অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৬ (৩)
রুপা
আর্য নিজের মুখে বলা কথা শুনে নিজেই কিছুটা অবাক হয়ে গেল! এতক্ষণ নিচে থেকে আসার পর থেকে তার ভেতরের রাগ যেন কোনোভাবেই কমছিলই না। ওই নিশির এত বড় সাহস হলো কী করে তাকে জড়িয়ে ধরার? ইচ্ছে তো করছিল, যে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে, ওই হাতেই এসিড ঢেলে দেয়! রুমে এসে অনবরত পায়চারি করতে করতে নিজের চুল খামচে ধরেও আর্য যখন রাগ শান্ত করতে পারছিল না, তখন কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গিয়েছিল। টানা দেড় ঘণ্টা শাওয়ার নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, পুষ্পকে দেখার পর তার ভেতরের সমস্ত রাগ কোথায় যেন এক নিমেষে উড়ে গেছে! নিজের মনের এই পরিবর্তনের কারণ সে নিজেই বুঝতে পারছে না। তার সাথে আসলে হচ্ছেটা কী? এই মেয়েটা কাছে আসলেই তার চারপাশের সবকিছু কেমন যেন অচেনা ওলটপালট হয়ে ওঠে!
এদিকে আর্যর এমন কথা শুনে পুষ্প কী বলবে বুঝতে পারল না। এমনিতেই আর্য এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকায় তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। আর্যর শরীর থেকে ভেসে আসা পুরুষালি তীব্র কড়া ঘ্রাণ আর শ্যাম্পুর সুবাস তার নাসারন্ধ্রে এসে ভারী আঘাত করছে, যা অবচেতনভাবেই পুষ্পকে আর্যর দিকে আকৃষ্ট করছে। নিজেকে কোনো রকমে সামলানোর চেষ্টা করে সে কেবল মিনমিন করে বলল—
– “ফুফুমণি নিচে ডাকছেন আপনাকে, খাবার খেতে।”
পুষ্প কথাটা বলে এক পা পিছিয়ে সরে যেতে নিলেই আর্য চট করে পুষ্পর দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে এল। আর্যর আচমকা পুরুষালি স্পর্শে আবারও কেঁপে কেঁপে উঠল নরম রমণীর কায়া, জড়সড় ও ভীত হয়ে পড়ল সে। আর্য রমণীর থমথমে চেহারার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল—
– “তখন কাঁদছিলে কেন?”
আর্যর কথায় মুহূর্তেই পুষ্পর মনে পড়ে গেল ড্রয়িং রুমে নিশির আর্যকে জড়িয়ে ধরার সেই দৃশ্যটা। তার বুকের ভেতরটা আবার অজানা এক ব্যথায় মুচড়ে উঠল। পলকেই সারা মুখমন্ডলে আঁধারের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। সে তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে মিনমিন করা কাঁপা গলায় পালটা প্রশ্ন করল—
– “কখন?”
আর্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে পুষ্পর পুরো চেহারা। মেয়েটা চোখ নামিয়ে রেখেছে, চোখের ঘন পাপড়ি দুটো ভীতিতে কাঁপছে। সারা মুখ জুড়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর মেঘ জমেছে। তা দেখে আর্য আর কোনো প্রশ্ন না করে চুপচাপ কেবল তাকিয়ে রইল পুষ্পর মায়াবী মুখটার দিকে। আর্যকে ওভাবে নিস্পলক তাকিয়ে থাকতে দেখে পুষ্প আবারও নিচু স্বরে বলল—
– “নিচে সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
আর্য পুষ্পর কাঁধ থেকে নিজের হাতজোড়া ছেড়ে দিল। তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল—
– “মেয়ে, তুমি নিজের চোখের পানির মূল্য দিতে শেখো। এত ঠুনকো কারণে চোখের পানি ঝরালে যে কেউ এসে তোমার চোখের পানি ঝরাতেই থাকবে। ইদানীং ওই ভীত চোখের পানি আমার অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে!”
আর্যর এই রহস্যময় কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না পুষ্প। সে আর্যকে আর কিছু না বলে ধীরপায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আর্যও পুষ্পর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আলতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার পেছন পেছন নিচে নেমে গেল।
খাবার টেবিলে সবাই যে যার মতো খেতে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বলছেন আমজাদ সরকার, আহমেদ সরকার আর রেশমা। শিফা আর সিমরান দুজনে সমবয়সী হওয়ায় বেশ ভালো সখ্যতা ওদের ; দুজনে আলাদা হয়ে নিজেদের মতো গল্পে মেতে আছে। আর নিশি? সে তো নিজের প্লেটে শুধু চামচ নেড়ে একটু একটু করে খাচ্ছে, আর বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে। মনে মনে সে ভীষণ অস্থির হয়ে ভাবছে—
– “এতক্ষণ লাগে আর্যকে ডেকে আনতে? এতক্ষণ ধরে কী করছে দুজনে উপরে!”
নিশির ভাবনার মাঝেই দেখা গেল পুষ্প সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে, আর ঠিক তার পেছনে পেছনে আর্য আসছে। আর্য হেঁটে নামছে ঠিকই, কিন্তু তার দুই চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার সামনে হেঁটে যাওয়া রমণীর ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে! এই দৃশ্য দূর থেকে দেখেই নিশি আবারও রাগে ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠল।
পুষ্প এসে শেহনাজ সরকারের পাশে যে ফাঁকা জায়গাটা ছিল, সেখানে বসে পড়ল। আর আর্য যখন দেখল তার নিজের বসার চেয়ারটার ঠিক পাশেই নিশি বসে আছে, তখন রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তবুও টেবিলে আর কোনো চেয়ার খালি না থাকায় বাধ্য হয়ে সেখানেই গিয়ে বসল। আর্যকে নিজের ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসতে দেখে মনে মনে বেশ খুশি হলো নিশি।
জেনিফার সরকার আর্যর প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন। আর্য খাওয়ার মাঝে পানির গ্লাস নিতে চাইলে, নিশি বেশ গদগদ হয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে আর্যর দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। কিন্তু আর্য নিশির সেই বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসটা সম্পূর্ণ না দেখার ভান করে, তার ঠিক সামনে বসা পুষ্পর খেয়ে রাখা পানির গ্লাসটা টেনে নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিল! আর্যর এই প্রকাশ্য অবহেলা আর পুষ্পর এঁটো গ্লাসে পানি খাওয়া দেখে নিশির ফর্সা মুখটা রাগে আর অপমানে লাল হয়ে গেল। আর্য অবশ্য সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো খেতে ব্যস্ত রইল। তবে খেতে খেতেই সে লক্ষ্য করল, সামনে বসা পুষ্পর প্লেটের খাবার যেন কমছেই না। পুষ্পকে ওভাবে না খেয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে আর্যর জোড়া ভ্রু কুঁচকে গেল।
আর্য খেয়াল করে দেখল পুষ্প এক লোকমা খাচ্ছে তো আবার নিজের পোড়া হাতটার দিকে তাকাচ্ছে। আর্য দেখেই বুঝতে পারল হাতের ব্যথাটা পুরোপুরি ঠিক না হওয়ায় খাওয়ার সময় চামড়ার টানে হয়তো ওর বেশ কষ্ট হচ্ছে। সে নিজে কিছু বলবে, তার আগেই শেহনাজ সরকার বিষয়টি খেয়াল করে স্নেহের সুরে বলে উঠলেন—
– “পুষ্প মা, যা, বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আয়, আমি খাইয়ে দিচ্ছি! তোকে নিজের হাতে খেতে কে বলেছে? আমি নিজেই তো খাইয়ে দিতাম!”
পুষ্প কিছু বলল না। সে তো ভালো করেই জানে ফুফুমনি তাকে কতটা ভালোবাসেন আর নিজের হাতে খাইয়ে দেন; কিন্তু আজকে বাড়িতে নতুন মেহমান আসায় ওনারা যদি কিছু মনে করেন বা উলটপালট ভাবেন, তাই সে নিজের হাতেই কষ্ট করে খাওয়ার চেষ্টা করছিল। তরকারির ঝোল লাগতেই পোড়া জায়গাটা তীব্রভাবে জ্বলছিল, তবুও সে মুখ বুজে খেয়ে নিতে চেয়েছিল। পুষ্পকে ওভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে আর্য গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “আম্মু কী বলছেন সেটা কি কানে যায়নি? বসে আছ কেন এখনো?”
পুষ্প একপলক সামনে বসা আর্যর থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে গেল এবং বেসিন থেকে হাত ধুয়ে ফিরে এল। শেহনাজ সরকার পুষ্পর প্লেটটা নিজের হাতে নিয়ে সুন্দর করে ভাত মেখে ওকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। পুষ্প লক্ষ্মী মেয়ের মতো টু শব্দ না করে খেতে লাগল। এদিকে বাড়ির বড়রা পুষ্পর প্রতি ওনার এমন নিখাদ যত্ন ও খেয়াল দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হলেও, একটুও খুশি হতে পারলেন না রেশমার শাশুড়ি মিনারা বেগম! সাথে নিশি তো রাগে আর হিংসায় ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না যে আর্য তার বাড়িয়ে দেওয়া পানির গ্লাসটা ছোঁয়া তো দূরের কথা, না দেখার ভান করে ওই মেয়েটার খেয়ে রাখা এঁটো গ্লাসের পানি খেল! রাগে আর চরম হিংসায় টেবিলের নিচে বাম হাত দিয়ে নিজের জামা খামচে ধরে রইল নিশি; পুষ্প মেয়েটাকে যেন কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছে না তার।
এদিকে মিনারা বেগম পুষ্পকে সামান্য খোঁচা ও কথা শোনানোর উদ্দেশ্যে বাঁকা হেসে বলে উঠলেন—
– “শেহনাজ, তোমাকে বলি শোনো! ছেলের বউকে নিয়ে এত আদিখ্যেতা করার কী আছে বাপু? এরকম মাথায় তুললে দেখবে একদিন ও তোমার মাথায় উঠেই নাচবে!”
তিনি একটু থেমে এবার সরাসরি পুষ্পর দিকে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—
– “তা মেয়ে, তুমিও বা কেমন? শাশুড়ির আগে তুমি নিজে খেয়ে নিচ্ছ, আবার এখন শাশুড়ির হাতেই গিলছ! তোমার কি কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই? নাকি মা-বাবা কোনো ভালো শিক্ষা দেননি?”
মিনারা বেগমের মুখ থেকে মা-বাবাকে জড়িয়ে এই কটু কথা শুনামাত্রই পুরো খাবার টেবিলে এক লহমায় পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবার খাওয়ার হাত যেখানে ছিল সেখানেই থমকে গেল। আর্যর শক্ত চোয়াল আরো শক্ত হয়ে গেল। রাগে তার হাতের রগগুলো দপ দপ করে কেঁপে উঠল। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পুষ্পর মুখের দিকে। পুষ্পর আঁকি যুগল ভিজে উঠলো এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল; যা দেখামাত্রই আর্য এক তীব্র যন্ত্রণায় নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিল।
আর্য টেবিল ছেড়ে ওঠার আগেই শেহনাজ সরকার ইশারায় ওকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন—
– “আর্য, খাবার শেষ করো।”
তিনি পুষ্পর চোখের পানি লক্ষ্য করে নিজের হাতের খাবারের প্লেটটা আলতো করে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর পরম মমতায় বাম হাত দিয়ে পুষ্পর গাল বেয়ে পড়া চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে, আবারও ভাতের এক লোকমা নিয়ে পুষ্পর মুখের সামনে ধরলেন। পুষ্পকে যন্ত্রণায় মুখ না খুলতে দেখে শেহনাজ সরকার নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—
– “পুষ্প, হা কর!”
পুষ্প শাশুড়ির কথামতো বাধ্য মেয়ের মতো মুখ খুলে খাবারটা মুখে নিয়ে চিবুতে লাগল। শেহনাজ সরকার পুষ্পকে পুরো খাবারটা খাইয়ে দিয়ে টিস্যু দিয়ে ওর মুখটা মুছে দিলেন। তারপর নিজে বাটি থেকে পানি নিয়ে হাত ধুয়ে নিলেন। এরপর তিনি একপলক টেবিলের সবার দিকে চোখ বুলিয়ে, সোজা মিনারা বেগমের দিকে নিজের ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অত্যন্ত গম্ভীর ও কড়া কণ্ঠে বললেন—
– “আপনি সম্পর্কে আমার বড়, আমি আপনাকে সেই হিসেবে যথেষ্ট সম্মান করি। কিন্তু সেই সম্মানের খাতিরে আমি কেবল এই একবারই চুপ করে থাকলাম; দ্বিতীয়বার কিন্তু আমি আর কোনো সম্মানের ধার ধারব না, এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন, শান্তিতে খান আর বেড়ান। কিন্তু আমার পুষ্পর দিকে যদি আর কখনো বাঁকা চোখে তাকান কিংবা কোনো বাঁকা কথা বলেন, তবে মনে রাখবেন—আমি নিজের অন্যায়ের জন্য নিজের ছেলেকে পর্যন্ত ছাড় দিই না, সেখানে আপনাকে আর নতুন করে কিছু বললাম না।”
তিনি একটু দম নিয়ে পুষ্পর দিকে তাকিয়ে কোমল সুরে বললেন—
– “পুষ্প, উপরে যা।”
পুষ্প বাধ্য মেয়ের মতো টেবিল ছেড়ে ধীরপায়ে উপরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এদিকে মিনারা বেগমের মুখটা অপমানে কালো হয়ে গেল। আর ওপাশে বসা নিশির মাথায় যেন আচমকা এক বিশাল আকাশ ভেঙে পড়ল! ছেলের বউ মানে আর্যর বউ? আর্য বিয়ে করেছে? কবে, কখন? বাড়িতে তো ছোটমা বা কাউকে কখনো এই বিয়ের ব্যাপারে একটা কথাও বলতে শুনিনি! তার মানে এই সাধারণ মেয়েটাই আর্যর বিবাহিত স্ত্রী? আর সেই জন্যেই আর্যর মনে ওই মেয়ের জন্য এত তীব্র অধিকার বোধ, আর শেহনাজ সরকার এত আদিখ্যেতা!
রেশমা নিজের শাশুড়ির এমন বেফাঁস কথায় লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইল। সে মূলত এই কারণেই শাশুড়িকে নিয়ে বাপের বাড়িতে অর্থাৎ সরকার বাড়িতে খুব একটা আসতে চায় না। কারণ সরকার বাড়ির মানুষের চিন্তাভাবনা আর তার শ্বশুরবাড়ির মানুষের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ আলাদা। আর ওনার বড় ভাবী শেহনাজ সরকার তো অন্যায্য কথা কোনোদিনই মেনে নিতে পারেন না; তবুও আগে রেশমার মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক সময় চুপ করে থাকতেন। কিন্তু আজকে মিনারা বেগম সরাসরি পুষ্পর মা-বাবার শিক্ষা নিয়ে কটু কথা বলায় শেহনাজ সরকার আর কিছুতেই চুপ থাকতে পারলেন না।
শেহনাজ সরকার একপলক সবার দিকে তাকিয়ে সবাইকে খাওয়া শেষ করতে বললেন। কিন্তু মিনারা বেগম অপমানে হাত ধুয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে চলে গেলেন। ওনার পেছন পেছন রেশমাও নিজের শাশুড়িকে সামলাতে চলে গেল। এরপর একে একে খাওয়া শেষ করে বাকি সবাইও টেবিল থেকে উঠে গেলেন।
খাবার টেবিলে তখন শুধু বসে আছেন আমজাদ সরকার, আহমেদ সরকার আর জেনিফার সরকার। আমজাদ সরকার এবার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা নরম গলায় বললেন—
– “বিষয়টা কি অন্যভাবে সামলানো যেত না শেহনাজ? বাচ্চারা টেবিল থেকে চলে যাওয়ার পরে ওনাকে একা ডেকে বুঝিয়ে বলতে পারতে! এখন এই কথাগুলো নিয়ে ওনারা বাড়ি ফিরে রেশমাকে কত কথা শোনাবেন, ভেবেছ?”
স্বামীর কথা শুনে শেহনাজ সরকার একবার টেবিলে বসা তিনজনের দিকেই তাকালেন। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত গলায় বললেন—
– “আমি ওনাকে কোনো অপমান করিনি আমজাদ, শুধু সাবধান করেছি যাতে পরবর্তীতে উনি আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলার সাহস আর না পান। আর যদি বলো বাচ্চাদের সামনে কথাগুলো বলার কারণ, তবে শোনো—উনি নিজেও কিন্তু সবার সামনেই পুষ্পর শিক্ষা নিয়ে কথা তুলেছেন। আমি যদি বাচ্চারা যাওয়ার পরে ওনাকে আড়ালে কথাগুলো বলতাম, তবে এই বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েরা এটাই শিখত যে অন্যায় কথা শুনেও চুপ করে থাকতে হয়। আমি যে আড়ালে গিয়ে প্রতিবাদ করেছি, সেটা তো ওরা দেখতে পেত না! এখন ওরাও শিখল যে ভবিষ্যতে অন্যায়ের মুখোমুখি হলে কীভাবে মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করতে হয়। আর আরেকটা কথা—আমি যদি পুষ্পর সামনে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ না করতাম, তবে মেয়েটার মনের ভেতর একটা স্থায়ী ভয় দানা বেঁধে যেত। ও ভাবত, এত বড় অপবাদের পরেও তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই! ভবিষ্যতে কেউ ওকে কথা শোনালেও ও আর কোনোদিন মাথা তুলে জবাব দিতে পারত না, কারণ ও ভাবত ওর পাশে তো কেউ থাকবেই না। এই ভয়টা ওর আত্মবিশ্বাসকে চিরতরে শেষ করে দিত, যা আমি বেঁচে থাকতে কোনোদিন হতে দেব না। আমি বেঁচে থাকতে ওকে যথেষ্ট স্বাবলম্বী করে তুলব এবং আমি যে সবসময় ওর পাশে আছি—এই ভরসাটুকু দিয়েই ওকে আমি বড় করব।”
শেহনাজ সরকারের এই অকাট্য ও দূরদর্শী কথাগুলো শোনার পর আমজাদ সরকার একদম চুপ করে গেলেন। তিনি ভালো করেই জানেন, ওনার স্ত্রী সবসময় একদম ধ্রুব সত্যি কথাই বলেন। তিনি মানুষকে যথেষ্ট সম্মান দেন ঠিকই, কিন্তু সেই সম্মানের দোহাই দিয়ে কোনোদিন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। কিন্তু তাও, এখন বোনের শ্বশুরবাড়ির লোক নিজের বোনকে কথা শোনাবে—কেবল এই পারিবারিক ভাবনা থেকেই তিনি কথাটা স্ত্রীকে বলেছিলেন।
আমজাদ সরকারকে ওভাবে মুখ কালো করে বসে থাকতে দেখে শেহনাজ সরকার আবারও বললেন—
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৬ (২)
– “যদি তোমার এখনও মনে হয় আমি ভুল বলেছি এবং তোমার বোনের শাশুড়ি আমার বাড়িতে বসে আমার মেয়ের শিক্ষা নিয়ে আবারও কথা তোলার অধিকার রাখেন, তবে তোমার বোনের শাশুড়ি যতদিন এই বাড়িতে আছেন, ততদিন আমি পুষ্পকে নিয়ে আমার ল’ ফার্মের পাশের বাংলোতে চলে যাচ্ছি। তোমার বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকদের বেড়ানো শেষ হলে আমাকে জানিয়ে দিও, আমি পুষ্পকে নিয়ে চলে আসব। কারণ, আমার চোখের সামনে পুষ্পর ব্যাকগ্রাউন্ড বা শিক্ষা নিয়ে কেউ বাঁকা কথা বলবে আর আমি তার উচিত জবাব দেব না—সেটা অসম্ভব! আর তুমি খুব ভালো করেই জানো আমজাদ, আমি অন্যায়কে কোনোদিন প্রশ্রয় দিইনি, আর ভবিষ্যতেও দেব না।”
