Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৩
ফাহিমা ইসলাম

নিস্তব্ধতা গ্যাস করে নিয়েছে সারা ড্রইংরুম জুড়ে। পিনপিন নিরবতায় আচ্ছন্ন সকলেই। সকলেই গম্ভীর ভাবে বসে আছে, কিছু সময় পর সেখানে শ্রাবণ উপস্থিত হলো। সবে মাত্র শাওয়ার নিয়ে বের হওয়ায়, ভেজা কাঁধ সমান চুল থেকে গড়িয়ে পরছে জলবিন্দু। যা হালকা করে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার পিছন দিকার শার্টটা। শ্রাবণে বাবা জামান সিকদার শ্রাবণের দিকে এগিয়ে এসে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে-
“ এইসব কি শ্রাবণ? আর বিয়ে কবে করেছো তুমি?”
শ্রাবণ তার বাবার কথা শুনে শান্ত দৃষ্টিতে একবার সকলের পানে চাইলো। সবাই তার মুখ থেকে কথা বের হওয়ার অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে; শ্রাবণ দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে নিয়ে, দম ছেড়ে বলে-

“ ওইবার চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম সেখানেই ইরার আর আমার বিয়েটা হয়েছে। তাও আকস্মিক ভাবে আমরা দুইজনের কেউ তৈরি ছিলাম না বিয়েটার জন্য। ”
“ ব্যবসার কাজে গিয়েছিলে তুমি, তাহলে বিয়ে কি করে হয়ে যায় তোমার?”
শ্রাবণ বুঝতে পারছে সবাই প্রথম থেকে সবকিছু খুলে না বললে। কিছুই বুঝতে পারবে না এই ব্যপারে।
*অতীত*
চট্টগ্রামের শ্রাবণের আকাশ সেদিন অস্বাভাবিক রকমের ভারী। যেন অনন্তকাল ধরে জমে থাকা কোনো অপ্রকাশিত বেদনা এক নিমিষে ঝরে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। চারিদিকে নীরবতার গাঢ় চাদর বিছানো, মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের চিকচিক আলোকচ্ছটা সেই স্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে তুলে ধরছে প্রকৃতির অন্তর্লীন অস্থিরতা। ব্যবসার কাজে দশদিনের মত শ্রাবণ চট্টগ্রামে এসেছে, আজকে রাতটুকু থেকে সকালে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিবে সে। কাজ শেষ হওয়ায়, চট্টগ্রামের এদিক-ওদিক ঘোরার জন্য বের হয়েছিল। যখন হোটেল থেকে বের হয়েছি আকাশ একদম পরিষ্কার,ঝলমলে ছিল। শ্রাবণ বরাবরই হাইকিং করতে পছন্দ করে, তাই আজকের দিনটা মেধস মুনি আশ্রম পাহাড় বেছে নিয়েছিল। লোকালয় ভীর থেকে একদম দূরে, বেশ ভোরে বের হয়েছিল, আর এখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসবে বলে।

ঝিরিঝির বৃষ্টির পানি পাহাড় সম্পূর্ণ পিচ্ছিল হয়ে পরেছে। চারিপাশ থেকে বজন কীটপতঙ্গের শব্দ ভেবে আসচ্ছে। এই পাহাড়ে বেশ সময় নিয়ে উঠেছে, আর এখন নামতে বেশ বেগ পোয়াতে হচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তা শুঁকনো থাকলে এই কষ্ট আর হতো না। হাতে থাকা ছোট্ট টর্চ লাইটা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলতেই, কারো ছুটে আসার শব্দ শ্রাবণে কর্ণকুহরে প্রবেশ করে। আশেপাশে যেদিক চোখ যায় ঘন গাছ-পালা দিয়ে ভরা।
কাঁদামাটিতে ভেজা সরু পথ ধরে দিশেহারা ভঙ্গিতে ছুটে চলেছে ইরা। এলোমেলো চুলগুলো বৃষ্টির জলে সপসপে হয়ে গালে লেপ্টে আছে, শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী, চোখে একরাশ আতঙ্কের ছায়া। যেন অজানা কোনো বিপদের গ্রাস থেকে নিজেকে মুক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সে। পা কে’টে র’ক্ত বের হচ্ছে কোনোদিনকে হুস নেই তার, এলোমেলো পাশে দৌঁড়ানোর ফলে, সামনে থাকা কোনো কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে। হুট করে প্রস্তর বুকের সঙ্গে বারি খেয়ে,নহঠাৎ করেই পা হড়কে পড়ে যেতে নিলো ইরা, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে এক শক্ত, উষ্ণ করতল তার বাহু আঁকড়ে ধরলো।
ইরা মনে হলো এই বুঝি তার জীবন শেষ। দূর্বল শীর্ণ শরীরটা নেতিয়ে পরতে নিলো। নিভু নিভু চোখে দিনের অবশিষ্ট আলোয়, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর শ্রাবণকে দেখতে পেলো। এতক্ষণ ধরে বুনো শু’য়োরের নিকট থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য, প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটছিল সে।

“ আর ইউ ওকে?!”
গভীর, ভারী কণ্ঠস্বরটা কানে যেতেই কেঁপে উঠলো ইরা। চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো বৃষ্টির মধ্যে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা পুরুষ। বৃষ্টিভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জোড়া অন্ধকার ভেদ করে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। এই বিপর্যস্ত রাতেও তার উপস্থিতি অদ্ভুতভাবে দৃঢ়, প্রভাবশালী
“কে… কে আপনি?”
কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো ইরা। সামনে পুরুষটি একই গাম্ভীর্য বজায় রেখে সংক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিলো,
“শ্রাবণ।”

ইরা আর কথা বলতে পারলো না, দূর্বল শরীরটা লুটিয়ে পরলো কর্দমময় মাটির উপর। শ্রাবণ তখনোও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইরার দিকে। বৃষ্টি ভেজা অবস্থা ইরাকে দ্বিতীয় দফার মতো দেখছে শ্রাবণ। মোটেও তার চিনতে অসুবিধা হয়নি ইরাকে চিনতে তার। ইরা সবার সঙ্গে এইদিকে বেরাতে এসেছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে সবার সঙ্গে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে হারিয়ে গেছে। হাতে থাকা ফোনের ব্যাটারিও শেষ হয়ে গেছে। সে হারিয়েছে সেই তিনটার দিকে, অনেক খোজা খুঁজির পরও কাউকে খুঁজে পায়নি। একেই অপরিচিত জায়গা তারউপর পাহাড়ি এলাকা; সবমিলিয়ে ইরা একপ্রকার দিশেহারা। সূর্য ঢোবার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি বনজ হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণে কবলে পরে। সেই থেকে প্রাণ রক্ষার ক্ষাতিরে ছুটে চলেছিল সে। এলোমেলো পায়ে ছোটার কারণে পায়ে আঘাত পাওয়ার কারণে পায়ের অবস্থা বেহাল!
” আমাকে একটু সাহায্য করুন প্লিজ। আমার ফোনে চার্জ নেই, আপনার ফোন থেকে একটা কল করতে দিবেন?”
কাঁপা কাঁপা গলায় আকুতির স্বরে জিজ্ঞেস করে। শ্রাবণ ইরার দিকে গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ ফোনে চার্জ নেই।”

শ্রাবণের ছোট কথাটুকু ইরার চোখে বর্ষ আনার জন্য যথেষ্ট ছিল। এতক্ষণের সাহস সব ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে তার। শ্রাবণকে এখন বড্ড ভয়ানক লাগছে তার নিকট। যদি তার সঙ্গে উল্টাপাল্টা কিছু করে দেয় তখন? ইরাকে কাঁদতে দেখে, শ্রাবণ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে-
“ কাঁদবেন নাকি যাবেন?”
“ম. মানে..??”
“ এখানে কি থাকার ইচ্ছে আজীবনের জন্য নাকি বাড়ি ফিরতে চান?”
ইরা হয়তো একটু সাহস পেলো। হাত দ্বারা চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ায়। হুট করেই মুষলধারে বৃষ্টি পরতে শুরু করে। চারিদিকে কুটকুটে অন্ধকারের হয়ে গেছে, যতটুকু আলো ছিল সেইটুকু সম্পূর্ণ ঘায়েব হয়ে আকাশপট কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুইয়ে যাচ্ছে ধরণীর সকল ধূলিকণা, দিয়ে যাচ্ছে শুধুই স্নিগ্ধতা। ইরা কোনো রকমে উঠে দাড়ায়, শ্রাবণ ভালো করে চারিদিকে তাকালো। এমন বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামা একদমই ঠিক হবে না। রাস্তা সম্পূর্ণ পিচ্ছিল হয়ে গেছে, পাহাড় ঢলসে পরতে পারে।

“ যাবেন না?”
“ না, এখন এখান থেকে যাওয়াটা বিপদজনক।”
“ তাহলে কি করবো?”
“ অপেক্ষা করুন।”
ইরার ঠান্ডায় কাঁপছে, অনেকক্ষণ ধরে ভিজা অবস্থায় থাকার কারণে সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ইরা ভয়ে ভয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছে, হুট করেই শ্রাবণের গায়ে জড়ানো লেদার জ্যাকেটটা ইরার দিকে ছুঁড়ে মারে। ইরা প্রশ্নবোধক চাহনিতে শ্রাবণের দিকে তাকালো।

“ মাথার উপরে দিন। ঠান্ডা কম লাগবে।”
কথাটুকু বলা শেষ হতেই চারিপাশটা নিস্তব্ধতায় গ্যাস করে নেয়। শুধু বৃষ্টির তীব্র শব্দ ও ক্ষণে ক্ষণে হওয়া বজ্রপাতের শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামার কোনো নাম নেই, অনেকটা সময় পার হয়েছে। তবু বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, এইদিকে ইরার শরীরটা আর এইসব নিতে পারলো না। দূর্বল শরীরটা মাটিতে পরে গেলো, শ্রাবণ পরে থাকা বৃষ্টির মধ্যে ইরার লুটিয়ে থাকা দেহটার দিকে তাকালো। সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পরে আছে, শ্রাবণ আর অপেক্ষা করলো না বৃষ্টি থামার। না চাইতেও হাত বাড়িয়ে ইরাকে পাঁজকোল তুলে নিলো। পিচ্ছিল রাস্তা ধরেই অতি সাবধানে নামতে থাকে, এখান থেকে অনেকটা কাছেই একটা মন্দির রয়েছে। সেই অব্দি ভালো ভাবে যেতে পারলেই সেখানে অবস্থা করবে।

বৃষ্টি থামতে থামতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে গেছে, মন্দরিরের এক সাইডে দেয়ালের সঙ্গে বসে আছে শ্রাবণ। তার কাঁধে ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে, জ্বরে তার সারা শরীর গরম হয়ে আছে। শ্রাবণ ইরার শরীরের তীব্র গরম উষ্ণতা অনুভব করতে পারছে। কিন্তু এখানে কিছু করার নেই, বৃষ্টি কমেছে কিছুখন আগেই। ইরার অবস্থা বেহাল, জামা-কাপড়ের অবস্থা আরও ভয়ানক। পাহাড়ি কাটাযুক্ত গাছের সঙ্গে লেগে জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। শ্রাবণ তার জ্যাকেট দ্বারা ইরার শরীরটা ঢেকে রেখেছে।
চারিদিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন, শ্রাবণ এখানে আর থাকতে চাইলো না। তাই উঠে দাঁড়ালো যাওয়ার জন্য, এইদিকে পাহাড়ি রাস্তা তার চেনা। এর আগে ৩ তিন বার এসেছে এখানে, তাই সবকিছুই চেনা। শ্রাবণ ইরাকে ডাকার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল,ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো লোক কজনের চিৎকার লণ্ঠনের ম্লান আলো ক্রমশ কাছে আসছে।
“ওইদিকে! কেউ আছে!”

পরিস্থিতি বুঝতে দেরি হলো না শ্রাবণের। এইদিকে কেউ আসচ্ছে কিছু সময় পর সেখানে কয়েক জন এসে উপস্থিত হয়েছে। লণ্ঠনের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি একে অপরের দিকে তাকালো। চোখে সন্দেহ, ঠোঁটে চাপা গুঞ্জন।
“তোঁয়ারা হনে? ইয়েনত এত রাইতত কি গরর তোঁয়ারা?” (তোমরা কে? এইখানে কি করো তোমরা এতরাতে?)
শ্রাবণ মানুষগুলের কথা কিছুই বুঝলো না। লোকগুলোর নজর পরলো ইরার উপর, বেশ এলোমেলো হয়ে থাকার কারণে মানুষগুলো মনে সন্দেহ দলা পাকলো।
“তোঁয়ারা এত রাইতত ইয়েনত কিল্লাই? আর এন গরি এই মন্দিরত কি গরর? নষ্টামি গরিত্তে আইস্সো না ইয়েনত?”
(তোমরা এত রাতে এখানে কেনো? আর এইভাবে এই মন্দিরে কি করো? নষ্টমি করতে এসেছো এখানে?)
শ্রাবণ এবারও বুঝতে সক্ষম হলো না তাদের কথা। তাই নিজের অবস্থা পরিষ্কার করার জন্য বলে-
“ দেখুন আমরা আসলে বৃষ্টির কবলে পরেছি। তাই এখানে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নিয়েছি।”
লোকগুলোর হয়তো বিশ্বাস হলো না শ্রাবণের কথা। কারণ ইরার শরীরের শ্রাবণের জ্যাকেট দেওয়া তারউপর দুইজনের অবস্থাই বেহাল।
“আইচ্ছা ঠিক আছে মানিলাম, কিন্তু তোঁয়ারা কি জামাই-বউ নি?”
এই কথাটুকু বুঝলো শ্রাবণ, লোকগুলোর কথার মানে সম্পূর্ণ বুঝতে সক্ষম হলো শ্রাবণ। যখন যদি বলে,তারা কেউ কাউকে চেনা তাহলে আর এক বিপদ।

“ জ্বী”
লোকগুলো বিশ্বাস করলো কিনা জানা নেই। তাদের দিকে এখনে সন্দেহপ্রবন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, শ্রাবণ এখানটায় আর থাকা ঠিক মতে করলো না। আস্তে করে ইরাকে ডাকতে শুরু করলো,
“ এই ওঠ, বাড়ি যেতে হবে।”
না চাইতেও শ্রাবণ ইরাকে তুমি বলে সম্মোধন করছে। কিছুখন ডাকাডাকি পর ইরা দূর্বল চোখে তাকালো। জ্বরের ঘোরে চিনতে পারলো না শ্রাবণকে, সঙ্গে এতগুলো মানুষ দেখে অনেকটা ঘাবড়িয়ে গেছে সে।
“ আ…আপনি কে? ”
ইরার কথায় লোকগুলো যেনে আরও গম্ভীর হয়ে এলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে আছে, শ্রাবণ অবস্থা বেগতিক দেখে চাপা স্বরে বলে-

“ জ্বরের ঘোর কি বলছো এইসব? ওঠ বাড়ি যেতে হবে। বৃষ্টি কমে গেছে।”
“ না আমি যাবো না, আপনি কে? আপনাকে ধরবেন না একদম।”
হালকা চিৎকার করে বলে ওঠে ইরা। মানুষগুলোর মধ্যে একজন এবার সন্দেহ নিয়ে বলে ওঠে-
“তুঁই যে হইলা তোঁয়ারা জামাই-বউ, তইলে এইগুন কি?” ( তুমি যে বললা তোমরা স্বামী-স্ত্রী তাহলে এইসব কি?)
“ জ্বরের ঘোরে উল্টাপাল্টা বলছে ও আসলে।”
শ্রাবণের কথা কেউ আর কানে তুললো না।
“না ইতে মিছা হইতেছে, ইতারার গা-গতরর অবস্থা চাইঅন। চাইলেই বুঝা যার নষ্টামি গইর্জে, এহন বাঁচিবের লাই এইল্লে হইতেছে। এই মন্দিরত এত বড় গুনাহ গইর্জে, ইতারারে এন গরি ছাড়ি দন ন যাইবো।”
“তইলে কি গইর্তাম ইতারারে?”
“বিয়া গরাই দঅন, তইলে উচিত শিক্ষা অইবো। নষ্টামি গরিত্তে আইয়ে ইয়েনত, নয় নি!”
“মকলেস মিয়ারে ডাহন, ইতে তো কাজি। ইতারারে ইক্কে বিয়া পড়াই দক।”
শ্রাবণ যতদূর বুঝলো বিয়ের কথা হচ্ছে। শ্রাবণ তাদের একে একে সব কথা খুলে বললো কিন্তু কেউ আর বিশ্বাস করলো, তাদের একপ্রকার জোর করে সেই রাতে বিয়ে পরানো হয়। ইরা জ্বরের ঘোরে তাকে যা বলা হয়েছে সে সেটাই মেনে নিয়েছে। শ্রাবণ শত বলেও আটকাতে পারেনি সেদিন।

“ এতকিছু হয়ে গেছে তুমি একবারও আমাদের জানাওনি কেনো?”
“ পরিস্থিতিটা তোমাদের জানানোর মত ছিলনা যে জানাতাম। তাছাড়া আমরা কেউই এই বিয়েতে রাজি ছিলাম, তাই মেনে নেওয়ারও প্রশ্ন ছিল না।”
নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিলল শ্রাবণ। সবাই আর কি বলবে খুঁজে পেলো না, বিয়ে যেহেতু হয়েছে তাই আর কিছু করার নেই।
“ তাহলে তুমি বিয়ে মেনে নিচ্ছো? মেয়ের পরিবার জানে এইসব?”
“ না ওনারাও জানে না, হুট করেই ওকে নিয়ে এসেছি।”
“ এতদিনে আমাদের বিষয়টা জানাতে পারতে, তাহলে দুই পরিবার মিলে একটা সুষ্ঠ স্বাভাবিক বিয়ে দিয়ে মেয়েটাকে আমাদের বাড়িতে তুলতে পারলাম। এইভাবে বিয়ের আসর থেকে তুলে এনেছো ওকে,এতে করে কতটা অপমান হতে হবে তুমি জানো?”
এতক্ষণে রাশেদুল সিকদার মুখ খুললেন। শ্রাবণ রাশেদুল সিকদারের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ বড় বাবা, যদি ওমন পরিস্থিতি থাকতো বিশ্বাস কর আমি সব বললাত। হুট করেই ওকে মেনে নিয়েছি তাই তোমাদের জানানোর সময় পাইনি।”
আর কেউ কোনো কথা বললো না। কিছু বলারও নেই, কি বলবে যা হওয়ার হয়ে গেছে চাইলেও এখন কিছু বদলাতে পারবে না তারা।
“ মেয়েকে বলিও ওর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো তাদের বাড়ি, তারপর সুষ্ঠ ভাবে বিয়েটা করেই ঘরে তোমার বউ তুলবো।”
শ্রাবণ কিছু বললো না মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো শুধু।

“ তুমিই কি শ্রাবণ ভাইয়ের বউ?”
অতি আনন্দের সঙ্গে কথাটুকু বলে উঠলো তূর্ণা। ইরা মাথা নিচু করে বসেছিল, হঠাৎ কারো কণ্ঠস্বর পেয়ে মাথা তুলে তাকাতেই তূর্ণাকে দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে যায়। তূর্ণা এখানে কিভাবে? ইরার বুঝতে খানিকটা সময় লাগলো, তারপর হিসাব মিলাতে বুঝতে পারলো শ্রাবণের ভাইয় মানে রৌদ্রিক সিকদার শ্রাবণের ভাই হয়।
“ তূর্ণা তুমি? কেমন আছো?”
ইরাকে দেখা মাত্রই তূর্ণার ইরাকে চিনতে ভুল হলো না। ইরাকে দেখে একপ্রকার সে খুশি হয়ে গেলো।
“ ইরা আপু তুমি! তুমি কি শ্রাবণ ভাইয়ের বউ হও?”
ইরা মুখ ফুলে কিছু বললো না। তূর্ণার খুশি হয়ে ইরাকে আচমকাই জড়িয়ে ধরলো, রূপার বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে ইরাই একমাত্র যেকিনা সেজে তার সঙ্গে কথা বলতো। বাড়িতে গেলে লুকিয়ে তাকে খাওয়ার জিনিস দিতো।
“ আমি খুব খুশি হয়েছি ইরা আপু, তুমি এখন আমার সঙ্গে এই বাড়িতে থাকবে। তুমি না খুব ভালো, শ্রাবণ ভাইয়ার বউ হয়ে এসে আরও ভালো করেছো।”

“ তুমি খুশি আমাকে এখানে দেখে?”
“ খুশি মানে খুব খুব খুশি! এখন আর তোমাকে লুকিয়ে কিছু দিতে হবে না। তূর্ণার এখন সব আছে, আমার বর আমাকে সবকিছু এনে দেয়।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২২ (২)

তূর্ণার কথা শুনে না চাইতেও ইরার ভালো লাগলো। তূর্ণার অধরভাজে লেগে থাকা মনোমুগ্ধকর হাসিটার দিকে চেয়ে থাকলো। মেয়েটা অল্পতেই খুশি হয়ে যায়, অথচ নিজ বাড়িতে সেই অল্প খুশি হওয়ার কারণটুকু পেতো না। তূর্ণার এমন অবস্থা দেখে ইরার না চাইতেও মনটা ভালো হয়ে গেলো, ইরা তূর্ণার গালে হাত রেখে নরম স্বরে বলে-
“ আরও সুখী হও তূর্ণা, জীবনে আরও সুখ আসুক তোমার জীবনের দোয়ারে।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৪