Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৭

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৭

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৭
সাবিলা সাবি

ডাইনিং টেবিলের আলোটা আজ একটু বেশিই ম্লান মনে হচ্ছে। খাবার সাজানো থাকলেও কেউ মুখে কিছু তুলছে না। লিওনের ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া কালচে র/ক্ত আর ফোলা ভাবটা কারো নজর এড়ানোর উপায় নেই।
লিওনের বাবা-মায়ের পাশাপাশি টেবিলে বসেছিল মায়া। লিওনের মুখের দিকে চোখ পড়তেই মায়ার হাত থেকে চামচটা প্রায় খসে পড়ল। ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা কালচে র*ক্ত আর বী*ভৎস ফোলাভাব দেখে সে শিউরে উঠল। অস্থিরতায় চেয়ার ছেড়ে কিছুটা ঝুঁকে এসে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “লিও ভাইয়া, তোমার ঠোঁটে কী হয়েছে? র*ক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে যে!”
সাথে সাথে আর্থার হায়াসও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, “হ্যাঁ, লিওনার্দো কী করে এমন হলো তোমার? কোনো অ্যা*ক্সিডেন্ট হয়েছে নাকি?”

লিওন মাথা নিচু করে খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো জানে, এই দাগ কিসের। বাবার চোখের দিকে সরাসরি না তাকিয়েই সে শান্ত স্বরে নিজের বানানো মিথ্যেটা সাজাল, “কিছু না ড্যাড, অফিসের ফরেনসিক ল্যাবে এক্সপার্টের সাথে কাজ করার সময় ফরেনসিক সলিউশনের একটা কেমিক্যাল ছিটকে পড়েছিল। লা*শ তদন্তের সময় ল্যাবের কাজটা একটু তাড়াহুড়ো করে করতে গিয়ে রিঅ্যাকশনে চামড়াটা সামান্য পুড়ে গেছে।”
মিথ্যে বলার মতো শারীরিক ধকল সামলানোর শক্তিও তখন লিওনের ছিল না। এক গ্রাস খাবার মুখে দিতেই ঠোঁটের ক্ষতস্থানে জ্বলন্ত কয়লার মতো দহন শুরু হলো। ব্যথার তীব্রতায় তার স্নায়ুগুলো বিদ্রোহী হয়ে উঠল। সে দ্রুত গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি পানের চেষ্টা করল, কিন্তু পানির শীতল স্পর্শ আগুনের হলকার রূপ নিয়ে ক্ষতস্থানটিকে দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল। অসহ্য যন্ত্রণায় তার কপাল কুঁচকে উঠল, খাবার কিংবা পানি—কোনো কিছুই গলা দিয়ে নামল না। সে প্লেট থেকে হাত সরিয়ে নিল।
আর্থার হায়াস অস্থিরভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের যন্ত্রণাকাতর মুখ দেখে তার কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল, “এভাবে যন্ত্রনা সহ্য করছো কেনো? আমি এখনই ডক্টর এহসানকে ফোন করছি, তুমি শান্ত হয়ে বসো।”

লিওনের মায়ের চোখের কোণেও তখন জল চিকচিক করে উঠল। কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি বললেন, “হ্যাঁ, ডাক্তারকে ডাকাটাই জরুরি। ইনফেকশন হয়ে গেলে বিপদ বাড়বে ছেলেটার।”
লিওন হাত নেড়ে তাদের থামিয়ে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “ডোন্ট ওয়ারি! ডাক্তার লাগবে না। একটা অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগিয়ে নেব, কালকের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। তোমরা খাওয়া শুরু করো, আমার আসলে আর খিদে নেই।”
মায়া করুণ চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার এই অস্থিরতা আর ঠোঁটের সেই ক্ষত মায়াকে খুব বেশি ভাবিয়ে তুলল। সে নিচু স্বরে বলে উঠল, “লিও ভাইয়া, একটু সাবধান হওয়া যায় না? নিজের প্রতি তো একটু খেয়াল রাখবে! কিছু খেতেও পারছ না, এভাবে চললে কী করে হবে?”
মায়ার কথার কোনো উত্তর দিল না লিওন। তার ঠোঁটের ওই ক্ষত কোনো রাসায়নিকের দহন নয়, ভাইপারের দেওয়া চরম অপমান—যা কোনো মলমে শুকানোর নয়। সে একদৃষ্টিতে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল, আর তার মনের ভেতরে তখন ভাইপারের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনাগুলো লাভার মতো ফুটতে শুরু করল।

ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে লিওন সোজা নিজের ঘরে চলে এল। কিছুক্ষণ পরেই দরজার ডিজিটাল প্যানেলে মৃদু একটা বিপ শব্দ হলো—পাসকোড চেপে মায়া রুমের ভেতরে ঢুকল। হাতে তার ফার্স্ট এইড বক্স। মায়াকে দেখেই লিওন বিছানায় উঠে বসল। মায়ার দিকে তাকিয়ে তার কণ্ঠে বিরক্তির বদলে ফুটে উঠল কোমলতা। সে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, “এই অসময়ে কেন এসেছিস মায়া?”
মায়া কোনো উত্তর না দিয়ে লিওনের সামনে বসলো তারপর বক্সটা টেবিলের ওপর রাখল। সে খুব সাবধানে কটন বাডটি মলমে ডুবিয়ে লিওনের ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটের ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিতে শুরু করল কোনো সতর্কতা ছাড়াই।

মলমের ছোঁয়ায় লিওনের সারা শরীরে মৃদু একটা কম্পন খেলে গেল; ঠোঁটের অসহ্য জ্বালাপোড়ায় তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে এল। মায়া পরম মমতায় ক্ষতস্থানটিতে আলতো করে ফুঁ দিতে উদ্যত হলো। কিন্তু লিওন এক ঝটকায় মাথা সরিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “ইটস ওকে মায়া, আমি ঠিক আছি।” তার কণ্ঠস্বরের সেই যান্ত্রিক শীতলতাটুকু মায়ার বুকটা অকারণে হিম করে দিল।
মলম লাগানো শেষ হলে মায়ার চোখ হঠাৎ আটকে গেল লিওনের হাতের দিকে। গত কয়েক মাস ধরে যে এনগেজমেন্ট রিংটি লিওনের আঙুলে অটুট ছিলো, আজ সেখানটায় শূন্যতা। মায়া ভ্রু কুঁচকে সংশয় নিয়ে বিস্ময় কণ্ঠস্বরে বলল, “লিও ভাইয়া, তোমার হাতে আমাদের এনগেজমেন্টের আংটিটা কোথায়?”
লিওন নিজের খালি আঙুলের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। এত বড় একটা বিষয় তার নজরেই পড়লো না! মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গত রাতের সেই পার্টির মুহুর্ত আর ভাইপারের পাঠানো হোটেল রুমের তাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবিগুলো। নিজেকে সামলে নিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করল, “কাল এক কলিগের বার্থডে ছিলো সেই পার্টিতে অনেক ভিড় ছিল, হয়তো কোথাও পড়ে গেছে। চিন্তার করিস না, আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। যেভাবেই হোক।”

মায়া মৃদু হেসে বলল, “থাক না ভাইয়া, ওটা নিয়ে অত অস্থির হতে হবে না। এমন কিছু বড় ক্ষতি তো হয়নি। বরং বিয়ের সময় আমরা নতুন করে আবার আংটি বদল করে নেব,আর ওটা আরও স্পেশাল হবে।”
মায়ার কথার মাঝখানে লিওন হঠাৎ তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার দৃষ্টিতে গভীর সংশয় স্পষ্ট সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “মায়া, তুই কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করতে চাস?”
প্রশ্নের আকস্মিকতায় মায়া থমকে গেল। সে মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে রইল লিওনের স্থির দৃষ্টির সামনে। মায়া কোনো কথা বলল না, শুধু দীর্ঘ একটা মুহূর্ত লিওনের চোখের অতল গভীরে ডুব দিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “কেন লিও ভাইয়া? তুমি কি চাও না যে আমি তোমার জীবনসঙ্গী হই?”

লিওন মায়ার চোখের অতল গভীরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করল। তার ক্লান্ত চোখেমুখে একরাশ অবসাদ, কিন্তু কণ্ঠে ইস্পাত-কঠিন নিশ্চয়তা। সে ধীরে ধীরে বলল, “তুই যদি আমাকে বিয়ে করে হ্যাপি হস, তবে সেটাই হবে। আর দেরি করা ঠিক হবে না, মায়া… আমি খুব দ্রুতই আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলবো।”
কথাটা বলেই লিওন অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু তার মনের ভেতরে তখন এক গহীন কালো মেঘের আনাগোনা। ভাইপারের মতো এক ভয়ংকর ক্রিমিনালের অসুস্থ পাগলামি আর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত বিয়ে করে থিতু হয়ে যাওয়াই এখন তার কাছে একমাত্র সুরক্ষার পথ। সে জানে, এই সম্পর্ক তাকে ভাইপারের কালো ছায়া থেকে হয়তো কিছুটা হলেও আড়াল করবে, ফিরিয়ে আনবে জীবনের ছন্দ। মায়া অপলক চোখে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। লিওনের স্থির অথচ ক্লান্ত চাহনিতে ধরা পড়া সেই অপরাধবোধ মায়ার হৃদয়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করল। লিওন কি বুঝতে পারছে না যে, সে আসলে কাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে? ভাইপারের সেই ভয়াবহ ছায়ার বিপরীতে এই সম্পর্কটি হলো অনিশ্চিত গন্তব্যের হাতছানি। লিওনের অস্ফুট দীর্ঘশ্বাসটি ঘরের নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল; সে আপ্রাণ চেষ্টা করল মায়ার মুখোমুখি না হতে, অথচ তার মুষ্টিবদ্ধ আঙুলগুলোই বলে দিচ্ছিল, প্রতিশোধের দাবদাহ আর অস্তিত্ব রক্ষার তীব্র আর্তিতে সে কতটা ক্ষতবিক্ষত।

এদিকে শহরের অন্য প্রান্তে মেফেয়ারের টাউনহাউস। এই অট্টালিকার ভেতরে এমন এক গোপন কক্ষ আছে, যেখানে ভাইপারের অনুমতি ছাড়া কারো প্রবেশ নিষেধ। একমাত্র ব্যতিক্রম ইভানা। কক্ষটির পরিবেশ এতটাই ভারী আর থমথমে যে, সেখানে পা রাখলেই গা ছমছম করে ওঠে।
ঘরের মাঝখানের ওই বিশাল সাদা দেয়ালটি হিয়ার অসুস্থ মনের এক অদ্ভুত ক্যানভাস হয়ে উঠেছে।রিমোটের বোতামে আলতো চাপ দিতেই প্রজেক্টরের মৃদু স্পন্দনে নিস্তব্ধ ঘরটি কেঁপে উঠল; মুহূর্তের মধ্যে দেয়ালে ফুটে উঠল লিওনের বিশাল এক থ্রিডি স্থিরচিত্র। প্রজেক্টরের নিখুঁত প্রক্ষেপণে তার চিন্তাক্লিষ্ট মুখাবয়ব এমনভাবে ভেসে উঠল যে, মনে হয় লিওন এইমাত্র ঘরের অন্ধকার ভেদ করে জীবন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নীলচে আলোর তীব্রতায় এতদিন অন্ধকারে ডুবে থাকা ঘরের প্রতিটি কোণ লিওনের শীতল দৃষ্টির সামনে নগ্ন হয়ে পড়ল। হিয়া রিমোটের দ্বিতীয় ক্লিকে ছবিটিকে আরও কিছুটা বড় করে নিল, এখন মনে হচ্ছে লিওন সরাসরি তার দিকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে।

দেয়ালের থ্রিডি চিত্রটির দিকে তাকিয়ে হিয়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একরাশ তৃপ্তির হাসি। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে তার প্রিয় চামড়ার চেয়ারটিতে শরীর এলিয়ে দিল। পকেট থেকে ছোট্ট এয়ারবাড বের করে কানে গুঁজে সে মিউজিক প্লেয়ার চালু করল। মিউজিকের মৃদু সুরের তালে তার দেহ হালকা দুলতে শুরু করল। একসময় সুরের নেশায় চোখ বুজে সে নিজে নিজেই বিড়বিড় করে গাইতে লাগল—তার কণ্ঠে তখন উন্মাদনা আর বিষণ্ণতার সুর একসাথে ঝরে পড়ল।
“যায় যদি যাক না সময়, যেয়ো না তুমি অকারণে…
বাসবো ভালো যে আমি তোমাকে মনে প্রাণে…
একা একা লাগে তুমি বিহনে, শূন্য শূন্য লাগে তোমার কারণে….।”
গানটির বিষণ্ণ সুর ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ভারী এক আবহের সৃষ্টি করল, আর হিয়ার সেই উন্মাদনা মনে হলো লিওনের স্থিরচিত্রের শীতল চাহনির সাথে একাকার হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা খোলার মৃদু শব্দ হলো। হিয়ার তীক্ষ্ণ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে মুহূর্তেই সতর্ক করে দিল—এয়ারবাড কানে থাকা সত্ত্বেও সে টের পেল, ইভানা যে ঘরে ঢুকেছে। হিয়া রিমোটের দিকে হাতও বাড়াল না; সে চাইলো ইভানা সবটা দেখুক। দেয়ালে লিওনের সেই বিশালাকার থ্রিডি প্রতিকৃতি ফুটে আছে। ইভানা দরজার মুখেই থমকে দাঁড়াল। লিওনের সেই শীতল চাহনি আর ছবির জীবন্ত উপস্থিতি তার স্নায়ুগুলোকে প্রায় অবশ করে দিল; মুহূর্তের জন্য তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যেতে লাগল।
হকচকিয়ে গিয়ে ইভানা আর্তস্বরে বলে উঠল, “মিস্ট্রেস… এ কী কাণ্ড! সিআইডি অফিসার লিওনার্দোর ছবি এভাবে প্রজেক্ট স্ক্রিন করে রাখা কেনো?”

হিয়া অবিচল! ধীরস্থির ভঙ্গিতে এয়ারবাড খুলে টেবিলের ওপর রাখলো সে। চেয়ার ঘুরিয়ে ইভানার দিকে তাকাল সরাসরি, তার চাহনিতে ছিলো একরাশ বন্য প্রশান্তি। সেখানে কোনো কৈফিয়ত বা তাড়াহুড়োর চিহ্নটুকু নেই। কণ্ঠে এক শীতলতা রেখেই বললো “কী হয়েছে ইভানা? কী বলতে এসেছিস সেটা বল?”
ইভানার কণ্ঠে তখন ভয়ের চেয়ে অবাক হওয়ার তীব্রতাটাই বেশি। সে শ্বাসরুদ্ধকর ভাবে বলে উঠল, “আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না! সিআইডি অফিসার লিওনার্দো! তার ছবি এভাবে প্রজেক্ট করে রেখেছেন কেন? আপনার কি মাথা ঠিক আছে? এটা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছেন?”
ইভানা এখনো ঘোর কাটানো চোখে দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে আছে। হিয়া এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। কোনো রাখঢাক না রেখেই সে শান্ত কণ্ঠে বলল, “কেন আবার? আমার ভালো লাগলো তাই করেছি তার ছবির প্রজেক্ট। দিনরাত ওকে দেখব তাই, এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার আগেও দেখব। আমার ভালো লাগার জন্য কারো অনুমতি লাগে না, আর না কারও তোয়াক্কাও করি আমি।”
ইভানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, কিন্তু সেই কম্পনে বিস্ময়ের চেয়েও বেশি কাজ করছে উদ্বেগ। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “কিন্তু কেন? এই অফিসারের ওপর আপনার এত আবেশ কেন? ও কি জানে যে আপনি ওকে এভাবে ট্র্যাক করছেন? কিংবা আমাদের টিমের অন্য কেউ কি এই পাগলামির কথা জানে?”

হিয়ার চাহনি মুহূর্তেই জমে গিয়ে বরফ হয়ে গেল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ইভানার ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বরে তখন প্রাণহীন শীতলতা।
“খবরদার ইভানা! টিমের কারো কাছে এই কথা যদি কান পর্যন্ত পৌঁছেছিস, তবে তোর জিহ্বা টেনে ছিঁ*ড়ে ফেলব। আর অফিসার লিওন? সে আমাকে এখন খুব ভালো করে জানে। তবে সে আমাকে ঘৃণা করে, তীব্র ঘৃণা! কিন্তু তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। লিওন আমার কাছে কোনো মিশন নয় ইভানা,ও আমার টক্সিক, প্যাথলজিক্যাল, ডেডলি অবসেসন…আমার পেয়ারে লাল।”
ইভানা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মস্তিষ্কের ভেতরে সব তথ্য ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাস ভাইপার—যার হৃদয়ে দয়া-মায়ার লেশমাত্র নেই, যে মানুষ খু*ন করে চোখের পলক ফেলে না, যার ব্যক্তিত্ব প্রতিটি পদক্ষেপে এক কঠিন পাথরের মতোই কঠোরতা বহন করে—সেই মানুষ কিনা কারো প্রেমে পড়েছে! তাও আবার বিপক্ষ একজনের। ইভানার কাছে পুরো বিষয়টা অবিশ্বাস্য, অনেকটা কোনো দুঃস্বপ্নের রূপকথার মতো অবাস্তব লাগছে।
ইভানা সাহস সঞ্চয় করে কাঁপা গলায় বলল, “মিস্ট্রেস, আমি তো আপনাকে এত বছর ধরে চিনি। কোনো ছেলের প্রতি সামান্য আগ্রহও কখনো আপনার মধ্যে দেখিনি। আর এই সিআইডি অফিসার—যে মাত্র দুদিন হলো আমাদের টার্গেটে এসেছে—তার প্রতি আপনার এই আকস্মিক টান? এটা কি সত্যিই ভালো লাগা, নাকি অন্য কোনো ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা?”

হিয়া তার চেয়ারে গা এলিয়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার চোখের চাহনিতে তখন নেশাতুর এক ঘোর। ইভানার দিকে তাকিয়ে সে নিরাসক্ত অথচ গভীর স্বরে বলল, “কে বলেছে এটা দুদিনের টান? এটা সাত বছরের পুরনো এক না বলা ভালোবাসা। ও আমার কলেজ লাইফের একতরফা প্রেম। সেদিন যখন লন্ডনের সিআইডিদের প্রোফাইল লিস্টটা আমার হাতে এল, ওর ছবিটা দেখামাত্র আমার হৃৎস্পন্দন থমকে গিয়েছিল। আমি তখনই বুঝেছিলাম—সৃষ্টিকর্তা লিওনকে আমার করার জন্য তাকে পুনরায় আমার সামনাসামনি এনেছেন।”
হিয়া নিজেরই কোনো এক ঘোরলাগা জগতে ডুবে কথাগুলো বলছিল। তার এই আবেগী রূপ ইভানার মনে ভয়ের চেয়েও বেশি বিস্ময়ের জন্ম দিল। ইভানা কিছুটা দ্বিধা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে খুব সাবধানে বলল, “কিন্তু মিস্ট্রেস… আপনি যা বলছেন তা তো আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু নিউজপেপারে তো দেখেছিলাম, উনি বোধহয় এনগেজড। ওনার বাগদত্তা আছে।”

মুহূর্তের মধ্যে হিয়ার চোখের সেই নেশাতুর চাহনিটা বদলে গেল। পরক্ষনেই হিয়ার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর, নিষ্ঠুর হাসি। অবজ্ঞার সুরে সে বলল, “তো? সেই আংটি তো আমি কাল রাতে খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। এনগেজমেন্ট হয়েছে, বিয়ে তো আর হয়ে যায়নি। আর বিয়ে যদি হয়েও যায়, এমনকি সে ১০ বাচ্চার বাবাও যদি হয়ে যায় তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমার আসক্তি একটুও কমবেনা ওর প্রতি। সে অন্য কারও সাথে বাগদান করেছে তাতে আমার কী? দিনশেষে লিওন আমারই হবে। সেই হবে আমার বাচ্চার বাবা। দ্যাটস সিম্পল।”
ইভানা হিয়ার চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলল। এই ভয়াবহ জেদ, এই বিকারগ্রস্ত উন্মাদনা—ইভানা স্পষ্ট বুঝতে পারছে, লিওন এখন ভাইপারের কাছ থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাবে না। মিস্ট্রেসের এই পাগলামি যে কোনোদিন তাকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে, সেই আশঙ্কায় ইভানার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল।
ইভানা এখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে আছে। নিজের মিস্ট্রেসের এই অবিশ্বাস্য, বিকারগ্রস্ত রূপ দেখে সে পুরোপুরি হতভম্ব। মুহূর্তের মধ্যে ভাইপারের চোখের সেই নেশাতুর চাহনিটা বদলে গেল বিরক্তিতে। ভ্রু কুঁচকে ইভানার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে সে বলল, “হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন? তোর কি গলার ভেতরে মাছি ঢোকার শখ হয়েছে? নাকি আমার কথাগুলো তোর মগজে ঢুকতে দেরি হচ্ছে?”

হিয়ার এই হঠাৎ বদলে যাওয়া মেজাজে ইভানা আঁতকে উঠল। সে দ্রুত ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, তারপর কোনোমতে বলল, “মিস্ট্রেস, আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না… আকাশ আর জমিন যেমন আলাদা, তেল আর জল যেমন কখনোই মিশে যায় না—আপনি আর এই অফিসার তো ঠিক তেমনই দুই মেরুর মানুষ! এটা কীভাবে সম্ভব হবে?
হিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে সেই ভয়ংকর তীব্রতা, যা দেখে ঘরের বাতাসের গতিও স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে ইভানার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ইভানার চিবুকটা নিজের আঙুল দিয়ে আলতো করে উঁচিয়ে ধরল সে, কিন্তু তার চোখের চাহনি ছিল আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উত্তপ্ত। সে ফিসফিস করে সে বলল, “তেল আর জল মিশে না ইভানা, ঠিকই বলেছিস। কিন্তু আগুন? আগুন যখন জলকে স্পর্শ করে, তখন জল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। লিওন আমার কাছে জল, আর আমি আগুন। আমি তাকে ধ্বংস করব না, বরং নিজের তাপে তাকে বাষ্প করে নিজের অস্তিত্বে মিশিয়ে নেব।”

ইভানা ভয়ে জমে গেলেও হিয়া থামল না। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ক্রুর, নিষ্ঠুর হাসি। সে আরও নিচু স্বরে যোগ করল, “আর প্রকৃতির নিয়ম নিয়ে এত চিন্তা করছিস কেন? আকাশ থেকে যখন বৃষ্টি ঝরে, তখন তো সে জমিনকেই স্পর্শ করে সেটাই তো তাদের চিরন্তন মিলন। আর রান্নাঘরের তরকারিতে তেল আর জল তো একসাথেই থাকে, তুই কি সেটা দেখিসনি? সব সম্ভব, ইভানা… সব সম্ভব, যদি আমার ইচ্ছা থাকে।”
হিয়ার প্রতিটা কথাই ইভানার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, এই নারীর সামনে যুক্তি বা বাস্তবতা কোনো কিছুই ধোপে টেকে না।
হিয়া ইভানার কাঁধে হাত রেখে সামান্য চাপ দিল। তার কণ্ঠস্বরে ছিল তীব্র আদেশের সুর, “এবার আর একটাও প্রশ্ন না করে আমার চোখের সামনে থেকে যা। আমার মাথা নষ্ট করিস না।”
ইভানা আর কোনো বাক্য ব্যয় করার সাহস পেল না। হিয়ার এই অমোঘ জেদ আর বিকারগ্রস্ত পাগলামির কাছে পৃথিবীর সমস্ত যুক্তি হার মেনেছে। সে মাথা নিচু করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ইভানার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই হিয়া ধীর পায়ে প্রজেক্টরের দিকে ঘুরে বসল। দেয়ালজুড়ে আবারও ভেসে উঠল লিওনের মুখ—ভাইপারের সাত বছরের পুরনো, এক তরফা আচ্ছন্নতা। ঘরের নিস্তব্ধতায় কেবল শোনা যাচ্ছে তার দীর্ঘশ্বাস, আর তার সেই শীতল চাহনিতে লিওনকে গ্রাস করে নেওয়ার নেশা আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা লিওনের প্রতিচ্ছবির দিকে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার মনে হলো লিওন স্বয়ং সেখানে উপস্থিত, তার সামনে দাঁড়িয়ে। তার শীতল হাতটি ধীরে ধীরে স্ক্রিনের ওপর নেমে এল, সে আলতো করে আঙুল বুলাল লিওনের অধরের রেখায়। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল তার কণ্ঠস্বরের প্রতিটি শব্দেই ছিল এক বিষাক্ত মোহ এবং গভীর আবেশ।
“আমি অপরাধ জগতের অন্ধকারে অভ্যস্ত, আর তুমি আমার সামনে এক টুকরো আলোর মতো ঝকঝকে। কিন্তু বিশ্বাস করো দিলবার, মহাবিশ্বের হাজার নক্ষত্রের আলোও ম্লান হয়ে যাবে তোমার ওই ঠোঁটজোড়ার সৌন্দর্যে। তোমার এই অধরের প্রতিটি রেখায় কোনো নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার গল্প লেখা আছে কি? যখনই তোমার অধরে আমার অধর ছুঁয়েছিল, মনে হলো আমার করা সব অপরাধ, সমস্ত পাপ—এক নিমিষেই তুচ্ছ হয়ে গেল।”

সে সামান্য থামল, তার চোখের চাহনিতে তখনও উন্মাদনা। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে নিজের মনেই হেসে উঠল—এক নিষ্ঠুর অথচ প্রশান্ত হাসি, সে জানে, লিওন তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু এই ঘৃণার তীব্রতা তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না, বরং সেই ঘৃণাটাকেও সে তার এই অসুস্থ ভালোবাসার এক শক্তিশালী রসদ হিসেবে গ্রহণ করেছে। লিওনের তার প্রতি ঘৃণা তাকে আরও বেশি প্রলুব্ধ করে, “বলো তো, এই ঠোঁটজোড়া কি তবে কেবল আমার ধ্বংসের জন্যই তৈরি, নাকি আমাকে বারবার অপরাধে প্রলুব্ধ করার জন্য?”
হিয়ার এই নিষ্ঠুর আবেশে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক ভয়ংকর সত্য—সে কেবল লিওনকে চায় না, সে লিওনের পবিত্রতাকে নিজের অন্ধকারের অতলে মিশিয়ে নিতে চায়। সে নিশ্চিত, এই আলোর টুকরোকে সে যে কোনো মূল্যে নিজের খাঁচায় বন্দি করেই ছাড়বে।

গভীর রাত। চারদিকে নিঝুম নিস্তব্ধতা, শুধু দূর থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক সেই নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলছে। লিওন ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে আছে, কিন্তু সেই ঘুম কোনো শান্তির আবেশ নিয়ে আসেনি। বরং তার অবচেতন মন তখন এক গোলকধাঁধায় বন্দি—এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের গোলকধাঁধা।
স্বপ্নে লিওন দেখছে সেই হোটেল রুমের অন্ধকার আচ্ছন্ন পরিবেশ। চারপাশটা ভারী কোনো কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা, আর তারই মাঝে কুয়াশা চিরে ফুটে উঠছে এক আবছা অবয়ব—ভাইপার। তার চেহারার নিখুঁত আদল স্পষ্ট নয়, কিন্তু সেই ছায়ামূর্তির প্রতিটি নড়াচড়ায় ফুটে উঠছিল এমন এক তৃষ্ণা, যা লিওনের অবচেতন মনকেও অস্থির করে দিচ্ছিল। মেয়েটি যখন ধীরে ধীরে লিওনের ওপর ঝুঁকে এল, হিমশীতল এক স্পর্শে লিওনের সারা শরীরে বিদ্যুতের তীব্র ঝলক খেলে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, ভাইপার তার ঠোঁটজোড়া নিষ্ঠুরভাবে দখল করে নিচ্ছে।

লিওন প্রথমে নিজেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তার শরীর আজ তার নিজেরই অবাধ্য হলো। ভাইপারের গা থেকে ভেসে আসা নারীসুলভ মাদকতাময় সুবাস আর এক আকর্ষণীয় নারীদেহের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথেই লিওনের পুরুষসত্তা এক তীব্র চাহিদায় দিশেহারা হয়ে পড়ল। ঘৃণার চরম শিখরে দাঁড়িয়েও সে টের পেল, তার প্রতিটি স্নায়ু সেই অপরাধীর শরীরী উষ্ণতার কাছে এক মুহূর্তেই নতি স্বীকার করে বসছে। নিজের অজান্তেই তার হাতজোড়া নেমে এল ভাইপারের সেই চিকন, লতানো কোমরের ভাঁজে; তার ভেতরটা তখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। ভাইপারের প্রতি জমে থাকা তীব্র ঘৃণা আর তার শরীরের সেই মাদকতাময় পরশের কাছে তার পৌরুষের লজ্জাজনক পরাজয়—দুইয়ের টানাটানিতে সে ভেতর থেকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। সেখান থেকে আলতো করে আঙুলগুলো উঠে এল তার পিঠের মসৃণ রেখা বরাবর। তার হাতের নিচে ভাইপারের কোমরের সেই লতানো আদল লিওনের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে এক অতল অজানায় ডুবিয়ে দিল। তার হাত দুটো প্রবল আবেগে ভাইপারের চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, আর সেই মুহূর্তেই তার মনের ভেতর ঘৃণা আর তীব্র আকাঙ্ক্ষার মিশ্রনে এক ভয়াবহ ঝড় বয়ে গেল। এই নিষিদ্ধ উন্মাদনা লিওনের নিজের কাছেই অসহ্য লাগছে, অথচ সে নিজেকে থামাতে অক্ষম এই মুহূর্তে। তার ভেতরটা তখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা। ভাইপারের মতো ক্রিমিনালের শরীরের সেই মাদকতাময় পরশের কাছে তার পৌরুষের লজ্জাজনক পরাজয় তাকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দিচ্ছিলো।

হঠাৎই এক তীব্র যন্ত্রণায় তার ঘুম ভেঙে গেল। লিওন ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। নিজের হাতের তালু দিয়ে নিজের ঠোঁটটাকে জোরে ঘষল সে—সেই অপবিত্র স্পর্শকে সে এখনই মুছে ফেলতে চাইছে। তার মনে হলো, ঘুমের ঘোরে সে কেবল স্বপ্নই দেখেনি, বরং সেই ঘোরকে সে নিজের অজান্তেই মনে মনে বরণ করে নিয়েছে। এই অনুভূতি লিওনের নিজের কাছেই এক চরম অপরাধবোধের মতো বিঁধছে, যা তাকে ভেতর থেকে রক্তাক্ত করে তুলছে।
বিছানা থেকে নেমে লিওন দ্রুত পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের গুমোট, অন্ধকার আকাশটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ভাবল, ক্রিমিনাল ভাইপারের ছায়া তার স্বপ্নের সীমানাতেও হানা দিয়ে দিলো? ঘুমের শান্তির আড়ালে সেই নারী কি তাকে এভাবেই নিজের নিয়ন্ত্রণে বন্দি করে রাখবে? তার মন, তার শরীর—সবকিছু কি সে ধীরে ধীরে নিজের করে নিতে চাইছে? ওই স্বপ্নের অমোঘ আকর্ষণের কাছে হেরে যাওয়ার লজ্জা আর ক্ষোভ লিওনের ভেতরটাকে তীব্র দহনে জ্বালিয়ে মারছে।

শহরের অন্য প্রান্তে, মেফেয়ারের টাউন হাউসে হিয়ার গোপন কক্ষের নিস্তব্ধতায় সে তখন ঘুমের গভীরে তলিয়ে আছে। তার দীর্ঘ চোখের পাতায় এখন এক স্বপ্নিল আবেশ, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু হাসি বলছে সে কোনো এক অজানায় হারিয়ে গেছে। তার অবচেতন মন তাকে নিয়ে গেছে এক কাল্পনিক স্বর্গে, যেখানে বাস্তবতার কোনো দেয়াল নেই, নেই কোনো ঘৃণা বা অপরাধবোধ। সেখানে কেবল সে আর তার টক্সিক অবসেশন লিওন একে অপরের বাহুবন্দি।

হিয়ার স্বপ্নে লিওনের সেই শক্তিশালী, বলিষ্ঠ শরীরের ওপর সে পরম তৃপ্তিতে এলিয়ে আছে। লিওনের উষ্ণ হাতের স্পর্শ তার কোমরের ভাঁজে, আর তার চোখের দৃষ্টিতে সেই পরিচিত ঘৃণা নয় বরং সেখানে আছে নেশাতুর মুগ্ধতা। লিওন পরম আবেগে তীব্র আকাঙ্ক্ষায় হিয়ার গ্রীবায় আর ঠোঁটের কোণে চুমু এঁকে দিচ্ছে। সেই স্পর্শের মাদকতায় হিয়া অনন্ত সুখের সাগরে ভেসে যাচ্ছে। স্বপ্নের ঘোরেই তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক মৃদু, মায়াবী হাসি। বাস্তব জগতে যে ভাইপারের হাত হাজারো রক্তের দাগে কলঙ্কিত, যে কি না র*ক্তপাত দেখে অভ্যস্ত—স্বপ্নের এই লিওনের স্পর্শে সে আজ এক শান্ত, কোমল নাজুক নারীর মতোই হয়ে উঠেছে। সেই ঘোরলাগা আবেশে সে বিড়বিড় করে উঠল, “ঠিক এভাবেই… শুধু আমার হয়ে থেকো সারাজীবন, দিলবার।”
সে এক মুহূর্তের জন্যও এই মায়া থেকে বেরোতে চাইছে না। স্বপ্নের সেই বাস্তবতায় লিওনের আলিঙ্গন তাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, বাইরের জগতের কোনো কোলাহল বা অপরাধের গ্লানি তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। ভাইপারের এই স্বপ্ন কেবল এক মুহূর্তের সুখ নয়, এটা তার সমস্ত অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার এক প্রবল বিস্ফোরণ—সে নিজের অবচেতন মন দিয়ে লিওনের হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার ভাঙার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর সেই তীব্র আবেশে হিয়ার শরীর তখনো থরথর করে কাঁপছিল। সে আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারল না। অস্থিরতায় ঘর থেকে বেরিয়ে এল, উদ্দেশ্যহীনভাবে বাইক রাইড করতে করতে এক সময় বাইক এসে থামল লিওনের বাড়ির ঠিক সামনে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় হিয়া সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কাছে লিওন মানেই সব—ভালোবাসা, মরীচিকার মতো আবেশ, আর ধ্বংসের একমাত্র গন্তব্য।

কালো হুডির আড়ালে নিজের অস্তিত্ব ঢেকে হিয়া তার বাইকের ওপর হেলান দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত, এই গভীর রাতে লিওন এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তবু তার এই অপেক্ষায় রয়েছে এক প্রকার জেদ যে তার হৃদয়ের এক অবাধ্য বিদ্রোহ। সে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল দোতলার বারান্দারটার দিকে, যেখানে মৃদু আলোয় লিওনের ঘরের পর্দাগুলো নড়ছে।
হঠাৎ করেই লিওন বারান্দায় বেরিয়ে এল, হাতে তার ধোঁয়া ওঠা এক মগ কফি। নিঝুম রাতের নিরেট অন্ধকারেও লিওনের অবয়ব ভাইপারের চোখে পড়ল প্রদীপ্তের মতো, আঁধারের মাঝে একমাত্র উজ্জ্বল কোনো নক্ষত্র হয়ে। কিন্তু তার শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রাস্তার উল্টো দিকে, ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো অবয়বের ওপর লিওনের চোখ স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, বাতাসেও উত্তেজনা ঘনীভূত হতে শুরু করল।
রাতের স্তব্ধতা চিরে দুজনেই একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।যদিও তাদের মাঝে ব্যবধানটা ছিলো অনেক, তবুও সেই নিস্তব্ধ অন্ধকারে একে অপরের চোখের ভাষা ছিল স্পষ্ট। লিওনের তীক্ষ্ণ চাহনি হিয়ার অস্তিত্বকে ব্যবচ্ছেদ করতে চাইছে, তার ভেতরকার সিআইডি মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ সজাগ হয়ে উঠল। আবেগের কোনো স্থান নেই তার মস্তিষ্কের অলিগলিতে; সেখানে এখন চলছে ঠান্ডা মাথার এক গাণিতিক বিশ্লেষণ। এই নিঝুম রাতে, শহরের এই নির্জন প্রান্তে কেন একজন অপরিচিত মানুষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে?

তার চোখের সামনেই দৃশ্যমান প্রতিটি খুঁটিনাটি সে ডাটা পয়েন্টের মতো বিশ্লেষণ করতে লাগল। শরীরের গঠন, বাইকের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি, আর তার ওই ঔদ্ধত্য—সবকিছুই লিওনকে কোনো এক চেনা ছকের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সে হাত থেকে কফির মগটা ধীরস্থিরভাবে বারান্দার রেলিংয়ে নামিয়ে রাখল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেই কালো হুডির আড়ালে ঢাকা মুখমণ্ডলের প্রতিটি ভাঁজ আর ছায়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। লিওনের মস্তিষ্ক মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিল—এটা কোনো সাধারণ পথচারী বা ভবঘুরে নয়। ওই মানুষটার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনো জড়তা নেই, আছে এক অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ। সে লিওনকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে।
অপরদিকে, হিয়া লিওনকে এখানে দেখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। সে শুধু তার স্বপ্নের ঘোরের রেশ নিয়ে এখানে এসেছিল, কিন্তু লিওনকে এই নিঝুম রাতে বারান্দায় আস্ত অবস্থায় নিজের চোখের সামনে দেখে তার হার্টবিট বেড়ে গেলো উঠল। লিওনের এই গাম্ভীর্য, তার এই লজিক্যাল সত্তা—সবই তার চেনা, তবু তাকে এভাবে সামনে দেখাটা তার কাছে ছিলো এই মুহূর্তে অসম্ভব প্রাপ্তি। লিওনের বিশ্লেষণাত্মক চাহনিকে সে কোনো গুরুত্বই দিল না; তার পুরো মনোযোগ এখন লিওনের উপস্থিতিতে।
হঠাৎ করেই, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই, হিয়া তার বাইকের ওপর হেলান দেওয়া অবস্থায় লিওনের দিকে আলতো করে একটা ‘ফ্লায়িং কিস’ ছুড়ে দিল। রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে তার সেই চপল অথচ প্ররোচনামূলক ইশারার অর্থ লিওনের বুঝতে বাকি রইল না—অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ওই অবয়বটা আর কেউ নয়, স্বয়ং ভাইপার।

এই সামান্য একটি ইশারা, অথচ এর প্রভাবে লিওনের পুরো অস্তিত্ব কেঁপে উঠল। তার সুশৃঙ্খল, যুক্তিযুক্ত সিআইডি সত্তার সমস্ত দেয়াল এক নিমেষেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।
রাগে আর উত্তেজনায় লিওনের ভেতরটা টগবগ করে ফুটছিল। বারান্দার রেলিং থেকে কফির মগটা সজোরে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে—রাতের নিস্তব্ধতা চিরে সেটি রাস্তার ওপর পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। কোনো বাক্য ব্যয় না করে, লিওন ঘরের ভেতরে দৌড়ে গিয়ে ড্রয়ার থেকে রিভলবারটা বের করে নিল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ তখন ক্ষোভে কম্পমান। পাগলের মতো ধড়ফড় করতে করতে সে মেইন গেট খুলে রাস্তায় বেরিয়ে এল। কিন্তু তার সামনে তখন এক বিশাল শূন্যতা। ল্যাম্পপোস্টের সেই নিস্তেজ আলোর নিচে এখন আর কেউ নেই। শুধু বাতাসে তখনো লেগে আছে বাইকের টায়ারের পোড়া গন্ধ আর ধোঁয়ার এক অস্পষ্ট রেশ। ভাইপার উধাও ঠিক যে রহস্যময় ছায়ার মতো সে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই সে মিলিয়ে গেছে।
ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে লিওন তীব্র ঘৃণা আর ক্ষোভে নিজের হাতের মুঠো এতটাই শক্ত করে চেপে ধরল যে, নখের আঘাতে চামড়া ছিঁড়ে র*ক্ত বের হওয়ার উপক্রম হলো। ভাইপার তাকে কেবল শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও এক অসহ্য যন্ত্রণার আবর্তে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। লিওন এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে, এই খেলা কেবল আড়াল থেকে চলছে না—ভাইপার এখন সরাসরি তার ব্যক্তিগত সীমানা বা বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে লিওন নিজের চুলগুলো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে টান দিল। গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অস্ফুট এক চাপা আর্তনাদ, “ড্যাম ইট! রাবিশ একটা!” তার কণ্ঠে ঘৃণা আর চরম বিরক্তি উপচে পড়ছিল। একজন সিআইডি কর্মকর্তা হিসেবে বহু দুর্ধর্ষ অপরাধীর মুখোমুখি হয়েছে সে, কিন্তু এমন কোনো মানুষ—বিশেষ করে কোনো নারী এতটা নির্লজ্জ আর সীমাহীন ধৃষ্টতাসম্পন্ন হতে পারে, তা তার চিন্তার বাইরে ছিল। ভাইপারের এই পাগলাটে আচরণ, তার ওই চাহনি আর প্ররোচনামূলক ইশারাগুলো লিওনের সুশৃঙ্খল চিন্তার জগতকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।
সে এক পলক শূন্য রাস্তার অন্ধকার প্রান্তের দিকে তাকাল, নিজের মনেই দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করে উঠল, “যদিও এই অসভ্য ক্রিমিনালটাকে আদতে কোনো মেয়ে মানুষের কাতারে ফেলা যায়না। সে শুধুই একটা উপদ্রব… একটা আস্ত আপদ!”

বাড়িতে প্রবেশ করে লিওন কোনোমতে নিজের অস্থিরতাকে চেপে ধরে সোজা স্টাডি রুমে ঢুকল। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপটা খুলে সে দ্রুত পেনড্রাইভ থেকে সেই রাতের সিসিটিভি ফুটেজটা কানেক্ট করল। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডে দ্রুত ছুটছে, ফুটেজটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই লিওন ভিডিওটি স্লো-মোশনে প্লে করল। সেদিন ভাইপার যে পোশাকে ছিল, তাতে তাকে চেনার কোনো উপায় ছিল না—ভারী মেকআপ, পরচুলা আর অদ্ভুত ধরণের পোশাক; সব মিলিয়ে একদম নিখুঁত ছদ্মবেশ। কিন্তু লিওন দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে নয়েজ কমানোর চেষ্টা করল এবং হাই-রেজোলিউশন ফিল্টার ব্যবহার করে ছবিটাকে পরিষ্কার করার কাজ শুরু করল।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, “তোমার মেকআপ, তোমার এই মুখোশ—আজকে সব ধুলোয় মিশিয়ে দেব। একবার যদি তোমার আসল মুখের একটা ছোট অংশও আমি ফ্রেমবন্দি করতে পারি, পুরো দুনিয়ার কাছে তোমাকে রিভিল করবো।” সে বারবার জুম করে ভাইপারের চোখের মণি, ঠোঁটের গঠন এবং গলার হাড়ের ওপর ফোকাস করার চেষ্টা করছে।

অতিরিক্ত মেকআপের কারণে সফটওয়্যার ঠিকঠাক প্রসেস করতে পারছিল না, তবুও লিওন হার মানল না। সে প্রতিটি ফ্রেম নিখুঁতভাবে কাটতে লাগল। যদি সে ভাইপারের আসল চেহারাটা শনাক্ত করতে পারে, তবে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সে লুকিয়ে থাকুক, তাকে খুঁজে বের করা লিওনের জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। হঠাৎ করেই ফুটেজের এক কোণায়, যখন ভাইপার একটা দ্রুত মোচড় দিয়ে ফিরেছিল, মেকআপের আড়ালে তার গালের এক টুকরো প্রাকৃতিক চামড়া স্পষ্ট হয়ে উঠল। লিওনের চোখেমুখে ঝিলিক দিয়ে উঠল এক জয়ের হাসি। সে দ্রুত ছবিটা ক্রপ করে তার সার্ভারে পাঠাল ‘ফেস রিকগনিশন’ করার জন্য।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৬

যদিও ফলাফল আসতে সময় লাগবে, কিন্তু লিওন জানে—আজ সে ভাইপারের ছদ্মবেশের দেয়ালে প্রথম বড় ফাটলটা ধরাতে পেরেছে। ল্যাপটপের উজ্জ্বল আলোয় তার মুখটা আরও কঠোর দেখাল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “যত গভীরে লুকিয়ে থাকোনা কেনো তুমি আর আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবেনা।”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here