অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৬
সুমি চৌধুরী
অতীত,,,,
হসপিটালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে রিদি। বিষের তীব্রতা শরীরের অনেকটা গভীরে চলে যাওয়ায় তার অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। রিদির ফর্সা শরীরটা এখন ফ্যাকাসে হয়ে নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে। অক্সিজেনের মাস্কের আড়ালে তার নিশ্বাসগুলো বড্ড ভারী আর যন্ত্রণাদায়ক। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন বিষ রক্তে মিশতে শুরু করেছে তাই এই লড়াইটা বড় অসম। করিডোরের এক কোণে রাবেয়া এহসান দেয়ালে মাথা ঠুকছেন আর বিলাপ করছেন। ইমন তার মায়ের আঁচল ধরে ভয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইকবাল এহসান করিডোরের বেঞ্চে বসে আছেন কিন্তু তাঁর প্রাণ যেন ভেতরে ওই শয্যাশায়ী মেয়েটার কাছে। তাঁর হাতে রিদির সেই রক্তক্ষরণ করা চিঠি যা পড়ার পর তাঁর কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠছে। সোহান চৌধুরীও পাথর হয়ে বসে আছেন। শুভ্রার কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। আর ঈশান করিডোরের জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোয়াল শক্ত দুচোখে শুভ্রের ওপর প্রচণ্ড ঘৃণা। সে বিড়বিড় করে বলছে।
“এত ইগো কেন বসের? এত রাগ কেন তাঁর? একটা মরণাপন্ন মেয়ের জীবন নিয়ে খেলার ফল কি খুব মধুর হবে?”
টানা দুদিন পর রিদি যখন চোখের পাতা মেলল তখন তার সেই ম্লান দৃষ্টিতে বেঁচে থাকার কোনো তৃপ্তি ছিল না। সে যখন বুঝতে পারল সে মারা যায়নি তখন তার মনের ভেতরটা বিষধর কোনো সাপের মতো ফণা তুলে উঠল। শরীর দুর্বল হলেও মনের জেদ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। নার্স যখন তার হাতে নতুন করে স্যালাইনের সুচ ঢোকাতে গেল রিদি তার অবশ শরীর নিয়ে সজোরে হাত সরিয়ে দিল। গলার ভেতরটা বিষে পুড়ে যাওয়ায় সে ঠিকমতো শব্দ করতে পারছে না তবুও বুক ফাটা এক ভাঙা আর কর্কশ কণ্ঠে আর্তনাদ করে বলল।
“আমাকে কেন মরতে দিলে না তোমরা? কেন আমাকে এই নরকে ফিরিয়ে আনলে? আমি একটু শান্তি চেয়েছিলাম। আমাকে প্লিজ শান্তিতে ঘুমাতে দাও। আমাকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলো তোমরা।”
রিদি নিজের গায়ের সব তার আর সুচ দাঁত দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে লাগল। তার এমন উন্মাদনা দেখে চিকিৎসকরাও ঘাবড়ে গেলেন। রাবেয়া এহসান মেয়ের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন।
“মা আমার। এমন করিস না। তোর বাবা মা কি কিছুই না তোর কাছে? কেন এভাবে চলে যেতে চাস মা?”
রিদির পাগলামি যেন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সে নিজেকে ক্ষতবিশোধ করে ফেলছে। মেয়ের এই বীভৎস অবস্থা দেখে ইকবাল এহসান আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি সোহান চৌধুরীর সামনে গিয়ে কাঙালের মতো দুই হাত পেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তাঁর কণ্ঠস্বর কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসছিল। তিনি অত্যন্ত করুণ আর আকুতি ভরা গলায় বললেন।
“ভাইসাব। আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। রিদি যেন শুভ্রকে ভুলে যায়। আমি ওকে অন্য হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম যেন আপনার ছেলের মায়া থেকে ও মুক্তি পায়। কিন্তু আমার মেয়েটা ওই শুভ্রের উপর এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে যে এখন মৃত্যুটাই ওর কাছে পরম সুখ মনে হচ্ছে। ভাইসাব। বাবা হয়ে মেয়ের এই মৃত্যুযন্ত্রণা আমি সইতে পারছি না। আমার মেয়েটার জীবন আপনার হাতে। ওকে একটু ভিক্ষা দিন। নাহলে আমি আমার সন্তানকে চিরকালের মতো হারাবো।”
সোহান চৌধুরী ইকবাল এহসানের হাত ধরে টেনে তুললেন। তাঁর নিজের বুকেও তখন অপরাধবোধের পাহাড় চেপে আছে। তিনি ধরা গলায় গম্ভীর অথচ আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বললেন।
“ইকবাল। শান্ত হ। দোষটা আসলে আমারই। আমি ভেবেছিলাম ওদের মাঝের এই প্রেম স্রেফ ক্ষণিকের মোহ। দুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই আমি আমাদের দীর্ঘদিনের আত্মীয়তা নষ্ট হওয়ার ভয়ে ওদের এক করতে চাইনি। ভেবেছিলাম অন্য কোথাও বিয়ে দিলে রিদি মানিয়ে নেবে। কিন্তু এই মেয়েটা যে তার ভালোবাসার জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে তা আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি।”
সোহান চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইকবাল এহসানকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ধীর গলায় বললেন।
“বোনজামাই থেকে তো বিয়াইসাব হওয়া যায়। কী বলো ইকবাল?”
ইকবাল এহসান যেন ঘোর অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আলোর সন্ধান পেলেন। তিনি খুশিতে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন।
“অবশ্যই ভাইসাব।”
কেভিনের ভেতর রিদি তখনও ছটফট করছে। গলার ভাঙা স্বর নিয়ে আর্তনাদ করে বলতে লাগল।
“আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে মুক্তি দিন। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। এই পৃথিবীটা আমাকে পুড়িয়ে মারছে। প্রতিটা সেকেন্ডে শুভ্র ভাইয়ের অবহেলা আমাকে তিলে তিলে শেষ করছে। তার চেয়ে একবারে মরে যাওয়া অনেক ভালো।”
সোহান চৌধুরী ধীর পায়ে রিদির মাথার কাছে গিয়ে বসলেন। তিনি অত্যন্ত স্নেহের সাথে রিদির কপালে হাত রেখে খুব শান্ত আর মায়াবী কণ্ঠে বললেন।
“শান্ত হ মা। পাগলামি করিস না। আর মরতে হবে না তোকে। তুই জিতে গেছিস মা। আমাদের এই কঠিন হৃদয়ের পরাজয় হয়েছে। তোর এই পাহাড়সমান ভালোবাসার কাছে আমরা আজ নত। চিন্তা করিস না। আমার ওই অবাধ্য ছেলেটাকে তোর আঁচলেই শক্ত করে গেঁথে দেবো ও দেশে ফিরলেই। তুই শুধু নিজের যত্ন নে।”
মুহূর্তের মধ্যে রিদি একদম শান্ত হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগে যে মেয়েটা ঘর ফাটিয়ে আর্তনাদ করছিল সে এখন যেন এক নিশ্চল পাথর। তার চোখে খুশির এক চিকচিক ঝিলিক দেখা দিল। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সোহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে একদম নিচু আর কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল।
“মা মা মামা। তুমি কি সত্যি বলছো? আমায় আর দূরে সরিয়ে দেবে না তো?”
“হ্যাঁ সত্যি মা। একবার ও আসুক। একদম তোর আঁচলে শক্ত গিঁট দিয়ে দেবো।”
রিদি যেন হারানো কোনো স্বর্গ ফিরে পেল। সে এক লহমায় খুব শান্ত আর অবুঝ শিশুর মতো হয়ে গেল। ইকবাল এহসান আদরের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুটে বললেন।
“আমাকে মাফ করে দিস মা। আমি বাবা হয়েও তোর মনের হাহাকার বুঝতে পারিনি। আর পাগলামি করিস না। তোর বাবার যে বড় কষ্ট হয়।”
রিদি এবার বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। তবে এই কান্না বিষাদের নয়। এ কান্না সব পাওয়ার আনন্দে মেশা এক অদ্ভুত স্বস্তির। রাবেয়া এহসান মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে ওকে আগলে ধরলেন। আর ছোট ইমন ওর আপুর হাত শক্ত করে ধরে মনে মনে বলল যে তার আপু আর কোথাও যাবে না।
সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর দেখতে দেখতে ছয়টা মাস কেটে গেছে। এই ছয় মাসে রিদির মাঝে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। আগের সেই পাগলামি জেদ বা কান্নাকাটি এখন আর নেই। সে একদম শান্ত কিন্তু এই শান্ত থাকাটা যেন আরও বেশি ভীতিজাগানিয়া। রিদি এখন পাথরের মতো চুপচাপ থাকে। কলেজে যায় ক্লাস করে বাড়ি ফেরে সবই চলে যন্ত্রের মতো। শুভ্রা তাকে হাসানোর জন্য সারাদিন কত কসরত করে কত দুষ্টুমি করে কিন্তু রিদির ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখাও ফুটে ওঠে না। তার চোখ দুটো যেন সবসময় এক গভীর শূন্যতায় ডুবে থাকে। সোহান চৌধুরী এই ছয় মাসে শুভ্রের ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপেছেন। ছেলেটার কোনো হদিস নেই ফোন বন্ধ দেশে আসার নাম নেই। রাগে দুঃখে তিনি একদিন পরিবারের সবার সামনে বিশেষ করে ঈশানকে উদ্দেশ্য করে কড়া গলায় বললেন।
“শোনো ঈশান। শুভ্র যদি কখনো ফোন খোলে বা কারো সাথে ওর কথা হয় তবে তাকে স্পষ্ট বলে দেবে রিদির বিয়ে হয়ে গেছে। ও দেশে আসবে না ছাইড়া ওর বাপ সহ আসবে।”
ঈশান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল।
“আঙ্কেল। ওর বাবা তো আপনিই।”
সোহান চৌধুরী একটু থতমত খেয়ে জোরে জোরে কেশে উঠলেন। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে বললেন।
“আরে ওটা তো কথার কথা। যাই হোক আমার কথাটা যেন কানে থাকে। ও যখন দেশে আসবে তখন রিদি আমাদের বাসাতেই থাকবে। আর সবাই এক সুরে বলবে যে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। তখন দেখবো ওর ইগো আর জেদ কোথায় গিয়ে ঠেকে।”
সেদিন কলেজ থেকে রিদি আর শুভ্রা গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ রাস্তার মোড়ে ঈশানের সাথে দেখা। ঈশান বাইক থামিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল।
“আরে। তোমাদের সাথেই দেখা হয়ে গেল। তা দুই মহারানী কি বাড়ি ফিরছো?”
শুভ্রা এক গাল হেসে উত্তর দিল।
“হ্যাঁ ভাইয়া। তবে আজ কিন্তু আপনাকে পেয়েছি যখন তখন আমাদের না খাইয়ে আমরা ছাড়ছি না।”
ঈশানও হাসিমুখে সায় দিল।
“আচ্ছা বাবা। চলো। কী খাবে বলো?”
“ফুচকা।”
শুভ্রার চটজলদি উত্তর। রিদি কোনো মানা করল না। ফুচকাওয়ালা মামার দোকানের সামনে গিয়ে দুজনেই দুই প্লেট নিয়ে যুদ্ধ শুরু করল। মেয়েরা যে ফুচকার জন্য কেন এত পাগল হয় ঈশান মাঝে মাঝে ভেবে পায় না। সে ওদের সামনের বেঞ্চে বসে নিজের ফোনটা বের করল। ফোনটা ওপেন করতেই অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু টিকটক নোটিফিকেশন এল। ঈশান বিরক্ত হয়ে সেগুলো স্কিপ করতে গিয়ে ভুলবশত টিকটকে ঢুকে পড়ল। বের হয়ে আসার জন্য যখনই সে স্ক্রল করতে যাবে ঠিক তখনই একটা ভিডিও দেখে তার চোখ কপালে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক জাঁকজমকপূর্ণ ক্লাবের স্টেজ। সেখানে গিটার বাজাতে বাজাতে দরাজ গলায় গান গাইছে স্বয়ং শুভ্র। ঈশান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ফোনের ব্রাইটনেস বাড়িয়ে একদম কাছে নিয়ে দেখল। হ্যাঁ এ তো শুভ্রই। সাদা টি শার্ট চোখে দামি সানগ্লাস কী দারুণ স্টাইলিশ লাগছে ওকে। মনে হচ্ছে কোনো প্রফেশনাল গায়ক তার প্রেমিকার জন্য স্টেজে গান গাইছে। ঈশান আরও চমকাল ভিডিওর ভিউ দেখে। মাত্র ৫ মিনিটে ২৯.৪ হাজার ভিউ। লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেছে। সে আইডিতে ঢুকে দেখল ওটা কোনো এক কুয়েতি মেয়ের আইডি। ক্যাপশন লেখা।
“বাংলাদেশের হিরো এখন কুয়েতে। ওর গান শুনে আমি পুরো ফিদা। আফসোস কেন বাংলাদেশি হলাম না তাহলে একেই বিয়ে করে নিতাম। আমার মতো আর কে কে ক্রাশ খেয়েছো?”
কমেন্ট বক্সে তো যুদ্ধ লেগে গেছে। বাংলাদেশি মেয়েরাও কমেন্ট করছে।
“এই হিরোর বাড়ি কোথায়? আমি তো প্রেমে পড়ে গেলাম।”
কেউ লিখছে।
“বাসা কোথায় বলেন? আমি দেখা করতে যাবো।”
ফোনে তখন হালকা সাউন্ডে শুভ্রের সেই গানটা বাজছে।
~কী নেশা ছড়ালে~
~কী মায়ায় জড়ালে~
ঈশানকে ফোনের দিকে ওভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে শুভ্রা ফুচকা মুখে নিয়েই ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
“কী দেখছেন ভাইয়া ওভাবে? চোখ তো মনে হচ্ছে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। কী এমন অবিশ্বাস্য জিনিস দেখছেন?”
ঈশান চমকে উঠল হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল।
“না মানে কিছু না। এমনি একটা জিনিস দেখছিলাম।”
“কই দেখি। আমিও দেখবো।”
বলেই শুভ্রা ফোনটা নিতে হাত বাড়াল। ঈশান চট করে ফোনটা মাথার ওপরে তুলে ধরে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল।
“না। ফোন দেওয়া যাবে না তোমাকে।”
শুভ্রা ঠোঁট উল্টে অভিমানী স্বরে বলল।
“কেন? কী এমন গুপ্তধন আছে ফোনে? আমি দেখবোই। দেন বলছি।”
বলেই শুভ্রা লাফালাফি শুরু করল ফোনটা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। ঈশান বিরক্ত হয়ে বলল।
“শুভ্রা। বলছি তো দেওয়া যাবে না। পাগলামি করো না। যাও ফুচকা খাও গিয়ে।”
“আপনি প্রেম করেন। তাই না ভাইয়া?”
শুভ্রা গাল ফুলিয়ে জিগ্যেস করল। ঈশান থমকে গেল। এই মেয়ে বলে কী।
“কী হলো? দেন বলছি। আমি আপনার গার্লফ্রেন্ডকে দেখবো।”
ঈশান এবার একটু ধমকের সুরে বলল।
“যত্তসব আবল তাবল কথা। কানের নিচে দেবো কিন্তু। আমি প্রেম করি তুমি জানলে কোত্থেকে?”
শুভ্রা মুখ গোমড়া করে বলল।
“তাহলে ফোন দিচ্ছেন না কেন? আমি কি ফোন খেয়ে ফেলবো?”
“আমার ফোন দিয়ে তোমার কাজ কী?”
“দরকার আছে।”
“কী দরকার?”
“আমি দেখবো।”
ঈশান এবার ঠোঁট কামড়ে একটু মজা করে বলল।
“ভারী পাজি মেয়ে তো তুমি। একটা ছেলের ফোন চাইছো লজ্জা করছে না? একটা ছেলের ফোনে পার্সোনাল অনেক কিছু থাকতে পারে।”
পার্সোনাল কিছু কথাটি শোনামাত্রই শুভ্রার বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। সে ধরা গলায় বলল।
“কীসের পার্সোনাল? আপনি কি সত্যিই প্রেম করছেন?”
ঈশান মুচকি হাসল।
“করতেও তো পারি।”
“খুন করে ফেলবো একদম।”
বলেই শুভ্রা জিভে কামড় দিল। ছিঃ কী বলে ফেলল সে। ঈশান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“কিছু বললে তুমি?”
“কিছু না। থাকেন আপনি আপনার পার্সোনাল মানুষ নিয়ে।”
শুভ্রা একদম গাল ফুলিয়ে রিদির হাত ধরে টানতে টানতে হাঁটা দিল। রিদি এতক্ষণ চুপচাপ থেকে ওদের খুনসুটি দেখছিল। যেন এতক্ষণ কোনো সিনেমা চলছিল সেও কোনো কথা না বলে শুভ্রার সাথে চলে গেল। ঈশান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে বিড়বিড় করল।
“অভিমানী মেয়ে একটা।”
বিল মিটিয়ে ঈশান একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বুক ধকধকানি নিয়ে শুভ্রের নাম্বারে কল দিল। এতদিন ফোনটা বন্ধ ছিল আজ যদি ভাগ্য সহায় হয়। সত্যি সত্যি ফোনটায় রিং হতে শুরু করল। ঈশানের কলিজা যেন মুখে চলে এল। অবশেষে ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। সেদিন সোহান চৌধুরীর কড়া নির্দেশ অনুযায়ী ঈশান শুভ্রকে জানিয়ে দিয়েছিল যে রিদির বিয়ে হয়ে গেছে। খবরটা দিয়েই ঈশান ভয়ে আর উত্তেজনায় দ্রুত কলটা কেটে দিয়েছিল। ওই একটা মিথ্যা সংবাদ শুভ্রর সাজানো পৃথিবীটা ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। খবরটা শোনার পর শুভ্র আর এক মুহূর্ত প্রবাসে স্থির থাকতে পারেনি। সব মায়া ত্যাগ করে পাগলপ্রায় হয়ে সে প্রথম ফ্লাইটেই দেশে ফিরে এসেছিল। শুভ্রর দেশে ফেরার খবর পাওয়ামাত্র সোহান চৌধুরী নিজের নাটকীয় পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি রিদিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তবে রিদির মনে যাতে কোনো সন্দেহ না জাগে তাই তিনি রিদির সামনে গিয়ে একদম কঠিন আর রাশভারী গলায় একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন।
“রিদি। তুই এই রুমেই থাকবি। খবরদার। যদি এই রুমের বাইরে এক পা ও দিস তবে ভাববো তুই তোর মামাকে একদম ভালোবাসিস না। অর্থাৎ। তুই তোর হবু শ্বশুরকে সম্মান করিস না।”
রিদি সোহান চৌধুরীর এমন কড়া আদেশ অমান্য করতে পারেনি। সে শুভ্রার পাশের রুমেই একরকম বন্দি হয়ে গুমরে মরছিল। এদিকে শুভ্র তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে অন্য কেউ নিয়ে গেছে এই চিন্তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। ভালোবাসা হারানোর এই প্রচণ্ড মানসিক চাপে সে বাড়ির ভেতর রিদিকে না খুঁজে পাগলের মতো পুরো শহর চষে বেড়াচ্ছিল। আসলে শুভ্রর কোনো দোষ ছিল না। যখন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় অস্তিত্বটা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় তখন স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। শুভ্রর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। নিজের একদম হাতের নাগালে রিদি থাকা সত্ত্বেও সে তাকে পুরো শহরে খুঁজে হাহাকার করছিল। সে জানলও না। তার কাঙ্ক্ষিত নারীটি তখন তারই ঘরের পাশের রুমে তার বিরহে নিশব্দে কাঁদছে।
____অতীত শেষ বর্তমান____
পুরো অতীতটা শুনে শুভ্রের শরীর একদম নিস্তেজ হয়ে এল। মনে হচ্ছে পায়ের নিচের মাটিটা হঠাৎ সরে গেছে। সে ঠিকমতো নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারছে না। বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠছে। রিদি একা একা এতটা পথ এতটা কষ্ট সহ্য করেছে অথচ সে কিছুই জানল না। নিজের জেদ আর ইগোর বশবর্তী হয়ে সে তার মনোমোহিনীকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। অথচ সেই মেয়েটা একটা বারও তার কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। পাহাড়সমান অভিমান বুকে চেপে নিভৃতে কেঁদেছে। শুভ্রের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। নিজেকে এখন পৃথিবীর সব থেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে তার। সে আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে বুক চিরে আসা এক আর্তনাদ করে বলল।
“আহহহহহহহহহহ।”
শুভ্রের হঠাৎ এমন অবস্থা দেখে সাহেরা চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলেন। পাশ থেকে ঈশান সোহান চৌধুরী আর ইকবাল এহসানও প্রচণ্ড অস্থির হয়ে শুভ্রকে ধরলেন। সাহেরা চৌধুরী ছেলের কপালে হাত দিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন।
“বাবা তোর কী হয়েছে? এমন করছিস কেন তুই?”
শুভ্র তখন একদম হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। তার এখন রিদির কাছে পৌঁছাতে হবে। নিজের কলিজার টুকরোটাকে একবার বুকে জড়িয়ে না ধরলে সে দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে। সে ধরা গলায় সবার উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে আকুতি জানিয়ে বলল।
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫৫ (২)
“আমাকে প্লিজ একটু রিদির কাছে যেতে দাও। এই মুহূর্তে আমি ওর কাছে না গেলে দম বন্ধ হয়ে মরে যাবো। প্লিজ আমাকে যেতে দাও ওর কাছে।”
সোহান চৌধুরী পরিস্থিতি বুঝে সবাইকে সরে গিয়ে পথ করে দিতে বললেন। শুভ্র আর এক পলকও সেখানে দাঁড়াল না। যেন মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত কোনো পথিক জলের সন্ধানে ছুটছে। সে সিঁড়ি দিয়ে ঝড়ের বেগে উপরে দৌড় দিল। তার প্রতিটি কদম যেন এক একটা হাহাকার। সে তার প্রাণের স্পন্দন রিদির কাছে ছুটে যাচ্ছে নিজের হারানো জীবনটাকে ফিরে পাওয়ার আশায়।
