আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৫০
কায়নাত খান কবিতা
“কিং এর অতীতের সাথে আমি কীভাবে জড়িত মনি?”
প্রশ্নটা শুনে আতিয়া বেগম থমকে যান। চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি। ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু শব্দ বের হয় না। কীভাবে বলবেন তিনি? এই মেয়েটার পুরো জীবনটাই যে এই ভয়ংকর অতীতের সাথে জড়িয়ে—এ বাড়িতে তার আসা, বড় হওয়া, এমনকি কিংশুকের সাথে তার বিয়ে—সবকিছুই সেই অন্ধকার অতীতের অংশ।
অরিন আবারও জিজ্ঞেস করে—
“মনি? বললে না তো?”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অবশেষে আতিয়া বেগম বলে ওঠেন—
“কিং এর বাবার পরকীয়া প্রেমিকা আর কেউ নয়… তোর নিজের মা… আইরিন ঝাউ।”
মুহূর্তেই যেন পৃথিবীটা থেমে যায় অরিনের জন্য।
তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে যায়, ঠোঁট শুকিয়ে আসে। মাথার ভেতর শুধু একটাই শব্দ ঘুরপাক খেতে থাকে— “মা?”
না… এটা হতে পারে না। তার মা এমন হতে পারে না।
কিন্তু আতিয়া বেগম থামেন না।
“কিংশুকের মা এবং তোর মা ছিলো বেস্ট ফ্রেন্ড। সেই সুত্রেই কিংশুকের বাবার সাথে তার পরিচয়। কিন্তু এই পরিচয় টা একটা নোংরা সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। কিংশুকের মা যেদিন জানতে পারে তার সব থেকে আপন লোকই তার পিঠে ছুরি মেরেছে। সে বিশ্বাস করতে চায়নি।’
প্রতিটা শব্দ যেন ছুরি হয়ে বিঁধতে থাকে অরিনের বুকে।
সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। পুরো শরীর কাঁপতে থাকে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তার নিজের মা—যাকে সে ভালোবাসতো, বিশ্বাস করতো—সে এমন একটা অতীত রেখে গেছে তার জন্য?
ক্যাটরিনা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে, শক্ত করে ধরে রাখে যেন সে ভেঙে না পড়ে পুরোপুরি।
অরিন কাঁদতে কাঁদতে বলে—
“বাইকার… তুমি তো আমাকে বিয়ের সময় পালাতে সাহায্য করেছিলে… তখন কেন কিছু বললে না? আর মনি… তুমি? তুমি তো সব জানতেই…”
ক্যাটরিনা চোখ নামিয়ে নেয়_ তোমার মায়ের মুখ পরিবর্তন হয়ে গেছে বাচ্চা। তাকে চিনতে পারিনি আমি। না-হলে নিজের মায়ের খু’নির সাথে তোমাকে কীভাবে যেতে দিতাম’
“তোর জন্য কিং সাইকো, এটা তো সত্যি… আর যায় হোক তোকে তো আমরা মরতে দিতে পারতাম না…”
অরিন হাহাকার করে ওঠে, _তার মানে, আমার মা খু’নি!”
অরিনের কান্না নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বুক ফেটে চিৎকার বের হতে চায়, কিন্তু শব্দ আটকে যায় গলায়। হঠাৎই বমি বমি লাগে। কোনোভাবে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিন ধরে বমি করতে থাকে সে।
শরীর কাঁপছে, চোখ দিয়ে পানি থামছে না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শক্ত একটা হাত তার পেট ধরে রাখে, আর বেসিনে পানি ছেড়ে দেয় কেউ। সেই স্পর্শে একটু স্থির হয় অরিন।
ধীরে ধীরে মাথা তুলে পেছনে তাকায় সে।
কিংশুক।
চোখ দুটো গভীর, তবুও শান্ত। যেন সবকিছু জানে, সবকিছু বুঝে—তবুও কিছুই বলে না।
এই মুহূর্তে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না অরিন। সে হঠাৎ করেই কিংশুককে জড়িয়ে ধরে, শক্ত করে।
“আমাকে ঘৃণা কেন করলেন না কিং?”
কিংশুক এক মুহূর্ত চুপ থাকে। তারপর খুব নরম, কিন্তু ভারী কণ্ঠে বলে,
“তুই ফুলের মতো পবিত্র বউ… তোকে ঘৃণা করা যায় না।”
এই একটা কথাতেই যেন অরিন ভেঙে পড়ে পুরোপুরি।
তার সব কষ্ট, সব লজ্জা, সব ভয়—একসাথে গলে গিয়ে চোখের পানিতে ঝরে পড়ে। পরক্ষনেই পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে অরিনের সামনে ধরে কিংশুক।
কিংশুকের হাত থেকে কাগজটা নিতে নিতে অরিনের আঙুল কেঁপে উঠে। বুকের ভেতর অজানা এক ভয়, এক অস্থিরতা ঘুরপাক খেতে থাকে ।
“আজ থেকে তুই মুক্ত বউ।”
শব্দগুলো কানে ঢুকলো, কিন্তু মনের ভেতর ঢুকলো না।অরিন হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকে কিংশুকের পানে।
“মানে?”
কিংশুক একদম শান্ত গলায় বলে,
“আমি আবার বিয়ে করছি।”
এই একটা বাক্য যেন বাজ পড়ে অরিনের মাথায়।
চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসে। সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগে।কিংশুক বিয়ে করছে? আর তাকে মুক্তি দিচ্ছে?
“কিং…”
“I’m divorcing you, Aurin.”
এইবার আর কোনো সন্দেহ থাকে না।সব সত্যি।
অরিনের বুকটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। এতকিছু পার করার পর, এত ভুল বোঝাবুঝির পর—এভাবেই সব শেষ?
“কিং, আমি…!”
কথাটা শেষ করতে পারে না সে।কিংশুক এগিয়ে এসে খুব আলতো করে অরিনের দু’গালে হাত রাখে। সেই স্পর্শে কোনো রাগ নেই, কোনো আগ্রাসন নেই—শুধু এক অদ্ভুত শান্তি।
তারপর মাথায় একটা চুমু খেয়ে বলে,
“ভালোবাসা মানে আটকে রাখা নয়, অরিন। সরি… তোকে এতদিন আটকে রেখেছি। আজ থেকে তুই মুক্ত। পেপারে আমি সাইন করেছি… তুই করে দিস। ভালো থাকিস, বউ।”
কিংশুক চলে যায়।কোনো নাটক নেই।কোনো চিৎকার নেই।কোনো অভিযোগ নেই।এই স্বাভাবিকতাই যেন সবচেয়ে অসহ্য লাগে।
অরিন ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে।চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারছে না—সে কাঁদছে কেন? রাগে? কষ্টে? না ভালোবাসায়?
সবকিছু মিলে এক ভয়ংকর শূন্যতা।দুদিন কেটে যায়।
এই দুদিনে অরিন যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
খাওয়া নেই, কথা নেই, শুধু নিঃশব্দে বেঁচে থাকা।
আর এদিকে কিংশুক এখনো খান বাড়িতেই থাকে।
কিন্তু একা না—তার সাথে আছে তার হবু বউ, লারা।
যদিও তারা আলাদা রুমে থাকে, তবুও সবসময় একসাথে বের হয়, একসাথে হাসে, একসাথে কথা বলে
এই দৃশ্যগুলো প্রতিটা মুহূর্তে অরিনের বুকটা ছিঁড়ে ফেলে।বাড়িতে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।
চারদিকে আলো, সাজসজ্জা, হাসি-আনন্দ।
কিন্তু সেই আনন্দের বাইরে, ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে অরিন। তার এমন শান্ত থাকা কিছু মানুষকে অশান্ত করে তোলে। আতিয়া বেগম, ক্যাটরিনা, পুষ্প, মুনিয়া তারা শত চেষ্টা করে ও অরিনকে স্বাভাবিক করতে পারে। এতো বার ফোন দেওয়ার পর ও যখন সে কারো সাথে যোগাযোগ করে না তখন সবাই মিলে ঠিক করে তার কী হয়েছে সেটা জেনেই ছাড়বে।
অরিনের ঘরের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠে।
আতিয়া বেগম, ক্যাটরিনা, পুষ্প আর সাথি—একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতে থাকে , এতো চুপচাপ ভাবে বসে রয়েছে সে। ফোন ও না টিপে।
আতিয়া বেগম সোজা অরিনের পাশে বসে কপালে হাত রাখে।
“একটা সত্যি করে বল তো অরিন, তোর কী হয়েছে? ডাক্তার ডাকবো?”
অরিন ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায় তার মনির দিকে। চোখে এমন এক শূন্যতা—যেটা কোনো শারীরিক অসুখ না, ভেতরের ভাঙনের চিহ্ন।
“মনের অসুখ… ডাক্তার কীভাবে ঠিক করবে মনি?”
কথাটা শুনে সবাই থমকে যায়।
“মানে”
তারপর হঠাৎই অরিন ভেঙে পড়ে। হুহু করে কাঁদতে শুরু করে। তার কান্নার আওয়াজ বাইরে অব্ধি চলে যায় । নিজেকে কিছুতেই সামাল দিতে পারে না অরিন। অরিনকে এভাবে কাঁদতে দেখে উপস্থিত সকলে মোটামুটি বোকা বনে যায়। কী হলো হঠাৎ করে এই মেয়ের।
“কাঁদছো কেন বাচ্চা ?”
“আম্মাজান, কী হয়েছে?”
সবাই একসাথে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
কিন্তু অরিন কাঁদতে কাঁদতেই বলে ওঠে
” কিং-কে অন্য কারো সাথে দেখে আমার ফেটে যাচ্ছে মনি।”
__কী ফেটে যাচ্ছে তোর?”
__মনননন।”
__এ্যা?”
আমি… আমি ভালোবেসে ফেলেছি মনি… খুব ভালোবেসে ফেলেছি…”
এই স্বীকারোক্তির সাথে সাথে অরিনের কান্না আরও বেড়ে যায়।
“কাকে?”—আতিয়া বেগম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন।
অরিন চোখ বন্ধ করে বলে—
কিং কে, i love him…”
মুহূর্তেই সবাই চুপ হয়ে যায়। এটা কী শুনলো তারা?
তারপর সকলে একসাথে বলে ওঠে
“কী???”
তাদের মুখে এমন এক এক্সপ্রেশন—যেন ভূত দেখেছে।
ক্যাটরিনা হেসে বলে—
“এত চড়-থাপ্পড়, লাথি খাওয়ার পরও শেষে আমার সেই ভিলেন ভাইকেই ভালোবাসলে?”
অরিন চোখের পানি মুছতে মুছতে আতিয়া বেগমের হাত চেপে ধরে—
“সরি মনি… আমি বুঝতেই পারিনি কখন ভালোবেসে ফেললাম…”
আতিয়া বেগম বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়েন,
“তোরা দুইজন আমাকে পাগল করে দিবি! এতদিন কিংশুক তোকে ভালোবাসতো, তুই পাত্তা দিলি না। আর এখন ও তোকে ছেড়ে দিচ্ছে—আর তুই প্রেমে পড়ে গেলি?”
অরিন হঠাৎ করেই বলে ওঠে—
__উনি যদি আমাকে ছেড়ে দেয়… আমি মরে যাবো…এতদিন বুঝিনি স্বামী কী, ভালোবাসা কী। তাই মর্যাদা দিতে পারিনি। আর এখন যখন বুঝেছি, তখন স্বামীটাই ছিনতাই হয়ে গেলো।”
পাশ থেকে সাথী বলে,
“কিন্তু অরিন, তোর কী মনে হয়? কিংশুক ভাই এত সহজে তোকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবে?”
অরিন অসহায় গলায় বলে__“বলেছে তো করবে…”
পুষ্প সাথে সাথে বলে ওঠে,
“কিং ব্রো তোর প্রতি কতটা অবসেড এটা সকলে জানে। সেখানে অন্য কাউকে বিয়ে? বিষয়টা কেমন অদ্ভুত না”
সকলের কথা শুনে অরিন একটু চিন্তার পরে যায়। কথস তো সত্যি। কিং তার প্রতি কতটা অবসেড এটা তো তার জানা। তাহলে হঠাৎ করে কীভাবে সে আরেক জনকে বিয়ে করবে?
ক্যাটরিনা অরিনের হাত চেপে ধরে বলে,
“দেখ, আমার ভাই যতই খারাপ হোক—ইমান আছে! প্রতি শুক্রবারে নামাজ পড়ে!”
“হ্যাঁ, শুক্কুর আলী তো তোমার ভাই! তাই শুধু শুক্রবারেই নামাজ পড়ে!”
অরিনের কথা শুনে সকলে নিজেদের হাসি কন্ট্রোল করে। এখন হাসলেই বিপদ।
__এই অরিনহহহ!”
__কী সমস্যা? ”
__লারা আর ব্রো একসাথে বাড়ি এসেছে দেখ।”
পুষ্পের কথা শুনে অরিন তাড়াতাড়ি করে থাই গ্লাসের সামনে গিয়ে দাড়ায়। বাহ! বেশ ভালোই গল্প হচ্ছে তাদের মাঝে। কিন্তু লারাকে কেমন যেন অদ্ভুত দেখতে। মনে হয় আগে ও অরিন দেখেছে। চুল ও কেমন অদ্ভুত লাল। কিংশুককে হাসতে দেখে অরিন নিজের হাত মুষ্টি বদ্ধ করে ফেলে।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৯
__মনি?”
__হুম?”
__একটা খুন করলে কী বাঁচাতে পারবে?”
অরিনের কথা শুনে সকলে হতবাক হয়ে যায়। হঠাৎ করে খুনের কথা আসছে কেন এটা ও কারো বোধ গম্য হয় না।
__কাকে খুন করবি তুই?’
__স্বামী ছিনতাই কারিকে। ওই লাড়া খাড়ার চুল তুলে যদি ন্যাড়া না করে দেই আমার নাম ও অরিন আবির খান নয়।”
