Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩২

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩২

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩২
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

___​”ঠিক আছে, পারতে হবে না আপনাকে! আমি আনু ভাইয়ার সাথে শপিং করতে যাবো। ভাইয়াকে বললে ঠিক নিয়ে যাবে,” বলেই জিয়ানের সামনে থেকে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো রিত্তিকা।
ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে জিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মুচকি হাসি হাসলো সে।
__”আমি জানি, এই কথাটা আপনার একদম সহ্য হবে না!”
​ জিয়ানের ভেতরের সুপ্ত অধিকারবোধকে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিল। রিত্তিকা দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই জিয়ান একা একা গজগজ করে উঠলো,
___ “আমি থাকতে ওই আনু কেন তোমাকে নিয়ে যাবে, শুনি? আমার বউকে আমিই নিয়ে যাবো, কোনো আনু-টানু না! যার বউ তার খোঁজ নাই, আর পাড়া-পড়শীর ঘুম নাই—এমন অবস্থা!”

​রিত্তিকা তড়িঘড়ি করে জিয়াকে ডাক দিল,
___ “জিয়া, রেডি হ তাড়াতাড়ি!”শপিং এ যাবো।
জিয়া অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে বললো
___”কার সাথে যাবো শপিংয়ে? গাড়ি তো নেই!”
__”নেই তো ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুই রেডি হয়ে নিচে যা, আমিও আসছি।”
​কথাটা বলে রিত্তিকা জিয়াকে রেখে নিজের ঘরে ফিরে এলো। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সে থমকে গেল—জিয়ান ইতিমধ্যে একদম রেডি হয়ে বসে আছে!
​রিত্তিকা একটু ভ্রু কুঁচকে, কণ্ঠে কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
__”আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন, প্রফেসর সাহেব?”
জিয়ান গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,

__”হ্যাঁ, তোমাদের নিয়ে যাবো।”
__​”ওমা! একটু আগে যে বললেন যাবেন না? তাই তো আমি আনু ভাইয়াকে কল করেছিলাম…”
​’আহনাফের’ নামটা শোনামাত্রই জিয়ানের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। সে এক মুহূর্তে বসা থেকে উঠে এসে রিত্তিকার দুটো বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো। তার চোখেমুখে রাগ আর তীব্র ঈর্ষার ছাপ স্পষ্ট।
__”কে হয় আহনাফ তোমার?” জিয়ানের গম্ভীর গর্জন।
​রিত্তিকাও দমার পাত্রী নয়। সে চিবুক উঁচিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,
___”আমার যে-ই হোক না কেন, তাতে আপনার কী? আপনি তো আর আমাকে বউ হিসেবে মানেন না! ডিভোর্স দিতে চান, তাই না? বাই দ্য ওয়ে, নিজের স্টুডেন্টের এত কাছাকাছি এসে দাঁড়াতে লজ্জা করে না আপনার?”
​জিয়ান রিত্তিকার বাহু ছেড়ে দিয়ে কঠিন স্বরে বললো,
__ “শাট আপ! পাঁচ মিনিট টাইম দিলাম, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিচে _এসো।”
কথাটা বলেই সে হনহন করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

​রেডি হয়ে রিত্তিকা আর জিয়া বাইরে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো। তাদের দেখে জিয়ান কোনো কথা না বলে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল।
​রিত্তিকা আর জিয়া দুজনেই যখন একসাথে পেছনের সিটের দরজা খুলতে গেল, জিয়ান রিয়ারভিউ মিররে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো,
__ “আমি কারও ড্রাইভার নই যে সবাই পেছনে বসছ।”
​রিত্তিকা তখন জিয়াকে ঠেলা দিয়ে বললো,
__ “জিয়া, তুই যা সামনে।”
জিয়া হাতজোড় করে কাচুমাচু মুখে বললো,
__ “না রে বাবা, আমি পারবো না! ভাইয়া যা রেগে আছে, তুই-ই যা।”
__”হ্যাঁ, বাঘের গুহায় তো আমাকেই পাঠাবি!” বিড়বিড় করে গালি দিল রিত্তিকা।
​জিয়ান এবার অধৈর্য হয়ে হাঁক দিল,
__”কী হলো, তাড়াতাড়ি ওঠো!”
​অগত্যা রিত্তিকাকেই জিয়ানের পাশের সামনের সিটে বসতে হলো। রিত্তিকা বসতেই জিয়ান না তাকিয়েই প্রশ্ন করলো,

__”সিটবেল্ট কে লাগাবে?”
__”আপনি!” রিত্তিকা সপ্রতিভ উত্তর দিল।
​জিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
__ “মুখে মুখে তর্ক ছাড়া আর কিছু পারো না তুমি, না?”
__”নাহ, পারি না! আপনার কোনো সমস্যা?”
__​”ইডিয়ট!” জিয়ান মুখ বিকৃত করে নিচু হয়ে রিত্তিকার দিকে ঝুঁকে এলো সিটবেল্টটা লাগিয়ে দেয়ার জন্য।
​হঠাৎ জিয়ান এত কাছে চলে আসায় রিত্তিকার বুকটা ধুকপুক করে উঠলো। জিয়ানের তপ্ত ও উষ্ণ নিঃশ্বাস রিত্তিকার গালে ও ঘাড়ে এসে আঁচড়ে পড়ছে। তার পুরুষালি সুবাসে রিত্তিকার মনে হলো—হৃদপিণ্ডটা বুঝি এই মুহূর্তেই বুক চিরে বাইরে বেরিয়ে আসবে! রিত্তিকা একদম কাঠ হয়ে বসে রইলো।
​জিয়ান বেল্টটা লাগিয়ে সরে যেতেই রিত্তিকা যেন খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া পাখির মতো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

​কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গাড়ি এসে পৌঁছালো যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে। জিয়ান গাড়ি পার্কিংয়ে নিয়ে গেলে রিত্তিকা ও জিয়া বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো।
​জিয়ান পার্কিং সেরে ফিরে আসতেই রিত্তিকা ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো,
__”আপনিও কি আমাদের সাথে লেডিস কর্নারে যাবেন, প্রফেসর সাহেব?”
জিয়ান ভ্রু জোড়া সামান্য উঁচিয়ে বললো,
__ “কেন, কোনো সমস্যা আছে?”
__”না, সমস্যা নেই। আপনি যদি চলে যান, তবে আমি আনু ভাইয়াকে কল করতাম আরকি—আমাদের ড্রপ করে দেওয়ার জন্য।”
​জিয়ান স্থির দৃষ্টিতে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
__ “যখন আমি তোমাদের এখানে নিয়ে আসতে পেরেছি, বাড়িও আমিই পৌঁছে দিতে পারবো। কোনো আনু-টানুর দরকার নেই।”
__”আচ্ছা, চলুন তবে!” রিত্তিকা মনে মনে হেসে উঠলো।

​তারা তিনজন প্রথমে জমকালো এক শাড়ির দোকানে ঢুকলো। চারপাশের আলোয় ঝলমল করছে হাজারো রঙের শাড়ি। সেলসম্যান রিত্তিকাকে দেখে পরম আগ্রহে একের পর এক দামি অর্গ্যাঞ্জা, জামদানি আর জর্জেট শাড়ি মেলতে লাগলো। রিত্তিকা বেশ সময় নিয়ে, ধৈর্য ধরে শ্বশুরবাড়ির সবার জন্য চমৎকার সব শাড়ি বেছে নিলো।
​সব কেনাকাটা প্রায় শেষের দিকে, ঠিক তখনই পেছনের র্যাকের এক কোণে রাখা শাড়িটার দিকে রিত্তিকার চোখ আটকে গেল।
​সেটা ছিল এক অপূর্ব গাঢ় পার্পেল কালারের সফ্ট সিল্কের শাড়ি।ওপরের আলো পড়ে শাড়ির ওপর যেন এক মায়াবী আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করছিল। শাড়িটার মধ্যে এমন এক রাজকীয় ও আভিজাত্যময় সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল যা এক পলকেই যে কারও মন হরণ করে নেয়।
​রিত্তিকা শাড়িটার কাছে গিয়ে আলতো করে হাত ছোঁয়ালো। কাপড়টা এতটাই নরম যেন হাতের স্পর্শেই গলে যাবে। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখার লোভ সামলাতে না পেরে সে সেলসম্যানকে জিজ্ঞেস করলো,

__ “ভাইয়া, এই শাড়িটার প্রাইজ কত?”
​সেলসম্যান দামটা বলতেই রিত্তিকার চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল! তার মুখ থেকে একপ্রকার চমকে উঠে বেরুলো,
__”কী! এই সিম্পল শাড়িটার দাম এত বেশি?!”
​সেলসম্যান মুচকি হেসে বিনীতভাবে বললো,
__”জ্বী ম্যাডাম। এটা সম্পূর্ণ পিওর হ্যান্ডলুম সিল্কের তৈরি। শাড়িটা দেখতে সিম্পল হলেও এর ফেব্রিক আর ফিনিশিং অত্যন্ত হাই-কোয়ালিটির। একবার গায়ে জড়ালে এর সৌন্দর্য বোঝা যাবে, তাই দামটা একটু বেশি।”
​রিত্তিকা শাড়িটার দিকে আর একবার তৃষ্ণার্ত চোখে তাকালো। কিন্তু এত দাম দিয়ে সে কিনবে না। তাই সে মন খারাপটা চেপে রেখে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও শাড়িটা সরিয়ে রেখে বললো,

__”থাক, লাগবে না আপনার শাড়ি।”
​দূর থেকে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে জিয়ান রিত্তিকার প্রতিটি ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করছিল। জিয়ানের চোখ এড়াতে পারেনি। সে কিন্তু মুখে কিছুই প্রকাশ করলো না।
​শাড়ি কেনা শেষ করে তারা এবার একটা এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবির দোকানে এলো। সেখানে শ্বশুর আর চাচা-শ্বশুরের জন্য প্রবীণ বয়সের উপযোগী চমৎকার দুটো কাতান পাঞ্জাবি পছন্দ করলো রিত্তিকা।
​পছন্দ করার ফাঁকেই হঠাৎ কাঁচের ডিসপ্লেতে ঝুলানো একটি পাঞ্জাবির দিকে রিত্তিকার চোখ গেল।
​সেটি ছিল অফ-হোয়াইট রঙের এক প্রিমিয়াম কটন-সিল্কের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিটার কাটিং ও ফিটিং ছিল নিখুঁত। তার কলার এবং বোতামের প্লেটে সূক্ষ্ম হাতলাইনের সুতোর কাজ করা, যা মোটেও চোখে লাগে না অথচ অপূর্ব অভিজাত দেখায়। ফেব্রিকের ওপর হালকা এক ধরণের আভা ছিল, যা যেকোনো সুপুরুষকে এক পলকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য যথেষ্ট।
​রিত্তিকা পাঞ্জাবিটার কাপড়ে হাত বুলালো। তার মনে মনে স্পষ্ট ভেসে উঠলো জিয়ানের ফর্সা গায়ের রং আর সুঠাম দেহের গঠন। এই অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবিটায় জিয়ানকে যে ঠিক কোনো রাজপুত্রের মতো দেখাবে, তা সে এক মুহূর্তেই অনুধাবন করলো।
​তাই রিত্তিকা খানিকটা উচ্চস্বরে, জিয়ানকে শোনানোর জন্য আফসোসের সুর তুলে বললো,

___”আহা! এই কালার আর এই ডিজাইনে আনু ভাইয়াকে দারুণ লাগে! ইস, আনু ভাইয়া যদি আজ সাথে থাকতো, তবে এই পাঞ্জাবিটা তাকেই উপহার দিতাম…”
​কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা ঝড়ের গতিতে জিয়ান এসে দাঁড়ালো। রিত্তিকার হাত থেকে এক টানে পাঞ্জাবিটা কেড়ে নিল সে।
​জিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, চোখে তীব্র ঈর্ষা। সে পাঞ্জাবিটা নিজের বুকের কাছে ধরে রিত্তিকার দিকে এক নজর কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো, তারপর দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর ও কর্কশ গলায় বললো,
____”এই পাঞ্জাবিটা আমার পছন্দ হয়েছে, এটা আমি নেবো।”
​রিত্তিকা ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিলো যাতে জিয়ান তার ঠোঁটের কোণের দুষ্টুমি ভরা বিজয়ীর হাসিটা দেখতে না পায়। সে মনে মনে নিজেকেই বললো,
__ ‘জানি তো, এমনি বললে জীবনেও নিতেন না প্রফেসর সাহেব! তাই তো আনু ভাইয়ার নামটা নিলাম। ওষুধ একদম ঠিক জায়গায় কাজ করেছে!’

​প্রয়োজনীয় কসমেটিকস ও জামাকাপড় কিনে নেওয়ার পর জিয়ান কাউন্টারে গিয়ে সবগুলোর পেমেন্ট করে দিল। তারপর গাড়ি চালিয়ে রিত্তিকা ও জিয়াকে বাসায় ড্রপ করে দিয়ে, নিজে না নেমে সোজা অফিসের উদ্দেশে চলে গেল।
​বাসায় ঢুকে রিত্তিকা পরম আনন্দে পরিবারের সবার হাতে যার যার উপহার পৌঁছে দিল। তারপর জিয়ার ঘরে গিয়ে দুই জন মিলে গল্প, হাসাহাসি আর আড্ডায় মেতে রইলো।

​আড্ডা শেষ করে রাত যখন প্রায় ১১টা, রিত্তিকা ক্লান্ত পায়ে নিজের শোবার ঘরে ফিরে এলো। ঘরটা অন্ধকার ছিল, লাইটের সুইচ অন করতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল বিছানার ঠিক মাঝখানে রাখা একটা সুন্দর শপিং ব্যাগের ওপর!
​রিত্তিকা অবাক হয়ে এগিয়ে গেল। ব্যাগটা খুলে ভেতর থেকে কাপড়টা বের করতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! এ তো শপিং মলে দেখে আসা সেই পার্পেল কালারের সিল্কের শাড়িটা!
___​”এটা তো আমি কিনিই নি! দোকানদার কি ভুল করে ব্যাগে দিয়ে দিয়েছিল নাকি? কিন্তু এমনি এমনি তো আর এত দামি শাড়ি তারা ফ্রিতে দেবে না!” সে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে শাড়িটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিল।
​ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলো জিয়ান। রিত্তিকা শাড়িটা হাতে নিয়ে বুক ঢিপঢিপ অবস্থায় জিয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, __”আপনি… আপনি কি এই শাড়িটা কিনেছেন?”
​জিয়ান তোয়ালেটা পাশে রেখে রিত্তিকার দিকে না তাকিয়ে খুব সাধারণ গলায় বললো,

__ “হ্যাঁ। দোকানে দেখলাম তোমার শাড়িটা সুন্দর লাগছিল, তাই নিয়ে নিলাম।”
​কথাটা বলেই সে আলমারি থেকে ট্রাউজার আর টি-শার্ট বের করে আবার শাওয়ার নিতে চলে গেল।
​রিত্তিকার বুকের ভেতর যেন একঝাঁক প্রজাপতি ডানা মেলে উড়তে শুরু করলো। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক অনাবিল, পরম তৃপ্তির হাসি। শাড়িটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে সে মনে মনে বললো,
__’বা বাহ! প্রফেসর সাহেবের তো দেখছি সব দিকেই কড়া খেয়াল! লোকটা মুখে অত রাগ দেখায়, অথচ মনটা কত দয়ালু… যাই হোক, শাড়িটা সত্যিই অসাধারণ!’
​সারাদিনের ছোটাছুটি আর কেনাকাটার ক্লান্তিতে রিত্তিকার শরীর আর বইছিল না। সে পরম মমতায় শাড়িটা ভাঁজ করে আলমারিতে গুছিয়ে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লো। নরম বালিশে মাথা ছোঁয়ানোর সাথে সাথেই গাঢ় ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো সে।

​কিছুক্ষণ পর শাওয়ার নিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে জিয়ান ঘরে ফিরে এলো। বিছানার দিকে তাকাতেই তার কড়া চাউনি এক মুহূর্তে নরম হয়ে গেল।
​রিত্তিকা নিবিড় শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমানোর ঘোরে ছোট বাচ্চাদের মতো ঠোঁট দুটো সামান্য উল্টে রেখেছে সে। চাঁদের আলো জানালার ফাঁক গলে এসে রিত্তিকার মায়াবী মুখে পড়েছে।
​জিয়ান কোনো শব্দ না করে, একদম নিঃশব্দে বিছানার একপাশ দিয়ে উঠে রিত্তিকার পাশে শুলো। তারপর খুব সাবধানে, যেন কাঁচের পুতুল ভেঙে না যায়—এমন আলতো ছোঁয়ায় রিত্তিকাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলো।
​রিত্তিকার গলার নরম ভাঁজে নিজের মুখটা গুঁজে দিল জিয়ান। তার সুবাস বুক ভরে টেনে নিতে নিতে পরম এক প্রশান্তিতে জিয়ানও চোখ বুজলো।

​ভার্সিটিতে আজ পৌঁছাতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছে রিত্তিকার। ক্লাস শেষ করে সে ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বরে দাঁড়িয়ে আহনাফের সাথে হাসিমুখে কথা বলছিল।
​দূর থেকে দৃশ্যটা চোখ এড়ালো না জিয়ানের। বুকের ভেতর ঈর্ষার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠতেই সে বিড়বিড় করে উঠলো,
___”ইডিয়ট একটা! নিজের বর থাকতে অন্য ছেলের সাথে এত কিসের কথা, শুনি? কথা বলতে ইচ্ছে হলে আমার সাথে বলবে, আর না ইচ্ছে হলেও আমারই সাথে বলতে হবে!”
​ রিত্তিকা পেছনে ফিরে তাকালো। দেখতে পেল—কিছুটা দূরে জিয়ান পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আহনাফকে বিদায় জানিয়ে রিত্তিকা হালকা পায়ে হেঁটে জিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালো।
​ঠোঁটে এক চিলতে দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটিয়ে রিত্তিকা জিজ্ঞেস করলো,
__”কখন এসেছেন, প্রফেসর সাহেব?”
​জিয়ান রিত্তিকার হাসির দিকে না তাকিয়ে কঠোর স্বরে প্রশ্ন করলো,

__ “এত কিসের কথা ওই ছেলের সাথে তোমার?”
​ “তাতে আপনার কী?”
​জিয়ানের সংযমের বাঁধ ভেঙে গেল যেন। রিত্তিকার আরও একধাপ কাছে সরে এসে নিচু কিন্তু তীব্র কণ্ঠে সতর্ক করে দিল,
___ “আরেকবার যদি ওর সাথে কথা বলতে দেখেছি, তবে ঠোঁট দুটো সেলাই করে দেবো—বলে দিলাম!”
​রিত্তিকা জিয়ানের হুমকি শুনে একটুও ভয় পেল না, বরং বাচ্চাদের মতো মুখ ভেংচি কেটে তার কথাটাই তোতাপাখির মতো অনুকরণ করে বললো,
__”আলেকবাল যদি কতা বনতে দেকেতি তাহলে ঠোত দুটো তেলাই করে দেবো বলে দিলাম!”
তারপর চোখ গোল গোল করে গলার স্বর উঁচিয়ে বললো,
___ “ইয়ার্কি পেয়েছেন? আমার যা ইচ্ছা করব! কার সাথে কথা বলবো আর কার সাথে বলবো না—সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার!”
__​”বেয়াদব মেয়ে!”
জিয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। রাগে হনহন করে পার্কিং লটের দিকে হেঁটে চলে গেল।
​রিত্তিকাও মুখে হালকা মুচকি হাসি চেপে তার পিছু পিছু হাঁটা দিল। আর এই সমস্ত দৃশ্য কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল আহনাফ।

​গাড়ি চলছে আপন গতিতে। ভেতরের দুটো মানুষের মাঝখানে নীরবতার এক বিরাট দেয়াল। কেউ কারো সাথে কথা বলছে না, কিন্তু গাড়ির ভেতরের আবহাওয়া বেশ গরম।
​হঠাৎ জিয়ানই নীরবতা ভেঙে আড়চোখে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
__”কিছু খাবে?”
রিত্তিকা গম্ভীর মুখে জবাব দিল,
__ “হুম।”
__​”কী খাবে, বলো?” জিয়ানের শান্ত প্রশ্ন।
​রিত্তিকা গাড়ি থেকে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মনের অজান্তে বলে উঠলো,
__ “আপনাকে…”
​বলেই সে চমকে উঠে নিজের জিভে কামড় দিল! কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছে! তৎক্ষণাৎ কথাটা সামলে নিয়ে তড়িঘড়ি করে শুধরে বলল,
__ “…না মানে, আইসক্রিম!”
“একটু আগে কী বললে?”
​”কই, কিছু না তো!” রিত্তিকা লজ্জায় একদম লাল হয়ে
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
___”গাড়ি থামান আর আইসক্রিম নিয়ে আসেন, যান!”
​জিয়ান আর কথা বাড়ালো না। রাস্তার এক পাশে গাড়িটা পার্ক করে নেমে গেল এবং কিছুক্ষণ পরই দুটো আইসক্রিম হাতে নিয়ে ফিরে এলো।

​গাড়িতে উঠে আইসক্রিমের কোণটা রিত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিল জিয়ান। রিত্তিকা হাত বাড়িয়ে আইসক্রিমটা নিতে যাবে, এমন সময় জিয়ান হুট করে রিত্তিকার দিকে একদম ঝুঁকে এলো।
​জিয়ানের আচমকা এত কাছে চলে আসায় রিত্তিকা সিটের সাথে সেঁটে গেল। জিয়ান তার ঠোঁট দুটো রিত্তিকার কানের একদম কাছে নিয়ে গিয়ে, গভীর ও রহস্যময় হ্যাস্কি কণ্ঠে বিড়বিড় করে বললো—
___”আমি তো তোমারই… যত ইচ্ছে খেয়ো।”
​কথাটা বলেই জিয়ান এক চিলতে হাসি হেসে নিজের সিটে ফিরে গেল।
​জিয়ানের কথা শুনে সে কাশতে শুরু করলো।
​জিয়ান জলদি একটা পানির বোতল খুলে রিত্তিকার দিকে এগিয়ে দিল,

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩১

___”এই নাও, পানি খাও।”
​রিত্তিকা কোনো মতে জিয়ানের হাত থেকে বোতলটা ছিনিয়ে নিয়ে ঢকঢক করে সবটুকু পানি খেয়ে নিলো। লজ্জায় তার মনে হচ্ছিল গাড়ি ফুঁড়ে নিচে নেমে যায়! পানি খাওয়া শেষ করে জিয়ানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে গালি দিল,
___ ‘কী নির্লজ্জ রে বাবা! পাক্কা এক খবিশ একটা!’

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here