Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী শেষ পর্ব 

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী শেষ পর্ব 

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী শেষ পর্ব 
রিদিতা চৌধুরী

পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছে এক স্নিগ্ধ, সুন্দর সন্ধ্যা। হেমন্তের হিমেল পরশমাখা বাতাসে চারপাশের প্রকৃতি যেন এক অন্যরকম মোহময় শান্ত রূপ ধারণ করেছে। চৌধুরী বাড়ির বিশাল বাগানের সবুজ ঘাসের ডগায় বিন্দু বিন্দু শিশির জমতে শুরু করেছে, আর আম গাছের ডালে ঘরে ফেরা ক্লান্ত পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে চারপাশটা মুখরিত। পড়ন্ত বিকেলের এই মৃদু আলো-আঁধারি ছটায় পুরো বাড়িটি যেন এক স্নিগ্ধ মায়াবী চাদরে জড়িয়ে আছে।

​দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার এই রূপ মুগ্ধ হয়ে দেখছিল রিভা। বাতাসে তার চুলগুলো একটু উড়ছিল। হঠাৎ পেছনে কারো চেনা উপস্থিতির শীতল শিহরণ টের পেয়ে সে চমকে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখল—ফারিস দাঁড়িয়ে আছে। রিভা মুখ খুলে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই ফারিস পেছন থেকে এসে শক্ত করে তার কোমর জড়িয়ে ধরে আদুরে অথচ অভিযোগের সুরে ফিসফিস করে বলে উঠল, “শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, তোকে সব জায়গায় খুঁজে মরছি, তুই আমার বাচ্চাগুলো রেখে এখানে একা একা কী করছিস?”
​ফারিসের এমন হঠাৎ আকস্মিক স্পর্শে রিভার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলেও, মুহূর্তের মধ্যেই সেই অনুভূতির জায়গা দখল করে নিল তীব্র অভিমান আর ক্ষোভ। ফারিস এর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখদুটো রাগে কুঁচকে, গলায় একরাশ তেজ ফুটিয়ে সে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, “নির্লজ্জ এমপি আপনি কার সাথে কথা বলছেন ফোনে ফিসফিস করে ? একদম আমার থেকে দূরে থাকুন?”

​রিভার এমন হঠাৎ ফুঁসে ওঠা দেখে ফারিস যেন একেবারে আহাম্মক বনে গেল। সে কার সাথে আবার কথা বলবে! এক সেকেন্ডের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইল, “আমি কারো সাথে কথা বলিনি সোনা তোকে এই প্যাঁচ কে লাগিয়েছে,?”
​রিভা এবার আরও বেশি তেজে ফুঁসে উঠল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন আগুন জ্বলছে, গলার স্বরে তীব্র ক্ষোভ— “একদম সাফাই গাইবেন না, আমাকে সায়ভান বলছে , আবার আপনি ওকে আমাকে না বলার জন্য দুইশো টাকা ঘুষ দিয়েছেন সরুন আমার থেকে!” বলেই সে ফারিসকে এক ধাক্কায় নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চাইল।
​ফারিস বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে মনে মনে ভাবল, আস্ত একটা বাঁদর ছেলে তো! কী সুন্দর প্যাঁচটাই না লাগিয়ে দিল! রিভার এই অভিমানী রাগ ভাঙাতে ফারিস এবার আলতো করে তার হাত ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। তারপর গলার স্বর একেবারে নামিয়ে এনে, পরম আদরে বোঝানোর সুরে বলল, “সোনা আমার, দুই নাম্বার বেজাল মিথ্যা বলছে তোকে একটা বাচ্চার কথা বিশ্বাস করবি তুই? ময়না পাখি না আমার তুই আমার ফোন চেক কর বিশ্বাস না হলে!”

​ফারিসের এই নরম ছোঁয়া আর বিশ্বাসের আকুতিতে রিভার জমাট বাঁধা রাগ যেন বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। রাগ ঝেড়ে ফেলে সে মুখ ফুলিয়ে সোজা ফারিসের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। তারপর অভিমানী কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের একদম সময় দেন না এখন আপনি ফারিস ভা…”
​বাকি কথাটুকু রিভার মুখ থেকে শেষ হতে দিল না ফারিস। তার আগেই বিদ্যুৎগতিতে রিভাকে বাহুডোরে তুলে নিয়ে কোলে তুলে নিল সে। তারপর রিভার কানের কাছে মুখ নিয়ে দুষ্টু মিষ্টি হাসিতে ফিসফিস করে বলে উঠল, “চল সময় দিচ্ছি, জঙ্গল থেকে মঙ্গল করে আসি!”

রাত তখন প্রায় আটটা। নিজের রুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে দারুণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল সৌহার্দ্য। ঠিক সেই মুহূর্তে হুড়মুড় করে রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল রিদি। মেয়েটির চোখ-মুখ কান্নার চোটে একেবারে ফুলে লাল হয়ে আছে।
​রিদির এমন বিধ্বস্ত চেহারা দেখেই সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে এক পলক রিদির দিকে তাকিয়েই ল্যাপটপটা পাশে সরিয়ে রেখে ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়াল। এরপর দুহাতে রিদিকে টেনে নিজের শক্ত বুকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড জান? কান্না করছো কেন?”
​সৌহার্দ্যের বুকের ওম পেতেই রিদির কান্নার বাঁধ যেন আরও ভেঙে গেল। সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সৌহার্দ্যের শার্টের হাতা খামচে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে উঠল,

“সায়ভানকে পাচ্ছি না, ডা. সাহেব! আমি ওকে পড়তে বসিয়ে রান্নাঘরে গেছিলাম। এসে দেখি ও নাই কো…”
​রিদির কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিরক্তির সুর মিশিয়ে বলে উঠল,
“এটার জন্য কান্না করছো? হয়তো বাচ্চাদের সাথে খেলছে তোমার পড়া চোর ছেলে!”
​কিন্তু রিদি মাথা নেড়ে আরও সজোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো তখন,
“আমি সব জায়গায় দেখেছি, ডা. সাহেব! ও কারোর সাথেই নেই। সাফওয়ান-শেহেজাদ—ওরা তো গ্রুপ স্টাডি করছে!”
সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটাও এবার ধুকপুক করে উঠল। ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেলেও সে নিজেকে শক্ত রাখল। রিদির আতঙ্কে কাঁপতে থাকা মাথায় স্নেহের একটা গভীর চুমু এঁকে সে অত্যন্ত শান্ত ও স্থির গলায় বলল,

“ডোন্ট প্যানিক, জান। আমি দেখছি।”
​বলেই সে রিদির ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। একে একে ওপরের সবকটি রুম, করিডোর আর খোলা ছাদে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সায়ভানের কোনো টিকি মিলল না। বুকটা ভারী হয়ে আসায় সৌহার্দ্য রিদিকে নিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলো।
​নিচে ড্রয়িংরুমের সোফায় তখন খোশগল্পে বসে আছে ফারিস, শাহাবীর, সুজন আর আকাশ। ওদের এমন নির্বিকার দেখে সৌহার্দ্যের উদ্বেগে মুখ শুকিয়ে এল। সে সরাসরি ফারিসের দিকে তাকিয়ে চরম উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“সায়ভানকে দেখেছিস কোথাও?”
​ফারিস প্রথমে একটু ভ্রু কুঁচকে উদাসীন ভঙ্গিতে বলল,
“কই না তো!”
পরক্ষণেই হালকা হেসে আবার যোগ করল,

“কোথাও কোনো চিপায় লুকিয়ে বসে হয়তো গেমস খেলছে!”
​ফারিসের এমন ক্যাজুয়াল কথায় শাহাবীর বিরক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ ধমকে উঠল,
“চুপ করবি তুই! ফাজলামো রেখে? বাচ্চাদের নিয়ে এভাবে হেয়ালি করা ঠিক না!”
​শাহাবীরের কথা শেষ হওয়ামাত্র সবাই এক লহমায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এরপর সৌহার্দ্য, শাহাবীর আর বাকি সবাই মিলে পুরো বাড়িটা—প্রতিটি ঘরের কোণ, অন্ধকার সিঁড়ির নিচ থেকে শুরু করে বিশাল বাগান—সবকিছু আবার নতুন করে তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কোথাও নেই! দিশেহারা হয়ে সৌহার্দ্য ছুটে গেল মূল গেটের দিকে এবং দারোয়ানকে জেরা করল। দারোয়ান আতঙ্কিত মুখে মাথা নেড়ে নিশ্চিত করে বলল,
“না স্যার, গেট দিয়ে বাইরে যায়নি। আমি তো চোখ সরাইনি!”

এদিকে রিদির কান্না দেখে মনে হচ্ছিল বুকটা বুঝি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল—দ্রুত পায়ে সিকিউরিটি রুমের দিকে ছুটে সে বাড়ির সিসি ক্যামেরা অন করল। মনিটরের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই রাগে তার মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করল! দেখা গেল, তার এই গুণধর ছেলে ড্রয়িং রুমের বিশাল ডাইনিং টেবিলের নিচে ঢুকছে মোবাইলটা হাতে নিয়ে!
​রাগে আর বিরক্তিতে সৌহার্দ্যের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে রিদির দিকে এমন এক নজর তাকাল, যেন এই মুহূর্তে একা পেলে কাঁচাই চিবিয়ে খাবে! দাঁতে দাঁত চেপে রাগী কণ্ঠে সে ফুঁসফুস করে বলে উঠল,
— “বালের পেট থেকে বাল দুটো বাহির করছে! জীবনটা একেবারে তছনছ করে দিল!”
​সৌহার্দ্যের এমন রাগী রূপ দেখে রিদি ভয়ে শুকনো একটা ঢোক গিলল। ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় সে মিনমিন করে বলল,

— “আমার… আমার দিকে ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? আমি কি করছি?!”
​রিদির কথায় কান দেওয়ার সময় এটা ছিল না। রাগে তেতে উঠে সৌহার্দ্য এক দীর্ঘশ্বাসে ড্রয়িংরুমে গিয়ে সোজা টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর রাগী গলায় ধমক দিয়ে ডেকে উঠল,
— “সায়ভান! বের হও বলছি ভেতর থেকে!”
​বাবার গম্ভীর গলার আওয়াজ পেতেই টেবিলের নিচ থেকে ভয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলো সেই ছোট শয়তানটা। সৌহার্দ্য যখন তাকে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই সায়ভান এক সেকেন্ডের মধ্যে এমন একটা মায়াবী ও ভোলাভালা মুখ বানিয়ে ফেলল, যেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নির্যাতিত বালক ও-ই! মুখটা বেজার করে সে এক সেকেন্ডে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল।
​ছেলের কান্নাই হোক আর যা-ই হোক, এই রূপ দেখেই সৌহার্দ্যের রাগ কর্পূরের মতো উবে গেল! এক পলক ছেলের দিকে তাকিয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে সায়ভানকে টেনে নিজের শক্ত বুকের সাথে চেপে ধরল এবং তার আদুরে গাল দুটোতে একের পর এক চুমু এঁকে ড্রিপিং সফট গলায় বলে উঠল,

— “পাপার জান! কাঁদে না আর, বকব না প্লিজ, ডোন্ট ক্রাই বাবার জানবাচ্চা!”
​সৌহার্দ্যের এই নাটকীয় রূপ দেখে উপস্থিত সবাই যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেল! যে মানুষটার রাগ মাথার তালুতে চড়ে বসেছিল, সে কিনা এক সেকেন্ডে গলে পানি! নিজের স্ত্রী আর সন্তানের বেলায় মানুষের ধৈর্যের সীমা যে কতদূর যেতে পারে, তা সৌহার্দ্যের মতো রাগী মানুষকে না দেখলে বোঝা যেত না।
​সবাই যখন অবাক বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে আছে, তখন ফারিস নিজের নাক-মুখ কুঁচকে একটা ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
— “বেজালের ঘর থেকে আস্ত একটা বেজালই বের হয়েছে !”

রাত তখন গভীর। বাড়ির ছিমছাম বাগানের ঘাসের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরাম করে গা এলিয়ে বসে আছে পাঁচ বন্ধু—সৌহার্দ্য, শাহাবীর, ফারিস, সুজন আর আকাশ। আকাশ দুপুরের দিকে আসার কথা থাকলেও কাজের ব্যস্ততার জন্য ও আসতে পারেনি; সন্ধ্যায় এসেছে আকাশের দুই ছেলে—আশবিয়ান আর আরশিয়ান। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আসেনি!
​চারপাশের স্নিগ্ধ অন্ধকারে ঝিঁঝি পোকার ডাক আর মৃদু বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে হঠাৎ করেই আকাশের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আনমনে বলে উঠল ফারিস,
“সময় কত দ্রুত চলে যায়, বল তো! বাচ্চারা কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে আমরাও বুড়ো হয়ে যাবো…”
​ফারিসের কথায় একটা নস্টালজিক সুর ভেসে বেড়াল বাতাসে। একটু থেমে উদাস কণ্ঠে সুজন বলে উঠল,
“হুম… সময় পাল্টাবে, জীবন পাল্টাবে, কিন্তু আমাদের এই বন্ধুত্বটা কখনো পাল্টাবে না, তাই না?”
​বন্ধুত্বের এই আবেগী মুহূর্তে ফারিস একটু মুচকি হেসে বাঁকা সুরে বলে বসল,

“হুম, আর তুই আর সৌহার্দ্য তো এবার বেয়াই…”
​ফারিসের কথাটা পুরো শেষও হলো না; তার আগেই বিদ্যুতের বেগে চমকে লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠল সুজন,
“কী?! একদম আজেবাজে কথা বলবি না বলছি! আমি জীবনেও আমার মেয়েকে ওর ওই পাজি ছেলের কাছে বিয়ে দেব না!”
​সুজনের এমন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা দেখে সৌহার্দ্য পাশ থেকে একবার কেবল বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকাল, তবে মুখে কোনো কথা বলল না। ঠিক তখনই শাহাবীর বুক ফুলিয়ে তেঁতে উঠে বলে উঠল,
“আরে রাখ তোর রাগ! আমার ভাগ্নেগুলোর মতো এমন লক্ষ্মী ছেলে জামাই পাওয়া মানে ভাগ্যের ব্যাপার!”
​শাহাবীরের এমন ভক্তি দেখে ফারিস কটাক্ষের সুরে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাহলে সেই ভাগ্য তুই নিজে গিয়ে নিয়ে নে ভাই! আমাদের এত ভাগ্যের কোনো দরকার নেই।”
​ফারিসের এই খোঁচায় শাহাবীর একটু থমকে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“মামা-ভাগ্নের পবিত্র সম্পর্কের মধ্যে অন্য কোনো সম্পর্ক জড়ানোটা একদম ঠিক না!”
​শাহাবীরের এই জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে ফারিস ফোঁড়ন কেটে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল,
“নিজের বেলায় তো…”
​কিন্তু ফারিসের সেই কথাটা আর শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় চরম বিরক্তিতে তেঁতে উঠে সৌহার্দ্য ধমক দিয়ে বলে উঠল,
“চুপ করবি তুই, ইডিয়টটা কোথাকার!”
​বলেই একরাশ বিরক্তি ঝেড়ে সোজা সেখান থেকে উঠে ঘরের দিকে পা বাড়াল সৌহার্দ্য।
​সৌহার্দ্য রাগে গটগট করে চলে যেতেই সুজন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে তেঁতে উঠে সরাসরি ফারিসের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় শাসিয়ে দিল,
“এমন অলক্ষুণে কথা জীবনেও আর মুখে আনবি না বলে দিলাম!”

সকালের মিষ্টি রোদে বাগানের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে শাহবীর। ঠিক সামনেই মায়াবী হাসিতে ক্রিকেট খেলায় মেতে আছে বাচ্চারা। হঠাৎ করেই একটা বল গড়িয়ে এসে থামল শাহবীরের পায়ের কাছে। বলটা কুড়িয়ে নিতে শাহবীর সামনে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই সাফওয়ান এসে হাজির। স্নেহের আতিশয্যে শাহবীর তার চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, “বড় হয়ে কি হতে চাও মামার কলিজা?”
সাফওয়ান ছোট ছোট চোখ করে, একদম গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল শাহবীরের দিকে। তারপর অত্যন্ত ধীর ও ঠান্ডা গলায় বলে উঠল—
“আপনার মেয়ে জামাই হতে চাই, বানাবেন?”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই শাহবীর খুক খুক করে কেশে উঠল! সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে কোনোমতে বলটা সাফওয়ানের হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “খেলতে যাও!”
এরপর দৃষ্টি ফিরিয়ে সে সুজনের দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “সুজন, দেখ তো কালকের আমেরিকার ফ্লাইটের টিকিট কয়টার আছে?”
সুজন বাঁকা একটা হাসি দিয়ে টিপ্পনী কাটল, “ভালো মানাবে কিন্তু! মামা-ভাগিনা থেকে জামাই-শ্বশুর!”
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে শাহবীর ফুঁসে উঠল, “জীবনেও না! বোন দিয়ে জীবন বরবাদ, আর মেয়ে দিলে সোজা উপরে যেতে হবে!

বলেই সে সুমিকে হাসপাতালে দিয়ে আসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সুমি এখন একজন স্বনামধন্য গাইনোকলজিস্ট, আর পৃথাও একজন স্বনামধন্য গাইনোকলজিস্ট। ব্যতিক্রম শুধু রিদি; রিদির নিজের ভেতরেও কখনো এমন কোনো পেশাগত উচ্চাশা ছিল না, আবার সৌহার্দ্যও তাদের বাচ্চাদের জন্য কখনো বাড়তি কোনো চাপ দেয়নি। সৌহার্দ্যের একটাই সাফ কথা ছিল— বাবা-মা দুজনই যদি সারাদিন বাইরে বাইরে ব্যস্ত থাকে, তবে এই ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চাদের সময় কে দেবে?
সৌহার্দ্যের এই ভাবনাকে রিদিও কখনো জোর করে বদলানোর চেষ্টা করেনি। বরং সব রকম কোলাহল আর পেশাগত দৌড়ঝাঁপ থেকে দূরে সরে সে মন দিয়ে নিজের সংসারটাকেই আগলে রেখেছে। আর এই গোছানো সংসারটাই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তির জায়গা!

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা প্রায় এগারোটা। চৌধুরী বাড়ির বিশাল রান্নাঘরটা এই মুহূর্তে একরাশ ব্যস্ততা আর ভালোবাসার সুবাসে ভরপুর। চুলায় মৃদু আঁচে রান্নায় মগ্ন সাথী আর পৃথা; তাদের হাতের জাদুতে যেন গোটা রান্নাঘরটায় একটা ঘরোয়া উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে। ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদের খিলখিল হাসি আর উচ্ছ্বসিত কোলাহল, খুনসুটিতে মেতে তারা পুরো ঘর মাতিয়ে রেখেছে।
​দুই জায়ের এই সম্পর্কটা কেবল নামমাত্র নয়; রক্তে রক্তের না হলেও ভালোবাসাটা তাদের আপন দুই বোনের মতোই গভীর। রিদি আপাতত এই বাড়িতে না থাকলেও, দূরত্ব কি আর ভালোবাসার পরিধি মাপতে পারে? যোজন যোজন দূরত্ব সত্ত্বেও সাথী আর পৃথার সঙ্গে তার নিত্যদিনের যোগাযোগ, হৃদয়ের টান একটুও ফ্যাকাশে হয়নি।
​রান্নার এই ব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ দরজায় এসে উঁকি দিল আরবান। ডাকল পৃথাকে। স্বামীর ডাকে সাড়া দিয়ে এক কাপ গরম কফি হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করল পৃথা। ঠিক তখনই আরবান নিপুণ দক্ষতায় ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। মুখে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে, একটু অভিমানের সুরে টেনে টেনে বলল—

​”তোমাকে আজকাল পাওয়াই বা যায় কই? আমাকে কি একটুও মনে পড়ে না, ওহে নিষ্ঠুর রমণী?”
​স্বামীর এমন শিশুসুলভ অভিমান দেখে পৃথার ঠোঁটে ফুটে উঠল মিষ্টি এক হাসি। চায়ের কাপটা টেবিলে সাবধানে রেখে সে আলতো করে জড়িয়ে ধরল আরবানের গলা। নরম গলায় অভিমান ভাঙানোর সুরে বলল—
​”কী করব বলুন! সারাদিন পর আমি যখন হাসপাতাল থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরি, তখন আপনার দেখা পাই না। আবার আপনি যখন ফেরেন, তখন আমার ডিউটি শুরু হয়।”
​কফির কাপটার চেয়েও তখন তাদের মাঝের উষ্ণতাটা অনেক বেশি গাঢ়। আরবান নিচু গলায় ফিসফিস করে জানতে চাইল, “আচ্ছা, বাচ্চারা কোথায়?”
পৃথা মৃদু হেসে জবাব দিল, “ওরা নিচে আম্মুর কাছে আছে। আহিয়াকে দোলনায় ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি আম্মু ওদের সাথেই আছেন।”

​আরবান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। পৃথাকে নিজের শক্ত বাহুডোরে টেনে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল, কপালে এঁকে দিল এক স্নিগ্ধ, ভালোবাসার ছোঁয়া। তারপর ফিসফিস করে বলল—
​”ঠিক আছে, আজ যেহেতু আমরা দুজনই বাড়িতে আছি, চলো বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও ঘুরে আসি, একটু সময় কাটাই একসাথে।”
​পৃথা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে মৃদু স্বরে বলল, “কিন্তু, এই দুপুরবেলা…”
​তবে পৃথার কথা শেষ করতে দিল না আরবান। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসী হাসিতে সে বলে উঠল—
​” আজ আমরা বাইরেই খাব। রাতে আমার আবার ওটি আছে, তাই দুপুরের সময়টা অন্তত নিজেদের মতো করে কাটাই।”
​ আরবানের চোখের সেই না বলা অনুরোধ আর গভীর ভালোবাসার কাছে সব দ্বিধা নিমেষেই উবে গেল। পৃথা আর দ্বিরুক্তি করল না, চোখের ইশারাতেই সায় জানিয়ে হাসিমুখে চলে গেল নিজেদের মতো করে একটু তৈরি হয়ে নিতে।

দুপুর তখন প্রায় বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। নিজের চেম্বারে বসে বেশ গম্ভীর মুখে একমনে রোগী দেখছিল সৌহার্দ্য । ঠিক সেই মুহূর্তেই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হঠাৎ কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ছেলেদের স্কুলের নাম। মুহূর্তেই তার কপাল কুঁচকে গেল, চোখমুখে ফুটে উঠল চরম বিরক্তি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা রিসিভ করে ঠান্ডা অথচ বেশ কড়া গলায় সে বলল, “হোয়াটস প্রবলেম?”
​ওপাশ থেকে প্রিন্সিপালের গলা ভেসে এল। বেশ আমতা আমতা করে, বুক চিরে একটা কাঁপাকাঁপা শ্বাস ফেলে তিনি বললেন, “আসলে… সাফওয়ান… মন্ত্রীর নাতির মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে…”

​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রাগে-ক্ষোভে সৌহার্দ্যের রগগুলো ফুলে উঠল। বুকের ভেতর ধিকধিক করে জ্বলে উঠল চরম ক্ষোভ। তীব্র ফোঁস করে উঠে নিজের অজান্তেই সে বলে উঠল, “বেয়াদবগুলো একদম মায়ের মতো অর্ধেক কাজ করে!” পরক্ষণেই নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে, একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আসছি আমি।”
​স্কুলে পৌঁছানোর পর প্রিন্সিপালের রুমের আশপাশের পরিবেশটা ছিল ভারী ও থমথমে। যেন ঝড়ের আগের এক অদ্ভুত নীরবতা। দরজার সামনে একপাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেহেজাদ, শেহেতাজ, সায়ভান আর তাদের মাঝখানে অভিযুক্ত সাফওয়ান। আর ঠিক তাদের বিপরীতে আগুনের দৃষ্টি নিয়ে ফুঁসছে মন্ত্রীর নাতি তাবিয়ান। কিন্তু সাফওয়ানের চেহারায় অনুশোচনা বা ভয়ের দূরতম কোনো ছাপও নেই; একদম নির্বিকার, বেপরোয়া ভাব নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে।
​রুমের ভেতর পা রাখতেই সৌহার্দ্যের অগ্নিঝরা দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বড় ছেলের ওপর। ভেতরের রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করায় সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। গর্জে উঠে চেঁচিয়ে বলল, “সাফওয়ান, ওর মাথা কিভাবে ফাটালে তুমি?”
​বাবার সেই বজ্রকঠিন ধমকেও সাফওয়ানের ভ্রুযুগল কাঁপল না। চোখের পলক পর্যন্ত পড়ল না। কোনো উত্তর না দিয়ে, হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে তাবিয়ানের মাথায় আবার আঘাত করে, আগের মতোই বেপরোয়া ভঙ্গিতে সে বলে উঠল—

​”এভাবে!”
​ছেলের এমন অবিশ্বাস্য ঔদ্ধত্য দেখে সৌহার্দ্য ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, তারপর তার রাগ গিয়ে পৌঁছাল চরম সীমায়। ছেলেকে কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতেই ঠিক মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে তেড়ে এলেন মন্ত্রী তুহিন মির্জা। আভিজাত্যের সুরে বলে উঠলেন, “ডাক্তার চৌধুরী, আপনাকে আমি নিজের ছেলের মতো জানি, তাই বলে এই বেয়াদবি—”
​আর সহ্য হলো না সৌহার্দ্যের। মুখের ওপর হাত তুলে তুহিন মির্জার কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে এক বরফশীতল, গম্ভীর কণ্ঠে সে বলে উঠল, “আমি আমার ছেলেদের খুব ভালো করে চিনি! ওরা বিনা কারণে কখনো কারো সাথে খারাপ আচরণ করবে না।”
​বলেই রাগী দৃষ্টিতে ছেলের দিকে ফিরে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে বল?”
​কিন্তু সাফওয়ান একরোখা তেজে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, মুখ থেকে একটা টু শব্দও বের করল না। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেহেজাদ শান্ত ও ধীর কণ্ঠে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল, “আঙ্কেল, ও সায়ভানকে মেরে হাত কেটে দিয়েছে।”

​শেহেজাদের মুখ থেকে কথাটি শুনতেই সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সায়ভানের ছোট হাতটা নিজের বড় মুঠোয় তুলে নিল। দেখল, ছোট্ট সেই হাত চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে!
​সন্তানের রক্ত দেখেই সৌহার্দ্যের চোয়াল শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে গেল। রক্তিম চোখে সে সোজা তাকাল মন্ত্রীর দিকে। আগুনঝরা দৃষ্টিতে তুহিন মির্জার উদ্দেশ্যে সে উচ্চারণ করল—
​”এইবার শেষ! দ্বিতীয়বার আমার ছেলেদের গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করলে, ছেলের জায়গায় ছেলের বাপের হাতই আমি কেটে দেব!”
​আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সাফওয়ান, শেহেজাদ ও শেহেতাজকে স্কুল গাড়িতে তুলে দিয়ে, আহত সায়ভানকে নিজের কোলে তুলে নিল সৌহার্দ্য। তারপর নিজের গাড়িতে করে সোজা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

চেম্বারের নরম আলোর নিচে সৌহার্দ্য পরম যত্নে ছেলেটার ক্ষতস্থানটা ব্যান্ডেজ করে দিল। এরপর তাকে নিজের পাশেই বসিয়ে শান্ত হাতে রোগী দেখতে শুরু করল সে।
তাদের ঠিক সামনেই বসে আছেন এক মধ্যবয়স্ক লোক, সঙ্গে তাঁর তরুণী মেয়ে। সৌহার্দ্য অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে লোকটির শারীরিক অসুস্থতার নানা কথা শুনছে, খোঁজ নিচ্ছে খুঁটিনাটি।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, লোকটির পাশে বসা মেয়েটির সমস্ত মনোযোগ যেন অন্য কোথাও। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌহার্দ্যের পানে; পলক ফেলা যেন সে ভুলেই গেছে। তার সেই মুগ্ধ বা উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টির গভীরতা যে কারোরই চোখ এড়ানোর মতো নয়।
ঠিক তখনই চেম্বারের এক কোণে বসে নিজের ছোট ছোট চোখ দুটো দিয়ে পুরো দৃশ্যটা তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল সায়ভান। মায়ের প্রতি সন্তানের এই অধিকারবোধ বড় অদ্ভুত! রাগে ফুঁসে উঠল ছোট্ট শরীরটা। মায়ের ক্ষেত্রে কাউকে এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে সে নারাজ।
আর সহ্য হলো না সায়ভানের। ছোট্ট শরীরটা শক্ত করে মেয়েটির দিকে সরাসরি তাকিয়ে সে খাঁটি বাংলাতেই কড়া গলায় বলে উঠল,
“আন্টি, এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন আমার পাপার দিকে? আমার পাপাকে পছন্দ হয়েছে?”
সায়ভানের এমন অপ্রত্যাশিত ও তীক্ষ্ণ কথায় মুহূর্তে থমকে গেল মেয়েটি। অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল সে। কোনোমতে গলার শুকনো ঢোক গিলতে গিলতে আমতা আমতা করে বলে উঠল,

“না, মানে…”
মেয়ের কথা শেষ হতে দিল না সায়ভান। ছোট্ট বুকের ভেতর জমে থাকা পাহাড়সম তেজ নিয়ে সে এবার সরাসরি হুমকি দিয়ে বসল,
“আমার পাপা শুধু আমার মাম্মামের সম্পত্তি! আমার পাপার দিকে নজর দিলে আপনার চোখ তুলে লুডো খেলব আমি!”
কথাটা শোনামাত্র লজ্জায় একেবারে গুটিয়ে গেল মেয়েটি। চেম্বারজুড়ে তখন এক থমথমে নীরবতা।
ছেলের এমন কাণ্ডে বিরক্ত হয়ে সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। ধমকের সুরে শাসনের গলায় বলল,
“শাট আপ সায়ভান! খুব বেশি কথা বলছ তুমি আজকাল।”
কিন্তু দমবার পাত্র সায়ভান নয়! সে যেন আরও তিনগুণ তেজ বাড়িয়ে দিয়ে প্রতিবাদ করে উঠল,
“তুমি শাট আপ পাপা! আমি কিন্তু মাম্মামকে বলে দেব, একটা আন্টির জন্য তুমি আমাকে বকা দিয়েছ!”
ছেলের এই নাছোড়বান্দা জেদ দেখে সৌহার্দ্য আর কোনো কথা বাড়াল না। দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চরম বিরক্তি নিয়ে পুনরায় রোগী দেখার কাজে মন দিল।

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় ৯টা। সারাদিনের ক্লান্তিকর ব্যস্ততা শেষে বাচ্চাদের পরম যত্নে খাইয়ে-দাইয়ে রুমে দিয়ে এসেছে সুমি। এই মুহূর্তে ছোট্ট সিয়ারাকে কোলে নিয়ে তাকে ফিডিং করানোর স্নিগ্ধ এক মগ্নতায় ডুবে আছে সে। ঠিক সেই সময় কোনো শব্দ না করে পাশে এসে বসল শাহবীর। সুমির মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে ফুটল এক চিলতে মিষ্টি হাসি, আর ফিসফিস করে সে বলে উঠল—
“আমাকে যে একটুও সময় দিচ্ছ না, সেদিকে কি কোনো খেয়াল আছে?”
সুমি এক পলক তাকিয়ে দেখল, ছোট্ট সিয়ারার চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে আসছে। পরম সাবধানে মেয়েটিকে তার বেবি বেডে শুইয়ে দিয়ে সুমি সোজা হয়ে বসল। এরপর শাহবীরের কাঁধে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিয়ে মুখে মৃদু এক হাসি ফুটিয়ে বলল—
“বীর সাহেব, আজকাল দেখি বড্ড বেশি অভিযোগ করতে শুরু করেছেন!”
শাহবীরের বুক থেকে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাসের এক দীর্ঘ ছায়া; কণ্ঠে আলতো অভিমানের সুর মিশিয়ে সে বলল—
“কী করব বলো? সারাদিন তো বাচ্চাদের আর হাসপাতাল নিয়ে ব্যস্ত থাকো, আমার দিকে তাকানোর একটু ফুরসত কই তোমার?”

শাহবীরের এই কথাটুকুর গভীরে জমে থাকা না-বলা অভিমান সুমির বুক চিরে এক ফোঁটা অপরাধবোধ জাগিয়ে তুলল। সত্যিই তো, জীবনের হাজারো দায়িত্ব আর ব্যস্ততার ভিড়ে নিজেদের একটু একান্ত সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না কতদিন! সুমি নিজের সমস্ত মায়া একত্র করে শাহবীরের বুকের কাছে মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলল—
“হাসপাতাল থেকে কয়েকদিনের ছুটি নেওয়ার চেষ্টা করব, তবে জানি না ছুটি মিলবে কি না; সিয়ার জন্মের আগে থেকেই তো অনেকটা ছুটি কাটিয়ে ফেলেছি!”
সুমির মনে সামান্য কষ্ট বা অনুশোচনার মেঘ জমতে দেখে শাহবীর আর স্থির থাকতে পারল না। সে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে সুমির ঘাড়ে মুখ গুঁজে স্নেহের সুরে বলে উঠল—
“এভাবে কষ্ট পেতে হবে না, আমি এমনিই বলছিলাম!”
এরপর সুমির কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে একান্ত ভালোবাসার একটি কথা বলতেই, লজ্জায় রাঙা হয়ে তাতে সায় জানাল সুমি। চারপাশের গভীর রাতের নির্জনতা আর হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়ায় দুজন চিরচেনা সেই সুখের ও আবেগের আবেশে হারিয়ে গেল।

চতুর্দিকে তখন গভীর রাতের পসরা। আকাশে রূপালি চাঁদ নিজের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো বারান্দা জুড়ে, আর সাথে মৃদু বাতাসে ভেসে আসছে দূরের কোনো নাম না জানা ফুলের ঘ্রাণ। সেই শান্ত ও মায়াবী পরিবেশে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে সুজনের কাঁধে মাথা এলিয়ে চুপচাপ বসে আছে মেঘা।
সুজনের কোলজুড়ে তখন তাদের ছোট্ট রাজকন্যা মায়রা। অবুঝ শিশুটি পরম আয়েশে তার বাবার আঙুলগুলো নিজের ছোট ছোট নরম হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে। মেয়ের এমন নিষ্পাপ স্পর্শে সুজনের বুকটা যেন এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে উঠল। সে এক দৃষ্টিতে মেঘার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় ফিসফিস করে বলল, “আমার জীবনে এত সুন্দর একটা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, পিচ্চি!”
মেঘার চোখদুটো তখন খুশিতে চিকচিক করছে। সে আলতো করে সুজনের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে টেনে নিয়ে ভালোবাসায় মোড়ানো কণ্ঠে জবাব দিল, “আমার জীবনটাকে এত সুখে ভরিয়ে দিতে আপনাকে ধন্যবাদ, আমার ডাক্তার বাবু!”
প্রিয় মানুষের এমন কথা শুনে সুজন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে একটু ঝুঁকে মেঘার কপালে এঁকে দিল এক গভীর, উষ্ণ ও আলতো চুমু—যেখানে মিশে ছিল অফুরন্ত ভালোবাসা আর সারাজীবন একসাথে পথ চলার এক পরম প্রতিশ্রুতি।

রাতের স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা তখন পুরো চারপাশকে চাদরের মতো জড়িয়ে ধরেছে। খোলা বেলকনির একপাশে আনমনে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। আকাশের রুপালি চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় তার অবয়বটায় কেমন যেন একটা প্রশান্ত মায়া লেগে আছে। ভেতরে তখন সায়ভানকে ঘুম পাড়াচ্ছে রিদি।
​হঠাৎ করেই পেছন থেকে এসে নরম দুটো হাতে সৌহার্দ্যকে জড়িয়ে ধরল রিদি। সৌহার্দ্যের প্রশস্ত পিঠে নিজের মাথাটা আলতো করে এলিয়ে দিয়ে খুব মায়াবী, মিনমিন স্বরে ফিসফিস করে উঠল, “কী ভাবছেন, ডা. সাহেব?”
​রিদির স্পর্শ পেতেই যেন সৌহার্দ্যের ঘোর কাটল। মন্থর গতিতে ফিরে রিদির কোমরটা নিজের এক জাদুকরি টানে আরও কাছে টেনে নিল সে। রিদির নাকের ডগায় নিজের নাকটা ছোঁয়াতেই একটা চেনা সুবাস তাকে মাতিয়ে দিল। গভীর চোখে তাকিয়ে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, “ছোট সাহেব ঘুমিয়েছে?”
​রিদি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল, “হুম!”

​সৌহার্দ্যের ঠোঁটে তখন এক চিলতে মুগ্ধতার হাসি। রিদির উন্মুক্ত ঘাড়ে ভালোবাসার আলতো ছোঁয়া দিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, “তাহলে এবার আমার দিকে একটু নজর দিন, ম্যাডাম?”
​রিদি আর দূরত্ব বজায় রাখল না। সৌহার্দ্যের বুকের ওপর নিজের নাকটা ঘষতে ঘষতে লাজুক অথচ মিষ্টি গলায় বলে উঠল, “শুভ জন্মদিন, ডা. সাহেব!”
​কথাটা শেষ হতেই রিদিকে আরও একটু নিবিড় করে নিজের বুকে টেনে নিল সৌহার্দ্য। রিদির নরম গালের ওপর এঁকে দিল একটা উষ্ণ, গভীর চুমু। গম্ভীর মুখেই দুষ্টুমি করে বলল, “উপহার দেবেন না, শুধু খালি মুখে উইশ করবেন, ম্যাডাম?”

​রিদিও যেন এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। মৃদু হেসে নিজের হাতের মুঠোটা আস্তে আস্তে খুলল সে। চাঁদের আলোয় চকচক করে উঠল একটা প্রেগনেন্সি কিট—যার গায়ে স্পষ্ট হয়ে আছে সুখের দুটো লাল দাগ। কিটটা সৌহার্দ্যের চোখের সামনে ধরে লাজুক মুখে মিনমিন করে সে বলল, “আপনি আবার বাবা হবেন, ডা. সাহেব?”
​সময়টা যেন ওই মুহূর্তেই থেমে গেল। হতবাক চোখে কিটের ওই দুটি লাল দাগের দিকে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্য। বুকের ভেতরটা আনন্দে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল, চোখের কোণ দুটো চিকচিক করে উঠল জলে। এক লহমায় রিদিকে নিজের শক্ত বুকের সাথে একেবারে মিশিয়ে নিল সে। রিদির মাথার তালুতে স্নেহের উষ্ণ চুমু এঁকে দিয়ে কম্পিত ও ফিসফিস কণ্ঠে বলে উঠল—
​“ধন্যবাদ… এতগুলো বছর আমার এই বেপরোয়া জীবনটাকে সহ্য করার জন্য। আমার অগোছালো পৃথিবীটাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য। আর আমার জীবনটাকে একদম পূর্ণ করে দিতে আরও একটি ছোট্ট পৃথিবী উপহার দেওয়ার জন্য।”

​সৌহার্দ্যের বুকের আরও গভীরে মুখ গুঁজে রিদি এবার বুজে এল আনন্দের আবেশে। আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল, “ভালোবাসি, আমার অসভ্য ডাক্তার!”
​রিদির এই কথাটায় হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সৌহার্দ্যের। চোখ দুটো শক্ত করে বুজে রিদির বলা প্রতিটি শব্দ নিজের রক্তে মিশিয়ে নিল সে। তারপর এক সুগভীর, ধীর ও কম্পিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্যটুকু—

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬৫

“আই ডোন্ট লাভ ইউ, আমার তিন পৃথিবীর মা… তুমি শুধু আমার ভালোবাসা নও। তুমি আমার বেঁচে থাকার মেডিসিন, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের স্পন্দন, আমার জীবনের পূর্ণতা… আমার সমস্ত সুখের কারণ—মিসেস সৌহার্দ্য চৌধুরী!”

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here