আবির ভাই পর্ব ৮
উর্মিলা মজুমদার
পরদিন সকালে মেঘের ঘুম ভাঙল না, বরং বলা ভালো ঘুমকে জোর করে ভাঙিয়ে দেওয়া হলো। এই কাজটা নিরন্তর করে যাচ্ছে অরু। মানুষের ঘুমের ভেতর মহাজাগতিক আনন্দ থাকে। অরু সেই আনন্দ মাটি করতে ওস্তাদ। সে মেঘের শিয়রে দাঁড়িয়ে ডাইনোসর মার্কা চিৎকার শুরু করেছে।
“মেঘ ওঠ না? আরে আজ আমাদের কলেজ যেতে হবে তো। তুই কি জানিস এখন কয়টা বাজে?”
মেঘ হাই তুলতে তুলতে চোখ মেলল। মজা করে আবোল তাবোল শুধাল, “অরু, পৃথিবীতে সব কাজ কি সময় মেনেই করতে হবে? মহাকালের বিচারে কয়েক ঘণ্টা এদিক-ওদিক হওয়াতে আকাশের তারাগুলো কি খসে পড়বে?”
অরু মেঘের যুক্তিতে কান দেওয়ার পাত্রী নয়। সে রীতিমতো তর্জন-গর্জন শুরু করল, “রাখ তোর মহাকাল! নয়টা পচিশ থেকে ক্লাস শুরু হবে। এখনই তুই আটটা বাজিয়ে ফেলেছিস। কলেজ যাবো কখন, রেডি হবো কখন? মেঘ ওঠবি নাকি মাথায় এক বালতি পানি ঢালবো?”
অরুর শেষ কথাটি বেশ বিপজ্জনক। সে যা বলে, তা করতে পারে। অগত্যা মেঘ বিছানা ছাড়ল। রাতে ঘুমাতে দেরি হয়েছিল। কেন দেরি হয়েছিল, সেই কারণটা মস্তিষ্কের কোনো এক কোণায় লুকিয়ে আছে, কিন্তু মেঘ সেটাকে এখন সামনে আনতে চাচ্ছে না। মেঘলা ভোরে মানুষের মন কুয়াশার মতো হওয়া উচিত, সেখানে গত রাতের উত্তাপ থাকা ঠিক না। মেঘ ওয়াশরুমে ঢুকে নিজেকে প্রস্তুত করল।
আজ মেঘের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। কলেজের প্রথম দিন। পরনে ধবধবে সাদা কলেজ ড্রেস। আয়নায় নিজেকে দেখল। চুলগুলো সযত্নে দুটো বেণী করল। গ্রামে থাকা আম্মুর কথা হঠাৎ মনে পড়ায় কল দিল। মাত্র দুই মিনিট কথা হলো, কিন্তু এই সামান্য কথাটুকুই মেঘের বুক পাঁজরে শীতলতা এনে দিল। তাড়া দিয়ে লাভ নেই, কারণ তাড়াহুড়ো করলে সময় আরও দ্রুত পালায়। তবুও অরুর ঠেলায় দ্রুত নাস্তা শেষ করল। বাড়ির নিচে এসে মেঘের বিস্ময়ের সীমা রইল না। অরু তরতর করে গিয়ে আবির ভাইয়ের গাড়িতে বসে পড়েছে। মেঘ অবিশ্বাসের স্বরে নিশপিশ করে আওড়াল,
“অরু, তুই আবির ভাইয়ের গাড়িতে বসলি কেন? ভাইয়া কি আজ অফিস যাবে না?”
অরু জানালার বাইরে মাথা বের করে ধমক দিল, “তোকে অত সাত-সতেরো ভাবতে হবে না। দ্রুত গাড়িতে ওঠ। আমাদের আজ আবির ভাই কলেজ পৌঁছে দেবে। আর বেশি ভনিতা করিস না, তাহলে একা একা রিকশায় যেতে হবে। চুপচাপ ওঠ তো!”
মেঘ ভুরু কুঁচকে গাড়িতে উঠল। আবির ভাইয়ের গাড়িটা বেশ সুন্দর। কিছুক্ষণ পর আবির ভাই এলেন। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, চমৎকার করে ইন করা। আজ সাথে ব্লেজার নেই। ব্লেজার ছাড়া ওনাকে কেমন যেন একটু সহজ দেখাল। অবশ্য মেঘের তাতে কী?
মেঘ ঠোঁট উল্টে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। আবির ভাই ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। পুরো গাড়িতে একটা গুমোট নীরবতা। মেঘ কোলের ওপর কলেজ ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বসে আছে। বারবার নিজেকে অন্যমনস্ক রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু অবাধ্য মনটা বারবার গত রাতের সেই মুহূর্তগুলোকে টেনে আনছে। গত রাতে আবির ভাইয়ের চাহনি কাহিনী বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে।
মেঘের নিশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। সে কি ভয় পাচ্ছে? নাকি উত্তেজনা তাকে গ্রাস করছে? আব্বু হলে হয়তো নির্ঘাত বলত, “মেঘ, তোর ভেতরে জ্যোৎস্নার সংক্রমণ ঘটেছে।”
গাড়ি একটা ট্রাফিক সিগন্যালে এসে থামল। রাস্তার ধারে একটা আইসক্রিম ভ্যান। রঙিন কাঁচের ওপাশে সাজানো কত রকমের আইসক্রিম! হঠাৎ মেঘের ভেতরে পাগলামি চাড়া দিয়ে উঠল। সমস্ত গাম্ভীর্য আর জড়তা ঝেড়ে ফেলে সে চেঁচিয়ে উঠল, “আবির ভাই, গাড়ি থামান! আমি আইসক্রিম খাবো।”
অরু প্রায় আঁতকে উঠল। সে খপ করে মেঘের মুখ চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “পাগল হয়ে গেছিস মেঘ? চুপ কর! আবির ভাই এক্ষুনি আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেবে। তুই জানিস না, উনি রাস্তার এসব আজেবাজে জিনিস কেনা তো দূরের কথা, ফিরেও তাকান না।”
অরুর ভয়টা অমূলক নয়। ওনার মতো পারফেকশনিস্ট মানুষ রাস্তার ধুলোবালি মেশানো আইসক্রিম খাবে, এটা ভাবাও পাপ। কিন্তু জগতের সব হিসেব সব সময় মেলে না।
আবির ভাই কোনো কথা বললেন না। কোনো তিরস্কারও করলেন না। নিঃশব্দে গাড়িটা রাস্তার একপাশে পার্ক করলেন। তারপর গাড়ি থেকে নেমে আইসক্রিম ভ্যানের দিকে এগিয়ে গেলেন। অরুর মুখটা তখন দেখার মতো। সে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, যেন কোনো এলিয়েন দেখছে।
কিছুক্ষণ পর আবির ভাই দুটো আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলেন। একটা মেঘের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। মেঘ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেটা হাতে নিল। অরু বিড়বিড় করে বলছে, “এটা অসম্ভব! আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি আর প্রেমা একবার ঢাকার বাইরে যাওয়ার পথে আইসক্রিম খেতে চেয়েছিলাম। সেদিন আবির ভাই আমাদের লেকচার শুনিয়েছিলেন ‘এসব রাস্তার নোংরা জিনিস খেলে অসুখ বাঁধবে, পেটের সমস্যা হবে।’ অথচ আজ…!”
অরুর কথাগুলো মেঘের কানে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মেঘ এখন আইসক্রিম পেয়ে অন্য জগতে বাস করছে। আবির ভাই গাড়ি চালাতে শুরু করেছেন। চকলেট আইসক্রিম জিভে অন্যরকম স্বাদ দিচ্ছে। মেঘ আয়নায় আবির ভাইয়ের দিকে একবার তাকাল। ওনার মুখভঙ্গি আগের মতোই গম্ভীর। অরু বোধহয় ধাক্কাটা সইতে পারছে না। সে মেঘের হাত থেকে আইসক্রিমের একটা অংশ নিয়ে মুখে পুরল। মেঘ রক্তিমাভ চোখে তাকাল। তবে কিছু বলল না। পরে নাহয় উশুল তুলবে।
মেঘ জানালার বাইরে তাকালা। রোদের তেজ বাড়ছে। আচ্ছা জীবনটা কি তবে উপন্যাসের পাতা থেকেও বেশি চমকপ্রদ? আবির ভাই কেন আজ কোনো কথা না বলে মেঘের কথা শুনলেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো দিন পাবো না অরু পাবে না। গাড়িটা কলেজের দিকে এগোচ্ছে। আজ প্রথম দিনের ক্লাস কলেজে।
রাত আটটা। ঘড়ির কাঁটা নয়টার ঘর ছুঁইছুঁই করলে সেটাকে আর শুধু রাত বলা যায় না, কবিদের পরিভাষায় সেটা ‘গভীর সন্ধ্যা’। আবির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিল। নেভী ব্লু শার্টের ওপর একই রঙের ব্লেজার। গলায় টাইয়ের ফাঁসটা আঁটসাঁট। তাকে দেখতে অসম্ভব সুদর্শন লাগছে। অবশ্য সুন্দরের সংজ্ঞায় একেকজনের কাছে একেক রকম।সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আবিরের পায়ে দ্রুত ছন্দ। দেরি হয়ে গেছে।
মির্জা সাহেবের ছেলের এনগেজমেন্ট। সেখানে সময়মতো না পৌঁছালে সামাজিক মর্যাদায় টান পড়ে। আবার মাঝপথে রায়হানকে তুলতে হবে। ড্রয়িং রুমের সোফায় মেঘ বসে ছিল অরুর সাথে। মেঘের চোখের দৃষ্টিতে আজ অন্যরকম একটা ঘোর। আবির যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছে, মেঘ সেদিকে একমনে তাকিয়ে রইল। অরু মেঘের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কিরে? পরে না চোখের পলক, কী তোমার রূপের ঝলক?”
মেঘ চমকে উঠল। লজ্জায় তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে লাল থেকে বেগুনী বর্ণ ধারণ করল। লজ্জা কাটাতে মেঘ অন্যদিকে তাকাল, কিন্তু কান পড়ে রইল আবিরের দিকে। ঠিক তখনই আবির ভাই বড়ো আম্মুর উদ্দেশ্যে বলল, “আম্মু, আমি মির্জা সাহেবের ছেলের এনগেজমেন্টে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হতে পারে।”
মেঘের হঠাৎ খুব রাগ হলো। প্রচণ্ড রাগ। আবির ভাই তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, কিন্তু একবারের জন্যও ফিরে তাকাল না। একটা মানুষ এতোটা নিষ্ঠুর হয় কীভাবে? তাকে কি একবারও মেঘের এই ব্যাকুল চাহনি চোখে পড়ল না? রাগটা মেঘের মাথার ভেতরে ঝিঁঝিঁ পোকার মতো ডাকতে শুরু করল। তার ইচ্ছে হলো, এই মুহূর্তেই যদি সে ড্রয়িং রুমের ফুলদানিটা মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভাঙতে পারত, তবে হয়তো কলিজার ভেতরটা একটু শান্ত হতো।
হুহ্! অন্যদিকে আবির তখন স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে বসে আছে। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়া হয়নি। এসি অন। কাঁচ তোলা। ভেতরে গুমোট গরম থাকার কথা নয়, কিন্তু আবিরের শরীরের ভেতর চলছে অন্যরকম এক দহন। সে দাঁত চেপে নিজেকে সামলাচ্ছে। মেয়েটার সাহস তো কম নয়! কীভাবে তাকিয়ে ছিল তার দিকে? দিনকে দিন মেয়েটার সাহস বেড়ে যাচ্ছে তো।
আবিরের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এসি ছাড়া গাড়িতে মানুষ ঘামে? কিন্তু আবিরের এই ঘামটা আবহাওয়ার কারণে নয়। এই ঘামটা পরাজয়ের ঘাম। সে মেঘকে উপেক্ষা করার অভিনয় করেছে ঠিকই, কিন্তু মেঘের ওই ‘পাগলাটে চাহনি’র তীব্রতা সে পিঠে অনুভব করেছে। মনে হয়েছে এক জোড়া জ্বলন্ত কয়লা তার পিঠের ওপর রাখা হয়েছে। মেঘ কি জানে না ওই দৃষ্টিতে কী মারণাস্ত্র লুকানো থাকে? হঠাৎ পকেটে রাখা ফোনটা বিশ্রী স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। রায়হানের ফোন। রায়হান ফোনের ওপাশ থেকে হয়তো বলবে, “ আমি রেডি। তুই কি কোথায়, ইয়ার?”
আবির ফোনটা রিসিভ করল। অতঃপর কেটে দিল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়িটি যখন সদর রাস্তা ধরল, অথচ তার কানে মেঘের সেই অস্ফুট শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ বাজছে এখনো। মাঝপথ থেকে রায়হানকে তুলে নিল সে। রায়হান গাড়িতে উঠেই বলল, “কিরে আবির, তোর মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেন? এনগেজমেন্টে যাচ্ছিস নাকি কারো শোকসভায়? আর তুই এত ঘামছিস কেন? গাড়িতে কি এসি কাজ করছে না?”
আবির কোনো উত্তর দিল না। সে মির্জা সাহেবের বাড়ির দিকে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। মেঘ তখন জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে আছে অন্ধকার আকাশের দিকে। জোছনা নেই, কিন্তু মেঘের মনে হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী এক অন্ধকার কুয়াশায় ঢাকা। বোধহয় মনে মনে বলল, “যান আবির ভাই, ফিরে তো আসতেই হবে। এই পথ দিয়েই তো ফিরবেন। আমি অপেক্ষায়।”
আবির ভাই পর্ব ৭
কিন্তু মুখ ফুটে সেই বুলি আহ্বান হবে না কভু। মানুষের প্রতীক্ষা বড় অদ্ভুত জিনিস। মির্জা সাহেবের ছেলের এনগেজমেন্ট হবে, আবির ভাই নিশ্চিত সেখানে অনেক মজা করবেন কিন্তু মেঘের এই যে দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভিমান, এর কি কোনো শেষ আছে? সম্ভবত নেই।
