Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (৩)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (৩)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (৩)
অরাত্রিকা রহমান

মিরা করিডরে দাঁড়িয়ে টেনশনে পায়চারি করছে একা একা বকবক করতে করতে,
— “ইয়া আল্লাহ! যদি কিছু গণ্ডগোল হয়ে যায়? না না… শান্ত হ মিরা… কিছু হবে না…”
হঠাৎ কেউ এক ঝটকায় তাকে টেনে নিলো এক ফাঁকা পরিবেশে। লেহেঙ্গার ব্যাকলেস ব্লাউসে উন্মুক্ত পিঠ ঢেকে গেল এক প্রশস্ত হাতের তালু দ্বারা, অন্য হাতটা তার কোমরের পাশে শক্ত হয়ে রইলো, যেন সামান্য নড়ার সুযোগটুকুও দেবে না। চোখের পলকে সযত্নে দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকলো মিরার। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব মিরা আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে ফেললো। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন করিডরের নীরবতাকেও হার মানাচ্ছে। মিরা নিজের দূর্বল কায়া সামলে উঠার আগেই কাউকে নিজের বড্ড কাছে অনুভব করলো। দ্বিধান্বিত মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার আগেই—

উষ্ণ এক জোড়া ওষ্ঠ তার কোমল গোলাপি ওষ্ঠ জোড়া বন্দি করে নিলো নিজের মাঝে। মুহূর্তেই জমে গেল মিরার সম্পূর্ণ শরীর, চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো বিস্ময়ে, মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো লাগছে তার। দু’হাত দিয়ে ছেলেটার প্রশস্ত বুকে ধাক্কা দিতে লাগলো সে। মুক্তি পেতে চাইলো সেই বন্ধন থেকে। কিন্তু অপর পাশের মানুষটা যেন আজ একচুলও দূরে সরে যাওয়ার পক্ষে নেই। বরং আরও ধীর, আরও গভীরভাবে তাকে থামিয়ে দিলো। মিরার ছটফটানি টের পেয়ে ছেলেটা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো আস্তে করে। নীরব একটা আশ্বাস। যেন বোঝাচ্ছে—

“শান্ত হও… প্লিজ… শুধু এই মুহূর্তটা…”
মিরার এলোমেলো নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর কাঁপন বাড়তেই হঠাৎ তার নাকে ভেসে এলো এক চেনা ঘ্রাণ, খুব চেনা, ভীষণ কাছের কারো। এক মুহূর্তেই শরীরের সমস্ত টান থমকে গেল তার। চোখের পাতাগুলো কেঁপে উঠলো হালকা করে মনে পড়লো সেই সতর্ক বাণী-
“ওই শরবতের তিক্ততার মিটমাট আপনার ঠোঁটের মিষ্টতা দিয়ে করবো আমি। বি রেডি ফর দ্যাট।”
পুরুষালি এই ভারী নিঃশ্বাস, এত কাছ থেকে বুক কাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গি, এই স্পর্শ… সবটাই মিরার চেনা। এতটাই চেনা যে অন্ধকারেও ভুল হওয়ার উপায় নেই মানুষটাকে চেনার ক্ষেত্রে। মিরার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে আটকে আসতে লাগলো। অসহায় হয়ে এক হাত রায়ানের কাঁধে রাখলো সে, আর অন্য হাতটা গিয়ে ঠেকলো তার বুকের উপর। হালকা টোকা দিয়ে মৃদু আওয়াজ বের করলো— “উউউমম্…!”
রায়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির রইলো মিরার ঠোঁটে, যেন নিজের ভেতরের সমস্ত তীব্রতা সামলানোর শেষ চেষ্টা করছে। তারপর ধীরে ধীরে সরে এসে কপাল ঠেকালো মিরার কপালে। দু’জনের এলোমেলো নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যেতে লাগলো নীরব আলো-আধারী পরিবেশে।
রায়ান চোখ বন্ধ রেখেই গভীর, ঘোর লাগানো কাঁপা স্বরে বললো—

“আই মিসড ইউ… হার্টবার্ড…”
কথাগুলোর ভেতরে এমন এক ক্লান্ত আকুলতা, যেন বহুদিনের জমে থাকা অস্থিরতা অবশেষে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছে। মিরা এখনও হাঁপাচ্ছে। বুকটা দ্রুত উঠানামা করছে তার। কাঁপা কাঁপা চোখ তুলে তাকালো রায়ানের দিকে। করিডরের ক্ষীণ আলোয় ছেলেটার রক্তিম চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম গভীর লাগছে। সেই চোখে ক্লান্তি আছে, অভিমান আছে, আর আছে একরাশ না বলা আকুতি। মিরার গলা কেঁপে উঠলো।
— “আই মিসড ইউ টু… কাম ডাউন… একটু শান্ত হন প্লি…!”
বাকিটুকু আর শেষ করতে পারলো না সে। শব্দের গতি রোধ হলো পুনরায়। তবে এবার কোনো আকস্মিকতা ছিল না। ছিল দমিয়ে রাখা অনুভূতির ধীর বিস্ফোরণ।
রায়ানের ঠোঁট আবার ছুঁয়ে গেল মিরার ঠোঁট। মিরা প্রথমে শক্ত হয়ে রইলো। তার আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো পাকিয়ে গেল রায়ানের কোর্ট ও শার্টের কলারে। কিন্তু রায়ানের কাঁপা নিঃশ্বাস বারবার তাকে ছুঁয়ে যেতে থাকলে ধীরে ধীরে তার ভেতরের অস্থিরতাটাও নরম হতে শুরু করলো। মিরার মাথার পাশে দেয়ালে রাখা হাতটা আরও শক্ত হলো রায়ানের আর একটা সময়ে হাতটা মিরার চুলের ভাঁজে জায়গা নিল, অন্য হাত আলতো করে ছুঁয়ে রইলো মিরার গাল।

করিডরের বাইরে মানুষের শব্দ ভেসে আসছে। অথচ এই ছোট্ট অন্ধকার জায়গাটায় সময় যেন থমকে গেছে।
রায়ান ধীরে সরে এসে কপাল ঠেকিয়ে রাখলো আবার। দু’জনেই হাঁপাচ্ছে। মিরার চোখের পলক কাঁপছিল অবিরত। আর রায়ান শুধু তাকিয়ে রইলো তার দিকে— এমনভাবে, যেন বহু অস্থিরতার পর অবশেষে নিজের শান্তিটাকে খুঁজে পেয়েছে।
-“মিয়াও…!” হঠাৎ এমন মিনমিনে আওয়াজে দুজনের ধ্যান ভঙ্গ হলো‌। দুজন একসাথে ওই আওয়াজের উৎস খুঁজতে নজর ঘুরাতেই মেঝেতে ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা রোমিও কে দেখতে পেল। ছোট্ট ছেলেটা পা গুটিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে বড় বড় চোখ করে মনোযোগ দিয়ে তথাকথিত শশুর শাশুড়ি কে চুমু খেতে দেখছে। মিরা রোমিও উপস্থিতিতে অদ্ভুত ভাবে লজ্জিত অনুভব করলো। দাঁতে জিভ কেটে দুই হাতে মুখ লুকিয়ে রায়ানের বুকে ঝুঁকে গেল সে। রায়ান দুই আঙ্গুলে কপাল চেপে মিরার মাথায় হাত রেখে স্বান্তনা দিল। রায়ান রোমিওর দিকে করুন নজরে তাকিয়ে চোখের ইশারায় নিজের অসহায়ত্ব বোঝানোর চেষ্টা করলো। মনে মনে মিনতি করলো-

“বাপ আমার, চলে যা। দেখছিস তো লজ্জা পাচ্ছে তোর শাশুড়ি। বহু কষ্টে বউটা কে কাছে পেয়েছি। শশুরের এতো বড় ক্ষতি করিস না। ভুলে যাস না তোর বিয়ে আমি দিয়েছি আমার মেয়ের সাথে।”
রোমিও ঘাড় কাত করে মায়াবী চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে সাড়া দিল যেন বলতে চাইছে-“আমি কি করলাম? যা করার তা তো তোমরাই করলে। আমি তো শুধু দেখেই গেলাম।”
মিরা অস্বস্তি তে রায়ানের বুকে মুখ লুকিয়েই মাথা ঝাঁকিয়ে রায়ান বুকে সজোরে আঘাত করে বকলো তাকে- “আপনি একটা অসভ্য, অশ্লীল লোক। নিজের উপর একটুও কন্ট্রোল নেই কেন আপনার? আমার সব মানসম্মান পানিতে গেল।”

রায়ান বিরক্তি ভরা চোখ জোড়া বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল মিরার বকা সহ্য করে নিল। রোমিও এখনও তাদেরকে দেখে যাচ্ছে। রায়ান রোমিওর দিকে চোখ পাকিয়ে ইশারায় তাকে চলে যেতে বলল। রোমিও চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল লেজ গুটিয়ে। রোমিওর প্রস্থানের পর রায়ান মিরার দিকে নিচু নজরে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“এইযে আমার লজ্জাবতী, আপনার মেয়ে জামাই চলে গেছে। এবার মুখ উঠিয়ে নিজের জামাইকে একটু দেখবেন প্লিজ? তার যে জান বেরিয়ে যাচ্ছে আপনাকে প্রাণ ভরে দেখার জন্য।”
মিরা ধীরে নজর উঠিয়ে রায়ানের দিকে তাকালো। দুজনের নজর এক হতেই একসঙ্গে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। রায়ান মিরার কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এলো। মিরা রায়ানের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে অর্ধ বুলিতে বলল- “আপনার ফেইস..!”

-“কি আমার ফেইস..?
মিরা মিষ্টি হেঁসে ফ্লার্টি ভাব নিয়ে বলল-
“কিছু না, it’s cute..!” কথাটা বলে মিরা হিহি করে হেঁসে উঠলো।
রায়ান মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সংযত করে দুষ্টু হেঁসে মিরার দিকে ঝুঁকে হাস্কি কণ্ঠে প্রশ্ন রাখলো-“Wanna sit..?!”
মিরা হাঁসি তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে পাল্টা প্রশ্ন করলো-“কিহ্..?!”
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে নিজের কথা পাল্টে বলল-
“কোলে বসার কথা বলছি সোনা, অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছো তো তাই। আমার প্রিন্সেস এর কষ্ট হয় যদি। Wanna sit..?”
মিরা চোখ বাঁকিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত বেঁধে হেঁয়ালি করে প্রশ্ন করলো-
“মিস্টার বেয়াই সাহেব, আপনি কি বাই এনি চান্স আমার সাথে ফ্লার্ট করছেন?”
রায়ান এক গাল হেঁসে পুরো ভাব নিয়ে মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল-
“বেয়াইন সাহেবা, আপনি ফ্লার্টিং এর কথা বলছেন.. অথচ আমার চোখের দিকে তাকালেই আপনি পোটে যাবেন।”

মিরা রায়ানের এমন নির্লজ্জের মতো কথা শুনে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“শুনেছি আপনি বিবাহিত, আমার আবার কারো সংসারে আগুন লাগানোর শখ নেই।”
রায়ান জিভের সাহায্যে নিজের ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে সম্মতি প্রকাশ করে বলল-
“হুম, কথাটা ভুল বলেন নি। বউ আমার সেই হট, আগুন লাগলে অস্বাভাবিক কিছু মনে হবে না আমার।”
রায়ানের সাথে কথায় পেরে ওঠা মুশকিল। মিরার কথার ভান্ডার ফুরিয়ে এলো তবুও হারমানলে চলবে না-
“কিছু মানুষ আছে জানেন, তাদের বউ চাই হট কিন্তু সংসারে আগুন লাগলে সমস্যা। আবার কিছু কিছু নমুনা আছে হট বউ পাওয়ার জন্য এ্যাকসিডেন্ট করে হসপিটালে বসে থাকে এক মাসের জন্য।”
রায়ান মিরার তর্কে হেঁসে উঠলো। সে নিজের দুহাত উপর করে নিয়ে বলল- “Ok ok, fine.. I, the Rayan chowdhury accepts his defeat.. happy now? কি হবে বিতর্ক করে সেই তো দিন শেষে তুমি আমার।”

মিরা রায়ান কে হাড় মানতে দেখে তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। রায়ানের সিদ্ধান্তের বাহোবা দিয়ে বলল-
“গুড গুড, নারীদের কথার উপর কথা বলা পুরুষরা কখনো সুখে শান্তিতে থাকতে পারে না বুঝেছেন?”
-“হুম, তুমি বুঝাবে আর আমি বুঝবো না তা কি কখনো সম্ভব বলো? আমি সুখী পুরুষ হতে চাই। আর আমার এই প্রিটি হট বউটার সাথে শান্তি তেও থাকতে চাই।”
মিরা রায়ানকে সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরে তার ডান গালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেল। আর তখনই হঠাৎ মিরার ফোন বাজলো। মিরা রায়ান কে ছেঁড়ে ফোনের দিকে তাকাতেই রায়ান বিরক্ত হয়ে মিরার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল-
“বালের এই ফোন কি বাজার আর সময় পায় না?”
ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে-“সোরার কল..ও তোমাকে কল করছে কেন? ওর তো এখন স্টেজে মাহিরের সাথে থাকার কথা।”

সোরায়ার নাম শুনতেই মিরার মনে পড়লো সোরায়া এখনো পার্লারে আছে। রায়ানের সাথে সময় কাটাতে গিয়ে ওর কথা তো সে ভুলেই গেছে। কনে বিয়ের আসরে নেই জানাজানি হলে অনেক বড় কেলেংকারি হয়ে যাবে। মিরা একপ্রকার যুদ্ধ করে রায়ানের হাত থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে সোরায়ার কল রিসিভ করলো-
“হ্যালো হ্যালো, বনু..! শুনছিস?”
-“আপু..১৫ মিনিট ধরে পার্লারের নিচে দাঁড়িয়ে আছি একটা গাড়িও পাচ্ছি না। ফোনের ডাটা শেষ একটা ওবার ডাকার ও অবস্থা নেই। চার্জও শেষ হয়ে এসেছে। কি করবো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার খুব ভয় করছে। কান্না পাচ্ছে খুব।”
ভয়ার্ত কন্ঠে সোরায়া এক টানা কথা গুলো বলে গেল। মেয়েটার কণ্ঠস্বরে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। মিরা শুকনো ঢোক গিলে আগে সোরায়াকে শান্ত করা জরুরি মনে করলো-
“বনু আমার কথা শোন। চিল কর। কিচ্ছু উল্টোপাল্টা হবে না সব পারফেক্টলি হবে। আমি আসছি।”
মিরা কথা না বাড়িয়ে কলটা কেটে ব্যস্ত গলায় রায়ান কে বলল-
“হাবি..আই নিড টু গো। এই দিকটা সামলে নিন। আমি আসছি। হাইয়েস্ট ১৫-৩০ মিনিট। এইটুকু সময় একটু ম্যানেজ করে নি।”

রায়ান মিরাকে টেনশনে দেখে অবাক হলো। এমন কি সে মেয়েটার একটা কথার মানেও বুঝলো না-
“বেইবি, কি বলছো তুমি? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। কোথায় যাবে তুমি। আমি যাচ্ছি তোমার সাথে চলো।”
-“প্লিজ প্লিজ প্লিজ, এখন এমন করবেন না। আমার কথা শুনুন। আপনি এখানে থাকুন প্লিজ। এখানে আপনার প্রয়োজন পড়তে পারে আমি আসছি।”
-“আচ্ছা, যাচ্ছো টা কোথায় সেটা তো বলবে।”
-“বনুকে আনতে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি চলে আসবো।”
মিরা হাতে লেহেঙ্গা আঁকড়ে দৌড়ে উপরে নিজের ঘরে গিয়ে নিজের বাইকের চাবি নিয়ে নিচে নামলো। রায়ান ড্রয়িং রুমে এলো। অতিথিদের বিচরণ চারদিকে মাহির বেজার মুখে স্টেজের সোফায় বসে আছে। রায়ানের মাথায় ঢুকছে না মিরা সোরায়াকে কোথা থেকে আনার কথা বলল। এখন তার টেনশনে মাথার সকল চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মিরা নিচে নামতেই বর পক্ষের কেউ একজন তার পথ আটকে দাঁড়ালো।

-“মিরায়া রাইট..? কনের বোন!”
মিরা চমকিত হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল-
“জি, কোনো প্রয়োজন? ডু ইউ নিড সামথিং?”
-“ইউর নাম্বার.. মে আই হেভ ইট?”
মিরা এক সেকেন্ডের জন্য নিজের চোখ বন্ধ করে মনে মনে সময়কে দোষারোপ করলো-
“হায় আল্লাহ, এইটা কোন আবালের পাল্লায় পড়লাম এখন? আমার পেটে একজনের বাচ্চা , বিবাহিত সুখী মেয়ে মানুষ আমি আর এই লোক আমার নাম্বার চাইছে লাইক হুয়াট দ্যা হেল..আমার বোনটা কতই না ভয় পাচ্ছে এখন। এমন একটা দিনে এসব প্রেশার নেওয়া যায়?”
দূর থেকে রায়ান মিরাকেই দেখছে। মিরার রায়ানের সাথে চোখাচোখি হওয়ার পর মেয়েটার আত্মায় সাহস এলো একটু। মিরা লোকটার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে বলল-
“অবশ্যই, কেন না। আপনার ফোন দিন।”
লোকটা হাসি মুখে নিজের ফোনটা এগিয়ে দিল। দূর থেকে রায়ানের রক্ত মাথায় চড়ে যাচ্ছে এসব দেখে। শুধু বিয়ে বাড়িতে সবার সামনে এখন সিনক্রিয়েট করার মন মানসিকতা বা সুযোগ নেই বলেই কিছু উল্টো পাল্টা করছে না ছেলে টা। তার বিশ্বাস মিরা হ্যান্ডেল করে নেবে শান্তভাবে। মিরা লোকটাকে নাম্বার টাইপ করে দিয়ে সামনের দিকে এগোলো। পিছন থেকে লোকটা চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“আপনি কখন ফ্রি থাকেন? কখন কল করলে পাবো আপনাকে?”
মিরা আর থামলো না নজর সামনের দিকে রেখেই জোরে বলল-

“কল এনি টাইম।”
মিরার কথায় রায়ানের ভ্রু কুঁচকে এলো। মিরা রায়ানের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় রায়ানের উদ্দেশ্যে বলে গেল-“হ্যান্ডেল দ্যাট স্টুপিড..! মেক সিওর হি নোস হুম আই বিলং টু।”
মিরা প্রস্থান করলো। রায়ান মিরার কথায় গুরুত্ব দিলো। প্রথমে বুঝতে না পারলেও তার খুব একটা সময় লাগলো না বুঝতে কারণ ঠিক পরেই তার ফোন বাজলো, কোনো এক অপরিচিত নাম্বারের কলে। রায়ান সামনে তাকিয়ে দেখলো ওই লোকটা কাউকে কল করছে। মিরা নিজের নাম্বারের বদলে যে তার নাম্বার দিয়েছে সেটা পরিষ্কার হলো তার কাছে। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গর্বিত হাঁসি দিয়ে বিড়বিড় করলো-“That’s my girl.. such a mine.. wholely mine…”
রায়ান কলটা রিসিভ করলো। অপর পাশ থেকে আগ্রহী কণ্ঠ ভেসে এলো-
“হ্যালো, মিস মিরায়া বলছেন?”
রায়ান মুচকি হেঁসে নিজের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে ভাব নিয়ে হেঁটে ওই লোকের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গর্বিত কণ্ঠে বলল-
“জি না, মিসেস মিরায়ার অনাগত বাচ্চার বাপ বলছি। হাও ক্যান আই হেল্প ইউ?”
লোকটা অবাক হয়ে একবার রায়ানের দিকে আরেকবার নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো। রায়ান ভ্রু নাচিয়ে তার কাছে এগোতেই লোকটা ভয়ে দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকিয়ে মিরার কথা মনে করে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“কি ঝামেলা পাকিয়ে আছে কে জানে। কোথায় গেলে হৃদপাখি। কাম ব্যাক ফাস্ট..!”

রাস্তার ধারে ভয়ার্ত ও মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা অল্প বয়সী মেয়ে- পড়নে লাল লেহেঙ্গা, গায়ে ভারী গহনা, দুহাত ভরা মেহেদি। তবে সাজসজ্জার সাথে মেয়েটার মুখশ্রীর মিল নেই- চোখ দুটো ছলছল করছে তার এই বুঝি গড়িয়ে পড়বে অশ্রু কণারা। তবে সদ্য অতি ধৈর্য ধরে করা সাজসজ্জার প্রতি মায়া দেখিয়ে নিজের চোখের জলধারা নিয়ন্ত্রণ করছে সে। ব্যস্ত রাস্তার ভীর কাটিয়ে এক বিকট গর্জন তুলে এক উজ্জ্বল হেড লাইট এগিয়ে এলো সোরায়ার দিকে। তীব্র আলোক রশ্মির তোপে সোরায়া সেদিকে তাকিয়ে নিজের চোখ ঢেকে নিলো। হেডলাইটের আলো কমে গেলে সোরায়া চাতোক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আবেগী হয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচিয়ে উঠলো-

“আপুউউউউ..!”
সে দৌড়ে গিয়ে মিরাকে জড়িয়ে ধরলো। মিরা স্বস্তির শ্বাস ফেলে সোরায়া কে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো বাইকের উপর থেকেই-“কিচ্ছু হয় নি তো বাবা। ভয় পেতে হয়? বড় হয়েছিস না? আজ বিয়ে তো। অনেক বড় হয়ে গেছিস।”
সোরায়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মিরাকে দেখে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো- “আপু.. লেহেঙ্গা তে কে রাইড করে? যদি কিছু..?”
মিরা সোরায়ার দিকে হেলমেট ছুড়ে দিয়ে শাসন করে বলল-
“এটা মাথায় দিয়ে পিছনে বস। কেউ করে না লেহেঙ্গাতে রাইড তোর আপু করে। এই জন্যই সে তোর আপু বুঝেছিস। এখন কথা না বলে তাড়াতাড়ি উঠ পিছনে। মাহির ভাইয়ের মুখ পুরো শুকিয়ে আছে তোকে দেখতে না পেয়ে। তুই বসতে পারবি তো এভাবে?”
সোরায়া আর সময় নষ্ট করলো না। সে নিজের ঘোমটার উপরের কোনো মতো হেলমেট টা পড়ে নিজের লেহেঙ্গা নিজের হাতে সামলে নিয়ে বাইকের পিছনে বসলো। মিরা আবারো বাইক ছোটালো বাড়ির পথে।

রাত~৯টার কাছাকাছি
বিষন্ন মনে মাহির একা স্টেজে বসে সোরায়ার অপেক্ষা করে যাচ্ছে। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে তাকায়। রায়ান গিয়ে মাহিরের পাশে গিয়ে বসে তার কাঁধে হাত রাখতেই মাহির চমকে রায়ানের দিকে তাকালো।
-“কিরে? বিয়ের জন্য এতো উৎসাহ নিয়ে এলি। এখন দেবদাস হয়ে বসে থাকার কারণ কি?”
মাহির রায়ানের হাত নিজের হাতে নিয়ে উৎকণ্ঠায় বলল-
“ভাই আমি আর ধৈর্য রাখতে পারছি না। তুই ভাবিকে একটু বল না আমার বউটাকে তাড়াতাড়ি আমার কাছে আনতে।”

রায়ান চুপ করে গেল। মিরা গেছে বেশ অনেকটা সময় হয়েছে এখনো না ফেরার কারণ সে জানে না। তার নিজেরই টেনশন হচ্ছে যেটা চেয়েও কাউকে বলতে পারছে না। উপর থেকে যার সাথেই দেখা হচ্ছে সেই দুই বোনের খোঁজ করছে। রায়ানের ইচ্ছে করছে নিজের কপাল চাপড়াতে। সে টেনশনে মাথায় হাত দিলে মাহির রায়ানের হাত মাথা থেকে নামিয়ে উদ্বেগ দেখিয়ে বলল-
“দোস্ত প্লিজ, কিছু একটা কর। এক কাজ কর ভাবি কে গিয়ে বল আমি প্রয়োজনে আরো ৫০ হাজার বাড়িয়ে দিচ্ছি তবু আমাকে আমার বউটার চেহারা দেখতে দেওয়া হোক।”
এক দিকে নিজের বউয়ের প্যারা অন্য দিকে বন্ধুর এমন বউ বউ পাগলামি রায়ানের কাছে বিরক্তিকর লাগছে। এই দিকে সকলে একসাথে রিমিকে ঘিড়ে ধরেছে গান করতে। চৌধুরী বাড়ির ছোট বউ গান করে এমন কথা ছাড়িয়ে পড়ায় বর পক্ষ তার গান শুনবে বলে জোর করছে। রিমি সবাইকে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় নানান তালবাহা করে চলেছে ঠিক তখনই রুদ্র রিমির সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“যদি আমি শুরু করি। আমাকে সঙ্গ দেবে?”
রিমি অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকালো। রুদ্র নিজের হাতে মাইক তুলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গান ধরলো-

“এলো এলো এলো একি গোধূলি জীবনে..
ডানা ম্যালে একশটা প্রজাপতি মনে..
চাওয়া পাওয়ার ছিল যত এতদিন ধরে..
পেল সবই পূর্ণতা বিবাহ বাসরে..
বেঁধেছি তোমাকে এই সাত পাকে,
চার হাত যেন এক হয়ে থাকে।
কোনেরই তো সাজে অন্তরে আজ এ
আনলে তুমি ভালোবাসা যে..”
মাহির সকলের মাতামাতি দেখে যেন আরো অধৈর্য হলো। সোরায়া কে বউ সাজে দেখার আকুলতা তার বুকে চড়ে বসছে। মাহির বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। রায়ান মাহিরের কাঁধে হাতে রেখে তাঁকে শান্ত করতে উপদেশ দিল-

“এতো অধৈর্য হোস না মাহির। আরো একটু ধৈর্য ধর দেখবি তোর সব অপেক্ষা উসুল হয়ে যাবে যখন চড়ুই কে নিজের চোখের সামনে দেখবি।”
হঠাৎ গর্জন করে এক বাইক ঢুকলো। লেহেঙ্গা পড়ে কেউ বাইক চালিয়ে ঢুকছে। সবার নজর সেই দিকে ফিরলো। রায়ান অবাক চোখে মিরাকে দেখছে। মনে মনে বিড়বিড় করছে- “কি সাহস..! এই অবস্থায় লেহেঙ্গা পড়ে বাইক নিয়ে গেছে।”
মিরার চোখে মুখে স্বস্তিরর পাহাড় ভেঙে পড়লো অবশেষে সে পেরেছে সময় মতো পৌঁছাতে। মাহিরের নজর মিরার পিছনে উড়তে থাকা লাল রংয়ের ওড়নার দিকে। মিরার বাইক থামলো। সোরায়া ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালো সামনে। মিরা বাইক সাইড করে সরে দাঁড়ালো। রায়ান মাহির কাঁধে হাত রেখে বলল-
“অপেক্ষা উসুল করে নে..!”
রায়ান স্টেজ থেকে নেমে সোজা দৌড়ে মিরার কাছে গেল। সোরায়া চোখ তুলে স্টেজের উপর মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির সোরায়াকে বউ সাজে দেখে আনমনে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (২)

“অপেক্ষার উসুল আবার কি? আমার তো পৃথিবীতে আসা উসুল হয়ে গেল।”
রুদ্র রিমির হাতে মাইক ধরিয়ে দিলো সর্ব কাঙ্ক্ষিত গানের লাইন গুলো গাইতে রিমি সোরায়া আর মাহিরের মনের অভিব্যক্তি যেন গানের দ্বারা প্রকাশ করলো-
“সামনে আমার এভাবে আর আগে এসেছ কই?
চাইছিল মন সারা জীবন কাউকে তোমার মতই।
সামনে আমার এভাবে আর আগে এসেছ কই?
চাইছিল মন সারা জীবন কাউকে তোমার মতই..
কোনেরই তো সাজে অন্তরে আজ এ
আনলে তুমি ভালোবাসা যে..”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭