Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৭

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৭

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৭
কায়নাত খান কবিতা

সময় তখন ৬ টা ৪৫ মিনিট!
পুরো খান ম্যানশন জুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে!সার্ভেন্ট, লোকজন, মিটিং নিয়ে যতটা মেতে থাকতো খান ম্যানশন, আজ ঠিক ততটাই নিরব! যেন নিঃশ্বাস ফেললে ও তার প্রতিধ্বনি সকলের কান অব্দি পৌঁছে যাবে!
খান ম্যানশনের বিশাল হল রুমে ২৩ জন সার্ভেন্ট এবং কিংশুকের গার্ডরা দাড়িয়ে আছে! সকলের চোখ কিংশুকের উপরে! পাশে আতিয়া বেগম জড়সড় হয়ে বসা! মুখে এক প্রকারের আতঙ্কের ছাপ! একবার আশেপাশে দেখছে তো আরেক বার সোফাতে বসা কিংশুককে!

আতিয়া বেগমের থেকে একটু দূরে মাঝ বরাবর সোফাতে খুব আরাম করে বসে আছে কিংশুক! কোলে অরিন! দু-জনেই ভিজে একাকার হয়ে আছে! ভয়ে কেউ কিছু বলার সুযোগ অব্দি পাচ্ছে না!
আতিয়া বেগম কয়েক বার জিজ্ঞেস করেছিলো বটে! কিন্তু কোনো লাভ হয়নি! এখন অরিনের সেন্স না আসা অব্দি কেউ কিছু মনে হয় না জানতে পারবে! আর কিংশুক সে যে কিছু বলবে না সেটা বোঝায় যাচ্ছে!!
কিছু ক্ষণের মধ্যে ওমার এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হয়! কিংশুক ইশারা করে নিচে রাখতে বলে! তারপর অরিনের দিকে তাকায়! সে এখন ও অবচেতন অবস্থায় রয়েছে!
কিংশুক অরিনকে ফ্লোরে শুইয়ে দিয়ে পানি ভর্তি বালতি হাতে নেয়, আতিয়া বেগম আতঙ্কে থাকে! কিংশুক এখন কী করতে চাচ্ছে? এমনিতেই এতো ঠান্ডা! তার উপরে দু-জনেই কাক ভেজা! হচ্ছে টা কী আজ! কাল তাদের আংটিবদল, আর আজকে দু-জনের এমন পরিনতি কেন?

বালতি ভর্তি পানি নিয়ে কিংশুক অরিনের মুখ বরাবর দাড়ায়! তারপর সম্পূর্ণ পানি ঢালতে থাকে অরিনের উপরে! ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে অরিন! ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপতে থাকে সে!
অরিনের এমন কম্পন দেখে তাড়াতাড়ি করে আতিয়া বেগম কাছে আসতে চায় অরিনের, কিন্তু কিংশুক চোখ গরম করে তাকায় উনার দিকে! আতিয়া বেগম সেখানেই থেমে যায়! সামনে পা বাড়ানোর আর সাহস পায়নি তিনি!
কিংশুক বালতি ফেলে দিয়ে অরিনের মুখ বরাবর বসে! ভয়ে হাতে ভর করে দু-কদম পিছিয়ে যেতে থাকে অরিন! কিংশুক অরিনের পা টান দিয়ে আবার ও অরিনকে নিজের কাছে নিয়ে বসায়!
” তোমার মেয়ের বয়স কত মনি?”
কিংশুকের হঠাৎ এহেন কথায় থমথত খায় আতিয়া বেগম! এই নিয়ে দু-বার কিংশুক অরিনের বয়স জানতে চাইলো! সে কী বার বার তার বয়স ভুলে যাচ্ছে? না-কি ইচ্ছেকৃত ভাবে জানতে চাওয়া? মনে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে আতিয়া বেগম উত্তর দেন,

” ১৮ বছর!”
” আর আমার কত? ”
” ২৬ বছর!”
” একটা ১৮ বছরের মেয়ে একটা ২৬ বছরের ছেলের মন নিয়ে হাডুডু খেললো, তার শাস্তি কি হওয়া উচিত মনি? ”
কিংশুকের এতো শক্তপোক্ত কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারে না আতিয়া বেগম! তার মন নিয়ে অরিন কীভাবে খেললো! হাজারটা প্রশ্নের বাসা বাঁধে আতিয়া বেগমের মনে!
কিংশুক খুব কড়া চোখে তাকায় অরিনের দিকে! কিংশুকের এহেন চাহনি দেখে ভয়ে আত্মা অব্দি কেঁপে উঠে অরিনের!!

সে উঠে আতিয়া বেগমের কাছে যেতে চায়! কিন্তু পারে না! তার আগেই কিংশুক অরিনের হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিজের কোলের মাঝে বসায়! নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় অরিন! কিন্তু কিংশুকের দক্ষ হাতের বাঁধনের কাছে তার চুনো পুটির মতো শক্তি কিছুই নয়!!
অরিন বার বার তার মনির দিকে তাকায়! যদি সে কিংশুকের এমন অমানবিক নির্যা’তনের হাত থেকে তাকে রক্ষা করে!!
কিন্তু আতিয়া বেগম পাথর মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে থাকে! চোখের সামনে এতো কিছু দেখতে হবে সে কল্পনা ও করতে পারেনি! অরিনের অসহায় দৃষ্টি তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে! পরক্ষণেই আবার কিংশুকের বাজ পাখির মতো দৃষ্টি তাকে ঠান্ডা করে ফেলছে!
অরিনের বার বার আতিয়া বেগমের দিকে তাকানোতে প্রচন্ড বিরক্তি বোধ করে কিংশুক! এক হাতে অরিনকে শক্ত করে ধরে আরেক হাতে তার মুখ শক্ত করে ধরে তার দিকে ঘুরিয়ে ফেলে!

” লুক অ্যাট মি জান! আমার কু’ত্তার নাম ও রকি! শেষমেশ একটা কু’ত্তা?
প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে অরিন কিংশুকের মুখ বরাবর থু থু ফেলে! অরিনের থেকে এতো বড় তাচ্ছিল্য চোখ বন্ধ করে সহ্য করে কিংশুক!কিংশুক চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে সুযোগ বুঝে অরিন কিংশুককে ধাক্কা দিয়ে উঠে সোজা আতিয়া বেগমের কাছে চলে যায়!!
” মনি….. প্লিজ মনি…হে..!”
কান্নায় ভেঙে পড়ে অরিন! আতিয়া বেগম অরিনকে ঠান্ডা করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়! কিন্তু অরিন এতোটাই ভয় পেয়েছিলো যে শরীরে কম্পন বাড়তে থাকে কিন্তু কমে না!
এক পর্যায়ে অরিন অনুভব করে তার পিঠ বরাবর কেউ দাড়িয়ে আছে! শুকনো ঢোক গিলে সে!! এটা যে কিংশুক সেটা বুঝতে বাকি নেই তার! অরিন দৌড়ে অন্য দিকে চলে যেতে চায়, কিন্তু পারে না! তার আগেই কিংশুক তার কোমর জাপ্টে ধরে! তারপর অরিনের গাল দিয়ে নিজের গালে থু থু ফেলা জায়গাটে ঘোষতে থাকে!!
কিংশুকের এমন আচরণে এটা স্পষ্ট যে সে স্বাভাবিক মানুষ নয়! রীতিমতো একটা সা’ইকোপ্যাথ! ভয়ে কাঁপতে থাকে অরিন!

” থ্যাংকস ফর ইউর লাভ জান! এতো ভালোবাসা কোথায় রাখবো আমি!”
” আই হেট ইউ! ”
” আই নো! এন্ড ফর দ্যাট, গেট রেডি ফর দ্যা পানিশ’মেন্ট বেবি গার্ল! ”
কিংশুকের মুখে শাস্তির কথা শুনে গলা শুকিয়ে আসে অরিনের!! এতোটা শা’স্তি কী কম নয়? আর কী শা’স্তি বাকি রয়েছে তার?
নিজের পকেট থেকে রি’ভলবার বের করে অরিনের মাথায় তাক করে ধরে কিংশুক! মুখে তার তাচ্ছিল্যের হাসি!!
” ইফ ইউর নট মাইন, দ্যান ইউ হ্যাভ টু ডাই!!”
কিংশুকের মুখে নিজের মৃত্যুর কথা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সব কিছু থমকে যায় অরিনের!!তার ভুল কী এতোটাই বড় ছিলো? যার জন্য তাকে মৃত্যু দন্ড দেওয়া হচ্ছে.

” নাহহহ! প্লিজ! ”
” আমার বউ না হয়ে বেঁচে থেকে কী করবা জান? জীবন বৃথা তো! ”
” কিং…!”
” ওপারে ভালো থাকিস অরিন! ”।
অরিন কে জাপ্টে ধরে তার মাথা বরাবর রিভল’বারটির ট্রি”গার চেপে ধরতেই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় অরিন! ঢলে পড়ে কিংশুকের বুকে! কিংশুক রিভল’বারটি পকেটে পুরে রেখে দেয়! তারপর অরিনকে কোলে তুলে নেয়!
” বেইমানির শাস্তি, এতো সহজ না জান!”

রাত ১০টা ২১ মিনিট!!
একটু একটু করে নড়তে চড়তে থাকে অরিন! মাথাটা বেশ ব্যাথা এবং ভার! শরীর ও খুব ব্যাথা ব্যাথা লাগছে তার! কোনো রকম চোখ ডলতে ডলতে মেলতে থাকে সে! চোখ খোলার সাথে সাথে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির অ্যাকশন রিপ্লে হয় চোখের সামনে! সহজ বাংলা ভাষায় যাকে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা বলে! হুট করে নড়েচড়ে উঠে অরিন! তারপর নিজের দিকে তাকায়!
সে তার রুমে বেডের উপরে! কিন্তু যতদূর মনে আছে, সে তো কিংশুকের সাথে ছিলো, নিচে! তার মাথায় রিভল’বার প্রেস করা হচ্ছিল! সে কী ভয়ংকর দৃশ্য!

কিংশুক যে এমন ভয়ংকর শ্রেণীর লোকের কাতারে পড়ে, সেটা দূর স্বপ্নে ও কল্পনা করতে পারেনি অরিন!
পরক্ষণেই অরিনের রকির কথা মনে পড়ে! কিংশুক তাকে তো শা’স্তি দিলো! কিন্তু রকির সাথে কি করেছে? রকিকে কী ছেড়ে দিয়েছে? না-কি সে ও তার রাগের স্বীকার হয়েছে?
এসব ভাবতে ভাবতেই দরজা খোলার আওয়াজে হালকা নড়েচড়ে উঠে অরিন! ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে তার! কিংশুক কী আবার আসলো?

ভয়ে ভয়ে বেড থেকে উঁকি মারতে থাকে সে! দরজায় শব্দ হলো কিন্তু ভিতরে এখন ও কেউ আসছে না কেন? এতো তো সময় তো লাগার কথা নয়! তার রুমে তো কিংশুকের মতো পাসওয়ার্ড দেওয়া নেই!
যত সময় যায় ততই ভয় বাড়তে থাকে অরিনের! এক পর্যায়ে তার ভয়ের অবসান ঘটিয়ে আতিয়া বেগম এবং ক্যাটরিনা তার রুমে প্রবেশ করে! প্রায় একদিন পর ক্যাটরিনা দেখে আবেগে আপ্লূত হয়ে যায় অরিন! এই একটা মানুষই আছে যার কাছে অরিন একদম বাচ্চাদের মতো থাকে! যত ন্যাকামি, হ্যাংলামি, বাদরামি সব কিছু সহ্য করে সে তার! আতিয়া বেগম যতটা না কোলেপিঠে করে অরিনকে বড় করেছে, তার থেকে ও বেশি ক্যাটরিনা তাকে কাছে রেখেছে! তার থেকে সাত বছরের বড় হলে ও খানিকটা অরিনের মায়ের মতোই সে!।।

” বাইকাররর!”
অরিন হাত বাড়িয়ে ক্যাটরিনাকে ডাকে! ক্যাটরিনা ও দূত চলে আসে অরিনের কাছে! খুব জোড়ে জড়িয়ে ধরে অরিনকে!
” ওয়াট হ্যাপেন্ড বাচ্চা! ”
অরিন কিছু না বলে শুধু কেঁদেই চলে যায়! বাইকার যদি বাইক রেসিং এ না যেতো তাহলে আজকে তাকে কিছু বলার সাহস ও পেতো না কিংশুক!
” কাঁদে না বাচ্চা! আমাকে বল কী হয়েছে! ”
অরিন ক্যাটরিনাকে ছেড়ে দিয়ে চোখের পানি মুছতে থাকে!
এক এক করে সব বলতে থাকে অরিন ক্যাটরিনাকে!!অবশ্য সে আগেই সব শুনেছে! কিন্তু অরিনের মুখে পুরোটা শুনতে চেয়েছিলো!

” কিন্তু ব্রো এমন কেন করলো?”
অরিন একটু সংকোচ বোধ করে কীভাবে বলবে সে? কিন্তু না বললে ও তো হবে না! আমতা আমতা করে সব বলে দেয় সে তাদের কাছে!
” তোর কোনো আইডিয়া আছে কী করেছিস তুই?”
” মনি আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি! সবার কথায় চলে এসেছিলাম, তাই বাজি ধরে!!”
আতিয়া বেগম অরিনের পাশে বসে! তারপর তার হাত দুটো শক্ত করে ধরে!
” কিংশুকের মা..!”
কথাটি বলার আগেই আতিয়া বেগম ক্যাটরিনার দিকে তাকায়! কারণ কিংশুকের মা তো তার ও মা! ক্যাটরিনা চোখ দিয়ে আস্বস্ত করে, নিরদ্বিধায় সব বলতে! তার কোনো সমস্যা নেই এতে! ভরসা পায় আতিয়া বেগম!

” কিংশুক মেয়ে জাতিকে প্রচন্ড ঘৃণা করতো! কারণ ছোটোবেলা তার মায়ের পর’কীয়ার জন্য সে নিজের বাবাকে হারায়! আমি ক্যাটরিনাকে তো সাথে করে নিয়ে আসি! কিন্তু কিংশুককে পারিনি! সে দিন দিন একা থেকে থেকে ভয়ংকর হতে থাকে! মানুষ খু’ন, থেকে শুরু করে সবই যেনো ডাল ভাত! ও যখন বললো তোকে বিয়ে করতে চায়, আমার বুক থেকে পাথর নেমে পড়ে! অবশেষে তার নারী জাতির উপরে ঘৃণা কমলো! কিন্তু তুই কী করলি? তার মায়ের মতোই ঠকালি!”
অনুতাপে চোখ বন্ধ করে ফেলে অরিন! এটা তো সত্যি সে ও কিংশুককে ঠকিয়েছে! আজকে তার সাথে যা হলো সেটা তো তারই কর্মের ফল!

” মনি আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি! তুমি প্লিজ আমাকে উনার হাত থেকে বাঁচাও! ”
” কে বাঁচাবে? ”
দরজা থেকে পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই ভয়ে আঁতকে উঠে অরিন!কিংশুক সুন্দর মতো দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে! কখন এসেছে কেউ বলতে পারে না! দাড়ানো দেখে মনে হচ্ছে অনেক ক্ষণ আগেই এসেছে!!
ভয়ে অরিন ক্যাটরিনাকে জড়িয়ে ধরে! কিংশুক নিজের শার্টের হাতা উপরে উঠাতে উঠাতে সামনে আসতে থাকে!
” ক্যাট সর! ”
” ব্রো প্লিজ! গো!”
” ক্যাটটট!”
চোখ বড় বড় করে তাকায় কিংশুক ক্যাটরিনার দিকে! কিন্তু অরিন তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে! কিছুতেই ছাড়তে চায় না তাকে! কিংশুক অরিনের হাত ধরে তাকে ক্যাটরিনার থেকে ছাড়াতে থাকে! কিংশুক যতই তাকে আলগা করতে থাকে, সে ততই ক্যাটরিনাকে শক্ত করে ধরে!

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৬

” বাইকার প্লিজ হেল্প মি!”
” নো ওয়ান গোনা হেল্প ইউ বেবি গার্ল! কাম!”
কিংশুক রীতিমতো টেনেই অরিনকে ক্যাটরিনার থেকে আলাদা করে নিজের কাছে নিয়ে নেয়! কিংশুক লক্ষ্য করে অরিনের নাইট সুটের উপরের পার্ট উঠে গিয়ে পিঠ অনেকটায় বের হয়ে গেছে! সে সেটা ঠিক করতে থাকে!
” আই হ্যাভ আ সারপ্রাইজ ফর ইউ বেবি গার্ল! কাম!”
” যাবো না আপনার..!”
পুরো কথা শেষ করার আগেই কিংশুক অরিনকে কোলে তুলে নেই!
” তুই যাবি, তোর বাপ ও যাবে!”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৮