আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬০
অরাত্রিকা রহমান
বাড়ির ছেলেরা আর সোরায়া কলেজের জন্য বের হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে শুধু মেয়েরাই ছিল। রিমি খাওয়া শেষ করে সোজা মিরার ঘরেই চলে এসেছে। নাস্তার পর কাজে সাহায্য করতে চেয়েছিল রিমি কিন্তু রামিলা চৌধুরী আর মিরা তাকে কিছু করতে দেয় নি। যেহেতু গৃহকর্মী আছে তাই সাহায্যের প্রয়োজন ও পরেনি। রিমির মনের অবস্থা তার নিজের বোধগম্যের বাইরে-কি হচ্ছে! কি হবে! সবকিছু ঘেঁটে আছে এখন। রুদ্র কে সে পছন্দ করে হয়তো ভালোও বাসে কিন্তু রুদ্র কে স্বামী হিসেবে মানার সাহস হচ্ছে না। রিমি রুদ্রর নম্রতা ভদ্রতা দায়িত্ববোধ বিবেচনা করে বিয়েটা করলেও এখন চৌধুরী পরিবারের সবার তার প্রতি এমন আন্তরিক ব্যবহার, সহজে সব মেনে নেওয়া যেমন তাকে শান্তি দিচ্ছিল, তেমন অস্বস্তি। রিমি গতদিনের কথা আর মনে করতে চাইছে না, একটু খোলা হওয়া নিতে রিমি বারান্দায় যায়। রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে খুলে একটু হাসার চেষ্টা করে মনে মনে নিজেকে বলল-
“কেন ভাবছিস অতীত নিয়ে রিমি? আল্লাহর কাছে কত কেঁদেছিস এই মুক্তির জন্য। আজ তুই মুক্ত, সব আছে তোর ঠিক যা যা তুই চেয়েছিলিস- একটা পরিবার, একটা ভালো জীবন সঙ্গী, একটা ছোট সংসার, আজ সব দিয়েছে আল্লাহ তোকে।”
রিমির দুই চোখ ছলছল করে উঠলো। তবে আজ চোখের পানি বেঁধে না রেখে সে পলক ফেলে তাদের মুক্তি দিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে বলল-
“না, আর কাঁদব না। আমার ভাগ্যে আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে যা দিয়েছে তা আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে আগলে রাখবো।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“আসতে পারি?”
পিছন থেকে হঠাৎ আওয়াজ আসতেই রিমি চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রামিলা চৌধুরী মিরা আর মিরার সাথে সাথে গুটি পায়ে জুলিয়েট ও এসেছে তার ঘরের দরজার সামনে। রিমি বারান্দা থেকে ঘরে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলল-
“এ মা কি বলছেন মামণি, আসুন না। জিজ্ঞেস করতে হবে কেন!”
রামিলা চৌধুরী আর মিরা ঘরে ঢুকলে জুলিয়েট ও তাদের সাথে হাঁটতে লাগলো। রিমি ঝুঁকে জুলিয়েট কে কোলে তুলে নিয়ে ওর গায়ে আদর করতে করতে রামিলা চৌধুরীকে বসতে বলল-
“বসুন না মামণি।”
রামিলা চৌধুরী নিজের হাতে করে কয়েকটা বক্স এনে ছিলেন দেখে মনে হচ্ছে গয়নার। সেগুলো তিনি মিরার হাতে দিয়ে বিছানায় বসে বললেন-
“মিরা এগুলো এক এক করে খুলে খুলে আমার হাতে দে।”
মিরা জিনিস গুলো নিয়ে বিছানায় রেখে নিজেও বিছানায় উঠে বসলো। রিমি অবাক হয়ে দেখছে শুধু। রামিলা চৌধুরী রিমিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন-
“দাঁড়িয়ে আছো কেন রিমি? জুলি কে রেখে বিছানায় বসো।”
রিমি বাধ্য মেয়ের মতো জুলিয়েট কে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে নিজেও বসলো। রামিলা চৌধুরী মিরাকে ইশারা করতেই মিরা উপরে থাকা ছোট একটা বক্স তার হাতে দিল।
রামিলা চৌধুরী বক্সটা নিতে নিতে বললেন-
“ওটার নিচের বক্সটাও দে।”
মিরা ওই বক্স এর নিচে থাকা একই সাইজের আরেকটা বক্স তার হাতে দিল। রামিলা পরপর দুটো বক্স খুললেন। বক্সেগুলোর ভেতরে ছিলো এক জোড়া করে সোনার বালা। রামিলা চৌধুরী প্রথমে মিরার হাত নিজের হাতে নিলেন।
-“মিরা, তোর হাত দে দেখি।”
তারপর নিজে মিরার দুই হাতে দুটো বালা পড়িয়ে দিলেন। তারপর রিমির দিকে হাত বাড়িয়ে রিমিকে উদ্দেশ্যে করে বললেন –
“রিমি..এবার তোমার হাত দাও দেখি।”
রিমি নিজের হাত বাড়িয়ে দিলে রামিলা চৌধুরী রিমির দুই হাতে একই বালা পড়িয়ে দিলেন। মিরা ও রিমি দুইজনেই নিজেদের হাত দেখছে। রামিলা চৌধুরী দুজন কে উদ্দেশ্য করে শান্ত কন্ঠে বললেন-
“আমার দুটো ছেলে, বড্ড আদরের। কিন্তু ভাগ্য এমন একজনেরও বিয়ে তেমন উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। মা হিসেবে আফসোস থাকলেও আমার ছেলেরা আমাকে শাশুড়ি হিসেবে আফসোস করার জায়গা দেয়নি। চাঁদের মতো দুই বউ এনেছে আমার ঘরে। এই বালা চৌধুরী বাড়ির বউদের পরিচয় বহন করে। আমার হাতে আমার শাশুড়ি পড়িয়েছিলেন, আমিও আমার দুই ছেলের বউকে পড়িয়ে দিলাম। বংশ পরম্পরায় এমনটা হয়ে আসছে, তোদের থেকেও ভবিষ্যতে এমনটাই কাম্য। নিজেদের দায়িত্ব পালন করবি তোরা এতোটা আস্থা আছে আমার। কি তাই তো?”
মিরা রিমি রামিলা চৌধুরীর কথা শুনে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়লো। এর পর রামিলা চৌধুরী মিরাকে পরের বড় বড় দুটো বক্স দিতে বললে মিরা সেগুলো এগিয়ে দেয়। এই বক্সে ছিল একটা সোনার নেকলেস সেট। রামিলা চৌধুরী মিরা হাতে আর রিমির হাতে একটা একটা বক্স দিয়ে বললেন-
“চৌধুরী বাড়ির নিয়ম অনুযায়ী এইগুলো বাড়ির মেয়েদের দেওয়া হয়। আল্লাহ আমাকে দুই ছেলে দিয়েছেন। বাড়ির মেয়ে বলতে আমার দুই ছেলের বউ আছে, যারা নিজের মেয়ের থেকেও বেশি কিছু। তাই এগুলো ও তোদের।”
মিরা আর রিমি মিষ্টি হেঁসে নিজেদের দায়িত্ব গ্রহণ করলো। মিরা রামিলা চৌধুরীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল-
“মামণি, ছেলের বউ ছেলের বউ বলা বাদ দেও তো। আমি তোমার মেয়ে হয়েই থাকতে চাই। তোমার ছেলে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে কে জানে।”
রামিলা চৌধুরী জোরে হেঁসে বললেন-
“তাহলে কি আমার ছেলেটাকে নিয়ে নেব ? ভালো না লাগলে বল। ফেরত নিয়ে নেই।”
মিরা সাথে সাথে আপত্তি জানিয়ে বলল-
“ভালো লাগে না কখনো বলেছি। ফেরত দেবে কেন আবার?”
রামিলা চৌধুরী মিরার হাতের বাঁধনে হাত রেখে বললেন-
“আমার ছেলেকে যেভাবে জাদু করেছিস, তুই ফেরত দিলেও আর ফিরবে না সে।”
মিরা লজ্জায় মুখ লুকালো। রামিলা চৌধুরী রিমির দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে বললেন-
“এই যে মেয়ে, হিংসে হচ্ছে না বুঝি? সব আদর যে বড় মেয়ে নিয়ে নিচ্ছে। তাড়াতাড়ি এসো।”
রিমি মৃদু হেসে রামিলা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরলো। মমতার ছোঁয়ার তার চোখে অশ্রু কণা ভীর করেছে। রিমি রামিলা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরেই কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“আমি কবে এভাবে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম আমার মনে নেই। আজ খুব আরাম লাগছে।”
রামিলা চৌধুরী রিমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন-
“এভাবে বলতে নেই মা। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। ধৈর্য হারাতে নেই।”
এভাবে তিনজনকে একসাথে দেখে জুলিয়েটের কি হলো কে জানে সেও গুটি গুটি পায়ে এসে তিন জনের মাঝে এসে বসে পড়লো। জুলিয়েটের কান্ড দেখে মিরা জুলিয়েটের গায়ে আদর করতে করতে বলল-
“রমিওর সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে তো মাম্মা কে ভুলেই গেছিস। সব সময় বরের আগে পিছে ঘুরঘুর করিস। এখন আবার এখানে কি তোর?”
এর মাঝেই রোমিও জুলিয়েট কে খুঁজতে ঘরে ঢুকতেই রামিলা চৌধুরী বললেন-
“ওই দেখ, বউ একটু চোখের আড়াল হওয়ার সাথে সাথে খুঁজতে চলে এসেছে।”
রোমিও কে দেখে জুলিয়েট সাথে সাথে বিছানা থেকে নেমে রোমিওর কাছে চলে গেল। রিমি এক নজরে দেখছে সব কিছু আর মনে মনে ভাবছে-
“প্রাণী হয়েও বিয়ের পর কি ভালোবাসা এদের মাঝে। বাপরে, আর এই দিকে মানুষ হয়েও বিয়ের পর ভয় করছে। আর ভালোবাসবো কি!”
রামিলা চৌধুরী রিমির কে উদ্দেশ্য করে বললেন-
“রিমি এই ঘরে আর থাকতে হবে না। রুদ্রর ঘরে চলো। বাকি যা যা তোমার প্রয়োজন আমরা একসাথে শপিং করতে গেলে আনা যাবে।”
রিমি রুদ্রর ঘরে থাকার কথা উঠতেই বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে রুদ্রর ঘরে একসাথে থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু মনের মাঝে এমন দোটানা তৈরি হয়েছে যে তার বিষয়টা নিয়ে কেমন ভয় ভয় করছে। মিরা রিমির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো রিমির অবস্থা- মিরারও রায়ানের সাথে এক ঘরে থাকার কথা মাথায় আসলেই বুক ধড়ফোড় করে। মিরা রিমির অস্বস্তি কমাতে রামিলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“মামণি, রিমিকে আমি রুদ্র ভাইয়ার ঘরে দিয়ে আসবো তুমি চিন্তা করো না।”
রিমি মিরার কথায় লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিলে রামিলা চৌধুরী আর তেমন কিছু বললেন না।
কলেজ~
কলেজে পৌঁছানোর পর সোরায়া আর মাহির একসাথে ক্লাস রুমে প্রবেশ করে। ক্লাসের বাকিরা সবাই মাহির কে ক্লাস ঢুকতে দেখে দাঁড়িয়ে সালাম দিলে মাহির সবার সালামের উত্তর করলো। সোরায়া একটু ইতস্তত বোধ করে চুপচাপ মাথা নিচু করে জুঁই কোথায় বসেছে খুঁজতে শুরু করলে পিছন বেঞ্চ থেকে জুঁই উৎসাহী মুখে সোরায়ার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে জোরে ডেকে উঠলো-
“সোরা…..এই দিকে।”
ডাক শুনেই বোঝা যাচ্ছে এতো দিন পর সোরায়াকে দেখে জুঁই খুব আনন্দিত। সোরায়া চমকে জুঁইয়ের ডাকে পিছনের দিকে তাকিয়ে হাসলো। সে অনেক দিন পর জুঁই কে দেখে খুশি। সোরায়া দ্রুত পায়ে জুঁইয়ের কাছে যেতে নিলে মাহির সোরায়ার ব্যাগ টেনে ধরে থামালো –
“উমমম্.. এখানেই দাঁড়াও।”
সোরায়া সামনের দিকে যেতে না পেরে মাহিরের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই মাহির সামনের বেঞ্চে ইশারা করে বলল-
“সামনের বসো।”
সোরায়া সামনের বেঞ্চে খেয়াল করে দেখলো সেখানে বসার জায়গা নেই। আর থাকলেও সে বসতো না- সে জুঁইয়ের সাথেই বসবে।
-“এখানে তো জায়গা নেই। আমি বরং পিছনে জুঁইয়ের সাথে বসি।”
মাহির সামনের বেঞ্চে বসা একটা ছেলেকে ইশারা করে বেঞ্চ থেকে উঠে যেতে বলল। সেই ছাত্র ও স্যারের কথার অমান্য না করে উঠে গেলে মাহির সোরায়ার ব্যাগ নিয়ে সেখানে রেখে বলল-
“কাল থেকে তাড়াতাড়ি এসে একসাথে বসবে । আর হ্যাঁ সামনের বেঞ্চেই বসবে প্রতিদিন।”
সোরায়ার বেশ রাগ হলো। একটু মুখ ফুলিয়েই বলল-
“কেন বসবো সামনে প্রতিদিন?”
-“আমি যেন তোমাকে স্পষ্ট দেখতে পাই তার জন্য।”
সোরায়া ক্লাস রুমের সবার দৃষ্টি খেয়াল করলো। সবাই তাদেরকেই দেখছে সন্দেহ ভরা নজরে। সোরায়া জেদ ধরে বলল-
“আমি জুঁইকে ছাড়া বসবো না।”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের বেঞ্চে অন্য সাইডে বসা মেয়েটাকে নিজের জায়গা ছাড়তে বললে ওই মেয়েটা অনিচ্ছুক হয়ে নিজের জায়গা ছাড়লো। সোরায়া সাথে সাথে দাঁত বের করে হেঁসে পিছনে জুঁইকে ইশারা করে সামনে ডাকলে জুঁই খুশি মনে নিজের জায়গা পরিবর্তন করে নিলো।
-“আমার জান বাচ্চা কি এখন হ্যাপি?” (ফিসফিস করে)
মাহিরের প্রশ্নে সোরায়া হেঁসে মাথা নাড়ালো-“হুম, ভীষণ।”
মাহির হাত উঠালো সোরায়ার মাথায় হাত দিয়ে কিন্তু ক্লাসের সবার নজর তাদের উপর দেখে সেই দুঃসাহস করলো না। ফার্স্ট বেঞ্চে জুঁই আসতেই সোরায়া তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল –
“I missed you…দোস্ত। কেমন আছিস?”
জুঁই ও একই ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল-
“I missed you too..দোস্ত। আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস।”
-“আমিও ভালো আছি।”
দুইজনের কুশল বিনিময় শেষ হলে ক্লাসের দিকে মন দিলো। ক্লাসে উপস্থিত সবাই সোরায়া আর মাহির কে খেয়াল করেছে কিন্তু পড়া শোনা শুরু হওয়ার পর এসব কিছুই আর তাদের মাথায় ছিল না। মাহির ও পড়াতে শুরু করে। আর কয়েকমাস বাকি মিড-টার্ম এর তাই পড়ার চাপ বেশি। সোরায়া এতো দিন ছিল না বলে জুঁইয়ের কাছে পড়াগুলো জানতে চাইলো।
-“জুঁই, আমাকে গত দেড় মাসের পড়া গুলো দিস তো। পরীক্ষার জন্য পড়তে হবে।”
-“আচ্ছা নিস। কিন্তু আমি গত এক সপ্তাহ আসি নি কলেজে সেগুলো অন্য কারো থেকে নিতে হবে।”
-“ওহ আচ্ছা, ওয়েট পিছনের জনকে জিজ্ঞেস করে দেখি।”
সোরায়া তার ঠিক পিছনে বসা একজন ছেলে ক্লাসমেট কে
গত এক সপ্তাহের পড়া গুলো দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে সেটা মাহিরের চোখে পড়লো। মাহির হঠাৎ পড়ানো বন্ধ করে সোরায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“এখানে কি কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে?”
সোরায়া অবাক হয়ে সামনে তাকিয়ে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার মতো আমতা আমতা করে বলল-
“ক..কই না তো। আমি আগের পড়া গুলো নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলাম শুধু।”
ক্লাস রুমের সবাই আবার মাহির আর সোরার দিকে তাকিয়ে আছে। মাহির শান্ত গলায় সোরায়াকে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“ক্লাসে মনোযোগ দাও এখন। আগের পড়া আমি বুঝিয়ে দেব। ক্লাস শেষে আমার অফিস রুমে আসবে।”
কথাটা শুনতেই সোরায়ার কাশি উঠে গেলো। মাহির সোরায়ার ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা নিয়ে সেটার ঢাকনা খুলে সোরায়ার দিকে এগিয়ে দিলো-
“পানি খাও।”
সোরায়া চটজলদি পানির বোতল হাতে নিয়ে পানি খেয়ে নিলো। হঠাৎই তার মাহিরের কথা আর কাজে গরম লাগছে। সোরায়া পানি খেয়ে নিজের মুখে হাত পাখার মতো করে হিয়া দিচ্ছিল বলে মাহির তৎক্ষণাৎ গিয়ে ফ্যান ছেড়ে দিলো-
“এবার ঠিক লাগছে?”
সোরায়া সবার নজর তাদের উপর দেখে লজ্জায় মাথায় হাত দিলে মাহির চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“মাথা ব্যাথা করছে? কিছু লাগবে তোমার?”
সোরায়ার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে এতক্ষণে। টিচারের দিক থেকে এমন আচরণ কখনোই স্বাভাবিক নয় এটা যে কেউ বুঝবে। সোরায়া চাই না কলেজে এসব নিয়ে কানাঘুষা হক। কিন্তু মাহিরের ব্যবহার যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে সে সবাইকে বোঝাতে চাইছে সোরায়ার উপর তার অধিকার। সোরায়া বিষয়টা আরো নিশ্চিত না হয়ে দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলল-
“আমি ঠিক আছি স্যার। ধন্যবাদ। আপনি ক্লাস কন্টিনিউ করুন।”
মাহির সোরায়ার কথায় ক্লাসের দিকে মন দিলে সোরায়ার পাশে বসা জুঁই সন্দেহ ভরা নজরে প্রশ্ন করলো –
“কিরে? কি চলে…?”
-“কি চলবে…?”
-“কিছু তো চলে…তোর অনুপস্থিতিতেও স্যার এমন ছটফট করতো। আমাকে যে কতবার তোর কথা জিজ্ঞেস করেছে তার হিসেব নেই। ৪ ৫ দিন স্যার কলেজে এলেন না, আজ আবার তোকে সাথে নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। তার উপর এসব… কিছু বুঝিনা মনে করিস?”
সোরায়া পাত্তা না দেওয়ার ভাব নিয়ে জুঁইয়ের মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
“একটু বেশিই বুঝিস তুই। সবকিছুই কোইনসিডেন্ট।”
-“আচ্ছা.. কোইনসিডেন্ট? ঠিক আছে দেখবো কয়দিন এমন কোইনসিডেন্ট চলে।”
সোরায়া আর কিছু বললো না- জানে বললে আরো ঘেঁটে যাবে তাই চুপ থাকলো। ক্লাস শেষে শেষে মাহির ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সোরায়াকে বলল-
“Come to my office room now..”
সবাই আবার সোরায়ার দিকে তাকালে সোরায়া বানোয়াট হেঁসে একটা খাতা আর কলম হাতে নিয়ে সবার জানার উদ্দেশ্যে বলল-
“আগের পড়া গুলো বুঝতে হবে তো তাই। আমি আসছি।”
এই বলে সোরায়া মাহিরের পিছন পিছন ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে অফিস রুমে যায়। মাহির অফিস রুমে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসে সোরায়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কয়েক মিনিট পর সোরায়া অফিস রুমে আসতেই মাহির তার পাশের চেয়ারে টা টেনে বের করে বলল-
“বসো।”
টিচারের দের চেয়ারে স্টুডেন্ট দের বসা বাড়ন। তাই সোরায়া একটু অবাক হয়ে চেয়ারটা দেখে মাহির কে প্রশ্ন করলো-
“এই অফিস রুমের চেয়ারে?”
মাহির চেয়ারটা আবার ঢুকিয়ে রেখে নিজের উরুর উপর হাত রেখে দুষ্টু হেঁসে সোরায়া কে বলল-
“এই চেয়ারে বসতে না চাইলে আমার কোলে বসতে পারো।”
সোরায়ার দুই গাল লাল হয়ে উঠলো সাথে সাথে। লজ্জায় আর কথা না বাড়িয়ে মাহিরের পাশের চেয়ারটাই আবার বের করে বসলো। মাহির সোরায়া কে লজ্জা পেতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। সোরায়া নরম কন্ঠে মাহির কে বলল-
“ক্লাসের সবার সামনে আমাদের একটু সাবধানে থাকা উচিত।”
-“কেন?”
-“ওরা ভাববে আমাদের মাঝে কিছু আছে।”
-“হুম, তো?”
সোরায়া মাহিরের এমন বেপরোয়া উত্তর আড় চোখে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল-
“তো মানে? আপনি কি মজা করছেন আমার সাথে?”
মাহির এক ঝটকায় সোরায়ার চেয়ার টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে সোরায়ার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“তো তুমি কি বলতে চাইছো? আমাদের মাঝে কি কিছু নেই?”
সোরায়া মাহিরে কাছাকাছি যেতেই নিজের চোখ বন্ধ করে নিলো ভয়ে। সেভাবেই বলল-
“কিছু নেই তা কখন বললাম। বলেছি কেউ জেনে গেলে খারাপ দেখাবে।”
-“দেখাক খারাপ। তো?”
সোরায়া আর তর্ক করতে না চেয়ে মেনে নিল-“তো কিছু না।”
মাহির সোরায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো। মেয়েটার ঠোঁট বেশ শুকনো। মাহির ঘোরের মাঝে চলে গেল হঠাৎ সোরায়ার গালে হাত রেখে তার ঠোঁটে নিজের হাতের আঙুল স্লাইড করে কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“আজ ঠোঁট গুলো এতো শুকনো লাগছে কেন জানবাচ্চা?”
মাহিরের ঠান্ডা হাতের স্পর্শে সোরায়ার সম্পূর্ণ শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল-
“আপনিই তো বলেছিলেন ঠোঁটে কিছু না দিতে।”
মাহির আবারো সোরায়ার ঠোঁটের উপর আঙ্গুল স্লাইড করতে করতে আনমনে বলল-
“লাভ কি হলো এতে। They are still looking so perfect..”
সোরায়া নিজের চোখ খুলে নিলো। মাহির ঠিক কয়েক ইঞ্চি দূরে তার থেকে। চমকে গিয়েই সোরায়া মাহিরের বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। মাহির নিজের হাত মুঠো করে নিয়ে শক্ত হয়ে সোরায়াকে বলল-
“ক্লাসে যাও। পরীক্ষার সিলেবাস কলেজ থেকেই প্রভাইড করা হবে।”
সোরায়া অবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকালো- মানুষ টা কন্ঠে হঠাৎ পরিবর্তন। কিন্তু সিলেবাস কলেজ থেকে দেওয়া হবে যেনেও মাহির তাকে অফিস রুমে কেন ডাকলো তার মাথায় ঢুকলো না কিন্তু মাহিরের আচরণ অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। একটু কিছু তেই লাগামহীন হয়ে যাওয়া দিন দিন বাড়ছে এটা মাহির ও বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে কিন্তু সামলানোর উপায় কে বলবে!
সোরায়া উঠে চলে যেতে নিলে মাহির পিছন থেকে বলল-
“কলেজে কোনো ছেলের সাথে যেন কথা বলতে না দেখি। পড়ার জন্য ও না।”
সোরায়া অবশেষে বুঝলো সবকিছু তাঁর ওই ছেলে ক্লাসমেটের সাথে কথা বলা নিয়ে। সোরায়া পিছন ঘুরেই মুচকি হেঁসে বলল-“আচ্ছা, ঠিক আছে। এবার যাই?”
-“যাও। কলেজের পর আমার অপেক্ষা করবে গেইটে। একসাথে ফিরবো।”
সোরায়া চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে নিজের ক্লাসে গেল।
কলেজ শেষে সোরায়াকে মাহির বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ি গিয়েছে। সোরায়া বাড়ি ফেরার পর ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসেছে। এইদিকে রিমি আর মিরা ঠিক করেছে কাল থেকে রেগুলার ক্যাম্পাসে যাবে। মিরা রিমির সাথে বসেছিল এক মাসের পড়া গুছিয়ে নিতে- আইন বিভাগে পড়ছে অথচ পড়া এক আনাও শেষ হয়নি দেখে আজ সব রুটিন ঠিক করেছে। পরীক্ষার আগে সব শেষ করবে। রিমি যেহেতু এক কাপড়ে চৌধুরী বাড়িতে এসেছিল তাই মিরা নিজের কয়েকটা ড্রেস রিমিকে দিয়েছে। কাল বা পরশু গিয়ে সবাই শপিং করবে প্লেন করেছে।
গোটা দিন এমন ভাবেই কেটেছে। দুপুরে রায়ান নিজের থেকে মিরাকে মেসেজ দিয়েছিল খেয়েছে কিনা জানতে। ভালো মন্দ কথা শেষে রায়ান মিরা কে একটু ঘুমিয়ে রেস্ট নিতে বলেছিল- এতো টুকুই। তারপর কাজের ব্যস্ততায় আর কথা হয়নি তাদের। এইদিকে রিমি কয়েকবার রুদ্র কে ফোন করতে চেয়েও করেনি নিজের মধ্যেকার জড়তার জন্য। রুদ্র তো পালিয়ে পালিয়েই আছে, রাতের জবাবদিহিতা দিতে হবে ভেবে সেও কল করেনি।
দিন গড়িয়ে রাত হয়েছে, রাতের খাবার খেয়ে যে যার যার ঘরে। রায়ান মিরাকে খেয়ে নিতে বলেছিল তাই মিরা খেয়ে নিয়েছে এটাও জানে আজ রায়ানের ফিরতে দেরি হবে তাই ঘরে গিয়ে সোজা নিজের টেবিলে গিয়ে বসেছে কয়েকটা টপিক আজই শেষ করবে ভেবেছে।
অন্যদিকে রিমি আজ রুদ্রর ঘরে অবস্থান করছে। রুদ্রর ঘরে তার একটু অস্বস্তি হলেও নিজেকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করেছে। রুদ্রর ঘরে সে আগেও এসেছে যদিও সেটা ভুল বশত আর আজ স্ত্রীর অধিকারে। রিমি রুদ্রর ঘরটা একটু এলোমেলো দেখে সযত্নে গুছিয়ে নিলো ঘরটা। এরপর সময় পার করতে কিছুক্ষণ বই পড়লো। যখন বই পড়তে আর ভালো লাগছিল না তার নজর গেল রুদ্রর গিটারের উপর। রিমি গিটার দেখেই উৎসুক মনে দ্রুত সেটা তুলে নিয়ে জানালার উপর গিয়ে বসলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে গিটারে টুংটাং সুর তুলে গুনগুন করতে লাগলো। অনেক দিন পরে গিটার ধরতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। রিমি এক নজর রুদ্রর গিটার টা দেখে হেসে নিজে নিজে বলল-
“বিয়েটা যেমনই হোক, আমার স্বামী কপাল ভালো। নিজের গিটার নেই তো কি… বরের তো আছে। নিঃসন্দেহে আমি জিতেছি।”
-“আপনার এই ভুল ধারণা ভেঙে দিতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও নিজের কথাটা ঠিক করে নি- আপনি একা নন সাথে আমিও জিতেছি।”
পরিচিত গলা শুনে রিমি পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে মুখে তৃপ্তির হাসি। রিমি সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে জিভ কামড়ে ধরলো-“ইসসস্…শুনে নিলো..!”
রুদ্র ধীর পায়ে রিমির কাছে এগিয়ে এলো। রুদ্র রিমির ঠিক পিছনে দাড়াতেই রিমি পিছন ফিরলো। খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় রিমির মাথা ঠেকলো রুদ্রর বুকে।
-“আউউউ্..!”
রুদ্র মৃদু হেসে রিমিকে জিজ্ঞেস করলো-
“রাতে খেয়েছেন?”
রিমি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো- “হুম, খেয়েছি। মামণি বলেছে আপনি আসলে আপনাকেও খেয়ে নিতে।”
-“হুম একে বারে খেয়েই উপরে এলাম। আম্মু বলছিল আমার বউ নাকি আজ আমার ঘরে থাকবে।”
রিমি ফেলফেল করে রুদ্র দিকে তাকিয়ে বলল-
“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, শুধু আজ নয় আজ থেকে প্রতিদিনই আপনার ঘরে থাকবো আমি। আপত্তি থাকলে এখনি বলে দিন।”
-“যদি আপত্তি থাকে?”
-“চলে যাবো।”
-“আর যদি আপত্তি না থাকে?”
-“থেকে যাবো।”
-“থেকে যান তাহলে। আমার আপত্তির তোয়াক্কা করবেন না।”
কত সহজ কথোপকথন অথচ কি সুন্দর। রিমি রুদ্র কে অপরের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকলো কিছু সময় যেন চোখে চোখে কথা হচ্ছে- কি কথা হচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। রিমি নিজের নজর সামলে চোখের পাতা নিচু করে নিয়ে রুদ্র কে বলল-
“সারাদিনের পর আপনি হয়তো ক্লান্ত। ফ্রেশ হয়ে আসুন।”
এই বলে রিমি রুদ্র কে কাটিয়ে সরে যেতে চাইলে রুদ্র রিমির সামনে দাঁড়িয়ে রিমির পথ আটকায়। রিমি অবাক চোখে রুদ্রর দিকে তাকাতেই রুদ্র নিজের একহাত দিয়ে রিমির চোখ ধরে বলল-
“এখনি যাবেন না প্লিজ।”
রিমি রুদ্রর হাতের উপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“সেটা তো স্বাভাবিক ভাবে বললেও হয়। আমার চোখ ধরেছেন কেন?”
-“একটু ধৈর্য ধরে চোখ দুটো বন্ধ করুন না।”
-“চোখ বন্ধ করে কি হবে?”
-“আমি বলেছি চোখ বন্ধ করতে তো চোখ বন্ধ রাখুন।”
রিমি রুদ্রর কথা ফেলতে পারলো না। শান্ত হয়ে বলল-
“আচ্ছা ঠিক আছে, চোখ বন্ধ।”
রুদ্র ধীরে ধীরে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলল-
“চোখ খুলবেন না কিন্তু।”
-“আচ্ছা বাবা, খুলবো না। বলবেন তো কি হয়েছে?”
রুদ্রর রিমিকে উল্টো করে জানালার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল-
“নিজের হাত আগে করুন।”
রিমি নিজের দুই হাত আগে করলে রুদ্র রিমির হাতে একটা বড় লম্বা ভারী বস্তু রাখলো। রিমি চোখ বন্ধ করেই ভ্রু কুঁচকে নিলো-
“এটা কি?”
-“অনুমান করুন দেখি।”
রিমি নিজের হাতে থাকা বস্তু টা হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলো। ঠিক যে মুহূর্তে বুঝতে পারলো তার হাতের জিনিসটা ঠিক কি তার মুখে এমনি একটু প্রসস্থ হাসির রেখা ফুটে উঠলো। রিমি কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন সূচক কন্ঠে আওড়ালো-
“গি..গিটার…!”
রুদ্র হাসিমুখে বলল-“চোখ খুলে দেখুন।”
রিমি সাথে সাথে চোখ খুলে তার হাতে থাকা একদম নতুন গিটার টা দেখলো। রুদ্র রিমির ঘাড়ের কাছে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল-
“আমার বউয়ের জন্য। তার কি পছন্দ হয়েছে?”
রিমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। সে গিটার টা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকলো। চোখে একটা চকচকে ভাব যেন খুব কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা তার আয়ত্তে। রুদ্র রিমির হাঁসি মুখ দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“এক কাপড়ে বিয়ে করে নিয়ে এসেছি আপনাকে। একটা মেয়ে হিসেবে বিয়ের দিনের আপনার কোনো শখ আমার পুরন করার সৌভাগ্য হয়নি। আমাদের বিয়ের পর এটা আমার তরফ থেকে আপনার জন্য প্রথম উপহার। মাথায় আসছিল না কি দিবো আপনাকে। নিজের থেকেই এটা নিয়ে এলাম। এর বাইরে আপনার কিছু দরকার হলে আমাকে বলবেন প্লিজ। আমার সত্যিই কোনো আইডিয়া নেই…!”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রিমি পিছন ঘুরে রুদ্র কে জাপটে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“খুব পছন্দ হয়েছে। আমার আর কিছু চাই না।”
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে গেলো নিজের জায়গায়। রিমির কান্নার কারণ অস্পষ্ট কিন্তু রিমির গিটারটা পছন্দ হয়েছে এতে রুদ্র সন্তুষ্ট। রুদ্র রিমিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল-
“পছন্দ হয়েছে তো কান্না করছেন কেন? স্বান্তনা দিচ্ছেন আমাকে?”
রিমি সাথে সাথে রুদ্রর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল-
“এতো ভালো কেন আপনি?”
রুদ্র রিমির মাথায় নিজের থুতনি ঠেকিয়ে বেজার কন্ঠে বলল-
“I don’t want to be good…কোনো দিন যদি এর বিপরীত হয়, তাহলে?”
রিমি রুদ্রর বুকের থেকে মাথা না উঠিয়েই বলল-
“খারাপ ভালো দিয়ে কাজ নেই আমার। আপনি আমার থাকলেই হলো।”
রুদ্র হালকা হেসে রিমির মুখটা নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“রাতে অনুমতি নেওয়ার সুযোগ ছিল না তাই প্রয়োজন মনে করি নি। এখন কি অনুমতি পাবো?”
রিমিও রুদ্রর মতোন পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“যদি অনুমতি না দিই?”
-“ছোব না।”
-“যদি অনুমতি দিই?”
-“ছোব।”
-“তাহলে ছুঁয়ে দিন। আমার অনুমতির তোয়াক্কা করবেন না।”
রুদ্র ঠোঁট কামড়ে হেঁসে রিমির কপালে ঠোঁট ছোয়ালো। রিমি আবেশে নিজের চোখ বন্ধ করে নিল। রিমি রুদ্র কে আর এগোতে না দিয়ে একটা আবদার রাখলো-
“আমাকে একটু বাইরে নিয়ে যাবেন?”
রুদ্র একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এখন যাবেন?”
রিমি মাথা নেড়ে হ্যা বললে রুদ্র রিমির দুই গালে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল-
“রেডি হয়ে নিচে আসুন আমি বাইক বের করছি।”
রুদ্র নিচে নেমে গেলে রিমি দৌড়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে দুই গালে হাত রেখে চিৎকার দিলো একটা।
-“আআআআআআ। আমি হ্যাঁ বলেছি? সত্যি হ্যাঁ বলেছি? হায় আল্লাহ। এখন আমার কি হবে?”
রিমি নিজের অজান্তেই আবেগে গা ভাসিয়েছে। রিমি বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের চেহারা দেখে দুই গালে হাত দিলো বিস্মিত হয়ে।
-“উনি এই মাত্র আমার গালে…!”
রিমি কথাটা মনে মনে পরিপূর্ণ করে নিজেই মুখ দুই হাতে ঢেকে সুখ আর শোক একসাথে উদযাপন করলো। তখনি রুদ্র নিচে থেকে চিৎকার করলো-
“রিমি….Come down fast….”
রিমি তাড়াতাড়ি করে নিজের গায়ে ওড়না টা ঠিকঠাক করে নিচে নামলো।
রাত ১টার কাছাকাছি সময়। রায়ান বেশ ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরেই সোজা নিজের ঘরে গেল। আশা করছিল বউটাকে একবার চোখের সামনে দেখলে হয়তো ভালো লাগবে। কিন্তু ঘরে ঢুকে এর বিপরীত হলো। সম্পূর্ণ ঘরে কোথাও মিরাকে দেখতে না পেয়ে তার মাথা যেন আরো বিগড়ে গেল। হাতের কোর্ট টা বিছানায় ছুড়ে ফেলে গলার টাই টা খুলতে খুলতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো-
“কপাল করে বউ পেয়েছি একটা। যখনি একটু শান্তির খোঁজে তার কাছে যাবো আরো অশান্ত করে দেয়। রাতে এতো কাজের চাপ নিয়ে বাড়ি ফিরে বউটাকে নিজের বিছানায় দেখাও এক প্রকার শান্তি, এগুলো আমার বউটা কে কেউ শিখায় নি কেন?”
টাই খুলে শার্টের হাতা ভাঁজ করতে করতে রায়ান মিরাকে ডাকলো-
“হৃদপাখি…!”
মিরার আওয়াজ না পেয়ে রায়ান ওয়াশ রুমে দেখলো মিরা সেখানে ও নেই। একটু চিন্তিত হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিরাকে খুঁজতে। মিরার আগের ঘরে হালকা আলো জ্বলতে দেখে রায়ান দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো-
“হৃদপাখি.. আমি আসার পর থেকে তোমাকে খুঁজছি..তু..!”
রায়ানের গলা থমকে গেল। মিরা বিছানায় নয় বরং নিজের পড়ার টেবিলেই বইয়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে। রায়ান ধীর পায়ে মিরার টেবিলের উপর কাছে গিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বই গুলো দেখে নিজের মাথায় দুই আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে বলল-
“ছোট্ট বউটা আমার পড়ার মাঝে ডুবে গেছে একে বারে।”
রায়ান মিরার মাথাটা আলতো করে তুলে মাথায় নিচের থেকে খোলা বই টা টেনে বের করে বন্ধ করে টেবিলের বাকি বই গুলোর সাথে গুছিয়ে রাখলো। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় মিরার মুখটা তার কাছে খুব মায়াবী লাগলো। ঘরের আরেকটা চেয়ার টেনে সেও মিরার পাশে বসে মুখমুখি মাথা নামিয়ে টেবিলে রাখলো। মিরার মুখে এসে পড়া চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে আস্তে করে কপালে আর গালে চুমু দিয়ে থেমে গেল। রায়ান নিজের আঙ্গুল মিরার ঠোঁটের উপর রেখে মনে মনে হেঁসে বিড়বিড় করলো-
“আমার সে প্রথম তোমার ঠোঁটের স্বাদ নেওয়ার রাতটা ঠিক এমন ছিল। তুমি ঘুমিয়ে ছিলেন আর আমি ইচ্ছে মতোন অধিকার খাটিয়েছিলাম এই ঠোঁট দুটোতে। Let me recreat that moment…”
কথাটা বলে রায়ান মিরার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার ঠোঁট রাখলো মিরার ঠোঁটে। মিরা মৃদু কেঁপে উঠলো রায়ানের ঠোঁটের স্পর্শে। আর ঘুম এতো ও গভীর ছিল না বলে সাথে সাথে চমকে চোখ খুলে ফেলল। কিন্তু মিরা নিজের ঠোঁট সরানোর আগেই রায়ান মিরার চুল পিছন থেকে আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো। মিরা ছাড়া পেতে শব্দ করলো-
“উউউমমম..”
রায়ান তখন মিরার ঠোঁটে নিজের ক্লান্তি বিসর্জন দিতে ব্যস্ত। ঠোঁটে ছোঁয়াতে কোনো সংঘর্ষ ছিল না শুধু ভালোবাসা ছিল। কিছুক্ষণ পর রায়ান মিরার ঠোঁট ছেঁড়ে দিলে মিরা টেবিলের উপরে ওভাবে মাথা রেখেই হাঁপাতে থাকে। কয়েক মিনিট পর চোখ খুলে রায়ানের দিকে তাকিয়ে ঘুম জড়ানো গলায় প্রশ্ন করলো-
“কখন এসেছেন আপনি? আর এই ঘরে কেন?”
রায়ান মিরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল-
“বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে এসেছি। আমার বউ যেখানে আমিও তো সেখানেই যাবো তাই নয় কি?”
মিরা একটু রাগ দেখিয়ে টেবিলের উপর রাখা একটা বই হাতে নিয়ে মুখ সেটা দিয়ে ঢেকে বলল-
“কই সারাদিন তো বউয়ের কথা মনে পড়ে নি। এখন কয়টা বাজে?”
রায়ান নিচের ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেঁসে বলল-
“কেন তুমি জানো না.. সচরাচর বউয়ের কথা রাত হলেই মনে পড়ে।”
মিরা মুখের সামনে থেকে বইটা নামিয়ে নিয়ে রায়ান কে সাবধান করলো-
“Behave your self hubby..”
রায়ান মিরার হাত থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে বলল-
“এটা বেআইনি হৃদপাখি।”
মিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কি বেআইনি হাবি?”
রায়ান তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে মিরাকে বসা অবস্থায় কোলে নিয়ে বলল-
“Looking this much addictive And you still want me to behave? Don’t you think it’s illegal?”
মিরা রায়ানের কথায় লজ্জায় রায়ানের গলায় মুখ গুজে লুকিয়ে নিলো নিজেকে। রায়ান আর সময় নষ্ট না করে মিরাকে তাদের ঘরে নিয়ে গেল।
ঘরে যেতেই রায়ান নিজের কোল থেকে মিরাকে বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে নিজেও বিছানার উপরে উঠলো। মিরা নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলো, রায়ানের চোখে এক অন্য রকমের চাহুনি ঠিক সেই বৃষ্টির রাতের মতো। মিরা সেই রাতের কথা চিন্তা করে ভয় পাচ্ছিল, রায়ানের সেই রূপ তার জন্য যেমন সুখের ঠিক তেমন যন্ত্রণার ছিল। মিরা রায়ানকে কিছু বলার আগেই রায়ান মিরার উপর নিজের শরীরের ভার ছেঁড়ে দিয়ে মিরার ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো। মিরা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু এতে কোনো বারই লাভ হয় নি তার উল্টো নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রায়ান হঠাৎ মিরার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলো-
“দুপুরে ঘুমাতে বলেছিলাম। ঘুমিয়ে ছিলে?”
মিরা পুনরায় প্রাণ ফিরে পাওয়ার মতো হাপাচ্ছে আর ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। কিছু বলতেও পারছে না। রায়ান পুনরায় একই প্রশ্ন করলো অধৈর্য হয়ে –
“আমি জিজ্ঞেস করছি কিছু। আমি বলেছিলাম দুপুরে ঘুমিয়ে নিতে। ঘুমিয়েছিলে?”
মিরা দ্রুত গতিতে মাথা উপর নিচ করে জবাব দিল-“হুম..!”
– “good girl…”
রায়ান উঠে বসে নিজের পড়নের শার্টের বোতাম খুলে শার্টটা ও খুলে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে আবারো মিরার কাছে ফিরে গিয়ে মিরার গলায় মুখ ডুবালে মিরা আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো-
“কিন্তু কেন?”
রায়ান মিরার কানের লতিতে ছোট চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“যদি দুপুরে না ঘুমাতে তাহলে গোটা রাত তোমাকে জাগিয়ে রাখতে আমার মায়া লাগত। এখন নিশ্চিত থাকবো।”
মিরা রায়ানের কথায় আশ্চর্য হয়ে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান মিরার কপালে চুমু খেয়ে বলল-
“Don’t worry..I will be gentle today..”
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৯
মিরা নিজের চোখ জোরা বন্ধ করে নিয়ে নিজেকে আবারো এক স্মরণীয় রাতের জন্য সঁপে দিল তার ভালোবাসার পুরুষটির কাছে। রায়ান আজ বড্ড যত্ন করে আদর করলো তার হৃদপাখিকে। মিরা একবারের জন্যও ব্যাথায় কাঁদে নি হয়তো সুখেই কেঁদেছে। রায়ানকে জড়িয়ে থাকায় সেটুকু ও তার জন্য আনন্দের ছিল। আজ কোনো বেদনা ছিলনা রাত টুকু তে শুধুই ভালোবাসায় পরিপূর্ণ দুটো মানব দেহ একে অপরকে আপন করেছে।

Apu porer parte den nah kno