অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৫
ফাহিমা ইসলাম
আবহাওয়ার শরীরে আজ এক অদ্ভুত বিষণ্নতার আস্তরণ। দুপুরের প্রহর ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে গোধূলির অতল গহ্বরে। পশ্চিম আকাশে হেলে থাকা দিবাকর যেন বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে নিজের সমস্ত ক্লান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। শহরের ব্যস্ত সড়ক আজও মানুষের পদচারণায় মুখর, অথচ সেই কোলাহলের মাঝেও কোথাও যেন এক অদৃশ্য নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে। বিশাল ফ্ল্যাট জুড়ে পিনপিন নিরবতায় ছেয়ে আছে। দূরে কোথাও বৃষ্টির পূর্বাভাসে কাকেরা ছিন্নবিচ্ছিন্ন সারি বেঁধে উড়ে চলেছে আপন গন্তব্যে। প্রকৃতি আজ যেন কোনো অনিবার্য ঘটনার পূর্বভূমিকা রচনা করছে।
হোসেন বাড়ির অভ্যন্তরও আজ অস্বাভাবিক রকমের নিশ্চুপ। চারপাশে সাজসজ্জা, আতিথেয়তার প্রস্তুতি, মানুষের আনাগোনা সবই আছে, তবুও যেন প্রাণ নেই কোথাও। বিয়ে পরার আগ মুহূর্তে যদি বিয়ের কনে পালিয়ে যায়, সমাজে সেটার কি রূপ প্রভাব পরে সেটা সকলেরই জানা। মেয়ে পালিয়ে যাওয়া বিষয়টা সমাজে কেউই ভালো চোখে দেখে না, সেটা যদি হয় দ্বিতীয়বারের মত তাহলে তো কথাই নেই।
শ্রাবণের পরিবার আজ ইরাদের বাড়িতে এসেছে। যে বাড়ি থেকে পাঁচ দিন আগেই এই বাড়ির কন্যা পালিয়ে গিয়েছিল বিয়ের আসর ছেড়ে। নিজের আকস্মিক ভাবে হওয়া স্বামীর হাত ধরে। সেই রাতটি শুধু একটি পরিবারের সম্মানেই আঘাত হানেনি, বরং সম্পর্কের বিশ্বাসকেও ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। সমাজের দৃষ্টিতে ইরা হয়েছে অবাধ্য, বেপরোয়া, কলঙ্কিনী। আর তার পরিবার? তারা হয়েছে উপহাসের নীরব পাত্র। আজ পাঁচ দিন পর সেই ক্ষতস্থানে প্রলেপ দিতেই এসেছে শ্রাবণের পরিবার। কেউই ইরার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে চাইছিলো না, এই কয়েকদিন অনেক মানানোর চেষ্টা করেছে ইরা। তবে সফল হয়নি, তাই আজকে না বলেই চলে এসেছে সিকদার পরিবার। উদ্দেশ্য একটাই, সম্পর্কটাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া, সমস্ত অস্বস্তি ও কলঙ্কের পর্দা সরিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক করে তোলা।
ড্রয়িংরুমজুড়ে এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা বিরাজমান। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না । ইরার বাবা সাদাদ হোসাইন সোফার এক কোণায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তার চোয়াল শক্ত, চোখের নিচে স্পষ্ট ক্লান্তির রেখা। একজন পিতার ভাঙা আত্মসম্মান কখনো শব্দ করে প্রকাশ না পেলেও, তা চোখের নীরবতায় জমে থাকে। অপরদিকে শ্রাবণের বাবা অত্যন্ত সংযত ভঙ্গিতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তার কণ্ঠে ভদ্রতা থাকলেও, ভেতরে ভেতরে তিনিও উপলব্ধি করছেন এই সাক্ষাতের অস্বস্তিকর ভার। কিন্তু এই মুহুর্তে এতকিছু ভাবলে চলবে না।
ইরা রুমের এক কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে হালকা রঙের শাড়ি, অথচ মুখজুড়ে কোনো নববধূসুলভ আভা নেই। বরং চোখেমুখে জমাট বেঁধে আছে অপরাধবোধ, সংকোচ আর না বলা শত অনুভূতির ছাপ। এই বাড়িতেই সে বড় হয়েছে, এই দেয়ালগুলোর সাথেই জড়িয়ে আছে তার শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। অথচ আজ নিজ গৃহেই সে যেন ভীষণ অপরিচিতা। তার মা একবারও মেয়ের দিকে তাকাচ্ছেন না। মায়ের এই নীরবতাই যেন সবচেয়ে নির্মম শাস্তি ইরার জন্য। আনিকা হোসেন ইরার বেস্টফ্রেন্ডের মত, তাই মায়ের এমন নিরবতা ইরাকে বেশি পিরা দিচ্ছে। কখনো কখনো শব্দের চেয়ে নীরব অভিমান মানুষকে অধিক ভেঙে দেয়।
শ্রাবণ নিঃশব্দে ইরার দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার চোখের ভেতরে জমে থাকা আতঙ্ক সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। অথচ এই সমস্ত পরিস্থিতির জন্য কোথাও না কোথাও সে নিজেও দায়ী। ইরা তার কাছে এসেছিল,কিন্তু সেই সময় সে উপেক্ষা করে গেছিলো বিষয়টা। নীরবতা ভেঙে হঠাৎ করেই ইরার বাবা গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন-
“ সমাজের কাছে অপমানিত হতে খুব বেশি সময় লাগে না, সিকদার সাহেব। কিন্তু সেই অপমান বুকে নিয়ে বাঁচতে হয় বছরের পর বছর।’
বাক্যগুলো শান্ত ছিল, কিন্তু তার অন্তর্গত যন্ত্রণা যেন পুরো ঘরটাকে ভারী করে তুললো। শ্রাবণের বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণের দিকে একবার তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন-
“ আমি জানি, যা হয়েছে তার ক্ষমা হয় না। কিন্তু ছেলেমেয়েরা ভুল করেই ফেলে কখনো কখনো। আমরা চাই আজকের পর থেকে সবকিছু নতুন করে শুরু হোক।”
ইরা নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। সে জানে, তার হুট করে শ্রাবণকে বেছে নেওয়ার অধিকার তার ছিল। তবুও এই মুহূর্তে বাবার ভাঙা কণ্ঠস্বর শুনে নিজেকে ভীষণ স্বার্থপর মনে হচ্ছে তার। আনিকা হোসেন কিছু বললে না, তিনি পুরুষদের মাঝে এখন না কথা বলাই শ্রেয় মনে করলেন। ইরার ভাই ইকরাম এখানে নেই, ছেলেটাকে আসতে বারণ করে দিয়েছেন আনিকা হোসেন। রাগের মাথায় কি করে বসে তার ঠিক নেই।
“ আপনার ছেলে ইরাকে পছন্দ করে থাকলে আমাদের জানাতেন। আমরা তো আর বাঁধা দিতাম না, ইরার খুশিতেই আমাদের খুশি ছিল। কিন্তু বিয়ের দিন এইভাবে ভরা মানুষের সামনে অপমান না করলেও পারতো আপনার ছেলে।”
সাদাত হোসেনের কথা শুনে বুঝতে পারলেন এই বাড়ির কেউ হয়তো তাদের মত ইরা আর শ্রাবণের বিয়ের কথা জানে না। রাশেদুল সিকদার ভাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে, হালকা গম্ভীর স্বরে বলেন-
“ দেখুন সাদাত সাহেব, আপনার অবস্থাটা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু ছেলেমেয়ের বিয়ে আর ৪ মাস আগেই হয়ে গিয়েছে। তাই যদি আপনার মেয়ের বিয়েও হত তাহলে সেটার পাপের ভাগিদার আপনাদেরও হতে হতো।”
রাশেদুল সিকদারের কথায় চমকালে ইরার পরিবার। আনিকা হোসেন এবার তীর্যক দৃষ্টিতে চাইলেন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ের পানে। ইরা মাথা নিচু করে রেখেছে।
“ মানে? চার মাস আগে কিসের বিয়ে হয়েছে?”
রাশেদুল সিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে সংক্ষেপে সব বললেন। সব শুনে ইরার পরিবার পুরোই স্তব্ধ! এতকিছু ঘটে গেছে আর তারা কিছুই জানে না।
“ আশা করি আপনাদের আর এই বিয়েতে কোনো সমস্যা নেই। এমনিও ওদের বিয়ে হয়ে গেছে, এখন আমরা খালি সসম্মানে ছেলের বউকে ঘরে তুলতে চাই। এতে করে সমাজে আপনাদের যে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে, সেটা কিছুটা হলেও কমবে। কেউ তখন প্রশ্ন তুলতে পারবে না আপনাদের ওপর।”
শান্ত গলায় কথাগুলো বলে থামলেন রাশেদুল সিকদার। সাদাত হোসেন এবার গম্ভীর দৃষ্টিতে নিজের মেয়ের পানে চাইলেন। ইরা তার বড্ড আদরের, সবসময় যা চেয়েছে তাই দেওয়ার চেষ্টা করেছে। মেয়ের কোনো প্রকার কষ্ট তিনি হতে দেননি। আর রাশেদুল সিকদারও ভুল কিছু বলছে না, তাই তিনি আর নাঁকচ করলেন না। এমনিও বিয়েটা হয়ে গেছে তাই এখানে তাদের আর না করার মত কোনো উপায় নেই। ঢাকা শহরে কম-বেশি সবাই সিকদার বাড়ির সমন্বে জানে। বেশ নাম-ডাক আছে এই যৌথ পরিবারের, ব্যবসায়ীক কাজের কারণেও সুনাম রয়েছে।
“ তাহলে কবে অনুষ্ঠান করবেন?”
“ এই সপ্তাহের মাঝেই করে ফেলি। শুক্রবারে পূর্ণরায় আইনিভাবেও বিয়েটা সম্পূর্ণ করা হবে।”
সবাই বিয়ের আলোচনায় মগ্ন হলেন। ইরা অসহায় দৃষ্টিতে নিজের বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু তাদের মধ্যেই কেউ-ই তার দিকে তাকাচ্ছে না, যেটা দেখে না চাইতেও ইরার বাঁধ ভেঙে কান্না আসচ্ছে। হুট করেই ইরা নিজের পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে, অশ্রুসিক্ত চোখে পাশে তাকাতেই শ্রাবণকে দেখতে পায়। শ্রাবণ ইশারদয় তাকে আশ্বাস দিলো কিছু হয়নি। ইরা যেনো আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পরলো না চাইতেও। দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো গাল বেয়ে।
সন্ধ্যা আজ নেমেছে এক অপার্থিব আবেশ মেখে। দিবাভাগের শেষ রক্তিম আভা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে নীলচে-ধূসর অন্ধকারের গর্ভে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজান। বাড়ির বারান্দাজুড়ে জ্বলে উঠেছে হলদে আলোর ক্ষীণ দীপ্তি। সারাবাড়িতে অভ্যন্তরে আজ দীর্ঘদিন পর প্রাণের উচ্ছ্বাস। কারণ সংবাদটি এমন যা এই কয়েকদিনের জমাটবাঁধা টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়েছে। ইরা আর শ্রাবণের বিয়েকে অবশেষে দুই পরিবার সামাজিক স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়েছে। খবরটা শোনার পর রিনি প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে। তার চোখেমুখে এমন এক উচ্ছ্বাস, যেন বহুদিনের কোনো অসম্পূর্ণ গল্প আজ পূর্ণতা পেয়েছে। অপরদিকে তূর্ণা সোফার উপর পা গুটিয়ে বসে আছে, অথচ তার ভেতরের শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস এতটাই প্রকট যে বারবার নিজের হাত। বাড়ির তিন গিন্নিও খুশি, তাই খুশিতে রান্না করতে গেছেন। বাড়িতে আবার বিয়ের আমেজ শুরু হতে চলেছে। তাই আজকের আয়োজনটুকু না করলেই নয়,ছোট্ট রোদেলা টলমল পায়ে কখনো তূর্ণার কোলে উঠছে, কখনো আবার রিনির হাত ধরে ঘুরছে। রোদেলা পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না, তবুও আশেপাশের আনন্দ তাকে সংক্রমিত করেছে।
“ মা..মা… পিপি নাচে! ”
আধো আধো কণ্ঠে বলে উঠতেই রিনি হেসে রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো। তূর্ণা হঠাৎ করেই দু’হাত ছড়িয়ে বলে উঠলো-
“ ইরা আপু এখন আমাদের সাথে থাকবে। আমরা অনেক মজা করবো রিনি, এখন সবাই হ্যাপি!”
তার কণ্ঠে ছিল এক নিখাদ সরলতা। যেন পৃথিবীর সমস্ত জটিল সম্পর্ককে সে নিজের সহজবোধ্য অনুভূতির ভেতর গলিয়ে ফেলেছে। রিনি মৃদু হেসে তূর্ণার পাশে বসলো। তারপর তূর্ণার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু স্বরে বললো-
“ তুমি কিন্তু পড়া বাদ দিয়ে অনেক বেশি আনন্দ করছো ভাবী। ভাইয়া আসলে আজকে রেহাই নাই তোমার। ”
কথাটি শুনে মুহূর্তেই তূর্ণার মুখটা কেমন ছোট হয়ে গেলো। তবুও পরক্ষণেই আবার রোদেলার সঙ্গে হেসে উঠলো সে। যেন ভয় আর আনন্দ দুটি অনুভূতি একইসাথে জায়গা করে নিয়েছে তার অন্তরে। বাইরে ঠিক তখনই গাড়ির শব্দ শোনা গেলো। রোদেলা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠলো
“ পাপা আতছে! পাপা আতছে! ”
মুহূর্তেই ছোট্ট পা দুটো নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো সে। তূর্ণাও প্রায় তার পিছন পিছন ছুটলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছিলো, চোখেমুখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। রৌদ্রিক বাড়িতে এলে এই দুই ব্যক্তি তার পিছু সর্বদাই থাকবে। রৌদ্রিক গাড়ি থেকে নামতেই ছোট্ট রোদেলা গিয়ে তার পায়ে জড়িয়ে ধরলো।
“ পা…পাপা! ”
রৌদ্রিকের কঠোর মুখাবয়ব মুহূর্তেই কোমল হয়ে উঠলো। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেলো সে। ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে তূর্ণা এসে দাঁড়ালো সামনে।
“ আপনি আসছেন? জানেন আমরা অনেক মজা করছি! ইরা আপুর বিয়ে আবার হবে! সবাই খুব খুশি! ”
তার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ শুনে রৌদ্রিক কয়েক সেকেন্ড নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর অত্যন্ত শান্ত, অথচ ভয়ংকর গম্ভীর স্বরে বললো-
“ পড়া শেষ হয়েছে তোমার? ”
মুহূর্তেই তূর্ণার সমস্ত উচ্ছ্বাস যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। মুখের হাসি মুছে গিয়ে সেখানে স্থান নিলো আতঙ্কমাখা অপ্রস্তুতি। রিনি দূরে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে।তূর্ণা ইতস্তত কণ্ঠে বললো-
“ ওই… আমি একটু… মানে… পরে পড়বো ভেবেছিলাম… ”
রৌদ্রিক ধীরে তূর্ণার দিকে এগিয়ে এলো। তার ব্যক্তিত্বে এমন এক চাপা কঠোরতা আছে, যা তূর্ণার অস্থির মনকেও মুহূর্তে নিশ্চুপ করে দেয়।
“ চল পড়া দেবে নাহলে শাস্তি আছে আজ। ”
অতি সংক্ষিপ্ত শব্দে আদেশ। করে রোদেলাকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলো। আর তূর্ণা এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো যেন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রিনি তূর্ণার কাছে ছুটে এসে ঠোঁট চেপে হেসে বলে-
“ যা শিখিয়ে দিয়েছি তাই বলবে। দেখবে ভাইয়া আর না করবে না, আজকের জন্য ছুটি নিয়ে নাও। ”
তূর্ণার রিনির কথা মত মাথা কাত করে বাড়ির ভিতরে গেলো। রুমে আসতেই রৌদ্রিকের কোলে রোদেলাকে দেখতে পেলো। মেয়েটা সারাদিন পট পাপাকে পেয়ে, রৌদ্রিকের সঙ্গে মিশে আছে। কি কি করেছে সেটা বিশ্লেষণ করে বলছে, আর রৌদ্রিক তার প্রতিটা কথা অতি মনোযোগ দিয়ে শুনছে। রোদেলা মাঝে মাঝে হাত নাড়িয়ে এটা-ওটা দেখাচ্ছে আবার হেসে ফেলছে নির্মল ভাবে। তূর্ণার ভাবলো এই সুযোগ পড়া থেকে বাঁচার, তাই সে উল্টো ঘুরে পালাতে চাইলে পিছন থেকে রৌদ্রিল ডেকে ওঠে-
“ এদিকে এসে পড়া দিয়ে, যেখানে ইচ্ছে যাও।”
তূর্ণা না চাইতেও থেমে গেলো। তারপর গাল ফুলিয়ে রৌদ্রিকের সামনে দাঁড়ালো। তূর্ণা ভয়ে আছে, আজকে সারাদিন একটি বারের জন্যও সে বই মেলে দেখেনি। যে অংকগুলো করতে দিয়ে গেছে সেগুলোও করেনি সে। রৌদ্রিক কয়েকটি প্রশ্ন করতেই স্পষ্ট হয়ে গেলো,সে কিছুই পড়েনি।
“ শুরু কর।”
গম্ভীর সংক্ষিপ্ত শব্দে বলে উঠলো সে। তূর্ণার হাত কচলাচ্ছে, কি করবে সে এবার। রৌদ্রিকের শান্ত, গম্ভীর মুখ পানে চেয়ে আমতা আমতা করে বলে-
“ ইয়ে..মানে বর..আজকের জন্য ছুটি দিয়ে দিন। কালকে পাক্কা সব করে দিবো একদম।”
রৌদ্রিক শান্ত ভাবে চোখ তুলে তাকালো। তূর্ণা সেই চোখের দিকে তাকিয়ে শুকানো ঢোক গিলো নিলো। এদিকে রোদেলা বাবার কোলে বসে নিষ্পাপ চোখে কখনো তূর্ণার দিকে, কখনো বাবার দিকে তাকাচ্ছে। রৌদ্রিক বই বন্ধ করে অত্যন্ত শীতল স্বরে বললো-
“ এক পায়ে কান ধরে দাঁড়াও। এখনই। ৩০ মিনিটের আগে পা নামালে ১ ঘন্টার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। ”
তূর্ণার মুখ মুহূর্তেই কুঁচকে গেলো।
“ প্লিজ… আজকে না… আমি খুশি ছিলাম… ”
“ তূর্ণা। ”
শুধুমাত্র নিজের নামের উচ্চারণেই মেয়েটা চুপ করে গেলো। ধীরে ধীরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে কান ধরলো সে। তার মুখে অভিমান, লজ্জা আর শিশুসুলভ অসহায়তার মিশ্র ছাপ। রোদেলা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট গলায় বলে উঠলো-
“ মা বেতা পাউ? ”
তূর্ণা কাঁচুমাচু মুখে মাথা নাড়লো।
“ হুম…তোমার পাপা খুব পঁচা। ”
অভিমাণে তূর্ণার চোখের কোণে অশ্রু এসে জমা হয়েছে। নাক টেনে নিজেকে ঠিক রাখলো, এইদিকে তূর্ণার অবস্থা দেখে রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠলো। যদিও সে তা দ্রুত আড়াল করে ফেললো।
“ পুতুল তোমার পাপাকে বলে দাও, আমি তার সঙ্গে রাগ করেছি। কথা নেই তোমার পাপার সঙ্গে কোনো।”
রোদেলার ছোট বক্ষস্থলে মাথা রেখে অভিমানী স্বরে বলে ওঠে তূর্ণা। রোদেলা পিটপিট চোখ করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রিকের দিকে তাকালো। আবার একবার তূর্ণার দিকেও তাকালো, তার ছোট্ট মাথায় তূর্ণার মধ্যে থাকা মারপ্যাঁচ বুঝতে সক্ষম হলো না। তাই রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আধো স্বরে বলে-
“ মা লাগছে, মা লাগ করেলেতে। মা কতুা বলে না।”
হাত দ্বারা নাড়িয়ে নাড়িয়ে সুন্দর,আদুরে এক ভঙ্গিমায় বলে রোদেলা। রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ তোমার পড়া চোর মা’কে বলে দাও কালকে যাতে, আমার পড়া আমাকে বুঝিয়ে দেয়। আজকে তো শুধু কান ধরে একপায়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। নেক্সট মুরগী বানিয়ে রাখবো।”
রৌদ্রিকের শান্ত স্বরে বলা হুমকি শুনে রাগে-দুঃখে রোদেলালে জড়িয়ে কান্না করে দেয়। তূর্ণার হঠাৎ কান্নায় রৌদ্রিক সহ রোদেলাক বিস্ময় হয়ে পরেছে। তূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে মুখ না তুলেই জোর গলায় বলে-
“ তূর্ণা আর পড়বে না। তূর্ণা সংসার করবে! তূর্ণার বিয়ে হয়ে গেছে তাই পড়ালেখা আর করবে না। একটুও ভালোবাসে না,খালি বলে পড়তে!”
তূর্ণার এমন কথা শুনে না চাইতেও রৌদ্রিকের অধরভাজে ক্ষুদ্র হাসির রেখা ফুটে ওঠে। রোদেলা তো কিছুই বুঝলো না, তূর্ণার কান্না দেখে রোদেলার নেত্রকোণেও অশ্রুবারি জমা হয়ে চিকচিক করছে। যেকোনো সময় সেটা ঝড়ে পরবে, রোদেলা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে তাকে শাসিয়ে ভেজা গলায় বলে-
“ মাইল দিবো এতদম, মা পলবে না, মা তংতাল কলবে। পাপা মা’কে বুকা দেয় না, মা কাঁদে!”
মেয়ের কথা শুনে রৌদ্রিকের ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে আসে। মেয়ের এমন আদর মাখা শাসন দেখে, রৌদ্রিক নৈঃশব্দে হেসে ওঠে। তার মেয়েকেও নিজের টিমে নিয়ে নিয়েছে মিসেস সিকদার।
“ তোমার মা একটা পড়াচোর, আর আমি কোনো পড়াচোরকে ভালোবাসি না। যে পড়া দিবে সে ভালোবাসা পাবে, এছাড়া পড়াচোরের কোনো ভালোবাসা নেই।”
রৌদ্রিকের এই কথা শুনে তূর্ণা এবার শব্দ করে কেঁদে দিলো। গা কাঁপিয়ে কাঁদছে সে, বহুদিন পর কাদলো বোধয়। কান্না নামক জিনিসটা যেনো অদৃশ্য হয়ে গেছে তার জীবন থেকে। তূর্ণাকে কাঁদতে দেখে রৌদ্রিক আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। প্রথমবারের মত মৃদু শব্দে হেসে উঠলো, রৌদ্রিক হাসলে তার ডান গালে ছোট্ট একটা টোল পরে। যা সচারাচর দেখা যায় না, তার হাসিটা যেনো তার থেকেও হাজার গুণ সুন্দর। হাসির শব্দ শুনে তূর্ণার রোদেলার কোল থেকে মাথা তুলে, সামনে ঘটতে থাকা আকস্মিক দৃশ্য দেখছে। এতগুলো মাস পর এই প্রথম সে রৌদ্রিকে হাসতে দেখছে, অসম্ভব রকমের সুন্দর সেই হাসি। তূর্ণা বিস্মিত নয়নে কান্না বন্ধ করে চেয়ে আছে। তার বরের হাসি এতটা সুন্দর হবে তার জানা ছিলনা, এর আগেও হেসেছে তবে সেটা বাঁকা হাসি। যার কারণে কোনোদিনও তার টোলটা দৃশ্যমান হয়নি।
কিছু সময় পর রৌদ্রিক হাসি থামিয়ে দিলো। মুহুর্তের মধ্যে তার মধ্যে থাকা হাসোজ্জল অবয়ব পাল্টে গিয়ে কেমন শীতল হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে একটু আগে কিছুই হয়নি যেনো।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৪
“ কালকে থেকে পড়া যেনো পাই। নাহলে আমার এমন বউ চাই না, যে পড়া করে না।”
তূর্ণা নাক টানলো আবারও। কান্না ফলে টসটসে লাল বর্ণ ধারণ করেছে তার সরু নাকটা। রোদেলা এবার তার ছোট্ট আদুরে হাত দ্বারা তূর্ণার গালে লেপ্টে থাকা অশ্রুবিন্দু মুছতে মুছতে বলে-
“ পাপাকে মাইত দিবু, কাঁদে না! পুচা পাপাকে মাইল দিবো। মা’কে কুত্তু দেয় পুচা!”
