Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ শেষ পর্ব

অপেক্ষা সিজন ২ শেষ পর্ব

অপেক্ষা সিজন ২ শেষ পর্ব
Maha Aarat

ছোট্ট গায়ে পান্জাবি জড়িয়ে,মাথায় টুপি আর জায়নামাজ কাঁধে বাবা, মামা, নানা, দাদার সাথে দুজনে মসজিদে চললো।উমাইজাকে নেওয়া হবে না বলে সে কেঁদেকেটে অস্থির।শেষ সময় নানাজান বললেন , ‘তাকে আসতে দাও!”
উমাইজা তাঁর ছোট্ট গলার সুরে আরহামকে জিজ্ঞেস করলো, “আব্বু, মসতিদে কি আল্লাহ থাকেন?”
আরহাম মুচকি হেসে বললেন, “আল্লাহ সবখানে আছেন মামনি, কিন্তু মসজিদে গিয়ে আমরা উনাকে বেশি করে স্মরণ করি।”

উমার মাথা নাড়িয়ে বলল, “আব্বু, আমি বড় হয়ে আপনার মতো এমন বড় হুজুল হবো!”
আরহাম হাসেন! এই ছোট্ট কথাগুলোই বাবা আর সন্তানদের মধ্যে একটা গভীর ইমানি বন্ধন গড়ে তোলে।
মসজিদের এক কোণে আরহাম আর আহমাদ মুসতাকিম,অপর সারিতে মাহের, আহনাফ তাজওয়ার।সারা মসজিদে ছুটোছুটি করছে বাচ্চা দুজনে।উমাইজা বারবার টুপি খুলে ফেলছে, আবার পড়িয়ে দিচ্ছে।উমার সিজদার জায়গায় গিয়ে বসে পড়েছে, তারপর উনারা সিজদাতে গেলেই পিঠের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে পড়ছে সামনে।
আরহাম নামাজে মগ্ন। কিন্তু উনার চেহারায় এক চিলতে হাসি।এমন দৃশ্য, এমন সময়—সন্তানদের নিয়ে আল্লাহর ঘরে বসে থাকা—এ যেন উনার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
এ জীবনে কত চাওয়া-পাওয়া থাকে, কিন্তু সন্তানের গায়ে চুমু দিতে পারা, তাদের চুলে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে পারা, একসাথে মসজিদে যাওয়া—এটাই তো সব চাইতে বড় নেয়ামত।

দূপুরের খাবারের পর ঘরের ভেতর ধীরকন্ঠে তিলাওয়াত করছিলেন আরহাম।উনার কণ্ঠে তখন কুরআনের সূরা আর-রহমানের সুরেলা তিলাওয়াত। ধীরে ধীরে উচ্চারণ— প্রতিটি আয়াতে ছিল ধ্যান, হৃদয় নিংড়ানো তাসবীহ।
ঘরের ভেতর থেকে আসছিল ছোট বাচ্চাদের হাসির শব্দ। উমার, উমাইজা মায়ের কাছ থেকে নতুন করে শেখা দোয়াগুলো অনুশীলন করছে —
“রব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি ছাগিরা…”
হাফসা পাশে বসে শুধরে দিচ্ছে — কোমল কণ্ঠে, যেমনটা একজন মায়ের হওয়া উচিত।
আরহাম তিলাওয়াত শেষ করে মোনাজাতে হাত তোলেন। নিচু গলায় ফিসফিস করে বলেন,
“হে আল্লাহ, আপনি আমাদের হৃদয় একত্রিত করেছেন আপনার ভালোবাসার জন্য, সুতরাং আমাদেরকে আপনার সন্তুষ্টির ওপর থাকার তৌফিক দিন। হে পরম করুণাময়, আমাদের ঘরে দিন ঈমানের আলো, করুন আমাদের সন্তানদের সৎ, বিনয়ী, নামাজি ও আল্লাহভীরু।হে রব, আমাদের হৃদয়কে করুন ধৈর্যশীল ও কুরআনের আলোয় পূর্ণ।আমার স্ত্রী’রা,সন্তানেরা,প্রিয়জনেরা সবাই যেন জান্নাতের পথের সহযাত্রী হতে পারি তৌফিক দিন।আল্লাহ, আপনি আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন,আমাদের এই ছোট পরিবারকে জান্নাতে একত্র করুন,আপনার রহমতের ছায়া যেন কখনো না সরে যায় আমাদের উপর থেকে।আমিন, ইয়া রাহমান, ইয়া রহিম।”

পাশে এসে বসে হাফসা, উমার উমাইজা ও।তাদের হাতও দোয়ায় শামিল।
মোনাজাত শেষ হতে হাফসা এক বাটি মালপুয়া নিয়ে আসলো।আরহাম খাওয়া শুরুর আগে শব্দ করেই বিসমিল্লাহ পড়লেন।ছোট দুই কণ্ঠনালি পেরিয়েও এলো একই ধ্বনি।আরহাম তাদের আদর করে বললেন , “মাশাআল্লাহ, আপনারা তো বীর মুসলিম হচ্ছেন!”
আসরের ওয়াক্ত এলে সবাই মিলে আসরের সালাত জামাতে আদায় করে।আরহাম হোন ইমাম।উমারকে আরহামের একটু পিছনে দাঁড় করালেও সে বরাবরের মতো বাবার পাশেই জায়নামাজ টেনে নিচ্ছে।হাফসা ও উমাইজা চুপচাপ পেছনে দাঁড়ায়, একেবারে বাধ্যের মতো।
অতপর হাফসা সূরা আল-মুলক পড়ে, আর আরহাম ছেলে-মেয়েদের কুরআনের ছোট ছোট আয়াত মুখস্থ শেখান।উমাইজা প্রশ্ন করে,
“আব্বু, জান্নাত কেমন হবে?”
আরহাম হেসে বলেন,
“জান্নাতে শুধু ভালোবাসা, শান্তি, আর আল্লাহর রহমত থাকবে।আপনারা যদি এখন থেকেই নামাজ পড়েন, ভালো ব্যবহার করেন, আল্লাহর সব কথা শুনেন, তাহলে একদিন আমরা সবাই একসাথে জান্নাতে দেখা করবো ইনশাআল্লাহ।”

সময়টা কাটে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে। দাম্পত্য ভালোবাসা, শিশুর নির্মলতা আর ঈমানদীপ্ত জীবনের ছায়ায় ভরা এক ঘর — যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে “আলহামদুলিল্লাহ” উচ্চারিত হয়।
একসময় বাবার কোলে বসে উমার প্রশ্ন করে,
“আব্বু আপনি কাকে বেশীই ভালোবাতেন?আমাকে বোনকে না মাম্মামকে?”
আরহাম হাফসার চোখে কোমল দৃষ্টি রেখে বললেন , “আপনাদের মাম্মামকে, আপনাদেরকেও।সবাইকেই বেশী ভালোবাসি।”
“মাম্মামকে বেশী?”
“আপনারা দুজন আসার আগে তো আপনাদের মাম্মামকেই বেশী ভালোবাসতাম।এখন আপনারা আসায় মাম্মামের ভালোবাসা ভাগ হয়ে গিয়েছে।”
হাফসা গাল ফুলাল।অথচ বাচ্চা দুজন মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেটে পড়ছে।মাম্মামের ফ্যকাশে চেহারা দেখে তারা মজা পাচ্ছে বোধহয়।আরহাম নিজেও তাদের সাথে হাসলেন।পরে একসময় বললেন , “আমাদের এই ভালোবাসা থেকেই আপনারা দুজন এসেছেন,এই ভালোবাসা অতুলনীয়, তুলনা চলে না।তবে আপনাদের… আপনাদের মাম্মাম আব্বুর জান,বুঝলে এবার?”

তারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো কেবল।হয়তো সবটা বুঝলো না।কিন্তু তাদের চোখে তখন এক ধরনের নিশ্চিন্ত আনন্দ।
আর হাফসা? সে এবার আর ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকতে পারল না। চোখ নামিয়ে নরম গলায় বলল,
“আপনার এমন বাক্যে… অভিমানের দেয়াল গলে যায় নিজে থেকেই।”
আরহাম মৃদু হেসে বললেন,
“আপনার ক্ষমা… আমার হৃদয়ের মৃত নদীতে স্রোত এনে দেয়।”
আরহাম একহাতে হাফসাকে জড়িয়ে ধরলেন,অন্যহাতে বাচ্চাদের।যেনো এক জান্নাতী সুখ!

“আইরা, আমার খুব একা একা লাগছে। এর আগে কখনো এমন লাগেনি। আমি কী করব?”
মাহেরের কণ্ঠে যেন এক অচেনা ভার। শক্ত মনের মানুষটা হঠাৎ এতটা অসহায় শুনালে কার না বুক কেঁপে ওঠে?
আইরার চোখ কেঁপে উঠল।
সবসময় যিনি নিজেকে গাম্ভীর্যের আবরণে মুড়ে রাখেন, তিনিই আজ এমন কোমল, ভাঙা গলায় কথাগুলো বলছেন!
চোখেমুখে ক্লান্তি, শিরায় শিরায় অবসাদ—মাহের তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে, যেন কোনো আশা বা জবাব না পেয়ে আরও হারিয়ে যাচ্ছেন এক শূন্যতার মধ্যে।
আইরার হঠাৎ ইচ্ছে হলো—কিছু একটা করে ফেলুক! এমন কিছু, যা মুহূর্তের জন্য হলেও এই বিষন্নতা ভুলিয়ে দিতে পারে উনাকে।
কিন্তু নিজের অস্থিরতাই তাকে বাধা দিল।সে বেকুবের মতো প্রশ্ন করে বসলো,
“আপনার কেমন লাগছে স্যার? আপনি খুব ঘামছেন।”
মাহের কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু চোখে একরাশ প্রশ্ন, আর অব্যক্ত অভিমান নিয়ে তাকিয়ে রইলেন।
আইরার বুকটা ধক করে উঠল।
তাঁর প্রিয় মানুষটা এত বিমর্ষ, এত গোমড়া—দেখে তার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
আইরা দূপুরে করা নিজের মিথ্যের জন্য ইস্তেগফার পাঠ করলো ভীষণ।পরে নতমুখ হয়ে বলল, “স্যার, আমি আপনাকে একটা মিথ্যা বলেছিলাম।”

মাহের প্রশ্ন করলেন না তবে স্বভাবত উনার ভ্রু কুঁচকে এলো!
“আসলে আমার কোনো প্রাক্তন-টাক্তন নেই, আপনিই আমার প্রথম পছন্দ।আর কখনো কোনো পুরুষের দিকে গুনাহের দৃষ্টি নিয়ে তাকাইনি আমি।”
আইরার কন্ঠে অস্বস্তি ,চোখেমুখে অনুতাপ! মাহের কিছুমুহুর্ত চুপ থেকে অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন , “তুমি মিথ্যে বলেছিলে?”
“আস্তাগফিরুল্লাহ।আর কখনো বলবো না, আফওয়ান।”
মাহেরের চেহারার কোনো ভাববেগ হলো না।একটু আগের বিধ্বস্ত ,ক্লান্ত, আর যাতনায় ডুবে থাকা উনি দিব্যি হেঁটে বারান্দার দিকে গেলেন।দাদার কাছ থেকে ছুটে এলো উমার।তাকে চট করে কোলে তুলেই গালে চুমু আঁকলেন, অতপর তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে যেতেই আইরা থমকালো।
একটু আগের ক্লান্ত উনি এখন কীভাবে এত স্বাভাবিক।আইরা গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “আপনার কি ঠিক লাগছে এখন?”
“লাগছে।”
আইরাকে তিনি খুব একটা পাত্তা দিচ্ছেন না।আইরার মন ভেঙে এলো।সে খানিক ইতস্ততা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “উমম আপনি কি রাগ করেছেন আমি মিথ্যা বলায়?”
“আর কোনোদিন বলবে না।মিথ্যা যেমন পাপ,তেমনি দূষিত।”
আইরা মাথা নিচু করে বলল,
“না বলবো না আর ইনশাআল্লাহ।”

রাতে, নামাজের পর এশা চুপচাপ রায়ানের পাশে এসে বসে। জানালার বাইরে আজ অদ্ভুত এক প্রশান্তি—রাতের আকাশ ঘন আঁধারে ডুবছে ধীরে ধীরে, যেন আকাশও আজ ক্লান্ত।
এশা নিচু গলায় বলে,
“আপনি কি মনে করেন, আমাদের ঘরে কখনো আলো আসবে?”
রায়ান তাকিয়ে থাকেন উনার স্ত্রীর দিকে। চোখে জ্বালা, কিন্তু কণ্ঠে প্রশান্তি,
“যদি আল্লাহ চান… অবশ্যই। তিনিই তো কুন ফায়াকুন।”
এশা মুখ নিচু করে ফেলে, কিন্তু তার চেহারায় হালকা একটা আশা খেলে যায়।
সেদিন রাতেই তারা দু’জনে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়ায়। সে সেজদাগুলো হয় কান্নায় ভেজা। রায়ান কাঁপা কণ্ঠে সেজদায় বলেন

“ইয়া আল্লাহ, যদি আমাদের আরেকটা সন্তান দান করো, তবে যেন সে হয় রাব্বানিয়, যেন তার অন্তর হয় ঈমানের আলোয় পূর্ণ। আমরা তো জানি, তুমি যা চাও, তাই ঘটে।”
এশা সূরা শুরার আয়াতটা মনে করে বলে,
“لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاءُ الذُّكُورَ”
অর্থ: “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।”
— (সূরা আশ-শুরা, আয়াত ৪৯)
এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ যেন এশার হৃদয়ে সান্ত্বনা হয়ে বেজে ওঠে।
এরপর থেকে প্রতিটি দোয়ার মাঝে, প্রতিটি সেজদার ভেতর তারা একটাই কথা বলে:
“ইয়া রব্ব, তুমি চাইলে তো শূন্য কোলকেও পূর্ণ করে দাও।”
তাদের আশা এখন হতাশার ছায়া নয়, বরং আলোর রেখা—যেখানে সন্তানের চেহারা নয়, বরং আল্লাহর সিদ্ধান্তেই তাদের আস্থা।এমন তাওয়াক্কুল ভরা হৃদয় নিয়ে ভালোবাসার আমৃত্যু মহল সাজুক তাদের হৃদয়ের গালিচায়!

বাইরের ঝুমবৃষ্টি ঘরের টিনের চালে ছন্দ বেঁধেছে।
জলবিন্দুরা একনাগাড়ে নাচছে জানালার কাঁচে, যেন কারা কাঁদছে চাপা কণ্ঠে।চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু টিনে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ আর মাঝেমধ্যে বিদ্যুত ঝলকানির মিটিমিটি আলোয় ঘরটাকে হঠাৎ ঝলকে ওঠা।
ঠিক এমন এক ভেজা সন্ধ্যায় দরজার ফাঁক গলে ঢুকলেন মাহের।চোখেমুখে ক্লান্তি, কাঁধ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে বুক পর্যন্ত ভিজিয়ে দিয়েছে।সাদা শার্টটা গা-লাগা, চুল থেকে ফোঁটাফোঁটা করে পানি ঝরছে।
আইরা উঠে দাঁড়াল তড়িঘড়ি,
“আল্লাহ! আপনি তো একেবারে ভিজে গেছেন!”
তারপর ছুটে গিয়ে নীল-সাদা স্ট্রাইপ টাওয়ালটা এগিয়ে দিলো হাতে।
মাহের কিছু না বলে সেটা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেন।
বাইরে এখনো ঝমঝম বৃষ্টি।
আইরা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
বৃষ্টির শব্দে একধরনের কাব্যময়তা আছে—মনটা আনমনা করে দেয়।
সে আনমনেই বিড়বিড়ালো,
ও চিন্টু সোনা, হোক যা হবার হোক,
তোর জন্যে আমি রেডি, তুলে রাখছি শোক।
প্ল্যান কর দোর্দণ্ড, একসাথে ছুটি কাটাই,
জামাইবেটাকে দিয়ে দেবো–ভেজ প্যাকেট–বাই!

ও চিন্টু সোনা,
আমি বিয়ে করেছি বলে তুমি রাগ করো না।
তুই ছিলি পাশে, ছিলি আমার চাঁদ,
আজ তুই দূরে, আমি একা এক ছাঁদ।
তোর নাক ধরা ছিল আমার অভ্যাস,
এখন তোর নামেই কাটে একশো শ্বাস।
তুই বলতি, “আইরা, তুই শুধু আমার,”
এখন রাতজেগে শুনি লেকচার আর লেকচার!
তোর ওই হাঁটা, তোর চোখের ভাষা,
সব ছেড়ে আইরার এখন সংসারে বাসা।
আর এখন দেখি, ইনবক্সে ধুপ,
তুই নাই চিন্টু, মুডটাই একদম চুপ।
ও চিন্টু সোনা, যদি থাকতাম তোর,
ভুলে যেতাম এই ভেজাল রান্নার ঘোর।
তোর ভালোবাসায় ছিল ছন্দের খেলা,
এখন শুধু শুনি—“বইখাতা কেন তোলা?”
আইরা গুনগুন করে গাইতে লাগল নিজের পুরনো সেই কবিতা—কণ্ঠে মৃদু হাসি, চোখে পুরনো স্মৃতির রঙ!

“ঝড় বৃষ্টির এই রাতে,
চিন্টু,আমি খুঁজে বেড়াই তোকে—”
মাহের ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে পড়লেন।উনার কপাল ভ্রুকুটি করা, চোখে স্পষ্ট এক ধরনের রাগ বা বিরক্তি।দাঁড়িয়ে আছেন চুপচাপ, কিন্তু দৃষ্টি এতটাই গম্ভীর যে, তাতে যে কেউ থেমে যেতে বাধ্য।
আইরা হকচকিয়ে গেল।
জিভে কামড় দিয়ে থেমে গেল লাইনটা মাঝপথেই।
মুহূর্তে মনে পড়ল—এই কবিতা তো তার প্রাক্তন “চিন্টু”কে নিয়ে লেখা! এজন্যই কি মহাশয় রেগে বোম!
সে গলা খাঁকারি দিলো।দ্রুত টপটপ করে এগিয়ে এসে মাহেরের ভেজা চুলে তোয়ালে বুলিয়ে দিতে লাগল।ব্যাপারটা ভুলিয়ে দিতে গিয়ে বলল,
“উমম… এই তো, আপনি বসুন…চুলটা শুকিয়ে দিই।”
তার চোখে ছটফটানি, মুখে সরল ব্যস্ততা।যেন চুল মুছিয়ে দিতে পারলেই তার সব গ্লানি ধুয়ে যাবে।
মাহের কিছু বললেন না।চুপচাপ বসে রইলেন।
চোখদুটো জানালার বাইরে নিবদ্ধ, যেখানে এখনো বৃষ্টি কাঁদছে টিনের ওপর।আইরার হাত থেমে গিয়েও চলে।
“আপনার মতো বর থাকলে চিন্টু না থাকলেও চলে…”
নিজের মনে এমন একটুকরো কথা বলে ফেলল, যেটা মাহের ঠিক স্পষ্ট শুনে ফেললেন।
মাহের একটু কড়াচোখে তাকালেন,

আইরা তখনই জিভ কামড়ে থেমে গেল, কিন্তু মুখ সামলাতে পারলো না।
”…কি বললে?” — উনার গলায় নেমে এলো কৌতূহলী সুর!
আইরা চোখ গোল গোল করে বলল,
“মানে… মানে চিন্টু তো কবিতার ক্যারেক্টার! আমি তো… আমি তো…”
মাহের একটু সিরিয়াস মুখ করে বলল,
“তাহলে আমি তোমার উপন্যাসের বর, তাই তো?”
আইরা মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে, প্রায় না শোনার মতো স্বরে বলল,
“না… আপনি তো আমার জীবনের শেষ অধ্যায়। একদম শেষ পৃষ্ঠা—যেটা আর উল্টানো যায় না।”
মাহের ওর দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ—চোখে অবাক হওয়া, মুখে ধরা-চাপা হাসি।
তারপর হঠাৎ হেসে বললেন,
“মানে আমি শেষ পৃষ্ঠা? তাহলে তো আমাকে পড়ে রেখে দেবে বুকমার্ক দিয়ে?”
আইরা মুখে হাত চাপা দিল, যেন হাসি বেরিয়ে না পড়ে। গাল ভিজে উঠল লজ্জায়।
বাইরে তখনো বৃষ্টির শব্দ।
আর ঘরের ভেতর একধরনের নীরব, কোমল মুহুর্ত জেগে উঠছিল—
যেখানে হাসি, চোখাচোখি আর একটা অনুচ্চারিত ভালোবাসা—সব মিলেমিশে একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু করছিল।

ঘরের ভেতর মৃদু হলুদ আলো, জানালার গ্লাসে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টুপটাপ শব্দ তুলে পড়ছে।বাইরে একটানা ঝমঝম বৃষ্টি, যেন আকাশ নিজেই কাঁদছে—তবে বিষণ্ণতায় নয়, ভালোবাসায়।
সন্ধ্যার আগের সময়টুকু কেটেছে মাইমুনার সাথে।অতপর আরহাম একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরলেন।শার্ট পাল্টে গায়ে পান্জাবি গলিয়ে হাফসার কাছে চিরুণী নিয়ে এসে বললেন ,
“নিন, চুলে চিরুনী চালান।এই চমৎকার সুন্নাত থেকে আমি নিজেও বঞ্চিত হতে চাই না,আপনাকেও করতে চাই না!”
আরহাম তাকান না, শুধু চোখ বন্ধ করেন।হাফসা এগিয়ে আসে, নরম হাতে চিরুনি চালায়।প্রথম ছোঁয়াতেই তার বুকের ভেতরে এক অজানা কাঁপুনি জেগে উঠে।আরহামের চুলে তখন শুধু চিরুনির শব্দ নয়, ছিল দাম্পত্যের নীরব ছায়াপথ।একেকটা আঁচড় যেন বছরখানেক জমে থাকা অভিমান মুছে দিচ্ছে।
হাফসা চুপচাপ।
আরহাম হঠাৎ হালকা গলায় বলে ওঠেন,

“একটা নাশীদ শুনবেন? হঠাৎ মনে আসলো?”
হাফসা চমকে তাকায়।চিরুনি থেমে যায়।সে খুব উচ্চাসিত কন্ঠে বলল,
“শুনতে চাই খুব… আপনার কণ্ঠে শুনাবেন?”
আরহাম ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে চোখ বন্ধ করেন।
উনার কণ্ঠে ভেসে আসে এক উর্দু নাত, খুব ধীরে…
নিঃশব্দ ভালোবাসার সুরে!
Tum meri raahat-e-jaan ho, mere sukoon ki raat ho,
Tum duaa ki qubooliyat ho, Rab ki bheji sougaat ho.
Tere labon ki muskurahat, mere dil ka qaraar hai,
Tu jo ho saath, to har lamha ek pyara paighaam hai.
(অর্থগুলো দিচ্ছি

আপনি আমার প্রাণের প্রশান্তি, আমার শান্তির রাত,
আপনি দোয়ার কবুল হওয়া, আল্লাহর পাঠানো উপহার।
আপনার ঠোঁটের হাসি, আমার হৃদয়ের শান্তি,
আপনি যদি পাশে থাকেন,তবে প্রতিটি মুহূর্তই এক মধুর বার্তা)
হাফসা থেমে যায়। তার হৃদয় থেমে যায় কিছুক্ষণের জন্য।
এই কণ্ঠ, এই শব্দ, এই নিবেদন…
সে যেন আর কিছু শুনছে না, বৃষ্টির ঝমঝমও কানে আসছে না।
আরহাম নাশীদ শেষ করে চলে যাবার আগে কেমন রহস্যময় হেসে বলে গেলেন,
“এই কথা আমি আজও বিশ্বাস করি… আপনি আমার দোয়ার উত্তর।”

নিচতলার বসার ঘরে আজ যেন এক অন্য রকম আবহ।
পাটি বিছানো, চারপাশে মোটা মোটা বালিশ রাখা, শিশুরা দৌড়ে বেড়াচ্ছে মাঝে মাঝে—কেউ বাবার কোলে চড়ে এসেছে, কেউ খেলার ছলে পাশের পিঁড়িতে বসে পড়েছে।
বাইরে এখনও থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে।কিন্তু ঘরের ভেতর এক উষ্ণ আলোয় যেন চারদিক ধোয়া-ধোয়া শান্তি।
মূল আকর্ষণ আজ আরহামের তালিম।
ঘরের সামনের দিকে বসেছেন তিনি, পাশেই আহনাফ তাজওয়ার, আহমাদ মুসতাকিম।মেয়েরা পর্দা টানানো, অন্দরমহলে।
আরহাম শুরু করেন ধীরে শান্ত কণ্ঠে, সালাম দিয়ে তালিমের বিষয় অবগত করেন,
‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – একজন স্বামী ও পিতা হিসেবে কেমন?’
আমরা শুনেছি অনেকবার, নবীজির (সা.) নেতৃত্ব, যুদ্ধক্ষেত্রের সাহস, দাওয়াতের পদ্ধতি—
কিন্তু আজ আমরা শুনবো সেই মানুষটির কথা, যিনি ছিলেন ঘরের ভেতরে একজন কোমলতম হৃদয়ের মানুষ।”
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
দূরে কোথাও একটা হালকা কাশি, বৃষ্টির ছাঁট জানালায়। কিন্তু কারো চোখ আর অন্যদিকে নেই।
আরহাম বলেন,

“আয়েশা (রাঃ) বলতেন—নবীজি (সা.) ঘরে ঢুকলে তিনিই ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে নম্র ও সহনশীল সদস্য। তিনি নিজের জামা সেলাই করতেন, নিজের স্যান্ডেল ঠিক করতেন, আর যখন স্ত্রী ক্লান্ত হতেন, নিজেই রুটি বেলতেন।”
“আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, ইসলাম শুধু মসজিদে নয়।
ইসলাম আমাদের খাবার টেবিলে, আমাদের বাচ্চার কান্নার ভেতর, আমাদের স্ত্রীর অভিমানে, আমাদের রাত জাগা দিনগুলোর ভেতর।
আর নবীজি (সা.) ছিলেন সেই শিক্ষা আমাদের জন্য রেখে যাওয়া এক জীবন্ত নিদর্শন।”
আরহাম একটু থেমে বলেন,
“তিনি বলেননি স্ত্রীর দায়িত্ব রান্নাঘরে আটকে আছে।
তিনি নিজে ঘরে পানি আনতেন, বিছানা গুছাতেন, বাচ্চাদের সময় দিতেন।আর স্ত্রীর মন খারাপ থাকলে—জিজ্ঞেস করতেন, কথা বলতেন, মন রক্ষা করতেন।”
হাফসার চোখ নামানো, ঠোঁটে কাঁপন। মনে হয় যেন নিজের জীবনের আয়নার ভেতর দেখছে নবীজির প্রেমময় ছায়া।
আরহামের কন্ঠ আবার শোনা যায় ,
“তিনি সন্তানদের ভালোবাসতেন হৃদয়ের গভীর থেকে।
নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.) যখন নামাজের সময় পিঠে উঠে যেতেন, নবীজি তখন সেজদা দীর্ঘ করতেন—
তারা নেমে আসা পর্যন্ত ওঠতেন না।একজন স্বামী, একজন পিতা—এরচেয়ে সুন্দর রূপ কি আর আমরা কল্পনা করতে পারি?”

ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে অনেকের চোখে পানি।
আহমাদ মুসতাকিম অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলে উঠেন,
“এই কথা আমাদের দরকার ছিল। ঘরে শান্তি আনতে হলে শুধু ওয়াজ না, এমন ভালোবাসা দরকার…”
আরহাম এবার তাকালেন সবার দিকে।
উনার কণ্ঠ নরম, অথচ দৃঢ়—
“আমরা চাই নবীজি (সা.) কে ভালোবাসতে। তবে সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, উনার আদর্শ মেনে চলা।
চলুন আমরা ঘরে ফিরে গিয়ে আজ রাতেই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি—‘আপনি কেমন আছেন?’বাচ্চার মাথায় হাত বুলিয়ে বলি—‘তুমি আমার জান।’
তবেই ঘরে আলোকিত হবে নবীজির প্রেমে।”

তালিমের শেষে সবাই চুপচাপ।বৃষ্টির শব্দ যেন আরও নরম হয়ে এসেছে।নীরবতা শেষে এবার হঠাৎ আহনাফ তাজওয়ার বলে উঠেন, “এবার একটা প্রাণবন্ত, হৃদয় শীতল করা নাত শোনাও দেখি।”
সবার কণ্ঠে সাড়া!
আরহাম, প্লিজ!
আরহাম হালকা হাসলেন, খানিক ইতস্ততা করেও চোখ নামিয়ে এক মুহূর্ত নীরব থেকে শুরু করলেন,
মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লি ওয়ালা,
তুমি বাদশাহ’র বাদশাহ কামলিওয়ালা!….
নাত শেষ হতেই…
ঘরের শিশুরা থেমে গেছে, বড়রাও নিঃশব্দে শুনছে।
হাফসা বিভোর, চোখ বুজে কান পেতে আছে। মাইমুনার ঠোঁট হেঁটে যাচ্ছে সুরের সাথে।আলো নিভে নিভে উঠছে মোমবাতি! বৃষ্টি তখনও একই ছন্দে ঝরছে।
সবাই স্তব্ধ, অপলক।উনার কণ্ঠে যেনো শুধু সুর না, ছিল এক আহ্বান।এক এক করে সবার চোখে যেনো ঘোর নামে।
নবীজীর (সা.) ভালোবাসায় ডুবে যায় চারপাশ।
আর এই সুরেলা মুহূর্তে…
হাফসা টের পায়—আরহাম তাকিয়ে আছেন।চুপচাপ।তীব্র এক কোমলতা নিয়ে।উনার মুখে হাসি নেই, কিন্তু চোখে এক অন্যরকম প্রশান্তি, ভালোবাসা—যেটা শব্দে ধরা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে লাগে গরম চায়ের মতো।ঘরজুড়ে নেমে আসে অন্য এক পরিবেশ।হাফসার ঠোঁটে থেমে যায় নিঃশ্বাস, বুকের ভেতর যেনো কিছু একটা কেঁপে ওঠে।
মনের গভীরে যেনো দোলা দিয়ে যায় সেই গভীর দৃষ্টি।তাঁর কানে তখনো বাজতে থাকে, সেই উর্দু নাত!

হাফসা বিনা দ্বিধায় তাকিয়ে রইলো।আরহামের পলকহীন দৃষ্টিতে এবার আর মুখ ফিরিয়ে নিলো না।আজ মন ভরে দেখল তার প্রিয়তমকে।শুভ্র গালের ওপর ঘনকালো খোঁচা দাঁড়ি।একেবারে শিল্পীর অনুরূপ নিঁখুত ভাসা চোখ,যেন আল্লাহ উনার চেহারায় একটুও ত্রুটি রাখেননি।গোঁফের শেইপটা বড্ড টানে,গোঁফের দুই পার্শ্বের রেখা দুদিক বেয়ে দাঁড়িতে এক হয়েছে,কি যে চমৎকার লাগে দেখতে।দাঁড়িগুলো আরো ঘন হয়েছে,চেহারা আরেকটু হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে।কালো চাদরে শুভ্র মুখখানা যেনো খুব বেশীই আকর্ষিত করছে।
হাফসার ধ্যানভাঙ্গে আরহামের কথায়,
“এমনভাবে কি দেখছেন উমায়ের?চুমু টুমু দিবেন না কি?”
-কি অস্বাভাবিক কথা খুব সহজেই বলে ফেললেন তিনি।হাফসা লালিমামিশ্রিত ফোলা গাল নিচু করলো।আরহাম যেনো আরও আকৃষ্ট হলেন।বোকাসোকা চোখে বললেন , “আমি কি দেখতে খারাপ হয়ে গিয়েছি?বয়স তো কম হচ্ছে না!”
“আপনার তো বয়স কমছে! বলতে বলতে সে গলেই যাচ্ছিলো।আরহাম মুগ্ধচোখে তাকান।কী যে মায়া লাগছে উমায়েরকে।উনার ইচ্ছে করছে তাঁর সারা চোখেমুখে হাজারটা চুমু এঁকে দিতে।তবে এই মুহুর্তে এমন দূর্ঘটনা ঘটালে উমায়ের আর এখনকার মতো সহজ হতে পারবেন না বলেই আরহাম নিজের এমন বেপরোয়া ইচ্ছের লাগাম টানলেন।
হাফসার কথা শেষ হয়নি তখন।এবার সম্পূর্ণ করে বলল , কিন্তু আমার বয়স কত্তো বাড়ছে।আমাকে একদমই বুড়ি লাগে দেখতে।”
কথা শেষ হতে না হতেই মুখটা বিষাদে ঢেকে নিলো।প্রিয় দৃশ্য বদলে যেতেই আরহাম খানিক অসন্তুষ্ট হলেন।বললেন , “কোথায় কত্তো বাড়ছে?আপনার তো মাত্র বাইশ! বাইশ বছর কোনো বয়স হলো?”

“হলো না?আমি এমনি এমনি বড় হয়েছি?”
“বড় হয়েছেন?”
“হইনি?”-হাফসার চোখে প্রশ্ন!
আরহাম হেসে জবাব দিলেন, “দেখি কত বড় হয়েছেন?”
হাফসা হাতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালালো।দেখিয়ে বলল , “দেখুন হাত দেখুন চামড়াগুলো কেমন বসে যাচ্ছে।চুল পড়ছে ঘনঘন।ঘনঘন সব ভুলে যাচ্ছি।আগের মতো।কাজ করতে পারছি না….
“আহা! তাই? এত তাড়াতাড়ি বুড়ী হলে চলবে,উমায়ের? সামনে আরও কত দায়িত্ব আছে আমাদের।”
হাফসার ভ্রু কুঞ্চিত হলো।কি এমন বড় দায়িত্ব নিয়ে আরহাম এতো পেরেশান!
তাঁর চোখেমুখে প্রশ্ন বুঝে আরহাম নির্দ্বিধায় বলতে লাগলেন, “উমার উমাইজা কি একাই থাকবে?তাদের আরও খেলার সঙ্গী দরকার না?এই যেমন ধরুন,
আর কোনো ধরাধরি নেই।হাফসা লজ্জ্বায় এবার আর টিকতে পারবে না উনার সামনে।চুপচাপ চলে আসতে নিলেই আরহাম খপ করে হাত ধরে ফেলেন,গম্ভীর গলায়
বললেন,

“যাচ্ছেন কোথায় আমার কথা তো শেষ হয়নি।”
হাফসা অজুহাত এঁটে বলল, “বাচ্চাদের কাছে যাব।”
আরহাম মাথা নাড়লেন।নাহ,এখন বাচ্চাদের কাছে যাওয়া যাবে না।বললেন , “বাচ্চারা সারাদিন তাদের মাকে কাছে পায়,বাবা পাবেনা কেন?এটা তো সমঝোতা নয়।তাদের তো বুঝতে হবে,তাদের থেকে তাদের মাকে, বাবার বেশী প্রয়োজন।”
হাফসা মুচকি হাসলো।বলল, ‘তাই?বেশী প্রয়োজন?এখন থেকে সকালে উঠে আমি ব্রাশ করিয়ে দিব?ডায়পার চেন্জ করল দিব?গোসল করিয়ে দিব,খাইয়ে দিব,দূপুরে ঘুম পাড়াব।’
আরহামও হাসলেন।কিছুটা খোঁচা মেরে বললেন, ‘আমার এসব কিছুই চাই না,বরং যেটা চাই,সেটাই পাচ্ছি না।’
‘কি চান?’
‘আপনাকে চাই।’
‘আমি তো আছিই।’
‘কোথায় আছেন?আপনাকে তো পাওয়া যায় না!”

“এই তো এখন আছি ”
“যেটা বলছিলাম, এবার দায়িত্ব বুঝেছেন?”
বলে হাসলেন আরহাম।হাফসা লজ্জ্বায় পড়ে গেলো।চুপিচুপি আবার কেটে পরার পায়তারা করতেই আরহাম তার হাত ধরে বসলেন।বাধ্য হয়ে আবারও সামনে ঘুরতে হলো তাকে।
“আমাকে মাতোয়ারা করেছেন।এখন এখান থেকে চলে গেলেও পরিণাম ভয়াবহ হবে,থেকে গেলে তো আরো হবেই।সো,ছটফট না করে চুপ থাকুন।মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনুন,উমায়ের।”
হাফসা আর নড়লো না।আরহাম হঠাৎ কেমন জানি সিরিয়াস হয়ে বললেন, ‘আমি একটা জিনিস খেয়াল করলাম, হোমাপাখি।’
হাফসার ভ্রু উঁচুতে উঠলো।আরহাম অভিজ্ঞসুরে বললেন, ‘উমাইজা যখন ঘুমান উমার একা একা থাকেন।আবার উমার ঘুমালে উমাইজা একা থাকেন।এখন তাদের জন্য আরেকটা ভাই বোন থাকতো,তাহলে অপরজনের ঘুমানোর সময় তাঁরা অন্যজনের সাথে সময় কাটাতে পারতো,খেলতে পারতো রাইট?’
আরহামের চতুরতা ঠিক বুঝে নিলো হাফসা।এবার লজ্জ্বায় নুয়ে না পড়ে কানে কানে ফিসফাস করলো, ‘উমাইজা উমারের যখন আরেকজন ভাই বোন হবেন,তখন তাদের আব্বু তাদের আম্মুর টিকির নাগালও পাবেন না!
আরহাম আর প্রত্যুত্তর করলেন না।শুধু নি:শব্দে হাসলেন!

রাত গভীর।তালিম শেষ হওয়ার অনেকক্ষণ হলো।শীতল আবহাওয়ায় ঘর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে।বাচ্চারা ঘুমে ঢলে পড়েছে, নারীরা সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেছেন।আহনাফ তাজওয়ার বসে আছেন বারান্দার এক কোণে—চায়ের কাপ হাতে।
বাইরে এখনও বৃষ্টি চলছে—টুপটাপ শব্দ, যেন অতীত স্মৃতিগুলোকেও ধুয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।পাশ থেকে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে আসেন আফসানা।
চুপচাপ পাশে এসে বসেন, তারপর কাপটা তুলে দেন স্বামীর হাতে।আহনাফ তাকিয়ে একটা হালকা হাসি দেন—উনার সেই অভ্যাসবশত,কোমল হাসি।
“আপনি চুপ করে গেলেন যে!” – বলে ওঠেন তিনি।
“আপনি নাশিদ শুনছিলেন তাই!” আফসানা হেসে বলেন, “ভালোই লাগছিল।”
তার কণ্ঠে এত বছর সংসারের পরিণত মমতা, কোনো নাটকীয়তা নেই—শুধু প্রশান্তি।
আফসানা একটু চুপ করে বলেন,
“আরহাম আজ যে কথাগুলো বলল,নবীজির (সা.) সংসার জীবন, স্ত্রীর সম্মান… জানেন আমার খুব ভালো লেগেছে।সে যখন বলছিল, নবীজি (সা.) এর চোখে স্ত্রী ছিল দুনিয়ার সেরা সম্পদ’—মনে হচ্ছিল… আমিও যদি তেমন একজন স্ত্রীর মতো হতে পারতাম!”
আহনাফ ধীরে কাপটা নামান, স্ত্রীর দিকে তাকান।
“আপনি সেটা হয়েছেন,আফসানা। বহু আগেই। আমি তো জানিই—আপনি না থাকলে আজ আমি এমন হতেই পারতাম না।”

আফসানার চোখ ভিজে ওঠে, কিন্তু তিনি হাসেন।
“আপনি মাঝে মাঝে খুব… বেশিই ভালো বলেন”, তিনি বলেন।
“আর আপনি মাঝে মাঝে খুব কম বুঝেন, ” আহনাফ চোখ নামিয়ে হাসেন।
এক মুহূর্ত—দুজনেই চুপচাপ।
তারপর একসাথে চুমুক দেন চায়ে।
হালকা বাষ্প উড়ে যায়… সঙ্গে পুরোনো ভালোবাসাও যেন আবার নতুন হয়ে ওঠে!

নিশ্চিন্ত নির্জনতা, গা ছমছমে নিস্তব্ধতা, দূরে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ক্রমাগত আওয়াজ, ঝুমঝুম বৃষ্টির রাতের ঘ্রাণে ভরে আছে চারপাশ। গ্রামের কোনো এক পুরোনো বাড়ির বারান্দায় একচিলতে উষ্ণ আলো জ্বলছে। সেখানে ঘিরে আছে কয়েকজোড়া দম্পতি-এক অদ্ভুত বন্ধনে বাঁধা, তবু অদেখা অনুভবের কথা কেবল নিরবতাই বুঝতে পারে।সেই মায়াভরা ক্ষণকে আরো রাঙিয়ে তুলেছে তাদের উষ্ণতম ভালোবাসা!

চাঁদের ম্লান আলোয় মাহেরের বুকের কাছে মাথা রেখে হালকা গলায় আইরা বলল,
“আমার জন্মের সময় আমাকে দেখতে যাননি কেন? তখন তো আপনি ১১ বছরের জোয়ান শিশু ছিলেন।”
“আল্লাহ পারমিশন দেননি তাই যেতে পারিনি।”
আইরা মুখ ঘুরিয়ে চাইল উনার দিকে।
“কেন?”
মাহের জানালায় বৃষ্টিমুখর আঁধারে নিমজ্জিত আকাশের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত চুপ থাকেন। তারপর নিচু গলায় বলেন—
“আল্লাহ বলে দিয়েছিলেন, ‘খবরদার যাবে না। তাকে এখনো দেখার সময় হয়নি। হলে দেখবে তো ঠিকই, সাথে সারাজীবনের জন্য তুলে নিয়ে আসবে।’”
“কিন্তু স্যার, আপনি তো তুলে আনেননি? আমি নিজেই উঠে এলাম।”
“একই হলো তো!”
আইরা এবার গা এলিয়ে দেয় মাহেরের প্রশস্ত বুকের ওপর।তাঁর কণ্ঠে চাপা হাসির দুলুনি—
“নিয়ে এসেছিলেন তারপর?”
মাহের তার চুলে আঙুল চালিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে—
“হুম, এই যে।”
চুপচাপ একটুখানি মুহূর্ত, তারপর আইরার মন খারাপের সুরে প্রশ্ন—
“আপনি আমাকে ভালোবাসেন না তাই না?”
“না।” — মাহেরের ছোট্ট জবাব

সঙ্গে সঙ্গে আইরা ধীরে ধীরে সরে আসে মাহেরের হৃদপিণ্ডের বহিস্থর থেকে। একফালি চাঁদের আলো এসে পড়ে তার ফ্যাকাসে মুখে।
মাহের ঠোঁট কামড়ে ধরে তার মলিন মুখটা দেখেন, তারপর হঠাৎই কাছে টেনে নেন তাকে।
তার কণ্ঠে গা শিউরে ওঠা গভীরতা—
“শুধু মুখে বললেই ভালোবাসা হয়? আর কোনোভাবে হয় না?”
আইরার একরোখা, শিশুর মতো জবাব—
“না, হয় না।”
একচিমটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মাহের।এই প্রথমবারের মতো তাকে ভালোবাসার কথা জানাতে নিচু গলায় বলেন—
“আচ্ছা বেশ! তাহলে ভালোবাসি আমার তুলতুল, বুলবুল চিন্টুর প্রেমিকাকে!”
আইরার গাল গরম হয়ে যায় অদ্ভুত এক ভালোলাগায়।সে লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলে।ভালোবাসার মানুষের থেকে ভালোবাসার কথা শোনার মতো শ্রুতিমধুর আর কিছু কি আছে!
মাহের তার লজ্জার ছায়া উপভোগ করে বলেন—
“এতো লজ্জ্বা পাচ্ছো?এই লজ্জা দেখে মনে হচ্ছে এখনই আবার বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে!”
আইরার গলা কাঁপে, চোখ ছোট করে মিনমিনে স্বরে বলে—
“আপনি একদমই ভালো না!”
মাহের চোখ নামিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসেন, তার কপালের উপর ঝুলে পড়া চুল সরিয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলেন—
“তুমি কিন্তু একদমই সাধারণ নও… তুমি আমার মতো অযোগ্য, তুচ্ছ এক মানুষের কপালে জোটা এক দামী নিয়ামত, খাঁটি হীরে, যা আমি যোগ্যতা ছাড়াই পেয়ে গিয়েছি।”
আইরা মুখ ফুলিয়ে বলল,

“আর আপনি জানেন আপনি কে?”
“বলো শুনি?”
আইরা চোখ নাচিয়ে বলল,
“আপনি আমার এই জীবনের শেষ বক্সভরা বিস্কুট! যা অত্যন্ত সুস্বাদু।নাহ, উমম আপনি হচ্ছেন আমার আমার…আমার কিন্ডারজয় বিলুপ্ত হওয়া পৃথিবীতে এক টুকরো কিন্ডারজয়? না না… আপনি হচ্ছেন বিলুপ্ত হওয়া পৃথিবীর একমাত্র চকলেট ফ্লেভারের ছানার জিলাপি!”
মাহের হেসে গড়িয়ে পড়লেন।তিনি যে কারো জীবনের ছানার জিলাপি বা কিন্ডারজয়ের মতো উদাহরণ হতে পারেন,ইতোপূর্বে তা কল্পনাও করতে পারেননি।
“হাসছেন যে?তাহলে কি আমি বুঝাতে পারলাম না আপনি আমার জন্য কতো স্পেশাল?”
মাহের প্রত্যুত্তর করলেন না আর।আইরা আরেকটু গুছিয়ে বলতে লাগল,
“তাহলে আপনি হচ্ছেন আমার জীবনের শেষ প্যাকেট ম্যাঙ্গো বার! যেটা কাউকে না দিয়ে ফ্রিজে লুকিয়ে রাখি!”
“তবে তুমিও আমার কাছে মজাদার সুস্বাদু কোনো রেসিপি, রাইট।সো নাউ…… সুড আই টেস্ট ইট?”
আইরা চোখ বড়োবড়ো করে তাকিয়ে থাকে।তার অস্ত্র দিয়ে তাকেই আঘাত! মাহের নরম চুমু এঁকে দিলেন তাঁর চোখের পাতায়!
চারপাশে একটুকরো নিস্তব্ধতা নেমে আসে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ যেন সুর হয়ে বাজে।জানালার ওপাশে ছায়া ফেলে রাখা বৃষ্টিভেজা গাছেরা সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেই হালাল, নরম ভালোবাসার।

বৃষ্টির ধারাগুলো কিছুটা কমেছে।
কিন্তু গা ছমছমে মেঘের গর্জন থামেনি। রাতের গভীরতা নামছে ধীরে ধীরে।চারদিকের কুয়াশা আর অন্ধকারে গ্রামের আলোগুলো দূরে দূরে মিটিমিটি জ্বলছে।একটা গাঢ় নীরবতা নেমে এসেছে চারপাশে।
আরহাম হাফসার হাত ধরে বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে এলেন।হাফসার বাড়ির সম্পূর্ণ অংশ বায়োন্ডারি দিয়ে আলগা করা।তাই গেট মাধ্যম ছাড়া বাহির থেকে ভেতর দেখা যায় না।
“চলুন, একটু ভিজি,” আরহামের কণ্ঠে শিশুসুলভ এক খুনসুটি।
হাফসার ইচ্ছে হলো ছুটে যেতে।পরক্ষণেই দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতে ভুগতে বলল, ‘যদি ঠান্ডা লাগে?”
“লাগবে না,ইন শা আল্লাহ।আপনি না ভিজলে, এই বৃষ্টিও বৃথা যাবে উমায়ের।”
হাফসা এখনো ঠায়,কিন্তু আরহাম হাত ছাড়লেন না।
একটু এগিয়ে নিয়ে এলেন তাঁকে সজনে গাছটার নিচে। গাছটা যেন এই দম্পতির ভালোবাসার সাক্ষ্য দিচ্ছে, তার পাতায় জমা ফোঁটাগুলো একের পর এক পড়ে যাচ্ছে তাদের পাশে।
হাফসা হালকা কাঁপছে।ঠাণ্ডায় বা এক অজানা কোনো অনুভবে।আরহাম ধীরে ধীরে নিজের কালো চাদরটা খুলে হাফসার গায়ে জড়িয়ে দিলেন।মুহুর্তেই বৃষ্টির ফোঁটা উনার সাদা পান্জাবি ছুঁইয়ে শুভ্র শরীরে মিশে গেলো!
কোনো শব্দ নেই।নিঝুম বৃষ্টি মেখে যাচ্ছে দুই কপোতীর গায়ে।তারা একসাথে দাঁড়িয়ে থাকেন, সজনে পাতার নিচে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তাদের ভালোবাসার সাক্ষ্য।তারা চুপচাপ সূরা “আদ্-দুহা” মুখে মুখে পড়তে থাকেন। প্রথমে হাফসা, তারপরে আরহাম।
“وَالضُّحَىٰ . وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَىٰ”
(শপথ সকালবেলার,
আর শপথ সেই রাতের, যখন তা শান্ত হয়ে যায়…)
হাফসার চোখে জল আসে। এই আয়াত যেন তাদের জীবনের গল্প।
আরহাম ধীরে বললেন—
“এই সূরাটা যখন পড়ি, মনে হয় যেন আল্লাহ আমাদেরকেই সান্ত্বনা দিচ্ছেন… ‘তোমার রব তোমাকে ত্যাগ করেননি, এবং তিনি রুষ্টও হননি।’ “
হাফসা মাথা নিচু করে বললো,
“আপনি জানেন, আমি মাঝেমধ্যে ভয় পাই — যদি আল্লাহ আমাদের মাঝে থেকে ভালোবাসা তুলে নেন?”
আরহাম তাৎক্ষণিক বললেন—
“যদি আমরা উনাকে ভালোবাসায় রেখেই আমাদের ভালোবাসা গড়ি, তবে তিনিই তা হিফাজত করবেন, উমায়ের। আমি চাই, আপনি শুধু আমার স্ত্রী না, বরং সেই নারী হোন, যার সাথে আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবো।”

হাফসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না,চোখ ভাসিয়ে কাঁদলো।নিঃশব্দ কান্না ঝরে পড়লো চোখের কোণ বেয়ে অঝোর বৃষ্টির মতো তার চোখ দুটো যেন ভিজিয়ে দিচ্ছিল চারপাশের নিস্তব্ধতা।
আরহাম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে চোখ মুছে দিয়ে তাঁর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলেন—নিভৃত, শ্রদ্ধাভরা এক স্পর্শ, যেন গভীর ভালোবাসার অদৃশ্য মুদ্রা।তাঁর অস্তিত্ব জুড়ে যেন এক অজানা অস্থিরতা।আরহাম বুঝতে পারলেন হিম ঠান্ডার সাথে ঝুমঝুমে বৃষ্টিতে কেঁপে কেঁপে উঠছেন উমায়ের।ঝুম বৃষ্টির রাত আর হিমেল হাওয়ার আচ্ছাদনে কাঁপতে থাকা উনার স্ত্রীর দেহে যেন আত্মার কাঁপুনি মিশে গেছে।
আর এক মুহূর্তও না ভেবে আরহাম তাকে গভীর আলিঙ্গনে আগলে নিলেন।সেই আলিঙ্গন শুধু শরীর নয়, আত্মাকেও জড়িয়ে ধরেছিল।হাফসা অনুভব করলো
এই গভীর ঝড়ো রাতে সে যেন এক বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে, যে তাকে আগলে রাখছে নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থভাবে।
চুপচাপ পড়ে রইলো সে আরহামের সান্নিধ্যে—কোনো কথা নেই, শুধু হৃদয়ের ভাষায় বিনিময় চলতে থাকলো। শীতল রাতের মধ্যে সেই উষ্ণতা তার ভেতর বয়ে গেলো এক পবিত্র শিহরণ হয়ে।সময় যেন থমকে গেলো।শীতলতায় উষ্ণতা খুঁজতে একসময় আরহাম বেছে নিলেন তাঁর কোমল কায়া, উষ্ণ শিহরনে বয়ে গেলো হাফসার ভেতরে।আরহাম অনেকক্ষণ পর আলিঙ্গনের সমাপ্তি টেনে বললেন , “চলুন ঘরে যাই।আপনাকে এমন দেখে আমারই ঘোর লাগছে,উমায়ের।অন্য কিছুর চোখে পড়লে তো!”

“মানে?”
“আপনাকে এভাবে দেখে মনে হচ্ছে… যেন আমি স্বপ্ন দেখছি। অন্য কারও চোখে পড়লে, আমার এই সৌভাগ্যটুকু হয়তো কারো হিংসার কারণ হয়ে যাবে।”
হাফসা মাথা নিচু করে রইলো, ঠোঁটে লেগে রইলো এক নিঃশব্দ হাসি—ভেজা চোখে লাজুক সম্মতি।
হাফসা চুপচাপ হাঁটলো।তাঁর হৃদয়জুড়ে ছড়িয়ে গেলো সেই দোয়া, সেই ইচ্ছা, সেই ভয় আর ভালোবাসা।তারা যখন ঘরে ফিরে এলো, তখন ঘরে লণ্ঠনের আলো জ্বলছিলো। শিশুরা ঘুমে ঢলে পড়েছে।
আরহাম হাফসার কানে মুখ এনে বললেন—
“আজ রাতের এই বৃষ্টিতে আমাদের দোয়া কবুল হোক… একটা নতুন শুরুর।যেটার শেষ হলো,জান্নাত!”
হাফসা মাথা নিচু করেই থাকলো। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে ছিলো একটাই জবাব— “আমিন।”
পরিশিষ্ট :
ভেজা কাপড় পাল্টে উষ্ণ কাপড় গায়ে জড়িয়ে তারা আবার বেলকনিতে আসলেন! আরহাম তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে হিজাবের ওপর শত চুমু আঁকলেন।অতপর প্রিয়তমার সুশ্রী মুখে পলকহীন দৃষ্টি রেখে আরহাম শীতল সুরে আওড়ালেন,

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮১

“আপনাকে দেখতে এলাম
যেন দেখেই গেলাম
দেখেই গেলাম
আর শুধু দেখেই গেলাম __
জানিনা কি বলবো এখন আমি
আর কি’ই বা বলতে এসে_ছিলাম!
ভালোবাসি, হোমাপাখি!

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here