Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২২

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২২

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২২
Maha Aarat

‘উমায়ের!আমার কথায় কষ্ট পেয়েছেন?আমি মোটেও আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এগুলো বলিনি।আমি কিছু লুকাতে চাইনি তাই…
হাফসা মাথা নাড়িয়ে চলে যাচ্ছিলো আরহাম তাকে টেনে এনে সামনাসামনি বসিয়ে মুখস্তের মতো বলতে লাগলেন,
‘উমায়ের আপনি আমার প্রথন চয়েস।ওই ছোট্ট আপনি টাকেই আমি আমার লাইফম্যাট হিসেবে চেয়েছিলাম।বলুন কতটুকু ডিপলি, আপনাকে নিয়ে সিরিয়াস হলে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।কিন্তু আমি গায়রে মাহরামের জন্য আমার হৃদয়ে কোনো অনুভূতির জন্ম দিতে চাইনি।কিন্তু আল্লাহর ফায়সালা দেখুন।আপনিই আমার ওয়াইফ হলেন।এটা কি আমার করুণা বা দয়ায়?
আল্লাহর হুকুমে নয়?

আমি তো সেটাই বুঝাতে গিয়ে আপনাকে ভুল বুঝিয়ে ফেলেছি।আপনি এখন আমার জন্য হালাল।আমি আপনাকে পছন্দ করি।এখন প্লিজ ভুল বুঝবেন না।’
হাফসার মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্লিয়ার করতে করতে আরহাম যেনো হাঁপিয়ে উঠলেন।ভালো করে বুঝিয়ে শুনিয়ে তাঁর ভুল ধারনা ভাঙ্গতে সক্ষম হয়েছিলেন অবশেষে।
তিনি যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আম্মু প্রবেশ করলেন।হাফসা অন্যমনষ্ক ছিল।স্কাউচের হাতা ধরে হেলান দিয়ে বেলকনির দিকে দৃষ্টি স্থির করে আছে।আম্মু পাশে দাঁড়াতেই চমকে উঠলো।নিজেকে ধাতস্থ করতে না করতেই আম্মু ওর হাত হাত রাখলেন।কোনোরূপ ভণিতা ছাড়াই শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

‘বিয়েশাদি হলো আল্লাহর হুকুম।যদিও আরহামের সাথে তোমার বিয়েটা হুটহাট হয়েছে তবুও হয়ে গেছে তো।আশা করি তুমি সন্তুষ্ট।দেরি করে হলেও এটা বুঝতে পারবে।এ কয়টা দিনে বুঝেছোও হয়তো।আরহাম তোমার হাজবেন্ড।অন্য আট দশটা ওয়াইফের মতো তুমি ওর সাথে স্বাভাবিক হতে পারছো না এতটুকও মেনে নিলাম।কিন্তু তুমার ভয়টা তো ভাঙ্গতে হবে হাফসা।আমি বুঝতে পারছি, তুমি পরিবারের শূন্যতা অনুভব করতে করতে বড় হয়েছো।তুমার বাবা আর ভাই তোমাকে ঘন প্রাচীরে আড়াল করে রেখেছিলেন।তুমার আপন রক্তও তুমার সাথে শত্রুতামি করার চেষ্টা করেছে।তাই তুমি ভীত হয়ে পড়েছো।কিন্তু এখানে তুমি একদম সেইফ।আমি তো তোমার আম্মুই।আমরা সবাই তো তোমার আপনজন।কিন্তু আরহাম তুমার সবচেয়ে আপন।যত তাড়াতাড়ি ওর সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করবে,তুমি ওর ততোটা আপন হতে পারবে।ওর হৃদয়ে তুমার স্পেস টা আরও স্ট্রংলি জায়গা করে নিবে।তুমি এক পা বাড়াও।ও তো তুমার জন্য প্রস্তুত।’

আম্মুর এত কথার পিঠে হাফসা কেনজানি ভড়কালো না।ভাবলেশহীন হয়ে তাকিয়ে রইলো কেবল।সে নিজেও বুঝতে পারছে এই অদৃশ্য জড়তাটা সম্পর্কে আরও দূরত্ব সৃষ্টি করছে।তাঁর কি লোকটার কাছে যাওয়া উচিত?
ওর বোকা বোকা চাহনী দেখে হেসে উঠলেন আম্মু।যাওয়ার পূর্বে বলে গেলেন, ‘নামাজ থেকে ফিরলে ওর রুমে যেও।’
আম্মু চলে যেতেই ঝটপট অযু সেরে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো হাফসা।দীর্ঘ নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে বার দূয়েক বারান্দায় মুখ বাড়িয়ে দরজার দিকে নজর দিল।এখনি বোধহয় কলিং বেল টা বাজবে।এখনি বোধহয় উনি চলে আসবেন।
আরহাম এসে জুব্বা চেইন্জ করে শার্টের হাতা ফোল্ড করেছিলেন।কোনো সংকেত ছাড়াই আচমকা কি বুঝে পিছু ফিরতেই হাফসাকে কাচুমাচু অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।আরহামের গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে এতক্ষণে সঞ্চয় করে নিয়ে আসা সাহসটুকু গুড়িয়ে গেল।ভয়ার্ত ভঙ্গিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরহাম ডাকলেন, ‘ভেতরে আসুন।’

হাফসা এক পা দূ পা করে এগিয়ে আসলো।মাঝখানের একটু দূরত্ব গুচিয়ে দূ পকেটে হাত গুজে এগিয়ে আসলেন আরহাম।ওর এমন ভয়ে হার্ট এ্যাটাক করার মতো অবস্থা পরখ করে চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আমাকে এত ভয় পান কেন আপনি?’
হাফসা এক পলক তাকিয়ে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিলো।আরহাম দূরত্ব রেখে দাঁড়ালেন এবার।স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু বলবেন?কোনো প্রয়োজনে আসছেন?’
হাফসা মাথা উপর নীচ নাড়িয়ে সম্মতি দিলে তিনি তাকে বসতে দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা বলুন।’
হাফসা বুঝালো, ‘কাল নাকি বাড়িতে যাব?’
‘ইন শা আল্লাহ।’
হাফসা চেষ্টা করছিলো আরও কিছু বলার।কিন্তু তাঁর কি যেনো হলো।কি যেনো হলো সে আর এক মুহুর্ত ও লোকটার সামনে থাকতে পারে নি।

ভাবির সাথে ট্যাবে ওয়ার্ড ম্যাকিং এর গেম খেলছিলো আইরা।আরহাম অনুমতি নিয়ে রুমে আসলে আইরা মনে মনে চাইলো,ভাইয়া যেনো দ্রুত চলে যান।জিতে যাওয়ার অন্তিম মুহুর্তে আছে সে।জিতে যাওয়ার আনন্দ সে মিস করতে চাচ্ছে না।এত সময়ে গুছিয়ে নেওয়া সুযোটা ভেস্তে না যাক!
কিন্তু ভেস্তে দিয়েই আরহাম বললেন, ‘আম্মুর কাছে যাও।আমার একটু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে উনার সাথে।’
মনে মনে ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে ট্যাব নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে যেতেই মাইমুনা আহতসুরে বললেন, কি প্রয়োজন?মনটা খারাপ হয়ে গেলো ওর।’
‘কিছু না।’
‘তাহলে?’
‘মিস করছিলাম আপনাকে।এতক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছি।ও সারারাত গেইম খেলে পার করে দিতে পারবে।আপনার সাথে কথা বলার সুযোগ হবে না।’

‘তাই বলে!এটা আপনার গুরুত্বপূর্ণ কথা?’
আরহাম মাইমুনার কোলে দখল নিতে নিতে বললেন, ‘আমি আপনাকে মিস করছি এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়?’
মাইমুনা আরহামের চুলে বিলি কাটতে কাটতে হেসে উত্তর দিলেন, ‘জ্বি।’
‘দাদূর কমেছে?’
‘এখন কি অসুস্থতা কমার বয়স?সবসময় ভয়ে থাকতে হয়।’
‘আপনাকে একটা কথা বলবো।’
‘বলুন।’
আরহাম কিছুটা ইতস্ততভাবে বলতে লাগলেন, ‘উ উমায়েরকে নিয়ে আলাদা থাকি মাইমুনা?’
‘কেন?’
মাইমুনার ভয়ার্ত গলা শুনে আরহাম তাকে আশ্বাস দিতে হাতের ভাঁজ হাত জড়িয়ে বললেন, ‘জানি না।আমার মনে হচ্ছে শুধু।’

‘না না।কেন?আলাদা থাকার কোনো কারন নেই তো।’
‘মাইমুনা আপনি ভয় পাচ্ছেন?’
মুখে হাত চেপে অথৈ কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে সে।আরহাম বিচলিত হতেই আরহামের বুক জড়িয়ে কেঁদে বলেন, ‘শাহ এমন সিদ্ধান্ত নিবেন না।আমার ভয় শুধু আপনাকে নিয়েই।আপনি কখনো বদলাবেন না।আমি একদম পাগল হয়ে যাবো।”
আরহাম তাকে শক্ত করে বুকের মাঝে আগলে রেখে বললেন, ‘কখনো না হানি।আমি চিন্তাও করতে পারি না এসব।আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এগুলো বলিনি।আমার মনে হচ্ছিলো,উনার সাথে আমি যখন থাকবো কথা বলবো,আপনি সামনে থেকে সেটা দেখে কষ্ট পাবেন শুধুই এতটুক ভেবেছি।অন্য কোনো কারন নেই।বিলিভ মি।’
‘দরকার নেই।আমি সারাদিন অপেক্ষা করি আপনি ফিরার।রাতেও জানবো,আপনি আমার পাশেই আছেন।আমার পাশের রুমেই আছেন।আপনি দূরে থাকলে আমার শান্তি উবে যায়।এজন্য তো বাড়ি গিয়ে আমি থাকতে চাই না।’
‘সরি সরি।আর বলবো না।আপনার চোখের সামনেই থাকবো।’

মান অভিমানের পালা শেষে মিষ্টি ভালোবাসার বিনিময় শেষে মাইমুনা ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘ডিনারের সময় হয়েছে।আমি খেয়ে নিয়েছি।আপনিও খেয়ে ঘুমান,যান।’
‘যাবো না।এখানে থাকবো।’
‘পাগলামি না।ওর ভয় তো আপনিই দূর করা লাগবে।একসময় থাকুন, কথা বলে সহজ হোন।ওর সাথে থাকুন আজকে।’
‘এখানেইইই থাকবো!’
বলতে বলতে আরহাম বেরিয়ে গেলে মুচকি হাসে সে।এই মানুষটার সাথে তাঁর প্রতিটা দিনই যেনো নতুন।বিয়ের তিনবছর পরে এসেও তাঁর মনে হচ্ছে আরহাম তাকে আগের থেকেও বেশি ভালোবাসেন।ভালোবাসায় ভাটা পড়ার সুযোগই দেননি।

রুম থেকেই বেরোচ্ছিলো হাফসা।হিজাবটা গায়ে ভালোমতো জড়াতে জড়াতে দরজা খুলছিল অমনি ঘ্রাণইন্দ্রিয়তে তড়িৎ এক সুঘ্রাণ ছোঁয়া দিয়ে যায়।গোলগোল আঁখিদ্বয় তুলতেই লজ্জায় মিইয়ে যায়।আরহামের থেকে দূ হাত পিছনে সরে এসে দাঁড়ায়।
হাফসার দৃষ্টি নিচু।বুকের ভেতর ছোট্ট সাইজের হৃদপিণ্ড টা দ্রীমদ্রীম শব্দ তুলে কাঁপছে।দরজা আটকানোর শব্দ হয়।
আরহাম বেশ দূরত্ব রেখেই দাঁড়ালেন।হাফসার পক্ষ থেকে কোনো রা নেই।উনিও নীরব।স্থির গভীর দৃষ্টিতে নতমুখী রমণীকে দেখছেন।তৃষ্ণামাখানো এই মুখে লাজুকতার ছড়াছড়ি।আরহাম নি:শব্দে হাসলেন।
আরহাম প্রশ্ন করলেন, ‘কোথাও যাচ্ছিলেন?’
হাফসা ধীরে মাথা নাড়াতেই পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ডিনারে?’
আবারও মাথা নাড়ায় সে।হ্যাঁ বোধক উত্তর পেয়ে বেডের পাশে খাবারের থালা টা রাখলেন।ওয়াশরুমে হাত ধোঁয়ার উদ্দেশ্যে যেতে যেতে বললেন, ‘বসুন গিয়ে।রুমে খাবেন।’

উনি ফিরে এসে খাবার হাতে নিয়ে বসলেন।বিছানার শেষ প্রান্তের কোণায় তাকে বসতে দেখে বললেন, ‘এতো দূরত্ব রেখে বসেছেন কেন?আপনি এগোবেন না আমি?’
তড়িৎ কিছুটা সরে আসলো আরহামের দিকে।খাবার মেখে মুখে ধরতেই হাফসার প্রশ্নাত্বক চোখজোড়া দৃশ্যমান হলো।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি?’
হাফসা ইশারা ইঙ্গিতে বুঝালো, সে মায়ের সাথে নিচে খাবে।
‘নতুন মেহমান বারবার নিচে গিয়ে খাবেন কেন?হাজবেন্ড ওয়াইফ একই পাতে খেলে ভালোবাসা বাড়ে।আপনি যে পরিমাণ ভীতু, একই পাতে খাওয়া খুব প্রয়োজন আমাদের।’

সকালে নাস্তার টেবিলে সবার হাত চলছে।শুধু গোমড়া মুখে বসে আছে আইরা।আরহাম এসবের ধ্যানে নেই।তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছেন।এদিকে লোকটার কাছাকাছি বসে রোজকার মতো একটু কেমন কেমন লাগছিলো তার।অনেকক্ষণ থেকে আইরার ভাবভঙ্গি পরখ করে ভ্রু উঁচিয়ে ‘কি হয়েছে’ বুঝাতেই সে যেনো সুযোগ পেলো।এতক্ষণ ধরেই সে অপেক্ষা করছিলো কেউ তাকে জিজ্ঞেস করুক তার মন খারাপের কারন।
সুযোগ পেয়েই সে বলল, ‘ভাবি’পু আপনি কতদিন থাকবেন?’
হাফসা আড়চোখে আরহামের দিকে তাকাতেই তিনি নিজেই জবাব দিলেন, “যতদিন ইচ্ছে ততদিন।”
হাফসার মন পুলকিত হলো খুশিতে।অথচ আইরা তাঁকে ফাঁসিয়ে বলল, ‘আপনি কাল বাদে পরশু চলে আসবেন প্লিজ।আমি মিস করবো আপনাকে।’

হাফসার শুকনো হয়ে যাওয়া চেহারা চোখ এড়ালো না আরহামের।খাবার শেষে তিনি চুপচাপ উঠে যেতেই হাফসা আইরাকে তাদের সাথে আসতে বললো।আইরা নাকোচ করে বলল, ‘উহু,ভাবিকে যে মিস করবো।আপনারা দূজন না থাকলে আমার কী যেনো খালি খালি লাগে।’
‘বেশ,তোমাকেও বিয়ে দিয়ে দিবো।তাহলে আর খালি খালি লাগবে না।’
আম্মুর কথার জবাব সে ইনডিরেক্টলি দিয়ে বলল, ‘আমার আশেপাশেই আমার বিপক্ষের লোকের অভাব নেই।তাই একা থাকতে আমার এতো ভয়।আপনারা দূজন থাকলে সাহস থাকে।আমার মনে হয়,আমি সেইফ জোনে আছি।নয়তো সবসময় একটা শঙ্কা থাকে নিজেকে নিয়ে।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২১

আইরার কথায় মাইমুনা হাফসস হেসে উঠলো দূজনে।মাইমুনা জবাব দিয়ে বললেন, ‘যাদের বিশ্বাস করছো,তাঁরা কি আদৌ তোমার দলের।না ভেতরে ভেতরে বিপক্ষ দলের গুপ্তচর?’
‘এভাবে হলে তো বিশ্বাসঘাতকতা।লাইন ধরিয়ে ধরিয়ে সবাইকে গুলি মেরে উড়িয়ে দিবো!’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৩