Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫০

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫০

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫০
রিদিতা চৌধুরী

সকালটা আজ যেন সত্যিই এক অন্য আবেশে ঘেরা! ঘড়ির কাঁটায় কেবল সাতটা ছুঁইছুঁই। ঘুম ভাঙতেই চারপাশের স্নিগ্ধ রোদ আর ভোরের শান্ত বাতাসের ছোঁয়া ঘরের সমস্ত গুমোট ভাব এক নিমিষে উড়িয়ে দিল।
রিদি চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানায় উঠে বসল। আলগোছে চারপাশটায় চোখ বুলিয়েই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল—সৌহার্দ্য এখনো বাড়ি ফেরেনি! অবশ্য রাতে যাওয়ার সময় সে নিজেই কথাটা বলে গিয়েছিল, তবুও মন তো মানতে চায় না। ঘুমটা ও ভালো হয়নি, সৌহার্দ্যর বুকের মাঝে লেপ্টে না ঘুমলে আজকাল যেন একবারে ঘুম আসেনা!
একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রিদি বিছানা ছেড়ে পা বাড়াল। আলমারি থেকে নিজের কাপড়-চোপড়গুলো হাতে নিয়ে ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। বেশ খানিকটা সময় পর গোসল সেরে ভেজা চুলে যখন সে বাইরে এল, তখন হুট করে যেন মাথার ভেতর জরুরি কিছু একটা খেলে গেল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ড্রেসিং টেবিল থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিল। কন্টাক্ট লিস্টে আঙুল দ্রুত স্ক্রোল করে সুমির নাম্বারে ডায়াল করে কানের কাছে ধরল ফোনটা।
ওপাশ থেকে রিসিভ হওয়ার সাথেই রিদি একটু থমকে গিয়ে ধীর ও শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“কয়টা বাজে বের হবি, আমি প্রায় রেডি!”
ওপাশ থেকে সুমি মিষ্টি হেসে উত্তর দিয়ে বলল, “আমিও রেডি, জানু! পনেরো মিনিট পরেই বের হচ্ছি। তুই সোজা আমাদের বাড়ির সামনে চলে আয়, সায়েমও তো চলে আসছে।” একটু থেমে সুমির গলায় মন খারাপের সুর ভেসে এল, “ইশ্‌, পৃথাটার জন্য বড্ড মায়া হচ্ছে রে! ও আমাদের সাথে যেতে পারলে আজ আনন্দটা আরও দ্বিগুণ হতো।”
রিদির কথার রেশ ধরে সুমি আবার একটু ভাবুক হয়ে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা রে, স্যার শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন তো?”
রিদি একরাশ মন খারাপ নিয়ে মায়া জড়ানো কণ্ঠে বলে উঠল, “তোদের সাথে রাজশাহী যাব জানলে জীবনেও রাজি হতো না, আমি বলছি ভাইয়ার কাছে যাচ্ছি!”
সুমি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল, “যদি জেনে যায়?”
রিদির নিজেরও ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠলেও সে সাহসে ভর করে জবাব দিল, “আরে জানতে পারবে না, উনি শিকদার বাড়ি যাবেন না। একদিন যেহেতু থাকব বলছি, একদিন কিছু বলবে না, তবে কাল রাতের মধ্যে চলে আসতে হবে কিন্তু!”

সুমি শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “প্যারা নিস না, চলে আসতে পারব। কাল বিয়ে খেয়ে আমরা দুপুরের মধ্যে রওনা দিয়ে দেব, আসার পথে পদ্মা নদী দেখে আসব, চিল! তুই দ্রুত আয়, এখান থেকে যেতে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা লাগবে। আমরা যেন একটার মধ্যে চলে যেতে পারি, আব্বু বলছে আটায় রওনা দেবো!”
রিদি সায় জানিয়ে ফোনটা রেখে দিল।
ঠিক দুই দিন আগের কথা। সুমির খালার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে সুমিদের রাজশাহী যাওয়ার কথা। এই নিয়ে সুমি, রিদি, সায়েম আর পৃথার মধ্যে একটা জমজমাট গ্রুপ কল চলছে। কথায় কথায় সুমি ওদেরকে রাজশাহী যাওয়ার পরিকল্পনাটার কথা জানায়। ঠিক তখনই রিদি হঠাৎ করে পদ্মা নদী দেখার জন্য এক তীব্র কৌতূহল আর দারুণ আগ্রহ প্রকাশ করে বসল। রাজশাহী থেকে যে পদ্মা নদীকে কতটা মোহময়ী রূপে সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়, সেই কথাই সে উত্তেজনার সাথে বলছিল।
রিদির কথা শেষ হতে না হতেই সুমি হাসিমুখে তাদের সবাইকে এক অদ্ভুত উৎসাহে তাদের সাথে রাজশাহী যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে বসল। সায়েম তো মুহূর্তের মধ্যে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু বাঁধ সাধল পৃথা আর রিদি। পৃথার বর্তমান পরিস্থিতিতে চাইলেও এই মুহূর্তে যাওয়াটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর রিদির সমস্যার জায়গাটা তো একদমই আলাদা—সে মনে যতই চাক না কেন, সৌহার্দ্যকে রাজি করিয়ে এত দূরে যাওয়া যে অসম্ভব! সৌহার্দ্য জীবনেও এই ব্যাপারে এক ফোঁটাও রাজি হবে না—
ঠিক তখনই সায়েম একটা বুদ্ধি দিল—সৌহার্দ্যকে ইনিয়ে-বিনিয়ে ভালোবাসা দেখিয়ে মন গলিয়ে যদি রাজি করানো যায়, তবেই কাজ হবে! ব্যস, আর পায় কে রিদিকে? সে তখনই নেমে পড়ল সৌহার্দ্যকে রাজি করানোর কঠিন এক মিশনে।

রিদি খুব ভালো করেই জানত, সরাসরি রাজশাহীর কথা বললে সৌহার্দ্য জীবনেও রাজি হতো না। তাই সে এক চরম কৌশল বেছে নিল—রাজশাহীর নাম না নিয়ে সে টেনে আনল ‘শিকদার বাড়ি’র প্রসঙ্গ! রিদি জানে, সৌহার্দ্যর শিকদার বাড়ির প্রতি তীব্র অনীহা; অতিরিক্ত প্রয়োজন ছাড়া সে ওই বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত মাড়ায় না। আগেও রিদির তীব্র অভিমানের জন্যই কেবল সে দুই-তিনবার সেখানে গেছে। তবে কখনো থাকেনি, এমনকি এর আগেও রিদি যখন টানা দুই দিন শিকদার বাড়িতে ছিল, সৌহার্দ্য একবারের জন্যও সেই বাড়িতে পা রাখেনি! উল্টো রিদি কলেজ গেলে নিজের চেম্বারে ডেকে নিয়ে রিদির সাথে সময় কাটিয়েছে সে।
তাই রিদির মনে এক চিলতে স্বস্তি ছিল—এই নিয়ে কোনো ঝামেলাই হবে না। যদি ঠিকঠাক টাইমে ফিরে আসা যায়, তবে সৌহার্দ্য ঘুণাক্ষরেও টেরও পাবে না!
রিদি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না; সুমির ফোনটা রেখেই দ্রুত তাদের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের আলমারি থেকে কিছু দরকারি ড্রেস আর একদম সিম্পল কিছু জুয়েলারি ব্যাগে ভরে নিল তড়িঘড়ি করে। এরপর শাহেদা চৌধুরীর কাছে গিয়ে অনুমতি নিয়ে, হালকা কিছু মুখে গুঁজে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।
পথ তো আর কম নয়—বহু দূরত্বের পথ! সুমির বাবা তাই বারবার তাগাদা দিচ্ছিলেন দ্রুত রওনা দেওয়ার জন্য, যাতে যতটা সম্ভব দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।

বেলা তখন প্রায় এগারোটা বাজে। হাসপাতাল থেকে দীর্ঘ সময় সামলে সৌহার্দ্য মাত্র বাড়ি ফিরল। কিন্তু বিশ্রামের জো নেই—বিকালে আবার তাকে একটা বিশেষ কাজে বের হতে হবে। নতুন একটা হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজ চলছে সেখানে। ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই সৌহার্দ্যর একটা সুপ্ত স্বপ্ন ছিল—নিজের একটা হাসপাতাল গড়া, যেখানে দেশের গরীব ও অসহায় মানুষেরা সম্পূর্ণ ফ্রিতে চিকিৎসা সেবা পাবে। দেশে ফিরে আসার পর থেকেই সে এই স্বপ্নের হাসপাতালের জন্য জায়গা নির্বাচন করছিল।
প্রথমে একা হাতেই প্রজেক্টটা শুরু করার কথা ছিল তার। কিন্তু সুজন আর ফারিস যখনই এ কথা জানতে পারল, তারা শেয়ারে থাকার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করে। বন্ধুদের এমন আন্তরিক আগ্রহ দেখে সৌহার্দ্য আর মানা করেনি।
ভারাক্রান্ত ও ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ঢুকেই সৌহার্দ্য অভ্যাসবশত চেঁচিয়ে রিদিকে ডাকতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। মনে পড়ে গেল, তার বউ তো এই মুহূর্তে বাড়িতে নেই! রিদি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরই অবশ্য তাকে ফোন করে শিকদার বাড়ি যাওয়ার কথা জানিয়েছিল। সৌহার্দ্য মনে মনে ঠিক করল, সন্ধ্যার দিকের কাজটা শেষ করেই রাতের মধ্যে একবার নিজের বউকে দেখে আসবে।
সৌহার্দ্য সব ভাবনা-চিন্তা ছেড়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। রাতে ঘুমাতে না পারায় ক্লান্তিতে শরীর আর একদমই চলছে না—এই মুহূর্তে এক চিলতে ঘুম তার কাছে ভীষণ জরুরি!

বেলা তখন প্রায় দুটো বাজে। রাস্তায় কোনো জ্যাম না থাকায় বেশ দ্রুতই যাত্রা শেষ করে দুপুর ১টার মধ্যেই সুমির খালার বাড়িতে পৌঁছে গেছে রিদিরা। বাড়িটার চারপাশজুড়ে এখন বিয়ের এক চমৎকার আনন্দঘন আমেজ। রিদি আসার পর থেকেই সুমির খালাতো বোনেরা ওকে ভীষণ আপন করে নিয়েছে। সবাই মিলে এখন বিয়ের কনের ঘরে বসে জমজমাট আড্ডা দিচ্ছে।
আড্ডার মাঝেই সুমি মিষ্টি হেসে প্রস্তাব তুলল, “আচ্ছা সিমি আপু, একটা কাজ করলে কেমন হয়? গায়েহলুদ তো রাত দশটার পর শুরু হবে, আমরা কি বিকালের দিকে একটু পদ্মা গার্ডেনে ঘুরে আসতে পারি? এখান থেকে তো মোটে দশ মিনিট লাগবে! রিদির পদ্মা নদী দেখার শখ, মূলত সেই কারণেই তো ওর ছুটে আসা। আর কাল তো দুপুরের মধ্যেই আমরা রওনা দেবো, তখন তো আর সময়ই পাবো না। যাবে নাকি তোমরা আমাদের সাথে? আমরা তো এখানকার তেমন কিছু চিনি না, তোমরা সাথে থাকলে অনেক সুবিধা হতো!”
সিমি একটু ভেবে শঙ্কার সুরে বলল, “যাওয়া তো যায় রে, কিন্তু মুরুব্বিরা কি যেতে দেবেন? ওনাদের তো হাজারটা নিয়ম আর কথা!”

অমনি রিদি চটপট করে এক গাল হেসে বলে উঠল, “আরে আপু, মুরুব্বিদের অত সব বলার দরকার কী? আমরা যে ঘুরতে যাচ্ছি, সে কথাটা বলব না! আমরা বরং বলব যে পার্লারে যাচ্ছি, ব্যস! তাহলে আর কেউ কিচ্ছু বলবে না। চলো না প্লিজ, একটু ঘুরে আসি!”
রিদির এমন চতুর বুদ্ধি দেখে সায়েম আড়ালে নাকমুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে উঠল, “খাটাশটা বলে কিনা, তার বউ নাকি একদম অবুঝ আর নাদান, মাথার ভেতর নাকি কোনো বুদ্ধিই নেই! আস্ত একটা শয়তানকে এক নিমিষে হাইকোর্ট দেখিয়ে দিতে পারবে, আর ওই খাটাশ বলে কিনা ও নাদান! আমার তো ইচ্ছে করছে খাটাশটার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিই তার এই ‘নাদান’ বউটার কারসাজি!”
সায়েমের এমন বিড়বিড় করার মাঝেই সিমির ছোট বোন মিষ্টি হেসে আদুরে গলায় বলে উঠল, “তাহলে সায়েম ভাইয়া, আপনিই তো আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবেন, তাই না?” (সায়েম আসার পর থেকেই মেয়েটা একটু একটু করে কাছে ঘেঁষার চেষ্টা চালাচ্ছে, যদিও সায়েমের দৃষ্টিতে তার কোনো পাত্তাই নেই)। সায়েম আর কথা বাড়াল না, শুধু ক্লান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু মাথা নেড়েই ড্রাইভিংয়ের দায়িত্বে সায় জানাল।

সিমি চোখের পলকে সবটা ভেবে নিয়ে মত দিল, “তাহলে এক কাজ করা যাক। আমরা গায়েহলুদের শাড়িটা পরেই বেড়িয়ে পড়ি! পরে ঘোরাঘুরি শেষ করে একেবারে সোজাসুজি পার্লারে চলে যাবো, মেকআপ করে সোজা অনুষ্ঠানে আসবো, কেমন হয়? এমনিতেই আমি খুব ভালো শাড়ি পরতে পারি, তোমাদের সবাইকে আমিই নিজ হাতে পরিয়ে দেবো। তাছাড়া শাড়ি পরে ঘুরলে দারুণ কিছু ফটোশুটও করা যাবে, মেমোরি হয়ে থাকবে!”
সবাই এক বাক্যে এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু মুহূর্তেই রিদির উচ্ছ্বসিত মুখটা মলিন হয়ে গেল, সে মন খারাপ করে বিমর্ষ সুরে বলে উঠল, “কিন্তু আমি তো কোনো শাড়িই সাথে করে আনিনি…”
সিমি স্নেহের সুরে আলতো করে রিদির হাত জড়িয়ে ধরে বলল, “আরে দূর পাগলী, এটা কোনো কথাই হলো না! আমার হলুদের জন্য দুটো শাড়ি কেনা হয়েছে, ভাবছিলাম আমি আর আমার বোন ম্যাচিং শাড়ি পরবো। মিলি নাহয় অন্যটা পরে নেবে, তুমি আমার সাথে ম্যাচিং করা শাড়িটা পরে নাও। তুমি মানুষটাই এত অপরূপ মিষ্টি, ওই শাড়িটা তোমায় জাস্ট প্রিন্সেসের মতো মানাবে!”
মিলীও বোনের কথায় জোরালো সমর্থন জানিয়ে হাসিমুখে সায় দিল।

সৌহার্দ্যের ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। চোখ মেলে হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাতেই সে দেখল—ঘড়ির কাঁটা প্রায় দুপুর তিনটা ছুঁই ছুঁই। উঠতে গিয়েও সে আর উঠতে পারল না; বরং বালিশে মাথা রেখেই পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে রিদির নাম্বারে ডায়াল করল। বেশ কিছুক্ষণ ফোন বাজার পর ওপাশ থেকে রিসিভ হলো।
রিদি কিছু বলার আগেই সৌহার্দ্য কপাল কুঁচকে, বিরক্তি ঝরানো কণ্ঠে বলে উঠল, “প্রবলেম কী তোমার? ফোন রিসিভ করতে এত সময় লাগল কেন?”
বিয়েবাড়ির শোরগোল থেকে দূরে একটু নিরিবিলি জায়গার খোঁজে অনেকটাই হেঁটে সময় লেগে যাওয়ায় রিদি কিছুটা ঘাবড়ে গেল। কী বলবে সে মুহূর্তে ভেবে পেল না। আমতা আমতা করে সে বলল, “আসলে… ফুপির কাছে ছিলাম তো, তাই! আপনি… আপনি খেয়েছেন?”

সৌহার্দ্য অবশ্য রিদির কথায় কোনো সন্দেহ করল না। তার জানামতে, তার বউ তাকে কখনো মিথ্যা বলবে না—বউয়ের প্রতি এইটুকু অন্ধ বিশ্বাস তার আছে। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে সৌহার্দ্য বলল, “না, এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলাম। তোমাকে ছাড়া ভালো করে ঘুম হয়নি আমার। প্লিজ, আজকে রাতে চলে এসো না, হার্ট?”
সৌহার্দ্যের কথাগুলো কানে যেতেই রিদির বুকটা ধক করে উঠল। অপরাধবোধে তার গলা জড়িয়ে এল, চোখে এল জল। কোনোমতে মিনমিন করে, কাঁদো কাঁদো স্বরে সে বলে উঠল, “এমন করবেন না প্লিজ! আজ রাতটুকুই শুধু থেকে যাই, আমার লক্ষ্মী বরটা! কাল বাড়ি ফিরে আপনাকে একদম স্পেশাল একটা সারপ্রাইজ দেব, প্রমিজ!”

বউয়ের এই মিষ্টি ছলচাতুরি আর আবদার বুঝতে পেরে সৌহার্দ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মোবাইলের স্ক্রিনেই কয়েকটা চুমু দিয়ে সে নরম গলায় বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে! তবে সাবধানে থেকো, জান। একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি—যদিও এসব আমি বিশ্বাস করি না, তবুও মনটা কেমন যেন করছে। কোনো সমস্যা হলেই কিন্তু আমাকে ফোন দেবে, হার্ট। রাখছি এখন, আমাকে একটু বের হতে হবে।”
রিদি সায় দিয়ে বলল, “ঠিক আছে, খেয়ে তারপর বের হন।”
বলেই সে ফোনটা কেটে দিল, তারপর বুকে হাত দিয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। এই মুহূর্তে রিদির নিজেরও মনে হচ্ছে, এভাবে আসা তার একদমই উচিত হয়নি!

বেলা তখন প্রায় চারটা বাজে। ফারিস পার্টি অফিসে বসে দলীয় কিছু নেতাকর্মীর সাথে জরুরি কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। মিটিংটা শেষ করেই তাকে সৌহার্দ্যর সাথে কোনো একটা কাজে বের হতে হবে, তাই সে একটু দ্রুত মিটিংটা গুটিয়ে আনার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই হুট করে ঝংকার তুলে বেজে উঠল ফোন—”জামাই ৪২০!”
এমন আজব একটা রিংটোন শুনে মিটিংয়ে উপস্থিত সবাই তো একেবারে হতবাক! সবাই অবাক হয়ে ফারিসের দিকে তাকাতেই ফারিস লজ্জায় আর বিব্রততায় কেশে উঠল। সে নিজেও সমানভাবে অবাক—তার ফোনে তো একটা দারুণ মার্জিত রিংটোন সেট করা ছিল, তবে এই অদ্ভুত গানটা এল কোত্থেকে? ফারিস বন্ধুদের সাথে যতই দুষ্টুমি করুক না কেন, কাজের জায়গায় সে সবসময় তার পার্সোনালিটি নিখুঁত বজায় রাখে।

চট করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে রিভার নাম দেখেই সে সব ডালপালা বুঝে ফেলল! এই মেয়েটা তাকে সারাজীবন জ্বালিয়ে মারবে মনে হয়। ফারিসের তো মাঝে মাঝে নিজের আর সৌহার্দ্যের ভাগ্য দেখে করুণা হয়—দুই ভাইয়ের কপালেই জুটেছে দুটো আস্ত পাগল! সৌহার্দ্য তো খালাতো বোনকে বিয়ে করে ফেঁসে গেছে, আর সে ফেঁসেছে ফুফাতো বোনকে নিয়ে! এজন্যই বোধহয় প্রবাদ আছে, ফুফাতো-খালাতো বোনকে মন দেওয়া উচিত নয়! বোনকে বোনের দৃষ্টিতে দেখা উচিত!
সব বিরক্তি আর রাগ এক নিমিষে ঝেড়ে ফেলে ফারিস একটু দূরে সরে গিয়ে বিরক্ত মুখে ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকেই ভেসে এল রিভার সেই চিরচেনা ন্যাকামো-মাখা কণ্ঠস্বর, “নির্লজ্জ এমপি সাহেব, আপনার ফোনটা সবসময় বিজি পাই কেন বলুন তো? যখনই ফোন দিই, তখনই লাইন ব্যস্ত!”
রিংটোনের কাণ্ড নিয়ে ফারিস এমনিতেই মাথা গরম করে ছিল, তার ওপর রিভার এমন অনুযোগ শুনে রাগটা যেন এক মুহূর্তের জন্য বহুগুণ বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ওরে পকেট সাইজের ঝড়! আমার ফোনে এই আজব রিংটোন কে সেট করেছে রে? তুই আমার ইজ্জত নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলছিস কেন বল তো? বাড়ি আসি আজ, থাপড়ে তোর ফোকলা দাঁত সব ফেলে দেব, একদম বেয়াদব কোথাকার!”

কিন্তু রিভা ফারিসের এই ধমককে বিন্দুপরিমাণ পাত্তাও দিল না। সে উল্টো আদুরে গলায় বলে উঠল, “ইস, ফারিস ভাই একদম রাগ দেখাবেন না তো! যেটা লাগিয়েছি ওটা আমার ভীষণ প্রিয় একটা গান, তাই ওটা আপনার মোবাইলে থাকবে। ভুলেও পাল্টানোর চেষ্টা করবেন না বলছি! যদি পাল্টান, আমি কিন্তু আর কখনো আপনার সাথে একটা কথাও বলব না! আজ সকালে যাওয়ার সময় একটা ভালো করে চুমু না দিয়েই তো চলে গেছেন, তাই এখন আমার ভীষণ চুমু খেতে ইচ্ছে করছে! তাড়াতাড়ি বাড়ি আসুন বলছি!”
রিভার এমন নির্লজ্জ বায়না শুনে ফারিস তো রীতিমতো কাশতে শুরু করল! তার বউটা যে তার থেকেও দশ ডিগ্রি বেশি বেহায়া, সে নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। এদিক-সেদিক আড়চোখে তাকিয়ে কেউ দেখছে কি না দেখে ফারিস বাধ্য হয়ে ফিসফিস করে রিভাকে ফোনের মাধ্যমেই দুটো-তিনটে চুমুর শব্দ উপহার দিয়ে বলল, “শোন সোনা, এখন এই মোবাইল চুমু নিয়ে শান্ত হয়ে থাক! বাড়ি ফিরি, তারপর লাইভ দিবো! এখন রাখ তো, তোর ভাইয়ের সাথে এক্ষুনি বের হতে হবে সোনা! আর রাগ করিস না আমার চুনুমুনুর আম্মু!”
রিভাকে আর একটাও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে কড়মড় করে ফোনটা কেটে দিল। এরপর নিজে নিজে বিড়বিড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কট খেয়ে একেবারে পাগলের বংশ জুটিয়েছি একটা! খোদা, এই পাগলগুলোর গর্ভে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী বা জন্ম নেবে কে জানে!”

চারদিকে ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সন্ধ্যা ছ’টা। কিছুক্ষণ আগেই পদ্মার পাড়ে ঘুরতে এসেছিল রিদি, সায়েম, সুমি আর সিমিরা।
পশ্চিম আকাশে তখনো অস্তগামী সূর্যের শেষ রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে পদ্মার বিশাল বুকে। নদীর ঢেউগুলো সোনালি-কমলা আলোয় চিকচিক করছে, মনে হচ্ছিল হাজারো ছোট ছোট হীরের কণা বুঝি ভেসে বেড়াচ্ছে জলে। দূরে ভেসে যাওয়া দু-একটি নৌকার মাঝিদের বৈঠার ছলছল শব্দ আর নদীর শীতল বাতাস মিলে চারপাশে তৈরি করেছিল এক অপার্থিব শান্তি। নদীর ওপারের অস্পষ্ট সবুজ রেখা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর পদ্মার বুকে শহরের আলোগুলোর মায়াবী প্রতিচ্ছবি জ্বলজ্বল করে উঠছে।
রিদি, সায়েম ও সুমি তখন চটপটে আনন্দে চারপাশ ঘুরে দেখছিল আর ছবি তুলছিল। সিমিরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের সেই উল্লাস দেখছে; যেহেতু তারা প্রায়ই এখানে আসে, তাই এই দৃশ্য তাদের কাছে খুব একটা নতুন কিছু ছিল না।

সবাই যখন নিজেদের মতো ব্যস্ত, ঠিক তখনই ঘটে বিপত্তি। রিদি বাকিদের থেকে একটু সামনে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ কোথা থেকে যেন দুটো হুলো শরীরের মোটা লোক এসে তার মুখ চেপে ধরে! মুহূর্তের মধ্যে তাকে জোর করে একটি গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায় তারা।
ঠিক সেই মুহূর্তে সায়েম ও সুমির চোখে বিষয়টি পড়ে যায়। বন্ধুকে বাঁচাতে তারা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসে। লোকগুলোর সাথে সায়েম আর সুমির শুরু হয় এক তুমুল ধস্তাধস্তি। কিন্তু একা কতক্ষণ লড়া যায় এমন মোটা মোটা লোকের সাথে? মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের উৎসুক মানুষের ভিড় জমে ওঠার উপক্রম হতেই ঘাবড়ে যায় অপহরণকারীরা। ধরা পড়ার ভয়ে লোকগুলো তাদের পকেটে থাকা ক্লোরোফর্ম চেতনানাশক মেশানো রুমাল সায়েম আর সুমির মুখে চেপে ধরে। মুহূর্তের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ে তারা। এরপর আর কোনো প্রতিরোধ করার সুযোগ না দিয়েই অচেতন রিদি, সায়েম ও সুমিকে টেনেহিঁচড়ে দ্রুত গাড়িতে তুলে চোখের নিমিষে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় সেই গাড়িটি।

প্রায় ঘন্টাখানেক পার হতেই রিদি পিটপিট করে চোখ মেলল। চারপাশে তাকাতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল—এ যেন কোনো অন্ধকার গোডাউনের মতো একটা অচেনা ঘর! আগের মুহূর্তের সব ঘটনা মাথার মধ্যে ভিড় করতেই ভয়ে ছোট্ট বুকটা থরথর করে কেঁপে উঠল। পাশ ফিরেই সুমি আর সায়েমকে দেখতে পেয়ে মেয়েটা যেন প্রাণ ফিরে পেল। সুমির তখনো জ্ঞান ফেরেনি, আর সায়েম চরম এক অসহায় দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে।

রিদি ভয়ে ভয়ে চোখ ঘুরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখল, একটা মোটাসোটা লোক তাদের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটাকে দেখে রিদির ভেতরে থাকা রাগ আর বিরক্তি একসাথে উথলে উঠল। সে একটু বিরক্তিকর সুরে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, “এই মুটু মামু, আমাদের কোথায় তুলে এনেছেন হ্যাঁ? আপনাদের কি একটুও কমনসেন্স নেই? আমরা আপনাদের এলাকায় ঘুরতে এসেছি, আর আপনারা এভাবে জোর করে তুলে নিয়ে এলেন? তাও আবার কেমন একটা জায়গায়! যখন আনলেনই, তখন অন্তত একটা ভালো জায়গায় আনতে পারতেন, চারপাশে কত মশা দেখছেন?”
কালো ওভারওয়েট লোকটা রিদির মুখে ‘মামু’ ডাক শুনে নাকমুখ কুঁচকে একদম খিঁচিয়ে উঠল। এই মেয়ে তাকে কোন আক্কেলে মামু ডাকছে? তার তো এখনো বিয়েই হয়নি, বয়স মাত্র ছাব্বিশ-সাতাশ হবে! কোন দিক থেকে তাকে এই মেয়ের মামু মনে হয়?
বিরক্তিতে মুখ কালো করে লোকটা বলতে গেল, “আপা মনি, আমাকে একদম মামু ডাকবেন না, আমার বয়স—”

কিন্তু তার কথা শেষ হতে দিল না সায়েম। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “মুটু ভাই, আপনার বয়স কত বা আপনার জন্মতারিখ কবে, তা জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমাদের নেই! ফালতু প্যাঁচাল বাদ দিয়ে আমাদের এখানে তুলে আনার আসল কারণটা কী, সেটা জলদি বলুন!”
সায়েমের কথার মাঝেই রিদি ব্যস্ত হাতে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগের পকেটগুলো হাতড়ে ফোনটা খোঁজার চেষ্টা করল। মুখে যতই বীরত্ব দেখাক না কেন, মনের ভেতর তার বুক কাঁপছে থরথর করে। কেন তাদের এভাবে তুলে আনা হলো, সেটা জানতে পারলে না হয় একটু ঠান্ডা মাথায় পরবর্তী প্ল্যান ভাবা যেত! কিন্তু কোথাও ফোনটা না পেয়ে রিদি এক নিমেষে বুঝে গেল, তাদের মোবাইলগুলো আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
রিদির এমন মরিয়া হয়ে ফোন খোঁজাখুঁজি দেখে সেই মোটা লোকটা বেশ ভদ্র সুরেই বলে উঠল, “আপা মনি, আপনারা কি কিছু খাবেন? শরীর খারাপ লাগছে!”

লোকটার মুখে এমন অপ্রত্যাশিত ভদ্রতা শুনে রিদি আর সায়েম দুইজনেই তো একদম আহাম্মক বনে গেল! জোর করে তুলে এনে আবার এত খাতিরদারি ও ভালো ব্যবহার—ব্যাপারটা কী? লোকটার এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে সায়েমের বুকের ভেতর যেন হঠাত করেই হিমালয়সম সাহস এসে ভর করল! সে একটু মুচকি হেসে টিপ্পনী কেটে বলল, “আরে মুটু ভাই, খাওয়ানোর জন্যই যদি আমাদের এখানে তুলে আনতে হতো, তবে এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল? কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেই তো পারতেন! আমরা কি তখন না বলতাম নাকি?”
লোকটা সায়েমের কথা শুনে আরেক দফা বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠল, “এই ছেরা, তুমি একদম চুপ থাকো! আমি তো ভাবিমনিকে বলছি! বড়ভাই বিশেষভাবে বলে দিয়েছেন, ভাবির যেন কোনো রকম অযত্ন বা কষ্ট না হয়!”

‘ভাবি’ কথাটা রিদির কানে যেতেই সে চমকে উঠল! বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠতেই সে একটা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “কী বলছেন? ডাক্তার সাহেব… আমাকে এখানে আনতে বলেছে? আমি তো জাস্ট একটু ঘুরতে এসেছিলাম বলে…”
রিদির কথা শেষ হতে না হতেই সায়েম নিজের কপালে সশব্দে একটা চড় মেরে বিড়বিড় করে উঠল, “খাটাশটার বউ দেখি আস্ত একটা গাঁদা ফুল! এই ভাই, তোর জামাই সৌহার্দ্য স্যার হতে যাবে কোন দুঃখে? এটা তো নিশ্চিত অন্য কোনো বড় মাপের গ্যাংস্টার হবে! আল্লাহ জানে, জীবনে কয়টা ছেলেকে গোল খাইয়ে রেখেছিস!”
ওদের এই তর্কাতর্কির মাঝেই সুমি চোখ কচলাতে কচলাতে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। চারপাশটা একবার দেখে সে ঘাবড়ে গিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলল, “আমরা কোথায় রে? আর এই মোটা হনুমানটা কে সামনে দাঁড়িয়ে?”

সুমি মুখের ওপর ‘মোটা হনুমান’ ডাকটা শুনে লোকটার তো মাথায় আগুন ধরে গেল! সে জীবনের কত বড় বড় কিডন্যাপ করেছে, কিন্তু এমন আস্ত পাগলের দল সে জীবনেও দেখেনি। যাদের সাধারণ নিয়মে ভয়ে কাঁপথরথ করার কথা, তাদের আচরণে ভয়ের লেশমাত্র নেই—যেন তারা কোনো রিসোর্টে পিকনিক করতে এসেছে!
বিরক্তিতে ফেটে পড়ে রিদি লোকটার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে উঠল, “এসব ফালতু নাটক বন্ধ করুন আর আপনার ওই কথিত ভাইকে ডাকুন! আমাদের কাছে আপনাদের কী চাই, পরিষ্কার করে বলুন তো?”
লোকটা একটু আগের সেই রাগটা সামলে নিয়ে হঠাৎ করেই লাজুক একটা হাসি দিল। তারপর গদগদ সুরে বলল, “ভাই তো আপনাকে বিয়ে করবে, তাই তো তুলে আনতে বলেছে! ভাই একটু পরেই কাজী নিয়ে হাজির হচ্ছে।”
এই কথা কানে যেতেই রিদির বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল! রক্ত যেন মাথায় উঠে গেল তার। হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেল সেই ভয়ঙ্কর মানুষটার কথা—তাজওয়ান শিকদার! রিদির মনে হলো, সে বুঝি সৌহার্দ্যর কাছে মিথ্যে বলে আর শিকদার বাড়ির নাম ভাঙিয়ে এখানে এসে জীবনের সবথেকে বড় বোকামি করে ফেলেছে!
ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলেও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে রিদি আমতা আমতা করে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপ- আপনার ভাইয়ের নাম কি… তাজওয়ান শিকদার?”

লোকটা তার পান খাওয়া লাল লাল দাঁত বের করে খিকখিক করে হেসে বলে উঠল, “আরে ভাবি, আমাদের সাথে মশকরা করেন ক্যা? নিজের হবু বরের নাম কি আর আপনি জানেন না? ওই চেয়ারম্যানের পোলা পাভেল সরকার যে পিলারে পিলারে আপনার পেছনে লাইন মারে! আপনার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তাই ভাই রাগ করে আপনাকে সোজা উঠিয়ে আনতে বলেছে, আজকেই বিয়ে হবে আপনার ভাইয়ের সাথে!”
পাভেলের নাম শোনামাত্র রিদির আটকে থাকা দমটা এক নিমিষে ছেড়ে গেল। সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল—বুঝল, এই গুন্ডা গোছের লোকগুলো আসলে ভুল করে তাদের তুলে নিয়ে এসেছে!
সুমি তখন নাকমুখ কুঁচকে ঘৃণাভরে বলল, “খেয়ে খেয়ে আগাগোড়া আস্ত একটা ভুঁড়ি বানিয়েছিস, ভুল তো করবিই রে মোটা ষাঁড়! আস্ত একটা ভুল মানুষকে জোর করে তুলে এনেছিস তোরা!”
লোকটা সুমির কথায় এক ফোঁটাও বিশ্বাস করল না। সে ভাবল, এগুলো সব পালানোর ফন্দি। পাভেলের দেওয়া বর্ণনার সাথে মেয়েটির শাড়ির রঙ পর্যন্ত হুবহু মিলে গেছে। তাই সে বুঝল এই দলটা ভীষণ চালু, পাভেলের হুকুম ছাড়া এদের এক পা-ও নড়তে দেওয়া যাবে না।

রাত তখন প্রায় আটটা বাজে। সৌহার্দ্য, সুজন, ফারিস আর আরবান—চারজন মিলে নতুন হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজ দেখে ফিরছিল। ঠিক তখনই হঠাৎ বেজে উঠল সৌহার্দ্যর মোবাইলটা।
সৌহার্দ্য ফোনটা রিসিভ করে স্পিকারে দিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই ওপাশ থেকে সুমির বাবার আতংকিত ও কান্নাকাটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “বাবা সৌহার্দ্য… সুমি আর রিদিকে… কে বা কারা যেন জোর করে তুলে নিয়ে গেছে! আ…”

বাকি কথাটুকু শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে হাত রেখেই গাড়িটা সশব্দে এক টানে ব্রেক কষে থামাল। মুহূর্তের মধ্যে সৌহার্দ্যর সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে এল! রক্ত চলাচল যেন ওই এক সেকেন্ডের জন্য একদম বন্ধ হয়ে গেল। বুক চিরে বেরিয়ে আসা প্রচণ্ড আতঙ্কে তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল, কপাল বেয়ে গড়িয়ে নামল চিকন ঘামের ফোঁটা। আর সহ্য করতে না পেরে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ড্রাইভিং সিটের সাথে মাথাটা এলিয়ে দিল!
সুজন পাশ থেকেই বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা মারাত্মক ঘটেছে। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত এগিয়ে এসে সৌহার্দ্যর নাড়ি চেক করে বুঝল—সৌহার্দ্য পুরোপুরি সেন্সলেস হয়ে গেছে!
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সুজন তৎক্ষণাৎ আরবানকে ডেকে একটা জরুরি ইঞ্জেকশনের নাম বলে দিল। কিন্তু আশেপাশে কোনো ফার্মেসি আছে বলে মনে হচ্ছে না। সুজন আর ফারিস মিলে আর কোনো উপায় না দেখে সৌহার্দ্যকে টেনেটুনে ড্রাইভিং সিট থেকে পাশের সিটে সরিয়ে দিল। এরপর ফারিস নিজে ড্রাইভিং সিটের দায়িত্ব নিয়ে দানবের মতো গতিতে গাড়ি ছোটাতে শুরু করল এবং সাথে সাথে সুমির বাবার নাম্বারে কল ব্যাক করল।

ফোন রিসিভ হতেই ফারিস শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল, “প্লিজ আঙ্কেল, খাপছাড়া না করে এবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা খুলে বলুন!”
সুমির বাবা কাঁপতে কাঁপতে রাজশাহী যাওয়ার থেকে শুরু করে রিদি-সুমিদের তুলে নিয়ে যাওয়ার আদ্যোপান্ত সবটা পরিষ্কার করে বলে দিলেন। সব শুনে ফারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে গাড়িটা কোনোমতে একটা ফার্মেসির সামনে ব্রেক করে দাঁড় করানোর সাথে সাথেই আরবান লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
গাড়িতে বসেই ফারিস তার সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার শুরু করল। সে এক পলকে রাজশাহীর পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মহলে ফোন করে রেড অ্যালার্ট জারি করতে বলে দিল! এমপি পদের সমস্ত জোর খাটিয়ে সে স্পষ্ট নির্দেশ দিল, পুলিশ হোক কিংবা আর্মি—যা যা প্রয়োজন, সব নামাতে হবে! ওই দুটো মেয়ের গায়ে যেন একটা ফুলের টোকাও না লাগে!

ফারিস যখন ফোন হাতে একের পর এক হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, ঠিক তখনই আরবান হাঁপাতে হাঁপাতে ইঞ্জেকশনটা নিয়ে গাড়িতে এসে উঠল। সুজন বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সৌহার্দ্যর হাতে সেটা পুশ করে দিল।
ফারিস উৎকণ্ঠার চোখে সুজনের দিকে তাকাতেই সুজন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক হয়ে যাবে, টেনশন করিস না। হঠাৎ এমন একটা মারাত্মক শকের ধকল ওর শরীরটা নিতে পারেনি! ভাগ্যিস সময়মতো ইঞ্জেকশনটা দেওয়া গেছে, নইলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেত। এখন ঠিক আছে, আর কিছুক্ষণেই জ্ঞান ফিরে আসবে।”
সুজনের মুখে কথাগুলো শুনে ফারিস এই চরম উৎকণ্ঠা ও দুঃখের মাঝেও একবার অচেতন সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে মৃদু বিড়বিড় করে উঠল, “সালা! বাইরের দুনিয়ায় সবার সাথে বাঘের মতো তেজ দেখিয়ে চলে, অথচ নিজের বউটার কিচ্ছু হলেই একেবারে বিড়ালের মতো নেতিয়ে পড়ে!”

এদিকে গোডাউনের এক কোণে গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে আছে সুমি। অন্যদিকে চরম টেনশনে সায়েমের হাত থরথর করে কাঁপছে—এত চেষ্টা করেও তারা এখন থেকে এক পাও নড়তে পারছে না। প্রথমে তারা ভেবেছিল লোক বোধহয় একজনই, কিন্তু যখন চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল কম করে হলেও ১০-১২ জন ক্যাডার কড়া পাহারা দিয়ে রেখেছে!
চারপাশের এই বন্দিদশা আর চরম থমথমে পরিস্থিতেও সুমি আর সায়েমের মুখে যেখানে ভয়ের চোটে বারোটা বেজে গেছে, কিন্তু রিদির চেহারায় তার লেশমাত্র নেই! সে নির্বাক ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ একটা লুডুর বোর্ড দেখতে পেল। অমনি মোটা লোকটার দিকে তাকিয়ে সে বেশ ফরমায়েশি সুরে বলে বসল, “এই যে মুটু মামা! ওই কোনায় লুডুর বোর্ডটা দেখা যাচ্ছে না? ওটা একটু এদিক নিয়ে আসেন তো ভাই! এখানে বসে বসে বোরিং লাগছে, চলেন কিছুক্ষণ লুডু খেলি। আর সাথে আমাদের জন্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করেন তো, পেটে ভীষণ খিদে পেয়েছে!”

রিদির এমন আজব আবদার শুনে সায়েম তো রীতিমতো অবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে এখান থেকে কীভাবে জান নিয়ে বের হওয়া যাবে, সেই চিন্তায় যেখানে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে, আর এই মেয়ে কিনা এখানে বসে লুডু খেলতে চাইছে! সায়েম রাগে-বিরক্তিতে ফেটে পড়ে ফিসফিস করে বলল, “এই বিপদের মাঝেও তোর মাথায় খাওয়ার আর খেলার ভূত চাপে কীভাবে, বোন? তোর ওই খাটাশ জামাই ঠিকই বলে, তুই আস্ত একটা তারছিঁড়া মেয়ে! এখান থেকে চামড়া বাঁচিয়ে বের হবি কীভাবে, সেই ফিকির না করে তোর মাথায় কিনা লুডু খেলার ভূত চাপল! ওই খাটাশটা যদি কোনোভাবে টের পায়…”
রিদি বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে ধমকের সুরে বলল, “আরে দোস্ত, চিল কর তো! এখান থেকে বের হতে না পারলেও সমস্যা নাই, আমার এক পিস জামাই আছে যে খবর পেলে পাতাল খুঁড়ে আমাকে বের করবে! শুধু টেনশন হচ্ছে, খুঁজে পাওয়ার পর কী করবে?”

রিদির মুখে সৌহার্দ্যর নামটা শোনার সাথে সাথেই সায়েমের বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল! সে তো মনে এই জুজুর ভয়ই পাচ্ছি। ভয়ে বুক কেঁপে উঠায় সায়েম গলা থেকে থুথু ফেলে তড়িৎ গতিতে ওই মোটা লোকটার দিকে তাকিয়ে মিনতি করে বলে উঠল, “এই মুটু ভাই, প্লিজ আমাকে শুট করে দে! ওই খাটাশটার হাতে অত্যাচারী হয়ে মরার চেয়ে তোর হাতে মরা ভালো, প্লিজ ভাই, শুট মি!”
ওদের এই বেআক্কেলের মতো বকবক শুনে সুমি চটে গিয়ে কড়া গলায় বলল, “তোরা কি একটু চুপ করবি? এমনিতেই টেনশনে আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছে!”
সুমির কথায় রিদি একদম উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, “উফ, ফালতু টেনশন করে লাভ আছে নাকি বল? এর চেয়ে ভালো উপায়—চল এদের সবাইকে পিটিয়ে সোজা রাস্তা মেপে বেরিয়ে যাই! আর তা না হলে চুপচাপ চিল করি!”

সুমি বিরক্তিতে চোখ উল্টিয়ে বলল, “দিনের বেলা হলে তাও কিছু একটা করা যেত, কিন্তু এই নিকষ কালো রাতে এদের পিটিয়ে বাইরে বের হয়েও লাভ কী? আমরা তো এখানকার কোনো রাস্তাঘাটই চিনি না, পালিয়ে যাবই বা কোথায়?”
সুমি-সায়েমের টেনশন যায় যায় অবস্থা, ঠিক তখনই ওই মোটা লোকটা বেশ অবাক করে রিদির নির্দেশমতো সামনে লুডুর বোর্ডটা এনে হাজির করল! শুধু তা-ই নয়, সাথে এক প্লেট গরম গরম কাবাব জাতীয় খাবারও নিয়ে এল।
রিদি এক পলক খাবারের দিকে তাকিয়ে নিজের মনের সব টেনশন যেন ঝেড়ে ফেলল। সে উৎসাহের সাথে লুডুর ঘুঁটিগুলো গুছাতে গুছাতে ডাকল, “আরে আয় আয়, খেলা শুরু করা যাক! এই মুটু মামা, আপনিও এদিকে এসে বসে যান, আপনি আজকে আমার দলেই থাকবেন! আসেন, জলদি আসেন!”
বলেই সে সত্যি সত্যি খেতে খেতে খেলা শুরু করে দিল। রিদি এতক্ষণে ঠিকই বুঝে গেছে, এরা পেশাদার কোনো অপরাধী নয়—সব কটি পাতি গোছের গুণ্ডা মাত্র, যারা হুট করে তাদের কোনো বড় ক্ষতি করবে না। তার এখন আসল টেনশন কেবল সৌহার্দ্যকে নিয়ে—সৌহার্দ্যের কানে এই খবর পৌঁছানোর আগেই যদি কোনো মতে তারা বাড়ি ফিরে যেতে পারত!

প্রায় বিশ মিনিট পর সৌহার্দ্যর জ্ঞান ফিরতেই তার মুখ দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়ে এল। রাগে চোখ-মুখ লাল করে সে বাঘের মতো গর্জে উঠল, “গাড়ি ঘুরা! ওই তাজওয়ান শুয়োরের বাচ্চাকে আজকে আমি জ্যান্ত কবর দেব! শালা, বার বার আমার কলিজায় হাত দেওয়ার সাহস…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সে। তার আগেই ফারিস বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে খিকখিক করে বলে উঠল, “আরে থাম ভাই! আজ কিন্তু ওই তাজওয়ানের কোনো দোষ নেই , সব দোষ তোর ওই বেয়াদব বউটার! তোকে একদম গোল খাইয়ে ছেড়েছে সে!”
ফারিসের মুখে এ কথা শোনা মাত্র সৌহার্দ্য চমকে তাকাল। আতঙ্কে তার বুকটা এখনো ধকধক করছে, যেন এই বুঝি তার হৃৎপিণ্ডটা ছাতি ভেঙে বেরিয়ে আসবে!

সৌহার্দ্যর এমন বেগতিক অবস্থা দেখে ফারিস এবার একটু নমনীয় হলো। কাঁধে একটা হালকা চাপড় দিয়ে সে স্বস্তির সুরে বলল, “আরে তুই রিলাক্স হ, ভাই! রিদি একদম ঠিকঠাক আছে, আমি সব খবর নিয়ে নিয়েছি। ও মূলত রাজশাহীতে গিয়েছিল সুমির খালাতো বোনের বিয়েতে—যদিও সেটা তোকে না জানিয়েই। আর ওই চেয়ারম্যানের ছেলেটা ভুল করে অন্য এক মেয়ের জায়গায় সোজা তোর বউকেই কিডন্যাপ করে ফেলেছে! তবে ঘাবড়াস না, ওরা একদম সসম্মানে এবং সেফ আছে। পুলিশ আর আর্মি ফোর্স অলরেডি পুরো জায়গাটা ঘিরে ফেলছে! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের উদ্ধার করে ফেলা হবে। সেখান থেকে খবর পাঠিয়েছে, ওরা পুরোপুরি নিরাপদে আছে। এমনকি ওই চেয়ারম্যানের ছেলেও নিজের ভুল বুঝতে পেরে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে বলেছে, ওদের কোনো ক্ষতি না করে সসম্মান পুলিশের হেফাজতে তুলে দেবে!”
সৌহার্দ্য যেন সত্যিই হতভম্ব হয়ে গেল। তার মাথা কাজ করছে না—এখনো তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে রিদি তার সাথে এত বড় একটা মিথ্যে কথা বলতে পারল! নিজের জীবনে সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে মিথ্যাবাদী মানুষদের, আর আজ তার নিজের বউ কিনা তার সাথেই এই জঘন্য কাজটা করল!
এই মুহূর্তে তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। সে চোখ বন্ধ করে সিটের সাথে মাথা এলিয়ে দিয়ে ভাঙা ও ভারী কণ্ঠে বলল, “হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা কর।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই সৌহার্দ্যর বুকের বাঁ পাশে একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। বুকের ভেতরে অসম্ভব ব্যথা করছে, তার যেন আর কথা বলার মতো কোনো অবস্থাই নেই। হঠাৎ সে খপ করে বুকটা চেপে ধরে দিল, সুজন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “তোর এখন হাসপাতালে চলা উচিত! ওদের নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ফারিস তো বললই ওরা সেফ আছে।”
কিন্তু সুজনের কথায় পাত্তাই দিল না সৌহার্দ্য। সে চরম বিরক্তিতে পাশ ফিরে কড়া গলায় বলল, “আমি যেটা বলছি, সেটাই কর!”
তারপর রাগে চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল,
“বাল জুড়ছে কপালে, দুই দিন পরপর বাইম মাছের মতো হাত ফসকে বেরিয়ে যায়, বালের বউ আমার!”
এই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের মুখে এমন অদ্ভুত ক্ষোভের কথা শুনে ফারিস বুঝতে পারছিল না—সে এই বেচারা ভাইয়ের চরম অবস্থা দেখে দুঃখ পাবে, নাকি মনে মনে হাসবে!
তাদের উত্তপ্ত কথার মাঝে হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে শাহাবীরকে নামতে দেখেই সৌহার্দ্য চরম রাগে ও বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল। শাহাবীর তার সেই রূঢ় আচরণে এক বিন্দুও কান না দিয়ে তাড়া দেওয়ার সুরে বলে উঠল,

“হেলিকপ্টার সামনের স্কুলের মাঠে দাঁড়ানো, তোরা সেদিকে যা, আমি আসছি।”
ঘটনা শোনার সাথে সাথেই সুজন তৎক্ষণাৎ শাহাবীরকে সবটা জানিয়েছিল, আর শাহাবীরও খবর পাওয়া মাত্রই নিজের সমস্ত ফোর্স মাঠে নামিয়ে দিয়েছে! সৌহার্দ্য জ্বলন্ত দৃষ্টিতে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে তেড়ে উঠে বলল,
“তোর বেয়াদব বোনকে আনতে তুই যা, যাব না আমি!”
শাহাবীর তখন গভীর উৎকণ্ঠা আর চরম বিরক্তি মিশিয়ে শীতল গলায় বলল, “এখন রাগ দেখানোর সময় না, সৌহার্দ্য! যতই খবর পাই ওরা সেইফ আছে, জায়গায় না গেলে বলা সম্ভব না; তাই ত্যাড়ামিগুলো ওকে পাওয়ার পর করিস, প্লিজ!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৯

বাইরে যতই কাঠিন্য বা রাগের আবরণ থাকুক না কেন, বুকের ভেতরটা তখন কোন ঝড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছিল, তা কেবল ওই একাই জানে। তীব্র যন্ত্রণায় তখনো তার হাতটা করে বুকটা চেপে ধরে আছে। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, সে শুধু ফ্যাকাশে চোখে ফারিসকে একটা ছোট ইশারা করল—গাড়িটা যেন আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে স্টার্ট দেওয়া হয়।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here