Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১২

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১২

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১২
ফাহিমা ইসলাম

দুপুরের প্রখর প্রহর অতিক্রান্ত হওয়ায়, খাওয়া-দাওয়ার পর্ব সমাপ্তি হতেই সকলেই নিজ নিজ কক্ষে আশ্রয় নিয়েছে নিবিড় বিশ্রামের অলসতায় নিমগ্ন । নীরব অবকাশের মধ্যেই মিথিলা বাহির থেকে থেকে মাত্রই এলো । চারপাশে জনমানবশূন্যতার স্থবিরতা; বাহিরের দগ্ধ তাপপ্রবাহে দেহ তার ক্লান্তির ঘামে সম্পূর্ণ ভিজে একাকার। অচেতন স্বস্তির সন্ধানে সে নীরবে সোফার উপর নিজের পার্স ব্যাগটা একপাশে নিক্ষেপ করে, মাথা এলিয়ে দিয়ে নয়ন যুগল মুদে রাখে কিছুক্ষণ।
সময়ের সূক্ষ্ম স্রোত ধীরে ধীরে গড়িয়ে যেতে না যেতেই, কারো পদধ্বনির মৃদু অনুরণন কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতেই সে চমকিত দৃষ্টিতে নয়ন উন্মীলন করে। দৃষ্টি স্থির হয় সিঁড়ি বেয়ে আসা তূর্ণার উপর, মেয়েটি ধীর পায়ে নিম্নমুখী, কাউকে অনুসন্ধানে ব্যাকুল সে। হঠাৎ কী এক অদৃশ্য প্রেরণায় মিথিলার অন্তর্গত সত্তা সঞ্চালিত হলো, সে গম্ভীর কণ্ঠের কঠোরতা মিশিয়ে তূর্ণাকে সম্বোধন করে বলে উঠলো-

“ এই মেয়ে এইদিকে আসতো।”
আকস্মিক আদেশের অভিঘাতে তূর্ণা দৃষ্টি ফেরায় সেই দিকে। মিথিলাকে অবলোকন করে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার সেই স্তব্ধ অবস্থান মিথিলার ধৈর্যের প্রান্ত ছুঁয়ে ফেলতেই, সে এবার কিছুটা উচ্চকণ্ঠে পুনরায় ডেকে ওঠে-
“ এই মেয়ে তোমাকে ডাকছি কানে কথা যায় না? এদিকে আস তাড়াতাড়ি!”
ধমকের তীক্ষ্ণ অভিঘাতে তূর্ণার দেহে হালকা কম্পন জাগলো। মাথা নিচু করে সে ধীর পায়ে মিথিলার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো । নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকে কেবল হাত কচলাতে থাকে এক অজানা শঙ্কার আবেশে। মিথিলা তার তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি তূর্ণার উপর নিবদ্ধ করে, রুক্ষ স্বরে উচ্চারণ করে বলে-
“ আমার জন্য লেবুপানি নিয়ে আস যাও। আর হ্যাঁ এটা যেনো তুমি নিজেও বানাও, কাজের লোকদের দিয়ে না। এখন যাও তাড়াতাড়ি নিয়ে আসো।”

মিথিলার কুঞ্চিত ভ্রু ও ক্রুদ্ধ মুখাবয়বের আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করে তূর্ণা নিঃশব্দে রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হয়। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল রুমা সিকদারকে খোঁজা, কিন্তু মিথিলার প্রতি তার অন্তর্লীন ভীতির জন্য নীরবে সবটা মেনে নিচ্ছে। প্রতিবারই এই নারীর সম্মুখীন হলে এমন কঠোর বাক্যবাণের সম্মুখীন হতে হয়,যার ফলে ভয়ের শিকড় ক্রমেই গভীরে প্রোথিত হয়। রান্নাঘরে প্রবেশ করে তূর্ণা চারপাশে দৃষ্টিপাত করে। এই বাড়িতে আসার পর তাকে দিয়ে কোনো কাজই করায়নি এখনো; অথচ এখানে আসার আগে সেলিমা খাতুনের কঠোরতার জন্য বাড়ির প্রতিটি শ্রমসাধ্য কাজে সে অভ্যস্ত ছিল। ঘর মোছা, ঝাড়ু দেওয়া, বস্ত্র পরিস্কার কোনো কিছুই তার অজানা ছিল না। অপারগতায়ও তাকে বাধ্য হয়ে সব করতে হত, আর সামান্য ত্রুটিতেই খুন্তির দগ্ধ ছ্যাঁকার নির্মম স্মৃতি আজও তার শরীরে লেগে আছে। তবুও, এই নতুন পরিবেশটা তার নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত। তাকে রান্নাঘরে দেখে এক কর্মচারী জিজ্ঞাসা করেঃ
“ আপনের কিছু লাগতো নাকি বড়বউ? আমারে কন আমি কইরা দিতাছি।”
ভয়ের কম্পমান স্বরে তূর্ণা বলে-

“ লেবু, লেবু কই?”
“ লেবু দিয়া কি করবেন? শরবত খাইবেন নাকি? আমি বানায় দেই বড়বউ?”
তূর্ণা মৃদু মাথা নাড়িয়ে অস্বীকৃতি জানায়। চারপাশে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় বলে-
“ আমায় শুধু লেবু দাও, ওই আপুটা খাবে। আমাকে বানাতে বলেছে।”
কর্মচারী আর কোনো প্রশ্ন না করে নীরবে ফ্রিজ থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ এনে তার সম্মুখে রেখে দেয়। তূর্ণা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রান্নার বিষয় তার অজানা। ওইবাড়িতে বাড়ির সব কাজ করলেও রান্নাটা কাজটা কোনোদিন করেনি সে। তাই জানাও নেই কিভাবে কি করতে হয়। তূর্ণা লেবুটি হাতে নিয়ে তা ভাঙার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত হয়। অবশেষে কর্মচারী নিজেই লেবুটি দুইভাগ করে প্রয়োজনীয় সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। নির্দেশনা অনুসরণ করে তূর্ণা এক টুকরো লেবু চিপে রস বের করে গ্লাসে দেয়। তাতে পানি মিশিয়ে নেয়; কিন্তু অজ্ঞতার অসতর্কতায় চিনির পরিবর্তে অতিরিক্ত বিট লবণ সংযোজন করে ফেলে। অতঃপর কোনো রকমে গ্লাসটি নিয়ে বাহিরে আসে। মিথিলা তখন নিজ মোবাইল ফোনে নিমগ্ন। তূর্ণা ভীতসন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে গ্লাসটি তার দিকে এগিয়ে দেয়। মিথিলা ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গ্লাস নিয়ে নেয়। গম্ভীর মুখে শরবতটি ঠোঁটে স্পর্শ করতেই তৎক্ষণাৎ তা মুখ থেকে ছিটকে ফেলে দেয়। অতিরিক্ত লবণের তীব্রতায় সেটা প্রায় বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। বিরক্তির তীব্রতায় গ্লাসটি শব্দ করে টি-টেবিলের উপর রেখে সে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠে-

“ এইটা কি বানিয়ে এনেছো? লেবুর পানি নাকি লবণের পানি? ইচ্ছে করে এইসব করেছো তাই না? যাতে আমি খেতে না পারি।”
ভয়ে তূর্ণা দুই পা পশ্চাতে সরে যায়; মিথিলার আকস্মিক ক্ষিপ্রতায় তার অন্তরে আতঙ্কের ঘনঘটা নেমে এসেছে।
“ আ..আমি কিছু করিনি! আমি কিছু করিনি!”
“ ও তারমানে আমি করেছি এইটা তাই না? নিজে তো একটা পাগল আবার এইসব শয়তানি করে বলছো কিছু করনি। তোমাদের মত পাগলকে এই বাড়িতে কিভাবে রেখেছে আল্লাহ জানে। বেয়াদব মেয়ে কোথাকার! পাগল হয়েও অন্যের জিনিস ঠিকই ছিনিয়ে নিতে জানো।”
মিথিলার বাক্যবাণের নির্মম আঘাতে তূর্ণার নেত্রকোণে অশ্রুবিন্দুরা সঞ্চারিত হয়। সে নাক টেনে কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে-

“ হ্যাঁ আমি পাগল, তুমি তো ভালো তাহলে আমার সাথে এমন করছো কেনো? বর বলেছে আমি ঠিক হয়ে যাবো, তারপরও আমায় কেনো পাগল বলছো? বর তো বলেছো তূর্ণা ভালো হয়ে যাবে। আমি তো এইসব বানাতে পারি না তুমি খুব পঁচা! আমাকে শুধু শুধু বকছো।”
এই বাক্যসমূহ মিথিলার অন্তর্লীন দহনকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে রূপান্তরিত করে। ক্ষিপ্র ক্রোধে সে টেবিলের উপর রাখা গ্লাসটি সজোরে নিচে নিক্ষেপ করে; মুহূর্তেই তা ভেঙে অসংখ্য কণায় বিচ্ছুরিত হয়ে পরে ফ্লোরে।তূর্ণা সন্ত্রস্ত হয়ে সরে যেতে উদ্যত হলে, মিথিলা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ক্রোধে তার কোমল গালে প্রবল জোরে চড় বসিয়ে দেয়। আঘাতের তীব্রতায় তূর্ণা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে; ভাঙা কাঁচের সূক্ষ্ম খণ্ডগুলি তার দেহভেদ করে রক্তিম রেখার আভাস ছড়িয়ে পরে। সংবৃত অশ্রুগুলো আর স্থির থাকতে না পেরে গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।মিথিলা আবারও বিষাক্ত ক্রোধে উচ্চারণ করে-

“ বর, বর বর ও তোমার বর না। আর না তুমি ঠিক হবে, তুমি পাগল পাগলই থাকবে! তোমার জায়গায় আজকে আমার থাকার কথা ছিল, কিন্তু তোমার মত একটা পাগল আমার জায়গা কেড়ে নিয়েছো। পাগলদের এত সুখে থাকতে নেই, তাহলে আমাকে বিরহে রেখে তুমি কিভাবে সুখী থাকতে চাও? তাও আমার না হওয়া মানুষটার সঙ্গে? শুনে রাখ ও তোমার বর না, তোমার মত পাগলকে কেউ কোনোদিন ভালোবাসাতে পারে না। আর না কোনোদিন মেনে নিতে পারে।”
বাক্যশেষে মিথিলা নিজ ব্যাগ নিয়ে জায়গাটা প্রস্থান করে। ফ্লোরের শীতল পৃষ্ঠে তূর্ণা নিথর হয়ে পড়ে আছে। নিজেকে ‘পাগল’ আখ্যায়িত করার এই নির্মম সত্য যেন তার অন্তর ছিন্নভিন্ন করছে। ভালোবাসার অক্ষমতায় সে নিজেকে পরিত্যক্ত ভাবে অনুভব করছে। এই পৃথিবী তার প্রতি চরম নির্মমতায় অনড়। শারীরিক আঘাতের যন্ত্রণা তুচ্ছ হয়ে যায় মানসিক বেদনার গভীরতায়। অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে উপর পানে চেয়ে সে কাতর স্বরে উচ্চারণ করে-
“ আল্লাহ তুমি খুব পঁচা, আমায় কেনো পাগল বানালে?

আমায় কেনো ভালোবাসো না তুমি? সবাইকে তো ভালোবাসো তাহলে? তাহলে আমায় কেনো বাসো না? আমায় ভালোবাসার কাউকে কেনো পাঠাও নি? বাবাও ভালোবাসে না, তুমিও বাসো না কেউ আমায় ভালোবাসেনি! তোমরা সবাই পঁচা,খারাপ আমায় শুধু কষ্ট দাও। আমার বুঝি কষ্ট হয় না, এই দেখ ‘ বুকে হাত দিয়ে’
এখানটায় প্রচন্ড রকমে যন্ত্রণা করছে! রোজ করে যখন বাবা শুধু রূপা আপু আর ভাইকে আদর করে। আমায় করে না, আমার দিকে তাকায় না, আমার সঙ্গে বসে না। তুমি তো সবার আল্লাহ, সবাইকে সব দাও। তাহলে আমায় কেনো ভালোবাসা দিলে না? পাগল হওয়া কি খুব খারাপ? আমায় ভালোবাসো না বলেই কি পাগল বানিয়েছো?”
চারপাশের স্থবিরতা যেন তার বুকের ভেতর জমাট বেঁধে থাকা অনুচ্চারিত ক্রন্দনের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসতে লাগলো। শীতল মেঝের উপর লুটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র দেহখানি কেঁপে উঠছে বারংবার। কাঁচের ক্ষুদ্র খণ্ডগুলি তার কোমল চামড়ার গভীরে সূক্ষ্মভাবে ঢুকেছে। সঙ্গে রক্ত বের হচ্ছে বেশ! অথচ তূর্ণার এই বেদনাতেও নির্লিপ্ত। বাহ্যিক আঘাতের যন্ত্রণা তার অন্তর্লীন ক্ষত-বিক্ষত আত্মার তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ। তার ভিতরের ভাঙন, তার মনের ছিন্নভিন্ন শৈশব, তার ভালোবাসার আকুতি। অবুঝ শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে সে নিজের বুকে হাত চেপে ধরে। যেন এই স্পন্দমান হৃদপিণ্ডটাকে থামিয়ে দিতে চায়, যে হৃদয় বারবার ভালোবাসা চেয়েও কারো কাছে ভালোবাসা পায়নি। এলোমেলো ভাঙা গলায় বলতে থাকে-

“এইখানে..এইখানে ব্যথা করে। এইখানে কেউ হাত বুলাই না…কেউ বলে না তূর্ণা ভালো..কেউ বলে না। আমি ভালো!”
তার কথাগুলো স্পষ্ট নয়, ছিন্নসূত্রের মতো জড়িয়ে যাচ্ছে বার বার। কখনো বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই থেমে যাচ্ছে, কখনো আবার একই কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করছে। তার মস্তিষ্কের ভাঙা আয়নার মত পুরোনো স্মৃতিগুলোও বিকৃত হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে বারবার।
“বাবা… বাবা তো রূপা আপুকে ভালোবাসে…ভাইকেও… আমি গেলে বলে দূরে যা… আমি নাকি বাজে… আমি নাকি পাগল…!!”
কান্না করতে করতে তূর্ণা কথা আটকে আসে। অশ্রুসিক্ত নয়নদ্বয় অন্যমনস্কভাবে শূন্যে স্থির হয়ে চেয়ে থাকলো। মনে হলো সে এই বাস্তবতার মধ্যে নেই, হারিয়ে গেছে নিজের এক ভাঙা জগতে, যেখানে ভালোবাসা মানেই কেবল প্রত্যাখ্যান, তাকে দূরে ঠেলে দেওয়া। বার বার তার ছোট্ট মনটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া। হঠাৎই সে কাঁচের টুকরোগুলোর দিকে তাকায়। কৌতূহলী শিশুর মতো একটি খণ্ড হাতে তুলে নেয়। রক্তের সরু রেখা তার আঙুল বেয়ে নেমে আসেছে। কিন্তু সে তাতে ভীত নয়,বরং বিস্মিত!

“ রক্ত… লাল।”
মৃদু হাসে তূর্ণা,একটি বেদনাবিধুর, অস্বাভাবিক হাসি।
“ আমারও লাল রক্ত,তাইলে আমি মানুষ না? আমি কি মানুষ না?”
প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দেয় সে শূন্যতার দিকে। কোনো উত্তর পেলো না। রুমা সিকদার মাত্রই ছাদ থেকে গাছ লাগিয়ে নিচে নেমে এলেন। দুপুরে নতুন অনেকগুলো ফুলের গাছ আনা হয়েছিল সেইগুলোই লাগাচ্ছিলেন এতক্ষণ। হাতে এখনো মাটি লেগে আছে, তিনি ধীর পায়ে নেমে আসতোি হঠাৎই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো ক্ষীণ, কান্নার শব্দ। পা থমকে গেলো তার রুমা সিকদারের, ভ্রু কুঁচকে চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই সেই শব্দের উৎস স্পষ্ট হয়ে উঠলো। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন। ড্রয়িংরুমের মেঝেতে দৃষ্টি পড়তেই তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। মেঝের উপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে তূর্ণা। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাঁচের ভাঙা টুকরো। তড়িঘড়ি করে সে ছুটে এসে তূর্ণার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। রুমা সিকদারের দৃষ্টি তূর্ণার রক্তাক্ত হাতের উপর স্থির হলো, তখন তার অন্তর যেন মুহূর্তেই বিদীর্ণ হয়ে গেলো। এই বাড়িতে হয়তো তিনিই বেশি তূর্ণাকে আপন করে নিয়েছে। মেয়েটাকে নিজের সঙ্গে সবসময় আগলে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। কাঁপা কাঁপা হাতে তূর্ণার মুখখানি তুলে ধরে তিনি ব্যাকুল স্বরে বলে ওঠেন-

“এই কি অবস্থা করেছিস মা? কিরে হলো এইসব? কই দেখি তো,হাতটা দাও।”
তূর্ণা প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে একবার তাকায় রুমা সিকদারের দিকে। সেই দৃষ্টিতে আছে ভীতি, আছে অভিমান, আবার আছে এক অদ্ভুত শিশুসুলভ নির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা।
“আমি… আমি কিছু করি নি।”
কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে সে, শব্দগুলো এলোমেলো। তূর্ণা রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে আবারও ক্রন্দনরত অবস্থায় বলে ওঠে-

“ সবাই লে আমি পাগল,আমি খারাপ, আমায় কেউ মেনে নিবে না।”
তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ যেন সূচের মতো বিঁধতে থাকে রুমা সিকদারের হৃদয়ে। তিনি আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। ধীরে তূর্ণাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নেন। একটা দীর্ঘ, নিবিড় আলিঙ্গন যেখানে মাতৃত্বের সমস্ত অপূর্ণতা, সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত নিঃসঙ্গতা একত্রে আশ্রয় খুঁজে পায় রুমা সিকদার। তূর্ণাকে নিজের সন্তানের মত আগলে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। কিছু অপূর্ণতা তূর্ণার মাঝে পূর্ণতা খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি।
“ চুপ,চুপ কর মা। কে বলছে তুমি পাগল?”‘ তার কণ্ঠে স্নেহের ভারী কম্পন। তিনি আবারও বলেন-
“আমার তূর্ণা পাগল না, আমার তূর্ণা খুব ভালো।খুব ভালো!”
এই ‘আমার’ শব্দটা শুনে তূর্ণার শরীর যেন হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। সে ধীরে ধীরে মাথা তোলে, বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায় রুমা সিকদারের চোখের দিকে

“আমার…?”
এর আগে কেউ কোনোদিন এমন ভাবে তাকে বলেনি। ‘আমার তূর্ণা’ শব্দটা বড্ড স্নেহময়, আর আদরে ভরা লাগলো। এর আগে এইভাবে কেউ বলেছে? না তার স্মৃতির পাতায় কোথাও খুঁজে পেলো না এমন শব্দ।
“হ্যাঁ আমার।”
রুমা সিকদার মৃদু হাসলেন, হাসির আড়ালে জমে থাকা অশ্রু ঝিলমিল করে উঠলো। তিনি হালকা হাসি মুখে বলেন-
“ তুমি তো আমার মেয়ের মত। তাহলে তো আমারই হলে তাই না!”
এই কথাটুকু যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করলো তূর্ণার অন্তরে। তবে তা ধ্বংসের নয়, বরং এক অদ্ভুত উষ্ণতার বিস্ফোরণের। হঠাৎই সে শিশুর মতো জড়িয়ে ধরে রুমা সিকদারকে। রুমা সিকদারের কাছ থেকে আলাদা এক উষ্ণতা খুঁজে পান সে। বাচ্চাদের মত ফুঁপিয়ে উঠে বলে-
“আমারে ছাড়বে না তো? সবাই দূরে সরিয়ে দেয়, কেউ ভালোবাসে না তূর্ণাকে।”
রুমা সিকদার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, স্নেহভরা কণ্ঠে বলেন-
“ আমি আবার কোথায় যাব? এখানেই তো আছি।”
রুমা সিকদার আলতো করে তূর্ণার রক্তাক্ত হাতের উপর বুলিয়ে দেয়। নরম স্বরে প্রশ্ন করেন তিনি-

“ব্যথা করছে?”
তূর্ণা একটু ভেবে মৃদু মাথা নাড়ে-
“এইখানে… একটু…।”
“ ব্যথা পেলে কি করে? আর গাল লাগ হয়ে আছে কেনো?”
তূর্ণা মাথা উঠিয়ে ছলছল চোখ করে বলে-
“ পঁচা আপু মেরেছে, আমি পাগল বলে বর আমাকে মানতে চায় না। আমি নাকি তার জায়গা নিয়েছি। আমি তে লেবুপানি বানাতে পারিনা, তাই ভুল হয়েছে।”
রুমা সিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, বুঝলেন কার কথা বলছে। মিথিলার ব্যবহার আসার পর থেকেই তিনি লক্ষ্য করেছে, মেয়েটা কেমন চুপচাপ আর তূর্ণার প্রতি অদৃশ্য এক ক্ষোপ আছে সেটাও বুঝতে পেরেছেন।
“ আচ্ছা বাদ দাও, ওর হয়তো মন খারাপ তাই ওমনটা বলেছে। এইসব মনে রাখতে নেই, রৌদ্রিক তোমায় না মানলে এখানে আর থাকতে হত না তোমায়। তাই ওর কথা মনে নিও না।”

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের অনিশ্চিত দোলাচলে ঝুলে আছে সময়। না পুরোপুরি দিবালোক, না সন্ধ্যার নিবিড় আবরণ। আকাশের গাঢ় নীলাভ স্তরে জমাট বেঁধেছে বৃষ্টিধারার অশ্রুবিন্দু। ঝরঝর শব্দে ভেঙে পড়ছে জলের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত, যেন ধরণীর অন্তর্লীন সমস্ত গোপন ক্রন্দনের বহিঃপ্রকাশ।এই দুর্বার বর্ষণেই বাইরে আটকা পড়ে গেছে শ্রাবণ। দুপুরের পর পর বাইক নিয়ে বের হয়েছিল সে, অনেকদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় এসেছিল। এখান থেকে মতিঝিলের দিকে যাচ্ছিল আর এইসবেই এই দুর্বার বর্ষের আগমন ঘটে।
এখন সে দাঁড়িয়ে আছে এক আধভেজা পথের ধারে। চারপাশে ঝাপসা জলরেখার আড়ালে বিলীন হয়ে গেছে পরিচিত পৃথিবী। চুল বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে জলের ফোঁটা, শার্টের প্রতিটি সুতো ভিজে সেঁধিয়ে গেছে শরীরের সঙ্গে। চোখ-মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট, আশেপাশে তার মত আরও অনেক মানুষ আটকা পরেছে। বার বার নিজের হাতে থাকা ঘড়িটায় সময় দেখে নিচ্ছে সে।

“ শা*লার বৃষ্টি এখনই আসতে হলো এটারে।”
বলেই সামনের দিকে তাকালো। হুট করে এক অদ্ভুত দৃশ্য তার চেতনার পর্দা ছিন্ন করে প্রবেশ করল।
রাস্তার ওইপারে একটা মেয়ে। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল কৃষ্ণচূড়ার নিচে, এই তীব্র বর্ষণের মাঝে মেয়েটা ফুল কুড়াতে ব্যস্ত। গাঢ় নীল শাড়িতে মোড়া তার অবয়ব, বৃষ্টি পানিতে চুলের লম্বা রেখাগুলো অদ্ভুত পিঠে লেপ্টে আছে । মেয়েটার মুখশ্রী স্পষ্ট নয়, কিন্তু সেই অস্পষ্টতাতেই লুকিয়ে আছে এক গভীর আকর্ষণ এক অমোঘ টান, যা ব্যাখ্যাতীত। শ্রাবণ কৌতুহলী সেইদিকেই তাকিয়ে আছে, সত্যি কি ওখানে কেউ আছে? নাকি বৃষ্টিভেজা বিকেলের তার কোনো মায়াবিভ্রম?

হুট করেই কেমন কৌতূহল জন্মালো মেয়েটাকে জানার। সে জানে মেয়েরা ফুল পাগল হয়, কিন্তু তাই বলে বৃষ্টির মাঝেও কি ফুল কুড়ানো সম্ভব? শ্রাবণ বাইকের চাবিটা পকেটে পুরে। সামনে এগিয়ে যেতেই অসাবধানতার জন্য পা ফেলতেই কাদাজল ছিটকে উঠল চারপাশে। কিন্তু তার দৃষ্টি আর সরলো না সেই রহস্যময়ী থেকে। হৃদস্পন্দন ক্রমশ বেড়ে উঠছে, যেন অজানা কোনো আশঙ্কা আর আকর্ষণের দ্বন্দ্বে আটকে গেছে তার অস্তিত্ব। মেয়েটি ধীরে মাথা তুলল, হাতে অনেকগুলো কৃষ্ণচূড়া ফুলেট ডাল। আর তখনই হুট করে বজ্রপাতের তীব্র আলো এক ঝলকে আলোকিত করে দিল চারপাশ। শ্রাবণ স্পষ্ট দেখতে পেল মেয়েটার উচ্ছাসে ভরা চোখ দু’টো। অস্বাভাবিক রকমের উচ্ছাসে মাতানো নেই চোখ তার ঠোঁটে ভেসে উঠেছে এক ক্ষীণ, রহস্যময় হাসি। মুহুর্তেই শ্রাবণের শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে শীতল স্রোত বয়ে গেল। এর আগে এমন ঘটনা তার সঙ্গে ঘটেনি, তাহলে আজকে এত ভিন্ন কেনো?

কাউকে দেখার এত কৌতূহল হলো কবে তার? তাও একটা আজানা মেয়ের প্রতি। যার পরিচয় অব্দি জানা নেই, এমনকি এই সাক্ষাৎ এর পর তাদের আর সাক্ষাৎ এর সম্ভাবনাও নেই। বৃষ্টি সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিচ্ছে শ্রাবণকে, শ্রাবণ মাসে শ্রাবণ নিজেই ভিজে গেছে আজ। শ্রাবণ এগিয়ে যেতে চাইলো, তবে আটকা পরলো তার পা যে কেনো এগিয়ে যাবে? মনের মধ্যে প্রশ্নের ঘুরপাক খেলো। পকেটে থাকা ফোনখানা বের করে আনলো, তারপর ক্যামেরা ওপেন করে জুম করে ভিডিও করতে শুরু করলো। মেয়েটা নিজ আনন্দে কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে নিজের কানে গুঁজিয়ে রেখেছে, ফুলগুলো হাতে নিয়ে বার বার নেড়ে নেড়ে দেখছে। জুম করায় মেয়েটার মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অনেকটা, শ্রাবণ ভিডিও করছে। সত্যি ই কি তাই? তাও কারো অনুমতি ব্যতীত। শ্রাবণ দ্রুত ভিডিওটা অফ করে দিলো, সে কি করছে এইসব? নিজের করা কাজে নিজেই সে হতভম্ব!

“ হোয়াট দ্যা হেল শ্রাবণ? এইসব তুই কি করছিস? তুই কি পাগল হয়েছিস? মেয়েটাকে না চিনেই তোর ফোনে জায়গা করে নিলি?”
নিজেকে কথাগুলো বলে ওঠে শ্রাবণ৷ আবারও দূরে থাকা মেয়েটাকে একনজর দেখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কিছু না ভেবে গাড়ির চাবি বের করে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা না করে বাইক দিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ভিজে যেতে থাকে। এমনিও সম্পূর্ণ ভিজে একাকার সে! তাই বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করেও লাভ নেই। তবে তার মস্তিষ্ক থেকে মেয়েটাকে বের করতে পারছে না সে। বার বার ভেসে উঠছে মেয়েটার মুখশ্রী। শ্রাবণ নিজের উপর বিরক্ত হয়ে যায়। হুট করে নজরে পরা একটা মেয়েকে নিয়ে এত ভাবার কি আছে?

কৃষ্ণচূড়া ফুলের ডালগুলো হাসিমুখে নিয়ে ইরা সামনের দিকে যেতে থাকে। বৃষ্টি আর কৃষ্ণচূড়া বরাবরই তার পছন্দ, ভার্সিটিতে আজকে তার নবীন বরণের অনুষ্ঠান ছিল। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিল সে, আর তখনই প্রবল বেগে শুরু হয় বৃষ্টি। আজ বৃষ্টি দেখলে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না বৃষ্টিতে তাকে ভিজতেই হবে। আর যখন কৃষ্ণচূড়ার গাছটা চোখে পরলো, নিজের মধ্যে থাকা উচ্ছ্বাস টাকে আর ধরে রাখতে পারল না। ছুটে গাছের তলায় এসে দাঁড়িয়ে ফোন নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আর ভাগ্যক্রমে প্রবল বাতাসের কারণে বড় একটা ডাল ভেঙ্গে নিচে পড়ায় এখান থেকে কৃষ্ণচূড়া ফুল গুলো নিয়ে নেয়। বাড়িতে গেলে মায়ের কাছ থেকে শ’খানের বকা খাবে এই বৃষ্টিতে ভেজার কারণে। কিন্তু তারপরও ইরাকে বৃষ্টিতে ভিজতেই হবে।

ইরার ব্যাগে ছাতা আছে কিন্তু সে ইচ্ছা করেই ছাতাটা আর বের করে। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করেছে, চোখ-মুখে যেন উচ্ছ্বাস উগলে পড়ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সে, বড় ভাই আর সে। ইরা সম্পূর্ণ নাম হলো রিধিকা ইসলাম ইরা। এবার অনার্স প্রথম বর্ষে উঠেছে, নতুন জায়গা হওয়ার তেমন কোনো বন্ধু হয়নি তার এখনো। হাঁটতে হাঁটতে হুট করে ব্যাগের মধ্যে থাকা ফোনটা বেজে ওঠে। ব্যাগটা ওয়াটার প্রোফাইল ব্যাগের ভেতর কোন প্রকার পানি প্রবেশ করতে পারেনি৷ ইরা ব্যাগের চেন খুলে আগে ছাতাটা বের করল তারপর সেটা মাথার উপর ধরে কোনখানি বের করে দেখলো আনিকা হোসেনের পাঁচটা মিস কল। ইরা তাড়াতাড়ি করে ফোনটা ব্যাক করল। কিছু সময় পরে আনিকা হোসেন ফোনটা তুলতেই করা গলায় বলে উঠেন-

“ এই তুই ফোন ধরছিলে না কেন? যদি দেখি তুই আজকেও বৃষ্টিতে ভিজে বাড়িতে এসেছিস, তাহলে তোর একদিন আমার দশ দিন মনে রাখিস।”
মায়ের হুমকিতে ইরা জিহ্বা কাটলো, আনিকা হোসেন নিশ্চয়ই বৃষ্টির কারণে তাকে ফোন দিয়েছে। ইরা ঢোক দিলে কোন রকম আমতা আমতা করে বলে ওঠে-
“ আরে মা তুমিও না, বৃষ্টি কই পেলে? আমি তো এখনো ক্যাম্পাসে আছি।”
ইরার কথা আনিকা হোসেন বিশ্বাস করবেন না। প্রেম করা গলায় আবারো বলে উঠেন-
“ আমি তো পেট থেকে হয়েছি নাকি তুই আমার পেট থেকে হয়েছে শুনি। তুই যে বৃষ্টির মধ্যে আছিস সেটা তো বুঝতেই পারছি, বৃষ্টির শব্দ আমার কানেও আসচ্ছে। ভালোয় ভালোয় বলছি বৃষ্টিতে ভিজে আসবি তো, খবর আছে। ডাক্তার না করেছে তোকে এখন বৃষ্টিতে না ভিজতে।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১১

“ উফফফ! মা ছাড়ো তো। এত ভয় দেখাও কেন তুমি। কিছুক্ষণ পর বাসায় আসছি আচ্ছা।”
বলে ফোনটা কেটে দেয় ইরা। আনিকা হোসেন কি করে যে বুঝা যায় কখন সে কি করছে। ইরা আর মাথার উপর থেকে ছাতা সরানোর সাহস করল না। কয়েকদিন হলো এসে জ্বর থেকে উঠেছে, আবারো বৃষ্টিতে ভেজার কারণে জ্বর আসলে আনিকা হোসেন তাকে আর আস্ত রাখবে না।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৩