Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৬

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৬

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৬
রুপা

পুষ্পর কলেজের প্রথম দিন খুব ভালো কেটেছে। যে পুষ্পর কারো সাথে কথা বলতে বা মিশতে ভয়ে বুক দুরুদুরু করে কাঁপে, সে-ও সারা নামের মেয়েটার সাথে বেশ মিশে গেছে। এতে অবশ্য বেশি এফোর্ট দিয়েছে সারা; সে পুষ্পকে নিজে থেকে এটা-ওটা তদারকি করে দেখাচ্ছে। সারা আগে ছয় মাস ক্লাস করার পর বাকি ছয় মাস ক্লাস করেনি, এ কারণে তার এক বছর গ্যাপ গেছে। তাই সে আবার প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে পুষ্পর সাথে। এটা নিয়ে সে কথা বলছে আর পুষ্প নিজে বেশি কথা না বললেও মন দিয়ে তা শুনছে, পাশাপাশি আশেপাশের পরিবেশটাও লক্ষ্য করছে।
কলেজ ছুটি হওয়ার পরে সারা আর পুষ্প দাঁড়িয়ে আছে কলেজের গেটের বাইরে। সারা পুষ্পর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

– “পুষ্প, তুই যাবি না?”
পুষ্প নরম গলায় জবাব দিল—
– “নাহ, ফুফুমণি বলেছেন কলেজ ছুটি হওয়ার পরে গেটের পাশে দাঁড়াতে। বাড়ির লোক অথবা ফুফুমণি আমাকে নিতে আসবে।”
– “তোর ফুফুমণি আসবে কেন? তোর আব্বু কোথায়?”
পুষ্প কথাটা শুনে মন খারাপ করে বলল—
– “আব্বু-আম্মু কেউ নেই। ওরা অনেক আগেই আল্লাহর কাছে চলে গেছে। ফুফুমণির বাড়িতে থাকি আমি।”
কথাটা শুনে সারার মন খারাপ হয়ে গেল। সে অপরাধী সুরে বলল—
– “সরি রে, আমি জানতাম না আঙ্কেল-আন্টি নেই। কষ্ট পাস না, আমি আছি না!”
পুষ্প কিছু মনে করল না, দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে হাসল। তারপর বলল—
– “তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তুই যা, আমি এখানে দাঁড়াতে পারব। একটু পরে বাড়ির লোক এসে যাবে।”
– “কী বলছিস! আজ থেকে আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড—যাকে বলে কলিজার বান্ধবী! তোকে ফেলে আমি যাব? কোনদিন না! তোর বাড়ির লোক আসলে তাদের হাতে তোকে তুলে দিয়ে তারপর আমি বাড়িতে যাব।”
পুষ্প বিনিময়ে মৃদু হাসল।
এর মধ্যে ওখানে এসে হাজির হলেন শেহনাজ সরকার! গাড়ি থেকে নেমে পুষ্পর কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সারার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকালেন। কিন্তু এতে মোটেও ঘাবড়াল না সারা; সে পুষ্পর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—

– “পুষ্প, ইনি কে?”
– “আমার ফুফুমণি!”
– “আসসালামু আলাইকুম, আন্টি!”
শেহনাজ সরকার সালামের উত্তর দিয়ে পুষ্পর দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই সারা বলে উঠল—
– “আন্টি, আমি সারা; পুষ্পর বান্ধবী!”
কথাটা শুনে শেহনাজ সরকার সারার দিকে তাকিয়ে বললেন—
– “একদিনে বান্ধবী হয়ে গেলে?”
– “আন্টি, বান্ধবী হতে অনেক সময় লাগে না। যাকে প্রথম দেখায় ভালো লাগে, তার সাথেই সময় কাটানো যায়। আর পুষ্পকে দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে, তাই পুষ্পকে আমার বান্ধবী বানিয়ে নিলাম। সে বান্ধবী না বানালেও আমি বানিয়ে নিয়েছি। এখন ওর খারাপও আমি দেখব, ভালোও আমি দেখব। আসি পুষ্প, সাবধানে যাস। আগামীকাল এসে আবার তোর সাথে গল্প করব, বাই বাই!”
বলেই পুষ্পর থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে গেল। শেহনাজ সরকার নিজের অভিজ্ঞ চোখে মেয়েটাকে দেখলেন। তিনি বুঝতে পারলেন মেয়েটা চঞ্চল ও ডানপিটে হলেও খারাপ নয়; নিজের জিনিস আগলে রাখতে পারবে। আর পুষ্প ওকে বান্ধবী বানায়নি, সারাই পুষ্পকে বান্ধবী বানিয়েছে এবং ওকে আগলে রাখবে। মেয়েটা ভালো।
তিনি পুষ্পর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, তারপর তার হাত ধরে গাড়িতে নিয়ে বসালেন এবং বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আজকে কেসের বিষয়ে তিনি বাড়িতে বসেই স্টাডি করবেন, তাই তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন এবং সাথে পুষ্পকেও নিয়ে যাচ্ছেন।

আর্য অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে এসে গোসল সেরে বেরিয়ে আসল। পরনে লেমন কালারের টিশার্ট, সাথে সাদা ট্রাউজার, যা তার বলিষ্ঠ দেহের ভাঁজে ভাঁজে লেগে আছে। গায়ের রঙ ফর্সা হওয়ায় লেমন কালারটা তার শরীরের সাথে বেশ ফুটে উঠেছে। মাথা মুছতে মুছতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নিল। এরপর ল্যাপটপ নিয়ে বসল, অফিসের প্রজেক্ট দেখতে হবে।
হঠাৎ হাসির আওয়াজ শুনে আর্যর হাত থেমে গেল। সাথে সাথে আর্যর চোখের সামনে ভেসে উঠল বাগানে খরগোশের সাথে কথা বলতে বলতে পুষ্পর হাস্যোজ্জ্বল গোলগাল মুখটা। হ্যাঁ, সেদিন ঠিক এই হাসির শব্দেই সে থমকে গিয়েছিল। আর্য মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেই নিজেকে ধমক দিল— “হোয়াট হ্যাপেন্ড আর্য? কী হচ্ছেটা কী? ওই মেয়ের কথা কেন ভাবছিস? এসবে জড়াস না, ধ্বংস হয়ে যাবি।” তবুও বারবার পুষ্পর হাসির শব্দে তার মুখটাই ভেসে উঠতে লাগল আর্যর চোখের সামনে। আর্য এবার বিরক্ত হয়ে, রেগে খাট থেকে উঠে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল—মেয়েটাকে এক ধমক দিয়ে সোজা করতে হবে।
বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে দেখল, পুষ্প বারান্দায় বসে তুলতুল আর তুলিকে গাজর খাওয়াচ্ছে, আর সারাদিন কলেজে কী কী করেছে সে-সব কিছু বলছে আর হাসছে। সেটা দেখে আর্যর শত বিরক্তির মাঝেও চোখ শীতল হয়ে গেল। পুষ্পর পরনে একটা কফি কালারের থ্রি-পিস, যেটা তার ফর্সা গায়ের সাথে বেশ লাগছে। হঠাৎ আর্যর চোখ যায় পুষ্পর বুকের ক্লিভেজের দিকে; পুষ্প সামনের দিকে ঝুঁকে খরগোশ দুটোকে গাজর খাওয়াচ্ছে, তার অন্যদিকে কোনো খেয়াল নেই। ওড়নাটা গলায় ঝোলানো, জামার গলা বড় হওয়ায় ভেতরের অংশ দেখা যাচ্ছে, সেদিকে পুষ্পর কোনো হুশ নেই। ফর্সা গায়ের সাথে সেই অংশটি দেখে আর্য একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই সে চট করে দৃষ্টি সরিয়ে নিল, সাথে ধমকে উঠল—

– “এই মেয়ে! এখানে কী করছ?”
আর্যর গলার আওয়াজ শোনার সাথে সাথে পুষ্প তুলি আর তুলতুলকে বুকে জড়িয়ে সিঁটিয়ে গেল। হাসির জায়গায় ভিড় করল একরাশ ভীতি, যা দেখে আর্যর মেজাজ আরও বিগড়ে গেল। সে পুষ্পকে এভাবে জড়োসড়ো হয়ে যেতে দেখে আবারও ধমকে উঠল—
– “এভাবে হাসছ কেন? আমার ডিস্টার্ব হচ্ছে বুঝতে পারছ না? বেরিয়ে যাও এখান থেকে, আমি কাজ করব যাও! আর একবার আমার সামনে যেন তোমাকে না দেখি।”
আর্যর ধমকের বিপরীতে কিছু বলার সাহস নেই পুষ্পর। সে খরগোশ দুটোকে কোলে তুলে নিয়ে উঠে চলে যেতে লাগল, এতে আর্য আরও রেগে গেল—
– “স্টপ!”
পুষ্প দাঁড়িয়ে গেল সত্যি সত্যি। আর্য তিরতিরে মেজাজ নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে এসে পুষ্পর ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে দিল, যাতে কিছু দেখা না যায়। আবারও গম্ভীর গলায় বলল—
– “ভুলেও ওড়না যেন না সরে।”
পুষ্প ভয়ে কিছু না বলে গুটি গুটি পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সে এখন যাবে সিমরানের রুমে। এদিকে পুষ্প বেরিয়ে যেতেই আর্য খাটের ওপর বসে নিজের চুল খামচে ধরল। তার সাথে হচ্ছেটা কী? তার কেন এমন দমবন্ধ লাগছে? সে উঠে বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে নিজের ঠোঁটের ভাঁজে চেপে ধরল। একের পর এক টান দিয়ে ধোঁয়া ওড়াতে লাগল সে।

কেটে গেছে আরো সাতদিন। পুষ্প নিয়ম করে কলেজে যাচ্ছে; শেহনাজ সরকার নিজে তাকে নিয়ে আসেন, আর তিনি আনতে না পারলে লোক দিয়ে নিয়ে আসেন। আর আর্য, সে নিজের নিয়মে অফিস যায় আর পুষ্পর থেকে দূরে দূরে থাকে। সে ভেতরে ভেতরে বেশ ডিস্টার্ব বোধ করে, তাই মাঝে মাঝে ড্রিঙ্ক করে এসে পুষ্পকে অপমান আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে; মনে হয় একজনের রাগ সে আরেকজনের ওপর ঝাড়ছে। আর পুষ্প সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে রাতে নীরবে কাঁদে, সকাল হলে আবার সবার সাথে স্বাভাবিক হয়ে কথা বলে।
যেটা দেখে আর্য অবাক হয়। তার এত কিছু বলার পরেও মেয়েটা কীভাবে এত স্বাভাবিক আচরণ করে—সেটাই এখন আর্যকে ভাবায়। সে কি সত্যিই ভুল করছে? কিন্তু তখনই ভেসে ওঠে অতীতের কিছু দৃশ্য; মুহূর্তেই ভাবনা শেষ হয়ে যায়, সে আবার কঠোর হয়ে যায়। কিন্তু এতেও তার মনের অস্থিরতা কমে না, তাই সে আজকাল বেশি বেশি ড্রিঙ্ক করে বাড়িতে আসে। তবে এখন ড্রিঙ্ক করার পরেও সে খুব একটা মাতাল হয় না; যাকে বলে খেতে খেতে সয়ে গেছে, অভ্যেস হয়ে গেছে। মাতাল হওয়ার পরেও সে যা বলে বা করে, সব তার মনে থাকে!
এই তো দুদিন আগে, সে ড্রিঙ্ক করে গভীর রাতে—একটা বাজে আসার পরে দরজায় দাঁড়িয়ে শুনতে পায় পুষ্পর কিছু কথা। সে জায়নামাজে মোনাজাতে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলছে—

– “আল্লাহ, তুমি আমাকে আম্মুর কাছে নিয়ে যাও না! আমার আর সহ্য হচ্ছে না। এইটুকু বয়সে আব্বু-আম্মুকে নিয়ে গেছ তোমার কাছে, তাহলে আমাকে কেন নিয়ে গেলে না তাদের সাথে? তোমার সৃষ্টি এই পৃথিবী বড্ড নিষ্ঠুর; এখানে বাবা-মা ছাড়া নিঃস্বার্থভাবে কেউ ভালোবাসে না। আমার জীবনে এত কষ্ট কেন দিয়েছ? আমি এই জীবন নিয়ে বাঁচতে চাই না। আমাকে নিয়ে যাও না আমার আব্বু-আম্মুর কাছে!”
এভাবে কতক্ষণ কান্না করেছে পুষ্প, আর আর্য সেসব শুনে দরজায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সত্যি, কী এমন কষ্ট এই মেয়ের জীবনে? পুষ্পর জীবন বা নিজের নানার বাড়ি সম্পর্কে আর্য কিছুই জানে না। শেহনাজ সরকার ভালোবেসে বিয়ে করায় নানার বাড়ির কেউ এ বিয়ে মেনে নেয়নি, শুধু পুষ্পর বাবা-মা ছাড়া। তাই নানার বাড়িতে আর্য কোনোদিন যায়ওনি। সে শুধু জানে তার দুটো মামা আছে; আর্যর এ নিয়ে কোনো কৌতুহল ছিল না, তাই কোনোদিন জানতেও চায়নি। তার ওপর আবার সে আঠারো বছর বয়সে প্যারিস চলে যায় পড়াশোনা করতে, ফিরে আসে সাত বছর পর। ফিরে আসার পর এক বছর সবকিছু ভালোভাবেই কাটছিল তার—অফিসে যাওয়া, নতুন কাজ শেখা আর তার বেস্ট ফ্রেন্ড ইয়াসারের সাথে সময় কাটানো। কিন্তু একটা ঘটনা সবকিছু বদলে দিল। সে তো জানেও না পুষ্প বড় মামার মেয়ে নাকি ছোট মামার মেয়ে! পুষ্পর কথা শুনে সে শুধু বুঝতে পারল পুষ্প বড় মামার মেয়ে, কারণ মায়ের মুখে সে শুনেছিল বড় মামা আর মামি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, আর তাদের মেয়ে পুষ্প। কিন্তু সে এটা বুঝতে পারে না, এই ছোট মেয়েটা নিজের মৃত্যু কেন চাইছে?

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৫

পুষ্প জায়নামাজ তুলে একটা বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। তার কিছুক্ষণ পরে আর্য রুমে ঢুকে দেখে ঠান্ডা মেঝেতে গুটিসুটি মেরে কুঁজো হয়ে শুয়ে আছে পুষ্প। আর্য একদৃষ্টে পুষ্পর দিকে তাকিয়ে রইল। ড্রিম লাইটের হলুদ রঙের আবছা আলোয় পুষ্পর মুখটা কী নিষ্পাপ লাগছে! অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেদিনের পরের দিন সকালেও আর্যর সব মনে ছিল—রাতের সব কথাগুলো। সে আরও অস্থির হয়ে ওঠে এবং পুষ্পকে আরও বেশি এড়িয়ে চলে; সে কিছুতেই এসব মায়ায় জড়াতে চায় না।

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here