Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৮

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৮
ফাহিমা ইসলাম

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত্রি নেমে আসছে ধরিত্রীর বুকে। পশ্চিমাকাশে রক্তিম আভার শেষ রেখাটুকু যেন মিশে গিয়ে গাঢ় নীল অন্ধকারের অন্তরালে। সিকদার বাড়ির প্রতিটি কোণে আজ আলোকমালার ঝলকানিতে স্বপ্নিল এক রাজপ্রাসাদের ন্যায় দীপ্তিমান। বারান্দাজুড়ে গাঁদা, রজনীগন্ধা আর বেলিফুলের মালাগুলো মৃদু বাতাসে দুলে দুলে এক মাতাল করা সুবাস ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। বাগানের মাঝ বরাবর বিশাল মেহেন্দির স্টেক নির্মাণ করা হয়েছে,চারদিকে ঝুলছে কাঁচের ঝাড়বাতি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফেয়ারি লাইটের আলোকচ্ছটা, আর মাঝখানে সোনালি কাপড়ে মোড়ানো বসার স্থান। ঢোলকের তাল, গিটারের মৃদু স্ট্রিং, আর নারীদের উলুধ্বনিতে সমগ্র পরিবেশ রীতিমতো উন্মাতাল হয়ে উঠেছে। আত্মীয়স্বজনদের কোলাহল, হাসির উচ্ছ্বাস, বাচ্চাদের ছোটাছুটি সব মিলিয়ে রাতটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে বহুদিন পর।

শ্রাবণের পরণের সবুজ রঙের পাঞ্জাবিতে তাকে আজ অসম্ভব প্রাণবন্ত লাগছে। মাঝে মাঝেই আশেপাশের মানুষদের সঙ্গে হাস্যরসে মেতে উঠছে সে নিজেও।
এইদিকে ছোট্ট রোদেলা মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল আর সবুজ ফ্রক টুপটাপ দৌড়ে বেড়াচ্ছে সবার মাঝে। তার পেছন পেছন ছুটছে তূর্ণা। তূর্ণাকে আজ অন্যরকম লাগছে, লাগবেই না বা কেনো। স্বয়ং তার বর তাকে নিজ হাতে তৈরি করেছে আজকে। সবুজ শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয়ে বারবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, অথচ সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। চোখেমুখে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস।
“ পুতুল সোনা দাঁড়াও! আমি ধরবো!”
তূর্ণা শিশুর মতো হেসে রোদেলার পেছনে দৌড়াচ্ছে। আর রোদেলা খিলখিল করে হাসতে হাসতে পালিয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে রোদেলা হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতেই তূর্ণা তড়িঘড়ি করে তাকে জড়িয়ে ধরে বসল মাটিতে।
“ ব্যথা পেয়েছো পুতুল?”
রোদেলা ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নাড়তেই তূর্ণা অত্যন্ত গম্ভীর ভঙ্গিতে তার কপালে ফুঁ দিলো।
“ এখন ঠিক হয়ে যাবে সোনা।”

চারপাশের কয়েকজন নারী দৃশ্যটা দেখে মৃদু হেসে উঠলো। কেউ কেউ বিস্ময় নিয়ে তাকালো তূর্ণার দিকে। এই মেয়েটা কখনো কখনো সত্যিই শিশুর মতো আচরণ করে, আবার কখন এমন আচরণ করছে যেনো তার মত বুঝদার আর কেউ নেই যা অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই। দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল রৌদ্রিক।
আগের পাঞ্জাবি পরিবর্তন করে আর একটা সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পরেছে সে। সবুজ পাঞ্জাবিতে তাকে আজ অস্বাভাবিক সুদর্শন লাগছে। হাতে ঘড়ি, চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালের উপর পড়ে আছে। চারপাশে এত কোলাহল, এত মানুষ তবুও তার দৃষ্টি বারবার গিয়ে স্থির হচ্ছে তূর্ণা আর রোদেলার উপরেই। মেয়েটা রোদেলাকে নিয়ে হাসছে। প্রাণ খুলে হাসছে। এই হাসিটা বড় অদ্ভুত। যেন বহু বছরের অন্ধকার গহ্বর ভেদ করে কোনো হারিয়ে যাওয়া আলো ফিরে এসেছে।
ঠিক তখনই শ্রাবণ হঠাৎ মাইক্রোফোন হাতে উঠে দাঁড়ালো।

“ আচ্ছা আচ্ছা! অনেক তো নাচগান হচ্ছে, কিন্তু আমাদের মহান রৌদ্রিক ভাই এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কেনো?”
মুহূর্তেই চারপাশে হইহই পড়ে গেলো।
“ গান চাই! চাই গান!”
“ আজকে রৌদ্রিক ভাই গান গাইবে!”
রৌদ্রিক সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকালো।
“ শ্রাবণ, নাটক কম কর।”
দূর থেকেই বলে ওঠে রৌদ্রিক। কিন্তু শ্রাবণ আজ ছাড়ার পাত্র নয়। সে বসা থেকে উঠে সোজা রৌদ্রিকের কাছে চলে যায়, তারপর সে প্রায় জোর করেই রৌদ্রিককে টেনে নিয়ে এলো মাঝখানে।
“ আজকে আমার মেহেন্দি। আজকে না করলে আর কবে?”
চারপাশের সবাই এবার একসঙ্গে সুর মেলালো। রিনি তো সরাসরি চিৎকার করে উঠলো-
“ ভাইয়া প্লিজ!”

রৌদ্রিকের গানের গলা দারুন! সচারাচর সে গান গায় না। গায়না বললেই চলে, কলেজে থাকাকালীন বন্ধুদের সঙ্গে যা করতো সেই অব্দিই সীমাবদ্ধ। সবাই এখন নাচ,গান বাদ দিয়ে তার পিছনে পরে গেছে। এইসব দেখে তূর্ণার বেশ কৌতূহল হয়ে পরলো। সেও আশায় রইলো কখন রৌদ্রিক গান গাইবে। বেশ অনেকক্ষণ যাবত রিকুয়েষ্ট করার রৌদ্রিক বিরক্তির ভান করলেও শেষমেশ হার মানলো সবার জেদের কাছে। গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে গিটারটা হাতে তুলে নিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে তূর্ণা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে সামনে বসে পড়লো। তার চোখজোড়া কৌতূহলে চকচক করছে, রৌদ্রিকের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ আপনি গানও পারেন বর?”
রৌদ্রিক মৃদু ভ্রু তুললো।
“ না। একদমই না।”
“ মিথ্যা কেনো বলছেন আপনি।”

অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বললো তূর্ণা। তারপর ধীরে ধীরে তার আরও কাছে সরে এলো। রৌদ্রিক কিছু সময় তূর্ণার মুখপানে চেয়ে থেকে গিটারের টুংটাং শব্দ তুললো, তারপর রৌদ্রিক গান শুরু করলো। তার কণ্ঠ গভীর, ভারী,অথচ আশ্চর্যরকম কোমল কণ্ঠস্বরে গান ধরতেই সবাই মুগ্ধ নয়নে সেদিকে তাকিয়ে রইলো।
মনে হচ্ছে, বহুদিন ধরে নিজের অন্তরে লুকিয়ে রাখা সমস্ত অব্যক্ত অনুভূতি যেন সুর হয়ে বেরিয়ে আসছে।
আর তূর্ণা, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রৌদ্রিকের দিকে। গান বলতে কি সেটাও এখানে আসার আগে জানা ছিল না তার, সে গানের মধ্যে থাকা এত কঠিন ভাষা বোঝে না। হঠাৎ তূর্ণা ধীরে রৌদ্রিকের পাশে এসে বসল। এতটাই কাছে যে তার শাড়ির আঁচল ছুঁয়ে যাচ্ছে রৌদ্রিকের হাত। রৌদ্রিক এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো। তার পূর্ণ দৃষ্টিতে আটকে রইলো তূর্ণার মুগ্ধতা মিশানো দু’টি কাজলদিঘী চোখের উপর। টুংটাং গিটারের শব্দের সঙ্গে রৌদ্রিকের ভারী, কোমল কণ্ঠস্বর দ্বারা উচ্চারিত হচ্ছে…..
Kahin na kahin tere dil mein,
dhadkano mein dhal rahe hain hum
Tu Har Lamha.. tha mujhse juda..
Chaahe door tha main.. yaa paas rahaa

প্রভাত আজ ধীরলয়ে উন্মোচিত হয়েছে এক অদ্ভুত বিষণ্ন সৌন্দর্য নিয়ে। আকাশজুড়ে জমাট বেঁধে থাকা ধূসর মেঘপুঞ্জ সূর্যের দীপ্তিকে সম্পূর্ণ আড়াল করতে না পারলেও তার উজ্জ্বলতাকে করেছে নিস্তেজ, ক্লান্ত। চারপাশে এক ধরনের স্নিগ্ধ নীরবতা বিরাজমান,যেন প্রকৃতি নিজেই কোনো অদৃশ্য দুঃখ বুকে চেপে স্তব্ধ হয়ে আছে। গত রাতের মেহেন্দির উচ্ছ্বাস এখন শুধুই ছড়িয়ে থাকা ফুলের পাপড়ি, ম্লান হয়ে আসা আলোকসজ্জা, বিশাল অট্টালিকার প্রতিটি কোণায় আজ এক অদ্ভুত প্রশান্ত নৈঃশব্দ্য। কালকে বেশ রাত অব্দি জেগে থাকায় সবাই এখনো নিদ্রায় মগ্ন, তাই কাজ-বাজের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।
দোতলার দক্ষিণ পাশের বারান্দাটিতে বসে আছে তূর্ণা। হালকা গোলাপি রঙের একটা নরম শাড়ি জড়িয়ে রয়েছে তার শরীরে। খোলা চুলগুলো এলোমেলোভাবে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। তার সামনে ছোট্ট টেবিলের উপর রাখা বাটিতে নরম খিচুড়ি। আর তার ঠিক সামনেই বসে আছে রোদেলা। ছোট্ট মেয়েটার মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি। তূর্ণা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে চামচে করে খিচুড়ি তুলে খাইয়ে দিচ্ছে তাকে।

“ আরেক লোকমা… তারপর গল্প বলবো।”
“ না না, আল খাবু না।”
“ আর একটু পুতুল তাহলেই শেষ হয়ে যাবে। বর যদি দেখে তুমি খাওনি তাহলে খুব করা দিবে।”
তূর্ণার কথা শুনে রোদেলা হেসে ওঠে। হাত নাড়িয়ে বলে-
“ পাপা বতে না, আল খাবু না পেত ভলে গেতে তো।”
“ আচ্ছা ঠিক আছে, শুধু এক চামুচ তাহলেই শেষ।”
রোদেলা আর না করলো না, মুখ বাড়িয়ে মুখে পুরে নিলো পুরোটা খাবার। খেতে খেতে বিশাল একটা হাসি উপহার দিলো তূর্ণাকে। রোদেলা হেসে তূর্ণার গলা জড়িয়ে ধরলো। শিশুসুলভ সেই স্পর্শে তূর্ণার মুখশ্রী অদ্ভুত কোমলতায় ভরে উঠলো। তার দৃষ্টিতে এমন এক মমতা, যেন এই ছোট্ট প্রাণটিই তার সমগ্র পৃথিবী।
এই সময়ই বারান্দার পাশের করিডোর দিয়ে কয়েকজন মহিলা হেঁটে যাচ্ছিল। তাদের চোখ হঠাৎ আটকে গেলো তূর্ণা আর রোদেলার দিকে। মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো কারও কারও। একজন নিচু স্বরে বললো-
“ মেয়েটাকে দেখেছো? এমন ভাব করছে যেন রোদেলা ওরই মেয়ে।”
অন্যজন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠলো-

“ আরে ও তো মানসিক ভারসাম্যহীন। ওসব মানুষ নিজের আর পরের তফাৎ বোঝে নাকি?”
হঠাৎই তূর্ণার কর্ণকুহরেও দূরে বলা মহিলাদের কথা ভেসে এলো। না চাইতেও থমলে গেলো সে, এখন সে এতটাও অবুঝ নেই যে সে বোঝে না কার কথার কেমন ধরন। আরেকজন ধীরে বললো-
“ রৌদ্রিকের আগের বউ…কি যেনো নাম, ও হ্যাঁ প্রীয়তি। কত সুন্দর, মার্জিত মেয়ে ছিল এখন তো কত বড় ডাক্তার। ভাগ্যটাই খারাপ ছিল ছেলেটার সঙ্গে বাচ্চাটারও। এখন দেখো কেমন একটা পাগল মেয়েকে সামলাতে হচ্ছে।”
“ রোদেলাও তো আসলে প্রীয়তির মেয়ে। অথচ দেখো, এই মেয়ে কেমন নিজের সন্তান ভেবে বসে আছে!”
প্রতিটি শব্দ যেন সূক্ষ্ম ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো এসে বিদ্ধ হতে লাগলো তূর্ণার অন্তরজুড়ে। রৌদ্রিকের… আগেও স্ত্রী ছিল?শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে অদ্ভুত ভাবে প্রতিধ্বনি তুললো। আগের স্ত্রী,মানে বউ! রোদেলা… তার মেয়ে নয়? হঠাৎ করেই চারপাশটা যেন ঝাপসা হয়ে এলো তার কাছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ অনুভূত হতে লাগলো,যেন কেউ ধীরে ধীরে তার হৃদপিণ্ডটাকে মুঠোবন্দি করে চেপে ধরছে। তূর্ণা ধীরে মাথা তুলে সেদিকে তাকালল। বড় বড় চোখদুটো কেমন শূন্য হয়ে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে।

“ মিথ্যা…!!”
তার কণ্ঠস্বর ভীষণ নিচু, কাঁপা। মহিলারা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
“ আরে দেখো, বুঝতেই পারেনি বেচারি।”
“ মানসিক অবস্থাই তো ঠিক নেই।”
“ রৌদ্রিকও না… কোথা থেকে যে এমন মেয়েকে আনলো!”
“ চুপ করুন!”
হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠলো তূর্ণা। হঠাৎ এমন করে চিৎকার করে ওঠার কারণে,রোদেলা ভয় পেয়ে তূর্ণার গলা জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। মহিলাগুলোও কিছুটা ইতস্তত করলো হয়তো। তূর্ণার নিশ্বাস দ্রুত ওঠা-নামা করছে । চোখেমুখে আতঙ্ক, কষ্ট, অবিশ্বাস সব মিলেমিশে এক বিভীষিকাময় অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে।
“ উনার… উনার আগে বউ ছিল?”
নিজের মনেই প্রশ্ন করলো। সে রৌদ্রিকে বউ তাহলে সামনে থাকা মহিলাগুলো এমন কথা কেনো বলছে? সে পাগল এটা বলায় যতটা না কষ্ট পায়নি তার থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছে মহিলাদের বাকি কথায়। রোদেলা তার মেয়ে নয়, তার বরের বউ ছিল আগে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রোদেলাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথা নাড়তে লাগলো বারবার।

“ না… না… পুতুল আমার… আমার মেয়ে…!”
তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।
“ ও আমার বাচ্চা… আমার…!!”
মহিলাগুলোর একজন বিরক্ত গলায় বললো-
“ দেখেছো? আবার শুরু হলো।”
“ বলেছিলাম না, মেয়েটা স্বাভাবিক না।”
তূর্ণা এবার রোদেলাকে এক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে নিজের কানে দু’হাত চেপে ধরলো। যেন আর একটি শব্দও শুনতে চায় না। কিন্তু শব্দগুলো থামছে না।
প্রীয়তি,আগের স্ত্রী,পাগল,ভারসাম্যহীন।প্রতিটি শব্দ তার মস্তিষ্কের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে।
“ না-আ-আ!”
চিৎকার করে উঠলো সে। তারপর আচমকাই সামনে থাকা ফুলদানি ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো মেঝেতে। কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে।
রোদেলা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠলো। তূর্ণা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এক মানুষ। তার চোখদুটো লাল, অশ্রুসিক্ত হয়ে আছে, ঠোঁট কাঁপছে অসংলগ্নভাবে।

“ উনি আমার… শুধু আমার…” ‘কণ্ঠটা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে।
“ রোদেলাও আমার…”
এই মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এক আহত পাখি নিজের শেষ আশ্রয়টুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতা তার ভঙ্গুর মানসিকতার উপর এমন নির্মম আঘাত হেনেছে, যা সে ধারণ করার মতো প্রস্তুত ছিল না। আর চারপাশের মানুষগুলো? তারা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে একটি কোমল, ভাঙাচোরা মনের ধীরে ধীরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। আপর পাশের মানুষ দু’টো বার ভাবে না তাদের এমন তিক্ততায় ভরা বাক্য কারো হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে দু’দন্ড সময় নেয় না। তাদের এই সামান্য বাক্য কারো জন্য মানসিক যন্ত্রণা হয়ে উঠতে পারে সেটা তারা উপলব্ধি করে না বলেই। এইভাবে কথাগুলো বলে যায়, বিপরীত পক্ষের মানুষটার অবস্থা ভাবে না তার উপর কেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। রোদেলা কেঁদে গেলো তূর্ণার কান্না দেখে! অবুঝ শিশুটাও যেনো তূর্ণার কষ্টটাকে আপন মনে করে কেঁদে যাচ্ছে সমান তালে।
মহিলাগুলো বেগ ভয় পেলেন। আশেপাশে তাকালেন কেউ দেখলো কিনা। তখনই করিডোরের অপরপ্রান্তে ভেসে উঠলো ভারী পদধ্বনি কানে আসতেই মহিলাগুলো আর দাঁড়ালো না। দ্রুত সেই জায়গায় প্রস্থান করলো। রৌদ্রিক উপরেই উঠছিল, একসঙ্গে দু’জনের কান্নার শব্দ কর্ণকুহরে আসা মাত্রই দ্রুত এদিকটায় এগিয়ে এলো। তূর্ণা তখন হাত বাড়িয়ে রোদেলাকে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে কেঁদে যাচ্ছে, রোদেলাও তূর্ণার কান্না দেখে ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদছে।
রৌদ্রিক একমুহূর্ত দেরি না করে ছুটে আসলো তাদের দিকে। রোদেলা বাবাকে দেখা মাত্রই হাত বাড়িয়ে কোলে যেতে চাইলো, রৌদ্রিক দেরি না করে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে বলে-

“ মা কাতে! মা কাতে!”
“ দেখছি তো মা, কান্না বন্ধ কর তো লক্ষীটি! পাপা এসেছি তো।”
বলেই মেয়েকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে তূর্ণার পানে চাইলো। মেয়েটা আপন মনেই কেঁদে যাচ্ছে।
“ তূর্ণা! কান্না থামাও, কাঁদছো কেনো? কেউ কিছু বলেছে? আমায় বল, কে কি বলেছে।”
তূর্ণা অশ্রুসিক্ত চোখে রৌদ্রিকের দিকে তাকালো। কান্নার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার! নিজের কান্নাকে দমাতে চাইছে, কিন্তু কোনোভাবে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। শব্দগুলো যে নিজের মাঝে ঝট পেকে যাচ্ছে। বহু কষ্টে হেঁচকি তুলতে তুলতে ভাঙা কণ্ঠে বলে ওঠে-
“ আ..আপনার আগেও ব..বউ ছিলো বর! ত..তাই আ.আমায় ভালোবাসেন না! আ..আগের বউকে ভালোবাসেন তাই না!”
বলেই আবারও কেঁদে ফেললো মেয়েটা। রৌদ্রিক বুঝলো না সে কি বলবে, এমনটা নয় যে সে তূর্ণা কিংবা তার পরিবারের কাছে তার প্রথম বিয়ের কথা লুকিয়েছে। তূর্ণার মানসিক অবস্থার কারণে তূর্ণা জানতো না এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। হঠাৎ এতদিন পর এই কথা তূর্ণা জানলো কিভাবে সেটা বুঝলো না রৌদ্রিক। তবে এতটুকু বুঝলো কারো থেকে জানতে পেরেছে যার কারণে তীব্র কষ্ট থেকে মেয়েটা কেঁদে ফেলেছে।

“ লিসেন তূর্ণা, কান্না থামাও। শ্বাস নাও আগে, আর এইসব কে বলেছে তোমায়?”
“ না থামাবো না, আ..আপনি তো আমার বর! তাহলে কেনো ওরা বললো আপনার আমার আগেও বউ ছিল। আমার পুতুল আপনার আগের বউয়ের!”
“ হ্যাঁ আমি তোমার বর! শুধু তূর্ণার বর। অতীতের পাতায় তোমার আগমন আমার জীবনে ছিলোনা। তুমি ছিলে আমার জন্য পরনারী, কিন্তু আমার বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবটাই তোমাকে ঘিরেই। তুমি ব্যতীত আমার জীবনে আর কোনো নারীর স্থান নেই।”
তূর্ণার অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। ঢলে পরতে নিলে রৌদ্রিক একহাতে তূর্ণার দূর্বল দেহটা নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়। অসহায় চোখে তূর্ণার ক্রন্দনরত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকলো।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৭

“ তুমি আমার জীবনের দ্বিতীয় নারী হলেও আমার পুরো জীবনটা তোমার নিলামে লিখা তূর্ণা! তুমি দ্বিতীয় হয়ে এসেও আমার অন্তরে পুরোটা জায়গা করে নিয়েছো। তাহলে কি করে তুমি দ্বিতীয় নারী হও আমার বল!”
তূর্ণার জানা নেই এত কঠিন কথার মানে। অনিমেষে বুঁজে নিলো নেত্রপল্লব জোড়া, রৌদ্রিক অতি সাবধানে নিজের সঙ্গে আগলে রাখলো তূর্ণাকে। এরজন্য তার এইসব অনুষ্ঠান পছন্দ নয়, এটারই ভয়ে ছিলো। তূর্ণাকে কেউ কিছু বলে দিবে এত ভিরের মাঝে। মেয়েটাকে না জেনে-বুঝে কষ্ট দিতে দু’বার ভাববে না, অপর পাশের মানুষগুলো।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৯