আবেগ নেই, আছে এক চরম শীতলতা। আগন্তুকের আঙুলের নিখুঁত ট্রিগার চাপে বিপরীত দিকের পাচারকারী লোকটির বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল। রক্ত ছিটকে পড়ল আগন্তুকের গায়ের ওপর।
এসবি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখল আগন্তুক আবার অন্ধকারের অতলে মিশে গেছে। তার উপস্থিতি ছিল যেন কোনো প্রেতাত্মার মতো। ঘাম আর বারুদের গন্ধে ভারী বাতাসে এসবি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া উষ্ণ রক্ত তাকে জানান দিচ্ছিল, সে নিশ্চিত মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছে। তার মস্তিষ্ক থেকে রহস্যের ধাঁধাটা সরিয়ে সে আবার ফোকাস করল মূল অপারেশনে।
“কভার করো! সবাইকে উদ্ধার করো!” এসবির গলার স্বর এখন আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত।
দুই ঘণ্টা ধরে চলল মরণপণ লড়াই। শেষ পাচারকারীটিও যখন মাটির সাথে মিশে গেল, তখন ভোরের ফিকে আলো উঁকি দিচ্ছে দিগন্তে। এসবি দাঁড়িয়ে রইল ট্রাকের সামনে। পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দে চারপাশ মুখরিত, কিন্তু এসবি নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে সেই অন্ধকার জঙ্গলটার দিকে।
সকালের মিষ্টি রোদ চোখে পড়তেই রিদির তন্দ্রা ভেঙে গেল। চোখ মেলে নিজেকে সে আবিষ্কার করল সৌহার্দ্যের বুকের উষ্ণতায়। সৌহার্দ্যের এক হাত তার মাথার নিচে, অন্য হাতটি আলতো করে জড়িয়ে আছে কোমরে। তার বলিষ্ঠ পা রিদিকে শরীরের সাথে লেপ্টে রেখেছে। সৌহার্দ্যের গা থেকে ভেসে আসা ‘ক্রিড অ্যাভেনটাস’-এর মাতাল করা সুগন্ধে রিদির দুচোখ বুজে এলো। এক টুকরো তৃপ্তি নিয়ে বিড়ালছানার মতো সে আরও খানিকটা গুটিসুটি মেরে ঢুকে গেল সৌহার্দ্যের বুকের গভীরে। লোমশ শক্ত বুকে নিজের ছোট নাকটা ঘষে বারবার সেই ঘ্রাণটুকু নিতে ব্যস্ত সে।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এলো সৌহার্দ্যের ঘুম জড়ানো গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “উম, সুইটহার্ট, বিরক্ত করো না। ঘুমাতে প্রবলেম হচ্ছে!”
রিদি মুখ তুলে সৌহার্দ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল, “তাহলে ছাড়ুন, আমি উঠি।”
সৌহার্দ্য রিদিকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে তার কপালে ও গালে কয়েকটা গভীর চুমু খেল। এরপর তাকে ছেড়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “গিয়ে পড়তে বসো, আসছি আমি। আজ তোমাদের টেস্ট নেওয়া হবে।” বলেই সে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।
রিদি উঠে বসে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেঙিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আনরোমান্টিক লোক! এমন টাইমে পড়ার কথা কে বলে?” একরাশ বিরক্তি নিয়ে কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে সে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল।
রিদির পড়ার মাঝে ওর পাশে এসে বসল সৌহার্দ্য! বইয়ের পাতায় চোখ রাখলেও রিদির মনোযোগের পুরোটাই তখন অন্য কোথাও। তার পাশেই বসে থাকা সৌহার্দ্যের দিকে—পরনে শুধু একটা কালো ট্রাউজার। তার সুঠাম, ফর্সা শরীরের পেশিগুলো যেন প্রতিটি নড়াচড়ায় জীবন্ত হয়ে উঠছে। রুমের স্তিমিত আলোয় সৌহার্দ্যের ওই বলিষ্ঠ অবয়ব রিদিকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মেয়েটা নিজের অজান্তেই যেন হিমশীতল হয়ে যাচ্ছে, অথচ বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছে। তার খুব ইচ্ছে করছে, বইয়ের এই জটিল হিসাব-নিকাশ ছেড়ে সৌহার্দ্যের সেই উন্মুক্ত বুকে মুখ গুঁজে কয়েকটা চুমু এঁকে দিতে।
রিদির এমন বিভোর দৃষ্টি আর আনমনা অবস্থা দেখে সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে উঠল। গম্ভীর স্বরে ধমক দিয়ে বলল, “স্টুপিড, না পড়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছো কেন? পড়ার সময় মনোযোগ কোথায় থাকে তোমার, দেড় ব্যাটারি?”
সৌহার্দ্যের ধমকে রিদির সম্বিৎ ফিরল। তার ভেতরকার চাপা উত্তেজনা যেন আগ্নেয়গির মতো ছাই ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, “আপনি কি আমাকে পড়তে বসিয়েছেন? নাকি আপনার মাখন মার্কা বডিটা দেখাতে বসিয়েছেন? মনোযোগ নষ্ট করার জন্যই আপনার এমন হট….”
বউয়ের মুখে এমন অসংলগ্ন কথা শুনে সৌহার্দ্যের বিরক্তি যেন উপচে পড়ল। সে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় ধমকে বলল, “বেয়াদব মহিলা! এসব অশ্লীল কথাবার্তা কোথায় শিখছো?”
রিদি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। যে লোক নিজে সারাক্ষণ ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ মার্কা কথা বলে তাকে, সে কি না এখন তার এই ছোট কথাটাকেও অশ্লীল ভাবছে! রিদি বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলল, “ভূতের মুখে রাম রাম!”
সৌহার্দ্য রিদিকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় মৃদু করাঘাত। রিদি উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল শাহেদা চৌধুরী হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে। রিদি দ্রুত সরে গিয়ে ঘরে ঢোকার জায়গা করে দিল। ট্রে-টা আলতো করে নিয়ে সে কিছুটা অপরাধবোধ নিয়ে বলল, “আপনি কেন কষ্ট করে আনলেন আম্মু? আমি তো নিচেই যেতাম।”
শাহেদা চৌধুরী ছেলের দিকে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, “নিচে যেতে হবে না, এখানেই খেয়ে নে। কলেজ যাবি না?”
রিদি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। শাহেদা চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না, নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। রিদি খাবারগুলো সেন্ট্রাল টেবিলে রাখতেই সৌহার্দ্যের গম্ভীর, গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “কাছে এসো।”
রিদি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য আচমকা ওর হাত ধরে হেঁচকা টানে বসিয়ে দিল নিজের কোলে। শক্তপোক্ত হাতের ছোঁয়ায় রিদি যখন কিছুটা অপ্রস্তুত, সৌহার্দ্য রিদির মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে নিচু স্বরে গম্ভীর কন্ঠে বলল, “এমন কাঠি শরীর নিয়ে আশি কেজি ওয়েট সামলাতে পারবেন তো, মিসেস চৌধুরী?”
রিদি তখনও সৌহার্দ্যের কথার গভীরতা বুঝতে পারেনি। সে সরল চোখে খাবার চিবোতে চিবোতে সহজভাবে বলল, “হুম।”
সৌহার্দ্য চমকে তাকাল। বউয়ের এই নিষ্পাপ উত্তরে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “শিওর?”
এতক্ষণে রিদির মস্তিষ্কে সৌহার্দ্যের কথার মানে পরিষ্কার হলো। লজ্জায় তার দুগাল রাঙা হয়ে উঠল, দৃষ্টি নেমে এল নিচে। কোনো প্রতিউত্তর করতে পারল না সে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমতা আমতা করে বলল, “আমি… আমি আর খাব না।”
সৌহার্দ্য একটা কলা তার হাতে দিয়ে বলল, “ওকে, এটা শেষ করো।”
রিদি, দু-এক কামড় খেয়েই কলাটা রেখে দিলো। সৌহার্দ্য বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে কলাটা তুলে নিয়ে নিজে খেতে শুরু করল। বিরক্তিটুকু চাপা দিয়ে ধমকের সুরে বলল, “স্টুপিড, পাখির মতো খাওয়া কখন বন্ধ করবে? খাবার অর্ধেক ফেলে দেওয়া এটা কেমন বাজে অভ্যাস?”
রিদির এই অভ্যাসটা সৌহার্দ্য অনেকবার লক্ষ্য করেছে। মেয়েটা কোনো কিছুই শেষ করতে পারে না, অল্প একটু খেয়েই রেখে দেয়। এখন যেহেতু প্রায় সময় তারা একসঙ্গেই খায়, সৌহার্দ্য বিনা সংকোচে রিদির ফেলে রাখা সেই অর্ধেক খাবারটুকু খেয়ে নেয়। কিন্তু এই অভ্যাসে বিরক্তি যে লাগে না তা নয়, তবুও বউকে কষ্ট পাবে ভেবে কিছু বলতেও পারে না। অথচ সৌহার্দ্য কতটা খুঁতখুঁতে! বাইরের কোনো গ্লাসে পানি পর্যন্ত সে মুখে দেয় না, সেই মানুষটাই কি না কোনো সংকোচ ছাড়াই তৃপ্তির সাথে রিদির এঁটো খাবার শেষ করে ফেলে! শুরুতে রিদির ব্যাপারটাতে অবাক হলেও, এখন দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
রিদি সৌহার্দ্যের কথার কোনো উত্তর দিল না, বরং কলেজের উদ্দেশ্যে রেডি হতে চলে গেল। কিন্তু মনে মনে ভাবল, কী-ই বা বলবে! সত্যিই তো, এটা একটা বাজে অভ্যাস, কিন্তু কী করবে? ছোটবেলা থেকেই যে এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে! আর এটার জন্য দায়ী তার বাবা। রিদি কোন খাবার না খেতে পারলে তিনি তখন বলতেন, “অন্যটা ট্রাই করো, যেটা পারছোনা সেটা খেতে হবে না!”
বেলা তখন প্রায় এগারোটা। আকিব শিকদারের ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে। সামনে বসে আছে শাহাবীর। আকিব শিকদারের চোয়াল শক্ত, রাগে তার সারা শরীর কাঁপছে। অনেকক্ষণ নিজেকে শান্ত রাখার বৃথা চেষ্টার পর হঠাৎই চিৎকার করে উঠলেন তিনি, “কোথায় ছিলে তুমি? ওই চালানটা পুলিশের হাতে গেল কীভাবে? ভাইজান যে কী পরিমাণ রাগে ফুঁসছেন, তার কি কোনো ধারণা আছে তোমার? আমার তো মনে হয়, ওই বেয়াদব ছেলেটা আর ওই বজ্জাত এমপির কারসাজি এসব! তুমি কি বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে আমাদের ব্যবসার সর্বনাশ করছো, বীর? কত কোটি টাকার লস হয়েছে জানো?”
শাহাবীর অটল। বাবার উত্তেজনার বিপরীতে সে বসে রইল হিমশীতল শান্ত হয়ে। বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, অত্যন্ত ধীর এবং মাপা গলায় সে বলল, “আমি খোঁজ নিয়েছি, এ ব্যাপারে ওদের কোনো হাত নেই। এটা ওই নতুন আসা সিআইডি অফিসারের কাজ। তুমি টেনশন করো না, আমি দেখছি বিষয়টা।”
কিন্তু শাহাবীরের এই শান্ত আশ্বাস আকিব শিকদারের অস্থিরতা কমাতে পারল না। তিনি আরও কঠোর স্বরে বললেন, “শুধু ‘দেখছি’ বললে হবে না, বীর! যেভাবেই হোক, ওই সিআইডিকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। আর শুনলাম, আকরাম ভাইজানের খুনের মামলাটা নিয়ে নাকি সে আবার কোর্টে আপিল করছে? সেটা এক্সিডেন্ট ছিল বলে আমরা বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি, তাহলে এখন কেন সেটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি হচ্ছে? ওই ছেলে আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলানোর সাহস পাচ্ছে কোথায়?”
বাবার প্রতিটি কথায় তিক্ততা থাকলেও শাহাবীরের মুখাবয়বে কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না। সে শুধু শান্ত, নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দিল, “সেটা আমি বলতে পারবো না। হয়তো তার মনে কোনো খটকা আছে, আর খুনের রহস্য যখন, তখন সে হয়তো শেষ পর্যন্ত দেখবে—সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। আর শ্বশুর হয় আকরাম খান, তার তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছো পাপা!”
কথাটা বলেই আকিব শিকদারকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, নিস্তব্ধ ঘরটিতে একরাশ অস্থিরতা রেখে শাহাবীর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল।
বেলা তখন প্রায় দুটো। কলেজ শেষ করে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিদি। হাতে ধরা একটা চকলেট, তাতে আলতো কামড় বসিয়ে সে উদাস চোখে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। সৌহার্দ্য মেসেজ করেছে অপেক্ষা করতে, কিন্তু দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও তার কোনো দেখা নেই। এর মধ্যেই শাহাবীর এসে দেখা করে একগাদা চকলেট দিয়ে গেছে। রিদি বিরক্ত হয়ে ভাবল, সৌহার্দ্যের চেম্বারের দিকেই এগিয়ে যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে সৌহার্দ্য এসে তার সামনে হাজির।
সৌহার্দ্য চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে রিদির কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। রিদির মুখের একপাশে লেগে থাকা চকলেটের একটু অংশ পরম মমতায় মুছে দিয়ে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কোথায় পেলে?”
রিদি সৌহার্দ্যের মুখের সামনে চকলেটটা বাড়িয়ে দিয়ে সহজভাবে বলল, “ভাইয়া এসেছিল।”
সৌহার্দ্য চকলেটে একটা কামড় বসিয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ব্যস্ততা থাকলেও রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল, “ওকে, চলো তোমাকে দিয়ে আসি।”
রিদি সৌহার্দ্যের সাথে আরও একটু ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “শুনন না, কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে আমার, নিয়ে যাবেন?”
সৌহার্দ্যের পরিকল্পনা ছিল রিদিকে বাড়ি নামিয়ে দিয়েই জরুরি একটা কাজে যাওয়ার, কিন্তু বউয়ের এমন আদুরে আবদার ফেরানোর সাধ্য তার হলো না। তার হৃদয়ের সব ব্যস্ততা মুহূর্তেই যেন ধুয়ে গেল। রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, “ওকে। বাট কোথায় যেতে চাও?”
রিদি একটু ভেবে বলল, “একটু গ্রাম্য টাইপ কোথাও চলুন না?”
সৌহার্দ্য শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “ওকে, সুইটহার্ট।”
গাড়ির দরজা খুলে রিদিকে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল সৌহার্দ্য।
শহরের পিচঢালা রাস্তা ছাড়িয়ে গাড়িটি যখন মেইন রোড ধরে এগোচ্ছিল, দুপাশের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। জানালা দিয়ে আসা বাইরের স্নিগ্ধ বাতাস রিদির এলোমেলো চুলগুলোকে বারবার তার মুখের ওপর উড়িয়ে দিচ্ছিল। রিদি হাত দিয়ে চুলগুলো বার বার কানের পাশে গুঁজে দিচ্ছে, তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সৌহার্দ্য এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে মাঝে মাঝেই আড়চোখে রিদির দিকে তাকাচ্ছে; তার মনে হচ্ছে, এই শান্ত বিকেলে রিদির স্নিগ্ধ মুখশ্রীর সাথে প্রকৃতির এই রূপ যেন মিশে গেছে।
কিছুক্ষণ যেতেই পথের মোড় ঘুরতেই চোখে পড়ল দিগন্তজোড়া ফসলি মাঠ আর তার গা ঘেঁষে বয়ে চলা এক শান্ত বিশাল দিঘি। দীঘির স্থির জলে বিকেলের ম্লান রোদ চিকচিক করে উঠছে, যেন কেউ রূপালি রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে! গাড়ি যত এগোচ্ছিল, আধুনিক সভ্যতার কোলাহল ততটাই ফিকে হয়ে আসছিল। এক সময় কাঁচা রাস্তার শেষে দিঘির পাড়ের এক নির্জন জায়গায় এসে তারা পৌঁছাল। প্রকৃতির এই নীরবতা আর দিঘির কলতানটুকু একান্তভাবে অনুভব করতে সৌহার্দ্য গাড়িটি ধীর গতিতে একপাশে থামাল।
গাড়ি থেকে নেমেই রিদি ছুটল দিঘির কিনারায়। খোলা বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে, পানির কলকল শব্দে চারপাশটা কেমন নেশা ধরানো। রিদি দুচোখ ভরে সেই স্নিগ্ধতা উপভোগ করছিল, ঠিক তখনই আচমকা অনুভব করল— কেউ খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে!
মুহূর্তেই শরীরটা কেঁপে উঠল ওর। পেছন থেকে সৌহার্দ্য ঠিক ওর ঘাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। পুরুষালি সুগন্ধটা রিদির নাকে আসতেই ও থমকে গেল। সৌহার্দ্য রিদির কানের একদম কাছে মুখটা নামিয়ে আনল; তার গরম নিঃশ্বাস রিদির কানের লতিতে লাগতেই মেয়েটার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা বৈদ্যুতিক স্রোত বয়ে গেল। সৌহার্দ্য ফিসফিস করে বলল, “তোমার চাওয়া তো পূরণ করলাম, সুইটহার্ট। এবার আমারটা পূরণ করবে না? এভাবে আর কতদিন আমায় উপোষ রাখবে?”
রিদির গাল লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা যেন একদম বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে। সে নিচু গলায় মিনমিন করে বলল, “আমি কি উপোষ থাকতে বলছি আপনাকে! আপ…. বলতে গিয়েই ওর ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, থেমে গেল ও। সত্যিই তো, সৌহার্দ্যকে তো সে কখনো বারণ করেনি। কিন্তু সৌহার্দ্য যখন কাছে আসে, তার সেই উন্মত্ত অস্থিরতা, রিদির ওপর তার অধিকার ফলানোর সেই তীব্র ব্যাকুলতা রিদিকে দিশেহারা করে দেয়। একটা সামান্য চুমুর আবদার মেটাতে গিয়ে সৌহার্দ্য যখন ওকে আগলে ধরে, তখন তার বেপরোয়া উন্মাদনা সামলাতে গিয়ে মেয়েটা হিমশিম খায়। তাই তো একটু ভয় পাই এই উন্মাদ পুরুষকে।
রিদির হঠাৎ থেমে যাওয়াটা সৌহার্দ্যের সহ্য হলো না। সে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র নেশায় মত্ত। রিদির এই লাজুক স্বীকারোক্তিটা যেন তার ভেতরের তৃষ্ণাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে আর দেরি করল না—হঠাৎ এক টানে রিদিকে নিজের কোলে তুলে নিল। নরম ঘাসের ওপর বসে রিদির পা দুটো নিজের কোমরে পেঁচিয়ে তাকে নিজের দিকে ভালো করে টেনে নিল।
রিদির লাজুক চোখের গভীরতায় তাকিয়ে, একদম নেশাতুর দৃষ্টিতে সৌহার্দ্য ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার সাথে মিশে যাও, সুইটহার্ট। আই প্রমিজ, একটুও কষ্ট দেব না।”
সৌহার্দ্যের চোখে তখন এক অসীম ব্যাকুলতা, যেন রিদিকে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিতে সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারছে না। রিদি তার উত্তপ্ত চাহনির সামনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল। চোখের পলক ফেলে সে শুধু আলতো করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানান দিলো!
সৌহার্দ্য ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসল। রিদির রক্তিম মুখটার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল, “কি ম্যাডাম, বুঝে-শুনে সায় দিলেন তো? আমি ঠিক কি বোঝাতে চাইছি?”
রিদি লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গেল। এই লোকটা যে তাকে লজ্জায় ফেলার কোনো সুযোগই ছাড়ে না, তা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। নিজেকে সামলাতে কথা ঘুরিয়ে রিদি সরাসরি সৌহার্দ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন?”
রিদির চোখের গভীরে তাকিয়ে সৌহার্দ্য তার নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে গম্ভীর, গমগমে স্বরে বলল, “নো! একটা স্টুপিড বউয়ের অপেক্ষায় ছিলাম, যে এসে আমার জীবনটা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করবে!”
সৌহার্দ্যের কথাগুলো রিদির একদমই ভালো লাগল না। বিরক্তিতে গাল ফুলিয়ে সে ঝাঁঝালো গলায় বলল, “আমি আপনার জীবনে না এলে তো কপালে বউ জুটতই না আপনার! এতো রাগ আর মেজাজ আপনার! আমি ভালো মেয়ে বলেই সব সহ্য করে নিচ্ছি।”
কথাটা বলেই সে সৌহার্দ্যের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল। কিন্তু সৌহার্দ্য যেন তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। রিদির নাকের ডগায় নিজের নাক ঘষে সে মৃদু স্বরে বলল, “বলো কী! এত বড় উপকার করে ফেললে আমাকে? তাহলে তো ম্যাডাম, এই উপকারের বিনিময়ে কড়া একটা চুমু দিতেই হয়!”
বলেই কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে রিদির কোমল ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিল। কিন্তু মুহূর্ত পেরুতেই বাতাসের বিপরীতে ভেসে এল এক কর্কশ, গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “কী হচ্ছে এসব এখানে?”
কানে আওয়াজ আসতে সৌহার্দ্য রিদিকে ছেড়ে দিয়ে পেছনে ফিরে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে দেখল, একদল মুরব্বি তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, চোখেমুখে তাদের ঘৃণ্য এবং বাঁকা চাহনি। পরিস্থিতি যে তাদের অনুকূলে নেই, তা বুঝতে সৌহার্দ্যের দেরি হলো না। লোকগুলোর নোংরা দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্যের বিরক্তি চরমে উঠল, কিন্তু সে পাত্তা দিল না। তার বউ, সে তার সাথে কী করবে—সেটা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব বিষয়।
লোকগুলো তেড়ে আসতে দেখে সৌহার্দ্য রিদিকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। রিদিকে পরম মমতায় নিজের কাঁধের কাছে টেনে নিয়ে একপ্রকার বুকের সাথে আগলে রাখল সে। দলের একজন লোক সামনে এসে বিষাক্ত স্বরে বলে উঠল, “এই মেয়ে নিয়ে এসে এসব নষ্টামি হচ্ছে?”
সৌহার্দ্যের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। কণ্ঠস্বর শীতল অথচ ধারালো করে সে বলল, “মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ! শি ইজ মাই ওয়াইফ।”
লোকটা এক গাল বাঁকা হাসি হেসে তাচ্ছিল্যভরে বলল, “ইংরেজি মারিও না ছেলে! তোমাদের মতো বড়লোক শহরের ছেলেদের ভালো করেই চিনি। একটা বাচ্চা মেয়ে তোমার মত দামড়া ছেলের বউ হবে?কাহীনি শিখাচ্ছো?ধরা পড়লে বউ পরিচয় দিয়ে নিজেদের হীন চাহিদা মেটানোর পর এই মেয়েদেরই ছুড়ে ফেলে দিবে, না হয় মেরে ফেলবে। প্রতিদিন এসব আমরা দেখছি!”
সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। এমনিতে তার মেজাজ রুক্ষ, তার ওপর রিদি পাশে আছে বলে এতদিন সংযত ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে সে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “আর একটা বাজে কথা বলবেন না! আমি খুব একটা ভালো মানুষ নই যে মুরব্বি বলে আপনার এসব নোংরা কথা হজম করব!”
তার কথার মাঝেই আরেকজন লোক তেড়ে এসে গর্জে উঠল, “এই ছেলে! তুমি ধমকাচ্ছ কাকে? জানো ওনি আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান? দোষ করে উল্টো গলাবাজি করছো!”
সৌহার্দ্য লোকটার অস্তিত্বকেই যেন পাত্তাই দিল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে পকেট থেকে ফোন বের করে ফারিসকে একটি বার্তা পাঠিয়ে দিল। চারপাশের পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, একের পর এক কটু কথা বাতাসে তীরের মতো বিঁধছে। রিদি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সৌহার্দ্যকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রিদির সেই কম্পন অনুভব করে সৌহার্দ্য ঝুঁকে এসে রিদির কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “রিল্যাক্স সুইটহার্ট, আই এম হিয়ার।”
জনসম্মুখে সৌহার্দ্যের এমন সাহসী এবং অসংলগ্ন আচরণে চারপাশের লোকগুলো যেন আরও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। একজন চিৎকার করে চেয়ারম্যানকে বলল, “দেখলেন মুরব্বি? কত বড় বেয়াদব! সম্মান পর্যন্ত জানে না, আমাদের সামনেই এসব অভদ্রতা করছে!”
চেয়ারম্যান লোকটি হাত তুলে সবাইকে থামালেন। তারপর সৌহার্দ্যের দিকে ঠান্ডা, ধীর গলায় বললেন, “ধরা খেলে সবাই বউ বলে পরিচয় দেয়। এতই যদি ভালোবাসা, তবে এই মুহূর্তে আমাদের সামনেই আবার বিয়ে করে প্রমাণ দাও দেখি, পারবে?”
সৌহার্দ্যের বিরক্তি এবার চূড়ান্ত সীমায়। গমগমে গলায় সে উত্তর দিল, “নো। আমার বউকে কেন আপনাদের সামনে নতুন করে বিয়ে করে প্রমাণ দিতে যাব? এই সৌহার্দ্য চৌধুরী কারো হুমকিতে বা চাপে কোনো কাজ করে না, যতক্ষণ না সে নিজে চায়!”
সৌহার্দ্যের এমন ক্ষিপ্ত আচরণে চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। উত্তেজিত লোকগুলোর চিৎকার আর কটু কথায় পরিস্থিতি তখন বারুদের স্তূপের মতো, যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। রিদি ভয়ে কুঁকড়ে গেল। এই জঘন্য পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সে এক অসহায় উপায় বেছে নিল। সৌহার্দ্যের শার্টের কোণা আলতো করে টেনে ধরে, নিচু স্বরে মিনমিন করে বলল, “আরেকবার বিয়ে করুন না ডাক্তার সাহেব, প্রথম বিয়েতে তো আমি ছোট ছি…”
রিদির এই অবুঝ আবদার সৌহার্দ্যের বিরক্তিকে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। সে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকাল। সৌহার্দ্যের কাছে বিষয়টা খুব স্পষ্ট—এভাবে তাদের মেনে বিয়ে করা মানে নিজের গায়েই কলঙ্ক লেপন করা, আর রিদির জন্য তো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। যদিও সে জানে রিদি ভয়ে দিশেহারা হয়ে এমনটা বলছে, তবুও তার এই সরলতায় সৌহার্দ্য স্থির থাকতে পারছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে, শান্ত পরিবেশকে তছনছ করে দিয়ে ধুলো উড়িয়ে সামনে এসে থামল কয়েকটি ঝকঝকে কালো গাড়ি। সবার আগে ফারিসের ব্ল্যাক মার্সিডিস, তার পিছু পিছু পুলিশের গাড়ি। ইঞ্জিনের শব্দ আর টায়ারের ঘষায় গ্রাম্য মোড়লদের দাপট মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। গাড়িগুলো থেকে সশস্ত্র পুলিশের দল নামতেই গ্রামবাসীরা ভয়ে পিছু হটল, তাদের সেই তেজ এক নিমেষে বরফের মতো জমে গেল।
গাড়ি থেকে ফারিস নামল। সৌহার্দ্যের চেহারা আর পরিস্থিতি দেখে তার পেটের ভেতর হাসির দমক আটকে রাখা দায় হয়ে পড়ল। রিদিকে আগলে দাঁড়িয়ে থাকা রাগী সৌহার্দ্যকে দেখে ফারিসের হাসি পেলেও সে জানে, এই মুহূর্তে হাসা মানেই সৌহার্দ্যের চড় খেয়ে নিজের মুখের নকশা পরিবর্তন করে ফেলা! ফারিস নিজেকে কঠোরভাবে সামলে নিয়ে গলার স্বর গম্ভীর করে এগিয়ে এল।
ফারিস একটু এগিয়ে এসে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল, “আপনাদের সমস্যা বুঝি না! আমরা নাদান শিশুগুলো, একটু শান্তিতে প্রেম করার জন্য একটু ঝেঁপে-ঝাঁপে উঁকি মারি, তাই বলে যেখানে-সেখানে কট খাইয়ে দিবেন? এটা ভালো কথা না চাচামিয়া! তাও আবার দেশের সেরা কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরীকে? টপ বিজনেসম্যান সারহান চৌধুরীর একমাত্র ভেজাল প্রোডা… না মানে ছেলেকে? এটা একটু বেশি হয়ে গেল না চাচা?”
চেয়ারম্যান লোকটা ফারিসকে দেখে আর বুঝতে বাকি রইলো না যে তারা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে। ফারিসের সাথে তার একবার দেখা হয়েছিল, তাছাড়া ফারিসের কাজের প্রশংসায় সোশ্যাল মিডিয়া সবসময় সরগরম থাকে, তাই তাকে চিনে নেওয়া খুব একটা কঠিন ছিল না। লোকটা প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে আমতা আমতা করে বলল, “আসলে বাবা, বুঝতে পারিনি। প্রায়ই তো খারাপ ঘটনা ঘটে, ভুল হয়ে গেছে! উনি যে ডাক্তার সৌহার্দ্য, সেটা শুরুতে পরিচিত লাগছিল ঠিকই, কিন্তু ভালো করে খেয়াল করিনি বাবা…”
কথাটা শেষ না করতেই সে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল, কিন্তু সৌহার্দ্যের সেই অগ্নিশর্মা রণমূর্তি চেহারা দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিছু বলার সাহস পেল না!
লোকগুলো যখন বারবার ক্ষমা চাইছে, সৌহার্দ্যের চেহারায় একরাশ বিরক্তি। সে গমগমে স্বরে বলল, “ইটস ওকে!” বলেই সে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল। হঠাৎ তার কানে যেন অনুরণন তুলল রিদির সেই মিনতিভরা কথা— “আরেকবার বিয়ে করুন না ডাক্তার সাহেব!” এই কথাটুকু যেন সৌহার্দ্যের হৃদস্পন্দন থমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
সৌহার্দ্যকে মাঝপথে স্থির হয়ে যেতে দেখে ফারিস ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কি হলো, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন?”
সৌহার্দ্য নিচের ঠোঁট কামড়ে গভীর কিছু একটা ভাবল। তার চোখের চাহনি বদলে গেছে, উত্তেজনার পারদ যেন এক মুহূর্তেই অন্য মাত্রায় মোড় নিল। এরপর গমগমে গলায় সে যা বলল, তাতে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সৌহার্দ্য সরাসরি চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে দৃপ্ত স্বরে বলল, “বিয়ে করব আমি! কাজির ব্যবস্থা করুন!”
চেয়ারম্যান লোকটি যেন আকাশ থেকে পড়লেন, তার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। যে ছেলেটিকে একটু আগে হাজার চাপাচাপি করেও বিয়েতে রাজি করানো যাচ্ছিল না, সে নিজেই কিনা এখন বিয়ের দাবি তুলছে! লোকটা হকচকিয়ে গিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “যেটা বলছি সেটা করুন!”
ফারিস বিরক্ত হলো প্রচুর। এটাকে ‘ভেজাল প্রোডাক্ট’ এমনি এমনি বলে না, কখন যে কি চায় সেটা বোঝার ক্ষমতা ওপরওয়ালা ছাড়া কারো নাই! তবুও নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “বউ মানি না-মানি না বলে, যেখানে সেখানে কট খাস, এক বউকে আ…” কিন্তু কথা শেষ করার আগেই সৌহার্দ্যের এক ‘রাম ধমকে’ ফারিস পুরোপুরি চুপসে গেল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সে সাথে সাথে কথা গিলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “না… মানে বলতে চেয়েছিলাম, তোর বউ, তুই বিয়ে করবি, এতে আমার কী! কর যা খুশি!”
সৌহার্দ্য ফারিসের কথার আর কোনো পাত্তাই দিল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে ফোন বের করে সরাসরি বাবা সারহান চৌধুরীকে ফোন লাগাল। পরিষ্কার গলায় নির্দেশ দিল মাকে নিয়ে দ্রুত সেই ঠিকানায় আসার জন্য এবং লোকেশন পাঠিয়ে দিল।
এদিকে রিদির অবস্থা তখন কাহিল। সকালের পর কিছুই খাওয়া হয়নি, তার ওপর এই চরম উত্তেজনার ধকল তার শরীরের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড ঝড় বইয়ে দিয়েছে। রিদি নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মাথাটা তার কেমন যেন চক্কর দিচ্ছে। চারপাশের শব্দগুলো ক্রমশ তার কাছে অস্পষ্ট মনে হচ্ছে! সৌহার্দ্য বুঝতে পেরে রিদিকে কাছে টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল!
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর সারহান চৌধুরী ও শাহেদা চৌধুরী উপস্থিত হলেন। ফারিসের কাছে সব ঘটনা শুনে তাদের সম্মানিত পুত্র যে এমন পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীর কাছে ‘কট’ খেয়েছে, তা জানতে পেরে সারহান চৌধুরীর পক্ষে হাসি আটকে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল। ছেলেকে নিয়ে বেশ ভালোভাবেই খোঁচাখুঁচি করলেন তিনি। কিন্তু সৌহার্দ্যের অবিচল মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, শুধু গমগমে স্বরে অদ্ভুত এক তেজ নিয়ে বলে উঠল, “বিয়ে করব, উপভোগ করো! দোয়া দাও যেন বছর ঘোরার আগেই তোমাকে দাদা বানাতে পারি!”
ছেলের এমন নির্লজ্জ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলা কথায় সারহান চৌধুরীর হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ছেলের ঔদ্ধত্য দেখে ওনার মুখটা চুপসে গেল; এই নির্লজ্জ ছেলের সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই! কখন কী বলে ইজ্জত খেয়ে দেবে তার ঠিক নেই!
কিন্তু এখানে এভাবে বিয়ে করবে শুনে সারহান চৌধুরী বিরক্ত হয়ে বললেন, “তোমার কি বিয়ে করার জন্য বাড়িঘর নেই? এখানে কেন বিয়ে করতে হবে? পুকুর পাড়ে এই জঙ্গল আর ধুলোবালির মধ্যে?”
সৌহার্দ্য বাবার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি কাজির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “বিয়ে পড়ান!”
কাজি অনেক আগে থেকেই উপস্থিত ছিল, কিন্তু সৌহার্দ্যের সেই অগ্নিশর্মা রণমূর্তি দেখে ভয়ে সে কুঁকড়ে গিয়েছিল। সৌহার্দ্যের রাগী চোখের ইশারাতেই তার কথা আটকে যাচ্ছিল। সে কোনো রকমে আমতা আমতা করে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “দেনমোহর… দেনমোহর কত বাঁধব বাবা?”
সৌহার্দ্য তার পাশে নিথর হয়ে বসে থাকা বউয়ের দিকে একবার তাকাল। তার চোখের কোণে তখনো রিদির প্রতি এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর অস্থিরতা। কোনো রকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই গমগমে স্বরে সে বলে উঠল, “বাঁধুন একশো টাকা! সাথে এই স্টুপিড মহিলার প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস সব আমার নামে লিখে দিন—যাতে আমাকে ছেড়ে যেতে চাইলে কোনো নিঃশ্বাস নিয়ে যেন যেতে না পারে!”
সৌহার্দ্যের এই রোমহর্ষক আর অদ্ভুত দাবির কথা শুনে কাজি থমকে গেল। উপস্থিত সবার অবস্থা তখন একই, যেন পাথরের মূর্তির মতো জমে গেছে তারা। এই ভরা জঙ্গল আর দিঘির পাড়ে এমন আজব দেনমোহরে বিয়ে পড়ানো তার দীর্ঘ পেশাজীবনের ইতিহাসে এই প্রথম! একটু ইতস্তত বোধ করে কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, “বাবা, এটা কি একটু বেশি না… মানে কম হয়ে গেল না…”
কাজি কথা শেষ করার আগেই সারহান চৌধুরী রেগে গিয়ে গর্জে উঠলেন, “তোমার টাকার এতই অভাব পড়লে আমাকে বলো, আমি দিচ্ছি! তবুও এমন…”
সারহান চৌধুরীর কথার মাঝখানেই সৌহার্দ্য তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, “আমার যা টাকা আছে, তোমার সব সম্পদ কিনেও আমার নাতি-পুতিরা আরামসে খেয়ে যেতে পারবে!”
ফারিস নাক-মুখ কুঁচকে তিক্ত কণ্ঠে বলল, “তাহলে এত কিপ্টামি করছিস কেন?” বলেই সে কাজির দিকে ফিরে আদেশ করল, “আপনি লিখুন তো ৫০ কোটি টাকা! ওর কথা শোনার দরকার নেই।”
কাজি বেচারা মহা ফ্যাসাদে পড়ল। যে পাত্র বিয়ে করছে সে বলছে ১০০ টাকা দেনমোহর, আবার তার বন্ধু বলছে ৫০ কোটি! কার কথা শুনবে, ভেবে সে কূলকিনারা পাচ্ছিল না।
সৌহার্দ্য একরাশ বিরক্তি নিয়ে কাজির দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠল, “লিখুন ১৫০ টাকা! বউ আমার, আপনাকে অন্য কারো কথা শুনতে হবে না। আমার কাছে ক্যাশ আছে ২০০ টাকা—১৫০ টাকা কাবিন, আর বাকি ৫০ টাকা দিয়ে বউকে চকোলেট কিনে দেবো। বিয়ের দিন মিষ্টিমুখ করাতে হয়!”
ফারিস আবার নাক-মুখ কুঁচকে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শাহেদা চৌধুরী তাকে থামিয়ে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “ও যেটা চাইছে করুক, কারো কিছু বলতে হবে না।”
শাহেদা চৌধুরী খুব ভালো করেই জানেন, সৌহার্দ্য মাসখানেক আগেই নিজের সম্পত্তির ৯০ শতাংশ রিদির নামে করে দিয়েছে। এই কথা সৌহার্দ্য কেবল তাকেই জানিয়েছিল, বাড়ির আর কেউ বা রিদি তা জানে না। তাই রিদির জন্য সৌহার্দ্যের এই তুচ্ছ অংকের কাবিন যে আসলে প্রতীকী, তা মা হিসেবে তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছেন।
এদিকে সব দ্বন্দ্বের মাঝে রিদি বসে আছে এক পাশে, শাহেদা চৌধুরীর বুকের সাথে লেপ্টে। সৌহার্দ্য এক টাকা দিয়ে বিয়ে করলেও তার কিছু এসে যায় না, সে শুধু সৌহার্দ্যের সেই শীতল দৃষ্টি আর আগলে রাখার ছোঁয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। সৌহার্দ্য রিদিকে এভাবে থাকতে দেখে একটু কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “সুইটহার্ট, খারাপ লাগছে?”
ছেলের এই প্রকাশ্য বেহায়াপনা দেখে সারহান চৌধুরী বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে কাজিকে তাড়া দিয়ে বললেন, “বিয়ে পড়ান! না হলে এই বেয়াদব ছেলের নির্লজ্জতা দেখতে দেখতে আমি হার্ট অ্যাটাক করবো!”
কাজি নিজেও প্রচণ্ড বিরক্ত, কিন্তু ভয়ে টু শব্দ করারও সাহস পাচ্ছেন না। জীবনে কম বিয়ে পড়াননি তিনি, কিন্তু এমন আজব বিয়ে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই প্রথম! সৌহার্দ্য যে একজন হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তার—এটা জানার পর কাজি আরও অবাক হয়েছেন। একে দেখলেই তো রোগী হার্ট অ্যাটাক করার কথা! এমন বদমেজাজি, বেপরোয়া আর খামখেয়ালি টাইপের ছেলে তিনি জীবনে খুব কমই দেখেছেন। নিজের অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে কাজি দ্রুত কাবিননামা লিখতে শুরু করলেন; এই আপদ থেকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় নেওয়া যায় ততই ভালো!
কাজি কাবিননামার লেখালেখি শেষ করে রিদির দিকে তাকিয়ে বিনম্র স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “সারহান চৌধুরী ও শাহেদা চৌধুরীর একমাত্র পুত্র সৌহার্দ্য চৌধুরীকে ১৫০ টাকা দেনমোহরে বিবাহ করতে রাজি থাকলে বলো মা—কবুল?”
রিদির বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। হৃদস্পন্দন তার বুকের খাঁচায় যেন তান্ডব নৃত্য করছে। আগের বিয়েটার সময় সে ততটা বুঝের ছিল না, ভালো করে বিয়ের মানেও জানতো না, চিনতো না সৌহার্দ্য চৌধুরী নামের মানুষটিকে। কিন্তু আজ, ভালোবাসার মানুষটির নামে ‘কবুল’ বলার সময় তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগার শিহরণ বয়ে গেল। সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিদির মুখের দিকে; রিদির প্রতিটি সেকেন্ডের বিলম্ব যেন তার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে। রিদি গভীর আবেগে ধীর কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “কবুল।”
কাজি আবার বললেন, “মা, নিয়ম অনুযায়ী আরও দুবার বলতে হয়।”
রিদি লজ্জারাঙা মুখে শান্ত স্বরে আরও দুবার বলল, “কবুল, কবুল!”
কাজি এবার সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করলেন, “আকরাম খান ও মালিহা খানের একমাত্র মেয়েকে…”
কাজি বাক্য শেষ করার আগেই সৌহার্দ্য অধৈর্য হয়ে বলে উঠল, “কবুল, কবুল, কবুল!” বলেই সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। উপস্থিত সবাইকে তোয়াক্কা না করে রিদিকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। রিদি চমকে গিয়ে সৌহার্দ্যের শার্ট শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সৌহার্দ্য লম্বা পায়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৩
সেখানে উপস্থিত সবাই যেন পাথরের মূর্তির মতো জমে গেছে, কারো মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। ফারিস নিজের বিরক্তি আর বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে আনমনেই সারহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “এই প্রোডাক্টটা আসলে কী খেয়ে জন্ম দিয়েছেন? এমন বেজ…” কিন্তু তার আগেই সারহান চৌধুরীর জ্বলন্ত দৃষ্টির মুখোমুখি হতে হলো তাকে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফারিস সাথে চুপসে গেল।
এদিকে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সারহান চৌধুরী রাগে-ক্ষোভে ফুঁসে উঠে গর্জে উঠলেন, “সবগুলো বেয়াদব! যাও, আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও সব বেয়াদবের দল!”
