Home আপনাতেই আমি সিজন ২ আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৬

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৬

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৬
ইশিকা ইসলাম ইশা

হলুদ সন্ধ্যার জমজমাট আয়োজন করা হয়েছে বাগানে।একে একে সবাই সাজগোজে শেষ করে স্টেজ এর দিকে আসছে।সব মেয়েদের পড়নে গ্রামীণ কাঠালি রংয়ের শাড়ি আর ছেলেরা একই রকম পাঞ্জাবি পড়েছে।তবে রাদিফ পড়ছে সাদা রঙের গর্জিয়াস পাঞ্জাবি।সবাই একই হলেও রাদিফ আলাদা পড়েছে দেখে রওনাফ মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।মনে পড়ল তখনকার ঘটনা,
জামাই আর ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবি শখ করেই কিনে এনেছিলেন তিনি।সেটা একে একে সবাইকে দিয়ে যখন বড় ছেলেকে দিতে গেছিল তখন,

রাদিফ নাক মুখ কুঁচকে পাঞ্জাবির দিকে তাকিয়ে বলল,
এমন লো কোয়ালিটির পোশাক আমি পড়ব না আম্মু!
রাদিফকে পাঞ্জাবি দিতে এসে এই কথা শুনে কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি।খারাপ লাগাটা আড়াল করে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তোমার ভালো না লাগলে পড়ো না।তোমাদের বাবা ছেলে আর জামাইদের জন্য শহর গিয়ে নিজে কিনে নিয়ে এসেছে।সে নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য লো কোয়ালিটির পোশাক আনবে না। সারাজীবন মাস্টারি করেছেন তাতে যা হয়েছে তাই এনেছে।তবুও তোমার যদি এমনটা মনে হয় তবে তুমি অন্য পোশাক পড়।
মা প্লিজ মন খারাপ করো না আসলে এসব পোশাকে আমি অভ্যস্ত না।
তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলেন না।বাইরে বের হতেই সম্মুখে স্বামীকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে চমকালেন!আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই রওনাফ মির্জা স্ত্রী কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
কিছু বলতে হবে না।রুমে এসো। তুমিও তৈরি হয়ে নাও।অনেক কাজ বাকি আছে।
কথাটা বলেই রওনাফ মির্জা দ্রুত পায়ে চলে গেল। স্বামীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তিনিও পিছু পিছু গেলেন।বড় আফসোস তার ছেলেটাকে মানুষ করতে না পারার।

দু হাত ভর্তি মেহেদী দিয়ে দিতে বসেছে রিদিতা।রুপের মেহেদিতে এলার্জি থাকায় সে দেয়নি।তবে তৃপ্তি কে মেহেদী দিয়ে নিচ্ছে। মেয়েটা মেহেদী দেখে হইচই শুরু করেছে। এলার্জি থাকায় রুপ না দিলেও মেয়ের সাদা সাদা হাতে দুহাত ভর্তি মেহেদি নষ্ট না হয়ে যাই তাই হাত ধরে আছে।রিদি দূর থেকে এটা দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে বলল,

আমার আম্মুর মেহেদী তো দারুন হয়েছে!! মাশাআল্লাহ!! খুবই সুন্দর।
শান্তশিষ্ট তৃপ্তির মুখের হাসি বিস্তর হলো রিদিকেও দুহাত ভর্তি মেহেদি দিতে দেখে।সে খুশি হয়ে বলল,
চাচি আম্মু আর তৃপ্তি সেম সেম!আমিও মেহেদী দিছি এই দেখ!!
আরে বাহ! সুন্দর!!আপু গাছের মেহেদী তো অরগ্যানিক!
আমার মেহেদীতেই সসম্যা রিদি তাই না দেওয়াই ভালো।তবে তোর মেহেদী দারুন হয়েছে।
রিদি মৃদু হাসল।এরমাঝেই এরিকা আর অলিভা এলো।এরিকা শাড়ি পড়লেও অলিভা গর্জিয়াস গোল জামা পড়েছে।এরিকা রিদির হাতের মেহেদী দেখে বলল,
তোমার হাত তো বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে! আমিও দিতে চাই!
রিদি বিস্তর হেসে বলল,

হ্যাঁ ভাবী অবশ্যই!আপু ওনাকে মেহেদী দিয়ে দিন। ফর্সা হাতে দারুন মানাবে।
এরিকা মিষ্টি হেসে বলল,
কি যে বলো না তুমি রিদিতা!!তোমার হাতেই তো দারুন মানাচ্ছে।
রিদি কিছু বলার আগেই অলিভা রিদিতার দিকে তেছড়া চোখে তাকিয়ে বলল,
ওহহ!তবে তুমিই সেই! কালো বলে রাদিফ জিজু বিয়ে করবে না বলেছিল।আর সেই রাগেই…….
অলিভার কথা শেষ না হতেই এরিকা রেগে বলল,
স্টপ অলি!এসব কি ধরনের কথা!!
অলিভা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
ভুল কি বললাম আপু?এই মেয়ের জন্য ই তো জিজু দেশে আসেনি এতদিন! তাছাড়া এমনি যতোই সুন্দরী হও না কেন!গায়ের রং সাদা না হলে কোন ছেলেই মেয়েদের দিকে ফিরে তাকাই না।

এরিকা আবারো ধমকে উঠল,
অলি তুমি বেয়াদবি করছ!রিদি আমাদের চেয়েও সুন্দর।তুমি……..
অলি আবারো একই সুরে বলল,
মিথ্যা কি বললাম আপু! হ্যাঁ মানছি এখন সে ঠিকঠাক দেখতে তবে আগে নিশ্চয়ই কালোই ছিল। তাছাড়া শুনেছিলাম যে ওর বর নাকি ওকে আবার ফেলে রেখে গেছিল। নিশ্চয়ই ওর রং এর কারনেই।ত…….
ঠাসসসস…….

খরবদার মেয়ে ওর নামে আর একটা বাজে ওয়ার্ড ব্যবহার করেছো তো!তুমি জানোই কি ওর ব্যাপারে হ্যাঁ! তাছাড়া তোমার সাহস কিভাবে হয় আমার বাড়িতে এসে আমার মেয়েকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করার। তুমি মেহমান মেহমানের মতো থাকবে ,খাবে বিয়ে শেষ হলে বিদায় হবে।খবরদার যদি আমার বাড়ির বিষয়ে নাক গলাতে দেখেছি তো!আমি ভুলে যাব তুমি আমার ছেলের শালিকা হও।
রিদি সহ সবাই চাচির এমন কঠোর রুপ দেখে চমকে উঠল।
অলিভা গালে হাত দিয়ে রেগে বলল,
জিজু ঠিকই বলে!আপনারা আপনের চেয়ে পরকে গুরুত্ব বেশি দেন।তাইতো ছেলের কোনো গুরুত্ব নেই আপনাদের।ছেলে থাকলেও কি বা না থাকলেও কি!আপনাদের মতো বাবা মা…..
ইনাফ অলিভা!!!

রাদিফের রাগী আওয়াজ শুনে সবাই ফিছনে ফিরে চাইল। তোমার সাহস হয় কিভাবে আমার মা কে এসব বলার!এটা আমাদের পার্সোনাল ব্যাপার আমরা বুঝে নিব।তুমি এসব থেকে দূরে থাকো।
অলিভা রাদিফের কথায় রাগে ধপাধফ পা ফেলে চলে যেতেই রিদি অবাক হয়ে বলল,
আমার জন্য ভাইয়া দেশে ফিরেনি কিন্তু কেন?আর বিয়ে?মানে!!
রাদিফ আশেপাশে নজর বুলিয়ে বলল,
ঐসব পুরানো কথা বাদ দে। আশেপাশে অনেক মানুষ রয়েছে এসব নিয়ে পড়ে কথা হবে।বলে রাদিফ চলে যেতেই রিদির চাচি বললো,
ঐসব পুরানো কথা রিদু।বাদ দে
রিদি বেশ অবাক হলেও চাচির কথার বিপরীতে কোন কিছু বলল না।

এদিকে থাপ্পর খেয়ে রাগে টগবগিয়ে অলিভা বাইরে এসে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াতেই কাউকে দেখে থমকে যায়। আনমনেই বিরবির করে বলে,
তীব্র চৌধুরী!!!অলিভা চেনে তীব্র চৌধুরী কে। বাবার ব্যবসা সূত্র ধরে আমেরিকার বিশাল পার্টিতে দেখেছিল তাকে।টপ বিজনেসম্যান আর মাফিয়া লর্ড! সুপার হ্যান্ডসাম এই পুরুষটি হাজারো সুন্দরী মেয়ের স্বপ্ন পুরুষ।এক রাতের শয্যাসঙ্গী হতেও মেয়েরা যেন লাইন লেগে থাকে। কিন্তু আফসোস এই পুরুষটি হাজারো সুন্দরী নারীর দিকে ফিরেও দেখেনি।ইভেন তার আশেপাশে যাওয়াটাও ছিল যেন অসম্ভব।সবসময় বডিগার্ড তাকে ঘিরে রাখে। তার অনুমতি ব্যাতীত তার গায়ে টাচ করাও পছন্দ না তার।
তীব্র শাটের হাতা ফোল্ড করতে করতে বগানে তৈরিকৃত ঘরে প্রবেশ করল।অলিভা হা করে তাকিয়ে দেখল শুধু।তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এটা তীব্র চৌধুরী।অলিভা দ্রুত পায়ে সেদিকে যেতেই কালো পোশাকধারী একজন এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

কাকে চাই??
অলিভা এক পলক গাডটার দিকে তাকিয়ে বলল,
আচ্ছা!ওনি কি তীব্র চৌধুরী??ওনি কি সত্যি তীব্র চৌধুরী!!
ইয়েস!ওনি তীব্র চৌধুরী।সরি মিস অর মিসেস এটা মেহমান এরিয়া না। আপনি এখানে প্রবেশ করতে পারবেন না।এটা পার্সোনাল এরিয়া!দয়া করে অনুষ্ঠানের জায়গায় যান। ধন্যবাদ!!
ওনি এখানে কেন?মানে……
স্যারের রিলেটিভ এর বিয়ে তাই।আপনি কে??

আমি………
অলিভা কিছু বলার আগেই গার্ডটি তাড়াহুড়ো করে বলল প্লিজ গিয়ে অনুষ্ঠানে জয়েন হোন।বলেই গাডটি দ্রুতবেগে সেখানে থেকে প্রস্থান করে। এদিকে অলিভা মনে মনে কিছু একটা ভেবে খুশি মনে দৌড়ে তার রুমে আসে।হলদে জর্জেট একটা পাতলা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নেই। পারফেক্ট বডি আর বেশ সুন্দরী হওয়াই শাড়িতে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে নিজেকে।ঠিক যেন বলিউডের অভিনেত্রী।
প্রায় ৩০মিনিট পর নিজেকে সুসজ্জিত করে বের হয় অলিভা। এদিকে সবাই অলিভাকে দেখে নানান কুটক্তি শুধু করেছে।একে তো গ্রাম তার উপর এমন পোশাক। যদিও এসবে অলিভার কোন খেয়াল নেই।তার ধ্যান পড়ে আছে তীব্র চৌধুরীর উপর।স্টেজ এর এক কোনায় সবার মতোই একই পাঞ্জাবী পরিহিত তীব্র কে দেখেই ঠোঁটৈর কোনে কুটিল হাসি ফুটে উঠে। দ্রুত পায়ে সেদিকে গিয়ে দাঁড়ালো তীব্রর কাছে।এতো কাছে থেকে এই মানুষটাকে দেখাও যেন সৌভাগ্য।অলি গলা খাঁকারি দিয়ে কয়েকবার তীব্রর ধ্যান পেতে চেয়েও কিছু হলো না দেখে সরাসরিই বলল,
হাই!!!

আমি অলিভা………
তীব্রর থেকে কোন উওর নেই।তবে ইতিমধ্যেই ছুটে এলো একজন গাড।এইতো কিছুক্ষণ আগেই কথা হলো যার সাথে।
এক্সকিউস মি মিস!!স্যার অচেনা কারো সাথে কথা বলে না।প্লিজ এখানে থেকে যান।
অলি সাথে সাথেই বলল,
আমি অচেনা নয়।ওনি………..
চেনে না আপনাকে।প্লিজ স্টে এওয়ে…..

গার্ড আর অলিভার তর্ক করার মাঝেই তীব্র উঠে দাঁড়ালো। তীব্র কে উঠতে দেখে গার্ডটি কিছু বলার আগেই তীব্র সেখান থেকে হেঁটে চলে যায়।অলিভা তীব্র কে যেতে দেখে তার পিছু যাওয়ার আগেই গার্ডটি তাকে থামিয়ে দেয়।অলিভা রাগে গজগজ করছে আর তীব্রর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে তবে গার্ডটি তীব্রর পিছু পিছু যেতেই অলিভাও তীব্রর পিছনে ছুটল।কিছুদূর যেতেই একজন অতি সুন্দরী মেয়েকে দেখে তীব্র থেমে গিয়েও আবারো তাৎক্ষণিক ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে মেয়েটির কোলে কান্না করতে থাকা পুতুলের মতো ছোট জীবন্ত পুতুলটিকে কোলে তুলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।অলিভা অবাক হয়েই তাকালো পুতুলের মত দেখতে মেয়েটার দিকে।পুরো চেহেরাটা যেন চেনা চেনা মুখ।তবে গুলুমুলু মায়াবী মুখখানা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে যেন কোন আদুরে রাজকন্যা।হলদে একটা সারারা সুট পড়নে।উপর দিয়ে একটা লাল কোটি চুলগুলো ঝুটি করে দুপাশে বাঁধা।কান্নার ফলে গালগুলো টকটকে লাল হয়ে আছে। ঠোঁট দুটো একদম টুকটুকে লাল।ডাগর ডাগর মায়াবী চোখ সব মিলিয়ে এককথায় অসাধারণ সৌন্দর্য আছে মেয়েটার মাঝে।

আমার মা! আমার আম্মু,জান!কি হয়েছে আম্মু!! আমার লিটিল বার্ড কেন কাঁদছেন আম্মা!!
অলিভা চমকে উঠল ।কি বলল??মা,আম্মু!!তবে কি মেয়েটা তীব্রর কেউ!!আপন কেউ?খুব আপন!!নিজের!নিজের সন্তান!!অলিভা নিজের মনে কথাগুলো ভেবে দেখল।নিজের না হলে তীব্র চৌধুরী কি এতোটা আদুরে হয়!!
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রমনী বলল,
সবার টানাটানিতে ভয় পেয়েছে।
তীব্র মেয়েকে বুকে নিয়ে বিরক্তকর মুখে বলল,
মানা করেছিলাম নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।

রুপ কিছু বলার আগেই তীব্র মেয়েকে নিয়ে চলে গেল। তখন রিদি চাচি ,রিয়া,মনির জোড়াজুড়িতে রোজ কে নিয়ে মিজা বাড়িতে যেতেই সবাই যেন রোজ কে দেখে হামলে পড়ে।কারো কটু কথা,কারো তিক্ত কথা,আবার কারো ভালোবাসা।কেউ বলছে রিদির মতো চেহারা শুধু রং টা অন্যরকম হয়েছে। কেউ বলছে হয়তো এটা রিদির গভের সন্তান না।আবার কেউ এতো সুন্দর মেয়ে রিদির!! এটা দেখে হিংসায় জ্বলে পুরে মরছে।তবে সবাই এই জীবন্ত ছোট্ট পুতুলটিকে কোলে নেওয়ার বা ছোঁয়ার লোভ সামলাতে পারছে না।এদিকে রোজ এতো মানুষ দেখে প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও সবার আদর পেয়ে চাচি,রিয়া,মনির কাছে থেকেছে কিন্তু একে একে সবাই তাকে নিয়ে টানাটানিতে বেচারি ভয় পেয়ে জোরে জোরে কান্না করছে।কোনমতে কান্না থামাতে না পেরে রুপ রোজ কে নিয়ে বাইরে আসে।একটু ফাঁকা জায়গায় আসতেই তীব্র কে বসে থাকতে দেখে রুপ। রোজ কান্না শুরু করলে তীব্র ছাড়া কেউ থামাতে পারেনা ভেবে রোজ কে নিয়ে তীব্রর কাছে আসছিল…….

রুপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছু পিছু গেল।
দূর থেকে এটা দেখে অলিভার ভালো না লাগলেও জীবন্ত পুতুলটিকে দেখে বেশ অবাক হয়েছে। এককথায় বলতে গেলে রুপকথার মায়াবী রাজকন্যা যেন পৃথিবীতে নেমে এসেছে।

হলুদ অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ।এরিকা বোনের এসব কান্ডে রেগে বেশ কথা শুনিয়েছে।একে তো রিদির সাথে এতো বাজে ব্যবহার করেছে তারউপর এমন পোশাক পড়ে ভরা বাড়িতে ঘুড়ে বেরিয়েছে। যদিও শাশুড়ি কিছু বলেনি তবে ভরা বাড়িতে মানুষের ফিসফিসানি শুনেছে এরিকা।বোনকে পতিতার সাথে তুলনা করলেও সে কিছু বলেনি।বলবে কিভাবে!!এমন পোশাক পড়া কখনো উচিত হয়নি।একে তো বাংলাদেশ তারপর আবার গ্রাম।এরিকা বোনকে বারবার বলে গেছে কালকে বিয়ে সে যেন আবার কোন ঝামেলা না করে।তবে অলিভা এসবে কোন ধ্যান নেই।তার ধ্যান গ্যান তীব্র চৌধুরীতে আটকিয়ে আছে।তবে এটা জানে না তীব্র চৌধুরী আসলে কি জিনিস।নিজের মনে যতোই পরিকল্পনা সাজাক তীব্র চৌধুরী ইজ তীব্র চৌধুরী।

সকালে নাস্তার পর থেকেই আবারো সবাই সাজতে শুরু করেছে। বরযাত্রী যাবে বলে কথা।সকাল থেকেই চলছে হৈইচৈই।বিয়ে বাড়ি মানেই হৈইচৈই আর সেটা যদি গ্রাম হয় তবে তো কথাই নেই।অলিভা আজ কালো রঙের গর্জিয়াস গাউন পড়েছে।হ্যাভি মেকআপ আর সিল্ভলেস গাউন এ তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে।
একে একে সবার সাজগুজ শেষ হতেই সবাই গাড়ির কাছে এসে গাড়িতে উঠে বসে।রিয়ার শ্বশুর বাড়ির পুরো পরিবার এক গাড়িতে উঠে বসে।তাদের ঠিক আগের গাড়িতে রিদের সাদা চকচকে সাজানো গাড়িটি বেশ নজরকাড়া সুন্দরভাবে সাজানো।তাদের গাড়ি চলতে শুরু করতেই রিদের গাড়িও চলতে শুরু করল।রিদের পাশে বসে আছে রিয়ার হাজবেন্ড আর মনি।

এদিকে রওনাফ মির্জা মনসুর আলীর পরিবারের সাথে তাদের গাড়িতে উঠে বসে। বন্ধুর সাথে বোঝাপড়ার উদ্দেশ্য মনসুর আলীর গাড়িতেই উঠেছেন তিনি।দাওয়াত বহু আগে দেওয়া হলেও মনসুর আলী আসছে বিয়ের দিন এটা নিয়েই সকাল থেকে মনসুর আলী বন্ধু কে মানানোর চেষ্টা করে চলছেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কালকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারে নি তিনি।
এরপর আরও একটি গাড়িতে উঠে রাদিফ সহ তার পরিবার।এরিকা শাড়ি সামলে গাড়িতে উঠে বসল।তবে অলিভা আর রাদিফকে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাতে দেখে অলিভা আর রাদিফকে বসার জন্য তাড়া দিতেই রাদিফ মায়ের উদ্দেশ্য বলল,

আর কয়টা গাড়ি যাবে??
যাবে হয়তো আর কয়েকটা?
বলছি যে গাড়িতে জায়গা আছে।কেউ গেলে বসতে পারে।
তার দরকার হবে না।তোর মামারা আর শহর থেকে কিছু আত্মীয় সরাসরি ওখানে চলে যাবে আর বাকি যারা আছে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রাদিফ মায়ের কথায় আবারো আশেপাশে তাকালো। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মুখটা দেখতে না পেয়ে গাড়িতে উঠে বসল।অলিভাও গাড়িতে বসল।ওদের গাড়ি যাওয়ার সাথে সাথে আরও একটা গাড়ি আত্মীয় স্বজনে ভরা সেটা বেরিয়ে গেল।রাদিফ জানালার দিয়ে দেখল শুধু।সবার পৌঁছাতে পৌঁছাতে সমম লাগল প্রায় ৩০ মিনিট।এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের সরু রাস্তায় পরপর গাড়ির বাহার দেখে সবাই বেশ উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। গাড়িতেই তো পুরো মাঠ ভরে গেছে।একে একে গাড়ি থেকে সবাই নেমে দাঁড়ায়। বিশাল বড় মাঠে খাবার আয়োজন করা হয়েছে।উপরে তাবু টাঙ্গিয়ে খুব সাধারণ চেয়ার টেবিল দেওয়া হয়েছে।তবে অনেক সুন্দর ডেকোরেশন করেছে।দোতলা বাড়িটাও সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে।এরপর তাদের আপ্যায়ন করা হলো। আপ্যায়নে রিদের শালিরা বেশ দুষ্টুমিও করেছে বটে।রিদকে নিয়ে ভেতরে ঢুকার আগেই শশশ আরো ৪ টি গাড়ি এসে থামে মাঠের অপর প্রান্তে। সেখানে থেকে বেরিয়ে এলো রুপ, রিদি,মেঘ,আয়ন,তীর, তৃপ্তি, রৌদ্র, তূর্য,লাবিব,মিহি।

তীর খুব ভোরেই গ্রামে পৌঁছেছে। জরুরী কাজের জন্য তাকে ঢাকায় কানাডা যেতে হয়েছিল।তীরের পড়নে সাদা রঙের কারুকার্য খচিত পাঞ্জাবি। ফর্সা, সুঠামদেহী সুশ্রী শরীরে সোভা পেয়েছে বেশ।রুপের পড়নে সিলভার আকাশি রঙের গর্জিয়াস থ্রিপিস।সাদা আকাশিতে দুইজনকে বেশ মানিয়েছে।আর তীরের কোলে ছোট আরেকটা রুপ মানে তৃপ্তি। সিল্কি চুলগুলো দুপাশে ঝুটি বাঁধা।পড়নে মেরুন রঙের গর্জিয়াস গাউন।
আয়নের কোলে তার ৮ মাসের ছেলে আয়মান চৌধুরী মাহিদ ।আয়ন আর মেঘের বিয়ে পারিবারিকভাবেই হয়েছে রুপের বিয়ের ৪ মাস পর । প্রথমে প্রথমে দুইজন দুইজনকে বুঝতে সময় নিলেও ধীরে ধীরে সবটা ঠিক হয়েছে।ছেলের জ্বর ছিল বিধায় আগে আসা হয়নি তাদের।

লাবিব আর মিহির বিয়ে হয়েছে রুপের বিয়ের পরপরই।মিহিই বাবা মা কে বলেছে সে লাবিব কে পছন্দ করে।প্রথমে লাবিব এই বিয়েতে সংকোচ করলেও মিহির ভালোবাসা দেখে তাকে ভালবাসতে বাধ্য হয়।এতো বড়লোকের মেয়ে কিনা তাকে বিয়ে করতে চাইছে এই নিয়েই সংকোচ ছিল তার।তবে এখন সুখের সংসার তাদের।দুই ছেলে নিয়ে বেশ ভালোই চলছে দিনকাল।বড় ছেলে মিহির শেখ যাকে তারা অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছে বিয়ের পর পরই।লাবিব নিজেও একজন অনাথ শিশু ছিল। বর্তমানে যে তার বাবা মা তারা তাকে দত্তক নিয়েছিল শিশুকালে।তাই লাবিবের ইচ্ছে ছিল সেও একজন অনাথ শিশুকে মানুষ করবে।তার সামর্থ্য আছে একজন শিশুকে বড় করার তাই বিয়ের কয়েক মাস পরে এই কথা মিহিকে জানালে মিহি ও লাবিব কে সাপোট করে।তারপর তারা ৬ মাসের একটা ছেলে সন্তান কে দত্তক নেন।সে হলো মিহির শেখ।আর ছোট ছেলে লিমন শেখ।মিহিরের বয়স ৫ বছর আর লিমন এর বয়স ৩ বছর।

সবাই এগিয়ে আসতেই রিদ সবার সাথে কুশল বিনিময় করে ভেতরে প্রবেশ করে।অলিভার গরম লাগাই তাকে অনেক আগেই ভেতরের একটা রুমে ফ্যান চালু করে বসানো হয়েছে।একে তো তীব্রর দেখা পায়নি তারপর এতো মানুষ জন আর গরমে বিরক্ত হয়ে রিয়াকে বলাতে রিয়া ওকে ভেতরে বসিয়ে এসেছে।

এই যে শুনুন!!
কারো ডাকে রিদি পেছনে ফিরে তাকালো।তারা এখনো বাসায় প্রবেশ করে নি।গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।রিদি পেছনে ফিরে দেখল একজন লোক এগিয়ে এলো তার দিকে। কাছাকাছি আসতেই গাড এগিয়ে এসে বলল,
জি!! কি কাজ আপনার??
আপনার সাথে আমার কাজ নেই ওনাকে দরকার!!
রিদি মৃদু স্বরে বলল,
জি বলুন!!
আপনার নাম কি ডঃ রিদিতা চৌধুরী!!
রিদি খানিকটা সময় নিয়ে বলল,
জি!!

কাইন্ডলি একটু আমার সাথে আসবেন!আসলে আমার ওয়াইফের হঠাৎ শরীর খারাপ করছে!
কোথায় ওনি?কি হয়েছে?
লোকটা কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,
হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে বুঝছি না কি হলো।
রিদি কিছু বলার আগেই গাড়ির ভেতর থেকে তীব্র বলল,
গিয়ে দেখে আসুন! অনাকাঙ্ক্ষিত কাউকে পেতে পারেন!
রিদি অবাক হয়ে তীব্রর দিকে তাকালো।তবে এই মুহূর্তে কথা না বাড়িয়ে লোকটার সাথে যেতেই গাড কিছুটা ইতস্তত করে বলল,

বস!ম্যাম কে একা ছাড়া কি……..
এখানে আসার আগেই সবার বায়োডাটা আমার কাছে এসেছে মার্ভেল!
মার্ভেল হচকচিয়ে বলল,
জি বস!বলছি ভেতরে প্রবেশ করবেন না।
তীব্র মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে বলল,
অপেক্ষা করছি ঘুম ভাঙ্গার!!
গার্ডটি মুচকি হাসল।মেয়ে হওয়ার পর তীব্রর পরিবর্তন যেন কোন মিরাক্কেল।যদিও পরিবর্তন রিদি আসার পরপরই শুরু হয়েছে।তবে ছেলেদের জন্যও তীব্র নিজেকে এতোটা বদলাইনি যতোটা মেয়ের জন্য।ছেলেদুটো মা ভক্ত হলেও মেয়েটা একদম বাবা ভক্ত।বাবাকে পেলে আর কিছু চাই না।
রিদি ব্যস্ত পায়ে পাশের বাড়িতে যেতে যেতে বলল,

আপনার ওয়াইফ কি খুব বেশি অসুস্থ??
না তবে ঐ আর কি!! আসুন এই রুমে আছে।
রিদি রুমে ঢুকতেই কেউ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রিদি কে রিদি ভয়ে চিৎকার করার আগেই কেউ ওর মুখ চেপে ধরে বলল,
চেঁচামেচি করিস না রিদুই আমি!!
রিদি অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,
নাফু!!!

নাফিসা রিদিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেই রিদির চোখ ভিজে উঠল।সেই ছোট্ট বেলার সঙ্গী এই মেয়েটা।একসাথে অনেকটা পথ চলেছে।নাফুর জন্য নিজের জীবনের রিস্ক নিতে নিতেও দুবার ভাবেনি।সেই প্রিয় সখী আজ এত বছর পর!!
নাফিস ভাইয়া বলেছিল তোর সাথে তাঁদের কোন সম্পর্ক নেই। কোথায় আছিস তা জানে না! তবে তুই এখানে??
বলবো বলবো সব বলব!!আগে চল নীরের বিয়েতে!!
তুই নীর কে…..

নীর জয়ের কাজিন।আর ও জয় । আমার হাজবেন্ড।জয় শিকদার।নীরের বিয়ের জন্যই আমরা এখানে এসেছি সপ্তাহ খানেক আগে।
সরি!রিদিতা তোমাকে মিথ্যা বলেছি!আসলে এটা ওর প্ল্যান ছিল। তোমার কথা ওর মুখে এতো শুনেছি যে তুমি নামক মানুষটা আমাদের একদম মুখুস্ত।তোমাকে সারপ্রাইজ দিবে বলে কাল থেকে অপেক্ষা করছে।
মানে তুই জানতি!!!
সব বলব তোকে।আগে চল বিয়ে বাড়িতে যায়।তোর নাকি মেয়ে হয়েছে একদম পুতুলের মতো।
রিদি হাসল।তোর সন্তান??
৩ টা ছেলে।আর ১টা নিলে এক হালি পূর্ণ হবে। মেয়ের শখ আমার আর জয়ের হলেও ৩ টায় ছেলে।তবে তোর মেয়েকে আমি ছেলের বৌ করে আমার কাছে এনে রাখব!রিদি নাফিসার কথায় হাসল।

মেয়ের পায়ে গোল্ডেন জুতা পড়িয়ে চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিকঠাক করে দিল তীব্র। গোল্ডেন ফ্রগ পরিহিত ছোট্ট রোজকে আজ সত্যিই সোনালি কিরনের মতো লাগছে। কপালে উপর ছোট ছোট চুলগুলো পড়ে আছে দুপাশে দুটো ঝুটি বাঁধা গলায় ছোট্ট একটা লকেট। তীব্র মেয়েকে গাড়ির সিটে বসিয়ে বলল,
আম্মুজান!!
রোজ হাতে থাকা চকলেট নাড়াচাড়া করছিল এতক্ষন বাবার কথায় মুখ তুলে তাকালো।ঘুম থেকে উঠেছে বিধায় চুপচাপ কিছুটা।
তীব্র মেয়ের ফুলকো ফুলকো গালে চুমু দিয়ে বলল,
মাম্মার কাছে যাবেন প্রিন্সেস!!

রোজ মাথা নাড়ায়।যার অর্থ যাবে। দুদিন থেকে মায়ের সঙ্গ খুব কম ই পেয়েছে রোজ।যদিও বাবা হলেই চলে তার। কিন্তু মায়ের সাথেও দূরত্ব হয় নি কখনো।তাই মা কাছে না থাকায় ছোট্ট রোজ মায়ের প্রয়োজন অনুভব করছে।
তীব্র মেয়েকে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে বের করতেই নাফিসা অবাক হয়ে বলল,
মাশাআল্লাহ!!এই তো দেখি ফেইরি।
তীব্র পেছনে ফিরে দাড়াতেই নাফিসা তীব্র কে দেখে আরো এক দফা অবাক হয়ে বলল,
এই রিদু এই মাফিয়া কি এখন তোর মেয়েকেও কিডন্যাপ করবে নাকি!!

রিদি ফিক করে হেসে উঠলো।সাথে নাফিসাও হেসে দিল। তীব্র এদের কথায় কিছু বলল না। কিন্তু রোজ মা কে দেখা মাত্রই মায়ের কোলে যাওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই রিদি মেয়েকে কোলে তুলে নিল।এতে নাফিসার বেশ সুবিধাই হলো।ওতো লম্বা মানুষটার কোলে রোজকে দেখতে গিয়ে ঘারটায় ব্যাথা করছিল।রোজ মায়ের কোলে আসতেই মায়ের বুকে মিশে গেল। গাড়িতে ঘুমানোর সময় মায়ের বুকেই লেপ্টে ঘুমিয়েছিল।
এতো সুইট!আয় হায় আমি তো রসগোল্লা ভেবে খেয়ে নিব তোমাকে!!
রোজ ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ নাফিসার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না করে বলল,

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৫

আমাতে তেয়ে নিবে!!
রিদি মেয়েকে বুকে চেপে মুচকি হেসে বলল,
আন্টি মজা করছে মা!
রোজ মায়ের বুকে গুটিয়ে গেল খানিকটা! ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
আমাতে তেয়ো না আত্তা!!
নাফিসা ফিক করে হেসে উঠলো।এতো আদুরে বাচ্চা। ইচ্ছে করছে কোলে বসিয়ে শুধু দেখতে। কিন্তু যেই ভয়ংকর বাপ দাঁড়িয়ে আছে মেয়েকে কাদানোর জন্য আবারো তাকে তুলে থার্ড ডিগ্রী টচার না করে।

আপনাতেই আমি সিজন ২ পর্ব ৭৭