Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ১০

আবির ভাই পর্ব ১০

আবির ভাই পর্ব ১০
উর্মিলা মজুমদার

রাত এখন দুইটা বেজে সাত মিনিট। মধ্যরাতের এই প্রহরটাতে মানুষের ঘুমানোর কথা, কিন্তু মেঘের চোখে ঘুমের কোনো নামগন্ধ নেই। তার মাথায় এখন বই পড়ার ভূত চেপেছে। অদ্ভুত এক নেশা। বইয়ের পাতায় শব্দগুলো জ্যান্ত হয়ে মেঘের সাথে কথা বলতে চাইছে। মেঘের ডান হাতে টাটকা মেহেদী। লালচে রঙের একটা মায়া মাখানো গন্ধ নাকে আসছে। প্রেমা মেয়েটা বড় অদ্ভুত, এত নিখুঁত করে মেহেদী কী করে দেয় কে জানে! মেয়েটা গুণী, সন্দেহ নেই। গুণী মানুষদের কদর এই পৃথিবীতে সবসময় একটু কম হয়।
​মেঘের অস্বস্তির কারণটা অবশ্য কেবল বই নয়। মনের কোনো এক গহীনে একটা খচখচানি আছে।
মস্তিষ্ক বারবার বলছে, “আবির ভাইয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে,” কিন্তু মেঘ সেটা স্বীকার করতে চাইছে না। মানুষের মন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লুকোচুরির জায়গা। এখানে সত্যি কথাগুলো সবচেয়ে গভীরে লুকানো থাকে। আবির এখনো ফেরেনি। এই যে একটা মানুষ গভীর রাতে এখনো বাহিরে, এর কোনো মানে হয়? আবির কি জানে না, কারো কারো বাড়িতে ফেরার অপেক্ষাটা বড্ড দীর্ঘ হয়?

​অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো। মেঘ বারান্দার কার্নিশে বসে ছিল। ঠিক তখনই দেখল আবিরের সাদা রঙের গাড়িটা খান বাড়ির ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। তবে গাড়ি চালানোর ভঙ্গিটা কেমন যেন আলুথালু। পার্কিং লটে না গিয়ে রাস্তার ঠিক মাঝখানে ক্যাঁচ করে ব্রেক কষলো। মেঘের কপালে বিরক্তির রেখা ফুটল। সে চট করে রুমের ভেতর ঢুকে জানালার পর্দার আড়াল থেকে দেখতে লাগল। ​আবির গাড়ি থেকে নামল। তার নামার ভঙ্গি দেখে মেঘের হার্টবিট একটা শব্দ মিস করল বোধহয়। লোকটা টলছে। নেভি ব্লু রঙের শার্টের ওপরের দিকের কয়েকটা বোতাম খোলা।
(#আবির_ভাই উপন্যাসটি বই হিসেবে বেড়িয়েছে। আপনারা চাইলে এক্ষুণি প্রি-অর্ডার করতে পারেন।)
ব্লেজারটা কোথায় কে জানে! মেঘের মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা এলো সেটা হলো, আবির ভাই কি মদ খেয়েছে? লোকটা মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরছে? দৃশ্যটা কল্পনা করতেই মেঘের শরীর রি রি করে উঠল। অথচ পরক্ষণেই তার মায়া হলো। মায়া বড় বিষম জিনিস। ​মেঘ আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। রুম থেকে বেরিয়ে এল। দোতলার করিডরে দাঁড়িয়ে দেখল, আবির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। প্রতিটি ধাপ যেন তার কাছে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করার মতো কঠিন মনে হচ্ছে। ঠিক যখন ওপরের শেষ সিঁড়িতে পা রাখল, তখনই আবির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

মেঘ কিছু না ভেবেই ঝাঁপিয়ে গিয়ে আবিরকে জাপটে ধরল। ​ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘ ভুলেই গিয়েছিল তার হাতের মেহেদী এখনো কাঁচা। আবিরের নেভি ব্লু শার্টে মেঘের হাতের মেহেদী লেপ্টে গেল। একটা চমৎকার নকশা নষ্ট হয়ে একাকার হয়ে গেল শার্টের বুকের বাঁ পাশে। অন্ধকারের কারণে সেই দৃশ্য মেঘের চোখে পড়ল না। আবির তখন সম্পূর্ণ অন্য জগতে। সে টলতে টলতে মেঘের ওপর আছড়ে পড়ল। মেঘের সারা শরীরে বৈদ্যুতিক শক খেলে গেল। এই প্রথম সে আবিরের এত কাছাকাছি।
​মেঘ মিহি স্বরে ডাকল, “আবির ভাই? আবির ভাই, শুনছেন?”
আবিরের কোনো সাড়া নেই। মেঘ ফিসফিস করে বলল, “উঠুন, কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। লোকে কত কী ভাববে!”
​আবির তখন জ্বরের ঘোরের মতো কিছু-মিছু বিড়বিড় করছে। তার চোখ বোজা, ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে ভাঙা গলায় বলল, “মে—মে… চলে যাস না প্লিজ। আমাকে ছেড়ে যাস না…”
​মেঘের কৌতূহল বাড়ল। সে কানটা আবিরের ঠোঁটের কাছে নিল। নীলু যেমন করে রহস্য খুঁজতে চায়, মেঘও তেমনি করে মাতাল আবিরের অবচেতন মনের সত্যটা জানতে চাইল। লোকে বলে মাতাল মানুষ আর শিশু কখনো মিথ্যা বলে না। আবির ভাই কি কোনো মেয়ের নাম বলছে? তার কি কোনো প্রেমিকা আছে? মেঘ সবটুকু মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করল, কিন্তু রহস্যের জট খুলল না। আবিরের কথাগুলো অস্পষ্ট মিলিয়ে গেল।

ভাগ্যিস সাদিফ সেই সময় রুম থেকে বেরিয়েছিল! সাদিফ না থাকলে এই বিশালদেহী আবিরকে নিয়ে মেঘ কী করত কে জানে। সাদিফের সহায়তায় আবিরকে তার রুমে পৌঁছে দেওয়া হলো। মেঘ হাফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু তার কাঁচা মেহেদীর দাগ তখন আবিরের নেভি ব্লু শার্টে মিশে গিয়ে একটা অলিখিত গল্পের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। যে গল্পের শেষটা মেঘ এখনো জানে না।

মেঘ নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা ‘ঠাস’ করে বন্ধ করে দিল। খান বাড়ির এই পুরনো আমলের দরজারাও মাঝে মাঝে মেজাজ দেখায় বোঝা গেল। ​মেঘ বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগল। হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি থামার কোনো লক্ষণ নেই। ডাক্তার চাচা একবার বলেছিলেন, মানুষের হার্ট যখন অস্বাভাবিক কিছু দেখে, তখন সে তার রিদম ভুলে যায়। মেঘের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। সে এইমাত্র যা দেখেছে, সেটা কোনোমতেই স্বাভাবিক নয়। ​সাদিফ যখন আবিরকে নিজের রুমে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আবির ভাইয়ের পকেট থেকে মানিব্যাগটা পিছলে ফ্লোরে পড়ল। মেঘ নিছক সৌজন্যবোধ থেকেই সেটা তুলে নিয়েছিল। কিন্তু তুলতে গিয়েই তার পৃথিবীটামুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। মানিব্যাগের স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ওপাশে মেঘের ছোটবেলার সেই চিলতে হাসিমুখের ছবিটা দিব্যি জেঁকে বসে আছে। ​মেঘের মনে হলো, সে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। কলটা ছেড়ে দিয়ে হাতের তালু ঘষতে শুরু করল। হাতে লেপ্টে থাকা গাঢ় মেহেদীর রংটার দিকে তার খেয়ালই ছিল না। পানির তোড়ে মেহেদী ধুয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতরে যে প্রশ্নের জোয়ার শুরু হয়েছে, সেটা ধোয়ার কোনো সাবান নেই যে আদতে। ​মেহেদী লেপ্টে যাওয়া সেই মানিব্যাগটার অবস্থা এখন তথৈবচ। কিন্তু মেঘের মাথায় এখন অন্য চিন্তা। আবির ভাইয়ের মানিব্যাগে মেঘের ছবি কেন? এটা কি নিছকই কোনো সমাপতন বা কো-ইনসিডেন্স? নাকি এর পেছনে বড় কোনো ‘লজিক’ লুকিয়ে আছে? ​হঠাৎ মেঘের নজর গেল দেয়াল ঘড়ির দিকে। কাঁটাটা তিনটার ঘর ছুঁইছুঁই করছে। মেঘের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সর্বনাশ! সকাল হলেই তো অরু এসে দরজায় কড়া নাড়বে। অরুর স্বভাব হলো আজকাল মেঘকে নাকানিচুবানি খাইয়ে কলেজে নিয়ে যাওয়া। তার কাছে দেরি মানেই মহাহিল্লোল। ​

মেঘ দ্রুত রুমের লাইটটা নিভিয়ে দিল। সে গায়ের ওপর কাঁথাটা টেনে নিল। কিন্তু ঘুম কি চাইলেই আসে? জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করা আর শুকনো ডাঙ্গায় সাঁতার কাটার চেষ্টা করা একই কথা। মেঘ চোখ বন্ধ করে থাকল, আর তার চোখের সামনে কেবল আবির ভাইয়ের সেই ভেজা মানিব্যাগ আর একটা ছোটবেলার ছবি ভাসতে লাগল।
সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ। তবে ঢাকা শহরের সকাল আর মফস্বলের সকালে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এখানে রোদটা ঠিক চাদরের মতো গা ঘেঁষে আসে না। বরং মনে হচ্ছে কেউ যেন এক বালতি গরম জল গায়ের ওপর ঢেলে দিয়েছে। বড় আব্বু বাগানে হাঁটছেন। পেছনে বাঁদর অরু দাঁত মাজছে। মেয়েটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। সাতসকালে সে ঘুম থেকে ওঠে। এই যে মানুষ কেন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, এর কোনো লজিক আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেল না। ঘুমের মধ্যে তো এক ধরণের আনন্দ আছে, যা জেগে থাকলে পাওয়া যায় না। অরুকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব মন দিয়ে দাঁত মাজছে।

এদিকে বড় আম্মুর রান্নাঘরে চায়ের কেতলিটা শাঁ শাঁ শব্দ করছে। তিনি চা গরম করছেন, আর ঠিক তখনই তাঁর মাথায় একটা খটকা লাগল। আবির কি রাতে ফিরেছে? বড় আম্মুর স্মৃতিশক্তি মাঝেমধ্যে ঝাপসা হয়ে যায়। তিনি রাহেলা আন্টিকে ডাকলেন, “রাহেলা, আমি চা বসিয়েছি। একটু দেখে দিস তো।”
রাহেলা আন্টি বললেন, “আচ্ছা সাহেবা, আপনে যান। আমি দেখতাছি।”
বড় আম্মু শাড়ির আঁচলটা একটু সামলে নিয়ে আবিরের রুমে ঢুকলেন। আবির ভাই উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। বড় আম্মু আবির ভাইয়ের কপালে হাত রাখলেন।
“আবির? এই আবির, শুনছিস?”
” আবির? ”
তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে গভীর ঘুমে মগ্ন। বড় আম্মু আর বিরক্ত করলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
অরুর দাঁত মাজা শেষ। এখন তার প্রধান কাজ হলো মেঘকে জাগানো। মেঘের ঘরে ঢুকে অরু শুরু করল তার হাঁকডাক, “এই মেঘ, ওঠ না!”

” কীরে মেঘ, শুনতে পাচ্ছিস?”
মেঘের বালিশের পাশে অ্যালার্ম ঘড়িটা পড়ে আছে। ওটা কিছুক্ষণ আগে নিশ্চয়ই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করেছে, কিন্তু মেঘকে টলাতে পারেনি। যন্ত্রের ওপর মানুষের এই যে বিজয়, এটা দেখার মতো দৃশ্য। অরু এবার গায়ের জোরে ধাক্কা দিতে শুরু করল।
” মেঘ ওঠ৷ কলেজ যেতে হবে আমাদের।”
” মেঘ শুনছিস সকাল হয়ে গেছে। ”
মেঘ আধবোজা চোখে উঠে বসল।
“উঠেছি তো! এত ডাকার কী হলো?”

আবির ভাই পর্ব ৯

অরুর নজর গেল মেঘের হাতের দিকে। সাদা ধবধবে ফর্সা হাত, তাতে মেহেদীর রঙ জমে কালচে হয়ে গেছে। রঙের এই গাঢ়তা দেখে মনে হচ্ছে, মেঘ নিশ্চয়ই কাল রাতে অনেকক্ষণ ধরে হাতে মেহেদী লাগিয়ে বসে ছিল। বেশ সুন্দর লাগছে লাল রাঙা হাতটা।

আবির ভাই পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here