Home অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৩

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৩

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৩
নুসাইবা ইভানা

অন্তর বসে আছে মাতুয়াইল ফুট ওভার ব্রিজের নিচের বকুলতলার টি স্টলে। নয়নার সাথে ফোনে কথা বলে চলে এসেছে এখানে। যদিও দোকান বন্ধ। আশেপাশে সব দোকান প্রায় বন্ধ। এত রাতে দু-একটা দোকান যা খোলা আছে, তাও হয়তো হাসপাতালের জন্য। ফাঁকা রাস্তায় শাঁ শাঁ করে দু-একটা দূরপাল্লার বাস চোখের পলকে ছুটে চলছে তাদের গন্তব্যে।

বকুলফুলগুলো পড়ে আছে মাটিতে। কিছু ফুল কুড়িয়ে হাতে নিল অন্তর। চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রুর কণা। এই জায়গাটার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তুষি। একদিন বলল, “দেখা করব। আমার পছন্দের জায়গায় আসো তো। শোনো, পাঞ্জাবি পরে আসবে কিন্তু।” সেদিন অন্তর অফ হোয়াইট কালারের পাঞ্জাবি পরে এসেছিল। তুষি পরেছিল বাসন্তী রঙের শাড়ি। অন্তর তুষির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তুষি হালকা গলা খাকারি দিয়ে বলে, “মিস্টার হ্যান্ডসাম, এটা ব্যস্ত রাস্তা। এখানে এভাবে তাকিয়ে থাকাটা ঠিক না। চলো এমন কোথাও যাই, যেখানে তোমাকে মন ভরে দেখতে পারব।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“কাজি অফিসে চলুন।”
“তুমি বললে তো মরুভূমিতেও চলে যাব। কাজি অফিস তো কোনো ব্যাপারই না। চলো।”
তুষি নিজেই অন্তরের হাত ধরে বলে, “চলুন।”
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“আমার সাথে যাচ্ছেন আমার প্রিয় প্লেসে।”
তুষি যখন হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকল, অন্তর বলল, “হাসপাতাল কারো প্রিয় জায়গা কী করে হয়! পাবনা মেন্টাল হাসপাতাল হলে তবুও বুঝতাম। কিন্তু শিশু হাসপাতাল?”
তুষি অন্তরের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি কি আমাকে পাগল বললে?”
“বলার কী আছে! তুমি তো পাগলি।”
তুষি বকুলতলায় এনে অন্তরকে বলে, “এই জায়গাটা সুনয়নার অনেক পছন্দের। ওর সাথে সাথে এখানে আসতে আসতে আমারও পছন্দের জায়গা হয়ে গেছে।”
“সুনয়নার সাথে তোমার এত ভালো সম্পর্ক থাকার পরেও কীভাবে এমন কাজ করতে পারো তুমি?”
“তুমি হয়তো আমাকে ক্ষমা করতে পারছ না। কিন্তু জানো, সুনয়না আমাকে ক্ষমা করে দেবে।”
“আমার মনে হয় না।”

“ও জানে আমার পরিস্থিতি। সেই ক্লাস টুতে থাকতে মাকে হারিয়েছি। এরপর বছর না ঘুরতেই সৎমায়ের সাথে জীবন কাটাতে শুরু করি। আমার সব স্ট্রাগলের গল্প নয়নার জানা। ওর সাথে দেখা হওয়ার আগে আমার জীবন আরও কঠিন ছিল। বেশিরভাগ সময় সকালে আমাকে টিফিন দেওয়া হতো না। ক্লাস সিক্সে পাগলা হাইস্কুলে যখন ভর্তি হই, তখন দেখা হয় নয়না নামক মেয়েটার সাথে। কীভাবে কীভাবে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ও প্রতিদিন আমার জন্য টিফিন নিয়ে আসত। রাতেও মাঝে মাঝে আমার কপালে খাবার জুটত না। সকালে এসে নয়নার দেওয়া নাস্তা খেতাম। আমার বাবার ইনকাম কম ছিল না, মোটামুটি ভালোই ইনকাম করতেন। কিন্তু সৎমা কোনোদিন আপন মা হয় না। সারাদিন বাসার সব কাজ আমি করতাম। যেন ওই বাসায় কোনো আশ্রিতা বা কাজের মেয়ে। শুধু বাবার সামনে আমার সাথে ভালো ব্যবহার করত। আমি জাহিনের সাথে যা করেছি, লোভে করেছি।

প্রথমবার জাহিন বিশাল বড় একটা পার্সেল পাঠিয়েছিল। সেখানে ছিল নানারকমের চকোলেট, ড্রেস, মোবাইল ফোন। আমার সৎমা সেটা দেখে আমাকে বলেছিল, জীবনে প্রথম কোনো ভালো কাজ করেছি আমি। ছেলে বড়লোক, আমার সব খরচ তার কাছ থেকে নিতে। দেড় বছর আমি জাহিনের কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়েছি। বলতে গেলে প্রাইভেট খরচ থেকে শুরু করে হাতখরচ—সব ওর টাকায় চলত। আমি বলেছিলাম আমি গরিব, সেটা জাহিন মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না দারোয়ান চাচার সাথে ওর যোগাযোগ ছিল। ও জানত আমি মিথ্যে বলছি। কারণ সুনয়না তো আসলেই বড়লোক। হয়তো তাকে পরীক্ষা করার জন্য মিথ্যে বলছি, তাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা পাঠাত প্রতি মাসে। সাথে মাঝে মাঝে বড় বড় পার্সেল তো আসতই। তবে জানো, জাহিন চৌধুরী সত্যি সত্যি সুনয়নাকে অনেক ভালোবাসত। আর আমি লোভে পড়ে তার হৃদয়ের ভালোবাসাকে নষ্ট করে দিয়েছি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোমাকে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই।”

অন্তর কিছু সময় চুপ থেকে উত্তর দিল, “চলে যাও। তবে মনে রেখো, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আমার মতো কেউ তোমাকে ভালোবাসতে পারবে না।”
“আমি জানি আমি ভুল করেছি, কিন্তু ওই সময় সেই জ্ঞান আমার ছিল না। জানো, মেয়ে মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় প্রাণী। এরা অনেক কষ্ট সহ্য করে হলেও একটা নিরাপদ স্থান আঁকড়ে ধরে থাকে। কারণ তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। তুমি যদি কোনোদিন আমার জামার পেছনটা উঠিয়ে দেখতে, তাহলে কাঁদতে ফেলবে। সবচেয়ে বেশি আঘাত পিঠে করত। কখনো খুন্তি পুড়িয়ে লাগিয়ে দিত। কখনো রড দিয়ে পেটাত। এখনো এসব থেকে মুক্তি মেলেনি আমার।”

অন্তর তুষির হাত ধরে সোজা নিয়ে এল যাত্রাবাড়ী এক কাজি অফিসে। বিয়ে করে হয়ে গেল দুজন দুজনার।
তুষি অন্তরের হাতটা শক্ত করে ধরে বলে, “পরশু দিন বাবার ছুটি। সেদিন বাবাকে সবটা জানিয়ে চলে আসব তোমার কাছে। তোমাকে সাথে করে নিয়েই দেখা করতে যাব নয়নার সাথে। আমার বিশ্বাস, ও আমাকে ক্ষমা করে দেবে।”
অন্তর তুষির হাতে চুমু খেয়ে বলে, “এরপর থেকে জীবনে তোমার কোনোদিন নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য কষ্ট সহ্য করতে হবে না। যদি আমিও হই তবুও আর অন্যায় সহ্য করবে না। আমি চাই তুমি মন খুলে বাঁচো।”
তুষি অন্তরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মৃদু স্বরে বলল, “ভালোবাসার ঋণ সারা জীবন আমি ভালোবাসার বিনিময়ে শোধ করব। আজ রাতে আমার শান্তির ঘুম হবে। কত রাত জেগে ভেবেছি কী হবে আমার ভবিষ্যতে? আজ মনে হচ্ছে এতদিনের সব কষ্ট যেন উবে গেল তোমাকে নিজের করে পেয়ে।”
অন্তর তুষির কপালে চুমু দিয়ে বলে, “অর্ধাঙ্গিনী, আজ তো আমাদের বাসর রাত।”
তুষি হেসে বলে, “পরশু দিন আমাদের ফুলশয্যা হবে। দুদিন কষ্ট করে অপেক্ষা করো।”

“একটা লিপ কিস।”
“তোমার ড্রাইভার দেখবে তো লুকিং গ্লাসে।”
অন্তর ড্রাইভারকে বলল, “চোখ বন্ধ করতে।”
তুষির ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল অন্তর। মিনিট দুয়েক পরে ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে বলে, “বউ না থাকলে বছরের পর বছর কাটানো যায়। কিন্তু বউ থাকার পরেও একা থাকা কষ্টের।”
তুষি মৃদু হেসে বলে, “আর দুটো দিন।”
অন্তর দোকানের বেঞ্চে বসেই সেদিনের সুন্দর দিনটা কল্পনা করল। তার অর্ধাঙ্গিনী তাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেল! কেন গেল? এত ভালোবাসার পরেও কি মানুষ ছেড়ে যেতে পারে!

নয়না জিয়ানের হাত ধরে বলে, “ভেঙে পড়ো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“এত সুন্দর জীবনটা কীভাবে যেন এলোমেলো হয়ে গেল। মনে হচ্ছে আর কখনো কিছু ঠিক হবে না।”
“এটা তোমার ভুল ধারণা। যদিও বিপদের সময় এটাই মনে হয়। তবে বিপদ একটা দীর্ঘ রাতের মতো। রাতের আঁধার কেটে যেমন সূর্য ওঠে, ঠিক একদিন বিপদ কেটে নতুন দিনের আলো এসে জীবনে আলোকিত করে তুলবে।”
জিয়ান নয়নার কাঁধে মাথা রেখে বলে, “আমি আর কিছু হারাতে চাই না।”
নয়না জিয়ানের মাথায় ভালোবাসার পরশে হাত বুলিয়ে দেয়। ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকাটা ম্যাজিকের মতো দুঃখ কমিয়ে সাহস যোগায়।
হুট করে জাহিন এসে বলে, “ভাই।”
নয়না কিছুটা সরে বসে জিয়ানের কাছ থেকে।
জিয়ান বলল, “কী রে, কিছু বলবি?”

জাহিন কিছু বলার আগেই নয়না বলে, “আপনি কি তুষির সাথে যোগাযোগ করেছিলেন এই তিন দিনের মধ্যে?”
জাহিন এত কিছুর মধ্যে ভুলেই বসেছিল তুষির কথা। নয়নার মুখে তুষির নাম শুনেই ছুটে বের হয়ে গেল।
নয়নার মুখে ফুটে উঠল টেনশন। জিয়ানের হাত শক্ত করে ধরে বলে, “আমার মন বলছে জাহিন ভাই নিশ্চিত তুষির সাথে কিছু করেছে। সে আবার তুষিকে খুন করে ফেলেনি তো? এই অসুস্থ মস্তিষ্কের লোকটাকে তো বিশ্বাস নেই।”
“কী বলছ এসব! এই কয়দিন তো ও বাসায় আমাদের সাথেই ছিল।”

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২২

নয়না বলল, “দেখলে না কীভাবে ছুটে গেল? তুষির সাথে কিছু করলে আমি কিন্তু ভুলে যাব এই অমানুষটা তোমার ভাই।”
নয়না কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন তুলে অন্তরকে কল করল। অন্তর তখনও শুয়ে আছে ফুটপাতের সেই বেঞ্চে। ফোন রিসিভ করে নয়নার কথা শুনে অন্তর ছুটে যেতে লাগল তাদের গোপন আস্তানায়।

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৪