Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১৭

অভিসৃতি পর্ব ১৭

অভিসৃতি পর্ব ১৭
নওরিন কবির তিশা

সূক্ষ্ম কুহেলীর আস্তরণ ঠেলে,ধরিত্রী জুড়ে প্রভাতি নরম রৌদ্রের প্রস্ফূটন ঘটেছে বহু পূর্বেই। বিছানাটা জানলার পার্শ্ববর্তী হওয়ায় হিমশীতল পবন চুপি চুপি ছুঁয়ে যাচ্ছে নারীকায়া। বিছানায় শায়িত অলস রমণী বেশভূষায় প্রচণ্ড অবিন্যস্ত।
আচানক,নীরবতা বিদীর্ণ করে ভেসে আসা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তন্দ্রাচ্ছন্নতার মাত্রা কিঞ্চিৎ পাতলা হলো ওর। পিটপিটিয়ে চোখ মেলতেই নিজে অবস্থান ঠাওর হলো। সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি বিছানায় উঠে বসলো ও। না, পাশে দূর্জয় যায় নেই। ঈষৎ চিন্তাগ্রস্ত হলেও পুনর্বার কড়া নাড়ার আওয়াজে চিন্তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারল না।

তাড়াতাড়ি নিজেকে যথাসাধ্য গুছিয়ে নিল ও। বিছানাটা যথেষ্ট গোছালো হওয়ায় সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন হলো না। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজার পাল্লা দুটো সরাতেই সম্মুখে দুটি হাসিখুশি মুখাবয়ব ভেসে উঠল। প্রথম জন তো ইথিকা। তবে ওর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীটিকে চিনতে পারল না কায়রা। কায়রাকে দেখামাত্রই চঞ্চল মেয়েটি চপলতায় খানিক হাস্যে বলে উঠল,,
“হাই ভাবি! অবশেষে দেখা মিলল আপনার! আই অ্যাম ঊষা,আপনার একমাত্র রায় বাঘিনী ননদিনী, অ্যাকচুয়ালি,বিয়েতে এত ঝামেলা ছিল যে আপনার সাথে একটু পিসফুলি এনকাউন্টার করার টাইমই পাইনি! সো, বাসর রাতের পরের দিন সকালেই চলে এলাম নতুন ভাবিকে এক্সপ্লোর করতে!”
কথাটা শেষ হওয়ার ফুসরত মিললো না;ইথিকা সঙ্গে সঙ্গে হালকা হেসে ঊষার মাথায় আলতো এক গাট্টা মেরে বলল,
“অনেক পেকেছিস কিন্তু ঊষা! এমনিতেই বেচারী হেজিটেড করছে, আর তুই শুরুতেই প্যানিক ক্রিয়েট করছিস!”

ঊষা কাল্পনিক ব্যথায় মাথা চুলকে মিষ্টি গলায় বলল,
“আহা ইথু ভাবি! জাস্ট একটু ফান করছিলাম! বাই দ্য ওয়ে ভাবি, আমার নেক্সট মান্থে এইচএসসি টেস্ট এক্সাম, আর কোচিংয়ে এত ইমার্জেন্সি ক্লাস ছিল যে ওয়েডিংয়ের দিন জাস্ট টাচ অ্যান্ড গো পজিশনে ছিলাম। আপনার সাথে ইন্টারেক্ট করার টাইমই পাইনি!”
কায়রার সঙ্কুচিত ভাবটুকু ওদের এমন সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডায় নিমেষেই কেটে গেল। ও মিষ্টি হেসে বলল,
“ইটস ওকে, ঊষা! ভেতরে এসো তোমরা।”
দুজনে কক্ষে প্রবেশ করতেই কায়রার নজর গেল ওদের হাতে থাকা সুদৃশ্য প্যাকেট ও গহনার বাক্সের ওপর। ইথিকা সম্মূখের কাউচে থরে থরে সাজিয়ে রাখলো সব। অতঃপর বললো,
“কায়রা, চাচিআম্মু পাঠালেন। ফ্রেশ হয়ে এই শাড়িটা পরে নাও, নিচে সবাই ওয়েট করছে।”
কায়রা প্যাকেট থেকে বের করা গাঢ় লাল রঙের ভারী সিল্কের শাড়িটির দিকে চেয়ে মৃদু তোতলে উঠে বলল,
“ইয়ে মানে… আপু, আমি তো একা একা শাড়ি পরতে পারি না! ক্যাওস বানিয়ে ফেলব একদম!”
কথাটা শোনামাত্র ঊষা উৎসাহী গলায় বলল,
“আরে নো টেনশন, ভাবি! শাড়ি ড্র্যাপিংয়ে আই অ্যাম অ্যান এক্সপার্ট! ইথু ভাবি আর আমি মিলে আপনাকে ফাইভ মিনিটস-এর মধ্যে প্রপার ব্রাইডাল লুকে রেডি করে দিচ্ছি। আপনি জাস্ট কুইকলি ফ্রেশ হয়ে আসুন!”

ঊষাদের সহযোগিতায় নিজেকে হালকা সজ্জিত করে সকলের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে কায়রা। আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতি নগণ্য। কেবল অতি নিকটাত্মীয় ছাড়া আমন্ত্রিত হয়নি কেউ। একে একে সকলের সঙ্গে ওকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন সাজেদা চৌধুরী আর আতিকা চৌধুরী। ইয়াসির পরিবারের সকলের কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। সেই তোড়জোড়েও ব্যতিব্যস্ত সকলে।
এতকিছুর মাঝেও একজোড়া উদগ্রীব দৃষ্টি কাঙ্খিত মানবের দেখা পেতে মরিয়া। তা লক্ষ্য করে সাজেদা চৌধুরী সকলের অগোচরে সযত্নে রমণীর মাথায় স্নেহার্দ হাত বুলিয়ে,খানিক মজা করে বললেন,,
“উমম…..,একদিনও হয়ে পারেনি,আমার ছেলেকে নজরবন্দি করতে চাইছো?”
সাজেদা চৌধুরীর কথায় ধ্যান ভাঙলো কয়রার। লজ্জায় আনত নেত্রে চেয়ে আমতা আমতা করে বলল,,

“না,আন্টি আসলে!”
“আন্টি মানে?”
কিঞ্চিৎ গম্ভীর শোনালো সাজেদা চৌধুরীর কন্ঠস্বর।হঠাৎ এমন পরিবর্তনে ভড়কে গেলো কায়রা। নিজ পক্ষে যুক্তিদানের পূর্বমুহূর্তেই সাজেদা চৌধুরী বললেন,,
“ছেলে বিয়ে দিয়ে মেয়ে আনতে চেয়েছিলাম।আর তুমি আন্টি বলে,পর করে দিচ্ছো!”
কথার মর্মার্থ বুঝে কায়রা ভুল শুধরে নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,,
“স্যরি!”
“স্যরি কি মামার বাড়ি? এত সহজে তো হবে না।কষ্ট দিয়েছ তুমি আমায়।”
কায়রা ভয়ার্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেও হেলদোল দেখালেন না সাজেদা চৌধুরী। পূর্বের অবস্থানে অনড় থেকেই বললেন,,
“ভয়ের কিছু নেই।আমি তোমাকে মাফ করতেই পারি।,কিন্তু একটা শর্তে।”
“কি শর্ত?”
“রাজি হবে?”
কায়রা কোনরূপ পূর্বভাবনা ছাড়াই বলল,,“অবশ্যই!”
“আমাকে দুর্জয় যা বলে সেটা বলে ডাকতে হবে। আম্মু বা মা কিংবা আম্মা সেটা তোমার খুশি!”
কায়রা ভেবেছিলো হয়তো জটিল কিছু বলবেন সাজেদা চৌধুরী। সেখানে এত সহজ একটা শর্তে স্বস্তির হাসির দেখা মিলল ওর ওষ্টাধরে। ওকে জবাব দিতে না দেখে সাজেদা চৌধুরী পুনরায় শুধালেন,,
“কি, রাজি তো?”
কায়রা জলদি সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বলল,,
“হাজারভাগ!”
প্রত্যাশিত জবাবে স্মিত হাসলেন সাজেদা চৌধুরীর। অতঃপর কায়রার ভীতি কাটাতে বললেন,,

“আমি দজ্জাল শ্বাশুড়ি নই যে ভয় পাবে!তবে দজ্জাল মা অবশ্যই,যার সাথে তুমি খুনসুটি করবে,ঝগড়া করবে, পরে মাফ চাইতে আসলে আমি রাগ দেখাবো আর তুমি ভাঙাবে।ভুল করলে আমি শাসন করব।শাসনের মাত্রা বেশি হয়ে তুমি অভিমান করবে আর আমি ভাঙবো। বুঝলে?”
কায়রা হেসে মাথা দোলাতেই উনি বললেন,
“আর দুর্জয় একটা এমার্জেন্সিতে বাইরে গিয়েছে। কিছুক্ষনেই মধ্যেই চলে আসবে।”

“কার সাথে কথা বলছো উজান?”
ভেসে আসা মেয়েলী কণ্ঠে হাত থেকে ফোনটা পরে যাওয়ার উপক্রম হলো উজানের। কোনোমতে নিজেকে সামলে, পশ্চাতে চাইলো ও,,
“ইথি?”
ইথিকা এগিয়ে এসে উজানের ঘর্মাক্ত বদনে চেয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,,
“তুমি কি কিছু নিয়ে টেনশন করছো উজান? কি হয়েছে? আমাকে বলো্।”
ইথিকার উদ্বিগ্নতায় হেসে ফেলল উজান। এগিয়ে এসে ইথিকার নাকে আদুরে স্পর্শ এঁকে, কপালে চুম্বন করল,,
”ওহ মাই সুইটনেস! এত চিন্তা করো কেন তুমি? অফিস থেকে একটা কল এসেছিল। মেইবি, বিজনেস ট্রিপে আমেরিকা যাওয়া লাগবে দু-তিন সপ্তাহের জন্য জন্য। কিন্তু তোমাদের রেখে কিভাবে থাকবো?সেটাই ভাবছি!”

“কি বলো! ২-৩ সপ্তাহ?”
“ইয়েস মাই লাভ!”
ইথিকা অভিমানী সুরে বলল,,
“তুমি যে কেন নিজেদের পারিবারিক ফ্যামিলি বিজনেস ছেড়ে কোথাকার কোন মাল্টিন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে জব করতে গেলে, বুঝি না! কর্পোরেট ডিউটির চক্করে এমনিতেই তোমাকে ঠিকমতো পাই না, তার ওপর যখন তখন এই ইমার্জেন্সি অফিশিয়াল ট্রিপ!”
​উজান ইথিকার হাতজোড়া প্রশস্ত করতলে তুলে নিল। অতল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ নেত্রে চেয়ে অতি সুকোমল, শান্ত কণ্ঠে বলল,
​“লিসেন ইথি, নিজের পরিচিতি আর স্কিল প্রুভ করার স্যাটিস্ফ্যাকশন আলাদা। আর এই বিজনেস ট্রিপটা আমাদের কোম্পানির ফিউচার প্রজেক্টের জন্য ভীষণ ক্রুশিয়াল। ট্রাস্ট মি, জানু… ২-৩টা সপ্তাহ দেখতে দেখতে কেটে যাবে!”
​উজানের পরম সান্নিধ্য, সুমিষ্ট ব্যাখ্যার পরশে ইথিকার মনের সমস্ত অভিমানের প্রাচীর মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। ও স্নিগ্ধ হাস্যে মাথা দোলালো। ​অতঃপর শাড়ির আঁচল সামলে মৃদু তাগিদ দিয়ে বলল,
“অলরাইট, এখন আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই! আম্মু আর কাকিআম্মু তোমাকে ভাইয়াদের ফ্ল্যাটে ডাকছেন। ডাইনিংয়ে রিলেটিভসরা অলরেডি চলে এসেছেন, সবাই আমাদের ওয়েট করছেন। চলো!”
​উজান স্বতঃস্ফূর্ত হাসিতে বলল,
“শিওর ম্যাডাম! লেটস গো!”
অতঃপর ​দুজনে ধীর ও চঞ্চল পদক্ষেপে প্রফুল্ল অন্তরে মেহমানদের আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে একই সাথে অগ্রসর হলো।

কিছুক্ষণ আগেই ইয়াসির পরিবারের সকলে উপস্থিত হয়েছেন দুর্জয়দের ফ্ল্যাটে। সকলে বললে ভুল হবে, কায়রার মা আর ফুফু আসেননি। পায়রা আর আনোয়ার ইয়াসির এসেছেন। আনোয়ার ইয়াসির এসেই টুকিটাকি গল্পে লিপ্ত হয়েছেন ইকবাল আহসান আর ইমতিয়াজ আহসানের সঙ্গে।
পায়রাও বোনের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতেছে। তবে ঝগড়া করতে পারছে না আর! কেন জানি বেচারীর প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে। বোনের সাথে একদিন না থাকতে পারাকে, এক যুগ সম মনে হচ্ছে। তবে নিজেকে সামলিয়ে ঠিকই বরাবরের ন্যায় কথোপকথনে মগ্ন ওরা। হঠাৎ, ছন্দপতন ঘটিয়ে সেথায় উপস্থিত হলো সায়মন। প্রথমে অবশ্য ওরা কেউ খেয়াল করেনি ওকে।
সায়মন এসেই একে একে বাড়ির সকলের সঙ্গে বেশ চঞ্চল মুখরতায় কুশলপর্ব সাঙ্গ করছিলো। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের এক কোণে বসারত কায়রা ও পায়রার পানে চোখ পড়তেই ওর সুগঠিত ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠল প্রচ্ছন্ন এক চপল হাস্যরেখা। ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কায়রার দিকে চেয়ে পরম প্রীতিভরে বলল,
“হ্যাপি ম্যারিড লাইফ, ছোট ভাবি! দুর্জয়ের মতো কাঠখোট্টা মানুষকে হ্যান্ডেল করার মতো ডিফিকাল্ট টাস্ক পারফর্ম করছেন, রিয়্যালি হ্যাটস অফ টু ইউ!”
কায়রা লাজুক হেসে বলল,

“থ্যাংক ইউ, ভাইয়া!”
ঠিক তখনই সায়মন পার্শ্ববর্তী পায়রার দিকে আড়াচোখে চাইল। সুগঠিত চিবুকে অলস হাত রেখে, ঠাট্টাছলে পরোক্ষ শ্লেষ ঢেলে বলল,
“কিন্তু ভাবি, আপনার কিছু কিছু রিলেটিভ আই মিন অনেক কাছের অনেকে আমার পরিচিত। যারা একটু বেশিই ফাউল ক্যাচাল করে। তবে,আমি শিওর আপনি অমন নন!”
কথাটা সরাসরি পায়রার প্রচ্ছন্ন অহংবোধে গিয়ে বিঁধল। ও বেশ ভালোভাবেই বুঝল সায়মন ওকেই বলছে। কেনোনা ও ছাড়া বাকি কেউ সায়মনের পূর্ব পরিচিত নেই। অন্তত এখানে।তবে প্রবীণ ও স্বজনদের সান্নিধ্যে নিজেকে অত্যন্ত সংযত রেখে, ওষ্ঠাধরের কোণে এক কৃত্রিম অমায়িক হাসি ফুটিয়ে পায়রা শাণিত কণ্ঠে বলল,
“আসলে মি. আপনি জেনে অবাক হবেন যে, ইয়াসির পরিবার কেউ ফাউ ঝামেলা পছন্দ করে না। তাই আমি বিশ্বাসী,তারা ফালতু আপনার সাথে লাগে নি, আপনিই প্রথমে নিজের অতি ভালো পার্সোনালিটির পরিচয় দিয়েছিলেন। অ্যাকচুয়ালি,প্রপার পার্সোনালিটি মেইনটেইন করাটা সবার পক্ষে পসিবল নয়, দ্যাটস ইট!”
সামমন চশমাটা এক আঙুলে সামান্য নামিয়ে পরম কৌতুকে বলল,
“ওহ, আই সি! ওটা পার্সোনালিটি নাকি ওভার-অ্যাক্টিংয়ের কম্বিনেশন? এনিওয়ে, আমার পার্সোনালিটি সবাই পছন্দ করে। তাই,অ্যাডভাইস লাগলে বলবেন মিস, বন্ধুকৃত্য হিসেবে ডিসকাউন্ট দেব!”
পায়রা এবার চোখের তারা ছোট করে সু-তীক্ষ্ণ সুর চড়ালো,

“আপনার ওই ফালতু অ্যাডভাইসগুলো নিজের কাছে রাখুন! আমায় শেখাতে আসবেন না!”
“ওকে! অ্যাকচুয়ালি আমি ভুলে গেছিলাম। ওই প্রবাদ-টা!”
“কোনটা?”
“কিছুই না!”
পায়রা ক্ষুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“জানলে তো বলবেন,বলদ লোক!”
তবে,কথার শ্রবণান্দ্রেয়ে পৌঁছালো না অপর পক্ষের। সে ততক্ষণে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বেশ অনেকটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে,উজানের সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন।এদিকে ও চলে যেতেই,কায়রা বোনের ওড়নার আঁচল চেপে ধরে মৃদু হেসে ফিসফিস করে বলল,
“কী ব্যাপার আপু? পূর্বপরিচিত তোরা? ”
পায়রা সায়মনের দিকে চেয়েই বললো,
“এটা সিরাজ আংকেলের সেই বেয়াদব ছেলে।”
কায়রা বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে বলল,,

“বলিস কি! এইটা ওই ভাইয়াটা? যার ক্রিকেট বল লেগে তোর বাঁ চোখে প্রবলেম হয়েছিলো?”
“হ্যাঁ,এই সেই বেয়াদব!আগে চোখের সমস্যার কারণ হয়েছিল আর এখন লাইফের হতে চাচ্ছে!”
“কিন্তু ভাইয়াতো লন্ডনে। মানে উনি ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েছিলেন না?”
“হ্যাঁ! মোগাডারে কোন হালায় ডিগ্রি দিছে কে জানে! আর আনফরচুনেটলি রিয়ার কেসটাও এই বলদ লড়ছে। তাই কিছু বলতেও পারছি না!”
কায়রা পুনরায় কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তার পূর্ব মুহূর্তে, ঊষার ডাক পড়ায় মধ্যপথেই স্থগিত হলো সব। জলদি পা চালিয়ে কক্ষের দিকে ধাবিত হলো ওরা।

গোধূলির ক্রান্তি লগন। সূর্যটা পাটে নেমেছে বহুক্ষণ, ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে নিকষ আঁধার। আনোয়ার ইয়াসির,পায়রাসহ উভয় পক্ষের আত্মীয়-স্বজন বিদায় নিয়েছে অনেকক্ষণ। দুর্জয় বাড়ি ফিরেছে একটু আগে। কায়রা আর কালক্ষেপণ না করে, সাজেদা চৌধুরীর সম্মতিক্রমে কক্ষে এসেছে।
তবে, প্রকাণ্ড কক্ষটির সুবিন্যস্ত পরিবেশ পরিদর্শনের পর কাঙ্ক্ষিত মানবকে দেখতে না পেয়ে কায়রার উন্মুখ মন ক্ষণিকের তরে ব্যাকুল হয়ে উঠল। ও ধীর পায়ে অগ্রসর হলো উত্তর প্রান্তের অর্ধবৃত্তাকৃতির ব্যালকনির দিকে।​কাঁচের স্লাইডিং ডোর সরিয়ে বাহিরে আসতেই চোখে পড়ল দুর্জয়কে। হালকা ধূসর রঙের ক্যাজুয়াল টি-শার্ট ও ট্রাউজারে সজ্জিত দুর্জয় রেলিং আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দূর অম্বরে চেয়ে।
​কায়রা অতি অলক্ষ্যে, নিঃশব্দে ওর ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। কায়রার মায়াবী উপস্থিতি পরম মুহূর্তে অনুভব করল দুর্জয়। তবে মুখ না ঘুরিয়ে, রেলিংয়ে হাত রেখে এক গম্ভীর ও গভীর কণ্ঠে বলল,
​“চুপিচুপি অঘটন ঘটানোর পুরোনো ট্র্যাক রেকর্ড কিন্তু তোমার আছে, মিসেস আহসান। এভাবে পেছনে এসে দাঁড়ানোর পেছনের রিজনটা কি জানতে পারি?”
​কায়রা মৃদু চমকে উঠে সামলে নিল নিজেকে। দুর্জয়ের এমন তীক্ষ্ণ উপস্থিতিবুদ্ধিতে থতমত খেয়ে, লাজুক কণ্ঠে বলল,

​“আ-আমি তো জাস্ট দেখতে এলাম… আপনি কোথায় গেলেন।”
দূর্জয় ঘাড় ঘুরিয়ে কায়রার ভয়ার্ত নেত্রেয়চেয়ে শুধালো,,
“ভয় পাচ্ছো?”
কায়রা জলদি নিজেকে সামলিয়ে বলল,,
“ক-কই নাতো!”
“শিওর?”
”হু!”
​“সো, সারাদিন ফ্যামিলির সাথে কেমন কাটল? এনি কমপ্লেন এগেইনস্ট এনিওয়ান?”
​কায়রা ত্বরিত মাথা নেড়ে অতি উৎসাহে বলল,
​“একদম না! এভরিওয়ান ইজ সো অসম!সবাই খুব সুইট। কোনো কমপ্লেন নেই!”

​হঠাৎ আকাশ ভেঙে নেমে এলো একঝাঁক গুড়িগুড়ি বর্ষণ। হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা কায়রার আলগা অলকগুচ্ছ আর শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিয়ে সর্বাঙ্গে এক মিষ্টি শিহরণ জাগাল। দুর্জয় একনজর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের পানে চেয়ে কায়রার দিকে তাকাল। ওর স্বাভাবিক শীতল কণ্ঠে সতর্কতার সুর ফুটিয়ে বলল,
​“বৃষ্টির প্যাটার্ন ভালো ঠেকছে না। বাতাসটাও ঠান্ডা বেশ। ভেতরে চলো।নাহলে,ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
​বলার সাথে সাথেই দুর্জয় কায়রার হাতটি স্পর্শ করে ঘরের দিকে ধাবিত হতে চাইল। কিন্তু কায়রা পা বাড়াল না। ও দুর্জয়ের সুগঠিত করতল সামান্য আঁকড়ে ধরে আবদারী কণ্ঠে বলল,
​“এই না, প্লিজ! আর কিছুক্ষণ থাকি? আই জাস্ট লাভ রেইন!
দুর্জয় এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে কায়রার আর্দ্র মুখশ্রীর পানে প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। অতঃপর, গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“বৃষ্টি তোমার পছন্দ হতে পারে, বাট আই ডোন্ট লাইক দিস। আননেসেসারি ইলনেস ডেকে আনার কোনো মানে হয় না। ইনসাইড, রাইট নাউ।”
দুর্জয়ের এমন চরম রসকষহীন, সোজাসাপ্টা নির্দেশে কায়রার ক্ষুণ্ন মন বিষাদে ভরে উঠল। ও দুর্জয়ের করতল হতে নিজের হাতখানি আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে, একপাশে মুখ ফিরিয়ে আনমনে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“বৃষ্টি পছন্দ করবেন কীভাবে? রোমান্টিকতার ‘র’ বর্ণটুকুও তো ভেতরে অবশিষ্ট নেই! পুরোটাই তো কাঠখোট্টা!”
কথাটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই কায়রার বক্ষপিঞ্জর থরথর করে কেঁপে উঠল। হায় আল্লাহ! আনমনে বলতে গিয়ে ও কি বাক্যটি বেশ উচ্চস্বরেই বলে ফেলেছে? কায়রা অতি আতঙ্কে আড়াচোখে চাইতেই দেখলড়দুর্জয় ওর দিকে এক কদম এগিয়ে এসেছে। পুরুষটির ওষ্ঠাধরের কোণে ফুটে উঠেছে একচিলতে সুপ্রচ্ছন্ন, শাণিত বক্র হাসি। সুগভীর চোখদুটিতে উপচে পড়ছে প্রখর কৌতুহল। কায়রার কানের কাছে ঈষৎ ঝুঁকে, উষ্ম নিশ্বাস ফেলে সুগভীর পুরুষালী কণ্ঠে শুধাল,
“সো, তোমার ধারণা আমার ভেতরে রোমান্টিকতার অ্যাবসেন্স আছে, মিসেস আহসান?”
কায়রা সীমাহীন কুণ্ঠায় রুদ্ধশ্বাসে তোতলে উঠে বলল,
“আ-আমি… আমি কি কিছু বলেছি নাকি? আ-আমি তো জাস্ট বলছিলাম আবহাওয়াটা খুব ফাইন!”
দুর্জয় কায়রার কোমরে এক হাত গলিয়ে দিয়ে, নিমেষেই ওকে নিজের সুঠাম বক্ষপটে টেনে নিল। কায়রার চঞ্চল হৃতস্পন্দন তখন সীমা ছাড়িয়ে প্রকাণ্ড রবে বাজতে শুরু করেছে। দুর্জয় ওর আরক্তিম কপোল ছুঁয়ে যাওয়া একগোছা সিক্ত কেশরাজ সযত্নে কানের পেছনে গুঁজে দিল। অতঃপর প্রখর, মোহময় দৃষ্টি স্থির রেখে নিচু ভরাট কণ্ঠে বলল,

“আমার রেইনফলের চেয়ে ভিজে যাওয়া পার্সনকে বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হয় কায়রা। স্পেশালি, যখন সে পার্সনটা তুমি।”
দূর্জয়ের এহেন কথায় কায়রার সর্বাঙ্গে এক অচেনা, তীব্র শিহরণ খেলে গেল। দুর্জয়ের এমন পরোক্ষ ফ্লার্টিংয়ের তোপে ও বাকশক্তি খুইয়ে কেবল ডাগর চোখে চেয়ে রইল।দুর্জয় কায়রার থরথর করে কাঁপতে থাকা চিবুকটি আলতো করে ওপরে তুলে ধরে, বক্র হেসে শুধাল,
“এখনো কি মনে হচ্ছে বরটা চরম আনরোমান্টিক? নাকি প্রুফ করার জন্য সেকেন্ড চ্যাপ্টার স্টার্ট করব?”
কায়রার শ্বেতাঙ্গ মুখমণ্ডল মূহুর্তেই রক্তিম রঞ্জকে কানায় কানায় পূর্ণ হলো। ও ত্বরিত দুর্জয়ের শার্টের ফ্রন্ট চেপে ধরে, অনুচ্ছ স্বরে অস্ফুটে বলল,
“না… একদমি না! চ-চলুন, ভেতরে চলুন… সত্যি ঠান্ডা লেগে যাবে এবার!”
কায়রার চরম ছটফটানি আর মিষ্টি ভীতি প্রত্যক্ষ করে দুর্জয়ের গম্ভীর ওষ্ঠাধরে স্মিত হাসির দেখা মিললো। ও কায়রাকে ছেড়ে না দিয়ে, পরম আধিপত্যে নিজের বাহুবেষ্টনীতেই আবদ্ধ রেখে ধীর পদক্ষেপে ঘরের শুষ্ক উষ্ণতায় ফিরে এলো।

দুই দিন বাদে,ক্যাম্পাসের চেনা প্রাঙ্গণে পা রেখেছে কায়রা। ডিপার্টমেন্টের করিডোর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কচি দেবদারু গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে কায়রা, মেধা, রুশাফ, নিহার আর তুজা।গত কয়েক দিন ধরে তুজার মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত। ইভানের সাথে ঘটে যাওয়া সেই অনভিপ্রেত ঘটনার পর থেকে ছেলেটা ওর সাথে সম্পূর্ণ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। মেসেজ সিন করে পড়ে থাকে, সামনে পড়লে অচেনার মতো পাশ কাটিয়ে চলে যায়। যা চঞ্চল তুজার হাসিখুশি প্রাণটাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পেরে নিহার অন্যদের ইশারায় ডেকে আগে যেতে বললো। সাংকেতিক ভাষা বোঝা মাত্র, পায়রা মেধা আর রুশাফ ব্যস্ত সমস্ত এগিয়ে গেল নিহারের পিছু পিছু। যাতে ওদের থেকে একটু হলেও পিছিয়ে গিয়ে, তুজা আর ইভান কিছুটা একা সময় পায়। ইভান তখন একটু দূরে অন্যমনস্কভাবে ফোন স্ক্রোল করতে করতে মেইন গেটের দিকে হাঁটছিল।
বাকিরা খানিক এগিয়ে যেতেই তুজা এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পায়ে ছুটে গিয়ে পিছন থেকে ইভানের বাহু শক্ত করে খামচে ধরল। রুদ্ধশ্বাসে ডেকে উঠল,
“ইভান! প্লিজ, এভাবে ইগনোর করা স্টপ করবি?”
ইভান থমকে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরল। চিরকালের সেই সদা-হাস্যোজ্জ্বল, চঞ্চল ছেলেটার মুখমণ্ডলে এখন থমথমে গম্ভীর এক অভিব্যক্তি! চোখে নেই আগের মতো উষ্ণ দীপ্তি। ইভানের এমন পাথরকঠিন রূপ দেখে তুজার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে মিনতির সুরে বলল,

“হোয়াট ইজ রং উইথ ইউ, ম্যান? তিনদিন ধরে টেক্সটের রিপ্লাই দিস না, সামনাসামনি দেখলে এমনভাবে তাকাস যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল! একটা ফ্রেন্ডের সাথে এভাবে কেউ বিহেভ করে?”
ইভান ওর বাহু থেকে তুজার হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত শীতল ও নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল,
“ফ্রেন্ড? রাইট, ফ্রেন্ডশিপের ডেফিনিশন হয়তো একেকজনের কাছে একেক রকম, তুজা। বাট আমার ক্ষেত্রে,কেউ লিমিট ক্রস করলে আমি আর আগের মতো ক্যাজুয়াল থাকতে পারি না।”
ইভানের এমন কাটা কাটা কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল তুজার মনে। তবুও বন্ধু হারানোর তীব্র ভয়ে ও গলার স্বর নরম করে কিছুটা আবেশ মিশিয়ে বলল,
“দেখ, সেদিন যা হয়েছে দ্যাট ওয়াজ জাস্ট আ মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং! প্লিজ, এভাবে সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট দিয়ে শাস্তি দিস না তো! রিয়েলি, ইট হার্টস লট।”
ইভান এবার বাঁকা হাসল। চোখের দৃষ্টি গভীর করে তুজার মুখের ওপর নিবদ্ধ করে ঠান্ডা গলায় বলল,
“শাস্তি আমি দিচ্ছি না, তুজা। জাস্ট রিয়েলাইজ করাচ্ছি। এনিওয়ে, ক্লাসের টাইম হয়ে গেছে, লেটস গো।”
বলেই ইভান আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না; সোজা ডিপার্টমেন্টাল বিল্ডিংয়ের দিকে হেঁটে গেল। তুজা অপলক দৃষ্টিতে ওর চলে যাওয়া পথের পানে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে জমে ওঠা উষ্ণ জলবিন্দুগুলো পলক ফেলতেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে চাইল, কিন্তু ক্যাম্পাসের চত্বরে নিজেকে কোনোমতে শক্ত করে সামলে নিল মেয়েটা।

“আপনি? এখানে?”
বন্ধু মহলের সঙ্গে গল্প গুজবে লিপ্ত থেকে এই বেরোচ্ছিল কায়রা। আকস্মিক পরিচিত পুরুষের উপস্থিতিতে থমকালো ওর পদচারণা। বিস্ময় উচ্ছ্বাসের মিশ্রণে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখালো ও।
দুর্জয় পকেটে ফোনটা পুরে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলো কায়রার সম্মুখে। প্রখর শুভ্র শার্টের আড়ালে সুঠাম পুরুষালী কায়া আর চোখে কালো রোদচশমা—মানবী হৃদয়ে ঝড় তোলার জন্য এইটুকু সাজই যথেষ্ট! কায়রার ডাগর চক্ষুর পানে সুগভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, গম্ভীর স্বরে বলল,
“হোয়াই? ক্যান’ট আই কাম টু পিক আপ মাই ওয়াইফ, মিসেস আহসান?”
কায়রা ইতস্তত করে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। পরিচিত মুখগুলোর কৌতূহলী চাহনি এড়াতে নিচু স্বরে তোতলে বলল,
“না… আই মিন, আপনি তো ইমার্জেন্সি কাজে বিজি ছিলেন, তাই বলছিলাম!”
“কর্মব্যস্ততা তো থাকবেই, মিসেস। বাট প্রায়োরিটি চেঞ্জ করতে হবে মনে হচ্ছে। এনিওয়ে, গাড়ি ওপাশে পার্ক করা আছে, কাম উইথ মি।”

কথাটি বলেই দুর্জয় গাড়ির দিকে ধাবিত হলো। কায়রাও সুবোধ বালিকার মতো ওর পিছু পিছু হেঁটে গিয়ে স্বভাববশত পেছনের সিটের দরজা খুলতে উদ্যত হলো।ঠিক তখনই দুর্জয় চালকের আসন হতে ঘাড় ঘুরিয়ে, প্রখর শাণিত নেত্রে চাইলো। ওর ওষ্ঠাধরের কোণে আলতো টিপ্পনীর রেখা ফুটিয়ে সুগভীর ভরাট কণ্ঠে শুধাল,
“ সামনে সিটে বসার অধিকার দিয়েছিলাম। আর এখন পুরো হৃদয় আর মস্তিষ্কের অধিকার নিয়ে বসে আছো। তার পরেও সামনে সিটে বসতে হেজিটেশন কেন??”
সীমাহীন লজ্জায় লাল হয়ে উঠল কায়রার শুভ্র কপোলদ্বয়। ও আর একমুহূর্ত বিলম্ব না করে, ত্বরিত দরজার হাতল ছেড়ে এসে সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে সোজা হয়ে বসে পড়ল। দুর্জয় কায়রার লাজুক আনত মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হাসল। তারপর কায়রার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে এসে, ওর অতিমাত্রায় স্পন্দিত বুকের হৃতস্পন্দন উপেক্ষা করে সযত্নে সিটবেল্টটা বেঁধে দিল। দুর্জয়ের উষ্ম নিশ্বাস কায়রার চিবুক স্পর্শ করতেই ও চোখ দুটি বুজে ফেলল সাগ্রহে। দুর্জয় ক্লিকের শব্দে সিটবেল্ট আটকে দিয়ে, ওর কানের কাছে মুখ এনে নিচু স্বরে বলল,
“ইটস জাস্ট আ সিটবেল্ট, কায়রা! এতটা নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই, আই অ্যাম নট গ্লুড টু ইউ… ইয়েট!”
কায়রা চট করে চোখ মেলে সোজা হয়ে বসল। নিজেকে সামলে নিয়ে ক্ষুণ্ন কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

“আমি একদম নার্ভাস নই! আপনি শুধু শুধু টিজ করেন!”
দুর্জয় স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে একহাতে গাড়ি স্টার্ট দিল। সুদৃঢ় ভঙ্গিতে গাড়ি ট্রাফিকের মাঝে চালনা করতে করতে অকম্পিত কণ্ঠে বলল,
“ওহ সত্যি? দেন লেটস সি, হাউ ব্র্যাভ ইউ আর! আজ তোমাকে একটা স্পেশাল প্লেসে নিয়ে যাচ্ছি।”
কায়রা কৌতূহলী চোখে চেয়ে শুধাল,
“কোথায়?”
“সারপ্রাইজ! এত কোয়েশ্চেন না করে জাস্ট এনজয় দ্য ড্রাইভ।”

বিকেলের মায়াবী আলোয় গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে চলল শহরের ব্যস্ত পথ পেরিয়ে এক নির্জন নদীর মোহনার দিকে। গাড়ির কাঁচ সামান্য নামিয়ে দেওয়াতেই নদীর হিমশীতল হাওয়া এসে কায়রার অলকগুচ্ছ উড়িয়ে নিয়ে দুর্জয়ের বাহুতে ফেলল। নদীর পাড়ে গাড়ি থামিয়ে দুর্জয় নেমে এলো। কায়রাও দ্রুত নেমে অপরাহ্নের ম্রিয়মান আলোয় ভেসে যাওয়া নদীর পানে চেয়ে মুগ্ধ নেত্রে দাঁড়িয়ে রইল। দুর্জয় অলস ভঙ্গিতে এসে কায়রার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। পরম অধিকারে কায়রার কাঁধে নিজের সুঠাম এক বাহু ছড়িয়ে দিয়ে, ওকে নিজের গা ঘেঁষে টেনে নিল।
কায়রা পরম নিশ্চিন্তে নিজের মাথাটি দুর্জয়ের বলীয়ান বুকের ওপর এলিয়ে দিল। দুর্জয় কায়রার শুভ্র কপালে পরম ভালোবাসায় নিজের ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে, সুগভীর মোহে আবৃত করে ভরাট পুরুষালী কণ্ঠে শুধাল,

অভিসৃতি পর্ব ১৬

“ফিলিং গুড?”
কায়রা দুর্জয়ের টি-শার্টের ফ্রন্টটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, লাজুক ও স্নিগ্ধ হাস্যে বলল,
“হুম! খুব সুন্দর! থ্যাংক ইউ… মিস্টার কাঠখোট্টা!”
দুর্জয় কায়রার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
​“ইউ আর ওয়েলকাম, মাই লিটল ট্রাবলমেকার!”
​কায়রা দুর্জয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল সাগ্রহে। দূর্জয়ও ঈষৎ হাস্যে আপন করে নিলো ওকে।

অভিসৃতি পর্ব ১৮