অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১১
ফাহিমা ইসলাম
আকাশ আজ যেন প্রাচীন কোনো অভিশাপের নীরব উন্মোচন অন্ধকারের কুহেলিকা ছিঁড়ে বৃষ্টিধারার অবিরাম অবতরণ। প্রকৃতির প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বইছে এক উন্মত্ত স্পন্দন, যেন বহুদিন ধরে স্তব্ধ হয়ে থাকা পৃথিবী আজ নিজের অন্তর্লীন আর্তনাদকে জলধ্বনির আবরণে প্রকাশ করছে। রৌদ্রিক বসে আছে তার প্রশস্ত রুমে। অভিজাত নিস্তব্ধতার এক গুমোট কারাগারে। সামনে খোলা ল্যাপটপের নীলাভ আলোকরেখা তার কঠোর মুখাবয়বে ফেলেছে এক শীতল দীপ্তি। আঙুলগুলো চলমান, রুমে এই মুহুর্তে শুধু সেই আছে, রোদেলা আর তূর্ণা বাকিদের সঙ্গে। সেদিনের পর আজকে নিয়ে দুইদিন হলো। মেয়েটা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, সেদিনের ঘটনা মেয়েটাকে একদম নিশ্চুপ বানিয়ে দিয়েছিল আরও। তূর্ণা এমনিও অন্যদের তুলনায় অনেকটাই শান্ত, এমন অবস্থার মানুষটা যেমন সবসময় জেদ, হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকে তূর্ণা সেটার বিপরীত। মেয়েটার চঞ্চলতাকে বন্দী করে দেওয়া হয়েছে এক আতঙ্কে ভড়া ছায়ায়!
কিন্তু মন তার স্থির রইলো না, চিন্তার প্রবাহ হঠাৎ কাজ থেকে ছিটকে বের হয়ে কোথাও গিয়ে হোঁচট খেলো। বাইরে ঝড়ের গর্জন, জানালার কাঁচে নিরন্তর বৃষ্টির প্রহার। ভোর থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিলো, কিন্তু সেটা এখন মুষলধারের রূপ নিয়েছে। হঠাৎই নিস্তব্ধতার বুক চিরে ভেসে এলো এক চিৎকার। এতক্ষণ বৃষ্টি ঝিরিঝিরি শব্দ ছাড়া অন্য শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। এই চিৎকার কোনো ভয়ের আর্তনাদ নয়; বরং এক অদ্ভুত উল্লাসে ভেজা, বুনো উন্মাদনার আহ্বান। রৌদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে উঠল। কৌতূহল, বিরক্তি, আর অজানা এক টানে সব মিলিয়ে তাকে টেনে নিয়ে গেল বারান্দায়। বাইরে পা রাখতেই ঝড় তাকে আঘাত করল নির্দয় আলিঙ্গনে। চলতে থাকা বৃষ্টির কণাগুলো তার উপর হামলে পরছে।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। বৃষ্টিস্নাত বাগানের মাঝে, জলকাদার উচ্ছৃঙ্খল ছিটেফোঁটার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণা। না দাঁড়িয়ে নয়, সে নৃত্যে মগ্ন। তার এলোমেলো কেশরাশি বৃষ্টির স্রোতে ভিজে গিয়ে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, ফ্যাকাসে মুখাবয়ব অদ্ভুত এক দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যেন ভেতরের সমস্ত শূন্যতা আজ বৃষ্টির জল দিয়ে পূর্ণ করতে চাচ্ছে। তার হাসি অসংলগ্ন, তবুও নির্মল বিকারগ্রস্ত, তবুও অদ্ভুতভাবে পবিত্রে মেশানো। বাগানে শুধু তূর্ণা রয়েছে এমনটা নয়, বাগানে সবাই রয়েছে। সকলেই একই উন্মাদনায় মগ্ন, কিন্তু রৌদ্রিকের গম্ভীর নেত্রযুগল মুক্তপাখির মত বৃষ্টিতে উল্লাস করা তূর্ণার উপর আবদ্ধ।
তূর্ণা হাসছে সে যেন নিজের ভেতরের সমস্ত অন্ধকারকে ছিন্ন করে এক উন্মাদ আনন্দে ভাসছে।রৌদ্রিক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে কোনো প্রেমের কম্পন জাগলো না, কোনো মমতার নরম আবেশও এলেও না তবু এই দৃশ্য তাকে অদ্ভুতভাবে আচ্ছন্ন করে ফেললো। এটা কী? করুণা বিস্ময়? নাকি এক অজ্ঞাত টান, যার কোনো সংজ্ঞা তার যুক্তিবাদী মন খুঁজে পাচ্ছে না। গায়ে জড়ানো শাড়িটা একদম দেহাবশেষে লেপ্টে গেছে, একরাশ স্নিগ্ধতা এসে ভর করেছে তূর্ণার মুখ জুড়ে। আলাদা এক দীপ্তিময় স্নিগ্ধতা! মেয়েটা মুখ জুড়ে অসম্ভব মায়ায় জড়াজড়ি। মেয়েটা কি শুরু থেকেই এতটা মায়াবী, এতটা স্নিগ্ধতা ভরপুর ছিলো? কই আগে তো দেখেনি, তাহলে আজকে এত নতুন লাগছে কেনো? রৌদ্রিক শান্ত ভাবে ভিজতে থাকা তূর্ণাকে দেখছে, বৃষ্টি যে তার বিলাসীনি হাওয়া দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে সেটা তার বোধগম্য হওয়ার পরও ঠায় রইলো।
বাকিদের সঙ্গে সমান তালে তূর্ণা আনন্দে মেতে উঠেছে। তার হুস নেই আশেপাশে কি হচ্ছে। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তার গুরুগম্ভীর নেত্রপল্লব তীক্ষ্ণ ভাবে তাক করে তাকিয়ে রয়েছে। তূর্ণা সবার সঙ্গে আবারও ঘুরতে শুরু করল। তার পদচারণা আর পাদচারণের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। তবুও সেখানে এক অদ্ভুত মুক্তির আর্তি রয়েছে। বৃষ্টির জল তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, নাকি তা অশ্রু তা বোঝার উপায় নেই। তার ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে উঠছে, যেন আনন্দ আর যন্ত্রণার সীমারেখা কোথাও গিয়ে একাকার হয়ে গেছে। হঠাৎই তার পা পিছলে মাটিতে পরে গেল। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় সবাই অবাক হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি করে তূর্ণার দিকে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ তুমি ঠিক আছো তো ভাবি?”
তূর্ণা কোনো জবাব দিলো না, নিশ্চুপ হয়ে রইলো। উপরে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রিকের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দা থেকে বের হয়ে সোজা নিচে চলে গেলো, বৃষ্টি কমে এসেছে এবার। ভেজা বাগানে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে তূর্ণার নিকট এগিয়ে গেল দ্রুত পায়ে, প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত তাড়নার সঙ্গে। তূর্ণার শরীর এখন ভিজে মাটির উপর আছড়ে পড়ে আছে। রৌদ্রিককে এখানে দেখে বাকিরা একটু ঘাবড়ালো। কারণ রৌদ্রিক পছন্দ করে না এই ভাবে বৃষ্টিতে ভেজা, কারণ বৃষ্টিতে ভিজলেই সব’কটার জ্বর আসবে। রৌদ্রিক সকলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ তোদের বারণ করেছি না বৃষ্টিতে ভিজতে না। তাহলে?”
সবাই কাচুমাচু চোরা দৃষ্টিতে রৌদ্রিকের গাম্ভীর্যের ঠাসা মুখশ্রীখানা দেখে নিলো। রৌদ্রিক সকলের দিকে একনজর তাকিয়ে কড়া আদেশে বলে-
“ সব’কটা এই মুহুর্তে ভিতরে যাবি, আর হট ওয়াটার দিয়ে সাওয়ার দিবি। সময় একমিনিট!”
রৌদ্রিকের কথা শেষ হওয়া মাত্রই, সকলেই ভেজা শরীর নিয়ে সোজা বাড়ির ভিতরে ছুটে যায়। তূর্ণা ভয়ার্ত চোখে রৌদ্রিকে দিকে তাকিয়ে আছে, রৌদ্রিক সকলের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তূর্ণার দিকে তাকালো। অতঃপর ভ্রু কুঁচকিও তূর্ণার উদ্দেশ্যে বলে-
“ তোমাকে কি নতুন করে দাওয়াত দিতে হবে? এত লাফাচ্ছিলে কেনো? ব্যথা পেয়ে খুব ভালো লাগছে বুঝি?”
রৌদ্রিকের কথায় তূর্ণার চোখ ছলছল করছে। ছুলে যাওয়া হাতটা বেশ পিরা দিচ্ছে! কাউকে তখন বলেনি কিন্তু হাতে প্রচন্ড জ্বালাপোড়া করছে। রৌদ্রিক হাঁটু গেড়ে বসে আস্তে করে তূর্ণা ডান’হাতটা উঁচু করে ধরলো। বৃষ্টির স্নিগ্ধ পানিতে সব ময়লা ধুইয়ে গিয়ে লাল টসটস করছে হাতখানা। রৌদ্রিক হাতের দিকে তাকিয়েই বলে-
“ মেডিসিন লাগালে সেড়ে যাবে চিন্তা কর না। এখন উঠ, নাহলে ঠান্ডা লাগবে।”
তূর্ণা ছলছল চোখে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তার ভেজা চুলের ফাঁক দিয়ে ছলছল করা চোখদুটি রৌদ্রিকের চোখের সঙ্গে মিলিত হলো। সেই দৃষ্টিতে আর আগের মতো উন্মাদ উচ্ছ্বাস নেই; বরং সেখানে জমে উঠেছে এক অদ্ভুত ক্লান্তি, এক গভীর, অব্যক্ত শূন্যতা।
তূর্ণা ক্ষীণ, প্রায় ভাঙা কণ্ঠে বলে-
“আপনি, আপনি কি শুনতে পান না ওদের?”
রৌদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে উঠল।
“কার কথা বলছ?”, ‘তার কণ্ঠ স্বাভাবিকের তুলনায় নিচু, ভারী।
তূর্ণা মৃদু হেসে উঠল একটা শীতল, অসংলগ্ন হাসি।
তার আঙুল ধীরে ধীরে উঠে এসে আকাশের দিকে নির্দেশ করল। তারপর হালকা হাসি মুখে বলে-
“ওরা, ওরা ডাকে সবসময় ডাকে, বৃষ্টি নামলেই বেশি জোরে ডাকে।”
রৌদ্রিক কিছু বলল না, এটা তূর্ণার মনের ভ্রম ছাড়া কিছুই নয়। রৌদ্রিক ভাঙ্গতে চাইলো না এই ভ্রম, থাকনা কিছু ভ্রম যা মানুষকে নিজের মধ্যে সুখ দেয়। সেই ভ্রম ভাঙার থেকে থাকাই ভালো।তাই যুক্তির সমস্ত ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে কণ্ঠে অনিচ্ছুক দৃঢ়তা মিশিয়ে বলে-
“ভিতরে যেতে হবে।”
তূর্ণা কোনো প্রতিবাদ করল না।
অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে গেল সে। যেন তার সমস্ত উন্মাদনা হঠাৎ করেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে রৌদ্রিকের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। ভেজা পায়ের ছাপ রেখে যেতে লাগল মাটির উপর, যা মুহূর্তেই বৃষ্টির জলে মুছে যাচ্ছে। জবা সিকদার দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি এতক্ষণ ধরে রৌদ্রিক আর তূর্ণাকেই দেখছিলেন। রৌদ্রিকের তূর্ণার প্রতি এত নরম হওয়ায় বিষয়টা খুব ভালো করে লক্ষ্য করেছে। রৌদ্রিক বরাবরই এমন, যে দায়িত্ব একবার নিবে সেটা নিজের সবটুকু দিয়ে পালন করবে। রৌদ্রিক জবা সিকদারকে দেখে কিছু বললো না, তূর্ণাকে নিয়ে সোজা উপরে চলে গেলো। বিকেলে দিকে তূর্ণাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাবে আবার।
তূর্ণার কোলে রোদেলা বসে আছে, একটু পর বাহিরে যাবে। সঙ্গে রোদেলাও যাবে রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে-
“ আমলা, বইলে গেতে বলুন কিতবো। সাতে পুতুও কিনবো।”
তূর্ণা কিছুই বুঝলো না, তূর্ণা ঠোঁট উঠিয়ে বলে-
“ পুতুল তুমি কি বল আমি তো বুঝতেই পারি না। আমাকে তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, ওই ডাক্তার খুব পঁচা ছিল। বর কে কত কথা শুনালো, তাও আমার জন্য।”
রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ কে কতা শুতিয়েছে? ডাতাল কি তুনা মা?”
এই কথাটুকু বুঝতে সক্ষম হলো তূর্ণা। সে মন খারাপ করে বলে-
“ ওই ডাক্তার, যেখানে গেলে আমি ঠিক হয়ে যাবো সে। ডাক্তার হলো সুঁই দেওয়ার মানুষ। ওরা ইয়া বড় বড় সুঁই দেয় খুব ব্যথা লাগে জানো। তারপর আরও তিতা তিতা ঔষধ খেতেও দেয়। তাদেকে ডাক্তার বলে।”
তূর্ণা কথা শুনে রোদেলা এমন ভাবে মাথা নাড়ালো যে খুব ভালো করে বুঝেছে জিনিসটা। পরনে তার বেবি পিংক রঙের ফ্রক, তূর্ণা হাত দিয়ে রোদেলার চুলের ভাঁজে হাত ঢুকিয়ে নড়াচড়া করে দিতে থাকে। রোদেলা চুল বড় না, হালকা হালকা ঝাঁকড়া চুল। এই ঝাঁকড়া চুলের কারণে রোদেলাকে দেখতে আরও সুন্দর লাগে।
সেখানে উপস্থিত হলেন রোকসানা খাতুন। রোকসানা খাতুনকে দেখে তূর্ণা একদম চুপ হয়ে গেলো, রোকসানা খাতুন তূর্ণাকে তীক্ষ্ণ ভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিলেন। রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ওর সাথে কি করছিলে?”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে কোনো রকমে জবাব দেয়-
“ ক.কিছু না।”
রোকসানা খাতুন আবারও রুক্ষ গলায় বলে-
“ এমনই যাতে থাকতে দেখি, ওকে যদি কোনো প্রকার আঘাত করেছো তো তোমার খবর আছে।”
তূর্ণা শুধু মাথা নাড়ালো ভয়ে ভয়ে, এদিকে রোদেলা রোকসানা খাতুনের দিকে তাকিয়ে হালকা জেদি স্বরে বলে-
“ তুনি পুচা,তুনি পুচা! তুনা মাকে বুকছ কেনু?”
রোকসানা খাতুন এবার নরম চোখে রোদেলা দিকে তাকালেন। শান্ত স্বরে বলে-
“ বকলাম কই? তোমার এই নতুন মা তো মানসিক রোগী। তোমাকে যাতে ব্যথা না দেয় তাই বললাম।”
“ তুনা মা বেতা দেয় না, তুনা মা অন্নেক ভালু।”
রোকসানা খাতুন আর কিছু বললেন না। তূর্ণার সঙ্গে রোদেলা বেশ ভাব হয়ে গেছে। কেউ কিছু বললেই এইভাবে প্রতিবাদ জানাবে, কিছু না বুঝলেও এতটুকু বোঝে তূর্ণার সঙ্গে রাগী ভাবে কথা বলছে। আর সে তো বোঝে কোনটা ভালোবাসার ডাক আর কোনটা রাগী ডাক।
এর মধ্যে ফোনে কথা বলতে বলতে রৌদ্রিক আসে। রোকসানা খাতুন নাতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন-
“ ওরে ডাক্তারের কাছে নিতাছোস? ঠিক হইবো তো ওয়? নাকি পাগলই থাকবো আজীবন?”
রোকসানা খাতুনের কথা শুনে রৌদ্রিক তাড়াতাড়ি ফোনে কথা শেষ করে। ফোনটা পকেটে পুরে নিলো, তারপর একবার বসে থাকা তূর্ণা আর রোদেলাকে দেখে শান্ত কণ্ঠে বলে-
“ নানু প্লিজ পাগল শব্দটা ব্যবহার না করলে হয় না। ওর সমস্যাটা কোথায় আমরা সেটা জানি না, আর মানসিক অসুস্থতাকে ‘পাগল’ বলা যায় না। যদি ওর ভাগ্যে সুস্থতা থাকে তাহলে ও সুস্থ হবে।”
রোকসানা খাতুন নাতির কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি বেজায় হয়ে বলে-
“ সুস্থ না হইলে এরে ছেড়ে দিবি তুই। এমন অসুস্থ মানুষের সাথে আজীবন কাটাবি কিভাবে? রোদেলা বড় হইবো, আর তো আরও সন্তান হইবো তাই না সেইগুলাও যদি এর মত পাগল হয় তখন?”
রোকসানা খাতুনের কথায় রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-
“ দাদি সবকিছু এত আগাম ভাবছো কেনো? কে বলেছে পাগল হলে তার সন্তানও পাগল হবে? আর আমি ওকে সুস্থ এই জন্য করতে চাইছি না যে আমার আরও সন্তানের প্রয়োজন। আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব, তাই এইসব চিন্তা বাদ দাও।”
“ তোর এই ভালোমানুষিই তোকে শেষ করবে দেখিস। তোকে বুঝিয়ে লাভ নেই, যা ইচ্ছে কর। ”
বলেই তিনি চলে গেলেন। এদিকে তূর্ণা নীরবে শুধু মাথা নিচু করে রেখেছে। না চাইতেও চোখের কার্ণিশ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো। রোদেলা সেটা দেখে উতলা হয়ে উঠলো-
“ তুনা মা কাতে না, কাতে না। পাপা তুনা মা কাতে,কাতে!”
রৌদ্রিক রোদেলার কথায় তূর্ণার দিকে তাকালো। আস্তে করে রোদেলাকে নিজের কোলে নিয়ে বলে-
“ কাঁদুক, তার চোখের জল বেশি তাই মানুষের কথায় কাঁদে বেশি। উঠ, আর আমার পিছনে আস।”
বলেই রোদেলাকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। তূর্ণা চোখে পানি মুখে রৌদ্রিকের পিছনে ছুটলো।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে আকাশ জুড়ে। সময়ের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে এক নিস্তব্ধ, ভারাক্রান্ত নৈঃশব্দ্য। নগরীর প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল ক্লিনিকের জানালাগুলোতে আলো জ্বলছে। কেবিনের মধ্যে বসে আছে সে তার পাশে তূর্ণা। এক নিঃশেষিত সত্তা, যেন অস্তিত্বের রঙচটা প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্ষয়িষ্ণু প্রতিচ্ছবি। তার দৃষ্টি শূন্যে নিবদ্ধ, অথচ সেই শূন্যতার গভীরে লুকিয়ে আছে সহস্র অচেনা ভীতি, অনুক্ত ব্যথার গুমরে ওঠা আজনা কথা। আঙুলগুলো কাঁপছে ক্ষীণ কম্পনে, যেন প্রতিটি স্নায়ু ভেঙে পড়ছে নিজস্ব প্রতিধ্বনির ভয়ে। বার বার এদিক ওদিক দেখছে সে আর রোদেলা, রোদেলার ছোট্টো হাতটা ধরে রেখেছে তূর্ণা। বেশ অনেকটা সময় হয়েছে এখানে এসেছে, রৌদ্রিক সামনে বসে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ডক্টর মানুষের ভেতরের এই ভাঙন এটা কি কখনও পূর্ণতা পায়? নাকি এই শূন্যতাই চিরস্থায়ী নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়?”
লোকটার নাম নীরব, সে কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তার দৃষ্টি স্থির হলো তূর্ণার উপর। তিনি দম ছেড়ে বলে-
“মানসিক বিপর্যয়,কোনো ক্ষণস্থায়ী ঝড় নয়, মিস্টার রৌদ্রিক। এটা এক দীর্ঘস্থায়ী আবহাওয়া যার প্রতিটি পরিবর্তন ধীর, জটিল, এবং কখনও কখনও প্রতারণাময়। সময় লাগবে অনেকটা।
“তাহলে কি কোনোদিন স্বাভাবিক হবে তূর্ণা ?”
নীরব ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন-
“ ‘স্বাভাবিক’ শব্দটা আপেক্ষিক। আমরা যা করতে পারি, তা হলো তার ভেতরের বিশৃঙ্খলাকে কিছুটা শৃঙ্খলায় বাঁধা, তার আতঙ্ককে ভাষা দেওয়া, তার শূন্যতাকে সহনীয় করে তোলা। কিন্তু সম্পূর্ণ নিরাময় তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।”
এই উত্তর যেন বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ল রৌদ্রিকের নিকট। তার দৃষ্টি ছুটে গেল তূর্ণার দিকে সে এখনো নির্বিকার, নিজের অদৃশ্য জগতে বন্দি। ঠোঁটের কোণে অস্ফুট কিছু শব্দ, যা ভাষায় ধরা দেয় না। রোদেলার সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে আছে সে। নিরব আবারও বলে-
“ দেখুন মিস্টার, ওনার সমস্যাটা জন্মগত। তারপর যা বুঝলাম খুব অল্প বয়সে ওনার মাথায় গভীর কোনো আঘাত পেয়েছিলেন। যার কারণে সমস্যাটা একটু জটিল, মানসিক অসুস্থতাকে সুস্থ করা সম্ভব। তবে ওনার জিনিসটা একটু ভিন্ন, এমন মানুষদের সাথে সবসময় ইতিবাচক ব্যবহার করাটাই কাম্য। কারণ তারা আমাদের থেকে কিছুটা নাজুক হয়ে থাকে, সময়ের সঙ্গে ওনাদের শরীর বৃদ্ধি পেলেও মস্তিষ্ক আর মন দু’টো বাচ্চা রয়ে যায়। তাছাড়া আপনার ওয়াইফকে দেখে যা বুঝলাম উনি বেশ ট্রমাটিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, যার জন্য ওনার মধ্যে যে চঞ্চলতা থাকার কথা সেটাও নেই। একধরনের আতঙ্ক তার মধ্যে রয়েছে। তবে হ্যাঁ এটা সম্পূর্ণ নিরাময় করা না গেলেও ওনাকে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক করা যেতে পারে। তবে এখানে সময়ের ব্যাপার আছে। ওনার প্রতি আরও কেয়ারফুল হতে হবে। সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ করতে হবে, যেসব জিনিস ওনাকে বেশি ট্রমা দেয় সেই গুলো যাতে ওনার সঙ্গে না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া থেরাপি আর সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ওনার মেন্টাল হেল্থ ইমপ্রুভমেন্ট করা যাবে। সম্পূর্ণ ঠিক হবে কিনা সেটার ওনার উপর ডিপেন্ট করছে, রোগী যদি নিজে সুস্থ না হতে চায় তাহলে আমরা যতই চিকিৎসা করি না কেনো সেটার কোনো লাভ হবে না। রোগীর ইচ্ছে শক্তিই তাকে সুস্থ হতে সাহায্য করে।”
রৌদ্রিক আরও কিছু সময় ডক্টরের সঙ্গে কথা বলে যা যা দরকার সব কিছু নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রোদেলার জন্য বেশ অনেক গুলো বেলুন আর কটন ক্যান্ডি নিয়েছে। সেইগুলোই খাওয়াতে ব্যস্ত দুই জন। গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছে দুইজন। রৌদ্রিক গম্ভীর মুখে ড্রাইভ করতে ব্যস্ত। হুট করে তূর্ণা সরল মনে রৌদ্রিকে প্রশ্ন করে-
“ আমি কি কোনোদিন ঠিক হবো না? আল্লাহ কেনো আমাকে পাগল বানিয়েছে বর? আমি তার প্রিয় নই? আল্লাহ কি আমাকে ভালোবাসে না? তাই কি আমি কারো ভালোবাসা পাই না?”
তূর্ণা কথা শুনে রৌদ্রিক কিছু সময় নিরবতা পালন করলো। তারপর অতি শান্ত গলায় বলে-
“ আল্লাহ কাছে তার সকল বান্দাই সমান। পৃথিবীর কেউ পারফেক্ট নয়, তারমানে এই নয় সে আল্লাহর অপ্রিয়। তোমাকে আল্লাহ একটু বেশি ভালোবাসেন তাই তুমি আমাদের থেকে ভিন্ন। এর মানে এই নয় যে তুমি তার অপ্রিয় কেউ। নিজেকে আগে ভালোবাসো অন্যের ভালোবাসা শুধুই তোমাকে আঘাত দিবে। কিন্তু তুমি যখন নিজেকে ভালোবাসতো শিখবে তখন কেউ তোমাকে ভাঙতে পারবে না। তাই নিজেকে ভালোবাসাটা আগে প্রয়োজন তারপর নাহয় অন্যকেউ ভালোবাসুক।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১০
তূর্ণা এত কঠিন কঠিন শব্দের মানে বুঝলো না। চুপ হয়ে রইলো ডাক্তারের কোনো কথাই সে বোঝেনি, সে তো শোনেই নি ঠিক মত। রোদেলার সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল সে। উত্তরাটা তার জানা হলো না, সে ঠিক হবে কিনা।
