আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৬
সাবিলা সাবি
হিয়া দ্রুত পায়ে লিওনকে নিয়ে সুইট রুমে প্রবেশ করলো। দরজাটা সজোরে আটকে দিয়ে সে লিওনের নিথর শরীরটাকে বিছানায় আলতো করে পরম যত্নে শুইয়ে দিল। লিওনের অচেতন মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা তীব্র অস্থিরতায় আনচান করে উঠল; এতটা কাছে, এত একান্তভাবে লিওনকে পাওয়ার নেশায় তার নিজের অস্তিত্বই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছিল।
হিয়া বিছানার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টিতে তখন শিকারি তৃষ্ণার চেয়েও বেশি ছিল কোনো নিষিদ্ধ শিল্পকর্মকে একা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। লিওনের নিস্তব্ধ নিথর অস্তিত্ব তাকে এমন এক নেশায় ডুবিয়ে দিল যে, হিয়া নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে ঝুঁকে পড়ল লিওনের ওপর; তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তখন কেবল লিওনকে নিজের করে পাওয়ার দাহ। লিওনের অচেতন অবয়বের দিকে তাকিয়ে হিয়ার মনে হলো, এতক্ষণের তীব্র উত্তেজনার পর কোনো মরুঝড় বোধহয় শান্ত হয়ে এসে ভিড়েছে তার অস্তিত্বের বন্দরে।
লিওনের অগোছালো শার্টের বোতামে ভাইপারের আঙুলগুলো যখন আলতো করে স্পর্শ করল, তখন তার শরীর থেকে আসা সেই দামী পারফিউমের ঘ্রাণ হিয়ার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ল—যেকোনো কড়া মদের নেশার চেয়েও গভীরে গিয়ে এক তীব্র মাদক হয়ে। সে বুঝতে পারছিল, এই স্পর্শ তাকে অনিবার্য কোনো ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তবুও নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো সামান্যতম ইচ্ছাশক্তিও তখন তার ভেতরে অবশিষ্ট ছিল না। তার প্রতিটি ধমনীতে তখন কেবল লিওনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরার এক অদম্য তৃষ্ণা দাউদাউ করে জ্বলছিল। তার ঘাড়ের কাছে নাক ডুবিয়ে হিয়া সেই সুবাসটুকু গভীরভাবে পুনরায় টেনে নিল এমনভাবে যেনো দীর্ঘ তৃষ্ণার পর এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য কাতর তৃষিত চাতক। লিওনের ত্বকের সেই উষ্ণতা তার অবাধ্য হৃদস্পন্দনকে কিছুটা থামিয়ে দিতে চাইল। সেই মূহূর্তে সে ভুলে গেল তার পরিচয়, তার অন্ধকার জগত আর সব হিসাব—কেবল লিওনের অস্তিত্বের ভেতরে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার এক তীব্র ব্যাকুলতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
হিয়া লিওনের কানের কাছে ঝুঁকে এল। তার হাস্কি কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা ভেঙে ভারী হয়ে ভেসে এল, “অবশেষে…এই নিস্তব্ধতায় তুমি শুধু আমার। পৃথিবীর সব কোলাহল আর বাধা থেকে বেরিয়ে এসে এখন তুমি কেবল আমার এই বাহুর বন্ধনে বন্দি।”
বিছানায় এলিয়ে থাকা লিওনকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে এক ক্লান্ত যোদ্ধা—যে নিজের অজান্তেই তার শত্রুর বাহুডোরে আশ্রয় নিয়েছে। হিয়া পরম মমতায় তার কপালে হাত রাখল, মনে হলো আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভাকে আলতো করে ছুঁয়ে দেখছে সে। তার আঙুলের মৃদু স্পর্শে লিওনের ভ্রু সামান্য কেঁপে উঠল; সেই মুহূর্তের অস্থিরতাটুকু হিয়া এক তীব্র নেশার মতো অনুভব করল। সে জানত, এই নিস্তব্ধতায় লিওনের শরীরের প্রতিটি স্পন্দন এখন কেবল তার একান্ত অধিকারে।
হিয়া লিওনের কাছ থেকে একটু দূরে সরে ধীরলয়ে বিছানার কিনারে এসে বসল। তার শরীর থেকে নির্গত হচ্ছিল উত্তপ্ত আবেগের এক তীব্র ঝাপটা। কিছু একটা ভেবে পুনরায় সে লিওনের ওপর ঝুঁকে পড়ল—তার দৃষ্টিতে ছিলো মুগ্ধতা, লিওনের নিথর মুখের প্রতিটি রেখা আর ভাঁজ তার চোখে এক নতুন বিস্ময় হয়ে ধরা দিচ্ছিল। সে লিওনের একদম কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল, “জীবনে এই প্রথমবার… তোমাকে এত কাছ থেকে দেখছি, লিওন বাজপাখি।”
হিয়ার আঙুলগুলো আলতো করে লিওনের চোখের কোণ ছুঁয়ে, তার তীক্ষ্ণ নাকের রেখা ধরে নিচে নেমে এল। তারপর আঙুলগুলো অবশেষে লিওনের অধরে এসে স্থির হলো। হিয়ার চোখের মণি তখন এক ঘোরলাগা নেশায় কাঁপছে—সেখানে কামনার চেয়েও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাকে আগলে রাখার সেই তীব্র ও জেদি এক তৃষ্ণা।
হিয়া লিওনের অধরে আঙুল বুলিয়ে মৃদু হাসল; বিষাদময় আর তীব্র আকুল কন্ঠস্বরে সে ফিসফিস করে বললো “তোমাকে এই রুমে এনেছি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়, শুধু এই নির্জনতায় তোমাকে একান্তভাবে একটু কাছ থেকে দেখতে কিন্তু বিশ্বাস করো,” সে তার কণ্ঠ আর একটু খাদে নামিয়ে এনে লিওনের মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসাল, “তোমাকে এত কাছে পেয়ে, তোমার এই অধর মিষ্টি স্বাদ গ্ৰহণ করার ব্যাকুলতা সামলানো আমার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠছে।”
হিয়ার বুকের ভেতরটায় তখন এক তীব্র তোলপাড় শুরু হলো। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না সে; লিওনের অধরের ওপর রাখা আঙুল সরিয়ে নিয়ে সে আরও ঝুঁকে এল—তার উষ্ণ নিশ্বাস লিওনের মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। লিওনের উষ্ণ নিশ্বাস হিয়ার মুখে আসতেই তার চোখে এক গভীর ঘোরের আবেশ ফুটে উঠলো। সে প্রথমে আলতো করে লিওনের গালে নিজের অধর ছুঁইয়ে দিল—খুব সাবধানে। সেই স্পর্শের মাদকতা তাকে আরও সাহসী করে তুলল। এরপর সে ধীরগতিতে তার অধর নামিয়ে আনল লিওনের কাঙ্ক্ষিত সেই অধররেখায়।
মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চারপাশ, স্থবির হয়ে এল সময়। লিওনের অধরের উষ্ণতা আর তীব্র স্বাদে হিয়া তলিয়ে যেতে লাগল এক অতল গহ্বরে। এ চুম্বন কেবল স্পর্শ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমানো সব তৃষ্ণার এক প্রশান্ত মুক্তি—যেখানে নেই কোনো তাড়াহুড়ো, নেই কোনো দ্বিধা। সে তার সমস্ত অস্তিত্ব উজাড় করে দিল লিওনের ওই স্তব্ধ অধরে। গাঢ় চুম্বনের সেই নিবিড় স্বাদ তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে দিল এক তীব্র মাদকতা;যেন মরুভূমির তৃষ্ণায় পোড়া এক জীবন অবশেষে খুঁজে পেল কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিধারা। নিস্তব্ধ সুইট রুমে কেবল ভেসে আসছিল দুজনের ঘন হয়ে আসা নিঃশ্বাস আর হিয়ার বুকের ভেতর তোলপাড় করা সেই অপরাধবোধ ও তৃপ্তির মিশ্রিত এক স্পন্দন। লিওনের অচেতন অস্তিত্বের মাঝে এই নিবিড় স্পর্শ তাকে এক নিষিদ্ধ জগতের বাসিন্দায় পরিণত করছিল। তবু, সমস্ত নৈতিকতার দেয়াল ভেঙে এই মুহূর্তের চেয়ে বড় কোনো সত্য তার পৃথিবীতে আর অবশিষ্ট রইল না।
হিয়া নেশাতুর চোখে লিওনের গলার ভাঁজে মুখ ডোবানোর ঠিক আগমুহূর্তে, তার পকেটে থাকা ফোনটা কর্কশ স্বরে কেঁপে উঠল। বিরাগের এক তীব্র ঢেউ তার স্নায়ু জুড়ে বয়ে গেল, যেন কেউ তার বোনা স্বপ্নের সুতোয় হ্যাঁচকা টানে ফাটল ধরিয়ে দিল।
ঘড়ির দিকে না তাকিয়েই সে ফোনটা বের করল, স্ক্রিনে তখন ‘ইভানা’র নাম জ্বলজ্বল করছে। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ইভানার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “মিস্ট্রেস! ভিক্টোর ডিলটা সাইন করেনি। সে আমাদের সন্দেহ করেছে। কোনোমতে আমি আর মার্ক সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি, কিন্তু বস দানিয়েল সব জেনে গেছেন। আপনাকে এখনই টাউনহাউসে ফিরতে হবে! আপনি কোথায় আছেন?”
হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের সেই মায়াবী আবেশ নিমেষেই এক ভয়ংকর রুদ্রমূর্তিতে রূপ নিল। লিওনের উষ্ণ সান্নিধ্যে পাওয়া এই পরম স্বস্তির মুহূর্তটিতে এমন এক বিড়ম্বনা তার স্নায়ুতে আগুনের হলকা হয়ে বিঁধল। সে তাকাল লিওনের দিকে—অচেতন লিওন তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন, বাইরের পৃথিবীর কোনো দহনই তার এই প্রশান্তিকে স্পর্শ করতে পারছে না।
হিয়ার মনে হলো, বড় কোনো বিপদ এলেও সে আজ এই রুম থেকে নড়তে চায় না। কিন্তু দানিয়েলের নির্দেশ অমান্য করার উপায় নেই। সে রাগে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লিওনকে এভাবে একা রেখে যাওয়া ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। সে এই রুমটা বুক করেছিল যাতে লিওন শান্তিতে ঘুমাতে পারে, কিন্তু নিজের মনের অস্থিরতায় তার অবস্থা যেন তপ্ত কয়লার ওপর বসে থাকার মতো।
সে লিওনের কপালে শেষবারের মতো একটা আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিয়ে ধীরস্বরে বিড়বিড় করল, “ভাগ্যিস অচেতন হয়ে ছিলে। আর এই শহর ধ্বংস হয়ে গেলেও তুমি কেবল আমার এই সুরক্ষার বলয়েই শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।”
এরপর হিয়া তার ফোনটার ক্যামেরা অন করে লিওনের দিকে ঝুঁকে পড়লো। অচেতন লিওনের মুখটা তখন এক মায়াবী প্রশান্তিতে ঢাকা। সে প্রথমে লিওনের গালের সাথে নিজের গাল ছুঁইয়ে একটা সেলফি তুলল, তার ঠোঁটে তখন ফুটে উঠল এক তৃপ্ত বিজয়ী হাসি। এরপর সে লিওনের অধরে নিজের অধর চেপে ধরে তুলে নিল আরও একটি ছবি। সবশেষে, সে লিওনের গলার খাঁজে মুখ ডুবিয়ে নিলো চূড়ান্ত ছবিটি, যেখানে তার সমস্ত আসক্তি আর দখলদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট হয়ে রইল।
রুম থেকে বের হওয়ার আগে ভাইপার এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। করিডোরের আবছা আলোয় তার চোখে খেলে গেল ধূর্ততার ঝিলিক। সে কন্ট্রোল প্যানেল থেকে শুধুমাত্র হোটেলের সেই সুইট রুমের ফুটেজটুকু মুছে দিল, কিন্তু হোটেলের অন্য কোথাও হাত দিল না। লিওন পরদিন সকালে জেগে উঠলে যেন নিজের চোখেই এই পুরো ঘটনার প্রমাণ দেখতে পায়—কেবল তাদের একান্ত মুহূর্তটুকুর সাক্ষী কেবল থাকল সে নিজেই।
এরপর সে নিঃশব্দে হোটেল থেকে বেরিয়ে এল। টাউনহাউসে দানিয়েলের রোষানল আর আসন্ন প্রলয় তাকে তাড়া করে ফিরছে—সেটা সে জানে। কিন্তু হোটেলের এই সুইট রুমের ভেতরে সে যে মায়াজাল বুনে এল, তা যেন আগামী সকালের অপেক্ষায় থমকে থাকা এক টাইম বোমা। লিওনের ঘুম ভাঙলেই শুরু হবে আসল খেলা।
মেফিয়ারের টাউনহাউসের নিস্তব্ধতা তখন হিমশীতল এক আতঙ্কে ভারী হয়ে আছে। বড় টেবিলটার অপর প্রান্তে দানিয়েল স্থির হয়ে বসে আছে, তার দৃষ্টিতে নিষ্ঠুর এক তীক্ষ্ণতা। ভাইপার তার সামনে মাথাটা সামান্য নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখের গভীরে অনুশোচনার ছিটেফোঁটাও নেই; বরং সেখানে জমে আছে গভীর এক গোপন তৃপ্তি।
দানিয়েল গর্জে উঠে বললো, “জীবনে এই প্রথম কোনো মিশনে তুমি ব্যর্থ হলে, ভাইপার! এমন খামখেয়ালি কাণ্ড তুমি করলে কীভাবে? তুমি কি জানো তুমি কী বিপদ ডেকে এনেছো? ভিক্টর—সে আমার অন্যতম প্রধান শত্রু ছিলো। আমি তাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলাম, আর তুমি কি না মাঝপথে সব ফেলে দিয়ে উধাও হয়ে গেলে? তুমি তো এমন ছিলে না। তোমার সেই শৃঙ্খলা, সেই লক্ষ্য—সব কোথায় হারিয়ে গেল?”
হিয়া এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। তার কানে তখনো লিওনের সেই মন্থর নিশ্বাসের শব্দ অস্পষ্ট সুরের মতো বাজছে। মাথা না তুলেই সে ধীর, স্থির গলায় উত্তর দিল, “সরি বলার কোনো অবকাশ নেই, বস আমি জানি। কারণ এই গাফিলতির কাছে ‘সরি’ শব্দটা বড্ড সস্তা, বড্ড তুচ্ছ।”
দানিয়েলের অট্টহাসি পুরো ঘর কাঁপিয়ে দিল। সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভাইপারের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠস্বরে এখন বিষাক্ত উপহাস, “সরি? সরি বলবেই বা কোন মুখে? তোমার কোনো অজুহাতে কি আমাদের সেই ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ড ফিরে আসবে? তোমার এই মুহূর্তের খামখেয়ালিপনায় যে বিশাল ক্ষতি হলো, তার দায়ভার কে নেবে? তুমি কি ভাবছো, তোমার ব্যক্তিগত ইচ্ছার মূল্য আমাদের সাম্রাজ্যের ক্ষতির চেয়ে বেশি?”
দানিয়েল তার পিস্তলটা টেবিলের ওপর সজোরে আছড়ে রাখলো। টাউনহাউসের থমথমে বাতাসে তখন বারুদের কটু গন্ধের চেয়েও তীব্র এক উত্তেজনার আঁচ। হিয়া জানে, দানিয়েল কোনো কৈফিয়ত শুনতে রাজি নয়। কিন্তু হিয়ার কাছে এখনকার পৃথিবীটা আর কেবল টাকা আর ক্ষমতার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নেই—সেখানে লিওন নামের এক পুরনো নেশা নতুন করে তার সমস্ত যুক্তিবোধকে পুরোপুরি গ্রাস করে রেখেছে।
হিয়া দানিয়েলের দিকে এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, “বস, আমাকে আরেকটা সুযোগ দিন। আমি কথা দিচ্ছি—”
দানিয়েল তাকে থামিয়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে হাসলো। “সুযোগ? ওটা তোমার জন্য শেষ হয়ে গেছে, হিয়া। ভিক্টরকে আমি নিজেই শেষ করে দিয়েছি। ওর গাড়িতে বম্ব ফিট করা ছিল; রিমোটের বাটনে প্রেস করতেই কাজ শেষ—যাতে তোমার মতো কারো খামখেয়ালির জন্য আমার ব্যবসায় আর কোনো বিঘ্ন না ঘটে।”
হিয়ার চোখের মণি বিস্ময়ে সংকুচিত হয়ে এল। সে ভাবেনি দানিয়েল এত দ্রুত পাল্টা আঘাত হানবে। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দানিয়েল শীতল কণ্ঠে যোগ করলো, “আর ওই ইভলিন? তাকে অপহরণ করে যে নাটকের অবতারণা করা হয়েছিলো, আমি তা-ও চুকিয়ে দিয়েছি। ওর দেহটা এই মুহূর্তেই জঙ্গলের খালে ফেলে আসো হিয়া; যেখানে আমার পোষা কুমিরগুলো ক্ষুধার্ত অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।”
ইভলিনের কথা শুনে হিয়ার ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো তোলপাড় চললেও, তার চেহারা ছিল পাথরের মতো স্থির। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে একটা শক্ত চামড়ার চাবুক তুলে নিল। এরপর অবনত মস্তকে সেটি দানিয়েলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত, শীতল গলায় বলল, “আমি ভুল করেছি, বস। ভুল যখন আমার, তখন শাস্তিটাও আমারই প্রাপ্য। নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। আমি লিডার বলে আমাকে মাফ করে দেওয়াটা দলের অন্যদের জন্য অবিচার। আপনিই সিদ্ধান্ত নিন—আমি কি এখানেই শাস্তি মাথা পেতে নেব, নাকি নিচে টর্চার সেলে যাব?”
দানিয়েল এক মুহূর্ত হিয়ার দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দিয়ে উঠলো। সে চাবুকটা নিলো না, উল্টো হিয়ার চিবুক ধরে উঁচিয়ে ধরলো। “তুমি খুব ভালো করেই জানো হিয়া, আমি তোমার গায়ে আঁচড়ও দেব না। এই যে আমার তোমার প্রতি এই দুর্বলতাটাই তুমি এখন আমার বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছ, তাই না?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। দানিয়েল ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সে তার হাতের চাবুকটা নিজের পিঠের ওপর সজোরে আছড়ে মারল। চাবুকের তীক্ষ্ণ শব্দে টাউনহাউসের নিস্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল। দানিয়েল থামলো না, বরং কোনো পিছুটান ছাড়াই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। হিয়া দাঁতে দাঁত চেপে আবার চাবুক তুলল। সে জানত, দানিয়েল দেখছেনা ঠিকই, কিন্তু ‘রুলস ইজ রুলস’। এই প্রতিটি আঘাতে সে নিজের ভেতর থেকে জমে থাকা ব্যর্থতার গ্লানিকে নিংড়ে বের করে দিচ্ছে। এত বছরের ক্যারিয়ারে এমন খামখেয়ালিপনা, ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ক্ষতি, আর দানিয়েলের চোখে নিজেকে একজন অপরাধী ও ব্যর্থ লিডার হিসেবে দেখার যন্ত্রণা—সব যেন তার চামড়া চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর প্রতিটা আঘাতের সাথে সাথে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে লিওনের সেই অচেতন ঘুমন্ত মুখটা। এই অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা যেন হিয়ার কাছে লিওনের ওই মুহূর্তের সান্নিধ্য পাওয়ার চড়া মাশুল।
পরের দিন সকালে ইভানা যখন ভাইপারের রুমে ঢুকল, তার চোখেমুখে বেশ উত্তেজনা। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে জানাল, আজ রাতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে ভাইপারের উপস্থিতি থাকাটা প্রায় বাধ্যতামূলক। ইভানা জানত, রিংয়ে নামার লড়াই কিংবা প্রতিপক্ষের হাড় ভাঙার সুযোগ ভাইপার কখনোই হাতছাড়া করে না। কিন্তু হিয়া এক মুহূর্ত না ভেবেই শীতল গলায় মাথা নাড়ল, “না, আমি যাচ্ছি না।”
ইভানা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ভাইপার—যে কি না মাল্টি ট্যালেন্টেড! বক্সিংয়ের রিংয়ে যার প্রতিটি পাঞ্চে প্রতিপক্ষ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, রেসিং ট্র্যাকে বাতাসের বেগে গাড়ি ছোটানোয় যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কিংবা স্কাই ডাইভিং ও সুইমিংয়ে যার জুড়ি মেলা ভার—সে আজ সরাসরি না করে দিচ্ছে? বক্সিং আর বিভিন্ন স্পোর্টসে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যে মানুষটি ট্রফি আর মেডেলের স্তূপ বানিয়েছে, সেই মানুষটিই আজ শখের রিংয়ের হাতছানিকে উপেক্ষা করছে!
ইভানা বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না। কণ্ঠে অবিশ্বাস ফুটিয়ে সে বলল, “মিস্ট্রেস, আপনি ঠিক আছেন তো? রিং আপনার কাছে কোনো ব্যাপারই না, এটা তো আপনার রক্তে মিশে আছে!”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। সে তখন ঘরের কোণায় রাখা পুরনো কাঠের বাক্সটার ডালা খুলল। ভেতরে অগোছালোভাবে পড়ে আছে মেডেলগুলো—যার একাংশে তার কলেজের সেই সোনালী দিনের ড্যান্স ও নানাবিধ প্রতিযোগিতার উজ্জ্বল স্মৃতি, আর অন্যভাগে এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের রক্তমাখা সাফল্যের নিষ্ঠুর স্মারক। সে একটা মেডেল হাতে নিয়ে আঙুল বোলাল ঠিকই, কিন্তু তার সবটুকু সত্তা তখন আটকে আছে সেই সুইট রুমের মায়াজালের ভেতরে। তার কাছে এখন ট্রফি বা মেডেলের চেয়েও বড় এক অস্পর্শী নেশা—লিওন। এক মুহূর্তের সেই নৈকট্য তাকে এমন এক ঘোরের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে লড়াইয়ের উত্তাপ বা রিংয়ের লড়াইগুলো ফিকে হয়ে আসছে। হিয়া জানত, রিংয়ে নামা মানেই দানিয়েলের সন্তুষ্টি, আর সেই সন্তুষ্টির নেশা তার ভেতর থেকে অনেক আগেই মরে গেছে। সে বক্সের ডালাটা ধপ করে বন্ধ করে দিল। মেডেলগুলোর ঝনঝনানি শব্দের চেয়েও বেশি জোরালো শোনাল তার শীতল কণ্ঠস্বর, “পর্যায় বদলে গেছে, ইভানা। এখন লড়াইয়ের ময়দান আর রিংয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই।”
হিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে টেবিলের কাছে বসল, যেখানে তার ট্যাটু করার সরঞ্জামগুলো নিপুণভাবে সাজানো। সে কেবল একজন ঘাতকই নয়, একজন নিখুঁত ট্যাটু আর্টিস্টও বটে। সূক্ষ্ম নিডল দিয়ে চামড়ার ওপর নকশা ফুটিয়ে তোলার মতো তার হাতগুলো যেমন স্থির, তেমনি শৈল্পিক। সে আনমনে ভাবছিল, মানুষের চামড়ায় কালি দিয়ে হয়তো অমরত্ব খোদাই করা যায়, কিন্তু লিওনের মনের গভীরে জমে থাকা অস্পষ্ট স্মৃতিগুলোকে সে কীভাবে নিজের করে নেবে?
ইভানা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর দ্বিধাভরে জিজ্ঞেস করল, “এমন কী হলো যে আপনি সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন?”
হিয়া তার শীতল দৃষ্টি ইভানার ওপর স্থির করল। তার কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত আবেশ—যা সাধারণ মানুষের চিন্তার বাইরের। সে মৃদু স্বরে বলল, “রিংয়ের লড়াইয়ের চেয়েও বড় কোনো যুদ্ধের নেশা আমাকে পেয়ে বসেছে, ইভানা। তাছাড়া… আজকের দিনটা আমার জন্য অন্যরকম। কিছু হিসেব মেলানোর আছে।
ইভানা আর কোনো প্রশ্ন করল না; ভাইপারের চোখের গভীরের সেই শূন্যতা তাকে জানান দিল, এই নীরবতার আড়ালে কোনো এক বিশাল ঝড় লুকিয়ে আছে। ইভানা নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অন্যদিকে সকালের আলো ফুটতেই অফিসার নোভা, রওশন আর আরিয়ানের ঘুম ভাঙল সেই টেবিলের ওপর মাথা রেখে। ঘোর কাটতেই তাদের চোখেমুখে খেলা করল এক অস্বস্তিকর শূন্যতা—লিওনের অনুপস্থিতি। তারা বিভ্রান্ত হয়ে তড়িঘড়ি করে ফোন করল, কিন্তু লিওনের মোবাইল তখনো বন্ধ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন কোনো সাড়া মিলল না, তখন তারা ধরে নিল, হয়তো রেগেমেগে লিওন তাদের না জানিয়েই বাসায় চলে গেছে। বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলে, দীর্ঘশ্বাসের সাথে তারা অগত্যা সেই স্থান ত্যাগ করল।
হোটেলের সেই লাক্সারি সুইট রুমের বিশাল জানালা দিয়ে সকালের কড়া রোদের আলো এসে পড়েছে। লিওনের ঘুম ভাঙল মাথার ভেতর এক তীব্র ঝিমঝিম অনুভূতির সাথে; মনে হচ্ছে মগজের ভেতরে কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটাচ্ছে। শরীরটা অদ্ভুত রকম ভারী লাগছে, নেশার ঘোর এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সে চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, বিছানায় সে অত্যন্ত আরামে শুয়ে আছে, গায়ে সুন্দর করে ভাঁজ করা একটা কম্বল জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে তার মস্তিষ্কে গত রাতের ঝাপসা দৃশ্যগুলো হানা দিল। আবছা মনে পড়ছে, কোনো এক রহস্যময় ছায়া তাকে জড়িয়ে ধরেছে; সেই বাহুবন্দি হওয়ার অদ্ভুত উষ্ণতা আর তীব্র কোনো নারীসুলভ পারফিউমের মাদকতা—যা এখনো তার স্নায়ুতে বিভ্রমের মতো লেগে আছে। সে দ্রুত উঠে বসল, অস্থির হৃদস্পন্দন নিয়ে নিজের শরীরটা পরীক্ষা করতে লাগল। কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, বা পোশাক আশাকে কোনো অসংলগ্নতা নেই, বরং সবকিছু যেন এক অদ্ভুত সযত্ন পরিচর্যায় রাখা হয়েছে। হঠাৎ তার নজর পড়ল বড় আয়নার দিকে। গলার কাছে একটা হালকা লালচে দাগ, যা কোনো কামড়ের মতো মনে হচ্ছে, কিন্তু তাতে ভয়ের চেয়ে বেশি তীব্র এক তীব্র সম্মোহন জড়িয়ে আছে।
লিওন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইল। সে বুঝতে পারছে না, গত রাতে সে কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল, নাকি কোনো এক অজানা মায়াজালের শিকার হয়েছে। ফোনের নেটওয়ার্ক সিগন্যাল চেক করতে গিয়ে দেখল, ফোনটি তখনো বন্ধ, কিন্তু ব্যাটারি ফুল চার্জ দেওয়া। কেউ একজন শুধু তাকে আগলে রাখেনি, বরং তার প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রয়োজনকেও নিখুঁতভাবে পূরণ করে গেছে।
লিওন বিড়বিড় করে উঠল, “আমি এখানে কীভাবে এলাম? আর আমাকে কে নিয়ে এল?”
সে হোটেল রুমের চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সবকিছু একদম নিখুঁত, সাজানো। কোথাও কোনো অগোছালো চিহ্ন নেই। সে কি সত্যিই এখানে ছিল? নাকি এই পরিপাটি ঘরটা কোনো মরীচিকা? লিওন নিজের হাত দুটোকে সামনে তুলে ধরল। তার মনে হলো, সে কোনো এক অতল স্বপ্নের অতলে ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্নের রেশটা এতটাই বাস্তব যে সে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করল।
লিওন হোটেল থেকে বের হওয়ার আগে সোজা গিয়ে দাঁড়াল রিসেপশনে। ম্যানেজারের মুখোমুখি হয়ে সে রাতের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইল। কিন্তু ম্যানেজার অদ্ভুতভাবে মাথা নাড়ল, তার চোখে-মুখে এক অজানা ভয়ের ছাপ, কণ্ঠস্বরে জড়তা—সে কিছুই বলতে পারল না, শুধু দৃষ্টি নামিয়ে নিল।
তবে ম্যানেজার যখন বলল, “স্যার, কালকের একজন গেস্ট মানে একটি মেয়ে ফোন করে আপনার জন্য এই স্পেশাল সুইট রুমটি বুক করেছিল,” তখন লিওনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। কোনো মেয়ে? সে তো কাউকে এমন দায়িত্ব দেয়নি!
লিওন দ্রুত সেই ফোন নম্বরটি সংগ্রহ করল। এরপর সে ম্যানেজারকে চাপ দিয়ে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজগুলোও নিজের পেনড্রাইভে কপি করে নিল। রিসেপশন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে বসার সময় তার হাতগুলো একটু কাঁপছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই পুরো বিষয়টি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে। গাড়িতে বসে সে সাথে সাথে সেই নম্বরটিতে কল করল। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না, শুধু যান্ত্রিক একটা আওয়াজ ভেসে এল—নম্বরটি অস্তিত্বহীন।
লিওন বাড়ি না ফিরে সোজা সিআইডি অফিসের দিকে গাড়ি ঘোরাল। নোভা বা রওশন তখন অফিসে নেই, অন্য অফিসারদের এড়িয়ে সে দ্রুত নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল। প্রথমেই সে সেই রহস্যময় নম্বরটি ট্র্যাকিংয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর মনিটরে নাম ভেসে উঠল নাম—’ইভলিন’।
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে হোটেল থেকে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজগুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কিন্তু যা দেখল, তাতে তার বিস্ময় কাটল না। হোটেলের লবি বা করিডোরের ফুটেজ থাকলেও, যে রুমে সে ঘুমিয়ে ছিল, সেই রুমের ফুটেজগুলো সম্পূর্ণ গায়েব! কেউ খুব নিখুঁতভাবে সেগুলো মুছে ফেলেছে।
ফুটেজে সে দেখল, হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মাঝে সেই রেডড্রেস পরা মেয়েটি তার আরও দুজন সঙ্গীর সাথে আলাদা একটি স্পেশাল টেবিলে গিয়ে বসেছে। এরপর লিওন জুম করে দেখল, কিছুক্ষণ পর মেয়েটি কাউন্টারে গিয়ে একজন ওয়েটারের সাথে কিছু একটা আলাপ করছে। কিছুক্ষণ পর সেই ওয়েটারই তাদের টেবিলে খাবার দিয়ে গেল। লিওন সাথে সাথে হোটেলে ফোন করল। ওয়েটারের ছবিটা হোটেলের ম্যানেজমেন্টকে মেইল করে জানতে চাইল তার ব্যাপারে। ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ পর জানানো হলো, সেই ওয়েটার কাল রাত থেকেই নিখোঁজ। লিওনের সন্দেহের পারদ মুহূর্তেই তুঙ্গে উঠল। ঠিক তখনই এসিপি এসে ধীর অথচ গম্ভীর গলায় জানাল—আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবশালী ডিলার ভিক্টরের গাড়ি বো*মায় উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেই সাথে নিখোঁজ রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘ইভলিন’ নামের এক রহস্যময়ী নারী ডিলার।
লিওন তখন চিন্তার অতলে তলিয়ে গেল। যদি ইভলিন নিখোঁজই থাকে, তবে তার সিম থেকে সুইট রুম বুকিং হলো কীভাবে? আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত ডিলারের সাথে সম্পর্কযুক্ত নিখোঁজ নারী আর হোটেলের সেই রহস্যময়ী ইভলিন—সবকিছুর যোগসূত্র কি তবে সেই রেড ড্রেস পরা মেয়েটিই? রহস্যের এই গোলকধাঁধা তাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যে, চাইলেই এসিপিকে সবটা খুলে বলার ঝুঁকি সে নিতে পারল না।
লিওনের শরীর বিদ্রোহ ঘোষণা করল। গত রাতের নেশার ঘোর এখনো কাটেনি; মস্তিস্কের গভীরে সেই পরিচিত ঝিমুনি আর স্নায়ুর প্রতিটি স্পন্দনে এক অস্থিরতা। ল্যাপটপের উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব হলো না। তদন্তের জট খুলতে গিয়ে নিজের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণই যেন হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে।
সে তার ডেস্কে থাকা অন্য একজন দক্ষ অফিসারকে পুরো কেসটির ফাইল এবং সংগৃহীত ফুটেজগুলো বুঝিয়ে দিল। নিজের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে সে বুঝল, এখন জোর করে কাজ করা মানে হলো বিপদ ডেকে আনা। অগত্যা সে সব গুটিয়ে সিআইডি অফিস থেকে বেরিয়ে এল। বাড়ি ফেরার পুরো পথটা তার কাছে ঝাপসা স্বপ্নের মতো মনে হলো। ঘরে ঢুকেই সে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা জলের ধারা যখন তার পিঠে আছড়ে পড়ছিল, তার মনে হচ্ছিল ওই জল দিয়ে সে গত রাতের সমস্ত অস্থিরতা মুছে ফেলতে চাইছে। শাওয়ার শেষে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে সে ধীর পায়ে নিজের শোবার ঘরে ঢুকল। কিন্তু পা রাখতেই তীব্র অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরল—ঘরের নিস্তব্ধতায় মনে হলো এখনো তার গায়ে সেই দামী পারফিউমের ঘ্রাণ ভাসছে। শরীরে আর কুলাচ্ছিল না। সে কোনোমতে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। ড্রাগসের রেশ আর তীব্র ক্লান্তি তাকে নিমেষেই এক গভীর অতল ঘুমে টেনে নিল।
বিকেলের ম্লান আলোয় লিওনের ঘুম ভাঙল এক তীব্র অস্বস্তিতে। বিছানা ছেড়ে বারান্দার দিকে পা বাড়াতেই তার নজর আটকে গেল দরজার ঠিক সামনে পড়ে থাকা সাদা খামটিতে। বুকটা ধক করে উঠল তার—আবার একটা চিরকুট!
লিওনের আঙুলগুলো খামের ওপর স্থির হলো। বছরের পর বছর তদন্তের অভিজ্ঞতায় তার হাত সাধারণত কাঁপে না; লিওনের হাত তখন পাথরের মতো শক্ত। কিন্তু খাম থেকে ছবিগুলো বের করার পর তার ধমনীতে রক্তস্রোত যেন হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সিআইডি ক্যারিয়ারে বহু বীভৎস দৃশ্য দেখার পরও, আজকের এই ছবিগুলো তাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিল।
গত রাতের সেই তিনটি সেলফি! ঘাড়ের কাছে রহস্যময় কামড়ের দাগ, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মাদকতা আর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সেই স্থিরচিত্রগুলো তাকে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিল। তার মনে হলো, চারপাশের দেয়ালগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে এবং ধীরে ধীরে তার দিকেই সংকুচিত হয়ে আসছে; নিস্তব্ধ ঘরের বাতাসে তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দই এখন অনেকটা বজ্রপাতের মতো কানে বাজছে।
তার সাথে ছিল একটি হাতে লেখা ছোট চিরকুট:
“ভয় পেয়ো না বাজপাখি,মাত্র তিনটি সেলফি তুলেছি, এর বেশি কিছু করিনি। আর হ্যাঁ, দুটো চুমু খেয়েছিলাম তোমাকে।সত্যি বলতে, কোনো ব্র্যান্ডের ওয়াইন কিংবা সিগারেটের ধোঁয়ায় আমি এমন তীব্র নেশা খুঁজে পাইনি, যতটা তোমার ঠোঁটে পেয়েছি। উফ! সেই স্বাদ আমি মরে গেলেও ভুলব না। তবে আমি এতটা নিচে নামিনি যে, অচেতন কারো ফায়দা নেবো।তোমার ইজ্জত একটুও লুটে নেইনি। যদিও সত্যিটা হলো, অচেতন অবস্থায় তোমাকে এত বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল যে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। খুব শীঘ্রই দেখা হবে, দিলবার উম্মাহ!….।”
চিরকুটের প্রতিটি শব্দ পড়ার সাথে সাথে লিওনের মাথায় যেনো আগুনের ফুলকি ছুটল। অপমানে আর ক্ষোভে তার শরীর কাঁপছে। যদি এই ছবিগুলো পাবলিক হয়, তবে সিআইডিতে তার ক্যারিয়ার আর মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে এর মাঝেই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠল—সব জট খুলতে শুরু করেছে। সেই রেড ড্রেস পরা মেয়েটিই ‘ভাইপার’! আর ভিক্টরকে নিশ্চিহ্ন করার পেছনে যেমন এই ভাইপারের হাত আছে, তেমনি ইভলিনের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যও যে সে-ই নিয়ন্ত্রণ করছে, তা নিয়ে লিওনের আর কোনো সংশয় রইল না।
তবে এই মুহূর্তে লিওনের রাগের মূল কারণটা ছিলো ভিন্ন। যে ক্রিমিনাল তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, যে তাকে খেলার পুতুল বানাল, তার এত বড় দুঃসাহস! সে কি না লিওনের ঠোঁটে-গালে চুমু খাওয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখাল? সেই স্পর্শের রেশ মনে পড়তেই লিওনের গা গুলিয়ে উঠল; ঘৃণায় আর আক্রোশে তার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
লিওন দ্রুত বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবি তার কাছে এখন চরম অপবিত্র মনে হচ্ছে। ড্রয়ার থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর টিস্যু বের করে সে উন্মত্তের মতো ঘষতে লাগল নিজের ঠোঁট আর গাল। একবার, দুবার—বারবার ঘর্ষণে তার নরম চামড়া লাল হয়ে উঠল। একসময় ঠোঁটের কোণ চিরে সরু হালকা রক্তধারা গড়িয়ে পড়ল বেসিনের সাদা সিরামিকের ওপর। কিন্তু সে থামল না; যেন চামড়া তুলে না ফেলা পর্যন্ত এই জঘন্য স্পর্শের রেশ ঘুচবে না।
আয়নার দিকে তাকিয়ে সে চাপা গলায় গর্জে উঠল, “আই জাস্ট হেইট ইউ! এই পৃথিবীতে যদি আমি কাউকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে থাকি, তবে সেটা তুমি।”
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৫
নিজের রক্তমাখা ঠোঁটের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল সে। প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে তার দৃষ্টি। এই অপমানের হিসাব সে নেবেই—ভাইপার পৃথিবীর যেকোনো গভীরে লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে চরম শাস্তি দেয়াটাই এখন লিওনের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
