অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮০
Maha Aarat
বিকেলের ম্লান আলোয় উঠোনের এক কোণে বসে ছিল আইরা।ওড়নাটা মাথায় গুঁজে কান অব্দি জড়ানো, চোখেমুখে একরকম চুপচাপ জেদ ,যেন পুরো দুনিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। ঠোঁটে গলতে থাকা চকোলেট আইসক্রিমের ঠাণ্ডা ঝাঁজ। কাঁচের কাপের নিচ থেকে চামচটা টুং টাং শব্দে আওয়াজ তুলছে।সে এতো মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছিল যেন এই মুহূর্তে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কাজ ওরই।
মনে মনে বলছিলো, ইসস! জীবনে যদি আইসক্রিমের মতো এমন মিষ্টি হতো সবকিছু!”
তার পাশে বসে থাকা খালি বাতাস যেন তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে—এই মেয়েটা সব সময়ই এমন, নিজের মত করে একরোখা।
বারান্দার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আরহাম। একহাত পকেটে, আরেক হাতে জামার হাতা গুটাতে গুটাতে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন ওর দিকে।
হঠাৎ কণ্ঠটা একটু কড়া হলো—
“তুমি আমার বাচ্চাদের সামনে আইসক্রিম খাচ্ছো?দেখতে পেলে তারা না আমার গলায় ঝুলে পড়ে!”
গলার সুরটা নরম ছিল না। ছিল দায়িত্বের কড়া টান, অভিভাবকসুলভ অভিযোগ!
আইরা মুখ তুলে তাকাল, চোখে এক চিলতে জেদ। মুখে কিছু বলল না, শুধু আরও এক চামচ মুখে নিল। যেন বলছে—“হ্যাঁ, খাচ্ছি। কী করবে?”
ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে ছুটে এল ছোট ছোট দুটো পা -উমার আর উমাইজা। তাদের হাতে ছোট ছোট খেলনা।
“আব্বু! দেকো আল্লাহ আমাকে এততা গাড়ি দিয়েতেন, মাশা’আল্লাহ!”
“আর আমি বাব্বি কে (বার্বি)নিকাব পরিয়েতি!”
আরহাম ঝুঁকে এসে দুজনকে কোলে তুলে আদরে ভরিয়ে দিলেন।এতটুকু প্রাণ দুটোর মুখে হাসি ছিল অনাবিল। তাদের চোখে তখন আনন্দের ঝিলিক।
কিন্তু সেই ঝিলিক নিমিষেই জমে গেলো —
উমার হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলল, “ফুপি আইস খায়!”
উমাইজা চোখ গোল করে তাকিয়ে বলল, “ফুপিল হাতে আইস! আইস!”
আইরা ততক্ষণে খেয়াল করে চামচটা লুকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। বাচ্চাদের তীক্ষ্ণ চোখ ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।শিশুর চোখ যেমন সরল, তেমনই ধারালো।
উমার ও উমাইজা একসাথে বলল,
“আব্বু, আইস খাব! খাব!”
আরহাম এক হাতে একজনকে অন্য হাতে আরেকজনকে সামলাচ্ছেন, চেষ্টায় আছেন বোঝানোর।
“ঠান্ডার দিনে আইস খেলে ঠান্ডা লাগে, বাবা,গলা খারাপ হবে।”
কিন্তু উমার তো আর থামার পাত্র নয়, গলা চড়িয়ে বলল,
“ফুপি খাইসেন! আমিও খাব!” বাচ্চারা নাছোড়বান্দা।
“আমিও খাবো!” — উমাইজা বলল।
আরহাম অসহায়ভাবে তাকালেন আইরার দিকে। আইরা ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে আছে উনার দিকেই। যেন কিছু বলতে চাইছে না।
আরহাম একটু অভিযোগ নিয়ে বললেন ,
“তোমার তো একটু বুদ্ধি থাকা দরকার ছিল, আইরা। বাচ্চাদের সামনে এসব খাওয়া যায়?”
আইরা এবারো কিছু বলল না। শুধু কাঁধ উঁচু করে মুখ ঘুরিয়ে নিল, চামচটা শেষবারের মতো চেটে নিলো। তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। যেন বলছে,
“পিচ্চিগুলোর জন্য কি আমিও খেতে পারব না?”
দুজনে এখনো আব্বুর হাত ধরে বায়না করছে।
আইরা মুখ খুলল, “আমি তো ওদের থেকে লুকিয়েই খাচ্ছিলাম।তোমাকে দেখেই না তারা দৌড়ে আসলো!”
“লুকিয়ে ফেলতে।তোমার বুঝার কথা ছিল, তুমি আর ছোট নেই!”
এই কথা শুনে আইরার ঠোঁট ফোলানো মুখটা আরও ফুলে উঠল। সে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা দিল ভেতরের দিকে। মাথা নিচু, চোখে অভিমান।
আর বাচ্চারা?
তারা হাত পা ছুড়ে মাটিতে বসে পড়ল।একদিকে গড়াগড়ি, একদিকে কান্না।
“আইস! আইস! আইস খাব!”
ঠিক সেই সময়ে উঠোনে পা রাখলেন মাহের।কিন্তু তাদের কান্না দেখে চোখে অবাক বিস্ময়।
“কাঁদছে কেন তারা?”
উমার আর উমাইজা ছুটে গিয়ে মামার গলায় ঝুলে পড়লো।”ফুপ্পি আইস খেয়েতেন আমরাও খাব!”
মাহের কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনা আন্দাজ করে নিলেন।ঘরের বড় বাচ্চাকে সামলানো তো উনার নাগালের বাইরে।দেখা যাক,ছোট্ট বাচ্চাদের সামলানো যায় কি না।
কিন্তু গেল না শেষমেশ।মাহের হাঁফ ছেড়ে হাসলেন।
“আচ্ছা আচ্ছা।”⸻
ঘণ্টা খানেক পর…
মাহের ফিরে এলেন হাতে তিনটা ছোট কাপ নিয়ে।বাচ্চাদের চোখ চকচক করে উঠল।
“তবে একটা শর্তে!” মাহের বললেন, “গরম করে খেতে হবে। ঠান্ডা খেলে তোমাদের দুইজনের সাথে আমারও খবর হয়ে যাবে!”
শর্তমতে, বাচ্চাদের আইসক্রিম গরম করে দেওয়া হলো—আধা-গলানো, মজার জেলির মতো। বাচ্চারা খুশিতে হাততালি, মেঝেতে লাফ—একটা উৎসব যেন!
আর সেই মাঝেই মাহের মুখ ঘুরিয়ে দেখলেন আইরাকে, দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে, মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।
“আইরা,”
তিনি ধীরে বললেন, “তুমি কেন এমন করো? একটু ভেবেচিন্তে খেলে কী এমন হতো?”
এইবার আর আইরা চুপ রইল না। ঠাস করে এক পা সামনে বাড়িয়ে বলল—
“আমি খেয়েছি, ওরা তো চায়নি তখন। আমি লুকিয়ে খাই, তাও সমস্যা, সামনে খাই, তাও সমস্যা।সব দোষ আমার?”
মাহের হতভম্ব, একটু রাগীও।
“তোমার কি একটু কমনসেন্স হয় না? বাচ্চাদের সামনে খাওয়ার কী দরকার ছিল?”
আইরা এক মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দিল।চোখে জল ছিল না, কিন্তু গলার নিচে কি যেন দলা পাকিয়ে উঠেছিল।
সেদিন সারাদিনে আর একবারও সে মাহেরের মুখোমুখি হয়নি।
রাতে খাওয়ার পর উমার বলল,
“মামা,আবার আইস খেতে তাই!”
মাহের দুশ্চিন্তামাখা কন্ঠে বললেন ,
“দোয়া কর, তোমার ফুপি যেনো আমার সাথে কথা বলেন।তাহলেই কিনে দিব।”
কাশফুলে ভরা মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ যুবক।সাদা পাঞ্জাবি, গায়ে সাদামাটা চাদর। বাতাসে উড়ছে কাশফুলের সাদা তুলোর মতো কোমলতা।কিন্তু ইমানের বুকের ভেতর কেবলই ভারী হয়ে আসছে — স্মৃতির ভার, নিঃসঙ্গতার ভার, আর এক এমন ভালোবাসার ভার, যার কোনো হক নেই উনার কাছে,নেই কোনো পূর্ণতা!
ছুটিতে শহর থেকে ফিরেই তিনি প্রতি সন্ধ্যায় বিলের ধারে শুকনো কাশবনের মাঠে যান।ফড়িং এর খেলা দেখেন,প্রজাপতি দেখেন,কাশফুলের দিন কাশফুল তুলে রাখেন,একা একা আকাশে তারা গুনেন,একা একাই শাপলা তুলেন কিন্তু কেউ আর উনার পাশে এসে বসে না,পাশাপাশি হাঁটে না।ইমান শহর থেকে ফিরার অপেক্ষা আর করে না কেউ।কেউ মরিয়া হয় না একপলক দর্শনের! ইমান ভাই ইমান ভাই বলে পাগল করো না কেউ! এই ‘কেউ’ টা হারিয়ে গিয়েছে উনার জীবন থেকে।আদওয়া নামের তাঁরা টা হারিয়ে গেছে।ইমানের একলা আকাশে সেই তাঁরাটা আর কোনোদিন জ্বলবে না!
আজ কত বছর পেরিয়ে গেছে? তিন? চার?
সময় গড়ালে কি হবে, স্মৃতিগুলো যেন প্রতিদিন নতুন হয়ে ফিরে আসে।সেই দিন, যেদিন হঠাৎ করে আদওয়ার বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল — হাসপাতালে কান্না আর করুণার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইমান। ভদ্রলোক মিইয়ে যাওয়া স্বরে ফিসফিস করে বলেছিলেন আদওয়াকে,
“হয়তো জীবনের অন্তিম মুহুর্তে আমি আছি, শেষ মুহুর্তে আমাকে আর ব্যথা দিয়ো না।”
ইমান দেখেছিলেন, আদওয়ার চোখে কোনো আলো নেই। হয়তো একটু সম্মান, একটু শ্রদ্ধা, হয়তো কৃতজ্ঞতা — কিন্তু ভালোবাসা ছিল না।ছিল শুধু কোনো এক দায়িত্ববোধের ভার।
তাই ইমান নিজেই অপারগ হয়ে বলেছিলেন,
“যদি কোনোদিনও আমাকে মন থেকে স্বামী মানতে না পারো,তবে আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়াতে আমার জীবনে এসো না।আমি এমনিতেই পুড়ে ছাই।”
তখন আদওয়ার চোখে ছিল নীরবতা।এরপর?এরপর নীরব প্রস্থান!
এরপর অনেক বছর কেটে গেছে।আজও ইমান জানেন — আদওয়া আর কখনো উনাকে ভালোবাসবে না এবং এই সত্যটি তিনি মেনে নিয়েছেন।
আজকের সন্ধ্যায় হঠাৎ শুনলেন, আদওয়া গ্রামে ফিরেছে।
হতবিহ্বল হয়ে বাকবুদ্ধি ছেড়ে ইমান ছুটে গিয়েছিলেন,লুকিয়ে এক পলক দেখার আশায়।কিন্তু মুখোমুখি হয়ে গেলেন।আদওয়া অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো, সে ভাবেনি ইমান হুটহাট নক ছাড়াই ড্রয়িং এ এসে পড়বেন।আদওয়া মুখ ফিরিয়ে নিলো,কেবল ঈমানের চোখে ছিল এক চিলতে অভ্যন্তরীণ দহন, আর মুখে ঝুলিয়ে রাখা এক মিথ্যে হাসি।
উনি জানেন, আদওয়া এখন আর সেই আগের মেয়ে নয়। দ্বীনের পথে ফিরে এসেছে, পরিণত হয়েছে।এখন তারা একে অপরের গায়রে মাহরাম।কথা যতটা কম হয়, ততটাই নিরাপদ।
কিন্তু হৃদয় তো বাঁধা মানে না, মাহরাম-নন মাহরামের বেড়াজালও না। ইমানের হৃদয়ে আজও একটিই নাম প্রতিধ্বনিত হয়— “আদওয়া…”
ইমান দাঁড়িয়ে থাকেন যখন আকাশের রং পূর্ব দিকে মিলিয়ে যায়! কাশফুল তুলে রাখেন একটা করে — যেন সেই কাশগাছ জানে, উনি কাউকে প্রতিদিন স্মরণ করেন।আকাশে তারা গুনেন,যেন সেই তাঁরাও ইমানের পাশের খালি জায়গাটার অস্তিত্ব খুঁজে।ফড়িংয়ের খেলা দেখেন — তাঁরাও বোধহয় ইমানের ফড়িং কে খুঁজে যায়!
গোধূলির অন্তিম প্রহরে,আকাশে লাল হলুদ রংয়ের মিশেলে, বাতাসের ধমকা হাওয়ার রেশ বুকে মেখে কাশফুলের ভেতর দাঁড়িয়ে ইমান চোখ বন্ধ করেন।ফিসফিস করে কেবল বলেন,
“আল্লাহ, আমি জানি সে আমার হক নয়।আমি জানি সে আপনার পথে ফিরে এসেছে, আমি তার হৃদয়ের হাকিকত বুঝি।তবুও, এই ভালোবাসা যদি পবিত্র হয়, আপনি আমার অপেক্ষাকে কবুল করুন।আপনি যদি কোনোদিনও তাকে আমার না করেন,তবুও আমি চাই সে সুখে থাকুক।আমি তো শুধু তার পাশে বসার মানুষ ছিলাম না, তার জন্য দোয়া করার মানুষ ছিলাম।”
কাশের পাতায় বাতাস লাগে।একটা শুকনো পাতা ঈমানের চাদরের কোণায় এসে লাগে। ইমান খুব আড়ালে চোখ মুছে নেন।
কিছু অপেক্ষা খুব তিক্ত,কখনো ফুরোয় না। কিছু ভালোবাসা কখনো বলেনা ‘শেষ’ — শুধু নীরবে অপেক্ষা করে… আজন্ম।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে মাঠের ওপর। কুয়াশার নরম চাদরে ঢেকে আছে গাছপালা, ঘাস, আর পথঘাট। বাতাসে এক ধরনের সতেজ ঠান্ডা ভাব—যেন পুরো প্রকৃতি নিঃশব্দে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। দূরে সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে, তার আলোর সোনালি রেখাগুলো কুয়াশার ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। পাখিরা কিছুটা দেরিতে জাগছে, কুয়াশার মাঝে তাদের কণ্ঠ যেন ভাঙা ভাঙা শোনায়।তবুও পরিবেশ টা কত মনোরম লাগে!
আজ উমারের সুন্নাতে খাৎনা।ঘরে ঘটা করে আয়োজন, তবে সেই পরিচিত আতিথেয়তায় নয়—নামিদামি অতিথিদের জায়গায় আজ নিমন্ত্রিত হয়েছেন কিছু দুস্থ বৃদ্ধ আর একদল নিরীহ এতিম শিশু।আম্মু নিজ হাতে রান্না করেছেন খিচুড়ি আর হালুয়া, বাইরে রান্না হয়েছে গোশত,বিরিয়ানি,কাবাব,পানীয় সহ মজাদার খাবার। ঘরজুড়ে মৃদু গন্ধে যেন এক অপার্থিব উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে।
আরহাম ব্যস্তভঙ্গিতে রুমে ঢুকে দেখলেন ছোট্ট উমারকে হাফসা কোমল হাতে পান্জাবি পড়াচ্ছে। লুঙ্গির ভাঁজ সামলাতে গিয়ে উমার একটু ধৈর্য হারালেও, হাফসার কণ্ঠে এক অদ্ভুত মমতা।তাঁর এতোটুকুন একটা বাচ্চা।সে ইনিয়েবিনিয়ে তাকে বুঝিয়েই চলেছে, “এটা সব ছেলে বাবুদেরই হয়।কেউ কাঁদে না… সবাই সাহসী…”
বলেই আবার নিজের চোখের কোণ মুছলো ভেজা ওরনার কার্ণিশে!একটুখানি থেমে, আবার বলতে লাগলো , “উমারকেও সাহসী হতে হবে…”
উমারকে খোঁজা হচ্ছে।আহনাফ তাজওয়ার তাগাদা দিচ্ছেন।ডাক্তারের সাথেই এতক্ষণ আলাপে ব্যস্ত ছিলেন তিনি।তাকে গুছানো শেষ হলেই হাফসা কপালে, গালে, চিবুকে দীর্ঘ চুমু দিয়ে তাকে আরহামের দিকে এগিয়ে দিলো।
চোখে জলের চিকচিক ভাব লুকিয়ে বললো, “নিয়ে যান।”
আরহাম ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন।উনার অস্বস্তি স্পষ্ট, চোখেমুখে দুশ্চিন্তার গাঢ় ছাপ,সাথে শঙ্কা! উনার হাসফাঁস অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসাদৃষ্টিতে তাকালো হাফসা।আরহাম বললেন , ‘মাহের আসছে।’
ঠিক তখনই মাহের আসলেন।উমারকে শূন্যে কোলে তুলে ফুরফুরে হেসে আরহামের উদ্দেশ্যে বললেন , ‘আসো।’
‘তুমি যাও।আমি আসছি।’
মাহের চলে গেলেও তিনি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন।ঘরের মাঝখানে নিঃসাড়, স্থবির।হাফসা এবার তাড়া দিয়ে বললো, ‘যান না!’
‘যাবো না।’
আরহামের কণ্ঠে শিশুসুলভ এক জেদ।
‘কেন?’
‘ভয় করে।’
‘আপনার কেন ভয় করবে?’
আরহাম তৎক্ষনাৎ চোখতুলে তাকালেন।হাফসা শোধরে নিয়ে বলল, ‘ম্ মানে বলছি উমার ভয় পাবে।আপনাকে যেতে হবে।’
আরহাম এলোমেলো কন্ঠে বললেন, ‘ও নিশ্চয়ই কাঁদবে।চিৎকার করবে আমি সহ্য করতে পারবো না।মাহের তো আছে।’
হাফসা কিছুটা তেজে উঠা কন্ঠে বলল, ‘আপনি আছেন আপনার ভয় নিয়ে।আপনি পাশে না থাকলে উমার আরো ভয় পাবে।এটা বুঝছেন না?যান।’
ঝাড়ি খেয়ে শুকনো মুখে তিনি বেরিয়ে গেলেন।কিন্তু ড্রয়িংরুমে পৌঁছেই থেমে গেলেন।
দরজার ফাঁক গলে ভেসে এলো উমারের প্রথম চিৎকার।
আরহামের থমকে গেলেন।পা জোড়া আর চালানো গেলো না।হাঁটার গতি স্তব্ধ হলো—কেউ দেখলে ভাবত, এই বুঝি নিজেই কান্না করে ফেলবেন!
ড্রয়িংরুমের দোরগোড়ায় আরহাম দাঁড়িয়ে ছিলেন নিঃশব্দে।উমারের চিৎকার শুনে যেন বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিল।পা আর এগোয় না।এক মুহূর্তে মনে হলো, দরজার ওপাশ থেকে হয়তো উমার হাত বাড়িয়ে ডাকছে—
“আব্বু…!”
আহ!
একটা ছোট্ট শব্দে বুকটা যেন কুঁকড়ে গেল।
তখনই পেছন থেকে হঠাৎ কান্নায় গদগদ হওয়া এক কণ্ঠ ভেসে এলো—
“যাচ্ছেন না কেন?”
হাফসা দাঁড়িয়ে, চোখে কান্না,কপালে কপট ভ্রুকুটি।
আরহাম অসহায়ের মতো বললেন,
“আপনি শুনলেন না ও কেমন করে চিৎকার করল! আমার পা কাঁপে বুঝলেন?”
হাফসার হেঁচকির মাত্রা বাড়লো।আম্মু এসে তাকে দূরে সরিয়ে নিলেন।
কিছুক্ষণ পর, উমারকে বিছানার মধ্যে চুপ করে শুয়ে থাকতে দেখা গেল।অনেক কান্নার পর এবার একটু স্বস্তি হয়েছে তাঁর।এখন একটু শান্ত।তাকে ঘিরে বসে আছেন পুরো পরিবার।তার মুখ এখন গম্ভীর, একেবারে ‘পুরুষালি’ ভঙ্গিতে বসে আছে—যেন বিশাল যুদ্ধ জিতে ফিরেছে!
আরহাম ঢুকতেই সে চোখ তুলে তাকাল।দুটি ফোলা চোখে।
তবে সে কিছু বলল না।আরহাম ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসলেন।হাতে চুমু এঁকে একটু থেমে বললেন , “এই তো জিতে গেলে।তুমি ভীতু না,আমার বাবাটা সাহসী!”
উমার মাথা নাড়িয়ে বলল, “হুম… আমি তাহতী(সাহসী)!”
তারপর একটুখানি থেমে,বসে যাওয়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “আব্বু আতেন নাই তেন?”(আসেন নাই কেন)
(কান্না করে ফেলবে এমন গলায়, গলা কাঁপছে, চোখ ছোট ছোট হয়ে গেছে)
এই প্রশ্নে আরহামের সব প্রতিরক্ষা যেন গলে গেল।
তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমি… ওদিকে ছিলাম… কিন্তু শুনছিলাম তোমার আওয়াজ…”
উমার উনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু বলতিলেন—বাবা ভয় পান।”
আরহামের মুখ থমথমে।হাফসার মুখের দিকে আড়চোখে তাকালেন।ছেলের সামনে মানসম্মান না ছাড়লে খুব অপরাধ হতো না নিশ্চিয়ই।উনার বিষয়টাও তো বুঝতে হবে।দেখলেন,মাহের মুখটিপে হেসে চলেছেন।
অগত্যা আরহাম বললেন,
“ঠিক বলছে।আমি সত্যিই ভয় পাই, তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে।”
উমার খানিক ভেবে বলল,
“তাহলে আমি দকন বড় হব, তখন আমি দাব আপনার পাতে দাঁলিয়ে থাততে।”(পাশে দাঁড়িয়ে)
এই ছোট্ট কথায় আরহামের চোখ যেন ঝাপসা হয়ে গেল।
রাতে, হালুয়া খাওয়ার সময় উমার নিচুস্বরে বলেই চলেছে,
“আমি তাহতী(সাহসী) আমি কাঁদি না!”
কেঁদেকেটে দূ পাড়া এক করে তাঁর জবান,সে কাঁদেনি।
কিন্তু মাহের সুযোগ টা নিতে ছাড়লেন না।পাশ থেকে বললেন , “আর উনার বাবা? উনি তো কাঁদেনই না, উনি কেবল সটকে পড়েন!”
ঘরে হাসির রোল উঠল।
আরহাম মাথা নিচু করে খিচুড়ির চামচে দানা গুনছেন—
তবে ঠোঁটের কোণে লুকোনো একটুখানি লাজুক হাসি, সেটা কেউই মিস করল না।
“আমার অতুখ নেই আমি হাঁতবো(হাঁটব) আব্বু,আমাকে নামাও!”
হাফসা থমকে গেলো।আর আরহাম হেসে উঠলেন এমনভাবে যে গলার রগ দপদপ করতে লাগলো।
আরহাম তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে বললেন,“তুমি কী জানো তোমার অসুখ আছে না নেই?”
“আমি হাঁতবো!”-উমারের একরোখা জেদ।
“না বাবা।হাঁটতে গেলেই ডাক্তার আঙ্কেল এসে আবার…বুঝতে পারছো?কয়েকদিন গেলেই তুমি হাঁটবে,বাবার সাথে মসজিদে যাবে,খেলবে সব করতে পারবে।”
উমার বলল,
“উহু আমি হাঁতবো।দাত্তার আন্তেল কাতলে কাতুক তাও হাঁতবো!
এই কথা শুনে এবার হাফসার হাত থেকে প্লেট পড়ে যাবার জোগাড়।
আরহাম হাঁটুতে হাত ঠুকতে ঠুকতে হাসছেন—
“ব্যস! সাহসীর এই দশা! আবার খাৎনা করতে চায়! বাবার থেকেও সাহসী আমার ব্যাটা!”
উমার কিন্তু খুব সিরিয়াস।
“আপনার তো ভয় কততেচিল কাল।আজকে আমি দাব, আপনি দাবেন আমার তাথে(সাথে)।ভয় পেলে আমি হাত ধলবো।”
আরহামের মুখ থেমে গেল।
হাফসা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“এই হলো সাহস! আপনি শিখুন!”
দুপুরে যখন অতিথি-এতিমরা বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন কাকামণি মাথায় হাত বুলিয়ে উমারকে বললেন,
“তুমি তো বড় সাহসী ছেলে, ব্যাটা! দিব্বি পটরপটর করে যাচ্ছো।আমি তোদের মতো সাহস পাইনি রে!”
উমার ছোটস্বরে জবাব দেয়,
“আমার আব্বুও এততু ভয় পান।আমি বড় হয়ে ওনাকে দেখাতোনা কলবো।”
সবার মুখ হেসে উঠলো।
আর আরহাম ঠোঁট কামড়ে হেসে এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।হাফসা পাশ থেকে বললো,
“এখনও ভয় লাগছে?”
আরহাম ফিসফিস করে বললেন,
“হ্যাঁ। আমার ছেলে আমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে… ভয় তো লাগবেই!”
নিজ কক্ষে বসে আছেন মাহের।শেষ পেশেন্টের কেসটা শেষ করে এখন অপারেশন রুমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন রোগীর হিস্ট্রিও একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ হার্ট সার্জারির সময় নির্ধারিত।বেশ কিছুদিন হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকার কারণে ডেস্কের কাগজপত্রে যেন হিমঝড় বয়ে গেছে—অগোছালো, এলোমেলো সব।
অমি দীর্ঘদিন লম্বা ছুটিতে ছিল, আজ অথবা কালকের মধ্যেই জয়েন করার কথা। কিন্তু এখনো এসে না পৌঁছানোয় মাহেরকেই একা সামলাতে হচ্ছে সব কিছু। পেশেন্টের অপারেশনের টাইমিং আর ইমার্জেন্সি রোগীর শিডিউল মিলিয়ে গত ক’দিনে কয়েকবার গণ্ডগোলও হয়েছে। ফলে মাহবুব সাহেব ইমেইলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন—অস্থায়ীভাবে একজন অভিজ্ঞ নার্স নিয়োগ করা হোক। মাহের বিনা বাক্যে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও ভেতরে ভেতরে বুঝছেন, চাপটা আর একা সামলানো যাচ্ছে না।
বাড়ির দিকেও ঝামেলা কিছু কম নয়। ছোট্ট উমাইজা পড়ে গিয়ে দাঁত ভেঙে ফেলেছে।আরহাম আসতে পারেননি ব্যস্ততায়, তাই আইরা তাকে নিয়ে এসেছে। ডাক্তারের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে শুনে উমাইজাকে নিয়ে ওয়েটিং এরিয়ায় হেঁটে বেড়াচ্ছিল।এক ফাঁকে কেবিনেও উঁকি মারলো।ক্লান্ত হয়ে সীটে চুপচাপ বসে রইলো উমাইজাকে কোলে নিয়ে।ছোট্ট মেয়েটি কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে নিঃশব্দে।
ঠিক তখনই দরজায় একপ্রকার ধড়ফড় করে কড়া নাড়ল কেউ। মাহের না তাকিয়েই বললেন, “কাম ইন।”
পর মুহূর্তেই ছটফটে এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আসসালামু আলাইকুম, স্যার! কেমন আছেন? বহুদিন পর দেখা! আপনার জন্য মনটা একদম ছটফট করছিলো স্যার! আপনি ভালো আছেন দেখে এবার মনে শান্তি আসলো।”
মাহের চশমার ফ্রেমের উপর দিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। চেনা চেহারা। সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
“তোমার মা কেমন আছেন এখন?”
“আলহামদুলিল্লাহ! মোটামুটি আগের চেয়ে ভালো। উনার কাগজপত্র নিয়ে দৌড়ঝাঁপ সামলাতে গিয়েই একদিন দেরি হয়ে গেল স্যার। কিন্তু এবার পাক্কা হাজির। আপনার ছায়া ছেড়ে আর কোথাও যাব না!”
“দেখতে পাচ্ছি,” মাহের সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, “রেস্ট নাও।”
অমি যেভাবে পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ায়, সেটা জানলে কেউ বলতেই পারে—শুধু ডিউটি নয়, স্যারের ‘স্নেহচক্র’তে ঢোকারও মহা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাহের যদিও পাত্তা দেন না।
আইরা ঘুমে ঢুলছে।উমাইজা ইতোমধ্যে কোলেই ঘুমে সটান।মাহের কাগজপত্র গুছাতে ব্যস্ত,এক সময় কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা অমির দৃষ্টি পড়লো আইরার দিকে।সে সালাম দিতে ভুলে গিয়ে আচমকা উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“স্যার? এগুলো মানা যায়?স্যার বুঝলাম আপনি বিয়ে খেতে গিয়ে বিয়ে করে এনেছিলেন তাই বিয়ের দাওয়াত পাইনি, তাই বলে আপনার মেয়ের আকিকার দাওয়াতও দিবেন না?এইটাও সহ্য করতে হবে?”
মাহের চশমা নামিয়ে শান্ত গলায় তাকে দেখলেন।
এই ব্যারেলটা এতদিন ছিল না, এখন এসে ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছে। বললে হাজার প্রশ্ন, না বললেও বাড়াবাড়ি। তাই সংক্ষেপে বললেন,
“তুমি অপেক্ষা করো। পরে বলছি।”
কিন্তু অমি থেমে থাকার ছেলে না। আবেগে টলমল গলায় বলেই ফেলল,
“স্যার আমি..অমি আবেগাপ্লুত হয়ে ভাঙ্গা স্বর তুলল, স্যার আমি জানি, আপনি আমাকে যা তা বুঝ দিলেও আমি বুঝ পেয়ে যাবো।কিন্তু চিরকালেও আমার এই দূ:খ ঘুচবে না যে এত করে হলেও স্যারের দাওয়াতের মানুষ হতে পারলাম না!”
মাহের এক দম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনোযোগ যতবারই জড়ো করেন, ছেলেটা এসে সেটা ঠাস করে ছিঁড়ে দেয়। তার উপর আরহামের ফোনও এসে ঢুকলো এই সময়ে। বুঝাই যাচ্ছে—মেয়ের জন্য নিশ্চয়ই পেরেশান তিনি।কাকে ছেড়ে কাকে বুঝাবেন মাহের!
“তুমি চুপ করবে,কাইন্ডলি?”
অমি চুপ হয়ে গেলো।মাহের আরহামের ফোন তুলে বললেন , “তোমার মেয়ে ঠিকঠাক,শঙ্কামুক্ত,বিপদমুক্ত,নিরাপদ কক্ষে এসির নিচে আরামসে ঘুমাচ্ছে।আমি যতটুকু দেখছি, তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।”
“পাশে থেকো মাহের।আমার শুধু শুধু টেনশন হচ্ছে।”
“ঠিক আছে।”
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৯
কল কেটে ফের অমির দিকে ফিরে তাকালেন। সে এখন মুখে আঙুল চেপে শিশুর মতো দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটু পরেই আবার কাঁদতে বসবে।
মাহের আর কিছু না বলে ফাইল গুছাতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
