অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬৩
রিদিতা চৌধুরী
ভোরের সোনালি রোদে খান বাড়ি তখন এক স্নিগ্ধ ও শান্ত আমেজে জেগে উঠছে। শিশিরভেজা ঘাস আর গাছের পাতার ওপর কচি রোদ পড়ে চারপাশটা চকচক করছে। উৎসবের ক্লান্তি কাটিয়ে পুরো বাড়িটি তখনো আলসে ঘুমে আচ্ছন্ন, কেবল রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম চায়ের সুবাস আর কাজের লোকজনের মৃদু গুঞ্জন।
রিদি আজ খুব সকালেই ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে সে হারিয়ে গেছে তার ফেলে আসা সোনালি দিনগুলোতে। ছোটবেলার কত সুন্দর স্মৃতি—বাবা, মা আর ছোট্ট বোনটাকে ঘিরে থাকা দিনগুলো একে একে মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই তার বুকটা ভার হয়ে এল। চোখ গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা মুক্তোর মতো জল।
কোনো রকমে কাঁপা হাতে চোখের জল মুছতেই পাশে এসে দাঁড়াল কেউ। রিদি চমকে পাশ ফিরতেই শাহাবীর তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল, তারপর অত্যন্ত শান্ত ও মায়ার কণ্ঠে বলল,
“কাঁদছিস কেন, ভাইয়ার জান?”
ভাইয়ের ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, শাহাবীরের বুকে মুখ গুঁজে সশব্দে কেঁদে ফেলল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল,
“পাপা আর মামমামের কথা খুব মনে পড়ছে, ভাইয়া!”
শাহাবীর কোনো কথা বলল না, শুধু নিঃশব্দে বোনের চুলে আর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার এই মৌন স্পর্শেই যেন রিদির সমস্ত জমাট কষ্ট কিছুটা হালকা হলো।
পরক্ষণে বুক থেকে মুখ তুলে শাহাবীরের চোখের দিকে তাকিয়ে রিদি ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“আচ্ছা ভাইয়া, আমাদের জীবনটা যদি অন্যরকম হতো! ছোটবেলা থেকে তোমার বুক আগলানো আদর আর শাসনে বড় হতাম, আর দশটা মেয়ের মতো বুক ফুলিয়ে বলতে পারতাম— ‘আমার একটা ভাই আছে’!”
বোনের এই না বলা অভিমান আর না পাওয়ার বেদনা ছুঁয়ে গেল শাহাবীরের বুকটাও। বোনের চুলে হাত বুলিয়ে বিষণ্ণ হাসিতে সে কেবল এতটুকু বলল,
“হুম… তবে এক জীবনে মানুষের সব চাওয়াই তো আর পূরণ হয় না!”
পরিবেশের ভারী ভাবটা কাটাতে হঠাৎই একটু শাসনের সুরে সে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, সকালের কিছু খেয়েছিস?”
রিদি চোখের কোণের জল মুছে হালকা হেসে জবাব দিল,
“হুম, সকাল পাঁচটায় উঠিয়ে তোমার ওই গণ্ডার বন্ধু জোর করে খাইয়ে দিয়েছে!”
কথাটা শুনে শাহাবীর চোখ পাকিয়ে বলল,
“এটা ও শুনলে তোর খবর আছে!”
রিদি মুখ ভেংচে চ্যালেঞ্জের সুরে বলে উঠল,
“কচু খবর করবে! আমি ওনাকে একটুও ভয় পা…”
পুরো কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই ছাদের প্রবেশদ্বারে ভেসে উঠল সৌহার্দ্যের গম্ভীর ও পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“আচ্ছা, তাই নাকি ম্যাডাম? আমাকে একটুও ভয় পান না, তাই তো?”
সৌহার্দ্যের হঠাৎ উপস্থিতিতে রিদি একটু কাঁচুমাচু হয়ে গেল। তা দেখে শাহাবীর একটু বিরক্ত হয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে সতর্ক করল,
“কথায় কথায় আমার বোনকে ভয় দেখাবি না বলছি, তাহলে কিন্তু…”
শাহাবীর কথা শেষ হতে না দিয়েই সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ ও বিরক্তি মেশানো চোখে তাকিয়ে বলে উঠল,
“ওকে দেন, কথায় কথায় তোর বোনকে চুমু খাব! তুই এখন এখান থেকে যা, আমার ক্রেভিং হচ্ছে— সকাল থেকে একটাও চুমু খাওয়া হয়নি…”
সৌহার্দ্যের এই বেহায়া টাইপ রসিকতা শুনে শাহাবীর চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রাগে বিড়বিড় করে উঠল— “বেয়াদব একটা!”
আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে রাগে গজগজ করতে সে ছাদ ছেড়ে দ্রুত পা বাড়াল নিচে।
শাহাবীর সেখান থেকে চলে যেতেই সৌহার্দ্য ধীর পায়ে রিদির কাছে এগিয়ে এল। তারপর দু’হাতে তার কোমর জড়িয়ে আলতো টানে নিজের একদম কাছে সেঁটে নিল এবং কপালে ভালোবাসার একটা স্নিগ্ধ চুমু এঁকে দিয়ে অত্যন্ত নরম ও আদুরে কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“এত সকাল সকাল কেন উঠেছ, জান? তোমাকে কতবার বলেছি এভাবে একা একা বাইরে আসবে না, বিয়ের বাড়ির চারপাশে কত অচেনা মানুষের ভিড়…”
সৌহার্দ্যের এই অন্তহীন যত্ন ও আকুলতা দেখে রিদি বুকভরা ভালোবাসায় মুচকি হাসল। তারপর সৌহার্দ্যের গালে একটা মিষ্টি চুমু এঁকে তার প্রশস্ত বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে আলতো গলায় বলল,
“আমি কি ছোট্ট কোনো বাচ্চা নাকি যে হারিয়ে যাব? এত দুশ্চিন্তা কেন করেন , ডা: সাহেব?”
রিদির এই নিষ্পাপ কথায় সৌহার্দ্য যেন আরও বেশি আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রিদিকে তার বুকের সাথে আরও শক্ত করে, আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। বুকজুড়ে বয়ে চলা ঝড়ের তীব্রতা লুকিয়ে সে কোনো কথাই বলল না, শুধু দুই বাহুর বেড়াজালে আগলে রাখল তাকে। এই মেয়েটি যে তার পুরো পৃথিবী, তার হৃৎস্পন্দনের প্রতিটি কোণ জুড়ে জড়িয়ে আছে— তা হয়তো এই বোকা মেয়েটাকে সে কোনোদিনই মুখ ফুটে পুরোপুরি বোঝাতে পারবে না!
ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। রিদি, পৃথা আর রিভা সেই সকাল ন’টার দিকেই সুমির বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। সৌহার্দ্য অবশ্য চেয়েছিল রিদিকে নিজের সাথেই নিয়ে যেতে, তাই কিছুতেই একা ছাড়তে রাজি ছিল না সে। কিন্তু রিদিও নাছোড়বান্দা! শেষমেশ শাহাবীরকে দিয়ে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তবেই সে সৌহার্দ্যকে রাজি করিয়েছে।
বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়স্বজনও কিছুক্ষণ আগেই রওনা হয়ে গেছেন। এখন কেবল ছেলেদের প্রস্তুতির পালা। জুমার নামাজটা শেষ করেই একযোগে বেরিয়ে পড়বে তারা।
এদিকে সৌহার্দ্য সেই কখন থেকে একেবারে পরিপাটি হয়ে তৈরি। একরাশ অস্থিরতা নিয়ে সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে আর হাঁসফাঁস করছে। ওর এমন তড়িঘড়ি ভাব দেখে যে কারো মনে হতে বাধ্য— বর শাহাবীরের চেয়ে যেন ওরই যাওয়ার তাড়া বেশি!
হাতের ঘড়ির দিকে আরেকবার তাকিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে সৌহার্দ্য বলে উঠল,
“মেয়েদের মতো তোরা এতক্ষণ ধরে কী রেডি হচ্ছিস বল তো? আজ বের হবি, নাকি এখানেই বসে থাকবি?”
ফারিস আয়নার সামনে থেকে নাক-মুখ কুঁচকে জবাব দিল,
“আমি তো কিছুই বুঝছি না! যার বিয়ে, তার নিজেরই কোনো তাড়া নেই, আর তুই খামোখা এমন ছটফট করছিস কেন? তোর ভাব দেখে তো মনে হচ্ছে বিয়েটা শাহাবীরের নয়, তোরই!”
পাশ থেকে সুজন সুযোগ পেয়ে বেশ রসিয়েই একটা খোঁচা দিল,
“আহা, আজ একটা বউ নেই বলে যাওয়ার তাড়া ও নেই!”
বন্ধুদের এমন কথায় সৌহার্দ্যের কান লাল হয়ে গেল। রাগ আর চাপা বিরক্তি নিয়ে সে কোনোমতে “ইডিয়ট!” বলে গজগজ করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
মির্জা বাড়ির বিশাল ফটক দিয়ে একে একে প্রবেশ করল সৌহার্দ্যদের গাড়িগুলোর বহর। প্রথম গাড়ি থেকে বর শাহাবীর নামতেই, তার পিছু পিছু একে একে নেমে এল বাকি চার বন্ধু। ঠিক তখনই ওদের ওপর ঝড়ের বেগে ঝরে পড়ল শত শত ফুলের এক টুকরো বৃষ্টি!
সবাই একটু সামনে এগোতেই গেইটটা ঘিরে ধরে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়াল সায়েম, রিদি, রিভা, পৃথা, জুথি, মেঘা আর সাথে সুমির কয়েকজন মামাতো বোন। তবে সৌহার্দ্যের চোখ সরাসরি গিয়ে আটকেছে তার নিজের বউয়ের ওপর— মুখের কোণে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে সে রিদির দিকে তাকিয়ে আছে।
সায়েম মুচকি হেসে শাহাবীরের দিকে শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এই নিন দুলাভাই, আগে শরবত খান, আর সাথে আমাদের গেট ধরা হাদিয়াটা মিটিয়ে তারপর ভেতরে প্রবেশ করুন!”
ফারিস একটু এগিয়ে এসে স্বভাবসুলভ ঢঙে বলল,
“কী বাচ্চারা, কত চাই বল তোমাদের?”
রিদি এক পা সামনে এগিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
“পাঁচ লক্ষ টাকা দিলে তবেই গেইট ছাড়ব!”
বোনের এমন কথা শুনে শাহাবীর কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি তোর দুলাভাই লাগি? তোর তো ওদের দলে থাকার কথা না, তুই আমার পক্ষে হবি নাকি ওদের পক্ষে?”
রিদি একটু ভাব নিয়ে জবাব দিল,
“আজ আমার বান্ধবীর বিয়ে, তাই আমি আমার বান্ধবীর পক্ষেই আছি ভাইয়া! কালকে আবার—”
রিদির কথা শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সোজা রিদির সামনে দাঁড়াল। কপালে বিরক্তির গভীর রেখা টেনে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
“স্টুপিড! আগে পাঁচ লক্ষ বানন করে দেখাও!”
বলেই পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে রিদির হাতে জোর করে গুঁজে দিয়ে গমগমে স্বরে সে যোগ করল,
“গেট ছাড়ো, স্টুপিড মহিলা! এটা দিয়ে চকলেট কিনে খেয়ো!”
সৌহার্দ্যের এমন কাণ্ডে একটুও দমে গেল না রিদি। উল্টো দুষ্টুমিভরা হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে সে মজা করে বলে উঠল,
“আরে বেয়াই! এই টাকা দিয়ে আমাকে চকলেট কিনে দিতে হবে না, বরং এটা দিয়ে না হয় আপনার বউকে একটা চকলেট কিনে খাইয়ে দিয়েন! আমাদের পাওনা টাকা না বুঝিয়ে দিলে কিন্তু এক পা-ও ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছি না!”
নিজের বউয়ের মুখ থেকে হঠাৎ এমন মিষ্টি সুরে “বেয়াই” ডাক শুনে সৌহার্দ্য যেন একেবারে বোকা বনে গেল! সে থমকে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই রিদি আগের চেয়েও মিষ্টি সুরে টেনে টেনে বলে উঠল,
“আগে টাকা ছাড়ুন, বেয়াই! তা না হলে কিন্তু ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছি না!”
সৌহার্দ্য পলকেই বুঝে গেল তার বউয়ের এই দুষ্টুমিভরা বুদ্ধির বহর! সে মুহূর্তের বিন্দুমাত্র দেরি না করে এক কদম এগিয়ে সরাসরি রিদির মুখের খুব কাছে মুখটা নিয়ে গেল। তারপর একদম ফিসফিস করে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“বেয়াইন, এত লোকজনের মধ্যে এসব কথা বলে আমাকে ব্যাড ফিল দিচ্ছেন কেন? আমি ভদ্র মানুষ, না ভিতরে…”
সৌহার্দ্যের মুখে এমন হঠাৎ ডাবল মিনিং কথাবার্তা শুনে রিদি হকচকিয়ে কেশে উঠল। তারপর মুখ কুঁচকে বিরক্তিতে চোখ ছোট করে বলে উঠল,
“লাগাম টানুন মুখে, ব্রেকহীন লোক!”
রিদির এই রাগ দেখে সৌহার্দ্য যেন আরও দারুণ এক আনন্দ পেল। সে বিন্দুমাত্র পিছু না হটে উল্টো আরও এক পা এগিয়ে আরও ধীর ও মোহনীয় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আপনাকে দেখে আমার সব লাগাম ছুটে গেছে, বেয়াইন। চলুন, রুম ডেটে যাবেন? আমার বউটা অবাধ্য, ভাবছি ওটাকে বাদ দিয়ে আপনাকে বিয়ে করে নিই। করবেন আমায় বিয়ে?”
সৌহার্দ্যের মুখে এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনে রিদি একদম তাজ্জব বনে গেল! বউ বাদ দিয়ে দেবে মানে কী? তাহলে সে নিজে আবার কে?! রিদি হতভম্ব হয়ে একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে রাগে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“লুচ্চা ডাক্তার!”
সৌহার্দ্য কিছু একটা জবাব দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে সুমির বাবা এসে উপস্থিত হলেন। তাকে দেখেই সৌহার্দ্য সাথে সাথে এক কদম পিছু গিয়ে একদম গম্ভীর ভদ্র ছদ্মবেশ ধরে ফেলল। সুমির বাবা হাসিমুখে ওদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে ঢোকার অনুরোধ করতেই সায়েম, রিদি আর বাকিরা হইচই জুড়ে দিল— টাকা না পেলে কিছুতেই গেট ছাড়বে না তারা!
সায়েমদের এই কাণ্ডে বিরক্ত হয়ে ফারিস পকেট থেকে একটা চেক বই বের করে চটপট সেখানে নিজের সই করে রিভার হাতে গুঁজে দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল,
“যা ফকিন্নির দল, এবার গেইট ছাড়!”
সায়েম কৌতূহলী হয়ে চেকের কাগজের দিকে তাকাতেই চোখ কপালে উঠল! সেখানে দশ লক্ষ টাকার অঙ্ক লেখা দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে সে সবাইকে নিয়ে এক পাশে সরে দাঁড়াল। রাস্তা পেয়ে ফারিসরা তখন শাহাবীরকে মাঝখানে রেখে হুরমুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
তবে কয়েক পা এগোতেই ফারিস পেছন ফিরে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“চেকটা শাহবীরের সিগনেচার আমার, টাকা তুলতে না পারলে আমার কোনো দোষ নেই বাচ্চারা!”
ফারিসের মুখে এই কথা শোনার সাথে সাথেই সায়েম চেকের দিকে তাকিয়ে একদম ভড়কে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিভা রাগে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করে ফারিসকে মনে মনে ইচ্ছামতো গালি দিতে দিতে বাড়ির ভেতরে পা বাড়াল। তাদের এই হাল দেখে বাকিরাও চরম হতাশা নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
সবাই যখন একে একে সরে গেল, রিদিও সেখান থেকে এক পা সামনে বাড়িয়ে চলে যাওয়ার ঠিক তখনই তার ঠিক পেছনে সৌহার্দ্যের গম্ভীর ও ভারিক্কি কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কোথায় যাওয়া হচ্ছে বেয়াইন, এই নিরীহ বেয়াইকে একা রেখে, হুম?”
বলেই সৌহার্দ্য রিদির একদম কাছাকাছি এগিয়ে এসে ওর নরম হাতটা আলতো করে নিজের মুঠোয় বন্দি করে ফেলল। তারপর টেনে নিয়ে গেল বাড়ির এক কোণে একটা নিরিবিলি ছায়াসুনিবিড় জায়গায়। লজ্জায় রিদির মুখটা তখন রক্তিম হয়ে উঠেছে; বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুলে দুলে উঠছে তার। কোনোমতে চোখ তুলে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতেই সে দেখল, সৌহার্দ্য এক দৃষ্টিতে, বড় বেশি মোহনীয় মায়ায় তাকিয়ে আছে তার পানে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া কণ্ঠে রিদি আমতা আমতা করে বলে উঠল,
“এ- এভাবে কী দেখছেন?”
সৌহার্দ্য আরও একটু ঝুঁকে এসে মাদকতা মেশানো মায়াবী কণ্ঠে জবাব দিল,
“দেখছি আমার সুন্দরী বেয়াইনকে! এমন সুন্দরী বেয়াইন আছে আগে জানলে অবাধ্য বউটাকে ছেড়ে আপনাকে বিয়ে করে নিতাম?”
সৌহার্দ্যের এমন চোখের ভাষা আর কথার জাদুতে রিদি থমকে গেলেও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিল। দুষ্টু হাসিতে চোখ চকচক করে উঠল তার, তারপর দু’হাতে সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে ধরে সহজ ভঙ্গিতে সে বলে বসল,
“বেয়াই, আপনার মতলব সুবিধার লাগছে না, পরকীয়া করতে চাচ্ছেন নাকি?”
রিদির এহেন সাহসী প্রতিউত্তরে সৌহার্দ্যের চোখে মুখে খেলার ছলে দুষ্টুমির ঢেউ খেলে গেল। সে মুহূর্তের দেরি না করে রিদির সরু কোমরটা নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে আরও কাছে টেনে নিল। তারপর দু’গালে পরম মমতায় দুটো চুমু এঁকে দিয়ে দুষ্ট চোখে ফিসফিস করে বলল,
“নো, পরকীয়া করা খারাপ মানুষের কাজ! আমি আবার ভদ্র মানুষ, আপনার সাথে রুমডেটে যেতে চাচ্ছি বেয়াইন!”
কথাটা শেষ করেই সে রিদির আরও একটু কাছে ঝুঁকে এল এবং আদুরে ছলে ওর নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে আবার বলল,
“যাবেন নাকি বেয়াইন, পাশেই আমার ফ্ল্যাট আছে?”
রিদি মুখটা একটু কুঁচকে বিরক্তির ভান করে সৌহার্দ্যকে বুক ঠেলে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“যাব, আগে আমার জামাইয়ের অনুমতি নিয়ে আসুন!”
সৌহার্দ্য এই মিষ্টি কথার রেশ কাটতেই আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আড়াল ভেঙে চারপাশ কাঁপিয়ে ভেসে এল সুজনের চেনা গলা—
“কী রে তু…”
কথাটা মাঝপথেই গলা টিপে থামিয়ে দিয়ে সুজন সাথে জরুরি ব্রেক কষল! চোখ বড় বড় করে পেছন ফিরে এক সেকেন্ডের জন্য পরিস্থিতি দেখে সে জিভ কেটে বলে উঠল,
“সরি সরি, রং টাইমিং!”
হঠাৎ সুজনের উপস্থিতি টের পেয়ে রিদি পলকে লজ্জায় আষ্টেপৃষ্ঠে রাঙা হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না সে, ঝড়ের বেগে সৌহার্দ্যকে ছাড়িয়ে ছুটে পালিয়ে গেল অন্দরের দিকে।
রিদি চোখের পলকে আড়ালে চলে যেতেই সৌহার্দ্য মাথার চুলে হাত চালিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“ইডিয়ট, তোর টাইমিং সবসময় রং হয়!”
রাগ মিশ্রিত এক চিলতে বিরক্তি নিয়ে সেও দ্রুত বাড়ির ভেতরের দিকে পা বাড়াল। এদিকে সুজন তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে নিজের সাফাই গেয়ে চলেছে,
“তুমি মাঠে ঘাটে রোমান্স করবা, আর মানুষ দেখলে দোষ!” — বলতে বলতে সেও ফিকফিক করে হেসে সৌহার্দ্যের পিছু নিল।
বিয়ের মূল মঞ্চের রাজকীয় সোফাটায় শান্ত হয়ে বসে আছে বর শাহাবীর। তার ঠিক পাশেই ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে সুজন, আকাশ আর ফারিস। সুমির পক্ষ থেকে বিয়ের যাবতীয় প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এবার কাজি সাহেব এসে হাজির হলেন শাহাবীরের সামনে। হাতে কাবিননামার খাতা নিয়ে তিনি মৃদু হেসে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন,
“সাফিন মির্জা ও রাহেনা মির্জার একমাত্র কন্যা সুমনা মির্জা সুমিকে পাঁচ কোটি টাকা দেনমোহরে আপনি বিয়ে করতে রাজি আছেন কি, বাবা? রা…”
কাজি সাহেবের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই শাহাবীর যেন ঝড়ের বেগে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠল,
“কবুল, কবুল, কবুল!”
শাহাবীরের এমন তড়িঘড়ি কাণ্ড দেখে ফারিস চরম বিরক্তি নিয়ে দূরে বসা সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে ফোস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল,
“শালা, দুইটা প্রোডাক্টই একেবারে একই রকম! একটা আস্ত বউপাগল, আরেকটা আধা বউপাগল! একটু ধীরে-সুস্থে শান্ত মাথায় ‘কবুল’ বললে কী হতো? মনে হচ্ছে এখনই বুঝি বউ চুরি হয়ে যাবে!”
সুজন ফারিসের কথার সাথে তাল মিলিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“ঠিকই বলছিস! আর ওইটার দিকে তাকিয়ে দেখ, কীভাবে চোখের পলক না ফেলে বউয়ের দিকে চেয়ে আছে! মনে হচ্ছে চোখ দিয়েই আস্ত গিলে খেয়ে ফেলবে!”
সুজনের কথা শুনে ফারিস চোখ ফিরিয়ে তাকাল সৌহার্দ্যের দিকে। একটু দূরে এক কোণের নিরিবিলি সোফায় একা বসে আছে সৌহার্দ্য। তার চারপাশে হাজারো মানুষের কোলাহল, অথচ সে যেন একদম নির্বিকার! এক দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে আছে সে শুধু রিদির পানে— পলক ফেললেই যেন চোখের পলকে হারিয়ে যাবে তার সবটুকু আকাশ!
বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা ও আনন্দঘন পর্ব শেষ হতেই রিদি আর পৃথা দুজনে মিলে সুমিকে ধরাধরি করে এনে বসাল শাহাবীরের পাশে। সুমি পাশে এসে বসতেই শাহাবীর একবার আড়চোখে তার দিকে তাকাল, পরমুহূর্তেই আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই রিদি দুজনের মাথা আলতো করে এক করে ধরে একটা সুন্দর আয়না সামনে বাড়িয়ে দিয়ে শাহাবীরের উদ্দেশ্যে ফুর্তিতে বলে উঠল,
“কী দেখা যায়, ভাইয়া?”
শাহাবীর এক পলক অপলক দৃষ্টিতে আয়নায় প্রতিফলিত রূপটির দিকে তাকিয়ে মায়াবী কণ্ঠে জবাব দিল,
“আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার আকাশের একমাত্র চাঁদ!”
শাহাবীরের মুখ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত ও গভীর রোমান্টিক কথা শুনে চারপাশের সবাই একসাথে হইচই করে উঠল! লজ্জায় সুমির আষ্টেপৃষ্ঠে গুটিয়ে যাওয়ার দশা। রিদি তখন মুচকি হেসে সুমির দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে প্রশ্ন করল,
“কাকে দেখেন, ভাবিজান?”
সুমি লজ্জায় প্রথমে কিছু বলতে চাইল না, কিন্তু রিদির নাছোড়বান্দা চাপে পড়ে শেষমেশ মিনমিন করে বলেই ফেলল,
“আমার জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষকে!”
সুমি কথাটি বলতেই চারপাশ জুড়ে আরেক দফা হইচই আর হাসির রোল পড়ে গেল!
ভিড়ের মাঝে রিদি একটু সরে দাঁড়াতেই শাহাবীর সুযোগ বুঝে একটু এগিয়ে এসে সবার অজান্তে সুমির নরম হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। হাতের ছোঁয়া পেতেই থরথর করে কেঁপে উঠল সুমি! শাহাবীর তখন একটু ঝুঁকে সুমির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“যতই কাঁপাকাঁপি করেন, আজ কিন্তু আর ছাড়াছাড়ি নাই!”
শাহাবীরের এমন রোমান্টিক কাণ্ড কারোর নজরে না এলেও তীক্ষ্ণধী ফারিসের চোখ এড়াল না! ফারিস বাঁকা হেসে ঠাট্টা করে বলে উঠল,
“আরে ভাই, বাড়ি যাওয়ার টাইমটা তো অন্তত দে! এমন আঠার মতো চিপকে আছিস কেন? তুই তো দেখছি সৌহার্দ্যের থেকেও দুই কাঠি সরেস, আস্ত নির্লজ্জ একটা!”
ফারিসের এই চটজলদি কথাটি কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই শাহাবীর বিদ্যুতের বেগে সুমির কাছ থেকে একেবারে ছিটকে দূরে সরে বসল!
বিয়ের সব কোলাহল ছেড়ে একপাশে নিরিবিলি একটা সোফায় বসে আনমনে মোবাইল টিপছিল সৌহার্দ্য। ঠিক তখনই রিদি এসে চুপচাপ তার ঠিক পাশেই বসে পড়ল। রিদিকে পাশে দেখেই সৌহার্দ্য কিছুটা বিরক্ত হয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল,
“হোয়াটস ইউর প্রবলেম? কথা শোন না কেন আমার? বলছি না এক জায়গায় বসে থাক…”
সৌহার্দ্য নিজের কথার বাকি অংশটুকু শেষ করার সুযোগও পেল না! তার আগেই রিদি চটজলদি ঝুঁকে পড়ে সৌহার্দ্যের মাথার সাথে নিজের মাথা লাগিয়ে মুখের সামনে সেই বিয়ের আয়নাটা ধরে মিষ্টি হেসে বলে উঠল,
“আয়নাতে কী দেখা যায়, ডাক্তার সাহেব?”
হঠাৎ চোখের সামনে আয়না চলে আসায় সৌহার্দ্য মোবাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সরাসরি রিদির চোখের দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর চাহনি নরম করে দৃঢ় অথচ গভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমার রাজ্যের রানি, আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ নারী, আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনের কারণ— যাকে ছাড়া সৌহার্দ্য চৌধুরী নামের মানুষটি অসম্পূর্ণ, বিলীন!”
সৌহার্দ্যের মুখ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত ও গভীর প্রেমের কথা শুনে রিদি একদম পলকহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুলে উঠল। এরপর কিছুটা সামলে নিয়ে সে নিজেই আবার ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আমি কী দেখছি জানেন?”
রিদির এমন অদ্ভুত প্রশ্নে সৌহার্দ্য আবার মুখে বিরক্তি টেনে এনে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী?”
রিদি মুখ মুচড়ে দিয়ে দুষ্টুমিভরা গলায় বলে উঠল,
“একটা রসকসহীন রাগী ভূত, যে রোমান্টিক কথা বলতে গিয়ে মুখটা গণ্ডারের মতো করে রাখে!”
রিদির মুখে এমন চাঁচাছোলা কথা শুনে সৌহার্দ্য একরাশ বিরক্তি গলায় চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসে কণ্ঠে বলে উঠল,
“স্টুপিড মহিলা!”
রাত এখন প্রায় বারোটা। সুমিদের বাড়ি থেকে ফেরার পর কেটে গেছে বেশ কয়েক ঘণ্টা। করিডোর দিয়ে কথা বলতে বলতে শাহাবীর আর সৌহার্দ্য এগিয়ে আসছিল। ঠিক তখনই তাদের পথ আটকে দাঁড়াল এক দল মুখরিত মুখ।
রুমের দরজার সামনে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারিস, সুজন ,আকশ আর আরবান। তাদের পাশেই রিদি, রিভা, জুথি আর মেঘা। সবার ভিড়ে সায়েমও উপস্থিত। বিয়ে বাড়ি থেকেই জুথিকে দেখে ছেলেটার অবস্থা তথৈবচ— প্রেমের সাগরে রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছে সে! মেয়েটার দু’পাশে পা মিলিয়ে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করলেও জুথি পাত্তাই দিচ্ছে না।
দরজার সামনে এমন রহস্যময় ভঙ্গিতে সবাইকে ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল সৌহার্দ্যের। বিরক্তি ঝরিয়ে সে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
— “কী চায় তোদের?”
ফারিস বাঁকা হাসিতে ঠোঁট রাঙিয়ে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে জবাব দিল,
— “টাকা চাই! ছাড় বিশ।”
শাহাবীর এক চিলতে অমায়িক হাসি হেসে পকেট থেকে বিশ টাকার একটা কুঁচকানো নোট বের করে বাড়িয়ে দিল। বিরক্তির সুরে বলল,
— “একজন এমপি হয়ে বিশ টাকার জন্য এভাবে দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
শাহাবীরের বাড়িয়ে দেওয়া বিশ টাকার নোটটা ছিটকে তার দিকেই ছুড়ে দিল ফারিস। আহত অহংকার দেখিয়ে নাক সিঁটকে বলল,
“বিশ টাকা কে চেয়েছে তোর কাছে? আমি কি তোর চোখে ফকির নাকি? তোর বিশ টাকা তোর কাছেই রাখ, বিশ লাখ দে!”
চোখ দুটো বড় বড় করে শাহাবীর অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
সুজন মুখে এক বাঁকা, বিটকেল হাসি ঝুলিয়ে জবাব দিল, “বউয়ের কাছে যাওয়ার জন্য, মামু!”
শাহাবীর আরও বেশি বিস্মিত হয়ে তেড়ে এল, “তোরা না বরপক্ষ ছিলি তখন? এখন হঠাৎ ওদের দলে ভিড়ে গেলি কেন!”
ফারিস তার কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, “আমার যখন যেই পক্ষে লাভ, আমি সেদিকেই যাই। তখন ওদের দলে থাকলে তো কোনো ফায়দা ছিল না, এখন লাভ আছে, তাই ওদের সাথেই আছি!”
এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সৌহার্দ্য আর সহ্য করতে পারল না। চরম বিরক্তি চেপে রেখে সে ফেটে পড়ল, “বউ ওর, খাট ওর, রুমটাও তো ওর! বাসর তো ও করবে, তোদের কেন টাকা দিতে যাবে ইডিয়ট?”
ফারিস মুখ কুঁচকে একরোখা সুরে জানিয়ে দিল, “টাকা না ছাড়লে বউয়ের কাছে আর রুমে ঢোকা হবে না! আজ সারারাত আমরা এই দরজার সামনেই পাহারা দিয়ে ঘুমাব!”
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে দেখে সৌহার্দ্য তেতে উঠল। সে শাহাবীরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “বাদ দে ভাই, আজ আর বাসর করার দরকার নেই। তোর বউ, তোর যখন ইচ্ছে তখন বাসর করতে পারবি। ওরা এখানে থাকতে চায়, থাকুক!”
কথাটা শেষ করে সে যেই না শাহাবীরকে নিয়ে ফিরে দাঁড়াবে, অমনি ফারিস ইশারায় কী যেন বোঝাল রিদিকে। সাথে রিদি সুযোগ বুঝে এক চমৎকার নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল, “উফ, পায়ে কী যে ব্যথা! একটু টাকাটা পেলে ঘুমাতে যেতে পারতাম…”
রিদির সেই অভিনয় শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য যেন ঘাবড়ে গিয়ে এক পলকে শাহাবীরের দিকে তাকাল। ব্যস্ত গলায় বলে উঠল, “মাত্র বিশ লাখ তো! দিয়ে দে না ভাই, এই সামান্য কারণে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই!”
নিজের বন্ধুকে চোখের পলকে এভাবে দল বদলাতে দেখে শাহাবীর কপালে হাত দিয়ে চরম বিরক্তিতে বলল, “একটা আস্ত বউপাগল!”
এরপর মানিব্যাগের খোঁজে নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে বুঝতে পারল, ওয়ালেটটা তার কাছে নেই। ফারিসের দিকে তাকিয়ে সে বলল, “রুমের চাবিটা দে, মানিব্যাগটা ভেতরে আছে।”
কিন্তু ফারিস দরজা আগলে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বাঁকা হেসে বলল, “উহু, অত বোকা পেয়েছিস নাকি? মোটেও বোকা বানানো যাবে না বন্ধু!”
ফারিসের এমন ফাজলামো দেখে সৌহার্দ্য এবার চরম বিরক্তিতে নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে কার্ডটা ফারিসের দিকে বাড়িয়ে দিল। রাগে কটমট করে বলল, “যা, মন চায় তুলে নিস! এখন বিদায় হ এখান থেকে!”
এরপর রিদির দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠল, “স্টুপিড মহিলা, রুমে আসা হোক!”
কথাগুলো শেষ করেই সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দুপ-দাপ ভারী পায়ে সে জায়গা ত্যাগ করল।
ফারিসরা গেইট থেকে সরে যেতেই শাহাবীর রুমে প্রবেশ করে। দরজার দিকে এক নজর তাকিয়ে ফারিসের উদ্দেশে মনে মনে একটা চাপা গালি দিয়ে সে ‘ঢাস’ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে, যেখানে সুমি লজ্জায় আর সংকোচে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বিছানার চাদর খামচে ধরে বসে আছে।
শাহাবীর সুমির মিষ্টি, লাজুক মুখটার দিকে তাকিয়ে মায়াবী কণ্ঠে বলল, “চলো ওযু করে আসি?”
সুমি অবুঝ দৃষ্টিতে তাকাতে শাহাবীর শান্ত কণ্ঠে বলল, “নামাজ পড়তে হবে!”
তার সেই আশ্বস্ত করা কথায় সুমি শাড়িটা সুন্দর করে সামলে উঠে দাঁড়াল। সে যখন পাশ দিয়ে চলে যেতে নিচ্ছিল, শাহাবীর আলতো করে তার হাত টেনে নিজের কাছে টেনে নিল। তারপর অত্যন্ত যত্নের সাথে, ধীরে ধীরে সুমির পরনের ভারী অলংকারগুলো একে একে খুলে দিল— যেন সমস্ত ক্লান্তি আর ভারী গহনার বোঝা থেকে মেয়েটাকে মুক্ত করছে।
অলংকার খোলা শেষ হলে সে সুমির আরও কাছে মুখ নিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আগে একটা নরমাল শাড়ি পরে নাও, এটা পরে কষ্ট হবে!”
সুমি আবেশে আর লজ্জায় রাঙা মুখে শুধু একটু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। এরপর আলমারি থেকে একটা সুতির শাড়ি হাতে নিয়ে সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। এই ফাঁকে শাহাবীরও নিজের পাঞ্জাবিটা বদলে হালকা টি-শার্ট পরে নিল।
কিছুক্ষণ পর সুমি ভেজা ভেজা চুলে স্নিগ্ধ রূপে রুম থেকে বের হয়ে এল। দুজনে মিলে একসাথে ওযু করে নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
নামাজ শেষে সুমি জায়নামাজটা গুছিয়ে ঠিক করে রাখতে যাবে, অমনি শাহাবীর তার হাতটা ধরে এক টানে নিজের বুকে টেনে নিল। সুমির কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা গভীর, ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল সে। তারপর সুমির কানের কাছে মুখ নিয়ে স্নিগ্ধ ফিসফিসিয়ে বলল, “মে আই?”
সুমি কোনো উত্তর দিতে পারল না; লজ্জায় রাঙা হয়ে সে শাহাবীরের শার্টের বুক বরাবর কাপড়টা শক্ত করে খামচে ধরল সাথে নিজের লাজুক মাথাটা তার চওড়া বুকে এলিয়ে দিল। সুমির এই মিষ্টি নীরবতা আর নিঃশব্দ সম্মতি বুঝতে পেরে শাহাবীরের ঠোঁটের কোণে এক অপূর্ব মুচকি হাসি ঝুলে উঠল।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সুমিকে আলতোভাবে কোলে তুলে নিল। বিছানায় এনে অত্যন্ত যত্নে, পরম আদরে তাকে শুইয়ে দিল। এরপর এক টানে বুক থেকে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিয়ে সুমির উষ্ণ বুকে মুখ গুঁজে দিল। নিজের সমস্ত উষ্ণতা আর উত্তপ্ত ভালোবাসায় মেয়েটাকে একেবারে বেসামাল করে হারিয়ে গেল এক অপূর্ব, নাম না জানা সুন্দর জগতে!
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও ছয়টি মাস। সময়ের হাত ধরে এই ক’টি দিনেই যেন অনেকের জীবনে রূপকথার মতো পরিবর্তন এসেছে।
পৃথা আর আরবান দম্পতির কোল আলো করে এসেছে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান, আজ তার বয়স ঠিক এক মাস হলো। চারপাশটা যেন ওই ছোট্ট শিশুর হাসিতে ম-ম করছে। এদিকে সুমি এখন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অন্যদিকে রিভা আর ফারিসের সংসার চলছে তাদের চিরচেনা সেই মিষ্টি খুনসুটি আর ঝগড়ায় ভরা রোমাঞ্চে। সবার কোলে বাচ্চা দেখে রিভার মনেও সুপ্ত বাসনা জাগে— সেও সারাদিন ফারিসের পিছু পিছু ঘুরঘুর করে একটা সন্তানের বায়না ধরে। কিন্তু ফারিস নানা ফন্দিফিকিরে, ভুলভাল বুঝিয়ে তাকে এদিক-সেদিক শান্ত করে রাখে!
এদিকে সুজনের সাথে মেঘার সম্পর্কের বরফ অনেকটাই গলেছে। যদিও সম্পর্কটা খুব বেশি এগোয়নি, তবুও শাহাবীরকে সামনে রেখে মেঘার পরিবারের সাথে কথা পাকাপাকি করে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলেছে সুজন। মেয়েটার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই বাজবে তাদের বিয়ের সানাই। এই সুযোগে মেয়েটার মন জয় করার হাজার চেষ্টা করে যাচ্ছে সুজন।
অন্যদিকে সায়েম আর জুথি চুটিয়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। জুথির মন জয় করতে সায়েমের চেষ্টার যেন কোনো কমতি নেই।
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত অবস্থা রিদি আর সৌহার্দ্যের। রিদির এখন আগের সেই ছিপছিপে ভাব নেই, নয় মাসের গোলগাল ফোলা পেট নিয়ে হাঁটাচলা করতেই তার দম ফুরিয়ে আসে। পেটে জমজ দুই বেবি আসার কারণে তার শরীরের এই অবস্থা, আর তাতেই সৌহার্দ্যের পাগল করা স্বভাব বেড়ে গেছে কয়েকশো গুণ! সারাদিন সে রিদির ছায়ার মতো পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায়, এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেয় না। তবে হাজার ভালোবাসার মাঝেও তার চিরচেনা সেই ধমক-ধমকি এক বিন্দুও কমেনি। আর অমনি রাগে মুখ ফুলিয়ে গজগজ করতে থাকে রিদি!
সকাল ঠিক নয়টা। ঘড়ির কাঁটায় চোখ রাখতেই শাহাবীরের গাড়িটা এসে থামল মেডিকেল কলেজের ঠিক সামনে। সুমিকে আজ কলেজে নামিয়ে দিতে এসেছে সে। গাড়িটা থামতেই সুমি দরজা ঠেলে নামতে যাবে— ঠিক সেই মুহূর্তে শাহাবীর সুমির হাত ধরে আলতো টানে নিজের উরুতে বসিয়ে নিল। সুমির নরম গালে একটা স্নিগ্ধ চুমু এঁকে সে নরম গলায় বলে উঠল,
“আমার পাওনা না দিয়ে কোথায় যাচ্ছ?”
সুমি মুখে এক ফালি মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“বীর সাহেব, আপনি দিন দিন একটু বেশি দুষ্ট হয়ে যাচ্ছেন?”
শাহাবীর এক মায়াবী হাসিতে সুমির ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল। এরপর একদম শান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আপনার মতো এমন মিষ্টি একটা বউ থাকলে দুষ্ট না হয়ে পারা যায়?”
শাহাবীরের এমন মিষ্টি আবদারে সুমি শাহাবীরের দুই গালে দুটো মিষ্টি চুমু এঁকে দিল। তারপর খিলখিল করে হেসে বলে উঠল,
“এবার তো দিলাম, ছাড়ুন?”
কিন্তু শাহাবীর তাকে ছাড়ল না তো বটেই, বরং আরও একটু শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে বলল,
“টেনশন হচ্ছে আমার, সাবধানে থাকবে!”
এরপর ভালোবাসায় মোড়ানো হাতে সুমির পেটে আলতো বুলিয়ে দিয়ে সে আবার বলল,
“আমার প্রাণটার খেয়াল রাখবে, মম যেটা টিফিন বানিয়ে দিয়েছে সেটা টাইম মতো খেয়ে নিবে, ঠিক আছে?”
শাহাবীরের এই নিখাদ যত্ন দেখে সুমির বুকটা গর্ব ও ভালোবাসায় ভরে উঠল। সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল,
“এত টেনশন করতে হবে না, বীর সাহেব। আপনার বউ অনেক স্ট্রং!”
সুমির কথা শুনে শাহাবীরের মুখে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটল। তারপর সুমির গাল টিপে দিয়ে সে আদুরে গলায় বলল,
“হুম, জানি আমি!”
এরপর ভালোবাসার একরাশ মায়া জমিয়ে রেখে সুমি শাহাবীরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলেজের চেনা গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আর শাহাবীরও নিজের অফিসের উদ্দেশে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় দুটো ছুঁই ছুঁই। নরম রোদের ঝিলিক এসে পড়েছে জানালার কাচে। আয়নার সামনে এক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে নিজের নয় মাসের ভারী, ফোলা পেটটাতে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেখছিল রিদি— যেখানে একটু একটু করে দানা বাঁধছে তাদেরই অস্তিত্ব। খাটের কোণটায় বসে বউয়ের এই মিষ্টি, এলোমেলো কাণ্ডকারখানা এক পলকে তাকিয়ে উপভোগ করছিল সৌহার্দ্য। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় তখন মোচড় দিয়ে উঠছিল তার।
ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে নিঃশব্দে রিদির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। পেছন থেকে আচমকা আলতো করে জড়িয়ে ধরে রিদির পিঠে মাথা এলিয়ে দিল, তারপর তার সুবাস ছড়ানো খোলা চুলে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, “কী দেখা হচ্ছে স্টুপিড মহিলা?”
রিদি চমকে একটু ঘুরে সৌহার্দ্যের গালে পরম আদরে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিল। তারপর অস্থির গলায়, একরাশ ব্যাকুলতা নিয়ে বলল, “ওরা আসতে এত দেরি করছে কেন ডাক্তার সাহেব, আমার আর তর সইছে না!”
বউয়ের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে সৌহার্দ্য একটু মৃদু হাসল। সে একটু ঝুঁকে রিদির ফোলা পেটের খুব কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে একটা চুমু বসিয়ে দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতর থেকে একটা ছোট্ট লাথি বসিয়ে দিল ছোট্ট প্রাণগুলো! রিদি চমকে শিউরে উঠে “উফ!” বলে মৃদু চেঁচিয়ে উঠল।
তৎক্ষণাৎ সৌহার্দ্যের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। উদ্বিগ্ন গলায় সে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “কী হলো সুইটহার্ট, ব্যথা হচ্ছে?”
রিদি মুখ কুঁচকে ছোট্ট বাচ্চার মতো অভিযোগের সুরে বলল, “আপনার দুষ্ট বাচ্চারা লাথি দিচ্ছে আমায়!”
বউয়ের সেই আদুরে অভিযোগ শুনে সৌহার্দ্যের মুখের অবয়ব নরম হয়ে এল। সে পরম যত্নে রিদির পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল, তারপর সরাসরি পেটের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কথাগুলো বলে উঠল, যেন ওই ছোট্ট দুনিয়াটার ঠিক কানে কানে পৌঁছাচ্ছে তার আকুতি—
“পাপার কলিজারা, পাপার হার্টকে কষ্ট দিও না প্লিজ। পাপা রিকোয়েস্ট করছে তোমাদের কাছে; তোমার মামমাম কষ্ট পেলে পাপা ও কষ্ট পাই! আমার জানবাচ্চারা, দুনিয়াতে এসে তখন পাপাকে কষ্ট দিও, এখন শান্ত থাকো প্লিজ!”
সৌহার্দ্যের এমন অবুঝ, মায়ায় মোড়ানো কথাগুলো শুনে রিদির বুকটা হুহু করে উঠল। ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সে সৌহার্দ্যের চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল, তারপর আনমনে বিষাদের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, “আচ্ছা, আমি যদি আর ফিরে না আসি, আপনি ওদের এভাবে আগলে রাখবেন?”
রিদির মুখ থেকে হঠাৎ এমন অদ্ভুত, বুকভাঙা কথাটা বেরোতেই সৌহার্দ্যের মাথার আকাশটা যেন এক পলকে ভেঙে পড়ল। সে চমকে এক পলক রিদির দিকে তাকাল। মেয়েটার ছলছলে, জলে ভেজা চোখ দুটো দেখতেই সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা অজানা এক ভয়ে ধক করে কেঁপে উঠল, নিশ্বাস যেন আটকে আসার উপক্রম হলো।
সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক টানে রিদিকে নিজের বাহুডোরে আরও শক্ত করে, প্রায় মিশিয়ে জড়িয়ে ধরল। বুকফাটা আর্তনাদটা লুকিয়ে ভারী, রুদ্ধশ্বাসে সে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“কিভাবে আগলে রাখব, জান? তখন তো ওরা এতিম হয়ে যাবে। ওদের মা না থাকলে বাবাও থাকবে না!”
সৌহার্দ্যের এই নিঃশর্ত, গভীর ভালোবাসার তীব্রতা রিদির সারা অস্তিত্বে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে এক হাহাকার সৃষ্টি করায় সে সৌহার্দ্যকে আরও শক্ত করে, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, “আমি আপনার সাথে হাজার বছর বাঁচতে চাই, ডাঃ সাহেব!”
সৌহার্দ্য আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। বুক চিরে বেরিয়ে আসা আর্তনাদটা গিলে ফেলে সে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল, তারপর ঠোঁট কামড়ে শুধু অত্যন্ত ক্ষীণ অথচ ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল, “হুম!”
সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িংরুমের স্নিগ্ধ আলোয় সোফায় পাশাপাশি বসে মেতে উঠেছে রিভা আর রিদি। চৌধুরী বাড়িতে রিভার আসার আজ দু’দিন হলো, আর দুই ননদ-ভাবীর এই মেলবন্ধনে ঘরের কোণগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। একটু দূরে সামনের সোফায় বসে গম্ভীর মুখে নিজেদের নতুন হাসপাতালের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত সৌহার্দ্য আর ফারিস।
কথায় কথায় হঠাৎ করেই রিভা রিদির দিকে ঝুঁকে আবদারের সুরে বলে উঠল, “চলো না ভাবি, একটু বাহির থেকে ঘুরে আসি আমরা?”
রিদি আনমনে নিজের নয় মাসের ভারী পেটের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল। ডাক্তার যদিও মোটামুটি হাঁটাচলা করতে বলেছেন, কিন্তু তার নিজেরই এই মুহূর্তে নড়াচড়া করতে একদম ভালো লাগছে না। প্রথমে সে ‘না’ বলতে গিয়েও থেমে গেল; সারাদিন চার দেওয়ালের মাঝে বন্দী থাকতে থাকতে বুকটা তার কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠেছে, দম বন্ধ লাগছে খুব।
তাই একটু দ্বিধা কাটিয়ে রিদি সোফায় বসা সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের সুরে বলে উঠল, “ডাক্তার সাহেব, একটু ঘুরিয়ে আনবেন আমাদের?”
বউয়ের এই আবদারে সৌহার্দ্য সাথে সাথেই ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করে কড়া গলায় বলে উঠল, “নো, এই টাইমে বাহিরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই!”
সৌহার্দ্যের এমন পরিষ্কার মানা করায় মুহূর্তের মধ্যে রিদির উজ্জ্বল মুখটা কালো মেঘের মতো থমথমে হয়ে গেল। তার এই মলিন মুখটা চোখের আড়াল হলো না ফারিসের। সে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে এক পশলা হেসে বলে উঠল, “চল, খুব দূরে যেতে হবে না, ওদের কাছাকাছির মধ্যে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি!”
ফারিসের কথায় সৌহার্দ্যের মন সায় না দিলেও, একবার রিদির ওই আশাভাঙা মুখটার দিকে তাকিয়ে সে আর শেষ পর্যন্ত না করতে পারল না। গম্ভীর মুখে শুধু মাথা নাড়ল।
বাড়ির থেকে একটু দূরে একটা ঝালমুড়ির ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছে রিভা আর রিদি। তার সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে এক পরিচিত লোকের সাথে কথা বলছে ফারিস আর সৌহার্দ্য। প্ল্যানে না থাকলেও হঠাৎ লোকটির সাথে দেখা হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই কথা বলতে হচ্ছে তাদের; অথচ সৌহার্দ্যের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে একটু দূরে দাঁড়ানো রিদির দিকে।
রিভা রিদির হাতটা ধরে আদুরে গলায় বলল, “চল ভাবি, হাঁটতে হাঁটতে খাই, তোমার জন্য উপকার হবে,” বলেই দুজনে এগিয়ে গেল রাস্তার এক পাশে।
হাঁটতে হাঁটতে আনমনে কখন যে রিদি ফুটপাত ছেড়ে মূল রাস্তায় নেমে গেছে, ক্লান্ত মেয়েটা তা খেয়ালই করেনি। ঠিক তখনই দূর থেকে চোখ পড়তেই বুকটা কেঁপে উঠল সৌহার্দ্যের। সে রাগে ও আকুলতায় তেড়ে আসতে আসতে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “স্টুপিড মহি….”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬২
কিন্তু তার মুখের বাকি কথাগুলো গলার মাঝেই চিরতরে আটকে গেল! মুহূর্তের এক পলক ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণহীন একটা প্রাইডেট কার ঝড়ের বেগে ছুটে এল তাদের দিকে। তা দেখতে পেয়েই রিভা নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে এক ধাক্কায় রিদিকে দূরে সরিয়ে দিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম নিষ্ঠুরতা— রিদি ধাক্কার চোটে হুমড়ি খেয়ে উপুড় হয়ে রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ল; ব্যথার তোড়ে রিদির বুকফাটা আর্তনাদে নিমেষে কেঁপে উঠল চারপাশ! আর চোখের পলকে, সেই প্রাইভেট কার এর ধাক্কায় টিটকে পড়ল রিভার ওই ছোট, কোমল শরীরটা!
স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেল চিরকালের মতো। পাথর হয়ে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ফ্যালফ্যাল করে দাঁড়িয়ে রইল দুই ভাই—
