অভিসৃতি পর্ব ২১
নওরিন কবির তিশা
ঘন কুহেলির আস্তরণ ফুঁড়ে তীব্র আলোকের বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে,শৈলবক্ষ বিদীর্ণকারী সামরিক জিপখানি ধাবিত সম্মুখের অজ্ঞাত গন্তব্যে। গোধূলির সমাপ্তি ঘটিয়ে সাঝের আঁধার ঘনিয়ে এসেছে বহুক্ষণ। ঘটনাস্থালে থেকে বেশ খানিকটা দূরবর্তী নির্জন উপত্যকায় এসে গতিরোধ হলো গাড়িটির।
পেছনের সিটে কায়রা তখন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। মন আকাশের বিস্ময়ের মেঘ কাটতে না কাটতেই জমাট বেঁধেছে তপ্ত অভিমান। সেনাসদস্যদের সামনে দুর্জয় কেন ওভাবে গম্ভীর হয়ে রইল? কেন ওই লোকগুলোকে দু-চ্ছত্র শাসন করল না, যারা ওর সাথে অযথা অসভ্যতা করছিল? এই ভেবে ও মুখ ঘুরিয়ে জানালার ওপারে আঁধারে ঢাকা পাইন বনের দিকে চেয়ে রইল।
দুর্জয় লুকিং গ্লাসে পেছনে বসারত নিজ রমণীর পানে একনজর চাইল। ওর ওষ্ঠাধরের কোণে ক্ষণিকের তরে অতি প্রচ্ছন্ন হাস্যরেখা ভাসমান হয়েই পরক্ষণ মিলিয়ে গেল। চালকের আসন হতে শরীরটা ঈষৎ ঘুরিয়ে নিচু, ভরাট কণ্ঠে বলল,
“সামনে এসে, কায়রা।”
অনড় কায়রা, অভিমানের তীব্রতায় মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। দুর্জয় পরিহিত সানগ্লাসটা খুলে ড্যাশবোর্ডে রাখল। লুকিং গ্লাসে ক্ষণকাল কায়রার অবাধ্য অবয়ব নিরীক্ষণ করে অকম্পিত কণ্ঠে শুধাল,
“আসবে তুমি? নাকি নামতে হবে আমাকে?”
কায়রা প্রচ্ছন্ন জেদ দেখিয়ে নীরব থাকাকালীন দুর্জয় নিস্পৃহ গলায় বলল,
“ওকে, ফাইন!”
পরমুহূর্তেই গাড়ি হতে নেমে এলো দুর্জয়। দ্রুত কদমে পেছনে এসে এক হেঁচকায় খুলল পেছনের রুদ্ধদ্বার। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব কায়রার বোধ উদয়ের পূর্ব লগ্নেই দুর্জয় ওর এক হাত চেপে সোজা টেনে বাইরের দিকে নিয়ে এলো। অতঃপর কায়রার সুডৌল কোমর চেপে এক চিলতে পেঁজা তুলোর ন্যায় শূন্যে তুলে সামনে এনে নিজের পাশের সিটটাতে বসিয়ে দিল ওকে।
কায়রা রুদ্ধশ্বাসে দুর্জয়ের সুঠাম কাঁধ আঁকড়ে ধরেছিল। ব্যাকুল চোখে চেয়ে ছিলো প্রিয় পুরুষের শাণিত মুখশ্রীর পানে। দুর্জয় দরজায় সশব্দে লক এঁটে দিয়ে নিজে চালকের আসনে বসে এক হাত বাড়িয়ে আলতো করে কায়রার সিটবেল্টটা টেনে নিয়ে লক করে দিল। কায়রার তপ্ত নিঃশ্বাস ওর গাল ছুঁয়ে যেতেই দুর্জয় ঈষৎ ঝুঁকে নিচু গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমার সাথে অভিমান করার আগে প্রপার জায়গায় বসতে হয়, মিসেস আহসান। আগে নিজের অধিকার রক্ষা করতে শেখো !”
নিশ্চুপ কায়রার মুখে কথা ফুটলো এবার। ক্ষোভে অভিমানে ফেটে পড়ে ও বলল,,
“অধিকার? কিসের অধিকার হ্যাঁ?আপনার ওই অফিসাররা আমার সাথে অত অভদ্রতা করল, আর আপনি উল্টো আমাকেই কালপ্রিট বানিয়ে গাড়িতে তুলে নিলেন? হাউ কুড ইউ ডু দিস, মেজর?”
দুর্জয় চালকের আসনে বসে জিপের ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে সুদৃঢ় এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে কায়রার দিকে ক্ষণিকের তরে তপ্ত দৃষ্টি হানলো,
“ওরা স্পট ক্লিয়ার করছিল, কায়রা। অন ডিউটি কোনো সোলজার কিন্তু তোমার পার্সোনাল আইডেন্টিটি চেনে না।”
“মানে? আপনার ওই কাঠখোট্টা রুলসের চেয়ে কি আমার রেসপেক্ট বড় নয়?”
দুর্জয় গাড়িটি পাহাড়ের এক নির্জন ভিউ পয়েন্টে এনে থামাল। ইঞ্জিন বন্ধ করে সম্পূর্ণ ঘুরে বসল কায়রার দিকে। কায়রার দু-গালে নিজের বিশাল দুটি হাত রেখে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখের কার্নিশে জমে থাকা অশ্রু কণাটুকু মুছে দিয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ ভরাট কণ্ঠে বলল,
“আমার কাছে তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের ভ্যালুও অনেক বেশি, মাই ট্রেজার। বাট আর্মি রুলস আর ডিসিপ্লিন কিন্তু সবার জন্য সেম!”
পুরাতন অভ্যাসের জের ধরে ওষ্টাধর কামড়ে অনাগত অশ্রু সংবরণের চেষ্টা করল কায়রা। এই কাঠখোট্টা মানব কিছুতেই বোঝেনা তাকে। এখানেও নিয়ম শৃঙ্খলা দেখাচ্ছে! নাক টেনে ও বলল,,
“আপনি কি আসলেও আমাকে ভালোবাসেন না? কি হতো,আমার হয়ে একটুখানি কথা বললে? খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত কি?”
চঞ্চল হরিণীর শিশুসুলভ আবদারে সে যে ভালোবাসার কাঙাল, সর্বদা যত্নে মুড়িয়ে থাকা আবেগি ফুল তা মুহূর্তেই উপলব্ধি করে ললাটের কুঞ্জন রেখা শিথিল হয় দূর্জয়ের। ক্ষুরধার চাহনি মোলায়েম হলো নিমেষেই। আলতো স্পর্শে আবেগিকে নিজের প্রশস্ত বক্ষপিঞ্জরে টেনে আবদ্ধ করে, তার শুভ্র ললাটে পুরু ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। অতঃপর মাথার পেছনে আদুরে পরশ বুলাতে বুলাতে বলল,,
“স্যরি! জীবনে প্রথমবার কাউকে বলছি, আ’ম স্যরি।আ’ম স্যরি মাই ম্যাজিস্টি। প্লিজ ডোন্ট ক্রাই মাই লাভ!”
বক্ষস্থলে কায়রার কান্নার তোড় দ্বিগুণ বেগ ধারণ করলো এবার।হয়তো অন্যদের কাছে এটা নিছক আবেগ কিংবা বড্ড বাচ্চাসুলভ আচরণ অথচ চিরন্তন সত্য এটাই যে, ছোটবেলা থেকে অপার স্নেহে বড় হওয়া মেয়েটা সামান্যতম মন খারাপ কিংবা আঘাত পেলেই প্রিয়জনের বুকে আঁকড়ে কান্না জুড়তে ভালোবাসে।
দুর্জয় ওর অভিযোগ মাথা পেতে মেনে নিলো। ক্ষণকাল নীরবতা পালন শেষে কায়রা মাথা তুলতে যেতেই দূর্জয় বাহুডোরে ওকে আরো নিবিড়ভাবে পেঁচিয়ে ভরাট কন্ঠে আক্ষেপের সুরে বলল,,
“কি বাচ্চাকাচ্চা বিয়ে করলাম! আমার মত মানুষও নাকি এক হেতুহীন কান্নার মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে!”
কায়রা মুখ তুললো! চঞ্চল চক্ষু সরাসরি নিবদ্ধ করলো অতল কৃষ্ণনেত্রে। ক্ষুব্ধ দৃষ্টি হেনে বলল,,
“আপনি আসলেও ভীষণ-ভীষণ-ভীষণ বাজে লোক! আদর-যত্নের বালাই নাই ভিতরে কোনো!”
কথাটা মুখ ফসকে বেরোতে না বেরোতেই, খপ করে ধরে বসলো দুর্জয়।
“এত যত্নেও মন ভরে না? আরো আদর চাই? হুম?”
কায়রা নত শির দুলিয়ে লাজুক ভঙ্গির প্রকাশ করতেই, দূর্জয় মৃদু বাঁকা হাস্যে গভীর স্বরে বলল,,
“প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়।আর, দূর্জয় আহসানের আদর তো একদম-ই নয়!”
গুঢ় অর্থ বোধগম্য হতেই মুখশ্রী মুহূর্তেই লজ্জায় আরুণ বর্ণ ধারণ করলো কায়রার। চঞ্চল নয়ন দুটি নত করে ও দ্রুত ক্ষিপ্র গতিতে দুর্জয়ের প্রশস্ত বক্ষপিঞ্জরে মুখ লুকাল।দুর্জয় কায়রার অবাধ্য নরম চুলে আঙুল চালিয়ে মৃদু হাসল; গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে শুধাল,
“বাই দ্য ওয়ে, হঠাৎ পাহাড়ে কী মনে করে?”
কায়রা দুর্জয়ের বুকের ওপর মাথা রেখেই মৃদু স্বরে বলল,
“আসলে… ভার্সিটির ইকোসিস্টেমের একটা অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডওয়ার্ক করতে।”
শিথিল ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো মুহূর্তেই। কালকেই ঘোষিত হবে, আগামী দু’দিন পার্বত্য এলাকায় জারিকৃত রেড অ্যালার্ট। এমন সময়ে কায়রার উপস্থিতি কাম্য নয় কিছুতেই। তবে সেটা বলার জন্য, বর্তমান সময়কে মোটেও উপযুক্ত মনে হলো না দূর্জয়ের। আপাতত এখান থেকে যেতে হবে। তাই মনোভাব নিজের মধ্যে চেপেই, ও শুধালো,,
“কোথায় উঠেছো?”
কায়রা ওর বুক থেকে সামান্য মুখ তুলে আলতো স্বরে বলল,
“মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্টে।”
“ওকে!”
দূর্জয় গাড়ি ঘুরিয়ে কাঙ্খিত গন্তব্যে মোড় নিতেই,কায়রা নিজেকে সামলে সামান্য সরে বসলো। অতঃপর মাথা রাখলো দূর্জয়ের প্রশস্ত কাঁধে।
“আরে সাবধানে!”
প্রচন্ড অসতর্ক পদক্ষেপে সম্মুখে পা বাড়ানোর দরুন হুমড়ি খেয়ে পড়তে গেলেই এক প্রকার ওকে আঁকড়ে ধরল অজ্ঞাত পুরুষ। খিঁচে বদ্ধ রাখা আঁখিদ্বয় পিটপিটিয়ে মেলতেই সম্মুখে দৃশ্যমান হলো বড্ড সুদর্শন পুরুষালী অবয়ব। নিজেকে সংযত করে পরক্ষণেই দূরে সরে এলো তূজা। সৌজন্যমূলক হেসে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করেই সরে আসতে চাইলো।
কিন্তু অপরপক্ষ এত দ্রুত ওকে ছাড়তে নারাজ যেন। কথোপকথন আরেকটু বাড়াতে সে শুধালো,,
“নামটা?”
তূজা সম্মুখে অগ্রসর হয়েছে সবে। ভেসে আসা কন্ঠে ঘাড় ঘুরিয়ে লোকটার পানে চেয়ে ও বলল,,
“আমার?”
“জ্বী, এখানে তো আর কাউকে দেখছি না!”
“তূজা আয়নাত।”
“নাইস নেম!”
“জ্বী, ধন্যবাদ।”
তুজা পুনরায় পা বাড়াতেই তরুণটি চটজলদি ওর সামনে এসে একটু হেসে বলল,
“আরে, চলে যাচ্ছেন কেন? আমার নাম শুনবেন না? যাইহোক, আমি ফারহান। উমমম…আপনিও কি ফ্রেন্ডদের সাথে এসেছেন? আমরাও একদল ফ্রেন্ডস ঢাকার থেকে ট্রাভেল করতে এসেছি।”
ফারহানের প্রকাণ্ড বাচালতায় তুজা বিরক্ত মনে ঈষৎ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই, পাশ থেকে ভেসে এলো এক অনমনীয়, শীতল পুরুষালী কণ্ঠস্বর,,
“তুজা?”
কণ্ঠটি কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই তুজার মলিন মুখশ্রী মুহূর্তে এক চিলতে প্রফুল্ল হাসিতে ভরে উঠল। চকিতে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখলো অনতিদূরে পকেটে হাত পুরে দাঁড়িয়ে আছে ইভান, তবে দৃষ্টিটা বর্তমানে প্রচন্ড কঠিন, ঐ কংক্রিটের মত!ইভানকে এতদিন পর যেচে কথা বলতে দেখে তুজার মনটা যে আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে তা ওর মুখাবয়বেই স্পষ্ট।
ইভান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো ওদের সন্নিকটে। ফারহানের দিকে একপলক কড়া দৃষ্টি হেনে, তুজাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“রুমের দিকে চল। সবাই তোকে ডাকছে, দেরি হচ্ছে।”
তারপর ফারহানের দিকে ফিরে বরফশীতল স্বরে যোগ করল,
“থ্যাংকস ফর দ্য হেল্প, ব্রো। ও পাহাড়ে অন্ধকারে একা মুভ করতে একটু নার্ভাস ফিল করে। আই থিঙ্ক, নাউ আই ক্যান টেক কেয়ার অফ হার। আপনার আর কষ্ট করতে হবে না।”
ফারহান ইভানের রূঢ় মনোভাব ও তুজার বদলানো চাহনি অনুধাবন করে হাত তুলে পিছু হটে মৃদু হাসল,
“আরে নো প্রবলেম! সি ইউ এগেইন, তুজা!”
ফারহান প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যেতেই তুজা একচিলতে মিষ্টি হাস্যে ইভানের গম্ভীর অবয়বের পানে চেয়ে বললো,,
“কখন এলি?”
“মাত্রই।”
রাশভারী কন্ঠে অতি সংক্ষেপে জবাব সেরেই, লম্বা কদমে সম্মুখে এগিয়ে গেলো ও। তবে,তূজা এবার আর সুযোগ ছাড়লো না। আশপাশটা আপাতত ফাঁকা হয়ে আছে। দৃষ্টি ঘুরিয়েও শূন্যতাই ঠাওর হলো। কটেজ অব্দি পৌঁছাতে এখনো মিনিট চারেক লাগবেই।তাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ও ডেকে উঠলো,,
“এই দাঁড়া!”
থামলো না ইভান। পূর্বের ন্যায় পদক্ষেপ বজায় রেখে এগিয়ে যেতেই,তুজা ক্ষুন্ন মেজাজে প্রায় চিৎকার করে উঠলো,,
“ইভান?”
নিঃশব্দ পরিবেশে চিৎকারটা স্বাভাবিকের চেয়েও বেশ জোরালো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ইভান ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই তুজা জলদি পদে এগিয়ে গিয়ে ইভানের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে বলল,,
“কি হয়েছে ভাই? ঐদিন জাস্ট ফান করে বলেছিলাম! আর এমনিতেও, আমার বিয়েতে তোকে চিফ গেস্ট হিসেবে দাওয়াত করব। ওকে? রাগ পড়েছে এবার? সামান্য একটা জিনিস নিয়ে রাগ করে বসে থাকে! ছাগল!”
ইভানের অভিব্যক্তি বোঝা গেল না। হিমশীতল দৃষ্টি হেনে ও শুধু বললো,,
“ফান? যে সম্পর্কটা তোর কাছে জাস্ট একটা ফান, সেটার এক্সপ্লেনেশন দিতে এসে নিজের টাইম ওয়েস্ট করিস না, তুজা। তুই কাকে চিফ গেস্ট করবি আর কার সাথে লাইফ সেটেল করবি, দ্যাটস কমপ্লিটলি ইউর চয়েস। বাট ডোন্ট এক্সপেক্ট মি টু প্লে দ্য সেম ফুলিশ রোল এগেইন। প্লিজ, ক্লোজড চ্যাপ্টার!”
কথাটি শেষ করে ইভান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। তুজাকে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ করে রেখে লম্বা কদমে কটেজের অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল।
গভীর নৈশ নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে সুয়ালক সেনাক্যাম্প প্রাঙ্গণ। ক্ষণকাল পূর্বেই হেডকোয়ার্টার্স হতে প্রাপ্ত এক জরুরি বার্তার পর পুরো ব্যাটালিয়নে তুমুল তৎপরতা ছেয়ে গিয়েছে। শত্রুপক্ষ কোনোভাবে ইন্টেলিজেন্সের সিক্রেট অপারেশনের আভাস পেয়ে গেছে! ফলশ্রুতিতে, নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বর্ডার ক্রস করে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী ও অস্ত্র চোরাচালানকারী গ্যাংটি বর্ডার পার হয়ে পালিয়ে যাওয়ার তোড়জোর করছে।
ব্যাটালিয়ন কন্ট্রোল রুমের আবহাওয়া আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু বেশিই বৈরী। প্রকাণ্ড কাঠের টেবিলের ওপর বিছানো স্যাটেলাইট ম্যাপের সামনে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী। পাশে সুসংগঠিত কম্ব্যাট গেয়ারে সজ্জিত মেজর দুর্জয় আহসান, স্পেশাল ফোর্স ব্যাটালিয়নের ক্যাপ্টেন ফাহিম রেজা এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের(বিজিবি)স্থানীয় সেক্টর কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্নেল তানভীর হাসান।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“লেটেস্ট ইন্টেলিজেন্স অ্যালার্ট অনুযায়ী, লিডার কালা নাগ তার মূল নেটওয়ার্ক নিয়ে থানচি আর রুমার মধ্যবর্তী সাঙ্গু নদীর জঙ্গল রুট ব্যবহার করে সীমান্ত পার হওয়ার ট্রাই করছে। উই হ্যাভ নো টাইম! সূর্য ওঠার আগেই অপারেশন এক্সিকিউট করতে হবে।”
দুর্জয় প্রখর দৃষ্টি মেলে ম্যাপের পাহাড়ি ট্রেইলগুলো পর্যবেক্ষণ করে ধাতব স্বরে বলল,
“স্যার! নদীপথ আর মেইন বর্ডার ক্রসিং ট্রেইলগুলো বিজিবির পেট্রোলিং টিম অলরেডি সিকিউর করেছে। ওরা নদী পার হওয়ার ট্রাই করলে বিজিবির কর্ডনে ট্র্যাপড হবে। বাট দেয়ার ইজ আ হাই রিক্স–পাহাড়ের এই সিক্রেট রুটটা খুব ন্যারো। আমরা যদি টু-অফেনসিভ টিমে ডিভাইড হয়ে সারপ্রাইজ রেইড দিই, তবেই ওদের একসাথে কর্নার করা পসিবল।”
বিজিবি অফিসার লেফট্যানেন্ট কর্নেল তানভীর সম্মত হয়ে বললেন,
“রাইটলি সেড, মেজর। আমাদের পেট্রোলিং ট্রুপস অলরেডি সাঙ্গু নদীর ডাউনে পজিশন নিয়েছে। আপনারা নর্থ রুট দিয়ে পুশ করলে ওরা ব্যাকফুট হতে বাধ্য হবে।”
রেদোয়ান চৌধুরী দুর্জয়ের দিকে প্রখর ভরসার দৃষ্টিতে চাইলেন,
“অলরাইট। ক্যাপ্টেন ফাহিমের আন্ডারে আলফা টিম সাঙ্গু রিভার ব্যাংক কমপ্লিটলি কর্ডন করবে। আর মেজর দুর্জয়, তোমার লিডারশিপে ব্র্যাভো স্কোয়াড ডিরেক্ট হাইডআউটে অ্যাসল্ট চালাবে। নো মার্সি! এভরি সিঙ্গেল টেররিস্টকে স্পট থেকে নিউট্রালাইজ বা কাস্টডিতে নিতে হবে। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”
চিতার ন্যায় উপস্থিত সব অফিসার দৃঢ় ভঙ্গিতে স্যালুট ঠুকে সমস্বরে গর্জে উঠলো,
“ইয়েস, স্যার!”
দুর্জয় কম্ব্যাট হেলমেটটা হাতে নিয়ে অধস্তনদের দিকে ফিরে আদেশের সুরে বলল,
“টিম, চেক ইওর আর্মস এন্ড ট্যাকটিক্যাল গিয়ার্স। রেডিও সাইলেন্স মেইনটেইন হবে। নাইট ভিশন অ্যান্ড সাপ্রেসারস অন। অনলি প্রিসাইজ ফায়ার! লেটস মুভ!”
পরমুহূর্তেই কালচে জলপাই রঙের তিনটি মিলিটার ট্রুপ ক্যারিয়ার অতি নিঃশব্দে ক্যাম্পের তোরণ পেরিয়ে গহীন অরণ্যের রুট ধরে ধাবমান হলো। দেশপ্রেমী অকুতোভয় সৈন্যদের নেতৃত্বে কিছুক্ষণের মাঝেই সংঘটিত হবে অতি বিপজ্জনক ও জীবনপণ মিশন।
পাহাড়ি হিমেল হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে কক্ষের ভেতরটা। মধ্যরাতের টিকটিক ধ্বনি শ্রবণান্দ্রেয়ে প্রবল বেগে আঘাত হানতেই তন্দ্রা ছুটে গেল কায়রার। হঠাৎ,এক অদ্ভুত ব্যাকুলতায় বক্ষপিঞ্জর কেঁপে উঠল ওর, এক অদৃশ্য অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে এলো দম।
ধীর পায়ে উঠে অজু সেরে এলো কায়রা। ইদানিং প্রিয়তম পুরুষের সুরক্ষার তাগিদে নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়ায় ও। একজন সৈনিকের সহধর্মিণী হওয়ার পথটা যে কত কঠিন, ভালোবাসার মানুষটিকে প্রতি মুহূর্তে স্রষ্টার দরবারে আমানত রেখে বাঁচতে হয় তা দুর্জয়ের জীবনে আসার পর থেকে একটু একটু করে উপলব্ধি করছে কায়রা।
বিছানার পাশে সুদৃশ্য জায়নামাজটি বিছিয়ে দু-রাকাত নফল সালাত আদায় করে সালাম ফেরাল ও। ঠিক সেই মুহূর্তে পার্শ্ববর্তী মুঠোফোনটা মৃদু কম্পনে সজাগ হলো। কায়রা ত্বরিত গতিতে ফোনটি হাতে নিতেই, ডিসপ্লেতে ভাসমান এক অতি সংক্ষিপ্ত বার্তায় সর্বাঙ্গে তীব্র ঝাকুনি অনুভব করল ও।
প্রেরক—‘মাই মেজর’। বার্তাটায় বড্ড সংক্ষেপে লেখা,,
“আই অ্যাম হেডিং ফর আ মেজর ট্রিকি অপারেশন, মাই লাভ। ফোন অফ থাকবে। টেক কেয়ার অফ ইউরসেলফ এন্ড বি স্ট্রং, মাই ম্যাজিস্টি।”
বার্তাটি পাঠিয়েই দুর্জয় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কায়রা ব্যাকুল হয়ে কয়েকবার রিপ্লাই পাঠাল, ডায়াল করল ওর নম্বরে—কিন্তু অপর প্রান্ত কেবল নিথর, নিস্তব্ধ! মুহূর্তেই চোখ ছাপিয়ে অশ্রুর অবাধ্য ঢল নামল। বুকে হাত চেপে জায়নামাজে বসেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ও। মনের সমস্ত ব্যাকুলতা, সমস্ত ভয় উগড়ে দিয়ে দু হাত তুলে মোনাজাতে হাত বাড়াল স্রষ্টার দরবারে,,
“ইয়া আল্লাহ! আমার মানুষটাকে আপনি সহিহ সালামতে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েন… ওনার কোনো ক্ষতি হতে দিয়েন না!আপনার পাপিষ্ঠা বান্দীটাকে আবার তার ভালোবাসার মানুষটার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে দিয়েন!”
অপর প্রান্তে, কালচে জলপাই রঙের মিলিটারি ট্রুপ ক্যারিয়ারটি গহীন পাহাড়ের বুক চিরে প্রকাণ্ড গতিতে ধাবমান। রাতের আঁধারে গাড়ির ভেতর কেবল নাইট ভিশন চশমা আর অস্ত্রশস্ত্রের ধাতব শব্দ। ফোনটা পকেটে পুরে সিটে মাথা এলিয়ে দিল দুর্জয়।চক্ষু কার্নিশে ভেসে উঠল শুভ্র চঞ্চল মুখখানি, সেই সকাতর আকুতি আর ব্যাকুল চোখের জল। চেনা-অচেনা সহস্র সামরিক অভিযানের মুখোমুখী হয়েছে ও, কিন্তু আজকের রাতটা বড্ড ভিন্ন! সুদীর্ঘ সামরিক জীবনে এই প্রথমবার কোনো মিশনে যাওয়ার মুহূর্তে দুর্জয়ের ইস্পাতকঠিন হৃদয়ে এক প্রকাণ্ড পিছুটান মোচড় দিয়ে উঠছে!
অভিসৃতি পর্ব ২০
হয়তো আজকের অপারেশনটি বড্ড বিপজ্জনক, র’ক্তক্ষয়ী হতে চলেছে। হয়তো এটাই কায়রার সাথে ওর শেষ যোগাযোগ! অস্ফুটে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ দুটি বুজল অকুতোভয় সেনাপতি। প্রিয়তমার স্মৃতি বুকে আঁকড়ে, সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করে নিল এক কঠিন, জীবনপণ সমরের জন্য।
