Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪১

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪১

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪১
কায়নাত খান কবিতা

চোখের পাতা ধীরে ধীরে উঠতেই অরিন বুঝতে পার সে হাসপাতালে।সাদা সিলিং,জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ, আর চারপাশের অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে।শরীর যেন পাথরের মতো ভারী। দৃষ্টি এখনো ঝাপসা, আলোটা কেমন যেন কাঁপছে চোখের সামনে। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে চারদিকে তাকায়।
ফাঁকা কক্ষ, তার মনি বাইকার, মা কেউ নেয় আশেপাশে। কোনো শব্দ নেই।শুধু মেশিনের ক্ষীণ টিকটিক আওয়াজ ব্যতীত।

মাথার ভেতর স্মৃতিগুলো এলোমেলোভাবে ভিড় করতে শুরু করে।কী হয়েছিল তার সাথে ?হঠাৎই মনে পড়ল
কিংশুকের কথা।তার শক্ত, অধিকারী হাত অরিনের কোমর জড়িয়ে ধরে রেখে ছিলো। শ্বাস নেওয়াটা ও যেন কঠিন হয়ে উঠেছিলো সেই আঁকড়ে ধরা স্পর্শে।তারপর একটি গু’লির শব্দ কানে আসলো।।মুহূর্তটুকু যেন সময় থেমে গিয়েছিল।
অরিন অনুভব করেছিল নিজের হাতে উষ্ণ, ভেজা কিছু তরলের ন্যায় কিছু।পরক্ষণেই সব অন্ধকার হয়ে আসে তার সামনে। স্মৃতি সেখানেই থেমে যায় ।গুলির শব্দ…আর নিজের হাত ভেজা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি মনে পড়তেই হঠাৎ কেঁপে উঠে অরিন।ধীরে ধীরে নিজের হাতের দিকে তাকায়।শুষ্ক, অক্ষত,তাহলে?
প্রশ্নটা মাথার ভেতর বজ্রপাতের মতো আঘাত করতেই অরিনের শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারি হয়ে আসে।

হঠাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ। ধীর, মেপে রাখা পদক্ষেপ।অরিনের শরীর অজান্তেই শক্ত হয়ে যায়, তবে কী কিং রয়েছে এখানে? অরিন এখনো মুক্ত নয়।
রুমের দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ উঠতেই, সেদিকে চমকে তাকায় অরিন । সে কী তবে আবার ও কিংশুকের নাগালে। অরিনকে ভুল প্রমাণিত করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে তিনজন বাইকা, তার পেছনে মনি, আর অরিনের মা।
তারা তিনজন এসে অরিনের চারপাশে গোল হয়ে দাড়ায়। আতিয়া বেগম অরিনের মাথায় হাত রেখে বলে
—এখন কেমন আছিস?”
অরিনের চোখে তখনও বিস্ময়ের ছাপ।সে ধীরে বলে,
আমি এখানে ?”
—তোমার হাতে তাজা রক্ত ছিলো বাচ্চা। আমি এসে দেখি তুমি ফ্লোরে পড়ে ছিলে, সেখান থেকে হসপিটালে আনি”
বাইকারের কথা শুনতেই অরিন নিজের হাত সামনে মেলে ধরে।
— আমার তো কিছু হয়নি বাইকা। তবে রক্ত কোথা থেকে এলো?”
—ডাক্তার পরীক্ষা করেছে। তোর হাতে রক্ত ছিল ঠিকই… কিন্তু তোর শরীরে কোথাও আঘাত নাই। এক ফোঁটা কাটাও না।”

ঘরের বাতাস যেন জমাট বেঁধে যায়। তার মনে পড়ে কিংশুক রিভ’লবার বের করেছিলো এবং তার বাহুতে ও চেপে ধরে ছিলো। তারপর একটা শব্দ, অরিনের চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে।
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই অরিনের বালিশের পাশে রাখা ফোনটা হালকা কেঁপে উঠে। হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজতে লাগল অরিনের। ধীরে ফোনটা হাতে তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখে WhatsApp Notification তাও কিংশুকের থেকে।
অরিনের কপালে ঘামের বিন্দু কনা গুলো জমতে শুরু করে। সে তো কিংশুককে সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছিলো। তাহলে কীভাবে কিংশুক টেক্সট পাঠালো। অরিনের এমন ঘাবড়ে যাওয়া দেখে উপস্থিত সকলের মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। আইরিন বেগম অরিনের হাত চেপে ধরে, কী হয়েছে বুঝে ওঠার জন্য। অরিন ফোন তার সামনে ধরে। আইরিন বেগম ফোনটি হাতে নিয়ে দেখে কিংশুকের নোটিফিকেশন। অপেন করে দেখে দুই লাইনের একটি টেক্সট।

—Fake রক্ত original রক্তে পরিণত হতে বেশিদিন সময় লাগবে না।”
অরিনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়ে আসে।দু-চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে। কিংশুক নামক অভিশাপটি তার জীবন থেকে যায়নি। অরিনের এমন বিচলতা দেখে উপস্থিত তিনজন তাকে শান্তনা দেওয়া শুরু করে। তারা থাকতে কোনো ভয় নেই। সে সেময়ই সমস্ত ফর্মালিটি পূরণ করে অরিনকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে।
বাড়ি ফেরার পর থেকে প্রতিটা কোণ সন্দেহজনক লাগে অরিনের কাছে।জানালার বাইরে হালকা শব্দ হলেই অরিন চমকে ওঠে। রাতে ঘুম আসে না। সব সময় তার মনে কিংশুকের ভয় জেগে বসে।
এভাবেই দু’দিন আতঙ্কে কেটে যায় অরিনের। অরিন ভেবেছিলো হয়তো সে এবার থেকে শান্তিরপূর্ন জীবন কাটাতে পারবে। বাড়ি থেকে আর বের ও হবে না। চার দেয়ালের মাঝে থেকে যদি নিরাপদ থাকা যায়, তবে সে তাই করবে। থাকবে সে চার দেয়ালের মাঝে,খান ম্যানশনে বন্দী।কিন্তু অরিনের এই মুক্ত চিন্তারা ও যেন তাকে ধোকা দিয়ে ওঠে। হুট করে তাকে জানায় হয় রাজের সাথে তার বিয়ে হবে এই শুক্রবারে।

রাজের নাম শুনতেই তার বুক কেঁপে ওঠে সেদিনের কথা ভেবে। কিংশুক যখন তার শরীর থেকে সমস্ত কাপড় খু’লে পুরো শরী’রটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেক করেছিলো। কতটা অস্বস্তি লেগেছিলো তার।আবার সেই রাজের সাথেই বিয়ে। ভয় এবং আতঙ্ক গ্রাস করে ফেলে অরিনের শেষ শান্তি টুকু ও। কিন্তু পরিবারের জোড়াজুড়িতে আর না পেরে রাজি হতে হয় তাকে। তার থেকে শুরু হয় বিয়ের তোড়জোড়। বিয়ের সমস্ত কিছু অনলাইনে কিনলে ও বাইকার এবং সাথি, পুষ্প, মুনিয়া ঠিক করে লেহেঙ্গা কিনবে মল থেকে।দেখে সব লেটিস ক্যালেকশন গুলো। যেই ভাবা সেই কাজ। পর্যাপ্ত বডিগার্ড নিয়ে বেরিয়ে পরে তারা শপিং মলের উদ্দেশ্যে।
মলে গিয়ে যা যার মতো ড্রেস দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ফাঁক দিয়ে অরিন একটি লাল লেহেঙ্গা নিয়ে ট্রায়াল রুমে চলে যায়। বাকিরা যে যার মতো ক্যালেকশন দেখতে ব্যস্ত। এবার জমিয়ে আনন্দ করবে সবাই অরিনের বিয়েতে।
দরজা বন্ধ করে ভেতরে নরম আলোয় বড় আয়না সামনে ধীরে ধীরে ড্রেস বদলাতে শুরু করে অরিন। পড়নের টপস টি পেট অব্দি উপরে তুলতেই, অরিনের কানের কাছে খুব পরিচিত, ভারী, মৃদু স্বর ভেসে উঠে,

—ইউ লুক ড্যাম হ’ট জান।”
তড়িৎ গতিতে অরিন তাকায় আয়নার পানে। কিংশুক হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে থাকে তার পানে। তাকে দেখার সাথে সাথে কলিজার সমস্ত পানি টুকু যেন শুকিয়ে আসে।
—কি..কিং।”
ভয়ে ঘুড়ে তাকায় অরিন কিংশুকের পানে।চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।
কিংশুক এসে সোজা অরিনের সামনে দাড়ায়। অরিন ভয়ে হাতে থাকা লেহেঙ্গাটি চেপে ধরে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে তার। কিংশুক এক হাত পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাত অরিনের মাথার ওপরে রাখে। তার পুরো শরীরের ভার দিয়ে চেপে ধরে অরিনকে।ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে অরিন।

— তোমার র’ক্তের রং ও কিন্তু লাল জান।”
ভয়ে চোখ বড় করে করে তালায় অরিন কিংশুকের দিকে। কিংশুক পটেক থেকে ফোন বের করে মিররের সামনে ধরে একটি মিরর সেলফি নেয়। অরিন কিছু বুঝে উঠতে পারে না, কিংশুক চাইছে টা কী।
— তোমাকে মুক্ত বাতাসে উড়তে দিলে ও, পায়ে কিন্তু সেকল পড়িয়ে রেখেছি।”
অরিনের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। কিংশুকের সমস্ত শ্বাস-প্রশ্বাস অনুভব করতে পারে সে। তাদের মাঝে আর এক চুল পরিমাণের দূরত্ব অবশিষ্ট নেই।

— আমি..আমি মুক্তি..!”
—পাবে নাহ। ডোন্ট ট্রাই।”
চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে অরিন। যেন এখনই মারা যাবে সে। পরক্ষণেই সাহস জুগিয়ে বলে ওঠে অরিন।
—আপনি কেন আমার…! ”
–বিয়ে কর আমাকে।”
—ম’রে যাবো, তবু ও বিয়ে আমি করবো না।”
–তাহলে মরতে হবে।”
–রাজি আছি। ”
আপনাকে নয় জান!”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪০

অরিনের চোখে এক বিস্ময় প্রকাশ পায়। তাকে নয় তবে কাকে?
— তবে?”
— আপনার পরিবারকে। আপনি তো আমার সোল মেট জান। how can i kill you?”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪২