আবির ভাই পর্ব ৭
উর্মিলা মজুমদার
কিছু দিন পর।
হুট করেই আবির ভাই সেদিন কথা অনুযায়ী মস্ত কাণ্ড করে বসলেন। দুইটা সাইকেল নিয়ে হাজির। ধবধবে সাদা আর কুচকুচে কালো। একটা মেঘের জন্য, অন্যটা অরুর। মেঘের আনন্দ দেখে কে! তার আনন্দের অবশ্য আরও একটা কারণ আছে। সাইকেলের সাথে বোনাস হিসেবে আবির ভাই তাকে একটা দামি অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিয়েছেন। ঢাকায় আসার পর মেঘের কোনো নিজস্ব ফোন ছিল না। এখন তার একটা ব্যক্তিগত ফোন হলো, কিন্তু মুশকিল হলো ফোনটা তার হাতে খুব একটা থাকে না। ফোনের আসল মালিক হয়ে দাঁড়িয়েছে অরু। অরুর নিজের একটা ফোন আছে ঠিকই, কিন্তু মেঘের ফোনটা বেশ দামী। অরু সারাক্ষণ মেঘের ফোনের ভেতরে মুখ গুঁজে থাকে। কখনো টিকটক, কখনো ফেসবুক, আবার কখনো ইনস্টাগ্রাম। মেঘ বেচারি ফ্যালফ্যাল করে নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ফোনটা আসলে অরুরই, মেঘ কেবল ওটার জিম্মাদার। এরই মধ্যে বড় একটা কাজ হয়ে গেছে। দুইজনেই কলেজে ভর্তি হয়েছে। ভাগ্য ভালো, দুই জন একই কলেজে চান্স পেয়েছে। গতকাল ভর্তি শেষ হলো, পরশু দিন থেকে ক্লাস শুরু।
তেরো তলার ছাদ। বৃষ্টির পর আকাশটা আজ বেশ পরিষ্কার। তবে একেবারে ঝকঝকে নীল বলা যাবে না, জায়গায় জায়গায় তুলোর মতো সাদা মেঘ জমে আছে। রোদের ঝিলিক এসে লাগছে ছাদে জমা বৃষ্টির পানিতে। আবির দাঁড়িয়ে আছে কার্নিশ ঘেঁষে। ওর ঠোঁটে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। আবিরের পাশে দাঁড়িয়ে রায়হান। অন্যতম বাস্তববাদী মানুষ সে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হুট করেই বলল, “এতো সময় বাদে অবশেষে মেঘ তোর কাছে আসলো।”
আবির চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। ওর চাহনিতে সূক্ষ্ম একটা ধমক আছে। রায়হান দাঁত বের করে হাসল। ভুল শুধরে নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “ওকে, ওকে সরি! তোদের বাড়িতে আসলো।”
আবির সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটা অনেকক্ষণ আটকে রাখল ফুসফুসে। তারপর এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “তাই তো আমার চিন্তা। এতোদিন দূরে ছিল সেটাও চিন্তা, এখন আমার চোখের সামনে আছে সেটাও চিন্তার। মেঘ বড় বিপজ্জনক জিনিস রে রায়হান। বেশিক্ষণ চোখের সামনে থাকলে বৃষ্টি নামিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।”
রায়হান কফির কাপটা দুহাতে চেপে ধরল। গভীর স্বরে বলল, “কন্ট্রোল, আবির। কন্ট্রোল। এমন কোনো ভুল কিছু করে বসিস না আবার যার জন্য মেঘ আবার দূরে চলে যায়। তুই তো জানিস, একবার উড়াল দিলে মেঘকে আর খাঁচায় ভরা যায় না।”
আবির হাসল। এই হাসির কোনো মানে হয় না। সে গায়ের দামি ব্লেজারটা খুলে অবহেলায় কার্নিশের ওপর রাখল। সাদা শার্টের হাতা কুনই পর্যন্ত গুটিয়ে আবির আবার আকাশের দিকে চাইল। আকাশে এখন অজস্র মেঘের আনাগোনা। মনে হচ্ছে একদল সাদা মেঘ আজ ফুটবল খেলতে নেমেছে। নীল প্রান্তরে সাদা মেঘের এই ছোটাছুটি দেখতে কি আসলেই ভালো লাগে? নাকি বুকের ভেতরটা একটু খাঁ খাঁ করে ওঠে? সাদা মেঘগুলো এখন বেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রায়হান হঠাৎ প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে দিল। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “মির্জা সাহেবের ছেলের এনগেজমেন্ট পার্টিতে কী তাহলে যাচ্ছিস তুই? বড় পার্টি কিন্তু!”
আবির কিছুটা সময় ভাবল। নিস্পৃহ গলায় বলল, “হ্যাঁ, যেতে তো হবেই। না গিয়ে উপায় নেই। বিজনেস পার্টনারের ছেলের এনগেজমেন্ট বলে কথা। তবে একটা শর্ত আছে, তুইও আমার সাথে যাচ্ছিস।”
রায়হান হাসিমুখে মাথা দোলালো। এর মানে সে রাজি। অতঃপর আবির আর রায়হান ছাদ থেকে নিচে নেমে এলো। জগতটা বড় বিচিত্র। একপাশে যখন নীল আকাশ আর মেঘের বিলাসিতা চলে, অন্যপাশে তখন জীবনের কঠিন অঙ্ক শুরু হয়ে যায়।
মেঘ সবেমাত্র শাওয়ার নিয়ে গুনগুন করতে করতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। পরনে ঘরোয়া পোশাক। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে রুমে ঢুকেই পাথর হয়ে গেল। ওর চোখ যেন কপাল ছাপিয়ে চড়কগাছে ওঠার জোগাড়। সোফায় অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে সাদিফ। মানুষের বসার স্টাইল দেখে যে তার ভেতরের নিশ্চিন্ত ভাবটা চেনা যায়, সাদিফ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সে নিবিষ্ট মনে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফুরফুরে সুর তুলে শিষ বাজাচ্ছে।
মেঘ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। সাদিফ এখনো ওর দিকে তাকায়নি। এই যে একটা মেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর সে উদাসীন হয়ে শিষ বাজাচ্ছে এটা কি চরম অভদ্রতা নাকি অতি ভদ্রতা? মেঘ দ্বিধায় পড়ে গেল। একটু কেশে মেঘ বলল, “সাদিফ ভাইয়া, কিছু বলবেন কি?”
সাদিফ এবার মেঝে থেকে চোখ তুলে মেঘের দিকে তাকালো। শিষ বাজানো থামল না, সুরটা একটু অন্যরকম হলো মাত্র। তারপর সরু গলায় বলল, “মেঘ, তোকে আর অরুকে নিয়ে আজ একটা জায়গায় ঘুরতে যাব। প্রেমার এক্সাম চলছে, সে তো এখন বইয়ের ভেতর মুখ গুঁজে বিজি। তুই চল আমাদের সাথে। একটু না ঘুরলে তো শরীর-মন জং ধরে যাবে।”
মেঘের মনে হলো, ব্যাপারটা তো মন্দ না। সাদিফ ভাই না বললেও সে হয়তো যাওয়ার জন্য বায়না করত। এখন যখন নিজ থেকে নিমন্ত্রণ এসেছে, তখন একটু আনন্দিত হওয়াই যায়। মেঘ হাসিমুখে বলল, “অবশ্যই যাব সাদিফ ভাই! আপনি শুধু সময়টা বলেন, আমি আর অরু একদম রেডি হয়ে থাকব।”
সাদিফ এবার হাসল। উঠে দাঁড়ানোর সময় মেঘের মাথায় একটা টোকা দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সাদিফ যাওয়ার সাথে সাথেই মেঘ খুশিতে একটা চিৎকার দিল। অরু পাশের রুম থেকে দৌড়ে এলো। মেঘ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কিরে অরু, সাদিফ ভাই আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে রে?”
অরু রহস্যময় হেসে বলল, “রেস্টুরেন্টে। ভাইয়ার বার্থডে ট্রিট।”
মেঘ আকাশ থেকে পড়ল। “বার্থডে ট্রিট? ভাইয়ার জন্মদিন কবে ছিল?”
“কেন, তুই যেদিন রাতে আমাদের বাড়ি আসলি, সেদিনই তো ছিল। ভাইয়ার সেমিস্টার পরীক্ষার কারণে ট্রিটটা বাকি ছিল। আজ সেই সুযোগ।”
মেঘ নিজের কপালে একটা হালকা থাপ্পড় মারল। এত বড় একটা কথা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে! সন্ধ্যায় দুই বোন সাজতে বসলো। মেঘ পরল একটা সাদা-কালো প্রিন্টের থ্রি-পিস। মাথায় বেশ কায়দা করে হিজাব বাঁধলো। অরু পরল একটা টু-পিস। অথচ আবির তখনো জানে না, আজ শহরের ভাগ্যটা ভালো নয়। মিরপুর পল্লবী এলাকায় সন্ধ্যার পরপরই এক ভয়াবহ গণ্ডগোল বেধে গেছে। কোনো এক তুচ্ছ ঘটনায় দুই দলের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়েছে।
চারদিকে মানুষের আর্তনাদ আর পুলিশের সাইরেনের বাজছে। খবরটা যখন বড় আব্বুর কানে পৌঁছালো। তার বুক ধরফর করে উঠল। তিনি আতঙ্কিত হয়ে সোফায় বসে পড়লেন। তার হাত কাঁপছে। কারণ সাদিফ আজ মিরপুর পল্লবীর এক নামকরা রেস্টুরেন্টেই গেছে। আর তার সাথে আছে মেঘ আর অরু। বড় আব্বুর গলার স্বর শুনে মনে হলো তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। আবির ভাই তখন অফিসের কনফারেন্স রুমে। বড় কোনো প্রজেক্টের মিটিং চলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে পিএ লিখন দরজায় এসে দাঁড়ালেন। লিখন সাহেব সাধারণত সিনা-টান করে হাঁটেন। ফোনের ওপাশে বড় আব্বুর কণ্ঠস্বর রীতিমতো থরথর করে কাঁপছে
“হ্যালো, আবির? তুই কি শুনতে পাচ্ছিস?”
আবির নিজেকে সংযত করে বলল, “হ্যাঁ আব্বু, বলো। কোনো সমস্যা?”
“আবির, তুই দ্রুত পল্লবী যা। এক্ষুনি যা।”
আবিরের কপালে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “কেন কী হয়েছে? পল্লবীতে তো আজ গণ্ডগোল হওয়ার কথা। মিছিল-টিছিল হচ্ছে সম্ভবত। ওখানে কেন যাবো?”
বড় আব্বু হাঁপাচ্ছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সাদিফ ওখানে গিয়েছে। একা নয়, সাথে অরু আর মেঘকেও নিয়ে গেছে। সাদিফকে বারবার ফোন করছি, ও কল তুলছে না। ছেলেটার জন্য চিন্তা করছি না, কিন্তু মেয়ে দুটোকে নিয়ে ও কেন ওখানে গেল? আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে রে আবির।”
’মেঘ’ নামটা শোনামাত্রই আবিরের বুকের ভেতর কোনো একটা সূক্ষ্ম তন্ত্রীতে টান পড়ল। চোখের পল্লব দ্রুত ওঠানামা করতে শুরু করল। মিটিং রুমের এসিটা সচল থাকলেও আচমকা ভীষণ তপ্ত হয়ে উঠেছে। বড় আব্বু ওপাশ থেকে সমানে ডেকে যাচ্ছেন, “আবির! হ্যালো! তুই কি আছিস?”
আবির উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা তার নেই। সে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল। মিটিংয়ের ফাইলগুলো ওভাবেই পড়ে রইল। উপস্থিত কর্মকর্তাদের বিস্ময়মাখা চোখের সামনে দিয়ে সে হনহন করে বের হয়ে গেল। লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে লাগল সে। মস্তিষ্কের কোনো এক কোণ থেকে বারবার ধ্বনিত হচ্ছে, ‘মেঘ ওখানে কেন?’
রাস্তায় বেরোতেই দেখা গেল বিশৃঙ্খলা। মানুষের মিছিল, পুলিশের ব্যারিকেড। পল্লবীর মোড়ে আসতেই জ্যামের মুখে পড়ল গাড়ি। আবির নিজের গলার টাইটা বারবার ঢিলা করছে, আবার টানছে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে। সে এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, মেঘ যদি বিপদে পড়ে? মেঘ কি জানে না যে এই শহরটা মাঝে মাঝে কত ভয়াবহ হয়ে ওঠে?
গাড়ি থেকে নেমে এক প্রকার দৌড় শুরু করল আবির। মানুষের ধাক্কা খেল, গ্রাহ্য করল না। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে সে পৌঁছে গেল সেই রেস্তোরাঁটার সামনে। রেস্তোরাঁটি দোতলায়।ভেতরে ঢুকে তার চোখ দুটো পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। চারপাশটা প্রায় ফাঁকা। হঠাৎ ডান পাশের কোণায় একটা টেবিলে সাদিফকে দেখা গেল। সাদিফ খুব আয়েশ করে পিৎজা খাচ্ছে। আবিরকে দেখে সে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“ভাইয়া! তুমি এখানে? কোনো ঝামেলা হয়েছে? তুমি এভাবে হাঁপাচ্ছ কেন?”
আবিরের কণ্ঠস্বর জড়িয়ে এল। সে অরু আর সাদিফকে দেখল, কিন্তু সেখানে মেঘ নেই। তার হৃদপিণ্ড যেন এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। সে কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, “মেঘ কোথায়? সাদিফ, আমি জিজ্ঞেস করছি মেঘ কোথায়?”
সাদিফ কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আরে ভাইয়া, রিলাক্স। অত অস্থির হচ্ছ কেন? ও তো…”
”আই সে, হোয়ার ইজ মেঘ?”
আবিরের গলার স্বর এবার পুরো রেস্তোরাঁ সংবিৎ কাঁপিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুমের করিডর থেকে মেঘ বেরিয়ে এল। পরনে হালকা সে সাদা রঙের একটা সালোয়ার কামিজটা। মেঘকে দেখামাত্রই আবিরের ভেতরকার ঝড়টা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। যেন উত্তাল সমুদ্র হঠাৎ করে এক নিথর দিঘিতে পরিণত হলো।
আবির ভাই কপাল চেপে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজেকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। মেঘ অবাক চোখে আবির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। বড় বড় চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে সে বলল, “আবির ভাই? আপনি এখানে কেন?”
আবির কোনো কথা বলল না। সাদিফ আবারও জিজ্ঞেস করল, “ঘটনা কী বলো তো ভাইয়া? তুমি এমন উন্মাদ হয়ে ছুটে এলে কেন?”
আবির সহসা শান্ত কণ্ঠে শুধাল, “আব্বু ফোন করেছিলেন। বললেন পল্লবীতে নাকি শুট-আউট হয়েছে। তোরা বাইরে আছিস শুনে উনি খুব দুশ্চিন্তা করছিলেন। তাই আসা।”
সাদিফ হাসল। সেই এক চিলতে অমায়িক হাসি। সে বলল, “আমরা তো ঠিকই আছি। সামান্য কিছু গণ্ডগোল হচ্ছিল রাস্তায়, কিন্তু ভেতরে তো সব স্বাভাবিক।”
“ঠিক আছে, এবার চল। বাসায় ফিরতে হবে।” আবিরের কণ্ঠ কাঠিন্য। সাদিফ বিল মিটিয়ে দিল। তারা চারজন মিলে গাড়ির দিকে হাঁটল। সারাটা পথ আবির একটা কথাও বলল না। সে ড্রাইভিং সিটে বসে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে রইল। তার চোখ সামনে রাস্তার দিকে, কিন্তু মনটা বোধহয় অস্থিরতায় দুলছে। মেঘ পেছনের সিটে বসে আড়চোখে বারবার আবিরকে দেখছিল। সে বুঝতে পারছে আবির ভাই ভীষণ রেগে আছে। কিন্তু রাগটা কিসের ওপর? সাদিফের ওপর, নাকি তার ওপর?
মেঘ ভাবল, আচ্ছা, আবির ভাই কি তবে তাকে নিয়ে সত্যিই একটু বেশিই ভাবেন? এই যে এত বড় একটা ঝুঁকি নিয়ে তিনি চলে এলেন, এটা কি কেবলই বড় আব্বুর নির্দেশে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গোপন ব্যাকুলতা আছে?
গাড়ি এগিয়ে চলছে খান বাড়ির দিকে। জানালার বাইরে দ্রুতবেগে সরে যাচ্ছে শহরের বাতিগুলো। নীরবতা ক্রমশ রূঢ় হচ্ছে। এই নীরবতার কোনো সহজ উত্তর নেই। অন্তত আজকের এই অবেলায় তো নয়ই।
রাত দশটা। খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলে এলাহি কারবার। বড় বড় হাড়ির ঢাকনা খোলা হয়েছে, সেখান থেকে কাচ্চি বিরিয়ানির ম-ম সুবাস বেরুচ্ছে। সেই সুবাসের ধাক্কায় পুরো খান বাড়ি ভেসে যাওয়ার কথা, কিন্তু সবাই কেমন যেন স্ট্যাচুর মতো বসে আছে। আবির আজ বড্ড গম্ভীর। সে আনমনে প্লেটে কাচ্চির চাল খুঁটছে। আবির ভাইয়ের চোখ জোড়া থিতু হয়ে আছে কাচ্চির প্লেটে। তার ঠিক দুই চেয়ার পরেই বসেছে মেঘ। মেয়েটা আজ বড় অস্থির। সে বারবার আড়চোখে আবিরকে দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু আবির ভাই নির্বিকার। মেঘের চোখের ইশারায় তার কিছু আসা-যাওয়ার কথা নয়, যাচ্ছেও না।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে বড়ো আব্বু গম্ভীর গলায় বললেন, “আবির, তুমি কাল তাহলে মির্জা সাহেবের ছেলের এনগেজমেন্ট পার্টিতে যাচ্ছো?”
আবির মুখ তুলল না। তার কণ্ঠস্বর এল মাটির গভীর থেকে আসার মতো, “হুম।”
“সাথে কি অন্য কেউ যাচ্ছে?”
“হ্যাঁ, রায়হান যাচ্ছে আমার সাথে।”
বড়ো আব্বু এক চিলতে হাসি হাসলেন। তার হাসিতে তৃপ্তি আছে। তিনি বললেন, “সেখানে গিয়ে সবকিছু একটু হেন্ডেল করিও। অনেক উঁচু উঁচু পদের লোক আসবে। আমি যেহেতু যেতে পারছি না, সব দায়িত্ব তোমার ওপর। সামলে নিও তো বাবা।”
আবির খুব শান্ত স্বরে জবাব দিল, “আপনি কোনো চিন্তা করিয়েন না।”
বড়ো আব্বুর মুখে এক গাল হাসি ফুটল ঠিকই, কিন্তু আবিরের মুখের মেঘ কাটল না। মেঘ তখন তার প্লেটের কাচ্চির আলুর ভেতর চামচ ঢুকিয়ে সেটাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। সে বড়ো আব্বু আর আবিরের কথোপকথন সবটা শুনছে, কিন্তু ভান করছে কিছুই নয়। তার মাথায় কাজ করছে আবির ভাই কাল পার্টিতে যাবে। যাক! তাতে তার কী? পৃথিবীর সব মানুষই তো কোথাও না কোথাও যায়। কেউ এনগেজমেন্টে যায়, কেউ যায় শ্মশানে। মেঘ মনে মনে একটা ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল।
খাবার পর্ব শেষ হলো। সবাই যখন টেবিল ছেড়ে উঠল, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মেঘের সঙ্গী হলো সাদিফ। সাদিফ ছেলেটা বড্ড বেশি চঞ্চল। সে মেঘের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিল।
“মেঘ, কেমন লেগেছিল আজকে?”
মেঘ খিলখিল করে হেসে উঠল। সে বলল, “উমম… বেশ মজা হয়েছে সাদিফ ভাই। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা ট্রিটের আয়োজন করার জন্য।”
সাদিফ একগাল হেসে মেঘের মাথায় ছোটখাটো একটা গাট্টা মেরে বলল, “ভালো তো লাগবেই রে পাগলী।”
দুই জন দুই দিকে রওনা হলো। মেঘ তার রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মেঘ মামা বোধহয় আজ খেপেছেন। বৃষ্টির তোড়ে আকাশ ছিদ্র হয়ে যাওয়ার উপক্রম। জানালার পর্দাটা দুলছে। বৃষ্টির ছাঁট চুইয়ে রুমে ঢুকছে। পর্দাটা ভিজে সপসপে হয়ে যাওয়ার আগেই মেঘ বিরক্তি নিয়ে বিছানা থেকে উঠল। যেই জানালাটা বন্ধ করবে, ওমনি তার চোখ আটকে গেল খান বাড়ির মেইন গেটের দিকে। হেডলাইটের আলোয় বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা হিরের দানার মতো চমকাচ্ছে। সাদা রঙের হোয়াইট বিএমডব্লিউ কারটা গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওটা আবির ভাইয়ের গাড়ি। এই গভীর রাতে, ঝুম বৃষ্টির ভেতর মানুষটা কোথায় যাচ্ছে? মেঘের ভ্রু কুঁচকে এল। এই লোকটা কি স্বাভাবিক কোনো মানুষ, নাকি অন্য গ্রহের কোনো অধিবাসী? গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেল। বৃষ্টির ঝাপটা এসে মেঘের চুলে লাগল। হুশ ফিরতেই সে ঝটপট জানালা বন্ধ করে দিল। বিছানায় ফিরে আসার পরও তার অবাধ্য মনটা স্থির হলো না। সে বারবার ভাবছে আবির ভাই কোথায় গেলেন? কারো সাথে দেখা করতে? না কি একা একা বৃষ্টিতে ভিজতে? নিজের ওপরই তার রাগ হলো। নিজেই নিজের মাথায় একটা গাট্টা মেরে মনে মনে বলল, “তোর এত ভাবার কী আছে মেঘ? তুই তো ‘ডোন্ট কেয়ার’ পার্টিতে নাম লিখিয়েছিস!”
পাশের সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল অন্যমনষ্ক হতে। এই ফোনটা আসলে মেঘের নিজের হলেও তার কাছে খুব একটা থাকে না। সারাক্ষণ ওই বানর অরুটার দখলে থাকে। আজ সুযোগ পাওয়া গেছে। মেঘ ওয়াইফাই কানেক্ট করতেই একগাদা নোটিফিকেশন মৌমাছির মতো হুল ফোটাতে শুরু করল। মেঘ ফেসবুকে ঢু মারল। ফ্রেন্ড লিস্টটা উল্টেপাল্টে দেখছে। সাদিফ ভাই আছে, প্রেমা আছে, এমনকি বড়ো আব্বুও আছে। হঠাৎ একটা আইডির ওপর মেঘের নজর আটকে গেল। তার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। মেঘ পাথর হয়ে গেল। আবির ভাই তার ফ্রেন্ড লিস্টে অ্যাড আছে? এটা অসম্ভব! এটা অলৌকিক! আবির ভাইয়ের মতো একজন গম্ভীর, রাশভারী মানুষ তার মতো এক ছিঁচকাঁদুনে মেয়ের ফ্রেন্ড লিস্টে?
মেঘ বিড়বিড় করে বলল, “নিশ্চয়ই ওই বানর অরুর কাজ।”
রাত এখন একটা বাজতে চার মিনিট বাকি। এই সময়টাকে ঠিক রাত বলা যায় না, আবার ভোর বলাও চলে না। পৃথিবীর সব আলো নিভে গিয়ে মায়াভরা অন্ধকার চারপাশটা ঘিরে ধরেছে। বৃষ্টি থেমে গেছে বহুক্ষণ আগে। ভেজা পিচঢালা রাস্তা থেকে সোঁদা গন্ধ আসছে। মেঘ বারান্দায় বসে আছে। তার কোলে সমরেশ মজুমদারের একটা উপন্যাস। বইটার নাম সে খেয়াল করেনি, কিন্তু সমরেশ বাবুর গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যে সে কখন যে হারিয়ে গিয়েছিল, টেরই পায়নি। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে তার কপালে থাকা অবাধ্য চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে গেল। মেঘের হুঁশ ফিরল। কাল তার কলেজে প্রথম ক্লাস। অথচ সে এই রাত দুপুরে বারান্দায় বসে উপন্যাসের ট্র্যাজেডিতে ডুবে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ক। মানুষের মন বড় বিচিত্র। যা করা উচিত, মন তার উল্টোটা করতে চায়। ঠিক সেই মুহূর্তে নিচে একটা পরিচিত শব্দ হলো। ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ ম্লান আলোয় মেঘ দেখল একটা সাদা রঙের গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকছে। আবির ভাই! মেঘের বুকটা অকারণে ধক করে উঠল। মেঘ চট করে ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। একটা বেজে তেরো মিনিট। তার মানে লোকটা এই অসময়ে ফিরল!
”হায় আল্লাহ! আবির ভাই যদি দেখে ফেলে আমি এখনো জেগে আছি, তবে তো কুরুক্ষেত্র বেঁধে যাবে। কানে ধরে ওঠবস করানোটা তো তার কাছে ডালভাত।”
মেঘ ঝড়ের গতিতে বারান্দা ছেড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। খট করে সুইচে চাপ দিয়ে ঘরের সব আলো নিভে দিল। ঘর এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু মনটা তো বড্ড অবাধ্য। সে গুটিগুটি পায়ে জানালার কাছে গিয়ে থাই গ্লাসটা সামান্য সরালো। পর্দার আড়াল দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখল আবির ভাই গাড়ি থেকে নামছে। গায়ে একটা ধবধবে সাদা টি-শার্ট। ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় তাকে কেমন যেন সুদর্শন সুদর্শন দেখাচ্ছে। মেঘ নিজেকেই নিজে বিড়বিড় করে প্রশ্ন করল, “মেঘ, তুই এই লোকটাকে লুকিয়ে দেখছিস কেন? তোর কি মতিভ্রম হয়েছে?”
নিজের ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়ে মেঘ চট করে জানালার পর্দা টেনে দিল। কিন্তু বুকের ভেতরকার শব্দটা যেন ড্রাম বাজানোর মতো বাড়ছে। তেষ্টায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে পানির ফ্লাক্সটা হাতে নিল। খালি! রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মেঘের মনে হলো সারা বাড়ি কেমন চুপচাপ চুপচাপ। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় আসতেই একটা শব্দ তার কানে এল। টুং টাং… গিটারের সুর! সুরটা বিষণ্ণ, কিন্তু মোহনীয়। মেঘের পা দুটো যেন তার কথা শুনল না, যন্ত্রচালিত মানুষের মতো সে দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ঘরের দিকে এগোতে লাগল। আবির ভাইয়ের রুম। দরজাটা ভেজানো। মেঘ দরজায় কান পাতল। ভেতর থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ গেয়ে উঠল, তবে খুব নিচু স্বরে। গিটারের তারে যেন আবির ভাই নিজের নিজেকে বেঁধে ফেলেছে। মেঘ মনে মনে ভাবল, “মানুষটা দেখতে কত রূঢ়, অথচ তার আঙুলের ছোঁয়ায় গিটারটা কাঁদছে। অদ্ভুত! কী হয়েছে আজ লোকটার?”
বেশ কিছুক্ষণ সেই মায়াবী সুরে দাঁড়িয়ে রইল মেঘ। তারপর হঠাৎ করেই তার হুঁশ ফিরল। সে এখানে কী করছে? যদি দরজাটা হঠাৎ খুলে যায়? আবির ভাই যদি সেই রহস্যময় হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, “কী রে মেঘ, এই রাতদুপুরে দরজায় আড়ি পাতছিস কেন?”
তবে তো মান-সম্মান সব যাবে! মেঘ দ্রুতপায়ে রান্নাঘর থেকে পানি নিয়ে নিজের রুমে ফিরল। বিছানায় গিয়ে কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল সে। গিটারের সেই বিষণ্ণ সুরটা তখনো তার কানের ভেতর খেলা করছে। মেঘের খুব ইচ্ছে হলো একবার আবির ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আবির ভাই, মধ্যরাতে কি গিটার বাজাতে হয়? আপনি কি জানেন না, এই সুরে কারো কারো ঘুম চিরতরে উড়ে যেতে পারে?”
আবির ভাই পর্ব ৬
কিন্তু মেঘ কিছুই বলতে পারল না। বাইরে মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ দেখা দিয়েছে কি না জানা নেই, তবে মেঘের চোখের পাতায় তন্দ্রা একাকার হয়ে গেল। আগামীকাল কলেজে প্রথম দিন। নতুন জীবন। অথচ মেঘের সমস্ত পৃথিবীটা এখন গিটারের ঐ বিষণ্ণ ছন্দে আটকে আছে।
