অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৭
Maha Aarat
নিশ্ছিদ্র ভোরের মৃদু বাতাস বইছে,বাতাসে হালকা জ্যোৎস্নার মতো কোমলতা।বাগানের কোণায় সদ্য ফোটা গাঁদা ফুলগুলো মাথা নুইয়ে অভ্যর্থনা জানায় নতুন সকালের।পাখিরা একে একে জাগছে, ডালপালা দুলে তারা যেন নিঃশব্দে দোয়া করছে—এই পৃথিবী যেন চিরকাল এভাবেই প্রশান্তিতে ভরে থাকে।
আরহাম সাদা পান্জাবি পড়ে নামাজ শেষ করে, ছোট্ট সূরা তিলাওয়াত করে এক কাপ কফি হাতে বেরিয়ে এসেছিলেন বাগানে।গত কয়দিন ধরে উনার বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা—ভয় আর আশা একসঙ্গে জড়াজড়ি করে ছিল। কিন্তু আজ সকালটা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দূর থেকে তিনি দেখতে পেলেন আম্মু আব্বু একসঙ্গে হাঁটছেন।নাহ,মুখ ভার করে নয়।নয় কোনো দায়বদ্ধ সামাজিকতার ভান করে।
তারা হাঁটছেন, ধীরে ধীরে—হাতের পাশে হাত।মাঝেমধ্যে চোখে চোখ রাখছেন, এমনকি হেসে ফেলছেন।যেন বহু বছরের বোঝা হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
আরহামের পা থমকে যায়।
তিনি দু’হাত বুকের মাঝখানে এনে জড়ো করেন, চোখ বুজে বলেন—
“আলহামদুলিল্লাহ।”
উনার কণ্ঠে এমন প্রশান্তি, যেন তিনি জ্যোৎস্নায় ভেজা এক নদীর ধার ধরে হাঁটছেন।
“ক্বলবে সুকুন ভরে যাচ্ছে…” তিনি ফিসফিস করে বলেন।
মিসেস আফসানার প্রথমে চোখে পড়ে ছেলেকে,
হাসিমুখে বলেন,
“তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন দূরে?আসো আমাদের সঙ্গে হাঁট। তুমিই তো আমাদের শান্তির কারণ।”
আহনাফ তাজওয়ার একটু এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“আমাদের সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহ তোমাকে বানিয়েছেন।তুমি আজ শুধু সন্তান না, তুমি আমাদের বন্ধন।”
আরহাম একবার মায়ের মুখের দিকে তাকান,তারপর বাবার দিকে।দু’জনের চোখেই স্নিগ্ধতা, প্রশান্তি, কৃতজ্ঞতা।
মিসেস আফসানা গভীরচোখে ছেলের দিকে তাকান।উনার ইচ্ছে করছে,ছেলেকে আদর করে বুকে লুকিয়ে রাখতে।তার জন্যই আজ ভাঙ্গা সম্পর্কের দেয়াল ভেঙেছে।মিসেস আফসানার মনে পড়ছে গতকাল সন্ধ্যার কথা….
ফ্ল্যাশব্যাক_____
সন্ধ্যা নামছে।বারান্দায় দুজন বসে আছেন।কেউ কিছু বলছেন না।পাখির ডাকে ভরে আছে চারপাশ।প্রকৃতি নিজের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর বুকে।
আহনাফ তাজওয়ার বলে উঠলেন,
“যদি সময়টা ফিরিয়ে আনতে পারতাম…”
মিসেস আফসানা ধীরে বলে ওঠেন,
“ফেরানো যায় না। তবে এখন থেকে শুরু করা যায়।”
দুজনেই চুপচাপ থাকেন।আহনাফ তাজওয়ার হাত বাড়ান না, আফসানা ধরেন না।কিন্তু মাঝখানের শূন্যতা এখন আর খালি নেই—ভরে উঠেছে বোঝাপড়া আর একরাশ শান্ত নীরবতায়।
“জানেন?আমার মনে হয় সম্পর্ক অনেক সময় নদীর মতো হয়।কখনো স্থির, কখনো স্রোতপ্রবাহে ভেঙে পড়ে।আর আমরা… হয়তো মাঝপথে দাঁড়িয়ে ছিলাম—না এগোতে পেরেছি, না ফিরতে পেরেছি।”
মিসেস আফসানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
“আপনি তো অন্তত স্রোতের বিরুদ্ধে হেঁটেছিলেন।আমি তো কেবল তীরে দাঁড়িয়ে কাঁদতাম।কাকে দোষ দেবো? নিজেকেই বেশি।”
একটি দীর্ঘ নীরবতা নামে।
দখিনা বাতাসের ঝাপটায় বেলকনির অপর পাশের পাতাগুলো নড়ে উড়ে।দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। আলো ফুরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
মিসেস আফসানা নিচু গলায় বলেন—
“আপনার সামনাসামনি আসতে ভয় লাগে। ভেতরে যেন একটা কাঁটাতার বাঁধা।আমি নিজেও ঘেরাটোপে আটকে ছিলাম।আর আপনিও ডাকেননি।”
আহনাফ এক চুমুকে শেষ করেন পানির বোতল।
“আমি ডাকিনি, কারণ আমি ভেবেছিলাম আপনার অভিমান কখনো শেষ হবে না।আর আপনি ভাবলেন আমি কখনো ফিরবো না।অথচ… দুজনেই ভুল ছিলাম।”
আফসানার কণ্ঠ ভেজা,
“আপনার চোখে এখনো কি আগের মতো দেখেন আমাকে?”
“আপনাকে আমি এখন আর চোখে দেখি না।আপনি আমার অন্তরে আছেন।আপনি কি পারেন ক্ষমা করতে?”
মিসেস আফসানার মুখ ঝুঁকে পড়ে।ঠোঁটে চাপা হাসি।
“ক্ষমা তো করতে শিখেছি অনেক আগেই। শুধু ভয় ছিল আপনি হয়তো আমার ক্ষমাটাকেও অবহেলা করবেন।”
এভাবেই অনেকক্ষণ কাটে নীরবে।শেষ মুহুর্তে কেবল আফসানা বলছিলেন, “একসময় ভেবেছিলাম, আপনার ভালোবাসা আপনাদের সন্তানদের মাঝেই আটকে গেছে। কিন্তু আজ বুঝলাম, সেখানেও জায়গা রেখেছিলেন আমার জন্যও।”
আহনাফ তাজওয়ার উদাস গলায় বলেন,
“আপনার জন্য তো শুধু জায়গা নয়, গোটা জীবনটাই রেখেছিলাম।শুধু বুঝাতে পারিনি।”
তাদের মাঝের ব্যবধান আর থাকে না। আহনাফ হাত বাড়ান।আফসানা একটু থেমে তাতে হাত রাখেন। তাদের বন্ধ থাকা গল্পটা যেন একটু একটু করে খুলে যায়।
বর্তমান_____
তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করেন।
হঠাৎ আম্মু বললেন,
তুমি জানো না, তোমার ছোট ছোট ভালোবাসা কীভাবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে।এক সময় ভাবতাম, সম্পর্ক শুধু অভ্যাস।আজ বুঝি, সম্পর্ক—ভালোবাসা।আর তুমি সেই ভালোবাসার একমাত্র যোগসূত্র।”
আরহাম অপ্রস্তত হয়ে গেলেন।উনার চালাকি কি উনারা ধরে ফেলেছেন যে চিঠিগুলো আব্বু আম্মু একে অপরকে দেননি,তিনিই দিয়েছিলেন।আব্বু হালকা রহস্যময় হেসে বললেন,
“আমি তোমার আম্মুকে এই সকালে বলছিলাম, আমাদের ছেলেটা যেন নিজের জগতের ভিতরেও আমাদের জন্য একটা কোণ রেখে দিয়েছে।এই বয়সে এসে তার কাছ থেকেই আমরা শিখছি—ক্ষমা, সহমর্মিতা, আর শ্রদ্ধার মানে।”
আরহাম নত মাথায় হাঁটেন, কিছু বলেন না।শুধু অনুভব করেন,এই নীরব সকাল, এই শান্তি, এই স্পর্শ… সব উনার বহুদিনের দোয়া কবুল হওয়ার ফল।
তারা তিনজন হাঁটতে হাঁটতে বাগানের এক কোণে এসে বসেন।আম্মু চা আনাতে বললে, আব্বু বললেন , “তুমি বস, আজ আমি বানিয়ে আনি।”
আরহাম হেসে বলেন,
“জাযাকুমুল্লাহু খাইর, কিন্তু এক কাপ চা বানাতে গেলে? আপনারা আবার ঝগড়া করবেন না তো?”
এই কথায় আম্মু আব্বু হেসে ফেলেন—তবে সে হাসি এবার আর ঠাট্টা নয়।তা যেন বহু বছর পরে নতুন করে একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার হাসি।
তারা তিনজন একসঙ্গে বসে, চায়ের কাপ হাতে, পাখির ডাকের মাঝে,আল্লাহর রহমতে মোড়ানো এক শান্তিময় সকাল উপভোগ করেন—যার প্রতিটি মুহূর্ত হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
আরহামের মনে শুধু একটিই কথা বাজে—
এটাই তো ছিল হৃদয়ের চাওয়া—আর কিছুই চাই না।আলহামদুলিল্লাহ, আমার রব আমার দোয়া পূর্ণ করে দিয়েছেন।”
আইরা চা দিতে এসে দেখতে পেলো লোকটা বইয়ে ডুবে রয়েছেন।ব্রাউন কালার শার্টের সাথে কালো ফ্রেমের চশমাটা উনার সৌন্দর্য হাজারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।কাপটা সেন্টার টেবিলে রেখে চুপিচুপি মুখোমুখি বসলো সে।মাহের একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে পুনরায় বইয়ে মনোযোগ দিলেন।আইরা আড়চোখে দেখছিলো তাকে।উনার গোছানো হাতের পশম,কনুইয়ের নিচে ফোল্ড করা স্লিভ,খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি,ফ্রেশ স্কিনটোন,গম্ভীর মুখভঙ্গি, পরিপাটি পোশাক দেখলে যে কেউ হয়তো ধারণা করতে পারবে,ইনি একজন ডাক্তার।আচ্ছা লোকটার সাহসের পারদ নিশ্চয়ই অনেক উঁচুতে।এ জন্যই বোধহয় কাঁটা ছেঁড়া করতে ভয় লাগে না।ভয় শুধু বাসায়।হাত ধরতে ভয়,তাকাতে ভয়,সাইনেস।
মাহের আরেকপলক তাকালেন।তাকে একা একা মিটিমিটি হাসতে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন।আইরা মুখে হাত দিয়ে বলল,
‘কিছু না।’
‘কিছু তো আছে?’
‘কিছু না।’
বলেই সে দৌড়ে ভেতরে চলে গেলো।মাহের আশ্চর্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।একটু পর সে আবার ও আসলো।দরজার ওপাশ থেকে উঁকি মেরে ডাকলো, ‘স্যার!’
মাহের তাকালেন।সে মিনমিনে স্বরে বললো, ‘ইউ আর ক্যারেক্টারলেস!’
মাহের প্রথমে ভ্রু কুঁচকালেন।পরক্ষণে তিনিও মিনমিনে উত্তর দিলেন, ‘ইউ আর বিউটিফুল!’
ইসসস! লজ্জ্বা পেয়ে কেটে পড়লো সে।মাহেরও ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি রেখে আবারো বইপড়ায় মনোযোগী হলেন।
বিকেলের সোনালি আলো ঘরের মধ্যে মায়ার ছায়া ফেলছে। ডাইনিং টেবিল গমগম করছে খাবারের গন্ধে—বাসমতী চালের ভাত, মুরগির ঝোল, আলুভর্তা, ডাল আর মিষ্টি দই। চারপাশে এক প্রাণবন্ত পারিবারিক পরিবেশ।
টেবিলের একপাশে বসলেন আব্বু-আম্মু।অন্যপাশে পাশাপাশি আইরা,মাহের।আর টেবিলের আরেক প্রান্তে মাহেরের ঠিক মুখোমুখি ঠোঁটে সেই অদ্ভুত দুষ্টু হাসি নিয়ে বসে আছেন আরহাম, যাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে, উনি আজ কাউকে ছাড়বেন না!পুরনো প্রতিশোধের ক্ষত এবার সারিয়ে ফেলতেই হবে।
আরহাম হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, “জামাই সাহেব, খাবার দাবার কেমন লাগছে?”
মাহেরের গলায় কাশি উঠে গেল, আম্মু আব্বুর দৃষ্টিও উনার দিকেই ঘুরছে।আরহামের দিকে আড়ালে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখ নিচু করে বললেন,
“ভালোই।”
“বেশ বেশ!”
আরহামের ঘটনায় মাহের মুখ নিচু করে হাসছিলেন।আইরা এক চিমটি হাসি চাপতে গিয়ে চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়।তার গাল হালকা লাল।
আহনাফ তাজওয়ার চমৎকার উদ্বেগ নিয়ে বললেন ,
“তোমাদের দূজনের সম্পর্ক কিন্তু চমৎকার।তোমরা দুজন পরস্পরের সমন্ধি ও ভগ্নিপতি উভয়ই।আমার ঘরের রাজকন্যাকে মাহের নিয়েছো,আর তোমার ঘরের রাজকন্যা আমরা এনেছি।একটা চমৎকার পরিবার হয়ে গেলো!”
আরহাম হালকা হাসিতে তাল মিলিয়ে মাহেরের উদ্দেশ্যে বললেন ,
“জামাই সাহেব,একটু ঝোল ঢেলে দিই?”
লজ্জ্বায় মাহেরের কান গলা অবধি লাল,অথচ আরহাম অদ্ভুত নির্লিপ্তভাবে ভাত মাখাতে ব্যস্ত।এদিকে মাহের নিচুমুখে সামনের গ্লাসটা এমনভাবে দেখছিলেন যেন সেটাই উনার মুক্তির রাস্তা।
আম্মু ঠিকই বুঝতে পারছেন আরহামের ছলচাতুরী।তিনি আরহামকে ধমকে দিয়ে বললেন, “আরহাম, তাকে কেন এতো লজ্জ্বা দিচ্ছো।জামাই হলে সে তো তোমার বন্ধু।তুমি আপাতত বন্ধু সম্পর্কেই সম্বোধন করে।”
আব্বু এতোক্ষণে মিটিমিটি হাসছিলেন।এবার তিনি মুখ খুললেন,
“এই যে তোমার জামাই-বন্ধুকে নিয়ে খোঁচা দিচ্ছো,পরে তো আবার তুমি যাচ্ছো তোমার শ্বশুরবাড়ি! তখন দেখি তুমি কীভাবে নিজেকে সামলাও।আই হোপ,মাহেরও প্রতিশোধ নিতে ছাড়বে না।অতপর মাহেরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন , এম আই রাইট?”
মাহের এমন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন যেনো আব্বু একেবারে চিরন্তনসত্য কথা বলেছেন।
আরহাম এবার পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,,
“থাক।আর বলবো না।জামাই সাহেব, পানিটা খান। আপনি তো এখন শুধু আমার বন্ধুই না—আমার পরিবারেরও শিকড়!”
মাহের এবার অসহিষ্ণু হয়ে বলেই ফেললেন, ‘একটু থামো,আরহাম।”
সবাই হেসে ওঠে।আর এই টেবিল, এই ছোট্ট ডাইনিং,এই দুই বন্ধু-জামাইয়ের দুষ্টু আলাপ আর এক জোড়া চোখাচোখি—সব মিলিয়ে যেন একটা অদ্ভুত তৃপ্তি এনে দেয় সবার মনে।বাইরে তখন আসরের আযান বাজে, আর টেবিলে জমে ওঠা মুহূর্তগুলো হয়ে যায় সোনালি, রোদের মতো কোমল।
একদিন সন্ধ্যায়, আরহাম যখন বাইরে গেছেন, তখন তারা একসাথে কাপড় গোছাচ্ছিলেন।কথার ফাঁকে মাইমুনা বললেন,,
“তুমি কি কোনোদিন ভেবেছিলে আমরা এক ছাদের নিচে একসাথে থাকবো, একে অপরকে বুঝবো?”
হাফসা উত্তর দিলো, “জ্বি না।আমি ভয় পেতাম।মনে হতো আপনিই হয়তো আমাকে কখনো গ্রহণ করবেন না।”
“আমি তো নিজেকেই তখন গ্রহণ করিনি, তোমাকে কীভাবে করতাম!”
মাইমুনা থেমে বলেন—
“আমরা দুজনেই আসলে অভিমান আর মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছি।আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আছি—কারণ কেউ না কেউ চুপচাপ ক্ষমা করে ফেলেছে।”
হাফসা মুচকি হাসে।মাইমুনা গভীরচোখে তাকান।এই মেয়েটার সৌন্দর্যে উনার নিজের নজর না লেগে যায়!
তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে এসেছিলেন,
কিন্তু বন্ধু হয়ে থাকলেন।
এক কষ্টের গল্প থেকে উঠে এলেন দুইজন নারী,
একই ছাদের নিচে
একটা ছায়াময় বন্ধনের নামে—
“আমরা দুইজন, পাশাপাশি।”
সেদিন এশা মায়ের সাথে ব্যাগ একটু বাইরে বেরিয়েছিল।হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এক পরিচিত অবয়বে—
শহরের কোলাহলে মানুষজন গিজগিজ করছিল,কিন্তু তবু তাদের দৃষ্টি এক মুহূর্তে মিলল।তিনি রাস্তার ওপারে কোনো মেয়ের হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছিলেন।উনার অবয়ব ভদ্র, সংযত, কিন্তু শান্ত।
তাকে রাস্তা পার করে দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন।হয়তো কারো অপেক্ষায়।এশা হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়ালো।তিনি প্রথমে তাকালেন না,বোধহয় চিনেন নি।যখন সে হেসে বলল,
“বিয়ে কবে করলেন?”
মাহের একটু থমকে গেলেন, ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করলেন এ ভয়েস টা পরিচিত।তারপর কণ্ঠে অপ্রস্তুত ভঙ্গি নিয়ে বললেন,
“হয়েছে মাস ছয়েক আগে…”
এশার চোখে এক মুহূর্তের কম্পন দেখা গেল, কিন্তু মুখে সে এক প্রশান্ত হাসি রাখল।
“নিজের পছন্দে?”
মাহের এবার একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“আসলে…. মানে না, তেমন কিছু না…”
এশা তখন ধীরে ধীরে কথার ভাঁজে অনুপ্রবেশ করল, তার গলায় না বলা অভিমান ও এক ধরনের জড়তা—
“নার্ভাস হবেন না।আমি জানি বিয়েটা কীভাবে হয়েছে।তবে একটা কথা জানেন?মাঝে মাঝে আফসোস হয়।যদি আমি ওর মতো জেদ করতাম… আপনাকে না ছাড়তাম, তাহলে আপনিও হয়ত আমার সঙ্গে থেকে মানিয়ে নিতেন।ঠিক যেমনটা তার বেলায় মানিয়ে নিয়েছেন।”
মাহের চোখ নামিয়ে নিলেন।উনার ভাবসাবে মনে হচ্ছে না,উনার থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যাবে আর।
“এখন আর আফসোস করি না। কারণ আমি আমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে সুখী আছি।আপনাকে হারিয়েছি বলেই তাকে পেয়েছি।আর এই পাওয়াটা অনেক বড়।আলহামদুলিল্লাহ।”
এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।তারপর মাহের মাথা নিচু করে বললেন,
“আল্লাহ আপনাদের সুখী রাখুন।দেখে যাবেন উনাকে,একদিন।”
ভদ্রতার খাতিরে বলা কথাটা মাহের মোটেও মন থেকে বললেন না।উনি জানেন,বাসায় কোনো মেয়ে ঢুকলে মাহেরকে সে ভাজা ভাজা করে খেয়ে ফেলবে।আর এশা হলে তো?কথাই নেই।তবুও কেন যেনো না চাইতেই বলে ফেললেন।
এশা হাসল।চোখের কোনে একটু জল জমল, কিন্তু তা সে লুকিয়ে ফেলল বাতাসের দোলায়।
ইমান যতটুকু আশাহত হয়ে ফিরছিলেন একটা দূ:সংবাদ আর তার সাথে সম্মিলিত ব্যাপারে কোথাও যেনো ঠিক ততটাই আশা খুঁজে পেলেন।দুদিন আগে আদওয়ার সাথে দেখা অথচ ঠিক আজ সন্ধ্যেয় খবর হলো,আয়বীর আঙ্কেল হার্ট এ্যাটাক করেছেন।অবস্থা গুরুতর।আদওয়ার সাথে দীর্ঘদিন হলো তিনি কথা বলেন না।অথচ আজ উনার চোখে শেষ আকুতি ছিলো, আরহামকে নিয়ে এসব পাগলামি ছেড়ে সে যেনো ইমানকে মেনে নেয়।কাঁদতে কাঁদতে ফোনে এতটুকুই বললেন মিসেস সেমু।উনার শেষ কথা ছিল, বাবার কথা রাখতে হলেও এবার আদওয়া দূর্বল হবে!
ইমানের মনে হলো,এবার সে নিশ্চয়ই মানবে।তবুও দোয়ায় অশ্রু ছেড়ে বললেন,আল্লাহ আগে উনাকে সুস্থ করে দিতে।
রাত গড়িয়ে যাচ্ছে। বারান্দার জানালা খোলা, হালকা বাতাসে পর্দা নড়ে উঠচে।আকাশে তারার মেলা, আর চারপাশে নিঃশব্দ প্রশান্তি।মাহেরকে নিয়ে আরহাম ছাদে আসলেন।হাতে কফির কাপ।লম্বা চুমুক টেনে কোমলকন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন ,
“মাস ছয়েক পেরিয়েছে।এতো বড়ো যে সিদ্ধান্ত নিতে তুমি দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলে,সেটার রেজাল্ট বলো।মানিয়ে নিয়েছো?না এখনো নীরব অভিমান চলছে?”
মাহের এই প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।কেবল নিচু গলায় বলছিলেন ,
“ভালোবাসা সবসময় গলা তুলে আসে না, অনেক সময় সেটা চুপিচুপি পাশে দাঁড়ায়।”
ঘরের বাতি নিভে গেছে অনেকক্ষণ।ঘরের কোণায় একফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে জানালার ফাঁক দিয়ে।বাইরে ঝিরঝির করে বাতাস বইছে, যেন কোনো কিছু না বলেই অনেক কিছু বলে দিচ্ছে।
আরহাম কুরআনের একটি আয়াত পড়ছিলেন ধীরে ধীরে, বিছানার পাশে বসে।উনার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি—যা কেবল আল্লাহর কথা উচ্চারণেই আসে।মাইমুনা পাশেই বসে ছিলেন,একপলকে তাকিয়ে।কখনও আরহামের ঠোঁটের নড়াচড়া দেখছিলেন,কখনও চুপচাপ তাকিয়ে থাকছিলেন উনার মুখের ওপর।
“تمسكوا بكتاب الله…” — আরহামের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল আয়াতের অনুবাদ:
“তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।”
মাইমুনা ধীরে ধীরে বললেন,
“আপনি যখন কুরআন পড়েন, মনে হয় আমি কোনো সুর শুনছি না… বরং জান্নাতের কোনো ডাক শুনছি।”
আরহাম হাসলেন, চোখ তুলে মাইমুনার দিকে তাকালেন।
“আপনি পাশে থাকলে কুরআনের অর্থ যেন আরও গভীর হয়ে যায়,হানি।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর মাইমুনা মাথা নিচু করে বললেন,
“আমি কী সত্যি ভালো স্ত্রী হতে পেরেছি,শাহ?”
প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত ছিল।আরহাম স্থিরভাবে তাকালেন।
অতপর বললেন ,
“আপনি সেই রাহমা (রহমত), যার কথা আল্লাহ বলেছেন — ‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে যুগল সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের পাশে প্রশান্তি পাও।’”
মাইমুনার চোখ ভিজে এলো।উনি মুখ ঘুরিয়ে নিতে চাইলেন,কিন্তু আরহাম হাত বাড়িয়ে তার হাতটা ধরলেন।
“আপনি যখন খাবার টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করেন,আমি সেটা বুঝি।আপনি যখন আমার না বলা ক্লান্তি বুঝে নীরবে পাশে দাঁড়ান, আমি সেটা অনুভব করি।আপনি যখন আমার সামনে রাগ চেপে রেখে মুচকি হাসেন,আমি সেটাও দেখি।আপনি আমার চুপ থাকাটাও বোঝেন— এটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট।”
মাইমুনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।উঠে এলেন আরহামের পাশে, মাথা রেখে দিলেন উনার কাঁধে।
“আমি চাই আল্লাহ যেন আমাদের এমন করেই রাখেন। দুনিয়ার ঝড়-ঝঞ্ঝা আমাদের ছুঁয়ে গেলেও, আমাদের অন্তর যেন এক থাকে।”
আরহাম ধীরে ধীরে তার কপালে চুমু খেলেন।
“আমিন।” উনার কণ্ঠে ছিলো হৃদয়ের দোয়া।
রাত তখন আরও গভীর। তারা একসাথে কিছু আয়াত মুখস্থ করছিলেন। মাঝে মাঝে ভুল হলে মাইমুনা লাজুক হেসে বলছিল,
“আবার ঠিক করে দিন,এবার শুধরে নিবো।”
আরহাম ধৈর্য নিয়ে তাকে সাহায্য করছিলেন, যেন শিক্ষক নয়, ভালোবাসার সহযাত্রী।ঘরের বাতাসে তখন শুধু কুরআনের ধ্বনি, দাম্পত্য ভালোবাসার ঘ্রাণ, আর নিঃশব্দ ইবাদতের প্রশান্তি।
এই মুহূর্তটি চিরন্তন হয়ে থাকলো তাদের স্মৃতিতে — যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু কথা বলা নয়, বরং একে অপরের নীরবতা বোঝা, ইসলামী জীবনের পথে একসাথে হাঁটা।
ডিনার শেষ।রায়ান নিজের কিছু কাজ সেরে নিচ্ছিলেন একটু পরেই ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিতেন কিন্তু দেখলেন এশা বিছানায় অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে।রায়ান পাশে এসে বসে তার কপালে হাত রাখলেন,
“আজ একটু বেশিই হাঁটছো মনে হয়? শরীর খারাপ লাগছে?”
এশা এবার মৃদু গলায় বলল,
“আপনি জানেন আপনি যেভাবে আমার যত্ন নিচ্ছেন, তা আমি কখনো আশা করিনি।”
রায়ান হেসে বললেন,
“তুমি কি তাহলে বলতে চাও, আমি চমৎকার স্বামী?”
“আপনি আমার সবথেকে বড় নিয়ামত”, এশা বলল নিচু গলায়।
এক পলক নীরবতা।
তারপর সে ধীরে ধীরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাদের হয়তো নতুন একজন অতিথি আসতে চলেছে… ইন শা আল্লাহ।”
রায়ান স্তব্ধ হয়ে গেলন।উনার চোখ বিস্ময়ে ভরে উঠল। তারপর উনি নিচু গলায় বললেন,
“সত্যি?”
“হয়তো। নিশ্চিত না। দু’দিনের মধ্যে চেকআপ করব।”
রায়ান ধীরে ধীরে এশার হাত ধরলেন। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল আবেগে—
“আমার দুনিয়া তুমি… আর যদি তুমি নতুন একটা জীবন নিয়ে আসো, তাহলে আমি… আমি জানি না কীভাবে শুকরিয়া আদায় করব আল্লাহর কাছে।”
“আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।”
রায়ানও তার কোলে মাথা রেখে সমস্বরে হৃদয়ের গভীর থেকে বলে উঠলেন , “আলহামদুলিল্লাহ।”
রাত গভীর।
লোডশেডিং হয়েছে।অন্ধকারে ডুবে থাকা এক নিরিবিলি সন্ধ্যা।জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া মৃদু হাওয়ায় পর্দা ধীরে ধীরে দুলছে, যেন প্রকৃতিও নিঃশব্দে ভালোবাসার কোনো গান গাইছে।ঘরের মধ্যে আলতো আলো ছড়াচ্ছে একটি মোমবাতি,যার শিখার নরম ঝিলিক যেন হাফসার মুখে পড়ে তাকে আরও কোমল করে তুলেছে।
আরহাম ঘরে ঢুকলেন নিঃশব্দে।আজ উনার হাতে ছিল এক ছোট্ট সোনালি বাক্স।হাফসার চোখে শুধু আরহামের দিকে তাকিয়ে থাকা এক নিঃশব্দ অভিমান, ভালোবাসা আর অপেক্ষার মিলন।তার কেন জানি মনে হয়,আরহাম বদলে যাচ্ছেন।নাহ,আজ হয়তো উনাকে আগের রূপে ফিরে পাওয়া যাবে।এমন একটা অনিশ্চিত আশা তার বুকের মধ্যে মৃদু আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
আরহাম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে হাফসার পাশে বসলেন।উনার চোখে ছিল গভীর প্রশান্তি, অথচ সেই প্রশান্তির আড়ালে ছিল এক তীব্র অনুভব—ভালোবাসা।নিঃশব্দে তিনি হাফসার দিকে ছোট্ট বাক্সটি বাড়িয়ে দিলেন।
হাফসা বিস্মিত হয়ে তাকাল, “এটা কী?”
আরহাম গলায় এক অদ্ভুত কোমলতা মিশিয়ে বললেন, “আপনি বলেন না,আমার মন পড়ে থাকে কাজকর্মে, আপনার খেয়াল রাখি না… আজকে দেখি, একটু খেয়াল রাখি, কেমন?”
হাফসা চোখ বড় বড় করে তাকাল, তার মনের কথা তিনি কীভাবে বুঝে গেলেন।ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি ফুটে উঠলো তাঁর।উত্তর দিল, “আমি তো এমন কিছু বলিনি!”
আরহাম একপলকে ওর চোখে তাকিয়ে রসিকতা করে বললেন, “আপনি না বললেও,আপনার গাল ফুলিয়ে রাখাই বলে দেয়।”বলে তিনি আলতো করে তার নাকের মাথায় খোঁচা দিয়ে দিলেন।
“আউচ!” হাফসা সত্যি সত্যিই নিজের অজান্তে গাল ফুলালো।
আরহাম হেসে বললেন, “ওই মুখটা আরেকটু ফোলান দেখি… আপনার ফোলা গালেই তো আমি চুমু দিই!”
বলেই তিনি দেরী করলেন না।এগিয়ে গিয়ে হাফসার গালে আদুরে একটি চুমু দিয়েই ফেললেন।
“আপনি খুব….” নাহ,সঠিক শব্দটা সে খুঁজে পেল না।হাফসা মুখ ঘুরিয়ে নিল,কিন্তু গালজোড়া তখনো আগুনের মতো লাল।
আরহাম আলতো হাসলেন।অন্ধকারেও হাফসা লক্ষ্য করলো,উনার দাঁতগুলো যেনো মুক্তোর মতো ঝলঝল করে উঠলো।চোখেমুখে কি মায়া!
আরহাম এবার মোমবাতির নরম আলোয় হাফসার চোখে চোখ রেখে বললেন,
“এই জীবনে অনেক কিছু চেয়েছি, পেয়েছি।কিন্তু যেদিন আপনাকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছি—সেদিন বুঝেছি, আল্লাহ্ আমাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না।আপনি আমার জন্য যেটুকু করেন,তা কোনো উপহারে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।তবুও… এটা আপনার জন্য।”
হাফসা বাক্স খুলতেই চকচকে সোনালি একটি ব্রেসলেট বেরিয়ে এলো।নিখুঁত ডিজাইন, আলতো খোদাই করা আরবিতে লেখা — “لَكِ قَلْبِي” (আপনার জন্যই আমার হৃদয়)।হাফসার চোখ ভিজে উঠল, ঠোঁট কেঁপে উঠল—কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।ঠিক এমন লিখা ব্রেসলেট তো সে মাইমুনার হাতেও দেখেছে।কিছুটা পরে হলেও সে বুঝলো,আরহাম সমতা করায় এক চুলও পিছিয়ে নন।
আরহাম নিজ হাতে ব্রেসলেটটি হাফসার হাতে পরিয়ে দিলেন।তারপর হালকা গলায় বললেন,
“আপনি জানেন উমায়ের, আপনাকে গ্রহন করার সম্মতি আমার মাত্র কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত।আমি খুব গভীরভাবেই বুঝতে পারলাম,আমাদের রব আমাদের হৃদয়ের প্রকাশিত অপ্রকাশিত সব চাওয়া সম্পর্কেই অবগত।কোনো একটা সময় আপনাকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চেয়েছিলাম।কতগুলো বছর পরে,আপনি আমার স্ত্রী-ই।দেখলেন,হিসাবটা কীভাবে মিললো?
যাই হোক, আপনি আমাকে সবসময় দোয়ার মতো আগলে রেখেছেন।আজ আমি চাই, এই ছোট্ট চিহ্নটা আপনার হাতে থাকুক—আমার ভালোবাসার নিঃশব্দ সাক্ষ্য হিসেবে।”
হাফসা তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।সে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি শুধু আমার স্বামী না, আপনি আমার কবর পর্যন্ত প্রিয়তম, আমার জান্নাতের প্রার্থনা।”
“আপনি আমার সবর-আমার হৃদয়ের প্রতীক্ষার উত্তর।আপনি আমার দোয়া—যা আমি অশ্রুতে গেঁথে চেয়েছিলাম প্রভুর কাছে।আপনি আমার নাযরানা—ভালোবাসার সেই পবিত্র উপহার, যা আমি হৃদয়ের গহিনে রেখে চুপিচুপি সযতনে লালন করি।আপনার ছায়াতেই আমার হৃদয়ের বাগান আজো সজীব, ফুলে-ফলে ভরা, রঙে ও সুবাসে মোহিত।”
এইসব কথায় কোনো অলংকার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই—কেবল নরম গলায় বলা সত্যিকারের ভালোবাসা।যে ভালোবাসা রূপকথার না, বাস্তব জীবনের। হাফসার গাল ছুঁয়ে আরহাম বললেন,
“আপনার হাসি, উমায়ের…..সেটাই আমার রোশনী। আল্লাহ আপনাকে আমার জন্য হিফাজত করুন।”
সে রাতে কোনো বিলাসী আয়োজন ছিল না, কোনো দামি রেস্টুরেন্ট বা শহরের আলোকিত সড়ক নয়—ছিল কেবল এক ভালোবাসায় ভরা সন্ধ্যা, এক দাম্পত্যের গভীর বন্ধন, আর এক স্বামীর শ্রদ্ধা ও অনুভব।
“আপনি এতো চমৎকার কথা কীভাবে বলেন?”
আরহাম হাসলেন,কিন্তু এবার সেই হাসিতে ছিল এক গভীর আবেদন।উনি হাফসার হাত নিজের দু’হাতের মাঝে নিয়ে বললেন,
“কারণ আমি শুধু আপনাকে ভালোবাসি না, আমি আপনাকে সম্মান করি।আমি আপনাকে চাই, উমায়ের।আজকের এই নরম রাতটায় আপনাকে চাই।যদি আপনি অনুমতি দেন, আমি আপনাকে একটু বেশি করে নিজের বলতে চাই।একটু বেশি করে.. শুধু হৃদয় দিয়ে নয়, ভালবাসার সেই অধিকার নিয়ে, যা আল্লাহ্ আমাদের বৈধ করেছেন।”
হাফসা মুখ নিচু করে ফেলল।একহাত দিয়ে ওরনার কোণ চেপে ধরল ঠোঁটে।চোয়াল কাঁপছে, চোখ ভরা পানিতে কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক লাজুক হাসি।চুপচাপ, কিন্তু গভীর এক সম্মতির ভাষা।আরহাম এতদিনেও এমন রকম লাজুকতা দেখেননি তার চোখে।কপালে স্পর্শ আঁকার আগেই অনাগত অতিথির খোঁজ নিলেন তিনি। হাত আলতোভাবে রেখে ফিসফিস করে বললেন,
“সালামুন আলাইক,বাবা…শুনতে পারছো আমাকে…”
তারপর একা একা অনেক কথা বললেন, ছোট ছোট স্বর তুলে হাসলেনও মাঝে মাঝে—যেন ছোট্ট প্রাণটার সাথে এক অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব তৈরি করে নিচ্ছেন আগে থেকেই।
হাফসাও হেসে উঠল, মুখে হাত চেপে খিলখিলিয়ে হাসছে—একেবারে বাচ্চাদের মতো।সেই হাসিতে ছিল অপার আনন্দ, একধরনের মাতৃত্বের উচ্ছ্বাস যা ভাষায় প্রকাশ হয় না।
আরহাম স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন।স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের এমন কোমল মুহূর্ত উনার চোখে যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্য।হৃদয়ের গভীর থেকে মনে হলো, এটাই একজন পুরুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—স্ত্রীর শান্ত মুখ আর সন্তানকে ঘিরে নির্মল ভালোবাসা।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন খানিকসময়।অযুও সেরে আসলেন।অতপর হাফসার দুহাত নিজের দুহাতে এনে দোয়া করলেন,
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৬
“ইয়া রাহমান, এই মেয়েটিকে আমার জীবনের জান্নাত বানিয়ে দিন।যে সন্তান আপনি আমাদের দান করেছেন, তাকে ঈমানদার, আল্লাহভীরু ও সৎ বানিয়ে দিন।আমার স্ত্রীকে আপনি সুস্থ রাখুন,সন্তানকে নিরাপদে তাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর তৌফিক দিন।আমাদের এই ছোট্ট পরিবারে ভালোবাসা, বরকত ও রহমতের ছায়া রাখুন সবসময়। আমিন।”
