অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১০
রুপা
কলেজ ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পুষ্প আর সারা। দুজনের পরনে সাদা কলেজ ড্রেস। এর মধ্যে হঠাৎ ওদের সামনে একটা কালো বাইক এসে জোরে ব্রেক করল। যাতে পুষ্প কিছুটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়; সারা দ্রুত পুষ্পকে টেনে নিজের দিকে করে নেয়।
– “ঠিক আছিস তুই?”
সারার কথায় পুষ্প ওর দিকে তাকিয়ে বলল—
– “ঠিক আছি আমি। হঠাৎ এরকম হওয়ায় ভয় পেয়েছি।”
ব্যাস! সারাকে আর থামায় কে? হেলমেট পরা ছেলেটার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠল—
– “এই, কোন মা*গের নাতি? চোখে দেখিস না শালা? চোখ কি পকেটে নিয়ে ঘোরার জন্য দিছে উপরওয়ালা? আর একটু হলে আমার জানের জান যেত!”
হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠে এরকম খাঁটি বাঙালি গালি শুনে ভড়কে যায় ইভান। সে নিজের হেলমেট খুলে তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে; পুঁচকে একটা মেয়ে, নাহলেও তার থেকে ৮/৯ বছরের ছোট হবে। তবে ইভান কিছু বলল না। তার নজর আটকায় সামনে সাদা কলেজ ড্রেস পরিহিত তার মায়াবিনীর দিকে, যে ভীত নয়নে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। ইভান সেদিকে এগিয়ে গিয়ে পুষ্পর কাছে ক্ষমা চাইল—
– “সরি মায়াবিনী, আমার আর একটু সাবধানে ব্রেক করা উচিত ছিল! আমি বুঝতে পারিনি তুমি ভয় পেয়ে যাবে।”
হঠাৎ ইভানের মুখে ‘মায়াবিনী’ নামটা শুনে বেশ বিব্রত বোধ করল পুষ্প। সে একবার সারার দিকে তাকাল, দেখল সারা তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে কৌতূহলী চোখে। পুষ্প এবার নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলল—
– “ভাইয়া, আমার নাম পুষ্প। আপনি আমাকে পুষ্প বলেই ডাকতে পারেন!”
পুষ্পর কথা শুনে হাসল ইভান। কী করে বোঝাবে এই মায়াবিনীকে যে আরও ছয় মাস আগে, এক দেখায় এই মায়াবিনীর মায়ায় পড়ে গেছে সে! ইভান কিছু বলবে, তার আগেই সারা বলে উঠল—
– “পুষ্প, তুই চিনিস এই লোকটাকে?”
সারার কথার বিপরীতে ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয় পুষ্প। এতে সারা আরও চটে যায়—
– “পরিচিত বলে কি মানুষকে মারার পায়তারা করবেন?”
পুষ্প বুঝতে পারে সারা রেগে গেছে, ওভাবে বাইক ব্রেক করায় ও ভয় পেয়েছে সে কারণে। সে এবার সারাকে শান্ত করতে লাগল—
– “সারা, কিছু হয়নি তো। আর ভাইয়া ইচ্ছে করে করেননি তো!”
সারা আবার কিছু বলবে, তার আগে ইভান বলল—
– “সরি মিস, আমি সত্যি দুঃখিত! আমার আর একটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। বাই দ্য ওয়ে, তুমি পুষ্পর কী হও?”
– “আমি জানের বেস্ট ফ্রেন্ড!”
বেশ ভাব নিয়ে, গর্ব করে বলে সারা। যেটা দেখে ইভান হেসে বিড়বিড় করে বলল—
– “জান! ইন্টারেস্টিং।”
তবে মুখে বলল—
– “তা তোমার নাম কী?”
– “সারা!”
– “তা মিস সারা, কলেজ ছুটি হয়েছে আধা ঘণ্টা আগে, এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
এবার পুষ্প বলল—
– “আসলে ভাইয়া, প্রতিদিন ফুফুমণি এসে আমাকে নিয়ে যান। আজকে ফুফুমণি এখনো আসেননি, তাই দাঁড়িয়ে আছি। আর আমি না যাওয়া পর্যন্ত ও নাকি যাবে না।”
ইভান কিছু একটা ভেবে বলল—
– “আচ্ছা চলো আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই!”
– “না না ভাইয়া, ফুফুমণি এসে আমাকে না পেলে দুশ্চিন্তা করবেন!”
– “আচ্ছা, তাহলে আমি তোমার ফুফুমণিকে কল করে জিজ্ঞেস করি।”
কথাটা বলেই ইভান পুষ্পর জবাবের অপেক্ষা করল না, শেহনাজ সরকারকে কল করল। দুইবার রিং হওয়ার পর রিসিভ করে ‘হ্যালো’ বলতেই ইভান সালাম দিল। শেহনাজ সরকার সালামের জবাব দিয়ে কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই ইভান বলল—
– “আন্টি, আমি পুষ্পর কলেজের দিক দিয়ে যাওয়ার সময় পুষ্পকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর থেকে জিজ্ঞেস করলাম। ও বলছে আপনি এসে নিয়ে যাবেন। আমি পৌঁছে দিতে চাইলে বলছে আপনি টেনশন করবেন, তাই আমি আপনাকে কল দিয়েছি!”
– “পুষ্প এখনো গেটে দাঁড়িয়ে আছে? কিন্তু আমি তো ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিয়েছি পুষ্পকে আনার জন্য! আজকে আমি ব্যস্ত থাকায় ওকে আনতে যেতে পারিনি, তাই ড্রাইভারকে পাঠিয়েছি। তুমি বলছো পুষ্প এখনো ওখানে!”
– “আন্টি, হয়তো জ্যামে আটকে গেছে! আপনি অনুমতি দিলে আমি পৌঁছে দিতে পারি।”
– “তোমার অসুবিধে হবে না?”
– “নাহ্ না আন্টি, কোনো অসুবিধা নেই।”
– “আচ্ছা ঠিক আছে, সাবধানে পৌঁছে দিও।”
ইভান কল কেটে ফোন পকেটে ঢুকিয়ে রেখে পুষ্পর দিকে তাকাল। সব শুনে পুষ্প এবার বেশ অস্বস্তিতে পড়ল। একটা অপরিচিত ছেলের বাইকে বসে যাওয়া—যাকে সে মাত্র একবার দেখেছে—কোথাও যেন মন সায় দিচ্ছে না। পুষ্পকে নড়তে না দেখে ইভান বলল—
– “ভয় পাচ্ছ কেন, মায়াবিনী?”
– “ভাইয়া, এসব নামে আমাকে ডাকবেন না দয়া করে। আমাকে আমার নাম ধরে ডাকুন!”
– “আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে পুষ্প, বাইকে ওঠো, আমি পৌঁছে দেব। চিন্তা কোরো না, তোমার ফুফুমণি অনুমতি দিয়েছেন।”
পুষ্প অগ্যতা বাধ্য হয়ে বাইকে উঠে বসল, তবে মাঝখানে নিজের ব্যাগটা রেখে দিল। সারার থেকে বিদায় নিয়ে ইভান বাইক স্টার্ট দিল। তবে সে বেশ ধীরেই চালাচ্ছে, কারণ পুষ্প তাকে না ধরে বাইকের পেছনের সিটটা শক্ত করে ধরে আছে।
পুষ্প যেতেই সারা রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল কোনো রিকশা আসছে কিনা। কোনো রিকশা না দেখে সে হাঁটতে শুরু করল। এমন সময় পেছন থেকে কেউ ডেকে উঠল—
– “মিসেস সায়ান, তোমার বাঙালি গালি দেওয়া এখনো বন্ধ হয়নি?”
কণ্ঠস্বর শুনে সারার পা থেমে যায়। সে পেছন না ফিরেই বলল—
– “যদি খাঁটি বাঙালি গালি শোনার ইচ্ছে না থাকে, তবে আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন!”
কথাটা শুনে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল স্নিগ্ধ। সে এবার দ্রুত পা চালিয়ে সারার সাথে পা মেলাতে মেলাতে বলল—
– “গালি দেওয়া মেয়েদের আমার পছন্দ নয়; তবে তোমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন, সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো!”
স্নিগ্ধর কথা শুনে সারা এবার থেমে যায়। সোজা স্নিগ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
– “এতসব আমি জানি না, জানতে চাইও না। আপনি শুধু আমার থেকে দূরে থাকুন! নাহলে আমি কী করতে পারি, আপনি খুব ভালো করে জানেন!”
কথাটা বলেই একটা রিকশা দেখে সেটাতে চট করে উঠে পড়ল সে। পেছন থেকে শোনা গেল স্নিগ্ধর চড়া গলা—
– “কী করবে? আমার থেকে পালাতে আবার শহর ছাড়বে?”
বিপরীত দিক থেকে কোনো উত্তর আসে না। স্নিগ্ধ এবার বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলল—
– “তুমি যেখানেই যাবে, সেখানেই হাজির হব আমি। তুমি আমার থেকে পালাতে পারবে না, রেজিস্ট্রি করা বউ!”
ইভান পুষ্পকে গেটের সামনে নামিয়ে দিল। সে বাইকটা থামিয়ে নেমে এল। পুষ্পকে কিছু বলবে, তার আগেই পুষ্প বলল—
– “ধন্যবাদ ভাইয়া। এখন আমি আসি!”
– “আমাকে কি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছ পুষ্প?”
– “এমা, না না! আমি কেন আপনাকে তাড়িয়ে দেব?”
– “তাহলে একবার ভেতরে যাওয়ার জন্য সাধলেও না! কেন, আমি কী মনে করব?”
– “সরি ভাইয়া, ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি আসুন!”
ইভান কিছু মনে করল না। সে বুঝতে পেরেছে মেয়েটা একটু বেশিই সহজ-সরল—একদম ওভারলোডেড কিউট যাকে বলে! সে পুষ্পর সাথে হেসে ভেতরের দিকে পা বাড়ায়।
কিন্তু এদিকে তাদের থেকে মাত্র তিন হাত দূরত্বে, সাদা প্রাইভেট কারে বসে সবকিছু পরখ করছিল আর্য! অফিসে মিটিং না থাকায় সে আজকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরে এসেছে। অফিসে কেমন যেন একটা অস্থির লাগছিল, মন বলছিল বাড়িতে আসলেই এই অস্থিরতা কমবে। কিন্তু বাড়ির গেটের কাছে আসতেই সামনের দৃশ্য দেখে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। পুষ্পকে একটা ছেলের বাইক থেকে নামতে দেখে অজান্তেই গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাত দুটো শক্ত হয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠে; হাতের পেশি টানটান হয়ে যেন শার্ট ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে! তীক্ষ্ণ নজরে সব দেখে বুঝতে পারে ওটা ইভান, তাও আর্যর রাগ কমে না। তার ভেতরে কোথাও যেন আগুন জ্বলছে!
সে গাড়ি নিয়ে ভেতরে চলে গেল। ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখল ইভান বসে আছে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল পুষ্প কোথাও নেই। সে ইভানকে জিজ্ঞেস করল—
– “তুই এখানে, এই সময়ে?”
হঠাৎ আর্যর গম্ভীর গলা শুনে চোখ তুলে তাকায় ইভান। আর্যর মুখ দেখে বুঝতে পারে সে কোনো কারণে রেগে আছে, গলা কেমন শক্ত শোনাচ্ছে। তবে সে এসবে পাত্তা দিল না; আর্য সবসময় এমনই থাকে। তাই সে হেসে বলল—
– “আরে, তোর বোনের কলেজের সামনে দিয়ে আসছিলাম। ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাবলাম বাড়িতে পৌঁছে দিই, তাই পৌঁছে দিতে এলাম!”
‘বাড়িতে পৌঁছে দিতে এসেছে’—কথাটা শুনে আর্যর চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেল। বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে কেন? বাড়ির গাড়ি নেই, নাকি বাড়িতে আর মানুষ নেই? এর মধ্যে আগুনে ঘি ঢেলে দিল ইভানের পরের কথাটা—
– “তবে যা-ই বলিস আর্য, তোর বোনটা বেশ কিউট! মায়াবী চোখ দুটো…”
কথাটা শেষ করার আগেই গর্জে উঠল আর্য—
– “ও আমার বোন নয়! কতবার বলেছি?”
হঠাৎ আর্যর এই রুদ্রমূর্তিতে ভড়কে গেল ইভান। সে এবার গম্ভীর গলায় বলল—
– “তোর সমস্যাটা কী আর্য? গতকাল আন্টি তো বললেন পুষ্প তোর মামার মেয়ে, তার মানে তোর মামাতো বোন! এখানে এত রিঅ্যাক্ট করার কী আছে?”
– “আর একবার যদি ওকে আমার বোন বলেছিস, জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব ইভান, মাইন্ড ইট!”
কথাটা বলেই গটগট করে ওপরে চলে গেল আর্য। আর্যর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ইভান আশ্চর্য হয়ে রইল—
– “যা বাবা! বোনকে বোন বলব না তো কী বউ বলব? এক মিনিট! আর্যর বউ কোথায়? গতকালও দেখিনি, আজকেও দেখছি না, গেল কই আর্যর বউ? মানে আমার ভাবী!”
আর্য রেগেমেগে রুমে এসে দেখে পুষ্প নেই। সে নিজের গলার টাইয়ের নটটা টেনে ঢিলে করতে করতে গিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ল; পরনের দামী স্যুটটা খুলে বিছানায় ছুড়ে মারল। হচ্ছেটা কী তার সাথে? সে তো ঠিক করেছে মেয়েটাকে বাধ্য করবে তাকে ছেড়ে দিতে, তাহলে আজ ওকে ইভানের সাথে দেখে তার এরকম অস্থির লাগছে কেন? ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে চাপড়ে সোজা করে দিতে! কী দরকার ছিল ইভানের বাইকে করে আসার? আর একটু দাঁড়িয়ে থাকলে কী হতো, বাড়ির গাড়ি গিয়ে নিয়ে আসত না!
আর্যর আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝেই খট করে খুলে যায় ওয়াশরুমের দরজা। আর্য সেদিকে তাকাতেই থমকে যায়। পুষ্প সদ্য গোসল করে বেরিয়েছে। কোমর সমান দীঘল কালো কেশরাশি থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। পরনে হালকা গোলাপি সালোয়ার-কামিজ, যা ফর্সা গায়ে আরও বেশি ফুটে উঠেছে। পুষ্পকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সদ্য ফোটা কোনো ফুল, নামের মতোই স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। শিশিরবিন্দু যেরকম ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকে, ঠিক সেরকম গোসল করার কারণে তার মুখেও বিন্দু বিন্দু পানি লেগে আছে, লাইটের আলোয় চিকচিক করছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে! হঠাৎ আর্যকে রুমে দেখে কিছুটা ভীত হয় রমণী। আর্যর অদ্ভুত দৃষ্টির দিকে চোখ পড়তেই কেঁপে উঠল পুষ্পর তনু-মন। তবে সে দ্রুত ভেজা কাপড়গুলো নিয়ে বারান্দায় চলে গেল মেলে দেওয়ার জন্য।
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৯
পুষ্প চলে যেতেই আর্যর যেন সম্বিৎ ফিরল। কী করছে সে? ওই মেয়েটার দিকে এভাবে তাকাচ্ছে কেন? এত চেষ্টা করেও নিজের দৃষ্টি সংযত করতে পারছে না কেন? আর্য একপলক বারান্দার দিকে তাকিয়ে ফ্রেশ হওয়ার জন্য কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকতে গিয়েও আরু ঢুকল না। পুষ্প কাপড় মেলে দিয়ে রুমে এসে আবার আর্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে এবার নিজের ওড়নাটা ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে যেই না রুম থেকে বের হতে যাবে, তখনই শোনা গেল আর্যর গম্ভীর গলা—
– “দাঁড়াও!”
