Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭
অরাত্রিকা রহমান

সোরায়ার দীঘল নেত্র মাহিরের অপলক দৃষ্টিতে লজ্জায় নত হলো। মাহির মুচকি হেঁসে স্টেজ থেকে নামার ছোট ছোট পদক্ষেপ গুলো পার করে সোরায়ার সম্মুখে এগিয়ে এলো। জুঁই সাইড থেকে চেঁচিয়ে উঠলো-
“গো জিজু..!”
সোরায়া ঠোঁট টিপে হাসলো। মাহির ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালে সোরায়া পিটপিট করে চোখ তুলে চাইলো তার দিকে। মাহির ঘাড় কাত করে মায়াবী নজরে তাকিয়ে আনমনে বলল-
“মাশাআল্লাহ।”
সোরায়া প্রশ্নাত্মক চাহুনিতে তাকালো-“জি?”
মাহির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের বাঁ পাশটায় হাত ডলতে ডলতে বলল- “মারাত্মক লাগছে। ঠিক প্রথম দিনের মতো।”

সোরায়ার গাল দুটো লজ্জায় লাল বর্ণ ধারণ করলো। মাহির সেই লাজুক মুখের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলো-
“এই যে মিস ৪৫ কেজি। আজ যদি নিজ ইচ্ছায় সকলের সামনে আপনাকে কোল তুলতে চাই আপনার কি তাতে আপত্তি আছে? বিশ্বাস করুন আমার একটুও কষ্ট হবে না।”
সোরায়া মাহিরের কথায় অবাক হলো। কলেজের সেই শুরুর দিনের কথাগুলো মাহির আজ অব্দি মনে রেখেছে- বিষয়টা তার ভীষণ পছন্দ হলো। সে মুখ উঠিয়ে মাথা ডানে বামে নাসূচক নেড়ে অমত প্রকাশ শান্ত কণ্ঠে বলল-
“বর্তমানে ৪৫কেজির তো লেহেঙ্গাই পড়ে আছি।”
সোরায়ার কথায় মাহির তুচ্ছার্থে হেঁসে ফট করে তাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিকতায় সোরায়া চোখ বন্ধ করে নিয়ে মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরলো। উপস্থিত সকলে একসাথে তালি দিয়ে উঠলো। বর পক্ষের সকলে মাহিরের জন্য চিয়ার করতে শুরু করলো-
“মাহির, মাহির, মাহির…!”

সোরায়া মাহিরের চোখে চোখ রাখলে যে
মাহির তার দিকে চোখ টিপে ইশারা করতেই সোরায়া লজ্জায় মাহিরের গলা জড়িয়ে তার বুকে মুখ লুকালো। মাহির সোরায়াকে নিয়ে স্টেজের উপর উঠতেই রায়ান,মিরা, রিমি, রুদ্র ঝুড়ি ঝুড়ি গোলাপের পাপড়ি শূন্যে উড়িয়ে দিল তাদের উপর। রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছলছল চোখে মাহির আর সোরায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন- “কি সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে তাই না বলুন? আমাদের ছোট্ট বুড়ি আজকে বিয়ে যুগ্যি হয়ে গেল। সময় এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে বয়ে গেল!”
শফিক রহমান রোকেয়া বেগমের কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বললেন-
“অবশেষে আমাদের দায়িত্ব শেষ হলো। ভাইয়া ভাবির আমানত আমরা সহি সালামত তাদের আসল হকদার দের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। জীবনে আর কোনো আক্ষেপ থাকলো না আমাদের রোকেয়া।”
রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের দিকে তাকিয়ে তার হাতে হাত রাখলেন। উভয়ের মধ্যকার সুপ্ত পিতৃ ও মাতৃ সত্তা আজ যতটা শূন্য অনুভব করছে ঠিক ততটাই পূর্ণ হয়ে আছে দুই মেয়ে সুখী জীবনের আশায়। মাহির সোরায়া কে নিয়ে স্টেজে উঠে গিয়ে চিৎকার করে বলল-

“Everyone… This is my love of my life.. little Mrs. Khan for you all..”
বলেই মাহির সোরায়াকে কোলে নিয়ে গোল গোল ঘুরলো। লাজুকতা আজ হয়তো সোরায়ার মুখ থেকেই সরতে নারাজ। মেয়েটার হাসি যেন থামছেই না। মিরা তার সন্তানসম বোনের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। রায়ান মিরার ছলছল চোখ দেখে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
“এখন কাঁদলে মেকআপ খারাপ হয়ে যাবে হৃদপাখি। কনে কে সবে মাত্র নিয়ে এলে। আমাদের এখনো অনেক ছবি তুলতে হবে।”
মিরা রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো চাহনি রেখেই ফিক করে হেঁসে উঠলো। রায়ান মিরাকে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলল-

“সোরা কে দেখো, ও কত হ্যাপি! আর আমার হাবলা বন্ধুটাকে দেখ, বউ পেয়ে ও কতটা হ্যাপি! প্রে করো যেন সারাজীবন একসাথে এমন ভাবেই হ্যাপি থাকে ওরা।”
মিরা আবেশে মাথা উপর নিচ নাড়ালো। সে অশ্রু সিক্ত চোখে আকাশ পানে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ালো-
“তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া খোদা। আমার বোনকে তুমি সুখী করো।”
মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে আনমনে প্রশ্ন করলো-
“আজ আব্বু আম্মু অনেক খুশি হবে তাই না?”
রায়ান মিরার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে সম্মতি দিয়ে বলল-
“হুম, অনেক খুশি হবে।”

মিরা মুচকি হেঁসে পুনরায় মাহির আর সোরায়ার দিকে মন দিল। মাহির সোরায়া কে কোলে থেকে নামিয়ে দিল। এরপর সকলে গিয়ে ভীর করলো তাদের চারপাশে। আর সেই থেকে শুরু হলো ছবি তোলার ধুম। একের পর এক সবাই স্টেজে উঠে বরং কনের সাথে ছবি তুলতে শুরু করলো। প্রথম দিকে মাহির আর সোরায়ার মুখের হাঁসি প্রকৃতির থাকলেও সময়ের ব্যপ্তি বাড়তেই তাদের হাঁসি কৃত্রিম হয়ে এলো। একজনের পর একজন লেগেই আছে যেন। সামান্য ভীর কমলে সোরায়া নিজের চোয়াল চেপে একটু টিপলো- হাসতে হাসতে যেন চাপা ব্যাথা হয়ে গেছে। মিরা রিমি দূর থেকে সোরায়ার এমন করুন অবস্থা দেখে মুখ টিপে হাসছে। মাহির সোরায়া কে দেখে চিন্তিত হয়ে সোরায়ার দুই গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“গাল ব্যাথা করছে, জান বাচ্চা?”
সোরায়া মাথা নিচু করে অস্বীকার করলো-“উঁহু, ঠিক আছি।”

মাহির নিজের থেকেই বুঝে নিল সবটা। সে তৎক্ষণাৎ রায়ান ও রুদ্র কে মেসেজ করে বলল- আপাতত অতিথিদেরকে খাওয়ার জায়গায় নিয়ে গিয়ে তাদের একটু শান্তির নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিতে। রায়ান আর রুদ্র ও মাহিরের কথা মতোই কাজ করলো। আমন্ত্রিত সকলে খাওয়ার জায়গায় গেলে সোরায়া পড়িহিত ভারী লেহেঙ্গা টা দুই দিক থেকে উঁচু করে ধাপ করে বসে পড়লো সোফায়। মুখটা মলিন ক্লান্ত স্রান্ত হয়ে গেছে কয়েক ঘন্টায়। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার পাশে গিয়ে বোসতেই সোরায়া বিরক্ত মুখে মাহির কে জিজ্ঞেস করলো-
“আচ্ছা, বিয়ে শেষ হতে আর কতক্ষন লাগবে?”
মাহির ভ্র কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“কেন জান বাচ্চা? কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?”
সোরায়া আর দুচোখ পিটপিট করে খুলে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ঘুম পাচ্ছে আমার। বাকি বিয়ে টুকু কালকে করি?”
সোরায়ার প্রস্তাব শুনে মাহির হকচকিয়ে বলে উঠলো-

“এমন বলে না জান, অনেক মুশকিলে পেয়েছি তোমায়। চোখে ঘুম ধরে রাখো একটু।”
সোরায়া মাহির উৎকণ্ঠা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। মাথা নিচু করে না খুঁটতে খুঁটতে মনে মনে কি যেন বিড়বিড় করলো। মিরা রিমি স্টেজে উঠে সোরায়া আর মাহিরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হে, নতুন বর কনে? কেমন লাগছে বিয়ের টেস্ট?”
সোরায়া মুখ উঠিয়ে কেবল তাকালো কিছু বলল না। বেচারি ভেবেছিল শুধু সাজবে কবুল বলবে আর বিয়ে হয়ে যাবে ঠিক যেমন মিরার বেলায় হয়েছে। কিন্তু পারিবারিক ভাবে বিয়েটা যে এতোটা পরিশ্রমের হবে তার জানা ছিল না। মাহির সোরায়ার মলিন মুখটার দিকে দেখে মিরার উদ্দেশ্যে বলল-
“ভাবি, সোরার খিদে পেয়েছে হয়তো। কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়?”
সোরায়া মাহিরের দিকে তাকালো, সে বুঝলো না মাহির কি করে বুঝলো যে তার খিদে পেয়েছে। মিরা সোরায়ার মুখের দিকে এক নজর দেখে বলল-

“সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে কাজী সাহেব বিয়ে পড়াবেন। আর বিয়ে শেষ হলে বর কনে খেতে বসবে। আপাতত স্টাটারের শুকনো ভাজা খাবার হয়ে পানি খেয়ে থাকতে হবে। কিছু করার নেই।”
সোরায়া মুখটা সামান্য ভার করে নিল। সে মাথা নিচু রেখেই বলল-
“এখন কিছু খেলে খিদে মরে যাবে। থাক পরে খাবো। বিয়ে শেষ হোক।”
মাহির মিরাকে তাড়া দিয়ে বলল-
“ভাবি, কোনো ভাবে বিয়ে টা তাড়াতাড়ি সম্পুর্ণ করা যায় না? কাজী কে বলুন না এখনি বিয়ে পড়াতে।”
মিরা মাহিরের কথায় কিছু টা লজ্জায় পড়ে গেল। এমম কথার উত্তরে কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না সে। মাথা ঝুঁকিয়ে রিমি ককে ইশারা করতেই রিমি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারও একই অবস্থা। মাহির নিজের কথায় রিমি আর মিরাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে বুঝে নিজেকে মনে মনে বেশ শাসন করলো। তবে মনে যা চলছে সে তাই বলেছে। সোরায়ার সেই দিকে খেয়াল নেই, পেটে খিদে, চোখে ঘুম, আর অন্তরে মনের মানুষ কে কবুল করার এক রাশ ইচ্ছে তার ব্রেইন দখল করে রেখেছে।

ঘণ্টা খানেক পর, খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে অতিথিরা পুনরায় স্টেজের কাছে ফিরে এলো। রায়ান রুদ্র এতোক্ষণ খাওয়ার জায়গাতেই ছিল। কনের ভাই বা দুলাভাই হিসেবে কাজের তো আর শেষ নেই। তারাও ফিরে এলো। অতঃপর কাজী সাহেব গিয়ে বসলেন স্টেজের মাঝের সোফায়। বর কনের বসার জায়গা মুখোমুখি করা হলো হলো, আর মাঝে দেওয়া হলো ফুল দ্বারা প্রস্তুতকৃত দেয়াল। ঝুলন্ত ফুলের মালার ফাঁকা দিয়ে মাহির সোরায়ার একে অপর কে দেখার চেষ্টা চালাচ্ছে। মিরা এগিয়ে এসে সোরায়ার মুখ ঢেকে দিল লম্বা ঘোমটায় আর কানে কানে বলল-
“জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত আনন্দময় একটা অনুভুতি অনুভব করবি এখন। আফসোসের কোনো জায়গা রাখিস না। এনজয় এভরি সিঙ্গেল মোমেন্ট।”
মিরার কথা টা সোরায়ার মনে কঠোরভাবে বিধলো। কয়েক সেকেন্ডে তার চারপাশের পরিবেশ টা কেমন যেন মায়াবী হয়ে উঠলো। গলা হঠাৎ করেই শুকিয়ে এলো যেন কথা বলার ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। নিঃশ্বাস অস্থির হয়ে আসছে, নখে নখে ক্রিয়ার গতি বাড়লো। নার্ভাসনেস এর সীমা পার করছে। সোরায়ার মাথায় মাহিরের চিন্তা আসতেই তার মনে প্রশ্ন জন্মালো –

“আচ্ছা, আমার যা হচ্ছে তা কি ওনারও হচ্ছে? হলে উনি কিভাবে সামলাচ্ছেন নিজেকে? এমনটা কেন হচ্ছে হঠাৎ?”
মাহিরের পুরুষ মানুষ, স্বাভাবিক ভাবেই নিজের মনের অশান্ত ভাব প্রকাশ করার তেমন সুযোগ নেই। মাহির কে দুই হাত মুষ্ঠিমেয় করে রাখতে দেখে রায়ান মাহির পাশে এসে তার কাঁধে হাত রাখলো। মাহির রায়ানের দিকে তাকিয়ে একটু স্বস্তি যে হাসলো, হয়তো বানোয়াট। রায়ান এক গাল হেসে ছেলেটার মনে সাহস যুগিয়ে বলল-
“আমি যেদিন তোর জায়গায় ছিলাম, মনে হয়েছিল হৃৎপিণ্ড টা খুশিতে এই বুঝি লাফ দিয়ে হাত চলে এলো।”
-“পরে কি করে সামাল দিয়ে ছিলি?”
মাহির আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলো। হয়তো তারও একই অবস্থা। রায়ান মুচকি হেঁসে বলল-
“পরে আর কি, যে মানুষ টাকে নিয়ে গোটা জীবনের কল্পনা করে রেখেছি তাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে নেওয়াটা সম্ভব শান্তির। বউ নিয়ে একটা মিষ্টি ভবিষ্যতের কল্পনা করতেই মন শান্ত হয়ে গেছিল। একবার চিন্তা কর, তোর এতো গুলো বছরের অপেক্ষার পর আজ ওই মেয়েটাকে নিজের সঙ্গীনির রূপে পাচ্ছিস যাকে তুই মন থেকে চেয়েছিস। আজকের পর প্রতিটা সকাল তার কেবল তোর সঙ্গে হবে। জীবনের পূর্ণতার প্রথম ধাপে এতো বড় শান্তির জন্য আজকের এই সময়টায় বুকে তৈরি হওয়া অশান্ত ঝড় টুকু কি কাম্য নয়?”
মাহিরের মন হঠাৎ শান্ত হয়ে এলো। রায়ানের কথায় সে কয়েক মিনিটে মনে হলো সোরায়াকে নিয়ে নিজের সম্পূর্ণ জীবন সাজিয়ে ফেলেছে। রায়ান মাহিরের কাঁধে চাপড়ে বলল-

“কাম অন, আমার বাঘের বাচ্চা। গো ফর ইট।”
মাহিরের বুক সাহসে ফুলে উঠলো। রায়ান মিরার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে তখনি খেয়াল করলো মিরা মাহির আর সোরায়ার ছবি তুলছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি। রায়ান ও মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখে দেখে নিজের ফোনটা বের করে মিরা ছবি তুললো। মিরার কিছু টা আন্দাজ হতেই সে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান ওভাবেই বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। মিরা নিজের ফোন নামিয়ে রায়ান দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে রায়ানের হাত থেকে তার ফোনটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু তার আগের রায়ান নিজের হাত সরিয়ে ফোনটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। রায়ানের চোখে দুষ্টুমির ছাপ দেখে মিরা মুখ ফুলিয়ে বলল-
“কিসব আবল তাবল ছবি তুললেন আপনি? ডিলিট করুন এখনি। তোলার হলো ভালো ছবি তুলুন।”
রায়ান মিরার পাশে কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বলল-

“আমার জন্য ওইগুলোই ভালো ছবি। আমি ডিলিট করবো না।”
মিরা পিছিয়ে রায়ান সামনে এসে তার পথ আটকে কোমরে হাত রেখে বিরক্ত কণ্ঠে বলল-
“এখানে আরো অনেক সুন্দরী মেয়ে আছে। প্রয়োজনে তাদের ছবি তুলুন গিয়ে।”
রায়ান মিরার দিকে ঝুঁকে গিয়ে দ্বিতীয় বার মিরা কথায় জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলো –
“সত্যি যেতে বলছো?”
মিরা চোখ পাকিয়ে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে মিরার কোমরে হাত রেখে মেয়েটাকে হেঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে এলো। মিরা হকচকিয়ে চারপাশে নজর ঘুরিয়ে বলল-
“কি করছেন টা কি? সবাই দেখছে.. ছাড়ুন। অসভ্য লোক।”
রায়ান মিরার কানের কাছে ঝুঁকে হাস্কি কণ্ঠে বলল-

“আমার ফোনের গ্যালারিতে তুমি ছাড়া আর কারো অধিকার নেই হৃদপাখি। বাকি রইল তোমার থেকেও সুন্দরী মেয়েদের কথা..(তুচ্ছার্থে হেঁসে) let me tell you this loud and clear.. there will always be a girl more prettier than you, but they are not you.. Now all you need is a man who doesn’t care about them and trust me I don’t care..”
কথা টা বলে রায়ান মিরাকে মুক্ত করে দিল। মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের সাথে আলাদা হয়ে যেতেই সে বাস্তবে ফিরলো। রায়ান মিরার পাশে কাটিয়ে চলে গেলে মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের পিছু পিছু গিয়ে রায়ান বাহু আঁকড়ে ধরল অধিকার দেখিয়ে। রায়ান একনজর মিরার দিকে দেখলো। মেয়েটা বেশ খুশি তে তার বাহু জড়িয়ে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। রায়ান মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে চুমু দিল মেয়েটার মাথায় আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বিড়বিড় করলো-

“কেউ বলবে এই মেয়ের কিছু দিন পর বাচ্চা হবে? বাইক চালাবে হিরো দের মতো, আমি আশেপাশে না থাকলে ম্যাচিউরিটি তার শিরায় শিরায় দৌড়ায়। আর আমার কাছে এলেই সেসব বিচুক্ষণতা তার আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায়। মনে হয় যেন নবজাতক শিশু। আমি যে কিভাবে সামলাবো দুটো বাচ্চা কে খোদা জানে। আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দিক।”
গুরুজনদের উপস্থিতিতে কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। কাজী সাহেব চশমাটা ঠিক করে সামনে রাখা নিকাহনামা হাতে তুলে নিলেন।
-“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিহিল কারিম। সম্মানিত উপস্থিত অতিথিবৃন্দ, আজ আমরা মহান আল্লাহ তাআলার নামে এই পবিত্র নিকাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য এখানে সমবেত হয়েছি। আল্লাহ তাআলা বিবাহকে মানবজীবনের জন্য শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক দায়িত্বের বন্ধন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। উপস্থিত সাক্ষীগণের সম্মুখে এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে আমরা এখন নিকাহর কার্যক্রম শুরু করছি।”

তিনি নথির দিকে চোখ বুলিয়ে বলতে শুরু করলেন—
“পাত্র— স্নিগ্ধ খান মাহির। পিতা— মাহিদ খান। মাতা— সীমা খান।
পাত্রী— জান্নাতুল রহমান সোরায়া। পিতা— মিরাজ রহমান (মরহুম)। মাতা— মেহেরুন্নেসা বেগম। (মরহুম)”
এরপর তিনি দেনমোহরের অংশ পড়লেন—
“এই বিবাহের দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছে নগদ ৩০ লক্ষ টাকা। পরিশোধিত দেনমোহরের পরিমাণ সম্পূর্ণ ৩০ লক্ষ টাকা এবং অপরিশোধিত বা বাকি দেনমোহরের পরিমাণ শূন্য টাকা। এতে দু’পক্ষের কোনো বাড়তি মতামত থাকলে বলার সুযোগ আছে। নিজেদের দাবি রাখতে পারেন।”
শফিক রহমান অমায়িক কণ্ঠে বললেন-
“সব ঠিক আছে কাজী সাহেব। আপনি আগান।”
-“আমার কিছু বলার আছে।”

মাহির নিম্ন কণ্ঠে নিজের মতামত রাখার প্রস্তাব রাখলে সকলে অবাক ও চিন্তিত হয়ে মাহিরের দিকে নজর ঘুরালো। শফিক রহমান চিন্তিত কণ্ঠে মাহিরকে প্রশ্ন করলেন-“কোনো সমস্যা বাবা?”
কাজী সাহেব-“জী বাবাজি, বলুন। কি বলতে চাইছেন?”
সীমা খান মাহিদ খানের কোর্টের নিম্নাংশ টেনে অবাক ও ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন-
“আপনার ছেলে কি করতে চাইছে? সব তো ঠিকই আছে। সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে দেখছেন? ওকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন তো সমস্যা কি ওর।”
স্ত্রীর কথায় মাহির খান ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। সোরায়ার বুক ধকধক করছে অজানা ভয়ে মিরা সোরায়ার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে তারা কাঁধে হাত রাখলো যেন তার একা অনুভব না হয়। মিরা তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইশারায় জানতে চাইলো কি হচ্ছে এসব। রায়ান ও এবিষয়ে কিছু জানে তাই সেও একই রকম অবাক। মাহিদ খান মাহিরকে কিছু বলার আগেই মাহির মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলো-
“আমি দেন মোহর স্বরুপ আমার স্ত্রীর পছন্দের একটা জিনিস যুক্ত করতে চাই‌। সেটা কি সম্ভব?”
সকলেই অবাক হলো। সোরায়া মাথা উঠিয়ে মাহিরের দিকে সোজাসুজি চাইলো। মাহির খান ও শফিক রহমান উভয়ই পিছিয়ে এলেন। চিন্তার কারণ হয়তো কমলো। কিন্তু সোরায়া বুঝে পাচ্ছে না তার পছন্দের এমন কি আছে যা তাকে মাহির দিতে চাইছে।

-“জী অবশ্যই দিতে পারবেন। বলুন কি দিতে চান।”
মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
“বাড়তি দেনমোহর হিসেবে আমি ওকে একটা লাইব্রেরী বানিয়ে দিতে চাই। যেখানে ওর শখের সকল বই আমি নিজে সাজাবো ওর জন্য। যখনই ওর পছন্দের বই প্রকাশ হবে সেই সকল বইয়ের ঠিকানা যেন ওর নিজস্ব লাইব্রেরী তে হয়।”
সোরায়ার গায়ে কাঁটা দিল মাহিরের ইচ্ছা শুনে। চোখ জোড়া অজান্তেই ছলছল করে উঠলো আবেগে। আশেপাশে মানুষ না থাকলে হয়তো নাচতে শুরু করে দিত মেয়েটা। মিরা হাফ ছেঁড়ে হাসলো, সে জানে সোরায়া বই পড়তে কতটা পছন্দ করে আর মাহির সোরায়ার শখের গুরুত্ব দিচ্ছে দেখে তার ভীষণ শান্তি অনুভব হলো। গম্ভীর পরিবেশটায় মুহূর্তে হাসির রোল পড়ে গেল গুরুজনেরা কথা বলাবলি শুরু করলেন-
“টিচারের সাথে বিয়ে হলে এই হয়.. দেন মোহরেও লাইব্রেরী বানিয়ে দিতে চাইছে।”

-“আরে আরে , এটাই তো ভালো। বিয়ের পর বর চাপ দিয়ে পড়াশোনা করাবে। মেয়েটার পড়ার ক্ষতি হবে না।”
কথাগুলো সোরায়ার কান এড়ালো না। সে সত্যিই ভাবতে লাগলো- ফুল দ্বারা সুসজ্জি বিছানায় মাহির তাকে ইংলিশ গ্রামারের সাবজেক্ট ভার্ব এগ্রিমেন্ট বোঝাচ্ছে। কি মর্মান্তিক কল্পনা! সোরায়া মাথা আনমনে না সূচক ঝাঁকিয়ে এমন অদ্ভুত কল্পনা ভঙ্গ করলো। মাহির সোরায়া কে খেয়াল করছে সম্পূর্ণ সময়টা। সে মেয়েটার এমন কান্ড দেখে মজায় হাসলো। কাজী সাহেব পুনরায় বিয়ের পড়ানো শুরু করলেন। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কাজী সাহেব কনের দিকে তাকিয়ে কোমল অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন—
“কনে জান্নাতুল রহমান সোরায়া, আপনি কি আপনার নির্ধারিত দেনমোহরের বিনিময়ে স্নিগ্ধ খান মাহিরকে স্বামী হিসেবে কবুল করতে রাজি থাকলে, বলুন মা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
সবার নিঃশ্বাস যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য আটকে গেল। সকলেই সোরায়ার দিকে নজর থামিয়ে রেখেছে অথচ সোরায়া পড়ে আছে গভীর চিন্তায়- যদি সত্যিই মাহির তাকে বিয়ের পর পড়াশোনা করতে বেশী চাপ দেয় তখন সে কি করবে? মাহির সোরায়ার দীর্ঘক্ষন চুপ থাকার কারণ বুঝলো। সে বাঁকা হেঁসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়ার উদ্দেশ্যে ওকে নিশ্চিন্ত করতে বলল—

“কবুল বলো জানবাচ্চা, কসম আমি পড়ার জন্য একটু ও চাপ দিব না।”
মাহির এই কথা বলতেই সোরায়ার চোখ যেন চকচক করে উঠলো। উপস্থিতি সকলে অবাক মাহিরের কথায়। মিরার কপালে হাত। কাজী সাহেব পুনরায় অনুরোধ করলেন-“বলুন মা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল..!”
সোরায়া বেশ উৎসাহিত কণ্ঠে কবুল করলো-
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
কাজী সাহেব নিয়ম অনুযায়ী বললেন-
“তিন বার বলতে হবে…”
কাজী সাহেব পুনরায় জিজ্ঞেস করার আগেই সোরায়া নিজ থেকেই বলে উঠলো-
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
সোরায়ার কান্ডে সকলে হেঁসে উঠলো। মাহির নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখলো, তার মাথা নিচু হয়ে এলো লজ্জায়। সোরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা আবার মলিন হলো সবাইকে তার উপর হাসতে দেখে। কিছু ভুল হেয়ে গেল নাকি তার দ্বারা সে বুঝে উঠতে পারছে না। কাজী সাহেব মুচকি হেঁসে বললেন –
“মেয়ে মনে হয় পড়া চোর।”

মাহির এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারলো না। সে হেঁসে উঠতেই সোরায়াও তাকে দেখে হেসে ফেললো। কাজী সাহেব মনে মনে বিড়বিড় করলেন-
“আর বিয়ে করছে টিচার কে কারে কালে যে আরো কত কি দেখমু..!”
কাজী সাহেব গলার খাকাড়ি দিয়ে মাহিরের দিকে ঘুরে একই ভ বে বললেন-
“স্নিগ্ধ খান মাহির, আপনি কি নির্ধারিত দেনমোহরের বিনিময়ে জান্নাতুল রহমান সোরায়াকে স্ত্রী হিসেবে কবুল করতে রাজি থাকলে বলুন বাবা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
বুকের ঝড়টা যেন হঠাৎ থেমে গেলে তার বউ তাকে স্বীকার করে নিয়েছে। এবার তার পালা। মাহিরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে সোরায়ার উপর নজর রেখে স্পষ্ট গলায় বলল-
“জি, আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
-“দ্বিতীয়বার..!”
-“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”
-“তৃতীয়বার..!”
-“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।”

কথাটি শেষ হতেই উপস্থিত সবাই একসঙ্গে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে উঠলেন। পরিবেশ আনন্দে ভরে গেল। সোরায়া চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। কোনো এক অজানা কারণে তার চোখে অশ্রু কণা ভীর করেছে। কাজী সাহেব নথিপত্র স্বাক্ষরের জন্য এগিয়ে দিলেন, আর দুই পরিবারের মুখে ফুটে উঠল স্বস্তি ও সুখের উজ্জ্বল হাসি। মাহির সোরায়া পর পর নথিপত্রে স্বাক্ষর করে দিলে কাজী সাহেব তাদেরকে স্বামী স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করলেন। মাহিরে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে ঝুলন্ত ফুলের মালার দেওয়াল ভেদ করে সোরায়ার ঘোমটা উঠিয়ে নতুন বউয়ের লাজুক রক্তিম মুখটা দেখলো। সোরায়া কিছু তেই নিজের দু চোখ খুলতে চাইছে না। যদি এটা তার অন্যদিনের স্বপ্ন হয় তবে কি হবে তার?! মাহিরের অন্ততর আত্মার আজ কোনো বাঁধা কাজ করলো না। সে নিজের অধিকারে সোরায়ার দুগালে হাত রেখে তার ওষ্ঠযুগল স্পর্শ করালো সোরায়ার কোমল ললাটে। চারপাশের সকলে মুখ লুকিয়ে হাসছে। সোরায়া তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে মাহিরের দিকে তাকালো আশ্চর্য হয়ে-
“স্যার, সবাই দেখছে, এখানে কলেজের অনেকে আছে। কি করছেন! ছাড়ুন।”
মাহির হেঁসে সোরায়ার মাথা নিজের মাথা দিয়ে টোকা দিয়ে বলল-
“আজ থেকে আর ছাড়াছাড়ি হবে না। আর এখন থেকে যতবার স্যার বলবে ঠিক ততগুলো বই লাইব্রেরী থেকে সরিয়ে নেব।”

সোরায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা না সূচক নাড়লো। মাহির সোরায়াকে সোজা করে দাড়া করালো বিয়ের পর প্রথম আলিঙ্গনের জন্য। ঠিক তখনি জুঁই সোরায়ার হাতে টেনে তাকে পিছনে সরিয়ে নিল। মাহির সোরায়ার দিকে এগোতে যাবে তখনি মিরা আর রিমি সামনে এসে তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল-
“আরে আরে আরে, বউ তো আপনারই। পালিয়ে যাবে নাকি।”
মাহির অসহায় মুখ করে তাদের দিকে তাকালো। মিরা ভাব নিয়ে কোমরে হাত রেখে বলল-
“খালি দেখলে হবে? খরচা আছে। বাকি ৫০ হাজার দিয়ে নিজের বউ বুঝে নিন। নয়তো আপনার আর বউ পাওয়া হবে না। A deal is a deal..”
মাহিরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো রুদ্র আর রায়ান।মাহিরের মনে সামান্য সাহস এলো। রুদ্র মাহিরের হয়ে বলল-
“বিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে গেলে এসব হিসেব করা বেকার।”
মিরা রিমির দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলল-
“তোর বর কে সামলা রিমি। আমাদের হোক মারছে।”
রিমি মিরার কথায় রুদ্রকে উদ্দেশ্যে করে অদ্ভুত এক মোহনীয় ভঙ্গিতে বলল-

“আচ্ছা আপনি যেন কি চাইছিলেন আমার কাছে? আলুভর্তা…হুম..ওইটা মনে হচ্ছে না আমি দিতে প্রস..!”
-“ঠিকই তো বলেছে ওরা, মাহির ভাই তুমি বাকি টাকাটা দিয়ে দাও তো। A deal is a deal..”
রিমির কথা শেষ হওয়ার আগে রুদ্র পার্টি খেয়ে গেল। মাহির আর রায়ান অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে দেখলো। রায়ান রুদ্র কে কিছু বলতে যাবে তখনি মিরা মিষ্টি স্বরে বলল-
“কে যেন আমার কাছে একটু মিষ্টি মুখ করতে চেয়েছিল। ভাবছি আমিও ডিল ব্রেক করেই ফে..!”
-“দিয়ে দে মাহির, সত্যিই তো A deal is indeed a deal..তুই আমার বন্ধু, আমার মান সম্মান ডুবাস না। দিয়ে দে।”

মাহির এবার সত্যি অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল, সেকেন্ডের ব্যবধানে তার দুটো পিলার নিজেদের বউয়ের সামনে ঝুঁকে গেল দেখে সে আশাহত। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে টাকার আরেকটি বান্ডিল বের করে মিরা আর রিমির হাত দিয়ে দিল। এরপর মিরা আর রিমি ড্যাং ড্যাং করে গিয়ে দুটো গোলাপ ফুলের মালা আনলো। সোরায়া আর মাহিরকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়া করিয়ে মিরা তাদের দিকে মালা দুটো এগিয়ে দিয়ে বলল-
“জড়াজড়ি একটু রয়ে শয়ে পরে করবেন খন। আগে মালাটা তো পরাবেন! আজকালকার ছেলে মেয়েদের সবুরই নেই।”
মিরা কথা বলেই মুখ টিপে হাসলো। বড়রা সেখান থেকে বেড়িয়ৈ গেল। তাদের আর বাচ্চাদের মাঝে কাজ নেই। মাহির মালাটা নিয়ে সোরায়ার গলায় পড়িয়ে দিতে গেলে জুঁই সোরায়াকে আঁকা বাঁকা করে নড়াতে লাগলো-“এতো সহজে পড়িয়ে দিলে মজা থাকবে না জিজু।”

মাহির তবুও সোরায়াকে মাথাটা পড়িয়ে দিতে সক্ষম হলো। সোরায়া মাহির কে ডোজ করার চেষ্টা ও করে নি। এবার সোরায়ার পালা মালা পড়ানোর। হোরায়রা স্বাভাবিক ভাবে মাহির কে মালা পড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু মাহিরের উচ্চতা সোরায়ার তুলনায় বেশী হওয়ায় হোরায়রা চেয়েও পারছিল না। সে কয়েকবার চেষ্টা করলো। রায়ান বুঝলো মাহির এবার নিজের থেকেই ঝুঁকবে ঠিক যেমন সে ঝুঁকে ছিল। তাই সে আগে থেকেই সাবধান করে বলল-
“মাহির…ভাই ভুলেও অতিরিক্ত পিরিতি দেখিয়ে মাথা নিচু করবি না বলে দিচ্ছি।”
মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বুঝলো মেয়েটা মন খারাপ করছে। সে রায়ানের কথা রাখতে নিজের মাথা না ঝুঁকি, সোরায়ার মন রাখতে উল্টো সোরায়াকে হঠাৎ কোলে তুলে নিয়ে বলল-
“আমি মাথা নিচে না করলেও বউকে তো উপরে তুলতেই পারি।”
সোরায়ায দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল-

“কি হলো? হা করে কি দেখছো? পড়াও।”
সোরায়া মুচকি হেঁসে মাহিরের গলায় মালা পড়িয়ে দিল। সবাই একসাথে তালি দিয়ে উঠলো। এরপর বর কনের খাওয়ার আয়োজন করা হলো। তাদের সাথে রায়ান মিরা আর রুদ্র রিমির খেতে বসলো। তাদেরও খাওয়া হয়নি। রোকেয়া বেগম এবং রামিলা চৌধুরী তাদের খাবার সার্ভ করলেন। টেবিল ভর্তি খাবার দেখেই সবার পেট মন হয় ভরে গেল। সবাই কেবল কোনো মতো নিজেদের প্লেটের খাবার খাচ্ছে। এর মধ্যে রায়ান মিরাকে আর মাহির সোরায়াকে খাইয়ে দিচ্ছে। মিরা প্রেগন্যান্সির আর অ্যাকসিডেন্টের পর থেকে কবে শেষ হাত দিয়ে খেয়েছে তার জানা নেই। কখনো বেশিরভাগ সময় রায়ান খাইয়ে দেয় আর রায়ান অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকলে রামিলা চৌধুরী বা সোরায়া নিজে খাইয়ে দিতো। প্রায় অভ্যাসগত করাতেই রায়ান তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। আর মাহির সোরায়া কে খাইয়ে দিচ্ছে তার হাতের গহনার জন্য। মাহির কে তেমন খেতে না দেখে রোকেয়া বেগম আরো কিছু টুকরো মাংস মাহিরের হাতের প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললেন –

“আরে নতুন জামাই বলে কি লজ্জা পাচ্ছো নাকি মাহির? কিছুই তো নিচ্ছো না।”
মাহির সোরায়ার মুখে এক গাল পোলাও তুলে দিয়ে মিষ্টি হেঁসে বলল-
“কই কিছু নিলাম না চাচি? আপনাদের মেয়েকে তো নিচ্ছি নিজের কাছে।”
মাহিরের কথায় সোরায়ার গাল লাল বর্ণ ধারণ করলো। লজ্জায় সে মাহিরের হাতে মৃদু চাপড় দিল। রুদ্র সোরায়ার সাথে মজা নিতে খেতে খেতে বলল-
“নিচ্ছো নাও। ওকে খাওয়াতে খাওয়াতে ফকির না হলেই হয়। যে পরিমাণ খায়..!”
রুদ্রর কথায় সবাই হাসলো। রিমি রুদ্রর কথায় রুদ্র কাঁধে ধাক্কা দিল-“কি অদ্ভুত কথা বার্তা এসব? খালি মেয়েটার পিছনে লাগেন কেন?”

সোরায়া মুখ ফুলিয়ে মাহির কে দেখলো মাহির ও সামান্য হাসতে যাচ্ছিল তখনি সোরায়ার অগ্নি চক্ষু তার নজরে পড়লো। ওমনি তার মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল। মাহির তার হাসি গিলে নিয়ে সোরায়ার মুখে খাব তুলে দিতে নিলে সোরায়া রুদ্র কে খোঁচা মেরে রিমিকে বলল-
“কোন পাগল কুকুরে কামড়ে ছিল তোমায় যে তুমি এমনটা শয়তান বেডাকে বিয়ে করলে রিমি আপু?”
রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রুদ্র রিমির হয়ে উল্টো জবাবে বলল-
“ঠিক যেই কুকুরটাকে তুই কামড়ে ছিলি ওটা। আর ওই কুকুর টাই মাহির ভাইকেও কামড়েছে।”
মাহির রুদ্র কে শাসন করে বলল-

“উফ্ রুদ্র, চুপ করবি? চুপ চাপ খা তো। আমার বউ কে আমি বিয়ে করেছি। আমি সামলে নিবো।”
সোরায়ার মুখের সামনে খাবার ধরে বলল-“তুমি খাও জান।”
সোরায়ার মুখে গর্বের ছাপ দেখা গেল। সে ভাব নিয়ে মাহির হাত থেকে খাবারটা মুখে নিল রুদ্র কে দেখিয়ে দেখিয়ে। সাথে নিজের পা ও উঠিয়ে দিল মাহিরের কোলে। মাহির সোরায়ার এমন আচরণে বাঁকা হাসলো।
মিরা সব শেষে পানি খেয়ে বলল- “আর পারছিনা হাবি। প্লিজ, আর খাব না।”
রায়ান মিরাকে জোর করলো না। টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছিয়ে দিয়ে আদেশ মূলক স্বরে বলল-
“ঠিক আছে আর খেতে হবে না। ঘরে গিয়ে ফ্রেস হো। আমি আসছি।”
-“ঘরে যাবো মানে? বাসর ঘরের দরজা ধরবো না!”
মিরার কথা শুনতেই মাহিরের কাশি উঠে গেল। রায়ান মাহির অবস্থা বুঝে মিরার দিকে কঠোর চাহুনিতে তাকিয়ে বলল-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬ (৩)

“আমি বাড়তি কিছু শুনতে চাই নি মিরা। সারাদিন যা খুশি করেছ কিচ্ছু বলি নি। এখন যা বলছি চুপচাপ শুনবে। ঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে বিছানায় যাও।”
রায়ানের রূঢ় আচরণে মিরার কষ্ট পেল হয়তো। লেহেঙ্গা উঠিয়ে জোর পায়ে হেঁটে নিজের ঘরে চলে গেল। রায়ানের রাগ দেখে রিমির আর সাহস হলো না এবিষয়ে আগে যাওয়ার এখন তো জুঁই ও জেগে নেই সে তো আছেই ঘুমের সাগরে তলিয়ে গেছে। খাওয়া শেষে যে যার যার ঘরে গেল। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা একটু বেশিই দূরত্বে তাই এক রাতের জন্য মাহির আর সোরায়ার বাসর রহমান বাড়িতেই সাজানো হয়েছে।
রাত~১.৩০ এর পর~

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৭ (২)