প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩১
insia isha chowdhury
ঋতু এই বৃষ্টির আবহাওয়ায় বেশ আরাম করেই ঘুমাচ্ছে। অথচ পাশে বসে থাকা সুপ্তি কতবার যে তাকে একনাগাড়ে ডেকে চলেছে, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু এই মহারানীর ঘুম কি আর এত সহজে ভাঙার? শেষমেশ ঋতুর দুই গালে হাত রেখে মুখটা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে সুপ্তি বলল,
“ঋতু, জলদি ঘুম থেকে ওঠ। তোর সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।”
সুপ্তির এমন কাণ্ডেও ঋতুর ঘুম ভাঙা তো দূরের কথা, বরং সে আরও গভীরভাবে কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। এবার আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সুপ্তি জোর করে ঋতুকে একটু তুলে বসাল। সুপ্তির এমন কাজে ঋতু ভীষণ বিরক্ত হলো। ঋতু এমনিতে সহজে ঘুমায় না। কিন্তু কোনোভাবে যদি একবার ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কেউ সেই ঘুম ভাঙিয়ে দিলে তার মেজাজ মুহূর্তেই খারাপ হয়ে যায়। চোখ না মেলেই বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“আরে ভাই, আমাকে একটু ঘুমোতে দে, প্লিজ।”
ঋতু এখনো ঘুমের ঘোরেই কথা বলছে দেখে সুপ্তি অস্থির হয়ে বলল,
“তুই কি জানিস, বাড়িতে কী হচ্ছে? আমার কথাটা একটু শোন।”
ঋতু এবার আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
“এই বাড়িতে সব সময় কিছু না কিছু হতেই থাকে। আমাকে ঘুমোতে দে, দয়া করে। রাতে আমার একটুও ঘুম হয়নি।”
“ঋতু, আমার কথাটা একটু শোন!”
সুপ্তির কণ্ঠে এবার একরাশ অস্থিরতা।
ঋতু মনে মনে ভাবল, নিশ্চয়ই সুপ্তি নিজের কোনো সমস্যার কথা বলতে চাইছে। তাই একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল,
“ভাই, বিশ্বাস কর, আর পঞ্চাশ মিনিট আমাকে ঘুমোতে দে। আমি সারারাত তোর কথা শুনব, প্লিজ। এখন যা, আমাকে একটু ঘুমাতে দে। তোর যত সমস্যা আছে, সব সমাধান করার চেষ্টা করব। কিন্তু এখন আমাকে একটু ঘুমোতে দে।”
কথা শেষ করেই একপ্রকার টেনে-হিঁচড়ে সুপ্তিকে ঘর থেকে বের করে দিল ঋতু। তারপর দরজা আটকে আবার নিশ্চিন্ত মনে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
সুপ্তি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে রইল।
সে তো কথাটাই বলতে পারল না! সোহেল ঋতুকে বিয়ে করতে চায়। বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছে। তার ওপর সোহেলের চরিত্র যে খুব একটা ভালো নয়, সেটা সুপ্তি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তাই সোহেলের ব্যাপারে সবকিছু ঋতুকে জানাতে চেয়েছিল সে।
কিন্তু ঋতু তো এখন ঘুমিয়ে একেবারে কাদা। এই অবস্থায় তাকে কিছু বলেও লাভ নেই। সুপ্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
“ঠিক আছে, ঋতু এখন একটু ঘুমিয়ে নিক। আমি আর কিছুক্ষণ পর এসে ওকে সব কথা বলব। কিন্তু কিছুতেই ওই সোহেলের সঙ্গে ঋতুর বিয়ে হতে দেওয়া যাবে না।”
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ সুপ্তির ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটি অচেনা নম্বর। সুপ্তি একটু অবাক হলেও ফোনটা রিসিভ করল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর,
“হ্যালো, সুপ্তি। আমি সোহেল বলছি।”
ওপাশ থেকে সোহেলের কণ্ঠস্বর বেশ হাসিখুশি শোনাল। আর তা শুনেই সুপ্তি বিস্মিত হয়ে বলে উঠল,
“শয়তানের নাম নিতে না নিতেই শয়তান হাজির!”
সুপ্তির কথা শুনতেই সোহেলের মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। একটু নরম সুরে বলল,
“কী যে বলো! আমি শয়তান হতে যাব কেন? আচ্ছা, আমি যেটা করেছি, এ কারণে কি তুমি রাগ করেছ?”
সুপ্তি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“না, রাগ করব কেন? আপনি যেটা করেছেন, এর পরে তো আপনার গলা টিপে দেওয়া উচিত!”
কথাটা শুনে সোহেল নিজের গলায় হাত রেখে বলল,
“ঠিক আছে, সমস্যা নেই। তুমি যদি এতই আমার গলা টিপে দিতে চাও, দিতেই পারো। আর কিছুদিন পর যখন আমাদের বিয়ে হবে, তখন তো তুমিই আমাকে শাসন করবে।”
সোহেলের কথা শুনে সুপ্তি বেশ অবাক হয়ে গেল।
এই ছেলেটার সাহস কত বড়! একেই তো তার বোনকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, আবার তার সঙ্গেই ফ্লার্ট করছে! সুপ্তি রাগে-ক্ষোভে বলল,
“মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন?”
সুপ্তির কণ্ঠের রাগ বুঝতে পেরে সোহেল এবার বিছানা থেকে উঠে ভালোভাবে বসে পড়ল। তারপর কিছুটা শান্ত কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, আমি জানি। হঠাৎ করে আমার মা আন্টির সঙ্গে বিয়ের কথা বলায় তুমি বিরক্ত বোধ করছ।”
সুপ্তি এবার আর ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা না বলে বলল,
“আপনি কি আমাকে ভালোভাবে বলবেন, আপনি আসলে কী বলতে চাইছেন?”
সুপ্তির কথায় সোহেল এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
“দেখো, আমি আমার মাকে সরাসরি বলেছি যে আমি তোমাকে পছন্দ করি। আর আমি তোমার সঙ্গে কোনো হারাম সম্পর্কে জড়াতে চাই না। আমি তোমাকে হালালভাবে বিয়ে করতে চাই। আর আমি এতদিনে এটাও খোঁজ নিয়েছি যে, তোমার বাইরে কারও সঙ্গে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।”
সুপ্তি নীরবে শুনে চলেছে। সোহেল আবার বলল,
“আর বিশ্বাস করো, সুপ্তি, তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো, আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি আমি সব সময় তোমাকে খুশি রাখার চেষ্টা করব। তোমাকে কখনো অশান্তিতে রাখব না। আমি বুঝতে পারছি, হঠাৎ করে এসব তোমার ভালো লাগছে না। কিন্তু একবার আমাকে বিশ্বাস করে দেখো। আমি তোমাকে নিরাশ করব না। আমি তোমাকে যেদিন মির্জা বাড়িতে প্রথম দেখেছি, সেদিন থেকেই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এই কারণেই তোমার ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। তুমি যদি রাজি হও, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আর তোমার মতামতকে আমি সম্পূর্ণরূপে সম্মান করব।”
সোহেলের কথায় সুপ্তি একেবারে নির্বাক হয়ে গেল।
তার কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দই বের হচ্ছে না।
মনের ভেতর একসঙ্গে কতগুলো প্রশ্ন, কতগুলো অজানা অনুভূতি এসে ভিড় করল। সে কিছু বলার আগেই সোহেল ফোন কেটে দিল। ফোনটা কানে ধরে কয়েক মুহূর্ত একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল সুপ্তি।
তারপর হঠাৎ যেন শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে করিডরের মেঝেতে বসে পড়ল। মাথার ভেতর শুধু একটি কথাই বারবার ঘুরপাক খেতে লাগল, “সোহেল… তাকে বিয়ে করতে চায়?”
তাহলে এতক্ষণ যে কথাটা সে ভেবে এসেছে, সেটাই ভুল! হয়তো সেদিন কোনো এক ভুল বোঝাবুঝির কারণে সোহেলের মা ঋতুর নাম বলেছিলেন। আসলে বিয়ের প্রস্তাবটা ঋতুর জন্য নয়। তার জন্যই ছিল! সুপ্তির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সুপ্তি অবিশ্বাসভরা দৃষ্টিতে শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে, নিজের কাছেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল,
“তার মানে… এই বিয়েটা আমার সঙ্গে ঠিক হয়েছে? ঋতুর সঙ্গে নয়?”
হালকা ঝিরিঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, আর তার মাঝেই তীব্র ট্র্যাফিক জ্যামে রাস্তায় আটকে আছে প্রণয়ের গাড়ি। বিরক্ত হয়ে জানালার বাইরে তাকাতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল রাস্তার পাশের একটি ছোট্ট শপের দিকে।
হঠাৎই মনে হলো, সূচনার জন্য একটা চকলেট নিয়ে গেলে কেমন হয়?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই আর দেরি করল না প্রণয়। গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তার ক্রিম রঙের শার্টের হাতা ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। তবুও সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। দ্রুত দোকানে ঢুকে সূচনার পছন্দের কয়েকটি চকলেট কিনে নিল।
চকলেটগুলো হাতে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতেই আচমকাই তার দৃষ্টি আটকে গেল সামনের একটি রেস্টুরেন্টের দিকে। কাচের ওপাশে বসে আছে সূচনা। প্রণয় থমকে দাঁড়াল।
রেস্টুরেন্টের ভেতরে সূচনার সঙ্গে রাফিও বসে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা হঠাৎ করেই জোরালো হয়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ বৃষ্টির পর্দায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল।
কিন্তু প্রণয়ের চোখের সামনে বৃষ্টি বলে কিছু নেই।
তার দৃষ্টি কেবল কাচের ওপাশে বসে থাকা সূচনার ওপরই স্থির হয়ে রইল। হাতে ধরা চকলেটের প্যাকেটটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে প্রণয় নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। চোখের সামনে দেখা দৃশ্যটা কোনোভাবেই তার মনের সঙ্গে মিলছে না।
সে শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সূচনার দিকে।
পকেট থেকে ফোন বের করে সূচনাকে একটা ফোন দিল। কিন্তু তার সামনেই সূচনা ফোনটি রিসিভ করল না। তা দেখে প্রণয়ের আরো বেশি রাগ হয়ে গেল।
আর কোনো কিছু না ভেবেই প্রণয় রেস্টুরেন্টের দিকে পা বাড়াল। ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ আটকে গেল দৃশ্যটার ওপর রাফির হাত তখনও সূচনার হাতের ওপর। মুহূর্তেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত রাগ আগুনের মতো জ্বলে উঠল। এতক্ষণ নিজেকে যে রাগটা সামলে রেখেছিল, তা আর ধরে রাখা সম্ভব হলো না। তার ওপর কাছে আসতেই রাফির মুখ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো যেন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দিল। পরের মুহূর্তেই প্রণয় আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে রাফির কলার চেপে ধরল সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাফিকে নিজের দিকে টেনে এনে এক ঘুষি বসিয়ে দিল মুখ বরাবর।
হঠাৎ আঘাতে রাফি কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
রাফির কলার মুঠোবদ্ধ হাতে চেপে ধরে প্রণয় দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল,
“ইউ অ্যাসহোল!”
প্রণয় রাফিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে চোখে চোখ রেখে হিসহিস করে বলল,
“তোর সাহস কত বড় হয় যে তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে… আমার ওয়াইফকে প্রপোজাল দিস?”
ঠোঁটের কোণে হাত দিয়ে রক্তের স্পর্শ পেতেই রাফির চোখেমুখেও রাগ জ্বলে উঠল। প্রণয়ের এমন আচরণে সেও আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারল না। প্রণয় তাৎক্ষণিক রাগে ফেটে বললো,
“আমি তোকে কোন কিছু বলিনি তার মানে এই না যে তুই আমার ওয়াইফ কে যা তা বলবি!”
প্রণয় আবারও এগিয়ে আসতেই রাফি আত্মরক্ষার্থে হাত তুলে তার আঘাত ঠেকিয়ে দিল। তারপর সুযোগ বুঝে একবার শক্ত করে প্রণয়ের মুখ বরাবর ঘুষি মারল। আঘাতে প্রণয়ের মুখ একপাশে ঘুরে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই সে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
দাঁত চেপে রাফির দিকে তাকিয়ে প্রণয় আচমকাই তার জামার কলার ধরে টেনে কাছে নিয়ে এলো।
রাফি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই প্রণয় তাকে ধাক্কা দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে দিল। ভারসাম্য হারিয়ে রাফি টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা খেল।
কিন্তু প্রণয় সেখানেই থামল না। চোখেমুখে তখন এমন এক ক্রোধ, যে সামনে থাকা মানুষটিকে সে আর চিনতেই পারছে না। আবারও রাফির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো প্রণয়।
আতঙ্কিত সূচনা এবার ছুটে এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ইতিমধ্যেই ভয়ে ওর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কাঁপা হাতে প্রণয়ের এক বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“প্লিজ… ভাইয়াকে আর মারবেন না! ছেড়ে দিন।”
প্রণয় থেমে গেল। ধীরে ধীরে সে সূচনার দিকে তাকাল। মেয়েটার ভয়ে কাঁপতে থাকা মুখ আর অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টিতে কঠোরতার আড়ালে অন্য এক অনুভূতি ফুটে উঠল প্রণয় সূচনার হাতটা আরও শক্ত করে নিজের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল। প্রণয়ের দেওয়া আঘাতের চিহ্ন ইতিমধ্যেই রাফির চেহারায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আঘাতে ওর ঠোঁট কেটে গেছে, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। কপালেও কেটে গেছে। আর এতবার পড়ে যাওয়ায় হাত-পায়েও বেশ ব্যথা করছে। রাফি আহত দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইল। তাৎক্ষণিক প্রণয় রাফির উদ্দেশ্যে বলল,
“আই’ম গিভিং ইউ ওয়ান লাস্ট ওয়ার্নিং, রাফি। ইফ ইউ এভার ট্রাই টু টক অ্যাবাউট সূচনা এগেইন, আই’ল কিল ইউ।”
ব্যস, নিজের কথা শেষ করে প্রণয় সূচনার হাত শক্ত করে ধরে টানতে টানতে তাকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে লাগল। সূচনা শেষবারের মতো অশ্রুসিক্ত নয়নে রাফির দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি ফেরাল প্রণয়ের দিকে।
প্রণয়ের এমন রূপ সে এর আগে কখনো দেখেনি। রাগে-ক্রোধে পুরো মানুষটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ভয়ে সূচনা মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। এত অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া এতগুলো ঘটনা ও কিছুতেই হজম করতে পারছে না।
রাফি তাকে পছন্দ করে? রাফির মনে ওর জন্য আলাদা জায়গা আছে? এসবের কিছুই তো সূচনা জানত না। তার ওপর প্রণয়ের এভাবে রাফিকে মারধর করা সবকিছু মিলিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে এলো। রাফির আহত মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সূচনা ফুঁপিয়ে উঠল। শুধু তার জন্যই এত বড় একটা ঝামেলা হয়ে গেল!
এরই মধ্যে প্রণয় সূচনাকে টানতে টানতে গাড়ির কাছে নিয়ে এলো। গাড়ির দরজা খুলে তাকে ভেতরে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল।
প্রণয়ের মুখে কোনো কথা নেই। অথচ তার প্রতিটি ভারী নিঃশ্বাস সূচনার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই প্রণয় গাড়ি চালাতে শুরু করল। কিছুদূর যেতেই সূচনা খেয়াল করল, প্রণয় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দ্রুত গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়ির গতি দেখে আতঙ্কিত হয়ে সূচনা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কী করছেন? গাড়ি আস্তে চালান!”
কিন্তু প্রণয় তার কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না। নির্বিকার মুখে, বেখেয়ালি ভঙ্গিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে সে। একদিকে প্রণয়ের এমন আচরণ, অন্যদিকে রাফির আহত মুখ দুটোই সূচনার নরম হৃদয়টাকে বারবার কাঁদিয়ে তুলছে। অবশেষে তারা মির্জা বাড়িতে পৌঁছে গেল। গাড়ি থামাতেই প্রণয় সূচনাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার হাত শক্ত করে ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে লাগল। প্রণয়ের হাতের মুঠো এতটাই শক্ত ছিল যে সূচনার হাতে অসহ্য ব্যথা হতে লাগল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই আর ব্যথা সহ্য করতে না পেরে সূচনা ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“আমার হাতে ব্যথা করছে। আপনি আমাকে ছাড়ুন।”
কিন্তু প্রণয় তখন যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বসার ঘরে এই মুহূর্তে কেউ নেই। সে সূচনার একটি বাহু ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে এনে কঠিন স্বরে বলল,
“আচ্ছা, তো তুমি ব্যথা পাচ্ছ?”
প্রণয়ের কথায় সূচনার চোখের কোণ বেয়ে আরও এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কান্না চেপে রেখে সে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, আমি ব্যথা পাচ্ছি।”
প্রণয় এবার প্রচণ্ড ক্রোধে হিসহিসিয়ে উঠল,
“আচ্ছা, তো তুমি ব্যথা পাচ্ছ? আর আমার ব্যথা? তোমার আচরণে আমি ব্যথা পাইনি? আমার কষ্ট হয়নি? তোমার তো বাহ্যিক ব্যথা, আর আমার ব্যথা অন্তরের। সেটা তুমি কীভাবে বুঝবে?”
কথাগুলো বলেই প্রণয় আবার সূচনার হাত ধরে টানতে টানতে তাকে ঘরের দিকে নিয়ে গেল। তারপর বেশ জোরে দরজাটা বন্ধ করে দিল। কিন্তু পাশের করিডোরে তখন সুপ্তি ছিল। পুরো ঘটনাটাই তার চোখে পড়েছে। সোহেলের সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই সুপ্তি সেখানেই বসেছিল। নিচ থেকে প্রণয় আর সূচনার উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই কৌতূহলী হয়ে সে বিষয়টা খেয়াল করেছিল। এরপর তাদের এভাবে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখে না চাইলেও প্রণয়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে কান পাতল সুপ্তি।
ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই প্রণয় হঠাৎ সূচনার হাত ছেড়ে দিল। এমন জোরে তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল যে সূচনা একটুর জন্য বিছানার পাশে গিয়ে পড়েই যাচ্ছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে দাঁড়াল সে। প্রণয় তখন রাগে উন্মত্ত। টেবিলের ওপর থাকা জিনিসপত্র এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে দিল মেঝেতে। বিকট শব্দে জিনিসগুলো ছিটকে পড়তেই সূচনা ভয়ে ফাঁকা ঢোক গিলল। প্রণয় ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আবারও প্রচণ্ড চিৎকার করে বলল,
“ও তোমাকে ভালোবাসি বলেছে, তাই না?”
সূচনার মাথা নিচু। নীরবে অশ্রু ঝরছে চোখ থেকে। কোনো উত্তর নেই। প্রণয় এবার দুহাত দিয়ে সূচনার মুখটা আলতো নয়, বরং অস্থিরতায় শক্ত করে ধরে বলল,
“আমি তোমাকে বলেছিলাম না, রাফি তোমাকে পছন্দ করে! তাহলে কেন আমার কথা শুনলে না? কেন ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে?”
কথা শেষ করেই পাশে থাকা চেয়ারটায় সজোরে লাথি মারল প্রণয়। চেয়ারটি শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল। এরপর উন্মাদের মতো নিজের চুলের মুঠি চেপে ধরল সে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, নিঃশ্বাসগুলো ভারী হয়ে উঠেছে।
“উফ! আই জাস্ট হেট দ্যাট ফিলিং! আমার রাগ কিছুতেই কমছে না। ও তোমার হাত ধরেছে, তাই না?”
কথাটা বলেই প্রণয় সূচনাকে নিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল। সূচনার চোখ তখন কান্নায় ভেজা। অসহায় দৃষ্টিতে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“কী করছেন আপনি?”
কিন্তু প্রণয় কোনো উত্তর দিল না। হ্যান্ডওয়াশ নিয়ে সূচনার হাত পরিষ্কার করে দিতে লাগল। সূচনা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। হাত পরিষ্কার করা শেষ হলে প্রণয় আবার ভারী কণ্ঠে বলল,
“তুমি কেন রাফির সঙ্গে দেখা করতে গেলে? আগে আমাকে সেটার উত্তর দাও। আমি তোমাকে ফোন দিয়েছিলাম, তুমি আমার ফোন পর্যন্ত ধরোনি। তখন ওর এমন কী কথা শুনছিলে?”
এবার সূচনার ভেতরেও জমে থাকা অভিমান নিয়ে মাথা তুলল। কিছুটা রাগী কণ্ঠে বলল,
“মানে আপনি কি বলতে চান? তখন আমি কোনো কিছু ভেবেই ছিলাম না।”
প্রণয় তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“আচ্ছা, তাই? কিছু ভাবোনি? তাহলে ও যেগুলো বলছিল, সেগুলো তোমার ভালো লাগছিল?”
কথাটা বলেই প্রণয় আবার সূচনাকে নিজের কাছে টেনে ধরল। সূচনার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,
“আপনি আসলে কী বোঝাতে চাইছেন? ভাইয়ার কথা আমার ভালো লেগেছে মানে? আমি কি জানতাম যে উনি আমাকে এসব কথা বলবেন?”
কথাটা বলেই সূচনা দ্রুত বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। প্রণয়ও সঙ্গে সঙ্গে পেছন পেছন এসে আবার তার বাহু ধরে ফেলল।
“কিন্তু আমি তো তোমাকে জানিয়েছিলাম, রাফি তোমাকে পছন্দ করে। ওর মনে তোমার জন্য ফিলিংস আছে। তুমি ওর সামনে যত যাবে, ওর কষ্ট ততই বাড়বে। তারপরও তুমি কেন ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে?”
এবার সূচনাও রেগে গেল। প্রণয়কে ধাক্কা দিয়ে তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনার মাথায় কি সমস্যা হয়েছে? আমি কি জানতাম ভাইয়া আমাকে এসব কথা বলবে? আর আপনি কী করলেন? আপনি ভাইয়াকে রক্তাক্ত করে এসেছেন! আপনার জন্য একটা মানুষকে এভাবে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে আসতে হয়েছে!”
প্রণয়ের চোখ আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
“ও আচ্ছা! তাহলে তোমার ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে? আমি ওকে রক্তাক্ত করেছি বলে তোমার খারাপ লাগছে? আর ও যে আমার জান নিয়ে নিতে চেয়েছিল, তার বেলায় কিছুই না?”
“আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! উল্টাপাল্টা বকছেন। আপনি ভাইয়াকে যেভাবে মেরেছেন…”
সূচনার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রণয় তার দুগালে হাত রেখে অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমি রাফিকে মেরে ফেলিনি। কিন্তু তোমার এত চিন্তা হচ্ছে কেন ওকে নিয়ে?”
প্রণয় অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে। বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ, অভিমান সব একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সূচনা কিছু বলার আগেই প্রণয় আবার তার দুগালে হাত রেখে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। এবার তার কণ্ঠে রাগের চেয়ে অভিমানই যেন বেশি।
“সূচনা, তোমার রাফিকে নিয়ে এত চিন্তা হচ্ছে কেন? তুমি কি ওর কথা শুনে প্রভাবিত হয়েছ? রাফির মনের কথা জানতে পেরে কি তোমার রিগ্রেট ফিল হচ্ছে? তোমার মনে হচ্ছে, তোমার আমার সঙ্গে বিয়ে হওয়াটা ভুল হয়েছে?”
প্রণয়ের কথা শুনে সূচনা যেন হতভম্ব হয়ে গেল।
এ মানুষটা কী বলছে তাকে? তার চোখে অশ্রু আসছে রাফিকে নিয়ে কারণ এতদিন রাফিকে সে শুধুই নিজের ভাইয়ের নজরে দেখেছে। তার কাছে রাফি ছিল আপনজন, মামাতো ভাই। আজ হঠাৎ জানতে পারল, রাফির মনে তার জন্য অন্যরকম অনুভূতি আছে। তার ওপর প্রণয় যেভাবে রাফিকে মারধর করেছে, সেটাও তার মনকে ভীষণভাবে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু এসবের মাঝখানে প্রণয়ের এমন অদ্ভুত প্রশ্নগুলো সূচনার নিজের মাথাটাকেও এলোমেলো করে দিচ্ছে।
সূচনার নীরবতা দেখে প্রণয় আবারও প্রশ্ন করল,
“রাফির কথা শুনে তুমি রিগ্রেট ফিল করছ?”
প্রণয়ের এই অস্থিরতা, এই পাগলামির মতো আচরণের পেছনে আসলে একটাই কারণ।
সে শুধু একবার সূচনার মুখ থেকে শুনতে চায় সূচনা ওকে ভালোবাসে। তাদের সম্পর্ক অনেকটা পথ এগিয়ে গেলেও সূচনা এখনো মুখ ফুটে প্রণয়কে বলেনি, “আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
প্রণয় জানে, সূচনা তাকে ভালোবাসে। তার আচরণে, তার চোখে, নীরবতায় সে সেই ভালোবাসা প্রতিদিন অনুভব করে। তবুও কোথাও একটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে। প্রণয় চায়, সূচনা একবার নিজের মুখে বলুক তার মনে শুধু প্রণয়ই আছে। সে শুধু প্রণয়কেই ভালোবাসে। আজ প্রণয় সেই কথাটাই শুনতে চাইছে। কিন্তু সূচনা তার মনের কথাটি না বুঝেই কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“প্রণয়, আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ভাইয়া আমাকে খারাপ কিছু বলেনি। উনি শুধু নিজের কিছু কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু আপনি কী করলেন? আপনি ভাইয়াকে এভাবে না মারলেও পারতেন!”
কথাটা শেষ করেই সূচনা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
তার ভয় হচ্ছে রাফিকে প্রণয় মারধর করেছে, এই ঘটনা বাড়ির লোকজন জানতে পারলে নিশ্চয়ই তার মামী বড় কোনো ঝামেলা করবেন। সূচনা কিছুতেই চায় না, তার জন্য প্রণয় কোনো বিপদে পড়ুক। শুধু তাই নয়, ঠান্ডা মাথায় কথা বলেও তো বিষয়টা সমাধান করা যেত। এভাবে মানুষকে রক্তাক্ত করার কী দরকার ছিল?
কিন্তু সূচনার প্রতিটি কথাই যেন প্রণয়ের মাথার ভেতরের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিল। তার মানে, যা কিছু হয়েছে সব দোষ তার? রাফির কোনো দোষ নেই? প্রণয় হঠাৎ বিছানায় থাকা কুশন আর বালিশগুলো একে একে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। তারপর তিক্ত, অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“রাইট! সব দোষ আমার। ওকে মারা ভুল হয়েছে।”
কথাটা বলেই এক মুহূর্তের মধ্যে দরজার দিকে এগিয়ে গেল প্রণয়। প্রচণ্ড রাগে দরজাটা ধাম করে খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সূচনা সঙ্গে সঙ্গে তাকে আটকানোর চেষ্টা করল “প্রণয়! শুনুন…”
কিন্তু প্রণয় পেছন ফিরে তাকালও না। বেপরোয়া গতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। প্রণয় চলে যেতেই পাশের দেয়ালের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সুপ্তি। তার চোখ সরাসরি গিয়ে থামল ঘরের ভেতরে থাকা সূচনার ওপর। মেয়েটা তখন দাঁড়িয়ে চোখ বুজে কাঁদছে। সুপ্তি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এতদিন তো এই দম্পতির মধ্যে কোনো বড় ধরনের ঝামেলা সে দেখেনি। অথচ আজ হঠাৎ এমন তুমুল ঝগড়া!
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ৩০
সম্পূর্ণ ঘটনাটা কী নিয়ে, কেন এত বড় ঝামেলা হলো সেটা সুপ্তি পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। তবে এটুকু সে বুঝেছে, ঝগড়ার মূল কেন্দ্রে রয়েছে সূচনার মামাতো ভাই রাফি।
সুপ্তি কিছুক্ষণ নীরবে সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মনে মনে বলল,
“প্রণয়ের মতো ম্যাচিওর একজন পুরুষের সঙ্গে এই বাচ্চামি স্বভাবের মেয়েটা কখনোই ঠিকমতো সংসার করতে পারবে না। তার ওপর সূচনা যেমন ও কোনোদিনই প্রণয়কে সুখে-শান্তিতে রাখতে পারবে না।”
