অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৪
মম সাহা
ঘন মেঘের আস্তরণে আকাশের আলো নিঃশেষ প্রায়। তুমুল বেগে বর্ষণ তখন আনন্দ লীলা বর্ণনা করছে। কিসের আনন্দ তার? নন্দার কলঙ্ক ধুয়ে মিছে নেওয়ার আনন্দ কী? প্রকৃতি কথা বলতে পারে না, তাই হয়তো আনন্দ প্রকাশ করছে অন্য ধারায়। “অলকানন্দার নির্বাসন” মহলের চারপাশে রঙবেরঙের কাপড় টানানো হয়েছে। যেন বৃষ্টি না পড়ে কারণ আজ নির্বাসন মহলে বিরাট ভোজ হবে। স্টিফেনের পরিচালনায় ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। পুরো গ্রামবাসীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনকি সকলের জন্য একটি করে স্বর্ণমুদ্রা এবং বস্ত্রেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্টিফেনের ভাষ্যমতে, তার ভালো সময়কে উদযাপন করতে তার সাথে যারা যুক্ত হবে তারা যেন সকলে আনন্দে আত্মহারা হয়। আর বর্তমান সময়ে কৃষকের ঘরে একটি স্বর্ণমুদ্রাই আনন্দের জন্য যথেষ্ট। আর বরাবরই যার যেটার অভাব সেটা দিলেই তার আনন্দ।
নন্দা দুচোখ ভরে দেখলো সেই আনন্দ। তার কলঙ্কের মৃত্যুতে কেউ এতটা খুশি হবে সে ভাবতেও পারেনি। পৃথিবীতে সবাইতো স্বার্থের জন্যেই ভালবাসলো, কাছে আসলো, আবার দূরে চলে গেল। অথচ এই একটা মানুষ যে নন্দাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গেছে, পাশে ছিল শক্ত ভিত্তি হয়ে। অথচ নন্দা কখনোই মানুষটাকে তেমন মূল্য দেয়নি। কেন দেয়নি? কারণ সে একটি বিশ্বাসঘাতকের জন্য পথ চেয়ে বসেছিল, তার সবটুকু ভালোবাসা সেই আঙিনায় ঢেলেছিল– যে আঙ্গিনা আসলে সেই ভালোবাসার যোগ্যই না। নন্দা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বিবশ চোখে তাকিয়ে রইল বারান্দা দিয়ে আনন্দে আত্মহারা মানুষটার দিকে। মানুষটার এত আনন্দ, এত আয়োজন কেবল নন্দার জন্য। মানুষের মুখে হাসি ঝলমল করছে। সুখী সুখী একটি আবহাওয়া যেন তার চারপাশ জুড়ে।
নন্দা বারান্দা থেকে সরে বিশাল এক স্বস্তির শ্বাস ফেললো। বুকের ভেতর থেকে যেন বিরাট এক পাথর নেমে গেল। সব নিয়ে বাঁচা গেলেও চরিত্রে দাঁগ দিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। বেঁচে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে একজন নারীর জন্য। আর নন্দা এতদিন যাবত এই কঠিন কাজটাই করে আসছিল। বেঁচে অবশ্য ছিল কিন্তু মৃত্যুর মতো এই বেঁচে থাকা। যে বেঁচে থাকায় মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলা যায় না, মানুষের থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয় সেই বেঁচে থাকায় আসলে মহত্ব কোথায়? এমন বেঁচে থাকা মৃত্যুর সমান। আর নন্দা এই জীবিত মৃত্যু নিয়ে বেঁচে ছিল। একটি অভিশপ্ত জীবন বহন করে বেঁচে ছিল। অবশেষে আজ থেকে তার সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকার দিন শুরু। আর সে বাঁচবে। অন্তত যে মানুষটা তাকে এতটা ভালবাসে, যে মানুষটা তার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতেও রাজি নন্দা সেই মানুষটার জন্য বাঁচবে। বাঁচতে যে হবেই। না হয় বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
নন্দার চোখে ভেসে উঠলো গত দিনের দৃশ্য। যে গ্রাম একদিন নন্দাকে মেরে ফেলতেও দু’বার ভাবেনি, কলঙ্ক ছেটাতেও দু’বার ভাবিনি সে গ্রাম কালকে নন্দার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছিল একটু ক্ষমা ভিক্ষা চাইতে। যে গ্রাম থেকে একদিন মাথা নত করে বের হয়ে এসেছিল , কাল সেই গ্রামই সে মাথা উঁচু করে ক্ষমা ভিক্ষা দিয়ে এসেছে। জীবনে এর চেয়ে বড় কোন মহিমা হয় না। আর এই মহিমার পুরো কৃতিত্ব একজনের। কেবল আর কেবলমাত্র তার স্বামীর। গতকালের একটা দৃশ্যই নন্দা ভুলতে পারছে না। স্টিফেন কেমন গর্জন দিয়ে উঠেছিল গ্রামবাসীর বিপরীতে! আর নন্দাকে সেই গ্রামের কর্তৃত্ব অর্পণ করেছিল। সকলের সামনে যে মেয়েটা একদিন দুশ্চরিত্রার তকমা লাগিয়ে গ্রাম ছেড়েছিল সেই মেয়েটাই আজ গ্রাম চালাবে! এরকম একটা মহৎ ব্যাপার একমাত্র স্টিফেনের জন্যই সম্ভব হয়েছে। মায়ের মতন যেই শাশুড়ি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সেই শাশুড়ি কাল নন্দার জন্য হাউ মাউ করে কেঁদেছে। নন্দার এই জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই। যা পেয়েছে তাই তার সারা জীবনের জন্য যথেষ্ট। এতেই সে আমরণ কৃতজ্ঞ থাকবে।
বেশ সময় নিয়ে সে স্নান করল। লাল টুকটুকে একটি শাড়ি জড়ালো শরীরে। সোনার ভারী গহনা গুলো দিয়ে সাজালো তার কোমল অঙ্গ খানি। শরীরের সুগন্ধি মাখতেও ভুললো না। নিজেকে রানীর মতো সাজালো। এতদিন পর স্টিফেনের বলা কথাটার মাধুর্যতা সে বুঝলো। সে আসলেই রানী। যার এমন একটা রাজা আছে সে রানী না হয়ে পারে!
“বড়ো সাজছো যে! কলঙ্ক ঘুচানোর আনন্দে নাকি অন্যকিছু?”
হুট করে নারী কণ্ঠ শুনতেই চমকে গেল নন্দা। পিছু ফিরে তাকাতেই দেখল বিহারিণী দাঁড়িয়ে আছে হাসি হাসি মুখ করে। চোখে মুখে তার প্রগাঢ় স্নিগ্ধতা। নন্দাও হাসল কিঞ্চিৎ। রহস্য করে বলল,
“তোমার কী মনেহয় বলো দেখি?”
“মনে তো কিছুই হচ্ছে না। তাই তো আমি জিজ্ঞেস করলাম।”
“হবেই একটা কারণ। তবে তুমি খুশি কেন?”
“যদি বলি তোমার খুশিতে?”
বিহারিণীর উত্তরে হাসল নন্দা। চোখে গাঢ় কাঁজল লাগাতে লাগাতে বলল,
“অনেক তো হলো লুকোচুরি। ধরা দিবে না এখন?”
নন্দার এহেন প্রশ্নের মানে বুঝল না বিহারিণী। অবাক কণ্ঠে বলল,
“কিসের ধরা দিব?”
“বিহারিণী মহলের তোমাকে প্রয়োজন এখন। মানুষ গুলো কেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। তাদের তুমিই পারে গুছিয়ে নিতে। নিবে না?”
বিহারিণী চমকালো। বি স্ফো রি ত নয়নে চাইল নন্দার পানে। আমতা-আমতা করে বলল,
“বিহারিণী মহলে আমার কে আছে? কিছু না। কেউ না।”
“অথচ মহলের নামটায় অব্দি তোমার অস্তিত্ব। তবুও অভিমান কমবে না?”
“অভিমান না তো। কলঙ্ক। যে কলঙ্ক নিয়ে তুমি গ্রাম ছাড়া হয়েছ সে কলঙ্কের ভাগিদার তো আমিও হয়েছিলাম। তোমার কলঙ্ক মুছে গিয়েছে। এটা ক্ষণিকের আর আমারটা আজন্মের। এই কলঙ্ক নিয়ে আবার সেখানে যাওয়া যাবে না।”
নন্দা বুঝল, আন্দাজে ঢিল মারলেও যে সঠিক জায়গায় ঢিলটা পরেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সে আগ্রহী হলো। কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
অলকানন্দার নির্বাসন পর্ব ৩৩ (২)
“কিসের কলঙ্ক? কে লাগিয়ে ছিল?”
“যে তোমাকে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সে-ই আমাকে স্বাধীন হতে বলে কলঙ্কিনী করে গিয়েছে। পার্থক্য একটাই, তুমি বেঁচে ফিরেছ আর আমাকে মরতে হয়েছিল।”
