Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৭

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৭

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৭
ফাহিমা ইসলাম

আকাশ আজ যেন বিষণ্ন কোনো চিত্রকরের ধূসর তুলির আঁচড়ে রঞ্জিত। দিবাকরের ক্লান্ত সোনালি আভা ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে পশ্চিমাকাশের অনন্ত গহ্বরে, অথচ তার আলোতেও আজ উষ্ণতার চেয়ে বিষণ্নতাই অধিক প্রকট। চারিপাশে এক অদ্ভুত উৎসবমুখর ব্যস্ততা, কিন্তু সেই ব্যস্ততার অন্তরালেও যেন জমাট বেঁধে আছে অদৃশ্য এক আবেগঘন ভার। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গাঁদা ও রজনীগন্ধার মিশ্র সুগন্ধ, উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে আছে রঙিন কাপড়, আলোকসজ্জার তার, আর মেয়ের জন্য রাতে মেহেন্দী আয়োজনের অবিরাম কোলাহল। বাড়ি ভর্তি মেহমান দিয়ে ভরা। রাতের মেহেন্দি অনুষ্টানের সমগ্র আয়োজনের গাঢ় রঙের পাঞ্জাবিতে আবৃত দীর্ঘদেহী পুরুষটি কখনো ডেকোরেশনের লোকদের নির্দেশ দিচ্ছে। গাঢ় রঙের পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, কপালে অল্প ঘামের রেখা, হাতে ফোন আর কর্মব্যস্ত নির্দেশনার ভঙ্গিতে সমস্ত আয়োজনের তদারকিতে সে এতটাই নিমগ্ন যে তাকে দেখলে মনে হচ্ছে যে, এই বাড়ির প্রতিটি বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রবিন্দুতেই দাঁড়িয়ে আছে সে।

বাড়ির সব পুরুষ আজকে নানা কাজে ব্যস্ত। কারো একদণ্ড নিশ্বাস ফেলার সময় নেই, হাতে খুব অল্প সময় নিয়ে বিয়ের আয়োজন করলে যা হয় আরকি!
দোতলার এক কক্ষে বসে আছে তূর্ণা। জানালার ফাঁক গলে আসা দুপুরের আলো তার গায়ে পড়ে মুখশ্রীটাকে আরও কোমল করে তুলেছে। আজ পরনে তার হালকা নীল রঙের শাড়ি পরানো হয়েছে। খোলা চুলগুলো এলোমেলোভাবে পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বড় বড় দুটি চোখে সেই চিরচেনা নিজের বর নাম মানুষটার উপরই আটকে রয়েছে। তূর্ণার কেনো জানি এইভাবে দেখতে প্রচন্ড ভালো লাগছে, তাই সবার সঙ্গে গল্প বাদ দিয়ে জানালার এই জায়গায় এসে বসে আছে সে। তূর্ণার চারপাশে বসে আছে আরও কয়েকজন মেয়ে। তাদের মাঝখানে রিনি অত্যন্ত রহস্যময় হাসি নিয়ে তূর্ণার দিকে ঝুঁকে এলো হঠাৎ।

“ জানো, ছোটবেলায় ভাইয়া আমাকে নিজে হাতে সাজিয়ে দিতো।”
তূর্ণা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো রিনির দিকে। রিনি একবার নিচে থাকা রৌদ্রিককে দেখে নিলো। তূর্ণা তূর্ণার নিস্তেজ চোখদুটো কৌতূহলে চিকচিক করে উঠলো।
“সত্যি?”
“ হুম। চুল বেঁধে দিতো, টিপ পরিয়ে দিতো, এমনকি শাড়ির আঁচলও ঠিক করে দিতো। ভাইয়ার হাত কিন্তু অসম্ভব সুন্দর।”
রিনির কণ্ঠে ইচ্ছে করেই দুষ্টুমি মেশানো ছিল। আশেপাশের মেয়েগুলোও চাপা হাসিতে যোগ দিলো।
“ ওহ, তাই নাকি!”
তূর্ণার প্রশ্নটা এতটাই সরল ছিল যে মুহূর্তেই সবার ঠোঁটে চাপা হাসি ফুটে উঠলো। রিনি এবার আরও কাছে সরে এলো তার, শয়তানি হাসি দিয়ে বলে-
“ এখনও পারে। তুমি যদি গিয়ে একটু বায়না করো, দেখবে তোমাকে সাজিয়ে দিবে।”
তূর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। যেন কথাগুলো নিজের ভেতরে ধীরে ধীরে অনুভব করার চেষ্টা করছে। অতঃপর খুব আস্তে বলল,

“উনি… রাগ করবেন না তো?”
রিনি মুচকি হেসে তার কাঁধে মাথা ঠেকালো।
“তোমার উপর ভাইয়া কখনো রাগ করতে পারে?”
এই একটি বাক্য যেন অদ্ভুতভাবে ছুঁয়ে গেল তূর্ণাকে। তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠলো। তারপরও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পরলো সে,
“ তাড়াতাড়ি যাও, আর যেয়ে খুব করে বলতে হবে, ‘আমাকে সাজিয়ে দিন।’ দেখবে না বলতে পারবে না আর।”
তূর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। যেন ভেতরে ভেতরে সাহস সঞ্চয় করছে। তারপর ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো। তার চুড়ির মৃদু শব্দ কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। তূর্ণা বের হয়ে যেতেই রিনি হেসে ফেলে। রৌদ্রিক কেমন তার জানা আছে, তবে তূর্ণাকে না করবে না এটাও তার জানা। তার ভাই যে আস্ত একটা অনুভূতিহীন সেটা তার খুব ভালো করে জানা। প্রয়োজন ছাড়া যে মানুষ কথা বলে না, সে আবার বউকে নিজ থেকে সাজানোর জন্য রাজি হবে এমনটা কি করে হয়।
নিচতলার বিশাল বাগানে তখনো কর্মব্যস্ত রৌদ্রিক। একজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই হঠাৎ অনুভব করলো, কেউ তার পাঞ্জাবির হাতা আলতো টানছে। রৌদ্রিক কথা বলছিল হঠাৎ টান পরায় পিছন
ঘুরে তাকাতেই থমকে গেলো সে। তূর্ণা,অদ্ভুত নিষ্পাপ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। মুখে শিশুসুলভ দ্বিধা, অথচ গভীরে কোথাও এক অচেনা কোমলতা ছেয়ে আছে। মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আঙুলগুলো অস্থিরভাবে জড়াজড়ি করছে।

“ কি হয়েছে?” রৌদ্রিকের গম্ভীর কণ্ঠে আশ্চর্যরকম কোমলতা মিশে ছিল।
তূর্ণা ঠোঁট ফুলিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বললো,
“ আমাকে সাজিয়ে দিন।”
রৌদ্রিক প্রথমে ভ্রু কুঁচকালো। যেন ঠিক শুনতে পায়নি।
“ কি?”
তূর্ণা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। তারপর শিশুসুলভ অভিমানে যোগ করলো-
“ রিনি বলেছে আপনি সুন্দর করে সাজাতে পারেন। আমাকেও সাজিয়ে দিন।”
আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কাজের মানুষ মুখ টিপে হাসলো তূর্ণার কথা শুনে। দূরে দাঁড়িয়ে রিনি তো হাসি চাপতেই পারছে না। রৌদ্রিক নিচু স্বরে বললো-

“ আমি এখন ব্যস্ত।”
তূর্ণা এবার আরও কাছে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে অভিমান জমলো শিশুর মতো।
“ না। এখনই সাজিয়ে দিতে হবে।”
“ তূর্ণা!”
“ প্লিজ বর…!!”
শব্দটা এমন কোমলভাবে বের হলো যে রৌদ্রিকের কণ্ঠ আটকে গেলো। এই মেয়েটার প্রতি সে ঠিক কেমন অনুভব করে, তা হয়তো নিজেও জানে না। তবে তূর্ণার এই নিষ্পাপ আবদারগুলো তার সুসংগঠিত কঠোর মনটাকে বারবার দুর্বল করে দেয়। রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“ আচ্ছা। কাজ শেষ করে, একটু পর দিচ্ছি কেমন?”
তূর্ণার চোখ দুটো মুহূর্তেই জ্বলে উঠলো শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে। সে তৎক্ষণাৎ রৌদ্রিকের হাত চেপে ধরে বললো-
“ আচ্ছা ঠিক আছে বর, আপনি এত্ত ভালো।”

দিবাকরের শেষ রক্তিম আভা ধীরে ধীরে গোধূলির নরম অন্ধকারে বিলীন হতে শুরু করেছে। সিকদার বাড়ির প্রতিটি কোণে উৎসবের উচ্ছ্বাসে দীপ্তিমান। বাগান জুড়ে ঝুলন্ত আলোকমালাগুলো একে একে জ্বলে উঠছে, যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোনাকির দল নেমে এসেছে মর্ত্যের বুকে। বাতাসে মিশে আছে মেহেন্দির, আতর আর বেলি ফুলের মাদকতাময় সুগন্ধ। দূরে নারীদের উলুধ্বনি, কোথাও হাসির ঝংকার, আবার কোথাও ঢোলকের মৃদু তাল শোনা যাচ্ছে। হালকা বিটে গান চলছে, কিন্তু এই সমগ্র উল্লাসের মাঝেও দোতলার এক কোণে বসে আছে এক অভিমানিনী। যার মন ভার হয়ে আছে কারো উপর অভিমান করে। খাটের একপ্রান্তে গাল ফুলিয়ে বসে আছে সে। দু’হাত বুকের কাছে গুটিয়ে রাখা। মুখশ্রীতে শিশুসুলভ অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট। জানালার পাশে টাঙানো পর্দা বাতাসে উড়ে উড়ে বারবার তার মুখ স্পর্শ করছে, অথচ সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রৌদ্রিক বলেছিল,কাজ শেষ করেই এসে তাকে সাজিয়ে দিবে। কিন্তু সেই “একটু পর” পেরিয়ে এখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

মাঝেমধ্যে দরজার দিকে তাকাচ্ছে তূর্ণা। অতঃপর আবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইছে,সে মোটেও অপেক্ষা করছে না। কিন্তু সেটা বোঝালেই কি মন বুঝে যাবে এইসব বাহানা? ঠিক তখনই দরজার বাইরে ভেসে এলো পদশব্দ। তূর্ণার দৃষ্টি সেদিকে ছুটে গেলেও পরমুহূর্তেই সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিলো। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো রৌদ্রিক।
আজ তার পরনে গাঢ় পাঞ্জাবিটা ঘামে পিঠের সঙ্গে লেপ্টে আছে। দিনের ক্লান্তি স্পষ্ট মুখে, কপালে ঘামের হালকা রেখা জমে আছে। তবুও চোখদুটো অদ্ভুত কোমল। তূর্ণার অভিমানী মুখটা দেখেই রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো।

“ কি হয়েছে?”
কোনো উত্তর দিলো না তূর্ণা।
“ তূর্ণা?”
এবারও নীরবতা। রৌদ্রিক ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। নিচু হয়ে মুখটা দেখার চেষ্টা করতেই তূর্ণা আরও মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
“ আমার উপর রাগ করেছো?”
অবশেষে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো তূর্ণা-
“ আপনি মিথ্যা কথা বলেছেন।”
রৌদ্রিক ভ্রু তুললো।
“ আমি?”
“ হুম। আপনি বলেছিলেন তাড়াতাড়ি আসবেন। আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি।”
শেষ বাক্যটায় অদ্ভুত এক কষ্ট মিশে ছিল। যেন ছোট্ট কোনো শিশু প্রতিশ্রুতি ভাঙার অভিযোগ করছে রৌদ্রিকের নিকট। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইলো তার দিকে। অতঃপর ধীরে ধীরে নিজের পেছনে লুকিয়ে রাখা ছোট্ট ব্যাগটা সামনে আনলো।

“ তাই নাকি? তাহলে এটা কার জন্য কিনলাম?”
তূর্ণার কৌতূহলী চোখ এবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেদিকে ঘুরলো। রৌদ্রিক ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে এলো কয়েক রঙের কাশ্মীরি চুড়ি, তার মধ্যে সবচেয়ে নজর কারলো গাঢ় লাল রঙের কাশ্মীরি চুড়ির সেট। ক্ষুদ্র পাথরের কারুকাজে চুড়িগুলো যেন আলোয় জ্বলজ্বল করছে।
তূর্ণার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো।
“ এইগুলো আমার?”
“ না, পাশের বাড়ির আন্টির জন্য।”
রৌদ্রিকের গম্ভীর উত্তর শুনে তূর্ণা ঠোঁট ফুলিয়ে ফেললো আবার। আর সেই দৃশ্য দেখে হেসে উঠলো রৌদ্রিক।
“ অবশ্যই তোমার জন্য।”
মুহূর্তেই তূর্ণার সমস্ত অভিমান গলতে শুরু করলো। কিন্তু সে পুরোপুরি নরম হলো না। নিচু স্বরে বললো-
“ তাহলে আগে আসলেন না কেনো”
রৌদ্রিক এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসলো। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থির ভঙ্গিতে বললো-
“ আগে তো কিনে রাখিনি এইসব।”
বলেই রৌদ্রিক উঠে গেলো, জবা সিকদারের রেখা যাওয়া কচু পাতা রঙের তাঁতের শাড়িখানা তুলে নিলো।
রৌদ্রিক শাড়িটা হাতে তুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। অদ্ভুত এক অনুভূতি বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে তার। এই দৃশ্য,একসময় তার জীবনের অংশ হবে, কখনো কি কল্পনা করেছিল? তূর্ণা ইতোমধ্যে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। তূর্ণার মহা খুশি, সে উঠে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রিকের সামনে লজ্জা নিয়ে।

রৌদ্রিক অত্যন্ত সতর্কতায় তূর্ণার প্রতিটা শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিচ্ছে। কাঁধের উপর সবুজ আঁচলটা গুছিয়ে দিতে দিতে তার আঙুল ছুঁয়ে গেলো তূর্ণার গলা। সেই স্পর্শে মেয়েটার শরীর কেঁপে উঠলো ক্ষীণভাবে। রৌদ্রিক একে একে সুন্দর করে নিচে বসে, শাড়ির প্রতিটা কুঁচি গুছিয়ে দিচ্ছে। তূর্ণা সেদিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে, একরাশ লজ্জা, মুগ্ধতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। না চাইতেও অজানা ভালো লাগায় তার হৃদয় ছেয়ে যাচ্ছে, এর আগে কেউ কোনোদিন তাকে সাজায়নি। রৌদ্রিক আসার পর সবকিছু কেমন স্বপ, স্বপ্ন হয়ে গেছে তার জীবনটা।
রৌদ্রিক শাড়ির কুঁচি ঠিক করে উঠে দাঁড়ালো। শান্ত চোখ দু’টি তূর্ণার উপর নিক্ষেপ করতেই, তার হৃদয় কেঁপে উঠলো। শীতল এক দমকা হওয়ায় বয়ে গেলো তার বক্ষস্থল জুড়ে। শাড়িটা হয়তো তূর্ণার জন্যঔ তৈরি হয়েছিল, তূর্ণাকে অসম্ভব রকমের সৌন্দর্য গ্রাস করে নিয়েছে হয়তো। রৌদ্রিক শুকানো একটা ঢোক গিলে নিলো। তূর্ণা রৌদ্রিকের এমন দৃষ্টি দেখে লজ্জা পেলো আরও। না চাইতেও গাল দু’টো কেমন লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে।

“ এ..এইভাবে কি দেখছেন বর?” ইতস্তত ভাবে জিজ্ঞেস করলো তূর্ণা।
“ তোমাকে।”
স্পষ্ট জবাব দিলো রৌদ্রিক কোনো ভনিতা ছাড়াই। যেটা মুহুর্তেই তূর্ণাকে আরও লজ্জায় ফেলে দিলো।
“ কিন্তু আম..আমার তো লজ্জা লাগছে।”
রৌদ্রিক নিজেকে সামলে, আলতো হেসে বলে-
“ লজ্জা মেয়েদের ভূষণ, তাই লজ্জা পাওয়া ভালো দিক।”
বলেই রৌদ্রিক ব্যস্ত হাতে ড্রেসিং টেবিলের উপরে থাকা চিরুনি নিয়ে, তূর্ণার চুলগুলো জড়ো করতে শুরু করলো রৌদ্রিক। কালো রেশমি চুলের ভাঁজে আঙুল চালাতে চালাতে নিখুঁত এক খোঁপা বেঁধে দিলো সে কিছুখন সময় নিয়ে। খোঁপা বাঁধার পর, নিজের পাঞ্জাবি পকেটে থাকা কাগজের মোড়া বেলিফুলগুলো বের করে আনলো। আসার সময় কি মনে করে ফুলের দোকানে নজর যেতেই কিনে এলো এইগুলো। কেনো জানি মনে হলো তূর্ণার খোঁপায় এইগুলো বড্ড মানাবে। তাই এইগুলোও কিনে এনেছে সঙ্গে। এইদিকে তূর্ণার অবাক হয়ে শুধু দেখছে, না চাইতে তার মনে প্রজাতির উড়ছে। রৌদ্রিক সেখান থেকে দু’টো গাজরা বের করলো। পুরো ঘর মুহূর্তেই বেলি ফুলের সুবাসে ভরে উঠলো। তূর্ণা আয়নায় রৌদ্রিকের মুখপানে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বললো-

“ এত সুন্দর গন্ধ…”
রৌদ্রিক উত্তর দিলো না। শুধু অত্যন্ত যত্নে গাজরাটা তার খোঁপায় জড়িয়ে দিলো। সেই মুহূর্তে তূর্ণাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার রক্তিম আভায় ফুটে থাকা কোনো কৃষ্ণচূড়া। তূর্ণা আজ সম্পূর্ণ নীরব, সে শুধু মুগ্ধ হয়ে সবকিছু দেখছে। অতঃপর রৌদ্রিক তার হাত নিজের হাতে তুলে নিলো। এক এক করে লাল কাশ্মীরি চুড়িগুলো পরিয়ে দিতে লাগলো। মুহুর্তেই টুংটাং শব্দে সমগ্র ঘর ভরে উঠলো। তূর্ণা মুগ্ধ চোখে শুধু তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই মানুষটার স্পর্শে কেনো যেন তার সমস্ত অস্থিরতা শান্ত হয়ে যায়। তার বহুদিনের বিশৃঙ্খল মানসিক অন্ধকারে রৌদ্রিক যেন একমাত্র স্থির আলোকরেখা। ঠিক তখনই ছোট্ট পায়ের টুপটাপ শব্দে ঘরে ঢুকে পড়লো রোদেলা। তার পরনেও আজ কচু রঙের বড় ফ্রক । মাথাভর্তি এলোমেলো চুল। ঢুকেই সে হাসি মুখে বললো-

“ পাপা… আনাকেও তুন্দর করে দাও, মায়ের মত।”
রোদেলার কথায় তূর্ণা আর রৌদ্রিক দু’জনই তাকালো তার দিকে। তূর্ণার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো হাত বাড়িয়ে নিজের কাছে ডাকলো, রোদেলা ডুলুমুলু পায়ে এগিয়ে এলো। আসতেই তূর্ণা তাকে কোলে তুলে নিলো,
ক্ষুদ্র দেহখানা যেন তুলোর মতো হালকা, আর মুখভর্তি সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি। গোলাপি আভামাখানো গাল দুটো উত্তেজনায় আরও লালচে হয়ে উঠেছে। বড় বড় চোখে অপার কৌতূহল নিয়ে সে তূর্ণাকে দেখছে।
“ মা তুনায় তুন্দল লাগতে।”
বলেই তূর্ণার গালে টুপটাপ চুমু দিতে থাকে। তূর্ণা যেনো খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো প্রশংসা পেয়ে,সে রোদেলার নরম গাল টিপে দিলো।

“ আমার পুতুলটাকে আজকে এত সুন্দর লাগছে কেনো?”
হেসে দিলো রোদেলা তারপর বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে-
“ তাতিয়ে দাউ।”
মেয়ের কথা মত রৌদ্রিক তার ছোট্ট প্রাণটাকে নিজের কাছে নিয়ে নিলো। মেয়ের কপালে ভালোবাসা একে দিয়ে বলে-
“ আমার মায়ের এখন নিয়ে সময় হলো পাপার কাছে আসার বুঝি?”
রোদেলা হেসে বলে-
“ এইত্ত মা এতেছি পাপা।”
রৌদ্রিক মেয়েকে ড্রেসিং টেবিলের উপর বসিয়ে দিল। তূর্ণা আরাম করে বিছানার উপর বসে পড়ল, তারপর মুগ্ধ নয়নে সামনে থাকা বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
“ পাপাই… আনায়ও তুলি দাউ…”
রোদেলা নিজের ক্ষুদ্র হাত নেড়ে চুড়ির দিকে ইশারা করলো। রৌদ্রিক হেসে উঠলো।

“ আচ্ছা, আমার ছোট্ট রাজকুমারীকেও চুড়ি পরিয়ে দিচ্ছি।”
সে ড্রয়ারের ভেতর থেকে ছোট্ট লাল কাঁচের চুড়ি বের করলো। মেয়ের জন্যও এনেছে সে, অনেক খোঁজাখুঁজির পর এমন ছোট সাইজের পেয়েছে। চুড়িগুলো এত ছোট্ট যে খেলনার মতো লাগে। রোদেলা উত্তেজনায় স্থির থাকতে পারছে না।
“ পুত্তুল, চুপচাপ বসো। নাহলে হাত কেটে যাবে।”
তূর্ণা অত্যন্ত কোমল স্বরে বলতেই রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য মেয়ের মতো স্থির হয়ে বসে পড়লো। তবে মুখে ফিসফিস করে বলে-
“ আমি ভালু মেয়ে…”
রৌদ্রিক এক এক করে তার ক্ষুদ্র হাতে চুড়িগুলো পরিয়ে দিতে লাগলো। টুংটাং শব্দে রোদেলা হঠাৎ খুশিতে হাত নাড়িয়ে উঠলো।
“ মা দেকু! ঝমঝম!”
তূর্ণা হেসে ফেললো। অতঃপর রৌদ্রিক ছোট্ট চিরুনি দিয়ে রোদেলার নরম চুল আঁচড়াতে শুরু করলো। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকা তার স্বভাবে নেই। কখনো এদিক ওদিক মাথা ঘুরাচ্ছে, কখনো আয়নায় মুখ বানাচ্ছে। তূর্ণা এবার উঠে এলো। তারপর রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ পুতুল, একদম নড়বে না।”

তূর্ণা এবার কপট রাগ দেখাতেই রোদেলা ঠোঁট গোল করে বললো,
“ নলবো না…”
কথাটা শেষ করেই আবার নড়ে উঠলো। রৌদ্রিক আর তূর্ণা দু’জনেই হেসে ফেললো একসঙ্গে। অবশেষে অনেক কষ্টে দুই পাশে ছোট্ট ঝুঁটি বেঁধে দিলো রৌদ্রিক। তারপর বাকি থাকা ক্ষুদ্র বেলি ফুলের কুঁড়িগুলো গুঁজে দিলো তার চুলে। রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে আয়নার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বলে উঠলো-
“ আমি… পলি!”
“ পরী না, তুমি তো আমার পুতুল।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৬

তূর্ণা কথাটা বলেই আদরে তার নাকে নাক ঠেকিয়ে দিলো। রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। অতঃপর ছোট্ট দুই হাত দিয়ে তূর্ণার মুখ জড়িয়ে ধরে অস্পষ্ট স্বরে বললো-
“ আমার তুন্না মা… তুন্দুল…”
মুহূর্তেই তূর্ণার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো কেনো জানি। বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত উষ্ণতা জমে উঠলো। সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে শিশুটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো। জানা নেই কেনো জামি তূর্ণার মনে হচ্ছে পুতুল তার থেকে দূরে সরে যাবে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৮