Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৪০

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪০

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪০
noorayn

আজ সকলে টায়ার্ড থাকার কারনে কেউ আর বাহিরে ডিনার করতে যায়নি বরং যে যার রুমেই ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়েছে। আলিশা আর ডোরা সেই কবে থেকে ঘুম – দুজনের উঠার নাম নেই। আরহাম ডিভানে বসে বসে নতুন গানের লিরিক ভাবছে আর সেই সাথে ল্যাপটপে ননস্টপ টাইপিং করে যাচ্ছে। তার মনোযোগ ভাঙলো আরশানের কান্নার স্বরে।
আরহাম এগিয়ে গিয়ে দেখলো ডোরা তার ঘুমন্ত মায়ের বুকে নাক ঘেষছে খাওয়ার জন্য কিন্তু ঘুমে বিভোর আলিশার কোনো হুশ নেই। আরহাম এগিয়ে গিয়ে ছেলের মুখে খাবার তুলে দিলো। ঘুমের মধ্যে নড়চড় হওয়ার কারনে আলিশার ঘুম পাতলা হয়ে এলো – সে হালকা চোখ খুলে দেখলো আরহাম তার জামা নিয়ে কি করছে। ঘুমের ঘোরে থাকা আলিশার মাথায় ছোট ডোরার কথা এলোনা তাই সে ঘুমের মধ্যেই আরহামকে বললো –

“অসভ্য ব্যাটা। ঘুমের মধ্যেও শান্তি দেয়না।”
আরহামের কানে কথাটি আসলে সে প্রতিবাদ করার আগেই আলিশা আচমকা স্বশব্দে চেঁচিয়ে উঠে বসলো।
“কি হয়েছে?”
আলিশা ডোরার পিঠে এক চড় মেরে দিয়েছে।
“বেয়াদব লোকের বেয়াদব বাচ্চা। কতবার মানা করেছি কামড়াতে তাও এই কাজ করলি তুই? তোর এই ইঁদুর ছানার মতো দাঁত সব ফেলে দেবো আমি।”
মায়ের এমন বকাতে ছোট্ট ডোরা গলা উঁচিয়ে কাঁদা শুরু করলো। বাবার দিকে হাত বাড়াতেই আরহাম তাকে কোলে নিয়ে আদর করে দিলে ডোরা বাবার গলা জড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে ভাঙা শব্দে আওড়ালো – “মা..ম্মা ডুত্ত।”
আরহাম ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে শান্তনার স্বরে শুধালো – “আমি জানি বাপ তোর মা অনেক দুষ্ট। আমাকেও ছোট থেকে জ্বালিয়ে মারছে এই মহিলা। থাক কাঁদিস না আর। সবসময় এভাবেই কামড় দিয়ে বাপের হয়ে প্রতিশোধ নিবি।

“পটি..সো..দ?”
“বলে কি এই ছানা! পটি না প্রতিশোধ বুঝলি প্রতিশোধ। বল প্রতিশোধ।”
“বা…ব্বা..বা পটি..”
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে আরহাম নাক-মুখ কুঁচকে ফেললো – “বেয়াদব মায়ের বেয়াদব বাচ্চা। তোকে শেখালাম কি আর তুই বললি কি?”
মা-বাবা দুজনের মুখে একই বাক্য শুনে ছোট্ট ডোরা আওড়ালো – “মা..ম্মা বাডপ..ডোরা বাডপ..বা..ব্বা বাডপ।”
আরশানের এমন কথায় আরহাম-আলিশা দুজনের চোক্ষু চড়কগাছ – বলে কি এই মিনি গন্ডার?

“কি শেয়ানা হয়েছিস তুই? এই বয়সেই মা-বাপকে রপ্ত করে ফেললি।”
“তুমি আমার বাচ্চাকে বরবাদ করে দিবে। এতটুক বাচ্চা আমার বলে কিনা বাডপ?”
“তোরও কি ওর মতো দুধের দাঁত উঠেছে?”
আলিশা নাকমুখ কুচকে বললো – “আজব! আমার কেন দুধের দাঁত উঠতে যাবে?”
“তাহলে ডোরার মতো বেয়াদব কে বাডপ বলছিস কেন?”
“ওইটা তো এমনি মুখ থেকে বেড়িয়ে গেছে। তোমার কারনেই হয়েছে সব।”
“আমি কি করলাম?”
“ওকে বেয়াদব ডাক তুমি শিখিয়েছো।”
“আমি কখন শেখালাম?”
“এইযে একটু আগে। ডোরা তোমার মুখ থেকে শুনেই বলেছে।”

“একটা আছাড় দিবো ভোটকি। তুই আগে বলেছিস আমি পরে। আমি আর আরশান তোর থেকে শিখেছি।”
“ওলেলে আমাল বাবুটা আমাল থেকে শিখেছে? বাবুকে কি ফিডার বানিয়ে দিবো?”
আরহাম আলিশার মাথায় এক গাট্টা দিয়ে বললো – না সোনামনি বাবুকে ফিডার দিতে হবেনা। বেশি কথা বললে এই বাবু আপনার পেটে আরেক বাবু এনে দিবে তখন তাকে ফিডার বানিয়ে দিয়েন। ওকে চোনামনি?”
আলিশা কটমট করে উঠলো এমন কথায়। এই গন্ডার কথায় কথায় তাকে ব্ল্যাকমেইল করে।
আলিশা রেগে ধুমধাপ করে ওয়াশরুমে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বললো – “আজকে থেকে আরশানের পটি তুই ক্লিন করবি গন্ডার। তোর আরেক বাবুর শখ মিটিয়ে ছাড়বো আমি।”
আরহাম হতাশার দৃষ্টিতে ডোরার দিকে চেয়ে বললো – কামড় দিলি তুই আর শাস্তি পেলাম আমি! এই কেমন অবিচার?
তুই পটি করিস না বাপ প্লিজ…বলতে না বলতেই আরহামের নাকে এসে ঠেকলো একটা বাজে স্মেল। সে অসহায় চোখে ডোরার দিকে তাকিয়ে চেঁচালো – ছোট মরিচের বাচ্চা, বলতে না বলতেই করে দিয়েছিস?
লিশা…আমার জান, প্লিজ হেল্পপপপ……..

ভোর ৫ টা – টাইগার হিল, দার্জিলিং…
দার্জিলিং শহরের অন্যতম আকর্ষণ হলো টাইগার হিল। ভোরে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যের আলো পড়ার অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায় – এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য কেউই মিস করতে চায়নি বিধায় ভোরের আলো ফোটার আগেই আরহাম-আলিশা এবং আরশাদ-নীলা সেখানে পৌঁছে গেলো। বড়রা কেউই আসেনি সাথে – তাদের ভাষ্যমতে জোয়ানকালে এমন অনেক ঘুরেছে তাই এখন না গেলেও চলবে। যদিও তাদের না আসার আসল কারন ছিলো ছোটদের স্পেস দেওয়া। এত সকালে ডোরাকে বাইরে আনলে তার ঠান্ডা লাগবে তাই তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় আয়শার কাছে রেখে এসেছে আলিশা।

–পাহাড়ি বাতাসে ছিল হালকা শীতের ছোঁয়া, আর চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সূর্যোদয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটির জন্য।
হঠাৎ করেই দিগন্তের কিনারে এক ফালি সোনালি আলোর দেখা মিললো। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আলো ছড়িয়ে পড়তে লাগলো পাহাড়ের পর পাহাড়ে। তুষারঢাকা চূড়াগুলো যেন সোনার আবরণে মোড়ানো হয়ে উঠছিলো। মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটি দেখছিল চারজনই। আলিশার চোখে বিস্ময়ের ঝিলিক, নীলার মুখে প্রশান্তির হাসি, আরহামের দৃষ্টি দূরের পাহাড়ে স্থির আর আরশাদ বারবার ক্যামেরায় সেই মুহূর্ত বন্দি করার চেষ্টা করছিলো।
আরহাম আলিশার কোমড় ধরে কাছে টেনে কানে ফিসফিস করে বললো – “ভালো লাগছে?”
“অনেককক। ডোরা পেটে আসার পর থেকে এই প্রথম ট্যুরে এসেছি – কতমাস পর।”
“তোর জন্যই এসেছি। যত মন চায় ঘুরে নে।”
“আমার মেন্টাল রিফ্রেশমেন্টের বড্ড প্রয়োজন ছিলো আরহাম। তুমি সব কেমনে বুঝে যাও?”
“কেউ একজন সারাক্ষণ কানের কাছে কাকের সুর তুলে কা-কা করলে কি না বুঝে উপায় আছে?”
আলিশার আবেগি মুহুর্তে যেন কেউ পানি ঢেলে দিলো। সে এক ঝটকায় আরহামের হাত কোমড় থেকে সরিয়ে দুরে এসে দাড়ালো। আরহামের হাসি পেলো আলিশার এমন বাচ্চামো দেখে – সে আবার আলিশার কোমড় টেনে কাছে নিয়ে আসলো।

“রাগ করলা?”
আরহামের মুখে এই বাক্য শুনে যেন আলিশার রাগে ঘি পড়লো। আজকাল সোশাল সাইটে ঢুকলে এই “রাগ করলা” এর জ্বালায় টেকা যায়না – তার বেশ বিরক্ত লাগে বিষয়টি এবং আরহাম এটা জেনেই ইচ্ছাকৃতভাবে বলেছে তাকে বিরক্ত করার জন্য।
আলিশা দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিলো –
“করলাম”
“তো এই রাগ ভাঙানোর জন্য কি করতে পারি?”
আলিশা যতই রেগে থাকুক না কেন তবে আরহামের পকেট খালি করার বেলায় সে সদা এগিয়ে – তাই হাসিমুখে জবাব দিলো –
“অনেকগুলো শপিং করিয়ে দিতে পারো।”
আরহাম জানতো উত্তর এমনই হবে।
“যথা আজ্ঞা মহারানী।”
–নীলা আরশাদের কাধে মাথা রেখে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছে। আরশাদ নীলার এমন চুপটি আচরন দেখে জিজ্ঞেস করলো – “মন খারাপ?”

“উহু।”
“আমার তোতাপাখিকে এতো চুপচাপ মানায় না।”
“তোমার তোঁতাপাখির ঘুম পেয়েছে।”
“রাত জেগে কান্নাকাটি করলে তো ঘুম পাবেই।”
“আরশাদ প্লিজ…”
“কান্নার কারন কি জানতে পারি?”
“নাাাাাা…”
“না বললেও জানি।”
নীলা এবার আরশাদের কাধ থেকে মাথা তুলে জিজ্ঞেস করলো – “বলো দেখি?”
“রাতে আরশানকে কাছে পেয়ে এতো কান্না করেছো তাই না?”
গতরাতে আলিশা সত্যিই কোনো হেল্প করেনি আরহামকে। তার এক কথায় ছিলো – আরহামকেই ডোরার পটি ক্লিন করতে হবে। পরে উপায় না পেয়ে আরহাম ডোরাকে কোলে নিয়ে গিয়েছিলো নীলাদের কামরায়।
নীলা আগলে নিয়েছিলো ডোরাকে এবং আদরের সহিত ক্লিন করতে হেল্প করেছিলো। নীলা ক্লিন করার টাইমে আরহাম আরশাদকে খুলে বলছিলো তার বোনের সব কান্ড – যা শুনে আরশাদ – নীলা হাসতে হাসতে মজা নিয়েছিলো আরহামের।

আরহাম ফিরে যাওয়ার সময় ডোরাকে কোলে নিতে গেলে সে শক্ত করে ধরে রেখেছিলো নীলার চুল – তার অর্থাৎ সে যাবেনা। তার এখন দুষ্টমি করার মুড হয়েছে আর ছোট্ট আরশান জানে এখন বাবার সাথে গেলে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হবে তাই সে ঝাপ্টে ধরে রেখেছিলো নীলাকে।
শেষে আরহাম একপ্রকার জোর করেই সাথে নিয়ে গিয়েছিলো আরশানকে। এতরাতে বিরক্ত করতে চায়নি নীলাদের – কিন্তু আরহাম জানতেই পারলোনা যা তার কাছে নীলাদের বিরক্তি মনে হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে ছিলো তাদের কাছে এক চিলতে সুখ। নীলা চেয়েও বলতে পারলোনা ডোরাকে কাছে রাখার কথা – তার যে সেই অধিকার নেই।
গতকাল রাতের কথা মনে পড়তেই নীলার চোখজোড়া ভিজে উঠলো। সে আরশাদকে জড়িয়ে ধরে বললো –
“কি হতো যদি আমাদেরও এমন একটা ছোট পরিবার থাকতো?”
“ছোট পরিবার দরকার নেই। আমরা নাহয় আমাদের বড় পরিবার নিয়েই সুখে থাকি?”
হুম…”

–আরহাম আলিশার অনেক ছবি তুলে দিয়েছে কিন্তু তাও আলিশা টমেটোর মতো মুখ ফুলিয়ে রেখেছে – তার নাকি একটা ছবিও সুন্দর আসেনি।
“সুন্দর না আসলে নাই। আমি আর একটাও ছবি তুলে দেবোনা ভোটকি।”
“আর কয়েকটা প্লিজ…”
আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে বললো – “বিগত এক ঘন্টা ধরে এটাই বলছিস।”
“তুমি অনেক খারাপ। কথায় বলবোনা।” বলেই আলিশা গটগট পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো।
আরহাম তার পিছে পিছে গিয়ে দেখলো আলিশার চোখ ছলছল করছে – “সামান্য ছবির জন্য কি কান্না করা লাগে? উফ চল আরও তুলে দেই।”

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৯ (২)

“আমি ছবির জন্য কান্না করছিনা।”
“তো?”
“আই মিস মাই ডোরা। ওকে নিয়ে আসলে ভালো হতো – ঘুম থেকে উঠে আমাকে পাশে না পেলে কান্না করবে।”
আরহাম হঠাৎ আলিশার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে স্নিগ্ধ হেসে বললো – “সত্যিকার অর্থে মা হয়ে গেছিস লিশা।”

তোমার আমার গল্প পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here