আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩
কায়নাত খান কবিতা
রাত তখন ১১ টা ২৩ মিনিট!
খান ম্যানশনে কিংশুক এসেছে সেই সকাল বেলা! আসার পর থেকে তার ব্যাকুল চোখ জোড়া খুঁজে চলেছে শুধু অরিনকে! কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে সন্ধা, সন্ধা গড়িয়ে রাত! অরিনের আর দেখা নেই!
যার দহনে গত তিনটি বছর ধরে নিজেকে জ্বা’লিয়ে_পু’ড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে, তাকে পেয়ে ও যে আর পাওয়া হলো না তার! মন ভরে দেখতে পেলো না তাকে!
কিংশুক বারান্দায় চলে যায়! আর বার বার অরিনের বারান্দার দিকে তাকায়! বাতাসে যেন অরিনের ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছে কিংশুকের!
কিংশুক চোখ বন্ধ করে ফেলে!
” তোর দহনে পুড়ছি আমি, আমার দহনে তুই,
হাত বাড়িয়ে না পারলে ও, মন বাড়িয়ে ছুঁই! ”
কিংশুকের ভিতরটা মরুভূমির মতো খা খা করে উঠে! সারাদিনে অরিনের সব ইনফরমেশন কালেক্ট করা শেষ তার! এ বছর এইচএসসি দিয়েছে সে! এখন রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে! বয়স ও ১৮ বছর ৪ মাস! একদম বিয়ের উপযুক্ত!!
কিংশুক ঠিক করে প্রেম নয়! পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবে! নিজের ঘরের বউ করে নিয়ে যাবে অরিনকে! কিন্তু অরিন যদি না মানে??
ঘাড়টা হালকা বাকিয়ে আবার ও অরিনের বারান্দার দিকে তাকায় কিংশুক!!
” আই হোপ ইউ ওয়েল একসেপ্ট মি! আদার ওয়েস, ইউ হ্যাভ টু ডায় বেবি গার্ল!”
কিংশুকের ভাবনার অবসান ঘটিয়ে খান ম্যানশনের প্রধান ফটক দিয়ে একটি বাইক আসতে থাকে! খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে কিংশুক! কারণ বাইকে তার প্রাণ প্রিয় প্রেয়সী বসা! কিন্তু সাথে এটা কে? কার কোমড় জড়িয়ে ধরেছে অরিন! ললাটে চিন্তার ভাজ পড়ে কিংশুকের! তিন বছর পর এতো কাছে পেয়ে ও কী সে হারাবে অরিনকে?
চোয়াল শক্ত করে হন্তদন্ত হয়ে হল রুমের দিকে যেতে থাকে কিংশুক! সাথে তার লাই’সেন্স ধারি রিভল’বারটি নিয়ে নেয়!
নিচে নামতেই এক অজানা শান্তি কাজ করে কিংশুকের মাঝে! মনে জলন্ত আগু’ন অচিরেই তলিয়ে যায়! এক ঠান্ডা শীতল হাওয়া বয়ে চলে কিংশুকের হৃদয় জুড়ে!
” ব্রোওওওওও!”’
হাত বাড়িয়ে কিংশুকের দিকে ছুটে আসতে থাকে ক্যাট! কিংশুক ও নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়! খুব শক্ত করে ধরে ক্যাট কিংশুককে! প্রায় তিনবছর পর সামনাসামনি দেখলো তার ভাইকে! ক্যাট অনেক কিছু বলতে থাকে কিংশুককে! কিন্তু তার ধ্যান ছিলো অরিনের দিকে! ভয়ে উল্টো দিক হয়ে দাড়িয়ে আছে অরিন! ড্রেসের দু’পাশে আকড়ে ধরা শক্ত হাত দুটো দেখলেই যে কেউ বলে দিবে অরিন ভয়ে আছে! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিংশুক অরিনের দিকে! তার সুক্ষ্য নজর দেখলে যে কেউ বলে দিবে তার মনে কী চলছে! অরিনের শরীরে প্রতিটি ভাজ যেনো সে পরখ করছে! কিছু ক্ষণ পর হয়তো তার মাথায় কয়টা চুল আছে সেটা ও বলে দিতে পারবে!
” লা ইলা হা ইল্লা আনতা সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজ যলিমিন! আল্লাহ মাবুদ এবারের মতো এই রাক্ষসের হাত থেকে বাচিয়ে নেন! কাল থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বো! আল্লাহ প্লিজ সেভ মি!”
মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকতে অরিন! এখন একমাত্র আল্লাহই পারবে তাকে এই বদজাত রাক্ষসের থেকে বাঁচাতে! সকালে অরিন কিংশুককে এতো জোরে কষিয়ে চ’ড় মারলো অরিন, এটার বদলা কী কিংশুক নিবে না? এতো সহজে ছেড়ে দিবে তাকে? খুব ভয়ে থাকে অরিন! শরীরে অস্বাভাবিক কম্পন শুরু হয়!
” অরিন?”
বাইকারের ডাকে শুঁকনো ঢোক গিলে অরিন! না পাড়তে ও পিছনে ফিরতে হয় তাকে! পিছনে ফিরতেই তার ভয় বেড়ে যায়! কিংশুক হাত ভাজ করে সটাম হয়ে দাড়িয়ে আছে! মনে হচ্ছে কাছে গেলেই অরিনের গাল লাল করে দিবে!
” কাম! ”
ক্যাট ইশারা করে অরিনকে তাদের কাছে যাওয়ার জন্য! অরিন ভয়ে ভয়ে যেতে থাকে! নিজের হাত প্রস্তুত রাখে! কিংশুক মা’রতে আসলেই গা’লে হাত দিয়ে ফেলবে! তাহলে আর ব্যাথা পাবে না!
কাছে যেতেই ক্যাটরিনা অরিনের বাহু ধরে কিংশুকের সামনে দাড় করায়!
” ব্রো.. মিট মাই লাভ! মাই গার্ল! মাই বেবি! ”
কিংশুক ভ্রু কুঁচকে তাকায় অরিনের দিকে! অরিন মাথা নিচু করে রাখে! আর মনে মনে দোয়া পড়তে থাকে!
” অরিনন!”
ক্যাটরিনা চোখ দিয়ে ইশারা করে অরিনকে কিংশুককে সালাম দেওয়ার জন্য! কিন্তু অরিনের মনে চলছে অন্য কিছু! তাও ভয়ে ভয়ে সালাম দিয়েই ফেলে!
” আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল!”
” ওহহ! ইম্পর্ট্যান্ট কল!”
অরিন সালাম দিতে দেরি, ক্যাটরিনার ফোন আসতে দেরি নয়! তাড়াতাড়ি করে দূরে চলে যায়! ক্যাটরিনা যেতেই কিংশুক নিজের টিশার্টের হাতা উপরে উঠাতে থাকে! ভয়ে শেষ হয়ে যায় অরিন!
” বাইকাররর!”
কিংশুককের হাতা উপরে উঠাতে দেখে দৌড়ে পালিয়ে যায় অরিন ক্যাটের কাছে! কিংশুকের মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটে উঠে! মেয়েটা আসলেই একটা বাদর!
” ওয়াট হ্যাপেন্ড? ”
” আঙ্কেল মারবে!”
অরিনের মুখে হঠাৎ মা’র খাওয়ার কথা শুনে চোখ কপালে উঠে ক্যাটের! কারণ কিংশুক যাকে মারবে সে দুনিয়াতে থাকবে না এটা ১০০% সিউর! কিন্তু অরিনকে কেন মারবে?? কপাল কুঁচকে তাকায় কিংশুকের দিকে!!
” ব্রোওওও!! আর ইউ গোয়িং টু হিট মাই গার্ল?”
” প্রশ্নই আসে না!”
কিংশুক ভাবহীন ভাবে দাড়িয়ে থাকে! যেনো এই বিষয়ে সে কিছুই জানে না!!
ক্যাটরিনা নিজের পিছনে লুকায়িত অরিনের দিকে তাকায়! সে তাকে জাপ্টে ধরে আছে!!
” তাহলে ও বললো কেন তুমি মা’রবে?”
” আই ডোন্ট নো! আক্স হার!”
ক্যাটরিনা অরিনের বাহু ধরে সামনে নিয়ে আসে!
“” র্নিভয়ে বলো কী হয়েছে! ”
অরিন আড় চোখে কিংশুকের দিকে তাকায়! অরিন তাকানোর সাথে সাথে কিংশুক চোখ শক্ত করে ফেলে!আমতা আমতা করে অরিন জানায়!
” সকালে তোমার ভাইকে কষিয়ে একটা চ’ড় মেরে”ছিলাম! উনি ওটার বদলা নেওয়ার জন্য টিশার্টের হাতা উপরে তুলেছিলো!”
ক্যাটরিনা অবাক হয়ে তাকায় কিংশুকের দিকে! অরিন তাকে চ’ড় মার’লো আর কিংশুক কিছু বললো না! এটা তো অবিশ্বাস্য! অরিনের হাত যে এখনো আস্ত আছে এটাই তার সোভাগ্য!
” কেন মেরেছিল”
” উনি মেরে’ছিলো আগে!”
ক্যাটরিনা কিছু বুঝতে পারে না! আজকেই তো তাদের দেখা হলো! আবার আজকেই চ’ড় থাপ্প’ড়!!
ক্যাট কি বলবে কিছু বুঝতে পারে না! কার পক্ষ নিবো! কাকে ডিফেন্ড করবে কিছুই তার মাথায় আসে না! সব কেমন গন্ডগোল লাগে তার!
ক্যাটরিনা কিছু বলতে বলতে যাবে, তার আগেই কিংশুক উপরে চলে যেতে থাকে!
কিংশুক চলে যাওয়াতে বড় বাঁচা বেঁচে যায় অরিন! সে ও বাইকার যে যার রুমে চলে যায়! অরিন রুমে যাওয়ার পর নিজের বেলকনির দরজা ভালো ভাবে লাগিয়ে দেয়! কারণ পাশের মাস্টার বেড রুম কিংশুকের! বারান্দা দিয়ে তো আসা যাওয়া করা যায়! অরিন কতো গেছে কিংশুকের বারান্দায় নিজের বারান্দা দিয়ে! তার বেলকনির ভিউ অনেক সুন্দর! অরিন যখনই ছবি তুলতো, কিংশুকের বেলকনিতে যেতো!
কিন্তু এখন থেকে আর যাওয়া যাবে না! রাক্ষস আছে যে!
—রাত তখন ২:৪৭ মিনিট!
নেটফ্লিক্স দেখতে দেখতে প্রচন্ড খিদে পায় অরিনের! ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে গভীর রাত! এতো রাতে তো মনিকে ডাকা যাবে না! এমনিতে ও আজকে যেই তাড়ানি দিয়েছিলো! সামনে পড়লে চ্যালাকাঠ তার পিঠেই ভাঙ্গবে!
চুপচাপ নিচে নেমে কিচেনে চলে যায় অরিন! চিপস, কোক, চকলেট, কুকিচ নিতে! আপাতত এসব দিয়েই তার খিদে মিটবে! পিৎজা ওর্ডার দিলে খিদে বেড়ে দ্বিগুন! তাই সাইড ডিসই ঠিক আছে!!
কিচেনে এসে খাবার খুঁজতে থাকে অরিন! কোথাও না পেয়ে বুঝে যায় মনি এবার ও সব সেল্ফে রেখেছে! কারণ রাতে এসব খাওয়ার জন্য তার পেটে প্রচন্ড সমস্যা হয়!
সেল্ফের সামনে দাড়িয়ে বেশ অনেকবার নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায় অরিন! কিন্তু ফলাফল শূন্য! তার থেকে সেল্ফ অধিক উপরে হওয়ায় সে বার বার অসফল হয় চিপস, চকলেট নিতে!
এভাবে কিছু ক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পর তার পিছন হতে আরেকটি হাত এসে চিপস চকলেট কুকিচ নামিয়ে দিতে থাকে! প্রচন্ড খুশি হয়ে যায় অরিন! এতো রাতে তার বাইকার ছাড়া আর কে আসবে?
চিপস, চকলেট হাতে পেতেই খুশিতে আত্মাহারা হয়ে পিছনে ঘুরতেই ভয়ে সব কিছু ফ্লোরে পড়ে যায় তার!
কিংশুক অরিনের খুব কাছে দাড়িয়ে! সে চাইলে ও পালাতে পারবে না! প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায় অরিন! কিংশুক ও কিছু বলে না অরিনকে! চুপচাপ তার সামনে দাড়িয়ে থাকে! অরিন ও কিংশুকের সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে! এভাবে প্রায় বেশ কিছু ক্ষণ অতিবাহিত হয়!!
” মেরেছি তোমাকে?”
হুট করে কিংশুকের মুখে এমন কথা শুনে একটু চমকে উঠে অরিন! আস্তে আস্তে বলে!
” নাহ!”
” তাহলে ভয় পাচ্ছো কেন? ”
অরিন নিজের হাত মুচরা মুচরি করতে করতে বলে!
” সকালে আপনাকে চ’ড় মেরেছিলাম যে তাই!”
কিংশুক মাথা নিচু করে নিজের মুখ অরিনের মুখ বরাবর নিয়ে যায়! হঠাৎ করে কিংশুক এতোটা কাছে আসায় বুক কেঁপে উঠে অরিনের!
” তুমি চাইলে আমাকে খু’ন ও করতে পারো! I Won’t mind!”
চোখ বড় বড় করে তাকায় অরিন কিংশুকের দিকে! সে তাকে খুন করলে ও কিংশুক কিছু বলবে না?
অরিনের গালে টোকা দিয়ে সব চিপস চকলেট ফ্লোর থেকে তুলে অরিনের হাতে দিয়ে দেয়! তারপর সামনের দিকে যেতে থাকে! হয়তো সে ও কিচেনে কিছু একটা নিতে এসেছিলো! এখন সেটায় নিবে হয়তো!
” টিকিট কাটা হয়ে গেছে? ”
অরিনের হঠাৎ টিকিট কাটার কথা শুনে পিছনে ফিরে তাকায় কিংশুক!
” কীসের টিকিট?”
” কেন পাবনার! ”
” ওয়াট?”
” আপনার তো পাবনায় থাকার কথা! লন্ডনে এতোদিন কি করছিলেন?”
অরিনের এম বোকা বোকা কথা শুনে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটে উঠে কিংশুকের মুখে!
” দুটো টিকিট কাটি?”
” দুটো কেন?”
” আমি একা গিয়ে কী করবো! তুমি ও সাথে চলো! কাম্পানি দিবে আমাকে!”
” আমি কী পাগল না-কি! আপনি পাগল আপনি যান”
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২
কথাটি বলেই অরিন কিচেন ত্যাগ করে! কিংশুক তাকে বললো সে কিংশুককে খু’ন করলে ও কিছু বলবে না! এটা তো পাগলের লক্ষণ! অরিন কিংশুককে পাগল বলে হনহনিয়ে নিজের রুমে চলে আসে! কারণ নিচে থাকলেই বিপদ!
কিংশুক তখন ও কিচেনেই থাকে! এক দৃষ্টিতে অরিনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে!
” তোমার উচিত হয়নি আমার চোখে পড়া মেয়ে! ”
