Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২১

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২১

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২১
কায়নাত খান কবিতা

প্রায় দু-দিন পর আস্তে আস্তে চোখ মেলতে থাকে অরিন।হাসপাতালের সাদা কেবিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু বাতাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তার। দু-দিন সে এভাবেই কেবিনে জ্ঞানহীন অবস্থায় পরে ছিলো।
দুদিন পর যখন অরিন চোখ মেলে তাকায় , তার নিঃশ্বাস অব্দি ভারি হয়ে যায়, মনে হয় সারা শরীর কেউ পাথর দিয়ে পিষে দিয়েছে তার। বিশেষ করে পায়ের দিকটা যেন অবশ হয়ে আছে। ব্যান্ডেজের নিচ দিয়ে অসহ্য ব্যথাটা মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করছে।

নিজের এতো করুন দশা দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে অরিনের । পরক্ষণেই তীব্র দূরগন্ধ ভেসে আসে তার নাকে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পাই না অরিন। পরক্ষণেই ফোনের রিংটোনের শব্দ পাই অরিন। মাথা হালকা উচুঁ করে বেলকনির দিকে তাকায়। চাইনিজ প্রাইভেট কেবিনে বেলকনি থাকলে ও সেখানে ধুম’পান এলাও নয়। জেল জরিমানা ও হয় ধুম’পান করলে। সেখানে তার কেবিনে ধুম’পান।

বেশ অনেকটা শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যায় অরিন, দু-দিন অজ্ঞান থাকার ফলে পুরো শরীর অবস হয়ে এসেছে তার। একটু একটু করে বেডে ভর দিয়ে উঠে দাড়ায় অরিন, উঁকি মে’রে বেলকনির পানে তাকায়।
থাই গ্লাসে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে কেউ একজন আপন মনে সিগা’রের ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে উপরে। লোকটার চওড়া পিঠ আর দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে অরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। আবছা আবছা গ্লাস ভেদ করে কিংশুকের ছায়া মূর্তির দর্শন পায় অরিন। কিংশুককে দেখা মাত্র অরিনের নিঃশ্বাস ভারি ভয়ে আসে।
যার থেকে তিনটি বছর পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে সে, নিয়তি আজ তারই সম্মুখীন করেছে অরিনকে।
এদিক ওদিক তাকিয়ে দরজা খুঁজতে থাকে অরিন। কিংশুকের থেকে পালানোর আর কোনো সুযোগ পাবে না সে। একবার বন্দী হলে সারাজীবনের জন্য কয়েদি।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে পা টিপে টিপে দরজার কাছে চলে আসে সে। কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে দরজা খুলতে থাকে সে। কিন্তু পারে না। দরজাটা এতোটাই শক্ত অরিন শক্তি লাগিয়ে ও পারে না। এভাবে বেশ কয়েকবার দরজার খোলার চেষ্টা চালিয়ে যায় সে। কিন্তু প্রতিবারেই ফলাফল শূন্য।

—– নিড মাই হেল্প জান?’’
কথায় আছে না? যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। অরিনের ক্ষেত্রে এই বাক্যটি অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় সব সময়।
দরজায় থাকা অরিনের হাতের উপরে নিজের হাত রাখে কিংশুক। বৈদ্যুৎতিক গতিতে চমকে উঠে অরিন। নিঃশ্বাস প্রতিনিয়ত ভারি হতে থাকে তার। তল পেটে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই পাথরের মতো জমে যায় সে।
—– এতো পালাও কেন জান? আমি কি তোমাকে মে’রে ফেলবো?’’
—- আপনার সাথে থাকার চাইতে ম’রে যাওয়া ভালো কিং।’’
— ওকে মরো তাহলে।’’
তড়িৎ গতিতে অরিনকে ঘুরিয়ে কোলে তুলে নেয় কিংশুক। দরজা খুলে হনহনিয়ে বাইরে যেতে থাকে সে।
—- কিং কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? নামান প্লিজ। “
— তুমিই না বললে, আমার সাথে থাকার চাইতে মরে যাওয়া ভালো। এখন মরো।’’
—- নো। কিং প্লিজ স্টপ। ‘’

খুব জোড়ে জোড়ে কিংশুকের বুকে পিঠে মা’রতে থাকে অরিনকে।যদি এই সুযোগে কিংশুক তাকে নামায়। কিন্তু নাহ। কিংশুক তার উদ্দেশ্যে অনড়। সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই হাটতে থাকে। অরিনের কোনো জোড়াজুড়ি কাজে দেয় না।
চায়নার সব থেকে বড় হসপিটাল হোয়াং চুর এর ২৩ তলা সাদের উপরে চলে যায় কিংশুক অরিনকে নিয়ে। ভয়ে রীতিমতো হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে অরিনের। কান্নার চোটে চোখে ও ঝাপসা দেখতে শুরু করে সে।
—– তো জান? কোন সাইট থেকে ফেলবো তোমাকে? চয়েস ইজ ইউর’স।’’
ভয়ে অরিনের মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না। ২৩ তলা থেকে ফেললে তো তার হাড়ের ও খোঁজ পাওয়া যাবে না। এবং কিংশুক যতটা সাই’কো তার দ্বারা সবই সম্ভব।

—- আপনি কি সত্যি আমাকে ফেলে দিবেন? ‘’
— মিথ্যা মিথ্যি তো ফেলা যায় না, তাই সত্যি সত্যিই ফেলতে হবে।’’
—- আমি কি করে…!’’
—- আমার জীবন বরবাদ। ‘’
বাজ পাখির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিংশুক অরিনের দিকে। চোয়াল প্রচন্ড শক্ত তার। রাগের পারদ ঠিক কতটা সেটা পরিমাপ করা যাবে না।
—- আমার মুক্তি চাই কিং।’’
—-মুক্তি?’’
কিংশুক অট্টহাসি দিয়ে উঠে।তার এই হাসি অরিনের ভয়টাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।

—আমার ডিকশনারিতে মুক্তি বলে কোনো শব্দ নেই জান। হয় থাকো, না-হয় মর।’’
— না থাকলে কি জোড় করবেন কিং?’’
—- নাহ। মে’রে ফেলবো।’’
কিংশুক সুন্দর মতো অরিনকে নিয়ে ছাদের একদম শেষ সীমানায় চলে যায়।
— কিং পরে যাবো। প্লিজ নামান।’’
— ভালো থেকো জান।’’
— নাহ। নাহ। কিং প্লিজ।নাহ।’’
কিংশুক অরিনকে ছাদের শেষ সীমানায় নিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর অরিনের কপালে খুব শক্ত পোক্ত করে চু’মু খায় ।

— গুড বাই বেবি গার্ল। ‘’
— কিং নাহহহ।’’
— দু-হাতে ভর দিয়ে ছাদের রেলিং ধরে ঝুলতে থাকে অরিন। নিচে তাকানোর মতো সাহস টুকু নেই তার। খুব জোড়ে জোড়ে চিৎকার করতে থাকে সে। কিন্তু কেউ আসে না তাকে সাহায্য করতে।
তার ঠিক সামনে চেয়ার নিয়ে পায়ের উপরে পা তুলে বসে থেকে সিগা’র টানতে থাকে কিংশুক। মৃত্যুর মুখে দাড়িয়ে অরিন যেখানে ছটফট করতে থাকে। ঠিক অপর প্রান্তে তাকে ২৩ তলার ছাদ থেকে ঝুলতে দেখে আরামে সি’গার টানতে থাকে কিংশুক। যেনো কোনো কিছু যায়ই আসে না তার।
কাঁদতে কাঁদতে অরিনের অবস্থা প্রায় করুন। হাতের ও শক্তি কমে আসছে তার। এভাবে আর কিছু দিন থাকলে সে নীর ঘাত মা-রা যাবে। তার ডাকে ও কেউ আসছে না। এই মুহুর্তে নিজের থেকে বেশি অসহায় কাউকে লাগছে না অরিনের কাছে। তার উপরে কিংশুকের এতো চিন্তা হীন ভাব।

— আর কতক্ষণ ঝুলে থাকবে জান? জলদি পড়ো। তোমাকে মাটি দিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে আমার।’’
শরীরের পশম দাঁড়িয়ে পরে অরিনের। কতটা সহজ ভাবে বলছে সে। যেনো মৃত্যুটা খুব সহজ।
— আমি থাকবো আপনার সাথে।’’
— শুনতে পাই নি।’’
— আমি থাকবো আপনার সাথে কিং।’’
চেয়ার থেকে উঠে শরীরে আড়মোড়া দেয় কিংশুক। তারপর ধীরে ধীরে অরিনের দিকে আসতে থাকে।
অরিনের কাছে এসে ফ্লোরে বসে পরে কিংশুক।পকেট থেকে একটা কাগজ এবং কলম বের করে অরিনের সামনে ধরে কিংশুক।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২০

—- সাইন ইট জান।’’
— আমি ঝুলে আছি কিং।’’
কিংশুক অরিনের এক হাত খুব শক্ত করে ধরে। এবং আরেক হাত দিয়ে তাকে পেপারস এ সাইন করে দেয়।
অরিন ও কোনো তর্ক না করে কোনো রকম করে সাইন করতে থাকে কাগজ গুলোতে।সাইন শেষে কিংশুক আবার ও অরিনের হাত রেলিং এ ধরিয়ে দেয়।
— ঝুলন্ত বিয়ে ডান্’’

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২২